হোম গদ্য হৃৎ-আখরের গাথা, প্রেমের গ্রন্থিতে বাঁধা কাব্য-ইতিহাস

হৃৎ-আখরের গাথা, প্রেমের গ্রন্থিতে বাঁধা কাব্য-ইতিহাস

হৃৎ-আখরের গাথা, প্রেমের গ্রন্থিতে বাঁধা কাব্য-ইতিহাস
1.01K
0

Humans live through their myths and only endure their realities.

-Robert Anton Wilson

মানুষ তো কবিতা লেখেই, লেখার অন্তত চেষ্টা করে যায়, কিন্তু কবিতা যখন মানুষকে লিখতে শুরু করে তখন কী দশা হয়! এমন দশাও কি মানুষের হয় নাকি? তার সাফ সাফ উত্তর হয়তো দেয়া সম্ভব নয়। তবে কবিতার পাঠক যিনি, কবিতার বযান, বিষয়, শরীর আত্মার পারস্পরিক সম্পর্কের বোঝাপড়াকে গভীর থেকে যিনি চিনতে বুঝতে পারেন, তার কাছে সে দশার পরিপূর্ণ প্রকাশ দেখা দেয়।

মোহাম্মদ রফিকের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘দুটি গাথাকাব্য (এ কোন বেহুলা, সে ছিল বেদেনি)’ পড়তে পড়তে কথাগুলো ভাবছিলাম। এক একটি কবিতার পরতে পরতে কবির মেলে দেয়া ভাষা-উপমা-বোধ-দর্শন-ভালোবাসার শতেক পসরার ভেতর দিয়ে ভাবের সওদাগিরি করতে করতে যে পথে হেঁটে চলা, সে পথের যেন দিকদিশা চিহ্ন সব আমূল মিলিয়ে যেতে থাকে। কোথায় তার যাত্রা শুরু, কোথায় তার শেষ, যেন ঠাহর করা দুরূহ হয়ে পড়ে। ভাষা তো কবিতাই এমনিতেই বর্ণচোরা হয়েই থাকে, কবিতার আত্মা থেকে শরীররূপী ভাষাকে আলাদা করে ফেলার কাজটা অসম্ভবই বটে। সেখানে মোহাম্মদ রফিকের এই কবিতাগুলোতে কাজটি যেন আরও দুরূহই।


মোহাম্মদ রফিকের এ কবিতা(গুলো) বোঝার চেষ্টা করার ব্যর্থ প্রয়াস নিতে পাঠককে হয়তো-বা গোয়েন্দাগিরি ফলাতে হবে ইতিহাস বা পুরাণ বা লোককথার কাছে


একটি কথাও নেই, যে কথার ধ্বনি শব্দ আবহ বোঝার জন্য হন্যে হতে হয়, একটি শব্দও নেই যার অর্থ বোঝার জন্য ভাষার অ-সাধারণ কোনো জ্ঞানস্তরে যেতে হয়, একটি দৃশ্যপটও নেই যার মর্মরূপ চেনার জন্য চোখের ভেতরে ভিন্ন চোখ নিয়ে গাঁথতে হয়, অথচ একটির পর একটি শব্দ বাক্য উপমা ছবি আওয়াজ ভঙ্গি আছড়ে পড়ে পাতায় পাতায়, তখন তা অনন্য হয়ে ওঠে। অসাধারণ হয়ে ওঠে। অন্য অন্য হয়ে ওঠে। আর এভাবেই হতে হতে তা লীন করে ফেলতে চায় পাঠক নামের এক চেতনাজাগ্রত সদাসক্রিয় সত্তার ভিন্ন তলকে। উপলব্ধির এক নিঃসীম শূন্যে অর্থ জাদু মোহে মায়ায়গ্রন্থিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে এই দুই সত্তা। কবি আর পাঠক। অথবা কবি পাঠক দুজনেই উধাও হয়ে যায়, কেবল সক্রিয় জীবন্ত সতেজ সঞ্চরণশীল হয়ে থাকে একটি মাত্র অস্তি—যার নাম কবিতা। সে কবিতার চলনে গড়নে বাংলার আঁকাবাঁকা সরু-পথের চলনের মতো ছন্দ (যার নাম অক্ষরবৃত্ত), শিথিল এলায়িত নয়, আঁটোসাঁটো পেশল রক্তমাংসময়, আর কবিতা যে শেষাবধি অনুপম শব্দবল্লরীর ছন্দময় বিন্যাস (এডগার এলান পো-ও বলেন, Poetry is the rhythmical creation of beauty in words), সে-কথা কে না স্বীকার করে!

মোহাম্মদ রফিকের এ কবিতা(গুলো) বোঝার চেষ্টা করার ব্যর্থ প্রয়াস নিতে পাঠককে হয়তো-বা গোয়েন্দাগিরি ফলাতে হবে ইতিহাস বা পুরাণ বা লোককথার কাছে, পরম্পরার কোন স্রোত বেয়ে কবিতার পলিক্লেদমাখা সাধের ঝিনুক এসে ঘাটে লেগেছে এমন ঝকমকিয়ে তার সন্ধান করতেও হতে পারে হয়তো-বা, পুরাণমানুষ কী করে অধুনামানুষের অন্তরাত্মায় এসে মিশে গেল তার সম্পর্কসূত্রের নানা ইশারা খোঁজার শতেক প্রয়াসেও মজে যাওয়া যেতে পারে হয়তো-বা, সেটা হতে পারে, কিন্তু যে এই কবিতার বুঝে-ওঠা চিনে-ওঠা পেয়ে-ওঠার ধার না ধেরে কেবল এর প্রতিমুহূর্তের সৃষ্টিযাত্রার রক্তচিত্ত স্নায়ুর আন্দোলনের নীরব নিভৃত অন্তঃমগ্নতার অনুরণনকে অনুভব করে করে পাঠ নামের এক অপার যাত্রার স্বপ্নচারী হতে চাইবে, তার জন্য পাঠক নামের এক সত্তার নিবেদিত আপাতত স্বতঃদানকৃত ভালোবাসার সীমাহীন খেলায় বিভোর হয়ে যাওয়াটাই যথেষ্ট।

আকাশের সাথে পৃথিবীর বিবাহের তোড়জোড়, সেই বিবাহ অথবা সেই মিলন তো ঘটবেই বৃষ্টিপাতের মধ্য দিয়ে, শুরুতেই সেই দৃশ্যের স্বাক্ষী করিয়ে দেন কবি।

(আজ আকাশের সাথে বুঝি-বা বিবাহ পৃথিবীর
এমন বৃষ্টিতে ওই  স্নাত হলো মাঠ-ঘাট-গাছ-পালা, তৃণ-পরিচ্ছন্ন
গায়ে হলুদের এই সমারোহ ইতিপূর্বে দেখেছে কি কেউ কোনোদিন।’
(আকাশ-পৃথিবী/এ কোন বেহুলা)

‘বিদ্যুতের শিখা আজ বেহুলার বাসর সাজাবে।’

যে সম্ভাব্য শঙ্কার ঝড় মাথায় নিয়ে বেহুলা এগিয়েছে লখিন্দরের বাসর সমীপে, তার বাসর তো বিদ্যুতের শিখাতেই সজ্জিত হবে।

যে লখিন্দর দৈবের অভিশাপের ভার কাঁধে নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে, বাংলার সমঝোতার ব্যাকরণ এমনই যে সে-ই হুংকারে বলে,

‘আমি তবে লখিন্দর
তোমারে অমর করে যাব,
ভাসতে দাও ঢেউয়ে ঢেউয়ে নিম্নগামী স্রোতে
গলিত মাংসের পিণ্ড ঝরে পড়বে জলে’

লখিন্দরের আনন্দেরই তো এ মরণযাত্রা। প্রেমের মানুষকে আত্মার অন্তর্গত জনকে সে নিজের মৃত্যু আর বীভৎস পরিণামের মধ্য দিয়ে স্বাক্ষরিত করে যাবে। এভাবেই তো

‘কিংবদন্তি যুগ-যুগান্তরে
প্রাণ পাবে মাটিতে ও জলে।’

বেহুলার জনম জনমের লখাই সেজে কবিতা বাঁধতে বসে যাওয়া কবি কখনো নির্বিশেষ মানবিক একলার নিঃসঙ্গ কথনেও তৎপর থাকেন: ‘জলেতে তোমার ছায়া দেখে/ স্রোত কিন্তু তড়পাবে আবেগে’, মানবিক ছায়া দেখে প্রকৃতিক জলের স্রোতের শরীরী মাতম বুঝে নিতে চান তিনি। উচ্চারণ না করলেও লখাই-ই থাকেন তিনি, বোঝা যায়, বেহুলাকে বলেন সে আপ্তকথা।

জীবন আর মৃত্যুর ভেদলেখা মুছে দেন কবি, একটা অপার্থিব আনন্দে :

