হোম গদ্য স্বগত সংলাপ

স্বগত সংলাপ

স্বগত সংলাপ
379
0

এমন মানুষ কে আছে, বুকের তলে

না পোষে হলদে সাপের তীব্র ফণা
মসনদে বসে অনবরত যে বলে :
‘আমি রাজি’, আর উত্তরে ‘পারবো না!’

স্মারক লিপি
[মূল : শার্ল বোদলেয়ার। অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু]

সচেতনতা একপ্রকার ব্যাধি, অন্তত এই আধুনিক কালে। এখানে আপনাকে হতে হবে নির্জলা চরিত্রহীন, নৈতিক দিক হতে। চারপাশের সব কিছু, যা কিছু দেখি উপলব্ধি করি প্রতিনিয়ত আমার মধ্যে তৈরি করে রাগ। প্রচণ্ড রাগ। এই রাগ জমে জমে আমি ক্রমে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। সমাজ আমার কাছে প্রতিনিয়ত আশা করে ভান। যা মানার না তাকে মানার ভান, যা সম্মানের না তাকে সম্মানের ভান। এই ভান আমার আমিকে মিশিয়ে দিচ্ছে, মেরে ফেলছে আমাকে। আমি বদমেজাজি হয়ে যাচ্ছি। সহজে মেজাজ হারিয়ে ফেলছি। আসলে হয়তো তাও না। আমার রাগের আসল কারণ এই বিরুদ্ধ সামাজিক উন্মাদনায় আমি নিজেকে মুক্ত করতে পারছি না। আগে মনে হতো এখন আরও মনে হয় সামাজিক মানুষের এই স্বাভাবিকতা আমার মাঝে নেই। আমি এক প্রতিবন্ধী। দুর্বল মানুষ। যে মুহূর্তে বদ মেজাজি হবার, খারাপ ব্যবহার করার এক দুর্মর ইচ্ছে বিষাক্ত সাপের মতো ফুঁসে ওঠে আমার ভেতরে, বিপরীত এক বোধ যেটা সলজ্জ মোটা এক রশির মতো আমাকে বেঁধে রাখে। নিয়তির মতো আমাকে আঁকড়ে ধরে। যেন এই সহজ সামাজিকতার প্রকাশ সে যে কোনোভাবেই হোক রুখে দেবে। এই রুদ্ধতা আমাকে অসুস্থ করে তুলছে আরও। এই যে একটা শিশুর কোমল মুখ, নদীর শান্ত হাওয়া আমার ভেতরের রাগগুলোকে শুষে নেয়, আমি চাইলেও ঠিক পরিস্থিতিতে যেগুলো টেনে তুলতে পারি না, তার কল্পনা আমাকে উন্মাদ করে দিচ্ছে। দস্তয়ভস্কির মতো আজ আমিও বুঝতে পারি না কী করলে কী হওয়া যায়। বা আমি আসলে কী? আমি কর্মঠ নাকি অলস, আমি কি সৎ নাকি অসৎ, নম্র নাকি বদমেজাজি, বীর পুরুষ নাকি নগণ্য কীট। আর কী আশ্চর্য এই বুঝতে না পারা নিয়ে আমার ভেতর কোনো অনুশোচনাও কাজ করে না এখন।


