হোম গদ্য হুসাইন বিষয়ে কিছু উপলব্ধি

হুসাইন বিষয়ে কিছু উপলব্ধি

হুসাইন বিষয়ে কিছু উপলব্ধি
162
0

‘হুসাইন শাসক, সম্রাট হুসাইন
ধর্ম হুসাইন, ধর্মের মুক্তিও হুসাইন
মস্তক দেবে তবু না দেবে হস্ত ইয়াজিদের হস্তে
মোক্ষ নেই আল্লাহ ব্যতীত এই সত্যের মূলই হুসাইন’

—খাজা মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতী।

মহররমের যত স্রোত আমাদের জীবনের এবং মরণ থেকে পুনর্জন্ম নেবার প্রান্তর প্লাবিত করে যায় তার মাঝে ইমাম হুসাইন (রা.) অনন্য আলোকদাতা চরিত্র দৃঢ়ভাবে গেঁথে থাকে আমাদের অস্তিত্বের মূলে। কেন হুসাইন? কেমন হুসাইন? তিনি কেমন করে শাসক হয়ে উঠলেন আমদের অন্তরাত্মায় সেই জিজ্ঞাসার জবাবের দিকে এগুতে চাই।

ইমাম হুসাইনের প্রতি আবেগ এবং তাঁকে ঘিরে তাঁর প্রচারিত ধর্ম অনুসারী ও ভিন্ন ধর্মানুসারীদের শ্রদ্ধা জানানোর ইতিহাস বেশ পুরনো, চলমান ও উল্লেখযোগ্য ধারায় বৈচিত্র্যময়। চার্লস ডিকেন্স, টমাস কার্লাইল, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ আরও অনেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হুসাইনের আদর্শ ও ত্যাগকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাদের শ্রদ্ধার মূল বক্তব্য প্রায় এক—বহুর প্রবলতার সামনে অল্পের ঋজুতার গভীর শক্তির প্রকৃতি কী এবং সেই আদর্শ কেমন করে চিরকালীন হয়ে বিজয়ী হয়ে ওঠে—এই বিষয়ে তাদের অভিব্যক্তিমালা নিবেদিত। এই শ্রদ্ধা একটি চরিত্রের পৌরুষের প্রতি কেবল নয়—এই শ্রদ্ধা ও আলোচনার মনস্তত্ত্ব গভীর। হুসাইনি প্রত্নমানসের অবস্থান সভ্যতার মর্মমূলে প্রোথিত।


হুসাইন একটি অনিশ্চয়তার দিকে এগুচ্ছিলেন বিশ্বাস ও সাহসে ভর করে, প্রেমে পূর্ণ হয়ে।


কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পূর্বাপরের ইতিহাসলগ্ন পাঠ থেকেও কিছু বিষয় পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে। হুসাইন-এর জীবদ্দশায় তাঁর পিতা বিশ্বাসীদের নেতা আলী [প্রভু তাঁর সত্তাকে উজ্জ্বল করুন] বিষয়ে নিন্দাবাদে মুখর ছিল উপাসনালয়ের মঞ্চগুলো। হত্যা করা হয়েছিল হুসাইন-এর সহোদর হাসান-কে। অর্থাৎ ক্ষমতাকেন্দ্র নানাভাবে হুসাইন ও তাঁর পরিবারের নামে অপবাদ ও নিন্দাবাদের ধারা চালু করে সমাজে তাদের নিগৃহীত করতে শুরু করেছিল। এই কর্মধারা আসলে ক্ষমতাকেন্দ্র সমূহের চিরন্তন চরিত্র। ক্ষমতার অন্য মাত্রা তথা প্রতাপের ধারা আরও গভীরতর একটি কাজ করতে উদ্যত থাকে বরাবর। তা হলো অবচেতনে ঘৃণা প্রোথিত করে দেয়া। হুসাইন ও তাঁর পূর্বপুরুষের বিষয়ে আমরা এমন ঘটতে দেখি। মনে রাখতে হবে, প্রতাপ স্মৃতিকে বিস্মৃতিতে রূপান্তর করে এবং স্মৃতিকে বদলে দিতে চায় ক্ষমতার প্রবলতা দিয়ে।