‘রক্তাভ দেহের কান্তি, যেন-বা গোলাপ সদ্য মুক্ত হলো কুঁড়ি থেকে,
আমি কীট! তড়িঘড়ি বসব গিয়ে নাভিমূলে, রস শুষে নিয়ে
ফোটাব-বা হুল প্রাণপ্রদীপের প্রজ্বলিত শিখা বেয়ে,
সেখানে মাটি ও স্রোত সম্মিলনে একাকার হয়ে শুয়ে আছে

প্রতীক্ষায়, অগ্নিগর্ভ আনন্দের তীব্র কোনো উজ্জ্বলতায়
সিক্ত দীর্ঘ চুম্বনের, অন্ধকার হয় আলোকিত হঠাৎ নিঃশব্দ আলিঙ্গনে!’
(প্রতীক্ষায়)

প্রাণপ্রদীপের প্রজ্বলিত শিখা বেয়ে হুল ফোটানোর আনন্দ মৃত্যুরই, জ্বলন্ত নারী-অঙ্গের আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে নিভে যাওয়ার ভাগ্য তার। যেন ঐভাবেই না পাওয়ার নিয়তির ভার বয়ে জন্ম আমাদের লখাইয়ের, শরীরের আনন্দের চরম মুহূর্তের চূড়ায় যার বসে থাকে মৃত্যুর অমোঘ গ্রাস। অন্ধকারের ভেতর আলো জ্বেলে দেয়া আলিঙ্গন আদতে মৃত্যুরই বাহুডোর। তবুও তা আনন্দের। সে আনন্দ প্রেমের। প্রতি পলে জীবনের অমোঘের কাছে পরীক্ষা দিয়ে দিয়ে পথ চলা যন্ত্রণার বেদনার্ত প্রান্ত জীবনের। হযতো-বা।

এ কবিতা শেষ বলে সীমা টানে না কোথাও, শিরোনামের তিলক পরে পরে সে কেবল নিজের রূপ অস্তি মনে করিয়ে দেয়, আসলে তা ভিন্ন হয় না কোনো চিহ্নায়নে। ভুল, স্বপ্ন আর প্রেমকাতরতার দ্বন্দ্বপথের মধ্য দিয়ে তার যাত্রা চলে নিরন্তর। রবার্ট ফস্টও তা-ই যেন বুঝেছিলেন :

A poem begins as a lump in the throat, a sense of wrong, a homesickness, a lovesickness.

তাই সে কবিতার মুহূর্ত-পরেই ‘চিরন্তনী’ তিলক-আঁকা কবিতার কালহীন দীর্ঘশ্বাস তৈরি করে দেয়। সে জীবনে কেউ ডাক দেয় নাই। কেউ এসে হাত বাড়িয়ে দেয় না সহায়ক সহচর হয়ে। তাই বুঝি—

‘নিয়তি নিয়ে এল হাত ধরে, মুখোমুখি
দুটি অসহায় নির্বিকার উলঙ্গ সত্তার সংঘর্ষণে’

উন্মিলিত দুই সত্তার বাসরের যে মিলনসম্ভব অবয়ব—তারা উলঙ্গ—কেবল তা শরীরের রূপে নয়, আভরণের বাহ্য সকল ভার থেকে মুক্ত চিরায়ত রূপের প্রতীকে।

কবি, অন্তরে সে লখাই হয়েছে আজ, তার ’পরে ভর করেছে জ্যান্ত লখিন্দর, তাই বলে :

‘মরণেতে পেতেছি বাসর
কোথায় সে সর্পদেবী
কে তবে দংশিবে আজ রাতে,

দুই ঠোঁট মেলে দিয়ে তুমি
শ্বাস নাও গহিন আশ্লেষে
আমি দেখি, ঢেউ ভাঙে দুই তীর জুড়ে,

এখন ভাসাই যদি ভেলা
তোমার জলে ও ঘামে
নাতিউষ্ণ ভেজা-ভেজা ঘ্রাণে,

হয়তো-বা অতলে ডুবে গিয়ে
পেয়ে যাব মেটো-জনমের স্বাদ
ঘটে যাবে অনন্য সত্তায় মাল্য দান,

প্রবাহিত হে নদীর ধারা,
তোমার জলজ অভ্যন্তরে টেনে নাও,
মৃত্যু তবে বাসনার ঘোর!’
(নদী ও নারী)

মৃত্যুকে পরিহাস করে লখাই। প্রেমিকপুরুষ মরণেতে যে বাসর পাতে, তাকে নতুন করে মৃত্যু আর কী পরিণতি দেবে? বেহুলার ‘দুই ঠোঁটের’ কিংবা প্রেমসখা বা প্রেমের দুই ঠোঁটের চুম্বন হয়ে ওঠে মুত্যুরই বাজুবন্ধ, সঙ্গমের ভেতরে আপন জৈবসত্তার ভেতরকার অর্থ কিবা অনর্থের সংঘর্ষ তাকে এই সত্য উপলব্ধি দেয় :
‘মৃত্যু তবে বাসনার ঘোর।’

যেন তা শিল্পেরও এক ধরনের ক্যাথারসিসের আনন্দের সমতুল। শিল্প যখন সিদ্ধ হয়, বাণী-ছবি-ভাষ্যের কাঠামোর ভেতর থেকে অনঙ্গের শূন্যে লুপ্ত হয়, তখনই তো শিল্পী আনন্দের ফেনিল সমুদ্রে ভাসে। সেই স্বাদ বিলয়ের অলৌকিক আনন্দের। এবং এক অর্থে বুঝি বা মৃত্যুরই।

সেই চিরন্তন মৃত্যুরই তো একনায়কতান্ত্রিক শাসনে শাসিত জীবন, আগে কিংবা পরে, বাংলার দর্শন কখনো তাকে চরম চমকি ম্যাজিক্যাল কিছু বলে মনে করে না, করে না লখাইও। তাই মিথের গুহা থেকে বের হয়ে সেই মৃত্যুমতি অমা-রজনীর মেয়ে’ সেই বেহুলারই অনন্ত যাত্রার নদীতে তার পাল ‘নৌকার গলুই’ হয়ে ওঠে, যে ‘ঢেউ ভাঙে স্বপ্নদরিয়ায়’ আর ‘জ্যোৎস্নায় ধোয়া হাওয়া মর্মরিত ধ্বনি টেনে নেয়/ অন্তহীন নিরুদ্দেশে’ (নয়, তবু) যাকে।


বাংলার শত শত বছরের মাটিলগ্ন জীবনের নিপুণ কারিগর যে নারী, তাকে কবি ইতিহাস ও যাপিত ভূগোলের অলিগলি ধরে চেনেন।


নিত্যকার লখাই হয়ে-ওঠা কবি আজ থামবে না পণ করেছে, এ জীবনের বাসনার থরথর প্রাপ্তিমুহূর্তের বুকে বিষদংশন দেয়া নিয়তিকে পরিহাস করতে করতে ক্ষান্ত দেবে ভেবে নিয়েছে সে। তাই সে গল্পকে, তার সংস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে। ফাঁদে গল্পের নতুন বয়ান। নতুন মুহূর্ত। সে দেখে প্রেমরূপ বেহুলার—

‘দু-স্তনের ওঠা-নামা
পাশ ফিরলে বুকের পাঁজরে মুড়মুড়
ঊরুর দিকের বেনারসি আলগা হয়ে আছে’

এমন সময় কৌতুক দারুণ!
‘ডেকে উঠল দুটি ব্যাঙ ঘরের কোনায়
ওরাও মেতেছে তবে বিপন্ন সম্ভোগে’।

সম্ভোগ কেন এত বিপন্ন এই রাতে! সম্ভোগ তবে কি শরীরের সমভোগই নয় কেবল? একে আর একে কিংবা দোঁহের মিলনের চিরায়ত বাসনা। জোসেফ ক্যাম্পবেল যেমন বলেছিলেন :

বিবাহ হলো এক থেকে দুই হওয়া সত্তার আবার এক হয়ে ওঠার কৃত্য।

তবে পকৃৃতি কি দ্বিধামোদী? এক হতে দেবে না দুই-কে? লখাই কিংবা কবি, সেই মিলনথরথর ইশারাচমকিত রাতে বুঝে ওঠেন, তবু :

‘আজ রাত হয়তো-বা অন্যরাত
অন্য কোনো দাবি নিয়ে ঢুকেছে বাসরে
পুষ্প পাপড়ি দুলছে ওই হাওয়ায়-হাওয়ায়
মৃদুমন্দ ঘ্রাণ যেন উতলা করেছে আঁধিয়ার,’

আর এই আলো-আঁধারির মিলন-বিচ্ছেদের মধ্যিখানের থমকে থাকা কালের পিছল পিঠে বসে কবি কিংবা লখাই বুঝতে পারেন :

‘বেঁচে থাকা এমন বিস্ময়কর, রহস্যমণ্ডিত!’
(যতক্ষণ বেঁচে আছি)

আর সে, মানুষই তো, বেহুলা-লখাইয়ে বিভক্ত সত্তাদ্বয়ের ব্যর্থ পরিণয়ের মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করে :

‘নির্ধারিত হয়ে আছে
মরণেতে দুজনের মিলনের রাত!’

