হোম চলচ্চিত্র ‘আলফা’ : বাঙালির আত্মপরিচয়ের উপাখ্যান

‘আলফা’ : বাঙালির আত্মপরিচয়ের উপাখ্যান

‘আলফা’ : বাঙালির আত্মপরিচয়ের উপাখ্যান
550
0

নাসির উদ্দীন ইউসুফ [Nasir Uddin Yousuff] পরিচালিত ‘আলফা’ দেখলাম। এর আগে তার ‘গেরিলা’ ছবিটি দেখেছি। ‘আলফা’ দেখার আগে মনে হয়েছিল, হয়তো এটাও সনাতন ধরনের একটা ফিল্মই হবে! কিন্তু না। তা হয় নি।

এমনিতে নাটকের সঙ্গে জড়িত লোকজন যে-সব ছবি বানান, সেগুলি দেখে কখনোই তৃপ্ত হতে পারি নি। অনেকের ছবিই শেষ পর্যন্ত নাটকই মনে হয়! চলচ্চিত্রের ভাষাটা তাদের অনেকেই ঠিক রপ্ত করতে পারেন নি! আবদুল্লাহ আল মামুনের ছবিগুলো যে অর্থে অখাদ্য! কেউ কেউ ‘সারেং বৌ’-এর কথা তুলবেন। ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসটাই এমন, কেউ চাইলেও মামুন ভাইয়ের ‘সারেং বৌ’-এর চাইতে খারাপ ছবি বানাতে পারবেন না! ‘আলফা’ সে অর্থে নাটক তো নয়ই, এমনকি প্রচলিত ধরনের ছবি যে হয় নি, সেটা দেখেই আমি খুশি হয়েছি! মুগ্ধও।


‘আলফা’র অনেক ফ্রেমই আমার কাছে কবিতাই মনে হচ্ছিল! কোনো কোনো অংশ মনে হচ্ছিল, চিত্রকলা।


ছবি দেখতে দেখতে আমার শিল্পী ও চলচ্চিত্রকার জাঁ ককতো’র ‘ব্লাড অব আ পোয়েট’-এর কথাই মনে পড়ছিল। কারণ, ‘আলফা’র অনেক ফ্রেমই আমার কাছে কবিতাই মনে হচ্ছিল! কোনো কোনো অংশ মনে হচ্ছিল, চিত্রকলা।

কবিতা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আমি কিছুদিন আগেই লিখেছিলাম, কবিতা হচ্ছে সেটাই, যা কবিতায় বলা হয় নি! কবির কাজ হচ্ছে, পাঠককে নিজের মতো করে তাতে অর্থ যোগ করার সুযোগ দেয়া।

’আলফা’য় সনাতন কোনো গল্প, সনাতন ক্লাইমেক্স, সনাতন ড্রামা—এসবের কিছু নেই। যদিও তাতে আছে আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া অনেক টুকরো গল্প! টুকরো টুকরো ঘটনা। একই সঙ্গে তাতে আছে দর্শকদের নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নেয়ার সুযোগও।


এই চলচ্চিত্রের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে প্রচল ও প্রথা ভাঙার চেষ্টা।


আমরা যে বহুমাত্রিক একটা সাংস্কৃতিক বলয়ের মধ্যে বাস করি, এ চলচ্চিত্রটিতে আছে তারই একটা কোলাজ বিবরণ! আমাদের চারপাশে যে সব রক্তপাতের ঘটনা ঘটে চলেছে, তা নিয়ে আছে আমাদের বিক্ষোভ ও যন্ত্রণাও। নানা রূপক ও প্রতীকের মাধ্যমে আমাদের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের উপাখ্যানই আসলে ‘আলফা’।

চলচ্চিত্রটির কিছু কিছু দৃশ্য অনেকদিন দর্শকরা মনে রাখবেন। বিশেষ করে, ক্যানভাসে রঙ ছিটিয়ে দিয়ে তাতে বিক্ষুব্ধ ও যন্ত্রণাকাতর আলফার পারফর্মিং আর্ট [আহা, এ দৃশ্য দিয়েই যদি চলচ্চিত্রটি শেষ হতো!] গাধার পিঠে লাশ বহন করা ও ডোমদের কণ্ঠে মিস্টিক কবি কবীরের গান! এই চলচ্চিত্রের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে প্রচল ও প্রথা ভাঙার চেষ্টা। যেমন, শহরের ব্যস্ত রাস্তার মাঝখান দিয়ে গাধা নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে আলফার হেঁটে যাওয়া। এ ছাড়াও ছবিটিতে আছে বাস্তব ও পরাবাস্তবের দোলাচল। অতীত ও বর্তমানকে ভেঙে তাকে একটি চিরকালীন অবয়ব দেয়ার চেষ্টাও। আলফা চরিত্রে কাস্টিং যথাযথ। তবে হিজড়া চরিত্রটি যিনি করেছেন আমার বিবেচনায় তার অভিনয়ই এ ছবিতে সেরা। রাগ-অভিমান-মমত্ব তার চেহারায় এমনভাবে দৃশ্যমান হচ্ছিল যে তা হৃদয়কে আন্দোলিত করেছে। এ অভিনেতার কোনো কাজ আমি আগে দেখি নি। কিন্তু তিনি যে একজন অসাধারণ শিল্পী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই আমার।


আজ থেকে তাকে কবি অভিধায়ও আমি অভিষিক্ত করতে চাই। মনেপ্রাণে কবি বা শিল্পী না হলে এমন চলচ্চিত্র সৃষ্টি সম্ভব না।


আমার যৎসামান্য কয়েকটা সমালোচনা আছে। যেমন, শেষাংশ প্রলম্বিত লেগেছে কিছুটা। অন্তত মিনিট দশেক তো বটেই। সোলাইমানের খোঁজে আলফা বেশ কয়েকবার তার বস্তি ও দেশের বাড়িতে গেছে। সেটাও কিছুটা কম হতে পারত। আলফাকে সোলাইমানের ঠিকানায় দুবার পাঠালেই তার পরিচয় ও ঠিকানা অন্বেষণের বিষয়টা আরো ব্যঞ্জনা পেত বলে মনে হয়। আর, সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের সমাবেশ দেখানোর লোভটা যদি কিছুটা সংবরণ করা যেত! এ ছাড়া কোনো কোনো জায়গায় আবহ সংগীতের কাজও যথাযথ মনে হয় নি!

ছোটখাটো এটুকু ত্রুটি সত্ত্বেও শেষতক চমৎকার একটি কবিতাপাঠের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে যে হল থেকে বেরোতে পারলাম, সে-জন্য বাচ্চু ভাইকে স্রেফ ধন্যবাদ জানানোটা যথেষ্ট হবে না। তাকে আমার আলিঙ্গন ও কুর্নিশ। একই সঙ্গে আজ থেকে তাকে কবি অভিধায়ও আমি অভিষিক্ত করতে চাই। মনেপ্রাণে কবি বা শিল্পী না হলে এমন চলচ্চিত্র সৃষ্টি সম্ভব না।

আলফার জয় হোক।

ফরিদ কবির

ফরিদ কবির

জন্ম ২২ জানুয়ারি ১৯৫৯, ঢাকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা: চাকরি।

উল্লেখযোগ্য বই:
ওড়ে ঘুম ওড়ে গাঙচিল (কবিতা)
অনন্ত দরোজাগুচ্ছ (কবিতা)
মন্ত্র, ওঁ প্রকৃতি ওঁ প্রেম (কবিতা)
আমার গদ্য (গদ্য)

ই-মেইল: faridkabir1962@gmail.com
ফরিদ কবির