হোম চলচ্চিত্র ডুব : উচ্চকিত পুরুষভাবাপন্ন ক্যারিকেচার

ডুব : উচ্চকিত পুরুষভাবাপন্ন ক্যারিকেচার

ডুব : উচ্চকিত পুরুষভাবাপন্ন ক্যারিকেচার
3.08K
0

‘একজন বিধবাই কেবল বলতে পারে তার স্বামী কোথায় আছে’—ধারণা করি হাল আমলের মেধাবী চলচ্চিত্রকার মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও উপরোক্ত বাক্যের সাথে সহমত পোষণ করেন। ফলে জাবেদ হাসানের মৃত্যুর পরপরই স্ত্রী মায়া নিশ্চিন্ত মনে ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা ছবিগুলো পুনঃস্থাপন করেন এবং আপন মনে বলেও যান—স্বামীর মৃত্যুই তিনি কামনা করেছিলেন! এখন তো আর সে কারো অধিকারে নেই।


‘ডুব’ মানে কী? ডুবে ডুবে জল খাওয়া? জীবন থেকে ডুব দিয়ে মৃত্যুর দিকে চলে যাওয়া? নাকি সবাইকে ডুবিয়ে, বিশেষ করে নিতু আর তার নাবালক সন্তানকে ডুবিয়ে দিয়ে জাবেদ হাসানের প্রস্থান? 


মায়া তার মৃত স্বামীকে নিয়ে এতটাই নিশ্চিন্ত বোধ করেন যে, তার মনোলোকে স্বামীর স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিজ গৃহে স্থান দেন। হয়তো জাবেদ হাসান তার মৃত্যু পরবর্তী জীবনে মায়ার সাথে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগলেন—এইরূপ ইঙ্গিত আমরা পাই।

‘ডুব’ মানে কী? ডুবে ডুবে জল খাওয়া? জীবন থেকে ডুব দিয়ে মৃত্যুর দিকে চলে যাওয়া? নাকি সবাইকে ডুবিয়ে, বিশেষ করে নিতু আর তার নাবালক সন্তানকে ডুবিয়ে দিয়ে জাবেদ হাসানের প্রস্থান? যা-ই হোক না কেন—ডুব যত-না ডুব দিতে পেরেছে তার চাইতে জাম্প করেছে বেশি। ঘটনার পরম্পরার বাইরে বেখাপ্পাভাবে দৃশ্যাবলি যুক্ত হয়েছে। জাবেদ হাসানের মনো-দৈহিক ক্রাইসিস তেমনভাবে স্পষ্ট নয়। তিনি কী জন্য যে নিতুর প্রতি আসক্ত হলেন বোঝা মুশকিল। নাকি নিতুই তাকে টেনে ডুবাল? বলা হচ্ছে ফারুকীই বাংলাদেশে প্রথম বায়োপিক নির্মাতা। নিতু চরিত্রটি যদি শাওনের প্রতিভূ হয়ে থাকে, তবে বাস্তবের শাওনের সঙ্গে তার কোনো মিল খুঁজে পেলাম না! নতুন কুঁড়ির চ্যাম্পিয়ন মেধাবী শাওন এখানে অনুপস্থিত। আমি মনে করি শাওন নিজেও বহুগুণের অধিকারী।

ফারুকীর সমস্ত মনঃসংযোগ ছিল জাবেদ হাসানের প্রতি। ফলে নিতু, মায়া বা সাবেরির মতো নারী চরিত্ররা কর্কশ এবং রুক্ষ। বাস্তবে কিন্তু আমাদের বঙ্গদেশীয় নারীরা অতুল মমতার আধার। ‘ডুব’-এর মায়া সর্বক্ষণই জাবেদ হাসানের উপর বিরক্ত। নিতুও। কন্যা সাবেরিও। আর নিতু তো হিন্দি সিরিয়ালের ওইসব নারী ভিলেনের মতো, যে কিনা স্বামীর অগোচরে গাড়ির বনেট খুলে সাবেরির জন্য কেনা গিফট সরিয়ে ফেলে, এমনকি কাজের লোককেও না খাইয়ে রাখে। আচ্ছা ধরে নিলাম—নিতু অমন কর্কশই কিন্তু জাবেদ হাসান মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়া সত্ত্বেও সে কেন কাকুতি-মিনতি করবে? আর জাবেদ হাসানরূপী ইরফান খান তো সর্বংসহা ধরিত্রীর মতো। মায়ার কাছে বারবার ফিরে যায়, কিন্তু মায়ার মনে তার জন্য বিন্দুমাত্র দয়ামায়া দেখা যায় না। বরং নিতুই যেন সামান্য কেয়ারিং তার প্রতি—‘তোমার গ্যাস্ট্রিক-এর সমস্যা বেড়ে যাবে—খেয়ে নাও।’

