হোম চলচ্চিত্র দ্য পোস্ট : যে সংবাদপত্র স্বাধীন নয়, তা মৃত

দ্য পোস্ট : যে সংবাদপত্র স্বাধীন নয়, তা মৃত

দ্য পোস্ট : যে সংবাদপত্র স্বাধীন নয়, তা মৃত
386
0

স্পিলবার্গের সিনেমা বহুরকম। কিন্তু একটা ক্যাটাগরিতে হয়তো সেসব সিনেমাকে ফেলা যায় যে তার সব সিনেমাই ব্যবসা সফল। সে যাই তিনি নির্মাণ করেন না কেন। ‘জোস’, ‘ইটি’, ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স’ বা ‘জুরাসিক পার্ক’ সিরিজের কথা বাদই দিলাম যেগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যবসা সফল ও জনপ্রিয় সিনেমার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। তার সিনেমাগুলো বিশ্লেষণ করে এটা দেখানো খুব সহজ যে তিনি মূলত দুই ধরনের ছবি নির্মাণ করেন। এক. যে সব ছবি ব্যবসা সফল হবে মানে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। দুই. আর একধরনের ছবি নিজের ইন্টেলেকচুয়াল ক্ষিধা মেটাবে। মানে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে নির্মাণ করা সিনেমা। ‘কালার পার্পল’, ‘আমিসটেড’, ‘সিল্ডলার্স লিস্ট’, ‘মিউনিখ’ ইত্যাদি ছবিগুলো ইন্টেলেকচুয়াল ঘরানার। ‘কালার পার্পল’ ও ‘আমিসটেড’ সিনেমায় তিনি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বাকি দুটো হিটলারের বিরুদ্ধে। তিনি সিনেমার জাদুকর। বিষয় যাই হোক সিনেমার যে নিজস্ব ভাষা সেটায় তিনি সিদ্ধহস্ত। তার সম্পর্কে বলা হয় যে, চলচ্চিত্র কাজ করে শিল্প বিজ্ঞান ও তৃতীয় আর কিছুকে নিয়ে, তবে সেই তৃতীয় সত্তা গদারের বেলায় হলো রাজনীতি, বার্গম্যানের বেলায় দর্শন, আইজেনস্টাইনের বেলায় নান্দনিকতা। আর স্পিলবার্গের বেলায় তা হলো প্রযুক্তি। প্রযুক্তিতে তিনি কতটুকু আপডেট থাকেন তা তার সাম্প্রতিক বক্স অফিস কাঁপানো ছবি ‘রেডি প্লেয়ার ওয়ান’ যারা দেখেছেন তারা জানেন।


স্পিলবার্গ এমন একটা বিষয় নিয়ে ডিল করেছেন এবং এমন একটা সময়ে যখন পৃথিবীর সিংহভাগ সংবাদ মাধ্যম কর্পোরেশনের দখলে।


তার সাম্প্রতিক ছবি ‘দ্য পোস্ট’ও একটা ইন্টেলেকচুয়াল ছবি। ভিয়েতনাম-মার্কিন যুদ্ধের অর্থহীনতা নিয়ে সেই সময়ের ক্ষমতাসীন সরকারের মিথ্যাচার আর দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া আর ক্ষমতা ব্যবহারের সর্বোচ্চ স্বৈরাচারী মানসিকতার বিরুদ্ধে সচেতনতার কারণে গণমাধ্যমের কণ্ঠরুদ্ধ করার সমালোচনা করেছেন। ঘটনাটা বাস্তব সত্য সেই সময়ের এক সামরিক কর্মকর্তার নিজস্ব সংগৃহীত কিছু গোপন সরকারি নথি যা পেন্টাগন পেপার্স নামে খ্যাত। সে সব তিনি ধারাবাহিকভাবে পত্রিকায় ছাপানোর সংকল্প করেন। সে সময়ের প্রথম শ্রেণির পত্রিকা নিইউয়র্ক টাইমসে এক কিস্তি ছাপতেই টাইমসের বিরুদ্ধে নিক্সন সরকার খড়কহস্ত হয়। এমনকি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পত্রিকা ছাপানোতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় সুপ্রিম কোর্টকে প্রভাবিত করে।

