হোম চলচ্চিত্র আলফা : বাংলাদেশের নতুন সিনেমা

আলফা : বাংলাদেশের নতুন সিনেমা

আলফা : বাংলাদেশের নতুন সিনেমা
526
0

২৬ এপ্রিল সারাদেশে মুক্তি পাচ্ছে ‘একাত্তরের যীশু’ ও ‘গেরিলা’ খ্যাত নির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর তৃতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আলফা’। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবির প্রিমিয়ার শো হয়ে গেল গত ২০ এপ্রিল বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে।

যারা ইতঃপূর্বে ‘একাত্তরের যীশু’ ও ‘গেরিলা’ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন তাদের জন্য এই সিনেমায় মুগ্ধতার চেয়ে অপেক্ষা করছে বিস্ময়। আর যারা নাসির উদ্দিন ইউসুফের আগের দুটি সিনেমা দেখেন নি বা দেখলেও মনে করেছেন প্রচলিত জন্‌রায় ভালো সিনেমা নয়, নতুন ধরনের সিনেমা খুঁজছেন, জমজমাট গল্পনির্ভর সিনেমার বাইরে কিছু, তাদের অনুরোধ করব সিনেমাটি অবশ্যই দেখবেন।

প্রত্যেক লেখক, শিল্পী বা নির্মাতা একটিমাত্র গল্প বলার জন্য বেঁচে থাকেন। তারা বিভিন্ন গল্পের ভেতর সেই গল্পটা খুঁজে বেড়ান। অর্থাৎ প্রতিটা সৃষ্টির ভেতর নির্মাতা আসলে আত্মঅন্বেষণ করেন। দর্শক সেই অন্বেষণের সঙ্গে কখনো একাত্ম হন, কখনো আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পাঠক আমার এই কথার সূত্র তখনই ধরতে পারবেন যখন সিনেমাটি দেখবেন। নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু একজন আর্টিস্টকে সৃষ্টি করেছেন যিনি একটি বিক্ষিপ্ত সময়ের বাসিন্দা। আশুরার শোক মিছিলে হারিয়ে যাওয়া এক শিশু বেড়ে উঠছে অন্য মানুষের মাঝে। পরিচিতির সঙ্গে সঙ্গে হয়ে উঠছে আরোপিত সংস্কৃতির বাসিন্দা সে। কিন্তু আর্টিস্ট এই আরোপ করা বাস্তবতা থেকে বের হতে চান। চিপিউয়া এলডাল বলছেন, ‘যখন অন্য কেউ তোমার গল্প বলবে, তখন সেটা বিকৃত হয়ে যাবে। এই গল্প বলার ভেতর দিয়ে একজন ব্যক্তির আইডেনটিটি নির্মিত হয়।’ বর্তমানে ব্যক্তির গল্পটা বলছে কর্পোরেট সমাজ তার বিজ্ঞাপনের ভাষায়, মৌলবাদ অস্ত্রের ভাষায়, রাষ্ট্র দমনের ভাষায়। মিডিয়া এসব বয়ানকে বিশ্বস্ত করে তুলছে প্রতিদিনের সংবাদে। আমলাতান্ত্রিক বাস্তবতায় ব্যক্তির আত্মপরিচয় বন্দি হচ্ছে জন্ম-নিবন্ধন, পাসপোর্ট কিংবা জাতীয় পরিচয় পত্রে। ফলে মৃত্যুর সময় এসব কাগজ সঙ্গে না থাকায় ব্যক্তির পরিচয় অনির্ণিত বা বেওয়ারিশ বলে চিহ্নিত হচ্ছে রাষ্ট্রের কাছে।


নির্মাতা তার আগের দুটো কাজকে অতিক্রম করে গেছেন বলে বাংলাদেশের আরেক খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম বিশেষ প্রদর্শনীতে জানালেন। 


এই আরোপিত বাস্তবতার মধ্যে একজন আর্টিস্ট তার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সে জীবিত কারও সঙ্গে কমিউনিকেট করতে পারছে না। লাশের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব তৈরি হচ্ছে। এই মৃত বন্ধুকে নিয়ে সে যতখানি বিচলিত, আশেপাশের জীবিত মানুষদের নিয়ে সে ততটা বিচলিত নয়। কারণ সে জানে জীবিত মানুষদের মেরে ফেলা হবে, বেঁচে উঠবে কেবল মৃতরা।

বহুজাতিক ও বহুভাষিক সংস্কৃতির ভেতর বেড়ে ওঠার ফলে আমাদের ভেতরেও একধরনের সাংস্কৃতিক সংকট ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো উন যে কারণে বলছেন :

