হোম চলচ্চিত্র আলফা : দীর্ঘকবিতা হয়ে ওঠা ছবি

আলফা : দীর্ঘকবিতা হয়ে ওঠা ছবি

আলফা : দীর্ঘকবিতা হয়ে ওঠা ছবি
850
0

কয়েকদিন জ্বরে ভোগার পর বের হলাম বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে ‘আলফা’ সিনেমার প্রিমিয়ার শো দেখতে। ‘আলফা’ ছবির নির্মাতা অর্থাৎ নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর তৈরি আগের দুটো ছবি ‘গেরিলা’ ও ‘একাত্তরের যীশু’ দেখেছিলাম। সিনেমাগুলো ভালো লেগেছিল। তাই ভাবছিলাম, এই ছবিটিও নিশ্চয়ই ভালোই লাগবে। তাই ছুটলাম ছবি দেখার উদ্দেশ্যে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এটি দর্শকের এক্সপেক্টেশন ছাড়িয়ে গেছে, অন্তত আমার ক্ষেত্রে তো তাই হয়েছে। সিনেমাটি দেখতে দেখতে মনে হলো কিছুটা যেন সব প্রিয় চলচ্চিত্রকারের ছোঁয়া পেলাম। লং টেক, সুররিয়ালিজম, ফ্ল্যাশব্যাক, পারফর্মিং আর্ট—একইসঙ্গে মোজার্টের সিম্ফনি সব মিলে হয়ে উঠেছে এক দীর্ঘকবিতা। যেন কোথাও কয়েক চিমটি তারকোভস্কি মিশে আছে। হয়তো কুরোসাওয়া বা বার্গম্যানও আছে। আরও মনে হলো, ছেলেবেলায় আলফ্রেড হিচককের ছবিতে দেখা সেই যে উল্টো স্রোতের গতি তাও যেন কোথাও আছে! সে যাই হোক, মুগ্ধতা নিয়ে দেখলাম ছবিটি।


এই যে গাধার পিঠে করে শিল্প নিয়ে হেঁটে চলেছে শিল্পী, এ যেন আমাদের দেশের মৌলবাদ উত্থানের যে অশনি সংকেতকাল এবং এই সময়ের শিল্প-সাহিত্য-চর্চার যে প্রতিকূল পরিবেশ, অনেকটা তারই প্রতিচ্ছবি।


বিশেষ কোনো গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হয় নি ছবিটি। নানা অর্থবহ টুকরো টুকরো গল্পের কোলাজ যেন ‘আলফা’। তবে এতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এই সমাজেরই চিত্র ও সমকালীন বাস্তবতা। আমাদের দেশ যে এক মিশ্রসংস্কৃতির জাতিগত বৈশিষ্ট্য যুগ যুগ ধরে বহন করে চলেছে, ‘আলফা’ তারই একটি উদাহরণ মনে হলো। একদিকে মৌলবাদের উত্থানে শিল্পের নাজেহাল অবস্থা, অন্যদিকে কর্পোরেট বাণিজ্যের শোষণ, ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়ার যে চাপ—এসবই এসেছে সিনেমার কাহিনি হিশেবে।

