হোম গদ্য হেলাল হাফিজের কবিতা : ইতিহাসের ভেতর বিন্যস্ত সমকাল

হেলাল হাফিজের কবিতা : ইতিহাসের ভেতর বিন্যস্ত সমকাল

হেলাল হাফিজের কবিতা : ইতিহাসের ভেতর বিন্যস্ত সমকাল
660
0

বাংলাদেশি কবিতার পাঠকদের মধ্যে হেলাল হাফিজের কবিতার সাথে পরিচয় নাই বা মোলাকাত হয় নাই সেরকম পাঠক খুঁজে পাওয়া দুরূহ হবে। হয়তো হিসেব করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশি কবিতায় যে জলে আগুন জ্বলে বইটাই হতে পারে কবিতার বইয়ের মধ্যে সর্বাধিক পঠিত। বইটার প্রায় দশবারটা মুদ্রণ হয়েছে। যদিও বইটার প্রিন্টার্স লাইন থেকে প্রতিসংস্করণে কত সংখ্যক মুদ্রণ হয়েছে তা জানা যায় না। এইটা অবশ্য আমাদের প্রকাশকদের দোষ। প্রতি সংস্করণে কত সংখ্যক মুদ্রণ হয় তা জানানো অবশ্য বই মুদ্রণশিল্পের আন্তর্জাতিক নীতি। ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বা আশির দশকে বইটার প্রথম মুদ্রণ হয়েছিল।

এর পরের দশকের কবিতাপ্রেমিরা বইটাকে তাদের আকৈশোর সঙ্গী করে নেয়। আমার নিজেরও সেই দিনকাল কেটেছে। আজ যৌবনে এসে আসলে ভাবতে চেয়েছি কী আছে এই বইটার ভেতর? যা আমাদের আকৈশোর ধরে রেখেছিল। আমরা তাকে বয়ে বেড়াচ্ছি গোটা জীবন। কারণ বইটাকে আমরা পেয়েছিলাম আমাদের বিকাশের সময়। এমন একটা সময়ে বইটা আমাদের সঙ্গ দিয়েছে যখন কিনা জগতের সাথে আমাদের নতুন নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠছিল।


যে জলে আগুন জ্বলে বইটার কবিতাগুলা লেখা হয় ৬৯ থেকে ৮৬ সাল পর্যন্ত সময়ে। নিঃসন্দেহে এই সময়টাকে বাংলাদেশের বারুদসময় বললেও অত্যুক্তি হয় না। 


হেলাল হাফিজ খুব বেশি কবিতা লিখেন নাই। কবিতা একাত্তর নামে তার আরও একটা কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হলেও তাতেও দেখা যায় অধিকাংশ আগের বইয়ের কবিতা ঢুকে গেছে। নতুন কবিতা যা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে আগের হেলাল হাফিজের কবিতার মতো যোগ্য কবিতা সে অর্থে পাওয়া যায় নাই।

যে জলে আগুন জ্বলে বইটার কবিতাগুলা লেখা হয় ৬৯ থেকে ৮৬ সাল পর্যন্ত সময়ে। নিঃসন্দেহে এই সময়টাকে বাংলাদেশের বারুদসময় বললেও অত্যুক্তি হয় না। কবিতাগুলার বিন্যাসের সাথে সাথে বাংলাদেশের বারুদসময়ের ইতিহাসের নানা অনুসঙ্গ তৈরি হচ্ছে কবিতাগুলাতেও। সত্যিকার অর্থে একজন কবির যেই অন্ত্যজ রসায়ন তা সমকাল আর ইতিহাস থেকে মালমসলা নিয়া ভবিষ্যতের দিকেই ধাবিত হয়। এই বইটার প্রথম কবিতা ৬৯’র উত্তাল সময়ে রচিত ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র দুইটা লাইন আমরা প্রায় নিজেদের অজান্তেই বহন করে চলেছি এখনো যে কোনো আন্দোলনে, সংগ্রামে।