মানুষের পরমমিলন তো মৃত্যুরই সাথে ঘটে। এর কোনো বিকল্প নাই, এ যে অনিবার্য। তাই সাপের ছোবলে রক্ত বেয়ে নামতে থাকা বিষ তার কাছে মধু, জীবন মৃত্যুরই অন্য নাম।

‘আজ রাত চৈতি পূর্ণিমার
বিষভাণ্ড উপচে পড়ে মধু
জীবনের স্বাদ, মৃত্যু যার অন্য পরিচয়’
(তীর্থভুঁয়ে)

তাই, যখন ‘দুজনে বিভোর ছিল দুজনাতে’, দুঃস্বপ্ন নয় স্বপ্ন(!) এসে ছোবল দিয়ে যায়। অর্থাৎ দুজনের সঙ্গমই ছিল ঘোর, অন্ধ, স্বপ্নের শব্দগত অর্থদ্যোতনায় বাস্তবই ছোবল দিয়ে যায়।

কবি, লখাইয়ের প্রেমিক সত্তার না-পাওয়ার মর্ম অভিমানের কৈবল্য থেকে ছিন্ন হয়ে রাজনৈতিক হয়ে ওঠে! উলটো বয়ান তার মুখে! বিষ সাপ অভিশাপ সব এখন পরিহাস বটে, তবে তা অন্যরূপ।

কুমারীত্ব লুটে নেয়া, ‘প্রতিটি অতীত-ভবিষ্যৎ’ হরণ করা ‘লোভাতুর, কামনার্দ্র সেই ‘লালসার বিষে জর্জরিত হবে দেহ, মুখে ফেনা অসাড় অনড়,’ আর ‘লখিন্দর, নিজের অলক্ষ্যে শোধ করে যাবে অকালের ঋণভার!’ ‘গুঞ্জরিছে প্রতিশোধ/ নীল, তীক্ষ্ণ দংশনে-দংশনে কথা বলে উঠবে ইতিহাস।’

এখানে প্রতিশোধের সত্তাটি হয়ে উঠেছে লালসালীলারত পুরুষ, যার দায়ভার বহন করতে হচ্ছে লখিন্দরকে। একটা আইরনি যেন তৈরি হয়ে যায় কবিতার বয়ান জুড়ে।

সেই কবি, জীবনের নিরর্থকতাকে পরিণয়ের অন্তঃসারশূন্যতাকে প্রেমের ব্যর্থতাকে আকাঙ্ক্ষার ক্রান্তিকে দূরে ঠেলে এবার পুরোদস্তুর রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল অবসাদ হতাশা গ্লানিকে পর্যবসিতে করা কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে লখাইয়ের ছদ্মকণ্ঠে, বলে :

কিন্তু ‘আমি তো পুরুষ নই, ক্লীব, পুরুষত্বহীন,
আমাকে করেছে রোদ, ফাটা খেত

অঙ্গহীন, বিদেশি শাসন,
তাই কাউকে জাগাতে পারি না, না, নিজেও জাগি না কখনো,

ক্ষমা করো; যদি বলি, আত্মাহুতি, আত্মদান,
বীর্যহীন চাষ ব্যর্থ, ইতিহাস-খোঁজ রাখি নি তো, যথার্থই

শুধু এই হাহাকার, আত্মরতি, নিজেকে ধিক্কার দেয়া সার
ভুলে গেছি ভাষা, প্রশ্ন ওঠে না নতুন আঙ্গিকের’

এইসব আত্মপরাজয়ের কথা তুলে, বাসরে মিলন কি জাগর-উন্মুখ নারীরূপ-অন্য-সত্তাটিকে সে দূরে ঠেলতে চায়, বলে :

‘সরে বসো, নেমে যাও, আমার নিশ্বাস ছুঁতে গিয়ে উষ্ণ হৃদয়েরে
পালায়-পালায় আত্মবিবরে সহায়হীন;’

তাকে জাগতে বলে, তবে সে জাগাবে অন্যকে। সে লখিন্দর নয়। ইতিহাস। একের পর এক পরাজয়ের ভার বওয়া পুরুষ নয়, নতুন দিনের অন্য কোনো পুরুষেরে, মানুষেরে জাগাবে সে ।
বলে,

‘তুমি জাগো, জাগাও অন্যকে,

একদিন নিশ্চয় রচিত হবে নতুন কাহিনি, উৎসারিত
উদ্বেলিত তোমার ভুবনে ঋদ্ধ হবে মন্ত্র আগামীর উচ্চারণে,

সর্পদেব, তোমাকেও ধন্যবাদ, আশীর্বাদ করো বেহুলাকে,
তাকে মুক্তি তবে এনে দিলে মোহে অন্ধ ভালোবাসা, ক্লীবত্বের নাগপাশ থেকে,

পালাবার পথ আমি নিজেই তো খুঁড়ে নেব নিরুত্তাপ বেদনার ভার বয়ে-বয়ে
গাঙুড়ের পুঁতিময় জল ঠেলে-ঠেলে…’
(শুধুই তোমার জন্য)

বাসরের রাতে সর্পদেব যে জীবনে ‘দিয়ে যায় লালাসিক্ত পিচ্ছিল চুম্বন।’ সে জীবনে বাঁচি কিংবা মরি, ‘সেই প্রশ্ন অবান্তর,’

এমনই আশ্রয়হীন অপ্রেমের এই বসবাস। এমনই
‘ছিন্নবস্ত্র, বিমুক্ত স্বদেশ,’ আর তাতেই ‘সহবাস।’

কবি-লখাই আত্মধিক্কার জানায় :
‘অভিশপ্ত বিবাহ আমার
আমি তবে লখিন্দর, যার কাছে দেব-দেবী
শাসক শোষক অপরাধী নতশির।’
(বীজমন্ত্র)

নতশির লখাইরূপ ইতিহাসের আয়নায় নিজেদের ঘৃণার অভিশাপের লজ্জাকর রূপটিকে দেখে এ নিশ্চয় বুঝে নেয়া যায়।

ফের ক’ পৃষ্ঠার কাব্যযাত্রা শেষে কবি উল্টোপথে অনুভব করেন, ‘বিষে-বিষে, জরায়ণে, উদ্বোধন, অমৃতের বা একটি দেশের’ (অভীপ্সা)

যেন এই নাশ এই দংশন সূচনা করে নতুন কালের। যেন-বা রবীন্দ্রনাথের সেই, ‘অন্ধকারের উৎসব হতে উৎসারিত আলো’ দেখার আনন্দ!

লখাইয়ের প্রতি বেহুলার আর্তি :

‘স্বপ্ন তবে বিষসিক্ত মণিমুক্তো দিয়ে গড়া নানাবর্ণ খচিত আগ্নেয়গিরি,
জ্বালামুখে তুৃমি-আমি রচনা করেছি আজ রাতে বাসরে শয়ান!’
(স্বপ্ন)

এমনই দহনের জীবনভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিল তারা। স্বপ্নের এমন পরিচয় কোথায় মিলেছে এই মতো আর!

এ লখাই অবনত জীবনের অন্তর্মুখী আত্মরতিকাল থেকে বেহুলার স্পর্ধা, তেজ, ব্রত কিংবা সাহসের জোর নিয়ে উঠে দাঁড়াতে চায়।

‘এবার দাঁড়ালে মাথা উঁচু যেন ভেদ করে যাবে অবরুদ্ধ ছাদের সীমানা’
বেহুলা যখন বাসর ঘরে প্রবেশ করে মুক্ত করে দিল ‘চুল বেণীর বন্ধন থেকে হাওয়ায়-হাওয়ায়
দীপ্তিমান আগুনের ফুলকি জ্বলে ওঠে, ছড়িয়ে পড়েছে দিকে-দিকে
তবে না পুড়িয়ে ফেলবে জঞ্জালের স্তূপ পরিত্যক্ত খোলস সাপের,’

যখন সে ‘আলগা করে স্কন্ধের সে গিঁট, তেজারতি, ঔপনিবেশিক ভার, অচল অস্তিত্ব,’ তখনই যেন ‘মানুষের বলীয়ান কণ্ঠস্বরে সমারোহে ভরে উঠবে সমাজ সংসার’।

