হোম চলচ্চিত্র ‘আগন্তুক’ : সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব

‘আগন্তুক’ : সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব

‘আগন্তুক’ : সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব
230
0

জীবনের অন্তিম প্রান্তে উপনীত হয়ে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধ; সত্যজিৎ রায়ের শেষ তিনটি চলচ্চিত্র ‘গণশত্রু’, ‘শাখা প্রশাখা’ এবং ‘আগন্তুকে’ও আমরা এক সংকটের চেহারা অবলোকন করি। প্রত্যক্ষ করি সমাজ, সভ্যতা, মূল্যবোধ নিয়ে তার পরিণত ভাবনা। সত্যজিৎ রায়ের শিল্পসৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দিলে প্রত্যক্ষ করা যায়—প্রাথমিক কাল থেকেই তিনি প্রাণিত ছিলেন মানুষের প্রতি বিশ্বাসে, আস্থায়। তার এই আস্থায় প্রবল একটি নাড়া প্রত্যক্ষ করা যায় সাতের দশকের কলকাতা ট্রিলজি : ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন-অরণ্য’তে এসে। ‘আগন্তুক’ সত্যজিৎ রায়ের শেষ সিনেমা, এখানেও সমাজ, সভ্যতা, আচার সম্পর্কে চরমভাবে বিশ্লেষণপ্রবণ তিনি; তবুও সকল কিছুর মধ্যে ফুটে উঠেছে এক মানবিক বিশ্বাসের প্রবর্তনা, মানুষের বড় ছবি।


আগন্তুক বিশ্বাস করেন ধর্ম মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, প্রতিষ্ঠিত ধর্ম এই কাজটি আরো ভয়ংকরভাবে সম্পন্ন করে থাকে।


‘আমাদের সংস্কৃতি, ওদের সংস্কৃতি : প্রসঙ্গ সত্যজিৎ রায়’ শিরোনামে এক দীর্ঘ গদ্যে অমর্ত্য সেন সত্যজিৎ রায়ের সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিষয়গুলির অভ্যন্তরে পারস্পরিক যোগাযোগ খোঁজার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। সেখানে তিনি সত্যজিতের সংস্কৃতি ভাবনা নিয়ে তিনটি প্রবণতার কথা উল্লেখ করেছেন : ক. স্থানীয় বা লোকাল সংস্কৃতিগুলোর স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গুরুত্ব। খ. প্রত্যেকটি স্থানীয় সংস্কৃতির গভীর, বহুবিভক্ত চরিত্র। গ. নানা সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের গভীর প্রয়োজনীয়তা এবং যে প্রাচীরগুলো সেই কর্মকে সুকঠিন করে তোলে, তাদের চেনা। প্রবণতাগুলোর মধ্যে এক প্রকার বৈশ্বিকচেতনার আবহ রয়েছে; যা ‘আগন্তুকে’ও খানিক মাত্রায় প্রত্যক্ষ করা যায়।

