হোম চলচ্চিত্র গুরু দত্তের পিয়াসা

গুরু দত্তের পিয়াসা

গুরু দত্তের পিয়াসা
427
0

গুরু দত্ত হিন্দি সিনেমা জগতে এক রহস্যময় ব্যক্তিত্বের নাম। তার জীবন, চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং মৃত্যু—সবকিছুই। কোনো কিছুই আর দশটা মানুষের মতো নয়। গুরু দত্ত’র পিয়াসা ছবির ওপর কিছু লিখব, বহুদিন থেকে ভেবে আসছি। নানা কারণে সিনেমাটি আমাকে টানে। মনে হয় জীবনের কবিতা চলচ্চিত্রে ধারণ করা হয়েছে। এত স্পর্শ করে কিছু দৃশ্য, কিছু সংলাপ এবং ক্যামেরার ভাষা—কখন যে নিমগ্নতায় নিয়ে যায়, বোঝাই যায় না।

গুরু দত্ত পিয়াসা ছবির মূল চরিত্রটি দিলীপ কুমারকে অফার করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন আগে দেবদাস ছবিতে দিলীপ কুমার দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করেন। পিয়াসা ছবির বিজয় চরিত্রকে দেবদাসের সাথে মিল খুঁজে পান তিনি। তাই পিয়াসার অফার ফিরিয়ে দেন। অথচ আমার মনে হয়েছে বিজয় আর দেবদাস চরিত্র মোটেই এক নয়। পিয়াসার বিজয় চরিত্র অনেক পরিণত, যে মানব জীবনের মনোজগৎ নিরীক্ষা করে। গুরু দত্ত চরিত্রগুলো বিন্যাস করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। ছবিতে অভিনয় করেছেন গুরু দত্ত, ওয়াহিদা রেহমান, মালা সিনহা। বলা যায় ত্রিভুজ প্রেম নিয়ে ছবি। ছবিতে একে একে সমাজের অলি-গলি, আমিরি-গরিবি এবং শুধু পয়সার জন্য মানুষের বিভিন্ন রূপ—ক্যামেরায়, গানে এবং মেলোড্রামাটিক সিকোয়েন্সে—এত অভিনব ভঙ্গিতে তুলে আনা হয়েছে যে, দর্শক সহজে ছবির সাথে ইনভলব হয়ে পড়েন।


29366302_480669405664839_7995865689258721280_n
গুরু দত্ত

ছবির একটি চরিত্রে জনি ওয়াকার অভিনয় করেছেন—তার স্বভাবজাত হাস্য কৌতুক-ভরা অভিনয় বাস্তবকে যেভাবে ইঙ্গিত দেয়, দর্শক যেন কৌতুকের মাঝে বাস্তবকে দেখতে পান। চার্লি চ্যাপলিনের ভারতীয় রূপ মূর্ত হয়ে ওঠে। গুরু দত্ত’র ছবিতে হলিউড-প্রভাব স্পস্ট চোখে পড়ে। ক্যামেরার ভাষায় বিষয়টি ছিল স্পস্ট। তৎকালীন সময়ে হলিউডের প্রভাবমুক্ত থাকা একজন চিত্রপরিচলের জন্য কঠিন ছিল।

ছবির প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় পার্কে শুয়ে আছে বিজয়। হঠাৎ তার কানে গানের আওয়াজ আসে, যার লিরিক নিজের লেখা। কিন্তু তার কবিতার পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়। গভীর রাতে মেয়েটি গান গাইছে। ওয়াহিদা রেহমানের বডি লেঙ্গুয়েজ এবং সিডাক্টিভ চাহনি এত মন-কাড়া ছিল, সেই সাথে রাস্তার লাইটের আলো, চাঁদের রৌশন সব মিলে সিনেমার চৌম্বক আকর্ষণ যাকে বলে।

গুরু দত্ত পিছু নেয় গোলাবোর। বার বার জানতে চায় কবিতাটি কোথায় পেল? গোলাবো বুঝে যায় লোকটি তার কাস্টমার নয়। তখন সে ক্ষেপে যায়। পরে বুঝতে পারে ওই পিছু নেয়া লোকটি এই লিরিকের মালিক, তখন সে অধির হয়ে বিজয়কে খুঁজে অথচ পায় না। পিয়াসা ছবির বিজয় হলেন একজন শায়ের। কলেজে পড়তেন। শায়েরি লিখতেন। কলেজে মিনাকে প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়ে শায়েরি বলেছিলেন মিনাকে লক্ষ করে।


29495836_480669025664877_7775849323731877888_n
গুরু দত্ত ও ওয়াহিদা রেহমান

‘জব হাম চলে, সায়া ভি আপনা না সাথ দেয়, জব তুম চলো, জমিন ভি চলে আসমান তক।’ যখন আমি হাঁটি, আমার ছায়াও আমার সাথি হয় না, যখন তুমি হেঁটে চলো, মনে হয়, জমিন খুশিতে আসমান তক চলে।

বিজয় ও মিনার উচ্ছল প্রেম বিজয়কে অনুপ্রেরণা দেয়। অনেক কাব্য মিনাকে উৎসর্গ করে লেখা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে মিনা ধনাঢ্য এক ব্যক্তিকে বিয়ে করে।