তখন স্বল্প পরিচিত পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টের সাথে যোগাযোগ করে সেই কর্মকর্তা নথিগুলো তুলে দেন। কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্ট এক মারাত্মক সমস্যার মুখে পড়ে যায়। প্রথমত তার প্রকাশক ক্যাথরিন [মেরিল স্ট্রিপ যে ভূমিকায় অভিনয় করেছেন] যিনি ব্যবসাটাই বুঝেন। যিনি পিতা ও স্বামীর উত্তারাধিকার সূত্রে পত্রিকার মালিক হয়েছেন। সরকারের উচ্চপদস্থদের সাথে যার উঠাবসা আবার পত্রিকাটি শেয়ার বাজারেও ভালো অবস্থানে আছে। এসব মিলিয়ে সেই সময়ের সরকারের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা ছিল না তাদের। অন্যদিকে বলা যায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ সম্পাদক বেন [টম হ্যাঙ্কস যে ভূমিকায় অভিনয় করেছেন] তিনি প্রকাশের ব্যাপারে অনড়। তিনি এমনিতেই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অনভিজ্ঞ প্রকাশককে নিয়ে নাখোশ। তাদের সম্পর্কের মধ্যেও টানাপড়েন চলছিল। তার সহকর্মীরা যখন ব্যানকে বলছিল সে এই সব প্রকাশ করলে ওয়াশিংটন পোস্ট শেষ হয়ে যাবে কারো চাকরি তো থাকবেই না পত্রিকাটাও ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন তিনি বলেন, যে পত্রিকা স্বাধীন নয় সেটা এমনিতেই মৃত।

শেষে সম্পাদক ক্যাথরিন পড়েন এক জটিল পরিস্থিতিতে। একদিকে সরকারের বিরুদ্ধে, ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যারা ইতোমধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী পত্রিকা নিইউয়র্ক টাইমসের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। তার পত্রিকার আরও খারাপ অবস্থা করে ছাড়বে। অন্যদিকে মানবিক সত্য যে পত্রিকার কাজ কী সরকারের তাবেদারি করা না জনগণের পাশে দাঁড়ানো, সত্য প্রকাশ করা? পুরো পত্রিকার টিমটাই তখন প্রকাশকের ঘরে। সবাই চিন্তিত। এক সম্পাদক ছাড়া সবাই তাকে মানা করছে গোপনীয় তথ্যগুলো না ছাপতে। হাতে সময়ও নেই পত্রিকা ছাপা হতে মাত্র দুইঘণ্টা বাকি। তিনি তখন সিদ্ধান্ত দেন পত্রিকায় নথিগুলো ছাপা হবে। কোনো পরামর্শই তাকে টলাতে পারে নি। কারণ তিনি মনে করেছেন সংবাদপত্র জনতার স্বার্থেই কাজ করবে। দাম্ভিক স্বৈরাচারী মানসিকতার সরকারের নয়। যথারীতি পত্রিকা ছাপা হয় পরদিন। সরকার কেঁপে ওঠে কাঁপে পুরো আমেরিকা। সমস্ত আঞ্চলিক সান্ধ্যপত্রিকাগুলো ওয়াশিংটন পোস্টের নিউজগুলো কপি করে ছাপে। এখন তারা শুধু একা নয়। পরদিন কোর্টে সবাইকে ডাকা হয়। সরকার পক্ষ ও পত্রিকাপক্ষের উকিলরা দীর্ঘসময় ধরে বাহাসে লিপ্ত হয়। সমস্ত সংবাদপত্র একজোট হয়ে লড়াই করে নগ্ন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে। কংগ্রেসের ভোটে সংবাদপত্রের পক্ষেই রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। এভাবেই এই অবস্থার অবসান ঘটে।

ঘটনা সিম্পল কিন্তু স্পিলবার্গ এমন একটা বিষয় নিয়ে ডিল করেছেন এবং এমন একটা সময়ে যখন পৃথিবীর সিংহভাগ সংবাদ মাধ্যম কর্পোরেশনের দখলে আর সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বলে কিছু নাই। সম্ভবত এরপরই ক্ষমতাসীন সরকার ও তাদের বলয়ে থাকা কর্পোরেশনগুলো উপলব্ধি করতে পারল সে সংবাদমাধ্যম একটি স্বাধীন শক্তি। ফলে তারা এগুলো ক্রয় করা শুরু করল। হারমান ও চমস্কির সম্মতি উৎপাদন বইয়ে আমরা দেখেছি দুনিয়ার সিংহভাগ সংবাদপত্রই এখন সরকার ও কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত। অন্য অনেক ব্যবসায়ের পাশাপাশি কর্পোরেট হাউসগুলো পত্রিকাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে যাতে অন্য পত্রিকাকে ঠেকানো যায় এবং নিজেদের অপকর্ম যেমন চাপা দেওয়া যাবে তেমনি নিজেদের পণ্যের প্রসারও করা যাবে। যে সব প্রতিষ্ঠানের পত্রিকা নেই তাদের এমনিতেই অনেক পত্রিকায় নিজেদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে হয়। এতে করে সেই বিজ্ঞাপনের টাকা দিয়েই একটা পত্রিকা করে ফেলা যাচ্ছে। তো আমরা এরপর দেখেছি পৃথিবীর সংবাদমাধ্যমের হালহকিকত।


স্পিলবার্গ ডিটেলসের কারিগর। শব্দ ও দৃশ্যের ফাঁকে ফাঁকে ঘটনাকে জীবন্ত করার অনেক টেকনিক তিনি জানেন।