‘আগন্তুক’ চলচ্চিত্রটি সত্যজিৎ নির্মাণ করেছিলেন তার ‘অতিথি’ ছোটগল্পের ছায়া অবলম্বনে। কাহিনির আরম্ভেই দেখা যায়—দুর্গা পুজোর প্রাক্কালে, এক রোদমাখা সকালে কলকাতাবাসী উচ্চ-মধ্যবিত্ত চাকুরে সুধীন্দ্র বোসের স্ত্রী অনিলা নিজের নামে সাধুগদ্যে রচিত একটি চিঠি পেয়েছেন। চিঠিটি পঠিয়েছেন তার মামা মনোমোহন মিত্র; যিনি যুবক বয়সে গৃহত্যাগ করে পঁয়ত্রিশ বছর ধরে নিরুদ্দেশ রয়েছেন। ভাগ্নির নিকটে মামা লিখেছেন—তিনি তার জন্মশহর কলকাতায় এসে সাত দিন অনিলাদের সংসারে অতিথি হয়ে অবস্থান করবেন। মামার কথা আত্মীয়দের কাছে শুনে থাকলেও অনিলা তার মামাকে স্মরণ করতে পারে না; ইতোমধ্যে নিকট আত্মীয়রাও সকলে প্রয়াত হয়েছেন। এর ফলশ্রুতিতে, মনোমোহন মিত্রের আগমন নিয়ে অনিলা ও সুধীন্দ্র দম্পতির মনে সন্দেহের উদ্রেগ ঘটে; এসব ঘটনা শিশুমন নিয়ে উপভোগ করে তাদের একমাত্র সন্তান সাত্যকি; যার ডাকনাম বাবলু। নির্দিষ্ট দিনে মনোমোহন মিত্র এসে উপস্থিত হন; অনিলা তাকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেও সুধীন্দ্র বোসের অবিশ্বাস ও সন্দেহের অবসান ঘটে না। তার ধারণা, অনিলার মামার ছদ্মবেশে এক নকল ব্যক্তি কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে তাদের আথিত্য নিয়েছে। তিনি তার ‘ঠোঁটকাটা’ ব্যরিস্টার বন্ধু পৃথ্বীশকে ডেকে ঘরোয়া আলাপের মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন মনোমোহন মিত্রের প্রকৃত পরিচয়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আগন্তুক মনোমোহনের পঁয়ত্রিশ বছরের প্রবাসী জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, প্রাজ্ঞতা, জীবনদৃষ্টি মুগ্ধ করে সুধীন্দ্র দম্পতিকে। পৃথ্বীশের আচরণে, চোরা বচনে আহত মনোমোহন কাউকে কিছু না জানিয়ে শান্তিনিকেতনে চলে যান। অবশেষে, তাদের সকল সমস্যার সমাধান ঘটে প্রবীণ পারিবারিক বন্ধু শীতলাচরণের মাধ্যমে; মনোমোহন তাদের বাড়িতে ফিরে আসেন। চলচ্চিত্রের সমাপ্তিতে দেখা যায়—আগন্তুক মনোমোহন মিত্র তার সকল সম্পত্তি অনিলাকে দান করে আবার চলে যান তার ভ্রমণপ্রিয় জীবনে; একপ্রকার নিরুদ্দেশে।

সত্যজিৎ রায়ের সর্বশেষ সৃষ্টি এই ‘আগন্তুকে’র পুরোটাই প্রায় আভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে ধারণ করা; ফলে চলচ্চিত্রটির সংলাপ, আড্ডা, বসার ঘরের বৈঠকগুলো সবিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত। পরিচালক এখানে ভারতবর্ষসহ সমগ্র পৃথিবীর অস্থিরতা, হতাশা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মানবিক বিপর্যয়কে একটি সাধারণ ঘটনার মাধ্যমে আমাদের নিকটে উপস্থাপন করেন দক্ষ শিল্পীর মহিমায়। চলচ্চিত্রে, আগন্তুক চরিত্রের মাধ্যমে তার নিজস্ব দর্শন, বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা প্রকাশিত হয়েছে। এই বিষয়গুলোর সার্বিক উপস্থাপন পরিলক্ষিত হয় পৃথ্বীশ সেনগুপ্তের সঙ্গে আগন্তুকের বাক্যালাপের মাধ্যমে। মৌলত এই দৃশ্যটিকেই চলচ্চিত্রটির নিউক্লিয়াস হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। কারণ, দৃশ্যটিতে বর্তমান বিশ্বে, ধর্ম, সমাজ, সভ্যতা সম্পর্কে আগন্তুকের মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় এমন কিছু মৌলিক চিন্তার অবতারণা করেছেন যা আমাদের ভাবনা কাঠামোকে নাড়িয়ে দেয়, গুরুত্ব দিয়ে মাথা খাটাতে বাধ্য করে।

চলচ্চিত্রটির আগন্তুক চরিত্রে মেধা এবং অভিজ্ঞতার পূর্ণ বিকাশ পরিলক্ষিত হয়। বুদ্ধিদীপ্ত, যুক্তিশীল কথাবার্তার মাধ্যমে তার চরিত্রের এই দিকটিই বিশেষভাবে উন্মোচিত হয়েছে। তথাকথিত ধর্মের প্রতি তার কোনো আগ্রহ, শ্রদ্ধাবোধ নেই; কারণ, আগন্তুক বিশ্বাস করেন ধর্ম মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, প্রতিষ্ঠিত ধর্ম এই কাজটি আরো ভয়ংকরভাবে সম্পন্ন করে থাকে। একারণে, ধর্মে তার কোনো আস্থা নেই, একই কারণে ভারতবর্ষে প্রচলিত জাতভেদও তিনি মানেন না। বন্যসভ্যতা নিয়ে পৃথ্বীশের আক্রমণাত্মক প্রশ্নের উত্তরে আগন্তুকের বক্তব্যে ফুটে ওঠে আধুনিক প্রযুক্তির আবিষ্কার বিভিন্ন মারণাস্ত্র কিভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষকে হত্যার কাজে, সভ্যতা বিনাশের কাজে। এই অস্ত্র প্রয়োগের সিদ্ধান্ত যে ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রপ্রধানরা গ্রহণ করছেন, আগন্তুক কোনোভাবেই তাদের সভ্য মানুষ বলে গণ্য করতে রাজি নন।তার বিবেচনায়, এদের চেয়ে নরমাংসভোজী জংলিরা অনেক বেশি মানবিক।