ছবির প্রধান চরিত্রটির নাম আলফা। পরিচিত সবাই তাকে ভালোবেসে ‘আর্টিস্ট’ বলে ডাকে। ছবির শুরুতেই মহররমের মাতম আর নানা বয়সী পুরুষের নিজের পিঠ চাবকে  চাবকে রক্তাক্ত করার দৃশ্য দেখে চমকে উঠেছিলাম। মনে হচ্ছিল ধর্মের উগ্রতা বা এধরনের কিছু নিয়ে কাহিনি নয় তো? পর মুহূর্তেই বুঝলাম, না তা নয়। বরং শিশু আলফা যে মহররমের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে এবং আশ্রয় পেয়েছে এক নিঃসন্তান, নিঃসঙ্গ মানুষের কাছে, সেই ঘটনাটি দেখানোর জন্যই এই মাতমের দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে। আশ্রয়দাতা মানুষটি একজন শিল্পী। কী করে সে খুঁজে পাবে শিশুর অভিভাবককে? নিঃসঙ্গ মানুষটিকে একজন উপদেশ দেয় শিশুটিকে লালনপালন করার। তারপর থেকেই শিল্পীপিতার স্নেহছায়ার আলফাও ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে জাতশিল্পী, আর্টিস্ট। শিশুবয়সে আর্টিস্টের পিতাকে কতিপয় দুর্বৃত্ত খুন করে লাশ ফেলে দিয়ে যায়। একই ঘটনাই যেন পুনরাবৃত্ত হয় যুবক বয়সেও। ঝিলের ওপর বাঁশ দিয়ে তৈরি করা একটি ঘরে আত্মভোলা আর্টিস্ট বসবাস করে। ঝিলের পাশের একটি বস্তি থেকে এক নিঃসন্তান নারী এসে তাকে খাবার দিয়ে যায়। এভাবেই তাদের ভেতর তৈরি হয় প্রেম আর সেই প্রেমের ফসল গর্ভধারণ। অথচ নারীটির বদরাগী-বন্ধ্যা স্বামী খবরটা জানতে পেরে আপ্লুত হয়। তাকে বুকে টেনে আশ্বাস দেয় যে, সেই হয়ে উঠবে সন্তানটির পিতা। সন্তানের সব দায়িত্ব তার। এমন অসাধারণ সব মানবিক চরিত্রের সমাহার ঘটেছে ছবিটিতে। আর্টিস্ট অর্থাৎ আলফা, সে নিজের মতো করে ছবি এঁকে বস্তি থেকে একটি গাধার পিঠে সেগুলো চড়িয়ে নিয়ে ঢাকা শহরের রাস্তার ওপর দিয়ে হেঁটে যায়। রিকশার পেছনের পাটাতনে আঁকা ছবিগুলো বিক্রি করে রিকশার গ্যারেজে নিয়ে। এই যে গাধার পিঠে করে শিল্প নিয়ে হেঁটে চলেছে শিল্পী, এ যেন আমাদের দেশের মৌলবাদ উত্থানের যে অশনি-সংকেতকাল এবং এই সময়ের শিল্প-সাহিত্য-চর্চার যে প্রতিকূল পরিবেশ, অনেকটা তারই প্রতিচ্ছবি। যদি ছবিটির আর কোনো ব্যাপারের কথা নাও বলি, তবু এই একটি মাত্র দৃশ্যই মনে হয় স্মরণীয় হয়ে থাকবে দর্শকের কাছে।

আবার গল্পে ফিরে যাই, আত্মভোলা আর্টিস্ট উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে। মৃদুভাষী মানুষ। অথচ তীব্র অনুভূতিসম্পন্ন। মোজার্টের সিম্ফনি শুনে পরির মতো ভেসে যায়, জলকেলি করে। যেন সে শিব। অর্ধেক তার নারী। আবার যখন শুনতে পায় বস্তির নারীরা যে গার্মেন্টসে চাকরি করে, সেখানে আগুন লেগেছে, তখন তীব্র যাতনা ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে। নিজেরই ক্যানভাসে রঙের ওপর রঙ ছিটিয়ে দিয়ে তার ওপর চিৎকার করে গড়াগড়ি দিয়ে প্রতিবাদ জানায় নিপীড়ক হয়ে ওঠা রাষ্ট্রের প্রতি। ছবির এ পর্যায়ে এসে পারফর্মিং আর্টের প্রয়োগ ছিল এক অসাধারণ দৃশ্য এবং তীব্র অনুভূতির প্রকাশ। যা প্রতিটি দর্শকের মন ছুঁয়ে গেছে।