এই পথে প্রতাপ অবচেতনেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করে। দশকের পর দশক আমাদের এই বাংলাদেশে, ভারতে ও পাকিস্তানে ক্ষমতাকেন্দ্র এমন অপচেষ্টা করেছে এবং করে চলেছে। মুসলিমদের জগতে হুসাইনের নাম মুছে দিতে অতি শক্তশালী একটি রাজশক্তি সচেষ্ট রয়েছে—নিজেদের অপকর্মসমূহের সাফাই গাইবার প্রতীক হিসেবে এরা হুসাইনের হত্যাকারী ইয়াজিদের প্রশংসায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে—এই প্রচেষ্টায় ইয়াজিদ একটি প্রতীক মাত্র। বিষয়টি কেবল ধর্মের নয়, অন্য দিকে বরং বেশি নিয়োজিত করে নিজেকে। উল্টোদিকে হুসাইনের সংগ্রাম থেকে উদ্ভূত প্রতীক নিয়ে রাজশক্তির বিরোধী ভিন্ন একটি শক্তিকেন্দ্র সোচ্চার এবং সক্রিয়। দুই পক্ষই প্রতীকের প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে নিজেদের অন্যায়কে জায়েজ করার খেলায় মগ্ন। এর মাঝে—

‘প্রিয় হে সবুজ ফল
তোমাকে কঠিন হতে দেব না’

আমাদের এই প্রত্যয়কে ধরে রাখতে শুরু করতে হয়েছে একটি নতুন ও ভিন্ন সংগ্রাম। কারবালা ও ফোরাত—মরুপ্রান্তর ও নদীর মাঝে রচিত হওয়া প্রেক্ষাপটে কিছু মানুষের দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে আসলে কী বার্তা ও সত্যকে উন্মোচিত করেছিল সভ্যতা প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বে? জলকে তথা প্রাণকে অবরুদ্ধ করলে রক্তের ধারায় প্রাণের নহর বয়ে যায় ধরণীতে। সেখান থেকে নব নব জীবন ফোটে। বরং শরীরের পতনের মধ্য দিয়ে অনির্বাচন সত্যের ও সাহসের এক নক্ষত্র খচিত দীর্ঘ জীবনের সূচনা ঘটে সেখানে।

প্রতাপ যেহেতু অবচেতনকে নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্যত হয়, সে-ভাষাকে বদলে দিতে চায়। কিন্তু ভাষার নিজস্ব চরিত্র হচ্ছে সে অভিব্যক্তির প্রকরণ বদল করলেও নিজেকে প্রকাশ করবেই। মানুষের চেতনার জগৎ বাঁধ ভেঙে বেরুবেই। নিশ্চিতভাবেই হুসাইনের জীবন দানের সংকল্প ও আদর্শকে আমি কেবল ভাষার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখব না। তবে ভাষা এর মাঝে কেমন করে রচিত হয় তা ভাবতে বলি পাঠককে।

হুসাইনের শাহাদাত আমাদের তাকাতে বলে শাহাদাত এবং শহিদ শব্দদ্বয়ের অন্য অর্থগুলোর দিকে। শাহাদাত অর্থ সাক্ষ্য দেয়া এবং শহিদ অর্থ সাক্ষী। হুসাইন একটি অনিশ্চয়তার দিকে এগুচ্ছিলেন বিশ্বাস ও সাহসে ভর করে, প্রেমে পূর্ণ হয়ে। কেননা তিনি সত্যে সমর্পিত ছিলেন। বস্তুত সমর্পিত থাকার মাধ্যমে নিজের জীবনের চেয়ে বিশালতর সত্যের সাথে নিজেকে বিলীন করেছেন তিনি যাত্রার আরম্ভেই—এই হলো শাহাদাত তথা মহৎ লক্ষ্যে জীবন বিসর্জন দেয়া এবং সত্যের সাক্ষ্য হয়ে ওঠার মর্মার্থ। হুসাইন শহিদ হয়ে কারবালায় এসেছেন। শরীরের পতন তথা মৃত্যু তুচ্ছ ছিল তাঁর কাছে।


সংগ্রামী ও প্রেমিকদের জন্য হুসাইন পরম সত্যের সাক্ষী এবং গভীর অনুপ্রেরণার প্রস্রবণ।


কয়েক সহস্র সশস্ত্র সৈন্যের সামনে বাহাত্তর জনের একটি দল, যাদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল নারী ও শিশু, তারা কেমন করে দাঁড়িয়ে ছিল সেই ১৪০০ বছর পূর্বে? সহস্রের প্রবলতার বিরুদ্ধে যে দাঁড়ায় সে-চিন্তা থেকে, কৌশল থেকে দাঁড়ায় না। একটি গভীর বিশ্বাস ও প্রেম তাকে চালিত করে এবং সে যে নবজীবন লাভ করে প্রতিনিয়ত এবং সে-জীবন সদা চলমান। সংগ্রামী ও প্রেমিকদের জন্য হুসাইন পরম সত্যের সাক্ষী এবং গভীর অনুপ্রেরণার প্রস্রবণ।