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’

এই পুরা কবিতাটা হয়তো তেমন কিছু নয়। এই কবিতাটার এই দুইটা লাইন যা সহজ ভাষায় লিখিত যা গ্রহণ করেছে গণমানুষ। কবিতার নিয়তিও হয়তো তাই। দুই বা ততোধিক লাইনকে অমরত্ব দেয়ার জন্য বাকি লাইনগুলার উপস্থিতি। ভাষার কথা যখন এলই তখন হেলাল হাফিজের কবিতার ভাষা নিয়া খানিকটা আলোচনা করে নিলে তাকে বা তার কবিতা বুঝতে আমাদের পথ আরো সুগম হবে।

কবিতার ইতিহাস নিয়া যারা নাড়াচাড়া করেছেন, তারা মানবেন কবিতা মানুষের সবচাইতে আন্তরিক বহিঃপ্রকাশ। যখন ভাষার লেখ্যরূপ তৈরি হয় নাই তখনও কবিতার উপস্থিতি ছিল মুখ্যরূপে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমার নাকি তার ইলিয়ড আর ওডিসি মুখে মুখেই আওড়াতেন। তার সাথে আওড়াতো পুরা গ্রিক সভ্যতা। আমাদের দেশেই আমরা দেখেছি পুঁথি আকারে আজকের কবিতার পূর্বরূপ মুখে মুখেই আওড়াতে পারতেন পুঁথিকবিরা আর কবির লড়াই বলে একটা সংস্কৃতি তো এখনো বিদ্যমান, যাতে তাৎক্ষণিকভাবে দর্শক ও শ্রোতাদের সামনে দুইজন লড়াকু কবিতা তৈরি করে চলেছেন। হয়তো কখনোই এসবের রেকর্ড থাকে না। একেক মঞ্চে একেক বিষয় নিয়া তারা উপস্থিত হয়। তো সেই হোমার বা পুঁথি কবিদের কাব্য, চর্যাপদ বা বৈঞ্চব কবিতা সবকিছুতেই আমরা ইতিহাসকে প্রতিস্থাপিত হতে দেখি সমকালের খাপে।

কবিতা মানবজাতির ঐতিহাসিক গতিশীলতার সাক্ষর। সত্য তো এই যে, ভাষার অসাধ্য কবিতা টিকে থাকে না। যদিও এটা মানতেই হয় যে, মানুষের ভাষাও ক্রম গতিশীল। সাপ যেমন তার খোলস ছেড়ে নয়া খোলস তৈরি করে তেমনি ভাষাও মানুষের ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক বিকাশের সাথে সাথে উৎপাদনকামিতার সাথে সাথে তার চেহারা বদলে নেয়। তো সংস্কৃতি যখন মানুষের উৎপাদন সম্পর্কের উপরিকাঠামো তা দুর্বোধ্য হতে পারে না। অনেককেই আমি দেখেছি হেলাল হাফিজের কবিতার ভাষা সম্পর্কে অতিসরলীকরণের অভিযোগ করতে। আমি বলব, কবিতায় আটপৌরে শব্দ বা ভাষার ব্যবহার কবির সমাজ ও তার স্বজাত্য সংস্কৃতির প্রতি কবির দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। এবং হেলাল হাফিজের কবিতা এতদিন ধরে বাংলাদেশের কাব্যপ্রেমিদের যে আনন্দ, সাহস, বেদনা আর বিশ্বাস যোগাচ্ছে তার কারণ তার কবিতা ভাষার সারল্য।

১৯৭১ সালে লিখিত ‘দুঃসময়ে আমার যৌবন’ নামের একটা কবিতায় তিনি লিখছেন।

‘মানব জন্মের নামে কলঙ্ক হবে/ এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই/ উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো/ আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ/ শুধু যদি নারীকে সাজাই।’