আহ্! প্রেমের স্পর্ধার বুঝি এমনই জোর। লোহার কপাট দিয়ে অর্থহীন ছলনার পাহারা বসিয়ে প্রেম, স্বপ্ন, সাধ, জীবনের অবাধ্য বাসনাকে শৃঙ্খলিত করে মরার আগেই মৃতবৎ রাখার কাপুরুষতাকে পরিত্যাজ্য মনে করছে এবার লখাই, বলে :

‘এবার বেহুলা তবে খুলে দাও লোহার কপাট, ফের দেখি সূর্যমুখ,
শুরু হোক অন্যদিন, জানালা দরজা ভেঙে ফেলা যাক, দুইজনে মিলে,
হাতে-হাতে, হাসিমুখে, ছেড়ে যাই লোহার প্রাসাদ, সেই দিন, দূর হবে অকালের
অভিশাপ…’
(তাই বলে)

কারণ বাংলার শত শত বছরের মাটিলগ্ন জীবনের নিপুণ কারিগর যে নারী, তাকে কবি ইতিহাস ও যাপিত ভূগোলের অলিগলি ধরে চেনেন। তার প্রেম ও দ্রোহের পাঠ তো বেহুলা মহুয়া চন্দ্রাবতীরাই কালে কালে দিয়ে গেছেন। সেজন্য কবি বলে উঠতে পারেন :

‘তোমাতেই অভ্যুত্থান, পাঠ, অনুমান,
স্পর্শে, ঘ্রাণে, খুঁড়ে চলি আমৃত্যু, অক্লান্ত,
মাটি ও জলের সম্মিলন!’
(ফুটে আছে প্রকৃতি নিয়মে)


তার গতি সর্পিল। তার গতি সরলরৈখিক বা একরৈখিক নয়। তাই বাঁকে বাঁকে তার আঁকা হয় পথ, এক অনুভূতির দেয়াল নিমেষে আছড়ে পড়ে অন্য অনুভূতির ঝড়ে।


এই আত্মখননের মধ্য দিয়ে বেঁচে ওঠার আকাঙ্ক্ষার তীব্রতার মাঝেও রিনিঝিনি বাজতে থাকে প্রেমের আকুতি। বেহুলার অনন্তমুখী ভেলায় লাশ হয়ে আকাঙ্ক্ষা তটিনীর দিকে ধাবমান অচেতন জীবনের ভেতর থেকে কবির প্রেমের তীব্রতা বেঁচে থাকে এই কণ্ঠস্বরে :

‘পলি পড়ে, পানি জমে দুই পাড়ে, জোয়ারে ভাটায়
প্রাণেতে প্রাণের টান নিত্য বহমান
তুমি স্রোত, আমি জল, এসো হাতে রাখি হাত,’
(অধিকার)

এ কবিতারই পরিবর্ধন মনে হয় অন্য একটি কবিতার এই পঙ্‌ক্তিতে :

‘গহিন গাঙের দুটি স্রোতে
তোমার-আমার সম্মিলন
এসো তবে জলের অক্ষরে লিখি নাম’
(সম্মিলন)

কোন জল?

তার উত্তর নিজেই দিচ্ছেন আরেকটি কবিতায় :

‘গাঙুড়ের জলে নয়, ভেসে চলি সময়ের স্রোতে,’

পরক্ষণেই চলে আসে কবির অন্য সত্তাটি। প্রেমের হৃদয়ের চিরকালীন টান কিংবা টানাপেড়েনের কৈবল্যে স্বস্তি নেই আধুনিক কবির কিংবা কবিতার। যেমন আফগান কবি ইয়েহুদা আইনরচাই বলেছিলেন যে, কবিতামাত্রই রাজনৈতিক। বলেছিলেন :

I’ve often said that all poetry is political. This is because real poems deal with a human response to reality and politics is part of reality, history in the making. Even if a poet writes about sitting in a glass house drinking tea, it reflects politics.

মোহাম্মদ রফিক তাই বেহুলা লখাইয়ের জীবনের প্রেম কিংবা মিলনের বিপর্যয় ও পরাজয়ের সাথে  মিলিয়ে ফেলেন একটি জাতির রাজনৈতিক বিবমিষা, তার সাংস্কৃতিক সংকট সবকিছুকে। বলে ওঠেন পরের লাইনেই :

‘কালে-কালে, পচন ধরেছে মেদে-মাংসে
মেধায়, ধ্যানে ও সহবাসে,
ক্ষয়ে-ক্ষয়ে, টুপটাপ ঝরে পড়ে
গিলে নেয় ভিনদেশি মৎস্যকুল
এ-নদীর নয় তারা সাগর পেরিয়ে আসে
চোখে-মুখে ক্রোধ-হিংসা রুগ্‌ণতা প্রোজ্জ্বল,
(ভেলা ভাসাবার পর)

এও তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ঘাটে ঘাটে বেহুলাকে যেমন নদীবর্তী ভিলেনের মুহুর্মুহু মোকাবেলা করতে হয়েছে, এখানে তা নয়, এরা আরও দূর দূর থেকে আসে। সাগর পেরিয়ে আসে তারা।

সাম্রাজ্যবাদের ইশারাই তিনি রাখলেন। এখনও জীবন বিপন্ন, এখনও বিপন্ন প্রেম প্রকৃত মানুষের, অন্তরে আত্মার মিলন সম্ভব নয় আর, এখন সে দৈব বা নিয়তি নয়, এখন ভিনদেশি আগ্রাসন।

এভাবেই প্রেমের আক্ষেপ, না-পাওয়ার যন্ত্রণা, গ্লানি, ক্ষোভ, দ্রোহ সবকিছু এই সময়ের এক ব্যক্তি-মানুষের এক কবির সত্তার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে বেঁধে এগোতে থাকে। তার গতি সর্পিল। তার গতি সরলরৈখিক বা একরৈখিক নয়। তাই বাঁকে বাঁকে তার আঁকা হয় পথ, এক অনুভূতির দেয়াল নিমেষে আছড়ে পড়ে অন্য অনুভূতির ঝড়ে। সেজন্যই কণ্ঠস্বরে ফের আসে প্রেমের আত্মপক্ষ সমর্থন ও শত্রুকে দোষারোপের নিষ্পাপ বয়ান।

‘আমি তো তোমার স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন কামনার
এইভাবে পরস্পর রচনা করেছি এক-জীবনের কিংবদন্তি, ইতিহাস
সর্পদেব ঢুকে পড়ে অনাহুত, অযাচিত;’
(স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন)

সর্পদেবই যত সর্বনাশের মূল। কিন্তু যে লাশ সামনে নিয়ে বসে আছে বেহুলা, এবার লখাই-ভর-করা কবি তাকে জানাচ্ছেন, আদতে তার মৃত্যু বেহুলারই গহ্বরে।

‘তুমি তো জানলে না,
মৃত্যু হলো তোমার গহ্বরে’

সত্যিই তো! বেহুলার প্রেমযৌনক্রোড়ই তো লখাইয়ের মরণগহ্বর।
যেখানে

‘ধানবীজ ঢাকা পড়ে থাকে মাটির গভীরে,
হালের আঘাত লেগে জেগে ওঠে ফের, খোসা মেলে ধরে,
তোমার ওষ্ঠের তাপে খুলে যায় আমার দু-দুটি ঠোঁট।’

আর লখাই জানে, যে আশ্রয়ে মাথা রেখে মৃত্যুকে বরণ করতে হলো তার, সে আশ্রয় কখনো বানে ভেসে যাওয়ার নয়, ঝড়ে ভেঙে পড়ার নয়, অগ্নিদাহে পুড়ে যাওয়ার নয়; কারণ সে আশ্রয়ের নাম নারী, বাংলার ইতিহাসে সেই নারী তার প্রেমের জন্য ভালোবাসার জন্য আপন মানুষকে নিজ করে পাওয়ার জন্য প্রাণান্ত সংগ্রাম করে গেছে। এজন্যই তিনি বলছেন :

‘তুমি নারী, পরাজয়, নিপীড়ন মানো নি কখনো!’ (গহ্বর)

বাংলার কবিই তো শুধু নন, সেই দূর পাশ্চাত্যের ভার্জিনিয়া উলফ নামের এক কবিও তো একই সুরে বলেছেন, প্রেমই নারীর সম্পূর্ণ অস্তিত্ব। (‘খড়াব, ‘the poet said, is woman’s whole existence.’ সে-প্রেমের জন্য সর্বস্ব নিয়ে দাঁড়াতে পিছপা নয় নারী।

এখানে পুরুষই যেন স্থির, নাজুক, তৎপর, বেগবান; দুর্বিনীত নারী, যেন প্রচল বয়ানের এক উলটো লিঙ্গীয় ডিসকোর্স, খুঁজে নিচ্ছে নতুন পয়েটিক ডিকশন :

আমি তীর, তুমি জলস্রোত, ছুঁয়ে বসে আছি তোমার শরীরে গতিধারা, ধুকপুক;
(হে নদী)