কুস্তেগানে খঞ্জরে তাসলীম রা
হর জামান আয গায়বে ‌জানে দিগারাস্ত।

প্রেমের তরবারিতে যারা খণ্ড বিখণ্ড হয়েছে
তাঁরা প্রতি মুহূর্তে অদৃশ্য হতে নবজীবন লাভ করেছে।

তার অস্তিত্ব একজন ব্যক্তি থেকে একটি সমগ্রের ও সভ্যতার সত্যের রূপ হয়ে দাঁড়ায়। সে একটি প্রতীকের চেয়েও গভীরতর পর্যায়ে নিজেকে উন্নীত করে। সে একটি অবিনশ্বর আদর্শ এবং ভাষা গড়ে তোলে। সাহিত্য ও শিল্প এবং এর রূপকাররা মিথ গড়ে তুলবার যে প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাত্রা করেন তেমন যাত্রা এই সংগ্রামী এক লহমায় গড়ে তোলেন। মিথ কল্পকথা থেকেই কেবল গড়ে ওঠে না। ক্ষমতাকেন্দ্র ও তার প্রতাপ যে ভাষাকে শীতলতায় হত্যা করতে চায়, রক্তের উষ্ণতায় বরং সেই অপচেষ্টাকেই পরাভূত করেন একজন সংগ্রামী। হুসাইনের জীবন বিসর্জনকে আমি তেমন বৈশ্বিক অবচেতন এবং বিস্মৃতি প্রবণতার বিরোধী প্রেমময়, বিশ্বসে স্থির, সক্রিয়, কিন্তু অন্তঃশীল এবং সবল প্রবাহ বলে চিহ্নিত করি।

হুসাইনের প্রতি মানুষের আবেগ মূলত ইয়াজিদের স্বভাবের প্রতি তথা মানুষের নিজের পশুত্বের প্রতি ঘৃণা ও নিজের মনুষ্যত্বের প্রতি তার প্রেমের বহিঃপ্রকাশ। ইমাম হুসাইনের বীরত্ব অতিক্রমী সত্তার সত্য নিষ্ঠার সংগ্রাম স্ট্র্যাটিজিহীন এবং শিশুর সহজতা নিয়ে দম্ভের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানবতার কাছে ইনোসেন্সের একটি মহাকাব্য রচনা করেন। মানুষ এই ইনোসেন্সকে হারিয়ে ফেলে বারবার—বলা উচিত ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, কেননা সে জেগে উঠতে পারে না সংগ্রামের ধারায়। কিন্তু ইনোসেন্সকে হারিয়ে ফেলার জন্য নিজের সত্তাকে সে ক্ষমাও করতে পারে না।

সত্যের সংগ্রামে ত্যাগী চরিত্রকে মানুষ বরাবরই মহিমান্বিত করেছে। এতে মানব সভ্যতায় সত্যের প্রতি অনুরাগ যেমন ধরা পড়ে, আবার মানুষ হিসেবে একটি প্রাণী পরিবারের সংকটও ধরা পড়ে। সত্য ও ন্যায়ের জন্য জীবন দানকারীদের কেন বারবার বিয়োগান্ত পরিণতি ভোগ করতে হয় আর পরবর্তীতে তাদের নিয়ে মর্সিয়া রচিত হয় এই প্রশ্নের অস্বস্তিকর জবাবটি সভ্যতা বরাবরই লুকিয়ে রাখে। মর্সিয়া সেই অপরাধবোধেরও অভিব্যক্তি বটে। হুসাইনের জন্য আহাজারি সত্য ও সহজতাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হবার দায়শোধের কান্না। মর্সিয়া রচনা করে মানুষ কেবল সে তার দরদই প্রকাশ করে না, নিজেকে ক্ষমা করতে না পারার অভিব্যক্তিও জানায়। কাজী নজরুল ইসলাম তাই বলেন—

“ফিরে এলো আজ সেই মহররম মাহিনা
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহিনা।”