আনন্দ আসে পতনের এক তীব্র চেতনা থেকে, এক ভয়ংকর পরিণতির একান্ত আকর্ষণ থেকে। 


নিজের ঘরের শান্ত কোণে অলস বিড়ালের মতো জীবনের লেজ নেড়ে চেড়ে সময় কাটাচ্ছি, আর নির্বোধের মতো এক অহংকার ভরা অভিমানে নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছি যে, মেধাবী মানুষ শেষপর্যন্ত ঐকান্তিকভাবে কিছুই হয়ে উঠতে পারে না, আর কিছু হয়ে ওঠা আসলে নির্বোধেরই কাজ। আমি মেধাবী এই অর্থহীন ভাবনা আমার আধুনিক মানুষদের নির্লজ্জ আর অনৈতিক জগতে প্রবেশে আমার অক্ষমতার এক মোলায়েম প্রলেপ। চতিত্রবান আর নৈতিক মানুষের অনেক সীমাবদ্ধতা। আর কেবল প্রলেপ নয়, আমার এই প্রায় চল্লিশ বছর বয়সের এটা এক অনমনীয় প্রত্যয়। চল্লিশ বছর অনেক বয়স। অনেক। এর বেশি বাঁচা অভদ্রতা, অসভ্যতা আর বেহায়াপনা। আমি দেখেছি এর বেশি বাঁচা লোকেরা অকর্মা আর নির্বোধই হয়। এই যে আমার ভেতর ক্রমে বাসা বাধছে এক অসুখ, প্রত্যাশার এক সহজ মরণ শোক, এর ভার আমি বইতে পারি না। এই ভার অসহ্য। অবাক বিষয় হলো এই অসুখ নিয়ে আজকাল বেশিরভাগ মানুষ গর্ব করে। এই অসুখকে মানুষ অলংকার ভাবে। আমি গর্ব না করলেও আজ মেনে নিয়েছি। বা বলা ভালো আমাকে মেনে নিতে হয়েছে। এখন এই স্মৃতিও ক্ষীণ প্রায় যখন মনের দুই বিপরীত বোধ নৈতিকতার প্রশ্নে পরস্পর যুদ্ধে নামত। অস্বাভাবিক, অসুন্দর, জঘন্য আর বিকৃত যত কিছু আমাকে আনন্দিত করেছে আমার একান্ত নিভৃত কোণে, সে সব আমি গোপন সম্পদে লুকিয়ে রেখেছি পানা পুকুরে, লজ্জা পেয়েছি তীব্র করে। সারাদিন সব কাজে আমি ভুলতেই পারি নি আমি কী করেছি। একসাথে এই লজ্জা আর আনন্দের আনুভূতি আমার চেতনাকে তীব্র যন্ত্রণায় দগ্ধ করেছে। আমি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছি। এখন তো আমি বুঝি যে আনন্দ আসে পতনের এক তীব্র চেতনা থেকে, এক ভয়ংকর পরিণতির একান্ত আকর্ষণ থেকে। কিন্তু জেনেও এই আকর্ষণ থেকে নিজেকে নিয়ে পালানোর কোনো পথ নেই। অন্তত আমি পথ পাই নি। আর এও আজ বিশ্বাস করি এই পালানোর পথ খুঁজে পেলেও হয়তো আমি সেই অন্য পথ নিতাম না। যেমন অন্য মানুষেরা নেয় নি।

আর এই বিশ্বাস তুলে আনে আরও বড় বিষ। পৃথিবীর সব অসুখ আর বিকলাঙ্গতার পেছনে নিজের সূক্ষ্ম আর অবশ জড় মনকে দায়ী মনে হয়। এই আত্মদায় আনে আরও বেশি ক্ষোভ। কোনো দুর্বল, অসুস্থ মানুষকে দেখলে রাগ ওঠে যায়। কোনো ভিখারি দেখলেও মারতে মন চায়। মনে হয় এই সব অক্ষম ও ব্যাধিগ্রস্ত মানুষেরা আমার অক্ষমতা সম্পর্কে তাদের অজান্তেই আমাকে উপহাস করেছে। মনের এই পতন মুখর সময়ে মনে হয় কেউ আমাকে অপমান করুক। জোরে এক চড় বসিয়ে দিক আমার গালে। আর এই অপমান কামনা আমাকে আরও হতাশ ও আনন্দিত করে। কেননা আমি অন্য সবার চেয়ে বুদ্ধিবান, মেধাবী আর সূক্ষ্ম রুচির মানুষ। আমার যেন একটা প্রতিশোধ নেয়ার সময় এসেছে। যতটুকু সুস্থির মন হলে প্রতিশধের মতো বিষয়কে ক্ষমা করা যায় তা নেই আমার, কারোর কি তা থাকে?