মৃত্যুদংশিত নিজপুরুষকে বাঁচাবে বলে ভেলা ভাসিয়েছিল বেহুলা। কিন্তু লখিন্দরের ভাব-বেশ ধরে কবি এক্ষণে জানাচ্ছেন, এ যাত্রায় বেহুলা নিষ্ফল হবে। এ কেবল দৈব বা সর্পের ক্ষোভ কিবা চক্রান্ত নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘকালের মানবিক অভিশাপ। আগেই বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে সে-কথা। যে অভিশাপের দায় বয়ে নিতে হচ্ছে এক লখিন্দরকে। ইতিহাস তো এমনই। ইতিহাসে কাউকে না কাউকে বইতেই হয় পূর্বপুরুষদের সকল কর্মের দায়ভার। এজন্য এবার লখাই-আত্ম কবি বেহুলাকে ভেলা থেকে নেমে আসতে বলছে।

‘যদি-বা সম্ভব হয়
নেমে যাও ভেলা থেকে, সাঁতরে ওঠো দূর তীরে,
আমার শরীর বিষে ভরা, অভিশপ্ত
পাঁচ আঙুলের নখ কালো হয়ে গেছে নীল বিষে,

নিয়তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি,
ওই দেখো, ছায়া-রোদ যেন প্রতিশোধ মন্ত্রে উজ্জীবিত,
দিগন্ত কাঁপিয়ে, যেন ধিক্কার জানায় ক্রোধে,
অধীর আক্রোশে জ্বলে যায়, দিকচিহ্নহীন;

বহু পাপ, স্খলন অন্যায় ত্রুটি, জমে আছে বংশধারা বেয়ে,
ডেকে ডেকে ইতিহাস হয়েছে বধির, দিই নাই সাড়া,
সঠিক সময়ে, লালসায় পুড়ে গেছে বন-বনান্তর, গ্রাম-গঞ্জ থেকে
স্বজনের মড়া কাঁধে নিয়ে ফিরে গেছে আত্মজন;’
(মুহূর্তের অবশেষ)

এবার লখাই হয়ে যায় আত্মরতিমগ্ন পুরুষের একজন, সময়কে বুঝতে চায় নি যে, রুখে দাঁড়ায় নি ঘটমান অন্যায়ের। সবকিছু স’য়ে স’য়ে চোখ বুজে গেছে। সুতরাং এই পরিণাম থেকে মুক্তি নাই আর। আর কতই-না সমসাময়িক হয়ে উঠল সেই ভাষ্য। সেজন্যই এক কবি বলেছিলেন প্রকৃত কবিতা ক্লাসিক হয়েও সমসাময়িক। কবিতার এই লখিন্দর অন্যরূপ। সে নির্দ্বিধায় জ্বলন্ত ইতিহাসের আগুনে নিজেকে দগ্ধ করে ফেলতে পারে। বলতে পারে :

‘মৃত মানুষেরে তুমি জাগিয়ে দিয়েছ,
মরেই ছিলাম আমি এতকাল
কী ক্ষতি-বা করবে সাপ, নিঃসাড় নিস্তেজ দেহে-মনে বিষ ঢেলে,’

তাই তো! লখিন্দর, তথাকথিত নপুংসক, কোনোদিন যুঝে নাই মনসা কি শিবের পূজাবিলাসের অঙ্ক, শাসন কি শোষণের কোনো রূপ হয়ে আছে তার অচেনাই। মরে ছিল। চোখ বন্ধ করে ছিল সে বাস্তবতা থেকে। শঙ্কা আর জিঘাংসা হিংসার রাজনীতি দৈবের ছল ধরে সকল সময়ই পথ রুদ্ধ করেছে প্রেমের, বিবেকের, শান্তির, মিলনের। সাপ কামড় না দিলে চেনা তো হতো না বেহুলারও ঘাটে ঘাটে জীবনের নিষ্ঠুরতার রূপ। মৃত লখাইয়ের সূত্র ধরে বেহুলার জীবন জেনেছে কেমন মৃত্যুময় প্রতিটি আয়ুকণা তার। ধীরে ধীরে কবিতাটি হয়ে ওঠে আমাদের রাষ্ট্র কি সমাজের সকল ব্যর্থতার দলিল। কবি লখাইয়ের সূত্র নিয়ে বলে চলে :

‘পারি নি জ্বালাতে, উসকে দিতে শিখা সময়ের দাবি মেনে
প্রতারক ঠাঁই-ঠিকানার পাই নি নিশানা দিক-নির্দেশনা
সম্পদের পাহাড় শুধু তো ক্লান্তি, নিরানন্দ জন্ম দেয়

অবসন্ন মস্তিষ্কে-চৈতন্যে ধরে ঘুণ
শুধু কুরে-কুরে খায় ব্যর্থতার দুঃস্বপ্ন ও দুরাচার
চেপে বসে, ক্রমে-ক্রমে জনশূন্য মেধাশূন্য ভিতর-বাহির;’

একটি রাজ্যের কী দেশের কী রাষ্ট্রের চিন্তন মনন সবকিছুর অন্তঃসারশূন্যতা যেন এক লখাইয়ের পরমমুহূর্তের নিশিব্যর্থতার কারণ হিশেবে প্রতীকায়িত হয়।

‘মেলাতে পারি নি আমি স্বদেশ-আবিশ্ব-ভূমণ্ডল
কী করে-বা বইয়ে দেবো পদ্মা-মেঘনায় টেমস বা রাইনের স্রোত
সে গুড়ে তো বালি পড়ে গেছে কোন কালে’

যেন রবীন্দ্রনাথের সেইা বাণীর অসারতা :
‘আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ
তাহারই মাঝখানে আমি
পেয়েছি মোর স্থান।’

এ আমাদের শিল্পচিন্তার দীনতাকেও যেন বিদ্রূপ করল।

পুরো কবিতায় এবার রাখ-ঢাক ছেড়ে প্রকট হয়ে ওঠে আমাদের শোষণের গোলামির ক্রম-অন্ধত্বের ইতিহাস।

‘আমার জন্মের পূর্বে যে হাটে বসেছে মেলা
চলেছে ঠকিয়ে খাওয়া দুরাচার তেজারতি দোলাচল
এখনো থামে নি, দিনে-দিনে বেড়ে গেছে শতগুণে’

আর ব্যর্থ, নপুংসক জনমানুষের ধিক্কার।

‘বিমুখ বিরস মানুষের ঢল ফিরে চলে গৃহপানে
শূন্য হাতে, অবনত মস্তক, মাটিতে মিশে গেছে,
শিরদাঁড়া, হাতড়ে দেখা যায়, পঙ্গু, পঙ্গু, শুধুই মাংসের ডেলা’

ফিরে পাওয়ার আকুতি, শেকড়ের দিকে চোখ দেয়ার চেষ্টা:
‘নিজেকে হারিয়ে নিজে খুঁজে ফিরি স্বদেশে স্বগৃহে
আপন সত্তার অধিকার রাজ-রাজত্ব রাজধানী,
দেখি, কবে খোয়া গেছে স্বর্ণকান্তি প্রাণের মন্দির’

এবার বেহুলাকে, নারীকে পুরুষ, (রাষ্ট্র শেষত যেহেতু পুরুষতান্ত্রিকই, পুরুষই তার কলকাঠি নাড়ে, পুরুষের চক্ষু দিয়ে দেখা হয় রাষ্ট্রজলছবি, তাই ব্যর্থতার দায় এখনো এ সমাজে রাষ্ট্রে পুরুষেরই, হয়তো-বা) লখিন্দর বয়ান করে, পলায়নের আশ্রয় হিসেবেক। প্রেম, যৌনতা, ক্ষণিকের মিলন এবার হয়ে ওঠে তার সকল পরাজয়ের গ্লানি ভোলার ওষুধ (নাকি আফিম?)।

‘অবশেষে পেয়েছি তোমারে হয়তো ক্ষণিকের প্রয়োজনে
ধীরে, অতি ধীরে, খুলে ফেলছি আবরণ-আভরণ, অন্তর্বাস
তোমার অসীম নগ্নতার অগ্নিদহে ডুবে গিয়ে’

তবে প্রচলিত সেই কামযজ্ঞে ক্ষণিকমুক্তির শরীরী চেতনার কাব্যিকতা এমন লখাই-আত্ম কবি শেষত মানবেন না জানি। তাই বলেন, এমন নিশ্চিন্তির সামান্য সুখের কালে বিঘ্ন হয়ে ঢোকে যে সাপ, সে-ই তো ঘটাবে সংস্কৃতির আপন সৃষ্টির উদ্বোধন। কারণ মানুষ তো দেয়ালে পিঠ ঠেকলেই ঘুরে দাঁড়াবে। দংশিত হলেই তো প্রেম মানবতা বিবেক একবার নড়ে চড়ে উঠবে অন্তিম সম্বলটুকু বাঁচাবার তাগিদে।