এদিকে হঠাৎ একদিন গুলির শব্দ শুনে ঘর থেক বেরিয়ে এসে দেখে হাত বাঁধা অবস্থায় উপুড় হয়ে ভেসে থাকা লাশ তারই ঘরের নিচের বাঁশের খুঁটির সঙ্গে লেগে আছে। লাশটিকে সরিয়ে দিলেও বারবার সে ফিরে ফিরে একই স্থানে চলে আসে। ছবির এ পর্যায়ে এসে কিছুটা পরাবাস্তবতা দেখা দেয়। আলফা লাশটির সঙ্গে কথাবার্তা বলে জানতে পারে, লোকটির নাম সোলায়মান। তার স্ত্রী, সন্তান ও অন্ধ মা আছে। সে তাদের কাছে গিয়ে সোলায়মানের মৃত্যু খরব দিতে চায়। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় সেটা আর হয়ে ওঠে না। ফলে একসময় পুলিশ লাশ উদ্ধার করে বেওয়ারিশ ঘোষণা করে। কিন্তু রাষ্ট্র কাউকে বেওয়ারিশ বললেই তো সে আর বেওয়ারিশ হয়ে যায় না। প্রতিটি মানুষেরই তো কোনো না কোনো শেকড় আছে। রাষ্ট্র চাইলেই সেটা খুঁজে বের করতে পারে।


পিছিয়ে পড়া সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের যে সংগ্রাম একইসঙ্গে তীব্রভাবে মাতৃত্বের যে আকাঙ্ক্ষা তার অনবদ্য প্রকাশ হয়েছে ছবিটিতে।


এই হচ্ছে মূলত আলফার মূল গল্প। তবে এখানে চিরায়ত বাংলার সংস্কৃতির যে মেলবন্ধন, সেটিকে বিস্তৃতভাবে দেখানোর কিছুটা প্রয়াস আছে বলে মনে হলো। কয়েকজন আদিবাসী মিলে এক অসুস্থ বাঙালি যুবককে শুশ্রূষা করে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে মানুষের বিপদে মানুষের এগিয়ে আসার সাধারণ প্রবণতাকে। আবার এই পিছিয়ে পড়া সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের যে সংগ্রাম, একইসঙ্গে তীব্রভাবে মাতৃত্বের যে আকাঙ্ক্ষা তার অনবদ্য প্রকাশ হয়েছে ছবিটিতে। একইসঙ্গে কয়েকজন ডোম মিলে সোলায়মানের বেওয়ারিশ লাশকে আর্টিস্টের কাছে হস্তান্তরের যে মানবিক প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ সেটাও দেখানো হয়েছে। তবে ১৫ শতকের মিস্টিক কবি কবীরের গান শুনে যারপরনাই মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়েছি। ‘আলফা’ ছবিটিকে প্রকৃতপক্ষেই একটি মানবিক ছবি বলা যেতে পারে।

ছোটখাটো দুই-একটা ব্যাপারে কিছুটা অসঙ্গতি যে চোখে পড়ে নি, সেটা বলব না। তবে, এটুকু বাদ দিলে আর সবই ভালো ছিল বলতে হবে। আমাকে রেটিংয়ের ভার দিলে আমি তো ফাইভ স্টারই দিয়ে দেবো কোনো সন্দেহ নেই। এরপর বিচারের ভার রইল দর্শকের ওপর। সিনেমাটা হলে গিয়ে দেখুন আর নিজেই ঠিক করুন কী রেটিং করবেন?

ফারহানা রহমান

জন্ম ১৩ আগস্ট, ১৯৭২; হলিফ্যামেলি হাসপাতাল। বাসা : ৪৮০, রোড : ৩২, নিউ ডিওএইচএস, মহাখালী, ঢাকা।

শিক্ষা : ইংরেজি সাহিত্যে এমএ, ইডেন কলেজ, ঢাকা।

পেশা : এডভাইজার, স্টেপ আপ রিসোর্সেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট।

প্রকাশিত বই—

অপরাহ্ণের চিঠি [এক রঙা এক ঘুড়ি, ২০১৬]
অপেরার দিনলিপি [চৈতন্য, ২০১৭]
লুকিয়ে রেখেছি গোপন হাহাকার [অনুপ্রাণন, ২০১৯]

ই-মেইল : papea.rahman@gmail.com

Latest posts by ফারহানা রহমান (see all)