হুসাইন দম্ভময় দুঃশাসনের বিরুদ্ধে অহিংসার প্রতীক। হুসাইনের পিতৃপুরুষের বংশের দুই ধারা—উমাইয়া ও হাশেমীদের ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করি চলুন—

১। উমাইয়া ধারা সম্পদ পুঞ্জিভূতকরণ, ক্ষমতা ও দম্ভের এবং কট্টরপন্থার প্রতি আসক্তির দিকে ধাবিত হয়েছে সরবে।

২। অন্যদিকে হাশেমী ধারা সদয়তা, সহমর্মিতা, দান করার প্রবণতা, আপ্যায়ন ও আতিথেয়তা, মানুষকে আপন করে নেয়া, ক্ষমা ও বিনয়ের পরাকাষ্ঠা অর্জন করেছে।


সভ্যতা কেবল পিরামিড ও কলোনেড নয়, সভ্যতা মানুষের মহত্ত্ব দ্বারা রচিত।


এখানে আমরা মানব সভ্যতারই দু’টি ধারা দেখতে পাই। আদি পিতা আদমের দুই সন্তানের মাঝে সূচিত দ্বন্দ্ব—যা ছিল ধৈর্য ও সহণশীলতা এবং হনন করে বিজয়ী হবার প্রবণতা—এই দুইয়ের মাঝে দ্বৈরথ সেখান থেকে মানব বংশ বের হয়ে আসতে পারে নি আজও। ধ্রুপদি মহাকাব্যিক সাহিত্যের পাঠে আমরা গৃহস্থালী, পরিবার ও সভ্যতার পক্ষে যে যুদ্ধ ও সংগ্রাম দেখতে পাই, কারবালায় তার অনন্য প্রকাশ ঘটে। হুসাইনের আদর্শ জবরদস্তি তথা নিজের মতকে অস্ত্রের জোরে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়ার মতো কট্টরপন্থার বিরোধিতা করেছে। সেই দ্বন্দ্ব এখনও চলমান—ধর্ম ও রাজনীতির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দল এখনও কট্টরপন্থা ও হত্যার মাধ্যমে আদর্শ প্রচারে সচেষ্ট, অন্য কিছু দল নমনীয়তা ও সহনশীলতার পক্ষে।

আমাদের পিতৃপুরুষদের এবং তাদের পিতৃপুরুষদের সময়েও হুসাইন ও কারবালা বিষয়ক শিল্প ও সাহিত্যের যে বিশাল সম্ভার তা সম্ভ্রম জাগানিয়া। ইমাম নিশাপুরী থেকে মীর মশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, মকবুল ফিদা হুসাইন, ইরানি চলচ্চিত্র সম্ভার, বাংলাদেশের শিল্পী রনি আহম্মেদ কারবালা ও হুসাইনের নির্যাস, প্রতীক ও ঘটনাক্রম নিয়ে রচনা করেছেন, করে চলেছেন, এবং এই ধারা থামবার নয়। এসব শিল্পের আবেদন জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমান। মাওলানা মোহাম্মদ আলি জওহার যখন লেখেন—

“ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালা কে বাদ…”

এই কথার মর্মার্থ আমাদের অনুসন্ধান করতে হয় ধর্মের চৌহদ্দির বাইরেও। ফেরাউন ও রোমানদের শাসককুল নিজেদের ঘিরে দম্ভ ও ক্ষমতার বিস্তৃতিকে নিরাপদ করার যে পর্দায় ঘিরেছিল [ইস্তেদরাজ] যাকে দুর্ভেদ্য বলে জ্ঞান করত তারা সেসবকে ভেদ করতে দ্রোহ ও সংগ্রামের ধারা কখনও বন্ধ হয় নি। সভ্যতা কেবল পিরামিড ও কলোনেড নয়, সভ্যতা মানুষের মহত্ত্ব দ্বারা রচিত। মানুষ ধ্বংস হবে জেনেও প্রবল শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ায় বলেই সে পরাজিত হয় না। তবে তার ট্র্যাজিক পরিণতি ঘটে, সে পূজিত হয় ব্যক্তির রূপ পেরিয়ে। বিশ্ব সাহিত্যে হেক্টরসহ ট্র্যাজিক হিরোদের যে ধারা সভ্যতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল হুসাইন তার উজ্জ্বলতম সত্য রূপ। ইনোসেন্সের শরীরী উপস্থিতির পতন ও মৃত্যু ঘটে—ট্র্যাজিডি এমনই। সে অমর হয়ে ওঠে শরীর মাত্রা পেরিয়ে।

(162)