এই কবিতাটার ভেতর না বুঝার মতো একটাও শব্দ নাই। কিন্তু ভাবনার মন্তাজ তার সমহিমায় উপস্থিত। কবিতাটার ভেতর একটা পরস্পর বিরোধিতার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে যা কবিতাটাকে প্রশ্নময় করে তুলেছে। কবি নারী বা সংসারকে গড়পড়তা বাঙালির মূল লক্ষ্য হিসাবে ধরেও ৭১’র যুদ্ধে যাবার যে অবশ্যাম্ভাবিতা তাকে সামনে নিয়া আসছেন।

৭২ সালে রচিত ‘অস্ত্র সমর্পণ’ নামের অসাধারণ কবিতাটার ভেতর দিয়ে তিনি অসাধারণ এক চিত্রময়তার সূচনা করেন। এই কবিতাটার ভেতর দিয়ে শুধু নারী নয়, সংসার নয়, আবহমান বাঙালি জাতির সাথে যে নয় মাসব্যাপী মারণাস্ত্রের সখিতা, তাকে তিনি প্রেম হিসাবে উপস্থিত করছেন। যা বাঙালির জাতীয় অভিজ্ঞতার স্মারক। এই অভিজ্ঞতা আসলে আন্তর্জাতিকও। শোষণ বা আগ্রাসন থেকে মুক্তি পেতে মারণাস্ত্র অনেকটা প্রেমিকার ভূমিকা নিয়েছে সমস্ত বিদ্রোহে, বিপ্লবে।

‘মারণাস্ত্র মনে রেখো ভালোবাসা তোমার আমার।/ নয় মাস বন্ধু বলে জেনেছি তোমাকে, কেবল তোমাকে।/ বিরোধী নিধন শেষে কতোদিন অকারণে/ তাঁবুর ভেতরে ঢুকে দেখেছি তোমাকে, বারবার কতোবার।

মনে আছে, আমার জ্বালার বুক/ তোমার কঠিন বুকে লাগাতেই গর্জে উঠে তুমি/ বিস্ফোরণে প্রকম্পিত করতে আকাশ, আমাদের ভালবাসা/ লুফে নিতো অত্যাচারী শত্রুর নিঃশ্বাস।

মনে পড়ে, তোমার কঠিন নলে তন্দ্রাতুর কপালের/ মধ্যভাগ রেখে, বুকে রেখে হাত/ কেটে গেছে আমাদের জঙ্গলের কতো কালো রাত!/ মনে আছে, মনে রেখো/ আমাদের সেই সব প্রেম-ইতিহাস।

অথচ তোমাকে আজ সেই আমি কারাগারে/ সমর্পণ করে, ফিরে যাচ্ছি ঘরে/ মানুষকে ভালোবাসা ভালোবাসি বলে।

যদি কোনোদিন আসে আবার দুর্দিন,/ যেদিন ফুরাবে প্রেম অথবা হবে না প্রেম মানুষে মানুষে/ ভেঙে সেই কালো কারাগার/ আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার।’


ইতিহাস চেতনা আর প্রেমের মোড়কে তিনি জনগণের কথাই বলেন, তার রাজনৈতিক বিশ্বাস শোষিত জনগণের পক্ষেই।