বেহুলা আর মহুয়ার কাহিনির স্থান-কাল-পাত্র-ভেদ থাকলেও এর ভাবগত ঐক্য আছে। বেহুলা লখিন্দরকে হারায় বিবাহের রাতেই, কিন্তু মৃত স্বামীকে জীবিত করে তোলার সংকল্প নিয়ে বেহুলা ঘাট থেকে ঘাটে পাড়ি দেয়। মুখোমুখি হয় লোলুপ নিষ্ঠুর নৃশংস নানান চরিত্রের, যারা তার প্রেমাতুর আর্তনাদের দুর্বলতার সুযোগ নেয়। উলটো তাকে ভোগ করতে চায়। এবং একটা সময় বেহুলাকে স্বর্গের ইন্দ্রদেবের সভায় নগ্ন হয়ে নেচে-নেচে তার স্বামীর প্রাণ ফিরে পাওয়ার লড়াই করতে হয়। বেহুলার আখ্যানগত সংকট অনেকটাই গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো, যেখানে মানুষের জীবন নিয়তির কাছে বাঁধা পড়ে থাকে। আর সেখানে ক্ষমতার দাপট নিয়েই বাঁধে যত গোলযোগ। লখিন্দরের প্রতি মনসার আক্রোশ তার বাপ চাঁদ সদাগরের জন্য, যে চাঁদ মনসাকে পূজা না করে শিবকে পূজা দিয়ে থাকে। তারই প্রতিহিংসার ফল লখিন্দরের সর্পদংশন।


আখ্যানের জগৎকে বর্তমানের উপলব্ধির কুঠারে বল্লমে ছিন্নভিন্ন করে অন্তরের মগজের বোঝা কি চেনার জটিল রসায়ন ফেঁদে-ফেলা কবি যেন এই সহজ কিন্তু নির্মম সত্যটি হয়তো-বা বুঝে ফেলেন।


অন্যদিকে মহুয়া মূলত শ্রেণিদ্বন্দ্বের কিংবা শ্রেণি-অভিমানের আখ্যান। বেদের কন্যা মহুয়াকে যে উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণ নদের চাঁদ ঠাকুর ভালোবেসে ফেলে, এটাই আখ্যানের মূল সংকট। সেখানে নদের চাঁদ শ্রেণি-উচ্চ জায়গায় থাকার কারণে মহুয়াকে নিজের মতো করে নিতে চায়। কিন্তু হুমরা বেদের কাছে এটা শ্রেণিগত হেজিমনির প্রশ্ন। এবং একটা ইনসিকিউরিটি কমপ্লেক্স বা সত্তা-সংকট স্বভাবতই নদের চাঁদকে বিশ্বাস করতে তার মন সায় দেয় না। কিন্তু বেহুলার মতো এই অর্থে মহুয়াও তার প্রাণের মানুষকে নিয়ে পাড়ি দেয় অজানার উদ্দেশ্যে। পরবর্তীকালে হুমরা বেদে তাদের পায়। বেহুলার মতোই মহুয়া নদের চাঁদকে নিয়ে পাড়ি দেবার পথে অনেক আগ্রাসী কুৎসিতজনের দেখা পায়, যারা তাকে ভোগ করতে চায়। শত প্রলোভন বিঘ্নকে হটিয়েও শেষ পর্যন্ত মহুয়া পায় না তার প্রেমের পরিণয়। হুমরা বেদের দল তাদেরকে ধরে ফেলে। হুমরা মহুয়াকে নির্দেশ দেয় সে যেন নদের চাঁদকে ছলনা করে বিষ খাওয়ায়। সেই বিষ খায় মহুয়া। আর নদের চাঁদকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয় হুমরা বেদের হাতে।

সেজন্য বেহুলার দীর্ঘ যাত্রার অন্তর বাহিরের শতেক আন্দোলন অমীমাংসা অম্ল মধুর স্বাদ নিতে নিতে কবি যখন মহুয়ার আখ্যানঘাটে প্রবেশ করেন, তখন একটা ক্ষুদ্র বিবৃতিই হয়ে ওঠে তার আপন উপলব্ধি :

‘ভালোবাসা’ শব্দটির গায়ে
কিছু রক্তমাংস লেগে থাকে’
(মুক্তিপণ/ সে ছিল বেদেনি)

ততক্ষণে আখ্যানের জগৎকে বর্তমানের উপলব্ধির কুঠারে বল্লমে ছিন্নভিন্ন করে অন্তরের মগজের বোঝা কি চেনার জটিল রসায়ন ফেঁদে-ফেলা কবি যেন এই সহজ কিন্তু নির্মম সত্যটি হয়তো-বা বুঝে ফেলেন। ভালোবাসা তেমনই কঠিন। তেমনই সংঘাত আর মোকাবেলাময়। তারপরেই আরেকটি সত্য। আরেকটি প্রশ্ন :

‘নামগোত্রহীন আনমনে ফেলে-যাওয়া আলতো স্পর্শ
সহসাই জ্বলে ওঠে ত্বকের গভীরে,
তবে ঝরে-পড়া পাতা চেনে কি বৃক্ষকে, হয়তো শাখা মনে রাখে!’
(যদিও-বা)

প্রেমের শ্লাঘাই এখানে অভিমানে এসেছে। ফের সেই লখাইয়ের মতো কবি এইবার নদ্যার চাঁদকে মিলিয়ে নেবার প্রয়াস নেন নিজের সত্তার সাথে, যে সত্তাটি ‘অন্ধকার, অনাচার, নিরর্থক আত্মহননের কামাতুর বেলেল্লা উৎসব’ আর ‘আত্মপীড়নের’ মধ্য দিয়ে নিজেকে অবদমিত করতে করতে নিয়ে এসেছে নতজানু সময়ের কাছে। নদ্যার চাঁদের মতো কবির ‘বিষয় আশয় বড় ক্লান্তিকর ঘোর,’ সে এসব থেকে মুক্তি চায়, সে ‘নিজের কাহিনি নিজে রচনা করেছ অতঃপর’। কাব্য তো কবিরই অটোবায়োগ্রাফি। এ অর্থে নদ্যার চাঁদকে উদ্দিষ্ট করে আদতে নিজেকেই নিজে বলেন কবি :

‘তোমাকে যেতেই হতো, পথ ভেঙে, জলের কিনারে
যেখানে অচিন স্বরে কথা কয়, বেনালতাগুল্ম, তৃণ,
বউ পাখি, কলসি কাঁখে হেঁটে চলে নৃত্যের মুদ্রায়,
বহুচেনা মদির আয়াসে কথকতা কোন সুদূরের’
(মুক্তিপণ)

লখাই কি নদের চাঁদ অথবা বেহুলা-মহয়া, সকলের এই নিরন্তর অবদমনের যাতনার অভিমানের পরাজিত এ জীবন সবসময়ই পেয়ে এসেছে বাধার প্রাচীর। তৃতীয় বিশ্বের মানুষের মন, তার সাধ, আকাঙ্ক্ষা কোনো না কোনো সংস্কারের প্রথার বাধার চোখরাঙানিতে তটস্থ। মুক্তি মেলে নাকো। এজন্য—

‘লতাফুল ডেকে ওঠে, আমাকে চুম্বন দাও চাঁদ
বৃক্ষ বলে, আমি পথ আগলে আছি,’
(ইতিকথার পরের কথা)

নদের চাঁদের বিরহ যাতনাকে আপন শরীরের কাঁটা করে বিঁধিয়ে নিতে নিতে সহসা যেন কবি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন, বিবৃত করেন, তার চাওয়ার কোনো প্রাপ্তি হবে না এ জীবনে, রবীন্দ্রনাথের কর্ণের সেই উক্তির মতো (‘আমি র’ব নিষ্ফলের হতাশের দলে’) বলেন :

‘কী-বা স্বপ্ন লেখা থাকে ঠোঁটে চোখে মুখে ত্বকে
কোনো-এক দূরদেশি ভোরে,
কোনোদিন পাব না তোমাকে, হায় রাত্রি, হায় দিন,
খুনি বেইদ্যা, বেইদ্যার দঙ্গল, সব সমাজশাসক,
লুটেরা বণিক, মধ্যস্বত্বভোগী দালাল ফড়িয়া, উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী
লোভ ও লালসা, জ্বলে রক্তচক্ষু, প্রচার-জগৎ