এক রি-ইউনিয়ন পার্টিতে মিনা ও তার স্বামীর সাথে দেখা হয় বিজয়ের। মিনার স্বামী ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বিজয়কে দেখা করতে বলেন। বিজয় ভাবে তার শায়েরি পাবলিশ করার জন্য ডেকেছেন। কিন্তু চতুর ব্যক্তি বুঝতে পারে বিজয় তার স্ত্রীর পূর্ব প্রেমিক। তিনি বিজয়কে ছোট একটি চাকরির অফার দেন। বিজয় কাজটি নেয়, সে-সময়ের অর্থ কষ্টের কারণে।

রাতে পথের মাঝে এক বস্ত্রহীন ব্যক্তি প্রচণ্ড শীতে কাঁপছিল। বিজয় গায়ের কোট দিয়ে লোকটিকে ঢেকে দেয়। লোকটি পিছু নেয় কিন্তু ট্রেন লাইনে পা আটকে যায়। বিজয় লোকটিকে বাঁচাতে চায়, ততক্ষণে ট্রেন কাছাকাছি চলে আসে। লোকটি ধাক্কা দিয়ে বিজয়কে সরিয়ে দেয়। বিজয় আহত হয়। লোকজন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। ট্রেনে মারা যাওয়া লোকটির গায়ে জড়ানো কোটের পকেটের কাগজে বিজয়ের নাম-পরিচয় ছিল। পরদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয় নামকরা শায়ের বিজয় ট্রেনে আত্মহত্যা করেছেন। মুহূর্তে খবর সারা শহরে ছডিয়ে পড়ে। গোলাবো ব্যথিত চিত্তে কবিতার পাণ্ডুলিপি নিয়ে যায় মিনার কাছে ছাপানোর জন্য। মিনার সুচতুর ব্যবসায়ী স্বামী কবিতার বই পাবলিশ করে। অল্প দিনে সব বই বিক্রি হয়ে যায়।

বিজয় সুস্থ হয়ে তার নাম পরিচয় জানায়। কিন্তু সবাই জানে বিজয় মৃত। এরপর ঘটনার প্রবাহ জটিল রূপ ধারণ করে। বিজয়ের মন বিতৃষ্ণায় ভরে যায়। এই সমাজ থেকে দূরে চলে যাবে ঠিক করে। যাবার আগে গোলাবোকে দেখতে যায়। গোলাবো বলে, সেও বিজয়ের সাথে চলে যেতে চায়।


29388595_480669155664864_1211143003234631680_n (1)
পিয়াসা পরিবার

গুরু দত্ত অত্যন্ত প্যাশন দিয়ে পিয়াসা নির্মাণ করেছেন। তার অন্তর্দৃষ্টি কিংবা তৃতীয় নয়ন দিয়ে পৃথিবীর মানুষের হালচাল আনন্দ বেদনা স্বার্থ নিষ্ঠুরতা ভালোবাসা প্রতারণা করুণা অসহায়ত্ব এসব সেলুলয়েডে নিয়ে আসেন এক বোধসমৃদ্ধ কাব্যভাষায়। ড্রামাটিক স্টাইল সিনেমাতে ব্যবহার করা হয়। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে ভায়োলিন বেশি ব্যবহৃত হয়। কারণ সিনেমার মূল সুর বোঝাতে ভায়োলিন একটি অন্যতম চরিত্র হয়ে ওঠে । শায়েরি যে পুরো সিনেমাকে কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়, সিনেমাটি না দেখলে বোঝা যাবে না। বিজয়ের চাহনি, মুভমেন্ট ক্যামেরায় ফোকাস করা হয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে।

প্রতিটি চরিত্র প্রয়োজনের বাইরে নয়। অর্কেস্ট্রেশন এত ছন্দবদ্ধ যে কোথাও খাপছাড়া ভাব চোখে পড়ে নি। সিনেমাটি সাদাকালো যুগের—প্রখর আলোর ব্যবহার দেখা যায় না। নরম বিষণ্ন একটি বাতাবরণ পুরো ছবি জুড়ে আছে। ছবির সংগীত-পরিচালক এস ডি বর্মন। বিখ্যাত উর্দু কবি শাহির লুধিয়ানির শায়েরি পুরো সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে। গানের লিরিক অনেক উচুমানের। আর ডি বর্মনের সুরে গাওয়া প্রতিটি গান মনকে ছুয়ে যায়। বিজয় চরিত্র গুরু দত্তের নিজেরই বায়োগ্রাফি যেন। গুরু দত্ত চরিত্রটিতে এতই নিমগ্ন ছিলেন যে, কোনো ভুল চোখে লাগে নি। তাকানোর ভঙ্গি, মৃদু রহস্যময় হাসি—হলিউডি প্রভাব বেস স্পষ্ট বোঝা যায়। শেষ দৃশ্যে গোলাবোর হাত ধরে চলে যাওয়া—মনে হলো, অন্য দুনিয়ার খুঁজে ওরা চলে গেল, যেন পৃথিবী তাদের জন্য বাসযোগ্য নয়। অনেকে ছবিটি দেখে নিজেকেও খুঁজে পান, যদিও বাস্তবে ফিরে আসে সবাই। তবুও বুকের মাঝে একটুখানি চিনচিনে ব্যথা কি লাগে না? মিনা চরিত্রে মালা সিনহাক অপূর্ব মানিয়েছে। গোলাবো চরিত্রটি ওয়াহিদা রেহমানের অভিনয় জীবনের মাইলস্টোন বলা যায়।

ভারতীয় সিনেমা জগতে পিয়াসা একটি অনন্য সিনেমা হয়ে থাকবে।

 

Shirin Osman

শিরিন ওসমান

জন্ম ৩১ মে, সিলেট। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : বি এ। পেশা ব্যবসা।

ই-মেইল : shirin.osman31@gmail.com
Shirin Osman