হেলাল হাফিজকে সচরাচর প্রেমের কবি বলা হয়। মিলনাকাঙ্ক্ষা আর বিরহ-বেদনার যে আবহ তিনি কবিতায় ফুটিয়ে তুলেন, তাতে সহজেই চিরন্তন এই আবেগ পাঠকের ভেতরে যেই আবহ সৃষ্টি করে তা নিঃসন্দেহে প্রেমের। ফলে অন্য কোনো অভিজ্ঞতাকেও তিনি এই একই ফ্রেমেই চিত্রায়িত করেন। যেমন উপরোক্ত কবিতায় তিনি প্রেমিকার স্থানে মারণাস্ত্র বা যুদ্ধাস্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করেন। নয় মাস ধরে এই অস্ত্রটি একজন যোদ্ধাকে প্রেমিকার মতোই সঙ্গ দিয়েছে। কবির এহেন অভিজ্ঞতা আমাদের অভিজ্ঞতার জগতে নয়া ঢেউ জাগায়। যেন সম্পৃক্ত হই নতুন অভিজ্ঞতার সাথে। কিন্তু শেষ বা পঞ্চম প্যারায় গিয়ে তিনি এমন এক সন্দেহের আবহ তৈরি করেন, যা একজন কবির অন্তর্দৃষ্টিরই প্রমাণ দেয়। শেষের চার লাইন কিভাবে অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে আছে আজ। কবি হৃদয় কতদূর দেখতে পায় তার প্রমাণ হয়ে আছে শেষের চার লাইন। অবশ্য তারই সূত্র ধরে কবি ৮১ সালে এসে লিখলেন এমন দুইটি কবিতা যা কবির এই ভবিষ্যৎবাণীকে বাঙ্ময় করে তোলে। ‘যার যেখানে জায়গা’ কবিতায় নিজের কাব্য ভাষার পরিবর্তন করেন। একদম গ্রাম্য মানুষের মুখের বুলিতেই তিনি তুলে দেন কবিতাটি।

‘ভোলায়া ভালায়া আর কথা দিয়া কতোদিন ঠগাইবেন মানুষ/ ভাবছেন অহনো তাদের অয় নাই হুঁশ।/ গোছায়া গাছায়া লন বেশি দিন পাইবেন না সময়/ আলামত দেখতাছি মানষের অইবোই জয়।… টিকেট ঘরের ছাদে বিকালে দাঁড়ায়া যখন যা খুশি কন/ কোনো দিন খোঁজ লইছেন গ্রামের লোকের সোজা মন/ কী কী চায়, কতোখানি চায়/ কয়দিন খায় আর কয়বেলা না খায়া কাটায়।’

এসব প্রশ্ন কবি ছুড়ে দেন ইতিহাসের টেবিলে। এদেশের মানুষ ভেবেছিল পাকিস্তানিদের হাত থেকে স্বাধীন হয়ে তারা সমানাধিকারের ভিত্তিতে একটা দেশে বাস করতে পারবে। কিন্তু গ্রাম আর শহরের পার্থক্য সেই আগের চাইতে বেড়ে যায়। শুধু কথামালার রাজনীতিতে গণজীবন অস্থির হয়ে ওঠে। ৭৩ থেকে ৮০ পর্যন্ত অবিরত ঝরতে থাকে দখলদারির নিমিত্তে ক্ষমতা কেন্দ্রের রক্ত।

বাংলাদেশ আবার হয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার খেলার পুতুল। দেশীয় শাসক বুর্জোয়ারা পাকিস্তানি বুর্জোয়াদের চাইতে আরো অমানবিকভাবে লুণ্ঠন করতে থাকে প্রিয় মাতৃভূমি। গ্রামে বাস করা দেশের বেশিরভাগ মানুষ চলে যায় দারিদ্র্য সীমার নিচে। যাদের কথা ভাবারই সময় নাই বুর্জোয়া শাসকদের। গণমানুষকে উপোস রেখে নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত শাসকরা। যা একজন সৎ কবির চোখ এড়াতে পারে না। লক্ষণীয়, এই কবিতাটা নিজের ভাষার প্রয়োজনে, কবির অন্ত্যজ রসায়ণকে ধারণ করতে তার ভাষা বদল করে নেয়। শুধু যে ভাষা বদল করে নেয় তা না, কবিতার প্রয়োজনে ঢুকে পড়ে শ্লেষও।

‘রাইত অইলে অমুক ভবনে বেশ আনাগোনা, খুব কানাকানি,/ আমিও গ্রামের পোলা চুতমারানি গাইল দিতে জানি।’