ফারুকী হয়তো ট্যাবু ভাঙতে ভয় পেয়েছেন—ফলে নিতুকে যতটা সম্ভব দুরাচার হিশেবেই দেখিয়েছেন। মায়ারও সারাক্ষণ বিরক্তিসূচক কথাবার্তা—বঙ্গদেশীয় পুরুষেরা এত সহিষ্ণু কবে হলো যে দুইপক্ষের চাপে স্যান্ডউইচের লেটুসপাতা হয়েই দিন গুজরান করে?

ফারুকীর সমস্ত মনোযোগ, সমস্ত নির্মাণ আদতে জাবেদ হাসানকে ঘিরেই। কিছু কিছু সিনেমাটোগ্রাফি অসাধারণ—যেমন : জাবেদ হাসানের তেষ্টা পেলে জলশূন্য জগ। অর্থাৎ প্রথম পক্ষের কাছ থেকে কিছু পাওয়া দুরাশা। তিশার গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে থাকা—সন্তানেরা কিছুটা হলেও জীবনের তৃষ্ণা নিবারণ করে দিতে পারে হয়তো।


পুতুলখেলার বয়স থেকেই তাহলে নারীরা সর্বনাশী হয়ে ওঠে! মেধাবী চলচ্চিত্রকার ফারুকী বেশ ভালো মেসেজ দিলেন তো!


নিতুর গাড়িতে বসে বই পড়া এবং ঝুম বৃষ্টিতে সব সয়লাব হয়ে যাওয়া—মানব মনের চাহিদা-মায়া-মমতা-প্রয়োজন ইত্যাদি প্রাকৃতিক নিয়মেই পূর্ণ হয়ে যায়। মানুষ সে-সব পূর্ণ করে নেয়। নিতে বাধ্য হয়।

‘ডুব’-এর আরেকটি চরিত্র নিমগাছ। চমৎকার সতেজ-সজীব একটা গাছ, যার তলায় শাঁখের করাতের নিচে পড়া জাবেদ হাসান দাঁড়িয়ে থাকে। নিজপুত্রকে আলিঙ্গন করে। এমনকি জাবেদ হাসানের গাড়িটিও নিমগাছের নিচে ছায়ায় নিঃসঙ্গতা যাপন করে। সাবেরি আর মায়ার আশুলিয়ার বুনোঘাসের ভেতরের দৃশ্যায়ন অপরূপ।

জোছনা করেছে আড়ি
আসে না আমার বাড়ি
গলি দিয়ে চলে যায়
লুটায়ে তাহার শাড়ি

এই গান দিয়েও জাবেদ হাসানের একাকিত্বকে তেমন করে ধরা যায় নাই।

‘ডুব’-এর প্রথমেই একটা ডায়ালগ স্লোগানের মতো শোনায়—আপনজন দূরে চলে গেলেই কেউ মারা যায়? জাবেদ হাসানের পরিবার তাহলে মায়া, সাবেরি এরা? তাহলে নিতু কে? নিতুকে আপনজন না ভেবেই তাকে বিয়ে করে ফেললেন? গর্ভে সন্তানও দিলেন? বেশ!

আর নারীরা বালিকা বয়স থেকেই হিংসুক হয়? প্রতিযোগী হয়? বন্ধু কভু নয়? সেই হিংসা ও প্রতিযোগিতার জন্য সহপাঠীর বাবাকেও বিয়ে করে ফেলতে হয়? হাস্যকর ও আজব যুক্তি! ছোট মেয়ে দুটোকে ওইভাবে কথাবার্তা বলতে দেখে নিজেই লজ্জিত হয়েছি। পুতুলখেলার বয়স থেকেই তাহলে নারীরা সর্বনাশী হয়ে ওঠে! মেধাবী চলচ্চিত্রকার ফারুকী বেশ ভালো মেসেজ দিলেন তো!