কোনোদিন পাব না তোমাকে, ওই সত্য ভনে চলে
রূপকথা, উপকথা, গীতিকা-কাহিনি, ফুল ফোটে, ঝরে যায়
কী-বা এসে যায়, ওই আকাশ-হাওয়ায়
নাও নিয়ে বসে আছে ঘাটে-ঘাটে অসাধু চামার কুলপতি
জাহাজের খোলে-খোলে, বস্তাবন্দি লাশ, জমা পড়ে
হায়রে ময়ূরপঙ্খি, দরিয়ার ঢেউয়ে-ঢেউয়ে মানুষের হাড়,
ছেঁড়া তন্ত্রী, হৃৎপিণ্ড হৃদয়, হায় নদ্যা-মহুয়ার ধড়,’
(অশেষ , অবশেষ)

এখানে শত্রুমিত্র ভেদ যেন লুপ্ত হয়ে যায়। সমকালীন সকল পক্ষ বিপক্ষ লুপ্ত হয়ে চিরকতালের অনিবার্য ট্যাবু যেন সামনে দাঁড়িয়ে যায় কবির। সকলেই মানুষের অনুভূতির সংবেদনের নাশ করে করে আপন আপন অস্তিত্ব চরিত্র বা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তৎপর।তাই তিনি জেনে নেন ‘ওই সত্য’, কোনোদিন পাবে না তোমাকে :

‘হাতে স্বেদ, মুখে লালা,
কাহিনি, কাঠামো-অভ্যন্তর, ঘর, ঘরের ভিতরে ঘর,
শিল্প ও সাহিত্য, স্বপ্ন, দীর্ঘশ্বাস, নান্দনিক বোধ,
নির্যাতিত, নিপীড়িত দুটি ছায়া, কায়াহীন ছায়া,
ছায়া-ছায়া, মানুষের কঙ্কালের, হাঁটে
হেঁটে যায়, পায়ে-পায়ে, দীর্ঘপায়ে,
মাঠ-ঘাট, পেরিয়ে প্রান্তর, তেপান্তর,
ভেঙে পড়ে সকল কাঠামো কালান্তক দানবের’

কবি তো কেবল অরূপের সাধক নয়। রূপের ভেতর দিয়েই তাকে খুঁজে নিতে হয় অরূপরতনের সন্ধান। তাই শরীরী মাংসের অবয়বের ভেতরেও তার খুঁজতে হয় জীবনের দর্শনের চমকি প্রতীক, দেখে :

‘খাঁচা ভেঙে, মাংসে-গড়া দুটি পাখি, ডানা ঝাপটায়
উড়ে যায়, অন্তহীনতায়
(কেমনে আসে যায়)

কিন্তু শরীরের বন্ধন থেকে শ্বাসের আগল ছিঁড়ে সীমানার প্রাচীর ভেঙে মুক্তি খোঁজা প্রাণী কি শেষত পাবে মুক্তির সন্ধান? সংশয়! প্রশ্ন করে :

‘ওগো পরিযায়ী পাখি, বাঁধবে নীড় কোন লোকালয়ে
সেখানে কি বন্দুকের টোটা কথা বলে অন্যস্বরে,
ধোঁয়া ও সিসার নয়, বাতাসের, পুষ্পের, পাপড়ির;’
(কেমনে আসে যায়)

তারপর সহসাই প্রেমাখ্যানের কৈবল্য থেকে হাত পা ছুড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন কবি, এবার দিগ্বিদিক মানুষের বেঁচে থাকার ইশারার সন্ধানে, ঝটিকায় জানিয়ে দেন, বেঁচে উঠবার পথ, ইতিহাস ঐতিহ্য নিজের স্বকীয় জীবনের জনপদের রেখা বাঁক ধরে যাত্রা করলেই পাওয়া যাবে বাঁচার উপায়, বলেন :

‘পালাও, পালাও, অতি দ্রুত
ময়মনসিংহ গীতিকার
পথ ধরে, এখনই বেরিয়ে পড়ো,
যদি বাঁচতে চাও, শ্বাস নিতে’
কারণ
‘ধেয়ে আসে বিগত শতাব্দী
লালাসিক্ত বধির হুংকার
লোভ-লালসার রক্ত-ফাঁদ
কিমাকার অস্থির সময়’

অতীতের সকল সংঘাত রিরংসা মানবিক অধঃপতন নতুন করে ধেয়ে আসছে। মানুষকে পশ্চাতে টানছে।

‘প্রতারক নান্দনিক অভিযান
অবক্ষয়, নির্বেদ, বিচ্ছেদ,
জন-সংহতির অভিশপ্ত বোধ
ধার করা হা-হুতাশ, চিন্তন-চেতনা’

আমাদের ঔপনিবেশিক মন কি মননের শিল্পবীক্ষাকে শ্লেষ করলেন কবি। আমাদের নাগরিক বিচ্ছিন্নতার শেকড়চ্যুত একাকিত্বের মেকি হা-হুতাশকে কটাক্ষ করলেন।

কিন্তু এও সত্য,
‘দুয়ের আকাঙ্ক্ষা বীজ বোনে
সংসারের খেতে ও প্রান্তরে
ওষ্ঠে-ওষ্ঠে ফলে ধানগুচ্ছ
মাতোয়ারা বাতাস সুঘ্রাণে,

প্রাণে-প্রাণে করতালি বাজে
আগুয়ান, ধরো হাতিয়ার
উপড়ে ফেলো প্রথার বিন্যাস
অপূর্ব সৃষ্টির মুদ্রা, নৃত্যতালে

প্রলম্বিত বিপুল ঝঙ্কারে
যে-ভাবে যায় না ধরা চোখ
বুকে-বুকে ভাঙা ঢেউমালা
শব্দ থেকে নিঃশব্দের ঘোর,’

একই সঙ্গে শরবিদ্ধ প্রেমিক-পুরুষ এবার হৃদয়ের প্রেম ও মিলনের আকুতির ডোর ছিন্ন করে মানুষের সর্বমানবিক মুক্তির তৎপরতার কথা বলেন। একই সাথে শিল্পরচনার কৌশলও যেন বাৎলে দিলেন। বলেন, বানে ভেসে যাবে—

‘যা-কিছু অন্যায়, চেপে-বসা,
ইনিয়ে-বিনিয়ে ছলকথা,
শোষকের শাসনের ভারে
ধসে যাওয়া শিল্পের প্রতিমা,’

শাসকের শোষকের পা-চাটা বুদ্ধিবৃত্তির প্রতিবাদ করলেন সরাসরিই। একমাত্র দুজনের (এই দুজন তো বেহুলা-লখাই কিংবা মহুয়া-নদের চাঁদ, যারা কিছু নয় প্রেম চেয়েছিল, অন্তর-আত্মার মিলন চেয়েছিল, নিয়তি কি মৃত্যুর চক্রান্তের জাল ছিঁড়ে-ছুড়ে) প্রসঙ্গে কালজয়ের বাণী এনেছেন। বলছেন—

‘দুজনের নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে
লেখা হোক কালের কাহিনি’

স্বপ্ন দেখেন, এবার

‘মুক্ত হবে বিমুক্ত নন্দন
বোধ-বোধি চৈতন্য-চেতনা
…..
মুক্ত হবে মুক্ত মানুষের
বিমুক্ত কবিতা’

আর শেষাবধি
‘জয় হবে মানুষের জয়’

মানুষের জয়েই তো লেখা থাকে বেহুলা-লখাই কিংবা মহুয়া-নদের চাঁদের জয়ের খোয়াবনামা। রবীন্দ্রনাথও তো মনে করিয়ে দিয়েছিলেন :

অতীতকাল যত বড় কালই হ’ক নিজের সম্বন্ধে বর্তমান কালের একটা স্পর্ধা থাকা উচিত। মনে থাকা উচিত তার মধ্যে জয় করবার শক্তি আছে।

তবু সেই জয়টিকা সহজে কি মেলে কপালে—শিল্পীর, মানুষের, জীবনের? কেন-না, দিনে দিনে পৃথিবীর অন্দরে সদরে সাজানো হয়েছে শতবীজ, নানা ছলনার।

‘আড়ি পেতে আছে হাওয়া, যদি খসে পড়ে একটি পাতা
অকালে ফলন হলে কোনো বৃক্ষে, যদি ফোটে ফুল, বেশরম
সুবাস বিলায়, জলে-জলে, তবে রক্ষা নেই, কুলটা অচ্ছুৎ,

বিচারের দণ্ড ধরে আছে পুরুষশাসিত ইতিহাস, এমনকি প্রকৃতিও।’
(অমর বিবাহ)

তবু মহুয়া শোধ করে যায় ‘সব কলঙ্কের দায়, সাহসিকা’, আপন প্রাণের বিসর্জনে।

এই দ্রোহী নারীকে কবি করে তুলতে চায় আগামীর জেগে ওঠা চেতনার শক্তি, বলেন :

‘তুমি জাগো, জেগে থাকো, ঘরে-ঘরে সাঁঝপ্রদীপের আলো,
সন্ধ্যামণি ফুলে-ফুলে ছেয়ে যাবে অচেতন-চেতনায় তোমার শরীর,
(অমর বিবাহ)