উল্লেখ্য, সম্প্রতি এই কবিতাটি বাংলাদেশের সংসদে বিএনপির এক মহিলা সাংসদ আবৃত্তি করে হইচই ফেলে দেন। অবশ্য তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যেই এই কবিতাটি উচ্চারণ করেন। এবং এটা নিয়া যেই পরিমাণ আলোচনা হয়। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বলে, প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করেই এই বিএনপি সাংসদ ‘চুতমারানি’ শব্দটা উচ্চারণ করে।

আদতে এই কবিতার ভেতর লুকানো ইঙ্গিতগুলা এই দুই দলের ক্ষেত্রেই সত্য ও আঘাত স্বরূপ। এই দুই দলের মধ্যে কি আজ কোনো ফারাক আছে? কিছুদিন পর হয়তো এই দুই দলের বিরুদ্ধে খোদ জনগণই উচ্চারণ করবে এই কবিতা। মোদ্দা কথা হচ্ছে, কবিতার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা। একটা কবিতা তখনই যুগ যুগ ধরে মানুষের কাজে আসে, মানুষ ব্যবহার করে, যখন কবি সেই গণমানুষেরই ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধারণ করেন। হেলাল হাফিজের কবিতা প্রেম আর ইতিহাসের চাদরে মোড়ানো। ভেতরে আছে প্রখর রাজনীতি চেতনা। ৮১ সালে লেখা ‘যেভাবে সে এলো’ কবিতায় তিনি আরো বলেন : ‘অসম্ভব ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছিলো/ সামনে যা পেলো খেলো/ যেনো মন্বন্তরে কেটে যাওয়া রজতজয়ন্তী শেষে/ এসেছে সে, সবকিছু উপাদেয় মুখে।… দু’পায়া পথের বুক, বিদ্যালয়/ উপাসনালয় আর কারখানা চিমনি খেলো/ মতিঝিলে স্টেটব্যাংক খেলো।… খালের অনুপম বাঁশিটিকে খেলো/ মগড়ার তীরে বসে চাল ধোয়া হাতটিকে খেলো।/ স্বাধীনতা সব খেলো, মানুষের দুঃখ খেলো না।’

স্বাধীনতা সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তিনি ছুড়ে দেন এই কবিতার মাধ্যমে। ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ কেন হয়েছে’ এই প্রশ্নের উত্তরে করতে হবে আরেকটি প্রশ্ন স্বাধীনতা যুদ্ধে আসলে কারা লাভবান হয়েছে। পুকুর ভরাট করে আজ কারা বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট বানাচ্ছে? এই অ্যাপার্টমেন্ট বানিয়ে কারা উদার ও মুক্ত আকাশটাকে আড়াল করছে? উপাসনালয়ের মালিক আজ কারা? দেশের সমস্ত কারখানার মালিক আজ কারা? মতিঝিলের ব্যাংকগুলা কাদের ঋণ দেয়ার জন্য বসে আছে? তাদের জন্যই হয়েছে আসলে স্বাধীনতা?

গণমানুষের দুঃখ উৎপাটনের জন্য দরকার আসলে আরেকটি প্রকৃত স্বাধীনতা। হেলাল হাফিজ খুব কম কবিতা লিখলেও সত্যিকার অর্থেই তিনি এদেশের গণমানুষের কবি। ইতিহাস চেতনা আর প্রেমের মোড়কে তিনি জনগণের কথাই বলেন, তার রাজনৈতিক বিশ্বাস শোষিত জনগণের পক্ষেই। এই জন্যই এখনো তার কবিতা সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছে সাধারণ পাঠককে। বুর্জোয়া পাঠক অবশ্য তাকে কবি হিসেবেই স্বীকার করবে কিনা সন্দেহ।