‘সমস্ত কোরীয় উপদ্বীপ হয়ে যাচ্ছে সিউল।…
তুমি, আমি, আমরাও সবাই,
হয়ে উঠছি এক নিউইয়র্ক
হয়ে উঠছি জঘন্য সেই কেবলা
কিংবা তারই কোনো নকল। আমি বলি :
হয়ে উঠছি নিকৃষ্টতম, নির্লজ্জতম, তথাকথিত ‘কেন্দ্র’।
[আমার এলাকা কোথায় গেল?/কো উন; অনুবাদ : ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ]

এই সংকটের মধ্যে আত্মসমর্পণ করেন নি নির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ। তিনি জানেন তার গল্পটা, তার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটা কোথায়। সিনেমার চরিত্রগুলো তাই বর্তমান সময়ের মধ্যে থেকেও সেই কেন্দ্রকে তুলে ধরতে পেরেছে।

নির্মাতা তার আগের দুটো কাজকে অতিক্রম করে গেছেন বলে বাংলাদেশের আরেক খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম বিশেষ প্রদর্শনীতে জানালেন। বিশেষ করে গল্প বলার শৈলী ও শিল্পের জায়গা থেকে তো বটেই। কেবল নিজের থেকে নয়, বাংলা সিনেমায় গল্পবলার যে চিরায়ত ঢঙ, সেটা থেকে তিনি সরে এসেছেন। চলচ্চিত্রে মোটা দাগে একক কোনো গল্প নেই। একটা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের টুকরো টুকরো চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন। পেইন্টিংয়ের কোলাজ আকারে। কিউবিক ফর্মের কথা আমরা জানি। গল্পটাকে সরলভাবে না বলে ছড়িয়ে দেওয়া। তত্ত্বের ভাষায় যাকে বলতে পারি Nonlinear বা disjointed narrative। দর্শক সেটা নিজের মতো করে মিলিয়ে নেবেন। না মেলালেও ক্ষতি নেই। ফলে এই সিনেমাকে আমরা বাংলাদেশের উত্তরাধুনিক সিনেমা হিশেবে চিহ্নিত করতে পারি। কারণ কেন্দ্রের যে ধারণা, সেটা এখানে ভেঙে গেছে। ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির উপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এখানে আমরা দেখছি চরিত্রগুলো অবচেতনভাবেই সেই আরোপিত আধুনিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় সংস্কৃতির খণ্ডিত ধারণাকে বাতিল করে একটা সমন্বিত রূপ দাঁড় করাতে চেয়েছে। এলিট-সাবঅলটার্ন এই বিভেদরেখা ধরে শেষ পযন্ত সাবঅলটার্নরাই মুখ্য চরিত্র হয়ে উঠেছে।

সিনেমার গল্পটা অতিবাস্তব, কিন্তু আবহটা সুররিয়ালিস্টিক। ফলে ক্রসফায়ারে মৃত লাশের সঙ্গে আর্টিস্ট অনায়াসে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। তথাকথিত ফ্ল্যাশব্যাকের মতো না হয়েও বর্তমান, অতীত, ভবিষ্যৎ মিশে যেতে পারে। চলচ্চিত্রে জমজমাট গল্প সকলে পছন্দ করেন। উত্তেজনা থাকবে, ক্লাইম্যাক্স থাকবে। কিন্তু এখানে স্থিরবয়ানে সেই অর্থে ফিল্মি বা অতি-নাটকীয় বিষয় নেই বলে দর্শকের বিরক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু ‘আলফা’ সিনেমা আমি থ্রিলার ছবির মতো সটান বসে থেকে দেখেছি।

সিনেমাটি যেহেতু সবে মুক্তি পাচ্ছে, আমি তাই কাহিনি বর্ণনার দিকে যাব না। শুধু এটুকু বলব, এটা বাংলাদেশের ছবি। চরিত্রের যে বাস্তবতা সেটা সমকালীন, যে সংস্কৃতি তারা ধারণ করে সেটা বাংলার চিরায়ত। ফলে দ্বন্দ্বটা যতটা না ঘটনার, তার চেয়ে বেশি বোধের। সামাজিক অ্যাকশন বিবেচনায় চিত্রটা আপাতভাবে হতাশার, ব্যথা ও বেদনার। কিন্তু এর মধ্যে মানবিকতার বিষয়টি এমনভাবে গেঁথে আছে যে দৃশ্যত নেগেটিভ চরিত্রটি যখন বলে ওঠে, ‘এই সন্তান আমার’, তখন চোখে জল চলে আসে। একদিকে কর্পোরেট বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, মৌলবাদের উত্থান, শ্রেণিসংগ্রাম, থার্ড জেন্ডার-সংগ্রাম, অন্যদিকে এসবের ভেতর থেকে জেগে উঠছে পরাভূত বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতি—একজন আর্টিস্ট। হিন্দু, মুসলিম, ডোম, প্রাকৃতজন, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী সকলের সাংস্কৃতিক ইউনিটি নিয়ে যে বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশের সিনেমা আলফা। এই কারণে এটাকে বাংলাদেশের ছবি বলা।