মিথের ভেতর থেকে কেবল পুরাণের বা লোকায়তের প্রসঙ্গকে আপ্ত করে নয়, পুরাণের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নিজের সমস্ত বর্তমান, তার আত্মা, তার শরীর, বাসনা সবকিছুকে খুঁজে বুঝে এবং যুঝে মোহাম্মদ রফিক আধুনিক কালের এই (মহা) কাব্যদ্বয় রচনা করলেন। 


কেন-না এই প্রেমমতি, এই বক্ষ-উজার ভালোবাসার রক্তরাঙা মানবীই জীবনের ন্যুব্জতাকে সব-মেনে-নেয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় মৃত্যুকে স্বেচ্ছাধীন করে, সে-নারীর মাটি-জল-নদীবর্তী জীবনের শরীরী উপমেয় হবার ব্যঞ্জনা করেন কবি :

‘নদী ছেড়ে এসেছে (শব্দটি ‘এসেছ’ হবে বোধ করি) ডাঙায়,
নদী কিন্তু ছাড়ে নি তোমাকে,
পায়ে-পায়ে, পদশব্দে জলের ঘুঙুর
মেরুদণ্ড বেয়ে অতি সংগোপনে
এক-একটি বাঁক ওই চোখ মেলে নিতম্ব দোলায়,
শাড়ির আঁচল ছেয়ে দু-পাড়ের ধানখেত
ছায়া দেয় দু-স্তনের খাঁজে দোল খায়
মৃদু সমীরণে; যেন ঢেউ ও তীরের কথামালা
মূর্ত হলো ফুটি-ফুটি ঘাসফুল তোমার শরীরে…’
(খেলা)

প্রেমই সেই সর্বস্বত্বদায়ী। পাবলো নেরুদা যেমন বলেছিলেন :

I love you as certain dark things are to be loved, in secret, between the shadow and the soul.

মহুয়ার আত্মাহুতি লিখে দিল আরেক ইতিহাস। সে ইতিহাস জীবনকে কেবল শ্বাসবৎ জৈবিক পরিচয়ে না-বাঁধবার, তার স্বাধীন চেতনার অভ্যুদয়ের আকাঙ্ক্ষারও :

তাই মহুয়ার ‘দু-ঠোঁট থেকে
ঝরে পড়ল ফোঁটা-ফোঁটা আলো, জল,’
তখনই নদের চাঁদ কিংবা কবি তার সাথে দাঁড়িয়ে পড়েন,
‘ইতিহাস-সমাজের মুখোমুখি’
‘রক্তে-রক্তে লিখে যাবে পরিণাম,’
(ইতিহাস)

মহুয়া বা নারী নয়, নির্ধারিত প্রেমিকাও নয় কারও, যেন সে আশা, আকাঙ্ক্ষা-বাসনা জীবনের ‘এক ঝাপটা হাওয়ার মতন’

‘ছড়িয়ে-ছিটিয়ে জলে-জলে ঢেউয়ের ওপর
চাঁদ নয়, চাঁদের কিরণ, তাও মেঘ-ভাঙা
আশা নয়, আশার মতন
ভাষা নয়, ভাষার নিঃস্বন’
(বিশ্বময়)

যেন-বা দেশ-রাষ্ট্রের নব্য ঔপনিবেশিক অবসাদ ও বিবমিষার কালে ডুবু-ডুবু জীবনের নৈরাশ্যে মহুয়া কী বেহুলার এই কাব্য-আখ্যানের ভেতর থেকে শক্তি খুঁজে পাওয়ার ঐতিহ্যগত প্রেরণার গর্বের জায়গাটিকে চিহ্নিত করেন কবি (জার্মান কবি রিলকে যে বলেছিলেন :

The purpose of life is to be defeated by greater and greater things

তার অর্থ এই পরাজয়ের বেদনাকে শিল্পে বিনির্মাণ করার স্পৃহাকেই খানিকটা নির্দেশ করে; আর অন্য অর্থে মহুয়ার কাহিনির এই মর্মবিস্তারি নব্যকাব্যপ্রকরণই তো এক অর্থে খুলে দিল বাংলার শিল্প কি কবিতার নতুন যাত্রার মুক্তির সনদ।

কারণ আপন সত্তার অধিকার তো এই ঐতিহ্য ও ইতিহাসের রক্তাক্ত হৃদয়ই আন্দোলনে আন্দোলনে সচল করে তোলে :

তুমি তবে ভূ-মণ্ডল, কালান্তরে, স্বাধীন চেতনা,
আমি বন্দি, জলজ ভূগোলে, সীমাবদ্ধ কালে,
তোমাতে নিশ্বাস নিলে বেঁচে যাই
খুঁজে পাই, আপন সত্তার অধিকার
(যৌথ উত্থান)

যে ‘নদী আপন বেগে পাগল পারা’, সেই নদী, সেই জলস্রোত, গতি, সঞ্চরণশীলতা, সেই নদীই আমাদের জনপদের জীবনের প্রেরণা..

‘তোমাতে-আমাতে নদী এক বহমান দিগন্তে বিলীন
নদীর আওয়াজ পাই রাতের গভীরে, মধ্যযামে
আমি যে তোমার কবি, তার অর্থ নেই কোনো, জানি,
একটি উন্মাতাল স্রোতে টেনে নিয়ে যায় রহস্যে, আন্ধারে’

কোন সে স্রোত? প্রশ্ন জাগে।
‘কণ্ঠচেরা আর্দ্র আর্ত শব্দস্রাব ঠাঁই মাপে প্রলয়ের
দেহে-দেহে, ডুবে যেতে যেতে, নৈঃশব্দ্যের পাতালের,
ভয়, শঙ্কা ধরে থাকে মুঠোমুঠো জলরাশি, শূন্যতায়;
একই নদী বহমান তোমাতে-আমাতে, চিরকাল।’
(চিরকাল একই নদী)

কবিতা-অন্তিমে এ নদী তো সে-ই, সমস্ত শরীর মনের বাসনার উচ্ছ্বাস, জলের জোয়ারে জোয়ারে সে তো এক নদীই। কিন্তু শেষাবধি সকল প্রেরণা ও শক্তির সন্ধানের দিকসূত্র নির্ণয়ে কাব্যের নভোচারী কবি ফের ব্যর্থতার ভূমে ফিরে আসেন, বলেন :

‘তুমি-আমি, অভিশাপ বয়ে-বয়ে ফিরি,
লখিন্দর ও বেহুলা, নদ্যা ও মহুয়া, একই কথা,
কিংবদন্তি রূপকথা উপকাহিনির,
এক যুগে একখানে সাপ অন্য যুগে অন্যখানে ছুরি
যুগান্তরে একখানে বিষ যুগে-যুগে অন্যখানে রক্ত
অভিশাপ তবু মুক্ত হয় না কখনো…’
(অভিসার, অভিষেক)

তখন যেন সমকালের দেশ, রাষ্ট্র, বিশ্ব, রাহুর আগ্রাস, অবিচল নঞর্থক বেগ, মানুষের অসহায়ত্ব, প্রেমের সংবেদনের পরিহাস, ব্যর্থতাই দায়ী হয়ে ওঠে।

প্রারম্ভিকায় রবার্ট উইলসনের কথাটির মতোই, মিথের ভেতর থেকে কেবল পুরাণের বা লোকায়তের প্রসঙ্গকে আপ্ত করে নয়, পুরাণের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নিজের সমস্ত বর্তমান, তার আত্মা, তার শরীর, বাসনা সবকিছুকে খুঁজে বুঝে এবং যুঝে মোহাম্মদ রফিক আধুনিক কালের এই (মহা) কাব্যদ্বয় রচনা করলেন। আমাদের সকল মর্মোদ্ধারের লিপিমালার ভাঁজে-খাঁজে প্রেম আর অমর আকাঙ্ক্ষার ঝিনুক ঝিকমিক করে উঠছে, যা সম্ভাব্য উপলব্ধির নবান্ন উৎসব সাজাবে বাংলার কাব্যজমিনে।

শুভাশিস সিনহা

জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৮, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে নাট্যপ্রশিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

ডেকেছিলাম জল (কবিতা)
অক্ষর নতুন করে চিনি (কবিতা)
বেলা দ্বিপ্রহর (কবিতা)
হওয়া না-হওয়ার গান (কবিতা)
দ্বিমনদিশা (কবিতা)
আবছায়াদের রূপকথা (গল্প)
প্রতিরূপকথা (নাটক)
কুলিমানুর ঘুম (উপন্যাস)
ইঞ্জিন (উপন্যাস)
ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ)
রবীন্দ্রনাথ : গ্রামের ছবি (গবেষণা)
মণিপুরি সাহিত্য সংগ্রহ ২খণ্ড (অনুবাদ ও সম্পাদনা)

ই-মেইল : shuvashissinha@yahoo.com