ভারতীয় পুরাণের প্রতি দুর্বলতা প্রমাণ করে তিন দশক প্রবাসে অতিবাহিত করলেও তিনি মোটেও তার শেকড় বিস্মৃত হন নি।


গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নাসা’র মাধ্যমে মহাকাশ নিয়ে বিভিন্ন কল্পনাতীত গবেষণা আধুনিক প্রযুক্তি সম্ভবপর করছে। কিন্তু, এখানে যুক্তিশীল আগন্তুকের অভিজ্ঞ মন্তব্য : ‘নাসা, আর তার পাশেই নেশা। হাইপোডেরমিক্স সিরিঞ্জ দিয়ে নিজের দেহে মাদকরস চালান দিয়ে সমনকে সমন জারি করছে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ। …এগুলোকে রোধ করবে কোন টেকনোলজি?’ অবিশ্যি, আগন্তুকের এসকল মন্তব্য নিয়ে সার্বিকভাবে এটিও ভাববার অবকাশ নেই যে—তিনি সভ্যতার থেকে জংলি, বন্যদেরকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। প্রকৃতার্থে তথাকথিত সভ্যদের মধ্যে জংলিদের থেকেও বীভৎসতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি; এর ফলেই তার এমন মন্তব্য। নিজের বক্তব্য ও যুক্তির মাধ্যমে তিনি উন্মোচন করেছেন আধুনিক সভ্যতার ভড়ং, অমানবিক; আরও পরিষ্কার করে ব্যক্ত করলে অসভ্য মূর্তিটি।

ভ্রমণের নেশা মনোমোহন মিত্রকে সার্বিকভাবে শেকড়চ্যুত করেছিল, এমন ভাবনার কোনো অবকাশ নেই। ভাগনি অনিলার বাড়িতে অবস্থানকালে তার যে ব্যক্তিগত পছন্দ এবং রুচির সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়েছি; তার পশ্চাতে রয়েছে দেশজ সংস্কৃতির প্রতি গভীর মমত্ব। খাবার টেবিলে বসে প্রথমে মাংসের পরিবর্তে মাছের প্রতি দুর্বলতা, মেদিনীপুরের প্রান্তিক নারীদের হাতে তৈরি ডালের বড়ির প্রশংসা করা, ভারতীয় পুরাণের প্রতি দুর্বলতা প্রমাণ করে তিন দশক প্রবাসে অতিবাহিত করলেও তিনি মোটেও তার শেকড় বিস্মৃত হন নি। বাংলা ভাষাকেও ভালোবাসেন তিনি; বাংলাটা বরং কলকাতায় বাস করা বাঙালিদের থেকেও ভালো বলতে পারতেন। অনিলার প্রশ্নের উত্তরে মায়ের ভাষা সম্পর্কে আগন্তুকের অভিজ্ঞ, আবেগমথিত উচ্চারণ : ‘ব্যাপারটা কি জানো মা, মায়ের ভাষা ভুলতে না চাইলে কেউ ভোলে না। আর, যারা ভুলতে চায়, তারা তিন মাসের মধ্যে ভোলে।’ আবার, এই আপাত ভারতীয় মূর্তির অভ্যন্তরে সুপ্ত তার বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে নানা ঘটনা, মন্তব্য এটাও আমাদের সার্বিকভাবে ভাবাতে বাধ্য করে যে—আগন্তুক একজন বিশ্বনাগরিক। যিনি মানুষের পরিচয়, সামাজিকতা, সংস্কৃতি, সভ্যতা নিয়ে আমাদের ভাবনার অপর এক প্রান্ত উন্মোচিত করে দিয়ে যান; মানবিকতা, মানুষ যেখানে বড় জায়গা নিয়ে থাকে।

নাজমুল হাসান পলক

জন্ম ২৮ মার্চ, ১৯৯৩; গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা।

শিক্ষা : স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল : palakhasan40424@gmail.com