হেলাল হাফিজের কবিতায় যে শুধু ইতিহাস চেতনা বা রাজনীতি-মুখিনতা এসেছে তাই না, তিনি কবিতার নান্দনিকতার প্রশ্নও উত্থাপিত করেছেন কিছু কিছু কবিতায়। কবিতা নিয়া জগতের কবিরা যেমন ভেবেছেন তেমনি অনেক দার্শনিকও বাহাসে লিপ্ত হয়েছেন। কবিতা মাধ্যমটিকে চেনার ব্যাপারে নিঃসন্দেহে এসবের দরকার আছে। ‘কবি ও কবিতা’ কবিতায় তিনি বলেন : ‘কবির জীবন খেয়ে জীবন ধারণ করে/ কবিতা এমন এক পিতৃঘাতী শব্দের শরীর/ কবি তবু সযত্নে কবিতাকে লালন করেন/ যেমন যত্নে রাখে তীর/ জেনে-শুনে সব জল ভয়াল নদীর।’


কবি এমন এক বুদ্ধিজীবী যিনি কারো কাছে কিছু প্রাপ্তির আশা না করেই মানুষ ও সভ্যতার পাহারা দেন আজীবন।


জর্মন কবি হাইনেকে নিয়ে লেখা একটা প্রবন্ধে দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার বলেছিলেন, আগামীতে দর্শনকে পথ দেখাবে কবিতা। তিনি বলেছিলেন, কবিতা হচ্ছে মানুষের প্রথম তথা ভার্জিন উচ্চারণ। তাই সততার প্রশ্ন আগে। দার্শনিকরা সৎ জীবনযাপন করার জন্য যে তাত্ত্বিক ডিসকোর্স হাজির করেন, তাদের থিসিসে কবি তা অনায়াসেই তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করেন। যা উপরোক্ত লাইনে উপস্থাপন করেন কবি হেলাল হাফিজ। কারণ তা স্বয়ং কবিতার দাবি। কবিতা কবির কাছে চায় সর্বোচ্চ ত্যাগ সততার প্রশ্নে। হেলাল এখানে তার দাবি প্রমাণ করার জন্য উপস্থাপন করেছেন সমুদ্রের তীরকে। অনেক সময় সমুদ্র ভয়াল হলে তীরও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তবু সেই ভয়কে উপেক্ষা করেই তার থাকা। কবি জানে প্রথাগত অর্থে কবিতা তাকে খাবে। কবি এমন এক বুদ্ধিজীবী যিনি কারো কাছে কিছু প্রাপ্তির আশা না করেই মানুষ ও সভ্যতার পাহারা দেন আজীবন। কোনো প্রাপ্তির আশা ব্যতিরেকেই। কারণ কবিতায় ভাষার যেই নিগূঢ় ঘ্রাণ মানুষকে উজ্জীবিত করে, প্রাণবন্ত করে, সেই প্রাণ কবিকে লালন করতে গেলে তাকে বাস্তবতার সাথে যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয় তা হয়তো একজন মানুষের একজীবনে শেষ হবার নয়। কেন?

হেলাল হাফিজ বলবেন : ‘সর্বভুক এ কবিতা কবির প্রভাত খায়/ দুপুর সন্ধ্যা খায়, অবশেষে/ নিশীথে তাকায় যেন বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরী/ কবিকে মাতাল করে/ শুরু হয় চারু তোলপাড়/ যেন এক নির্জন বনের কোনো হরিণের লন্ড ভন্ড খেলা/ নিজের ভিতরে নিয়ে সুবাসের শুদ্ধ কস্তুরী।’