তবে কি এটাই সত্য যে নারীর না-মরে মুক্তি নাই—না, এখানে স্যান্ডউইচের লেটুসপাতা জাবেদ হাসান মারা গেলেন। হয়তো দুই পক্ষের চাপে পড়েই মারা গেলেন। মৃত্যু কি কোনো কিছুর সমাধান? মনো-দৈহিক জটিলটার টানাপড়েনের সমাধানে মৃত্যুই অনিবার্য হয়ে উঠলে দর্শক নিশ্চয়ই এরপর ভেবেচিন্তে ওইরকম কোনো সম্পর্কের দিকে এগুবেন


নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে ডুবের প্রতিটি শো হাউসফুল চলছে। উপচে পড়া দর্শকরা কি বায়োপিকের টানেই ব্লকবাস্টার, সিনেপ্লেক্সে দৌড়াচ্ছেন? কিং-লিয়ার জাবেদ হাসানের সমস্ত স্বেচ্ছাচারিতা দেখতে পারাও মন্দ কিছু নয়।


‘ডুব’-এর সংযোজন বলতে ভারতীয় অভিনেতা ইরফান খানকে বাংলাদেশের দর্শক ভালো করে চিনল। তবে ডাবিংটা অন্য কাউকে দিয়ে করালে ভালো হতো। পর্নো যথারীতি আড়ালের মানুষ। ফলে তার উপস্থিতি কমই হবে বলাই বাহুল্য। শাওনের গানের গলা কিন্তু ভারি সুন্দর। নিতুর চরিত্র আমাদের দুই/একটা গানও শোনাতে পারত। কিন্তু সে আশারও গুড়ে বালি।

ছোটবেলায় ভাইদের দেখতাম মাটির হাড়ি ভাঙা চারা কায়দা করে পুকুরের জলে ছুড়ে দিত। সেই চারা তিন-চারটা লম্ফ দিয়ে জলে তলিয়ে যেত। এই খেলার নাম ছিল ‘ফ্রগ জাম্প’। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ ওই ‘ফ্রগ জাম্প’ দিয়েই শেষ হলো। ফলে কারো জন্য দয়া-মায়া-মমতা-ঘৃণা কিছুই অনুভূত হলো না! বানসালির বাণিজ্যিক ছবি ‘দেবদাস’ দেখে যে পরিমাণ বিষাদাক্রান্ত হয়েছি, বায়োপিক ‘ডুব’ দেখে তার কণা মাত্রও নয়! শুধু কিছু দৃশ্য [জাবেদের মৃত্যু সংবাদে মায়া আর সাবেরির কনভার্সেশন], কিছু সিম্বলিক দৃশ্য, কিছু মুগ্ধকর সিনেমাটোগ্রাফি মনের গভীরে রয়ে গেল।

নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে ডুবের প্রতিটি শো হাউসফুল চলছে। উপচে পড়া দর্শকরা কি বায়োপিকের টানেই ব্লকবাস্টার, সিনেপ্লেক্সে দৌড়াচ্ছেন? কিং-লিয়ার জাবেদ হাসানের সমস্ত স্বেচ্ছাচারিতা দেখতে পারাও মন্দ কিছু নয়।

বাংলাদেশের প্রথম বায়োপিক নির্মাতা হিশেবে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর প্রতি রইল অভিনন্দন। আর কিছু না হোক আগ্রহ নিয়ে দর্শক ছুটছে ‘ডুব’ দেখতে, এটাই ভরসার কথা…

papree.rahman@gmail.com'

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।
লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং অনুবাদক।

গল্পের বই:
লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা (২০০০)
হলুদ মেয়ের সীমান্ত (২০০১)
অষ্টরম্ভা (২০০৭)
ধূলিচিত্রিত দৃশ্যাবলি (২০১০)
মৃদু মানুষের মোশন পিকচার (২০১২)
মামুলি জীবনের জলতরঙ্গ (২০১৪)
Lilies, Lanterns, Lullabies (২০১৪) Edited By Niaz Zaman
শহর কিংবা ঊনশহরের গল্প (২০১৬)

উপন্যাস:
পোড়া নদীর স্বপ্নপুরাণ (২০০৪)
মহুয়া পাখির পালক (২০০৪)
বয়ন (২০০৮)
পালাটিয়া (২০১১)

সম্পাদনা:
ধূলিচিত্র (সাহিত্যপত্রিকা)
বাংলাদেশের ছোটগল্প : নব্বইয়ের দশক
গাঁথাগল্প (যৌথ), লেখকের কথা (যৌথ)
অ্যালিস মানরোর নির্বাচিত গল্প (যৌথ)
Women Writing from Bengal (Joint)

গবেষণা : ভাষা শহীদ আবুল বরকত
আত্মজীবনী : মায়াপারাবার (২০১৬)

ই-মেইল : papree.rahman@gmail.com
papree.rahman@gmail.com'