যাই হোক সিনেমা প্রসঙ্গে ফিরে যাই। এখানে বলা হচ্ছে যে তৎকালীন শাসকরা জানত যে ভিয়েতনাম যুদ্ধে তাদের পরাজয় অনিবার্য তাহলে কেন তবুও এত টাকা খরচ করল বা এত তরুণকে ভিয়েতনামের যুদ্ধে পাঠানো হলো। জনগণকে ধাপ্পা দিয়ে এই আত্মহুতি শাসকদের স্বৈরাচারী মনোবৃত্তির পরিচায়ক তো বটেই। তারা জেনেভা চুক্তির লঙ্ঘন করেছে, কংগ্রেসের কাছেও মিথ্যা বলেছে, জনগণের কাছেও মিথ্যা বলেছে। এই যুদ্ধ তবুও তারা চালিয়ে গেছে। আমেরিকার তিনটি সরকারের শাসনামল জুড়ে বিস্তৃত ছিল এই যুদ্ধ। এটা নিক্সনের আমলের ঘটনা। তিনিও যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন আগের মিথ্যা তথ্যসমূহ সঙ্গী করে কারণ তিনি পরাজয়ের ভয়ে ভীত। পাছে না প্রচার হয় নিক্সনের আমলেই পরাজয় হয়েছে। বিশ বছরজুড়ে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবার কারণ সম্পর্কে এখানে বলা হচ্ছে, এর দশ পার্সেন্ট ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামিদের সহয়তা করা, বিশ পার্সেন্ট ছিল কমিউনিস্ট দমন, আর সত্তর পার্সেন্ট ছিল আমেরিকার পরাজয় ভীতি ও জেদের কারণে।

অনেক প্রশ্ন ও হিসেব নিকেশ সামনে নিয়ে আসে স্পিলবার্গের এই সিনেমাটি। স্পিলবার্গের অন্যান্য সিনেমার মতো এটিও বাগিয়ে নিয়েছিল অনেকগুলো শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। স্পিলবার্গের অনেকগুলো সিনেমাতেই টম হ্যাঙ্কস অভিনয় করেছেন। অবশ্য মেরিল স্ট্রিপের সাথে সম্ভবত এটা তার প্রথম কাজ। স্পিলবার্গ ডিটেলসের কারিগর। শব্দ ও দৃশ্যের ফাঁকে ফাঁকে ঘটনাকে জীবন্ত করার অনেক টেকনিক তিনি জানেন। যেমন গোটা ওয়াশিংটন পোস্ট পরিবার যখন দ্বিধাহীনতায় ভুগছিল তখন তিনি প্রেসের পত্রিকার ছাপা হওয়ার সময় লাইটকে কাঁপানো থেকে শুরু করে টেবিলে কলম কাঁপানোসহ অনেকগুলো ডিটেলস ব্যবহারের ভেতর দিয়ে সিনেমাটাকে আরও বেশি বাস্তবসম্মত করে তোলেন। খুব সিরিয়াস বিষয়ও তিনি শিশুতোষভাবে বলতে পারেন। তিনি পর্দায় গল্প বলেন মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার মতো করে। কিন্তু গল্পকথকের চাইতে বেশি তিনি, তিনি হলেন এক চরম অভিযাত্রী, তার অভিযান সমুদ্রের গভীরে, মহাশূন্যের অসীমে, মানবমনের গভীরে, বিনোদনের উন্মাদনায়। যারা সিনেমা বুঝেন তারা জানেন একটা সিনেমায় কাহিনিই সব নয়। কাহিনিকে গড়ে তোলার পিছনে অনেক টুলস আছে। আর সেই পেছনের টুলস ব্যবহারে স্পিলবার্গের জুড়ি নেই। এই ছবিটিরও সর্বত্র তার প্রমাণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

জাহেদ সরওয়ার

জন্ম ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৭৬; মহেশখালী দ্বীপে। স্নাতকোত্তর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ফ্রিল্যান্সার।

প্রকাশিত বই—

এই মিছা কবি জীবন [কবিতা]
আততায়ী একটি কবর [কবিতা]
বিকালের দাসবাজার [কবিতা]
আরো একটি কবিতা শোনাও কবি [কবিতা]
সূর্যের নিচে শুধু ভয় [কবিতা]
পায়ুবাসনার জনগণ [উপন্যাস]
দস্তইয়েভস্কির বই ও কোটিপতির সকাল [গল্প]
সম্পর্কের সন্ত্রাস ও অন্যান্য গল্প [গল্প]
রাজ্য ও সাম্রাজ্য [রাজ্যচিন্তার কারখানা-১]
সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ [রাজ্যচিন্তার কারখানা-২]
কবিতা পড়ুয়ার নোটবই [কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধের বই] ফিদেল কাস্ত্রো [জীবনী গ্রন্থ]


ই-মেইল : sjahedpoet@gmail.com