ইতালিয়ান দুঃখবাদী কবি গিওকোমো লিওপার্দি বলেছিলেন, কবিতা লিখতে গিয়ে কবির সবকিছুই ভেসে যায়। মানসম্মান, অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি এমনকি সংসারও। সত্যিকার অর্থে কবিতা নিজেই একটা বিশাল যজ্ঞ। কবি যখন নিজেকে আবিষ্কার করেন, তিনি যখন বুঝতে পারেন ‘নিজের ভিতরে নিয়ে সুবাসের শুদ্ধ কস্তুরী’ তিনি দিনযাপন করেন। স্বেচ্ছায় তিনি ত্যাগ করতে পারেন প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক জীবন। এই জন্য সংসার ত্যাগী বলে কবিদের বদনাম আছে জগতে। কিন্তু গোটা দুনিয়াটাই যার সংসার তাকে সংসারে বেধে রাখে কে? কিন্তু কবি নিজে কী পায় এইরকম এক নিঃস্বার্থ কবিতাময় জীবনযাপন করে? কবি হেলাল হাফিজ বলবেন : ‘কবির কষ্ট দিয়ে কবিতা পুষ্ট হয়/ উজ্জ্বলতা বাড়ায় বিবেক/ মানুষের নামে বাড়ে কবিতার পরমায়ু/ অমরতা উভয়ের অনুগত হয়।’

খুব অল্প কবিতা লিখলেও সত্যিকারের একটা কবিতা জীবনযাপনকারী হিসাবে আমরাও কবি হেলাল হাফিজের জন্যও সেই অমরতা বাসনা করতে পারি। কিন্তু এর উল্টোপিঠেই আরেকটা আশঙ্কা থেকে যায় যেই আশঙ্কা রিপাবলিক কিতাবে প্লাতনীয় সক্রাতাস করেছিলেন। যেই আশঙ্কা থেকে তিনি কবিদের তাদের আদর্শ রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। কারণ কবিতার যেই মহৎ সম্ভাবনা তার উল্টাপিঠেই আছে নোংরা মানসিকতার নিম্নরুচির কবিদের খ্যাতির প্রতিযোগিতা।

এই খ্যাতির প্রতিযোগিতায় পড়ে এদেশে অধিকাংশ কবিতাসেবীরাই আজ পরিণত হয়েছেন কবিতার শত্রুতে। জাগতিক লোভ যা মৌলিক কবিতার পথে প্রধান অন্তরায়, তাই আজ এদেশীয় কবিদের সহায়। আমরা বলি মহৎ কবিতা এখন আর হচ্ছে না। কবিতা মহৎ হবে কোত্থেকে, কবি যদি ভাঁড় হয়, কবি যদি দাসত্ব করে কোনো বুর্জোয়া মতবাদের। আগে কবির জীবন হতে হবে কবিতাময়, যেই কবিতা সত্যের কাছাকাছি। হতে পারে সেই দূষিত কাব্য-আবহাওয়ার থেকে দূরে থাকতেই কবি হেলাল হাফিজের গতানুগতিক কবিতা থেকে সরে যাওয়া। একা হয়ে যাওয়া…

জাহেদ সরওয়ার

জন্ম ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৭৬; মহেশখালী দ্বীপে। স্নাতকোত্তর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ফ্রিল্যান্সার।

প্রকাশিত বই—

এই মিছা কবি জীবন [কবিতা]
আততায়ী একটি কবর [কবিতা]
বিকালের দাসবাজার [কবিতা]
আরো একটি কবিতা শোনাও কবি [কবিতা]
সূর্যের নিচে শুধু ভয় [কবিতা]
পায়ুবাসনার জনগণ [উপন্যাস]
দস্তইয়েভস্কির বই ও কোটিপতির সকাল [গল্প]
সম্পর্কের সন্ত্রাস ও অন্যান্য গল্প [গল্প]
রাজ্য ও সাম্রাজ্য [রাজ্যচিন্তার কারখানা-১]
সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ [রাজ্যচিন্তার কারখানা-২]
কবিতা পড়ুয়ার নোটবই [কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধের বই] ফিদেল কাস্ত্রো [জীবনী গ্রন্থ]


ই-মেইল : sjahedpoet@gmail.com