সিনেমার ভালো-মন্দ নিয়ে কথা বলার সুযোগ আমাদের তখনই সৃষ্টি হবে যখন অনেকে মিলে সিনেমাটি দেখবে।


সিনেমায় ডায়লগ কম। প্রধান চরিত্র আর্টিস্ট তার চলা, স্থির হয়ে থাকা, তাকানো এসবের মধ্য দিয়েই মনে হয়েছে, অব্যক্ত অনুভূতি আরও বেশি মর্মভেদী। শিল্পী যখন অকারণ মানুষের মৃত্যু সহ্য করতে পারে না, তখন সে পথে কাপড় বিছিয়ে লাল-সবুজ রঙ ছড়িয়ে তার উপর ক্ষোভে যন্ত্রণায় ফেটে পড়ে। আমি এই দৃশ্যে চোখের জল ধরে রাখতে পারি নি। পারফর্মিং আর্টের এমন উপযুক্ত ব্যবহার বাংলাদেশের সিনেমায় এই প্রথম দেখা আমার। অনেক প্রতীকের ব্যবহার আছে, যে কারণে সেলুলয়েডে কবিতা পাঠ বলে মনে হলো। এমন নিরেট বাস্তব ও বিষণ্নতার গল্পকে কবিতার মতো ধোঁয়া ধোঁয়া, মায়াময় করে তোলা খুব সহজ কাজ না।

যারা অভিনয় করেছেন, এ টি এম শামসুজ্জামান ছাড়া বাকিরা পর্দায় নতুন। কিন্তু নতুনরা—বিশেষ করে আলমগীর কবীর, দোয়েল ম্যাশ ও মুস্তাফিজ নুর ইমরান—এত ভালো অভিনয় করেছেন যে সিনেমা শেষ হলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে মোরশেদুল ইসলাম বলেই ফেললেন, এ টি এম শামসুজ্জামান ছাড়া বাকিরা অসাধারণ অভিনয় করেছেন!

আর গান নির্বাচনও হয়েছে অপূর্ব। পুরো সিনেমার স্বরের সঙ্গে মিলিয়ে সংগীত করা হয়েছে।

ছবির সমাপ্তি নিয়ে আমার কিছু বলার আছে। আরও কিছু খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। সেটা অন্য আলোচনায় বলব, কিন্তু তার আগে আপনাদের সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখা উচিত। হলে বসে অসাধারণ একটি মুহূর্ত কাটিয়ে আসুন। সিনেমার ভালো-মন্দ নিয়ে কথা বলার সুযোগ আমাদের তখনই সৃষ্টি হবে যখন অনেকে মিলে সিনেমাটি দেখবে।

মোজাফ্‌ফর হোসেন

জন্ম ২১ নভেম্বর, ১৯৮৬। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি।

প্রকাশিত বই :
গল্প—
খুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক (গল্পগ্রন্থ, অন্যপ্রকাশ)
দ্বিধা [অন্বেষা, ২০১১]
আদিম বুদবুদ অথবা কাঁচামাটির বিগ্রহ [রাত্রি, ২০১২]
অতীত একটা ভিনদেশ [বেহুলা বাংলা, ২০১৬]
পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা [অগ্রদূত, ২০১৯]

প্রবন্ধ—
বিশ্বগল্পের বহুমাত্রিক পাঠ [অনুপ্রাণন, ২০১৩]
আলোচনা-সমালোচনা [অনুপ্রাণন, ২০১৪]
বাংলা সাহিত্যের নানাদিক [গ্রন্থকুটির প্রকাশনী]
বিশ্বসাহিত্যের কথা [বেঙ্গল পাবলিকেশন]

সাক্ষাৎকার—
প্রশ্নের বিপরীতে [অনিন্দ্য প্রকাশ]

সম্পাদনা—
বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত প্রবন্ধ [দেশ, ২০১৭]
নির্বাচিত হেমিংওয়ে [আলোঘর প্রকাশিত]
কল্পে-গল্পে ইলিশ [গল্পসংকলন, সহ-সম্পাদনা, মূর্ধন্য প্রকাশনী]

প্রকাশিতব্য—
দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য [গবেষণা, পাঞ্জেরী প্রকাশনী]
পাঠে-বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প [ছোটগল্পের তাত্ত্বিক গ্রন্থ, পাঞ্জেরী প্রকাশনী]

ই-মেইল : mjafor@gmail.com