এসব এলোমেলো কথা ভাবতে ভাবতে এথেন্সের কাঁচা বাজারের পাশ দিয়ে যাওয়া অনেক ছোট ছোট নর্দমার একটিতে পড়ে গেলাম। দুপুর পার হয়েছে। বাজারে লোকজন একটু কম এখন। শুধু ফলের দোকানের ওইদিকে বাইরের কিছু ব্যবসায়ী বুঝি নতুন ফল এনেছে আন্দালুসিয়া কি ইস্তানবুল থেকে। আশেপাশে পথ চলা কিছু লোক কেবল আমার এই পতন দেখল। দুই একজন একটু আফসোসের আওয়াজ করল। প্রায় কোমর সমান হবে গড় গভীরতা এই নর্দমার। বাজারে বিভিন্ন কাজে যেই পানির ব্যবহার হয় সেগুলো এই পোড়া মাটির দেয়াল দেয়া নর্দমা নগর পাঁচিলের বাইরে নিয়ে যায়। পানি কম থাকলেও প্রায় এক হাঁটু কাদা। কাদায় আমার জুতো আটকে গেছে। পা তুলতে যেয়ে দেখি জুতো  থেকে পা আলাদা হয়ে কাদার মধ্যে জুতো হারিয়ে গেছে। আমি না দেখেই হাতড়িয়ে জুতো খুঁজছি পানি আর কাদার মধ্যে। এর মাঝেই পোশাক আর শরীরে কাদা লেগে গেছে।

‘এই যে মানুষ উঠে আসো, জুতোর খোঁজে কি নর্দমাতেই কাটাবে সারা বেলা?’—ভারি ও তীব্র একটা গলা শুনতে পেয়ে মাথা তুলে দেখি দীর্ঘকায় এক বৃদ্ধ। তার মুখটা ঠিক দেখতে পারছি না। সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়ানো। আমি মুখ তুলতেই সরাসরি সূর্যের আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিল। দেখলাম আরও দুই একজন পথচলতি মানুষ নর্দমার পাশে এসে উঁকি-ঝুঁকি মারছে।

ততক্ষণে জুতো খুঁজতে যেয়ে আমার মেজাজও খারাপ হচ্ছিল। খোঁজা বাদ দিয়ে উঠব ঠিক করলাম। নর্দমার কিনারে হাত দিয়ে লাফ দিব, দেখি সেই বৃদ্ধ হাত বাড়িয়েছে।

আমি আরও লজ্জিত হয়ে গেলাম। একে তো লোকজন দেখছে। তার উপর বৃদ্ধ মানুষ। আমার মনের এই দ্বিধা কী করে যেন সেই বৃদ্ধ বুঝতে পারল। হাত বাড়িয়ে থেকেই বলে উঠল খনখনে ভাঙা আর ভারি স্বরে, ‘মানুষ, স্বেচ্ছায় বাড়িয়ে দেয়া কোনো হাত কখনো ফিরাবে না, নিজের অহমে যত লাগুক।’

আমি কোনো কথা না বলেই এবার তার হাত ধরলাম। আর ধরেই বুঝলাম এই হাতের বন্ধন বজ্রের চেয়ে কঠিন। বুঝলাম এই মানুষ জীবনে কোনো কিছুই অনিচ্ছায় ছাড়েন নি। উপরে উঠে এবার ভালো করে তাকালাম তার দিকে।

বয়স কত ঠিক ঠাহর করা যায় না। ষাট হতে পারে, বা সত্তর বা আশি বা আরও বেশিও। শক্ত, পাকানো দড়ির মতো পেশি। নগ্ন পা। চটের মতো এক টুকরো কাপড় গায়ে জড়ানো। চুল আর দাড়ি বেশিরভাগ সাদা আর রুপালি। চুলগুলো কাঁধ ছাড়িয়ে যেয়ে পিঠের কাছে বাক খেয়েছে। তার বুকের চুলগুলোও সাদা। হয়তো চোখের পাতাও। হয়তো বললাম এজন্য যে তার চোখের দিকে সরাসরি বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। মনে হয় একটা আলো বের হচ্ছে। এমন ধারাল আর তীব্র চোখের মানুষ আমি কোনোদিন দেখি নি। কাঁধে একটা পুটলির মতো কিছু। হাতে বেশ লম্বা পাকানো এক লাঠি।

এর মাঝে লোক জমেছে আরও কিছু। কিছু উৎসাহী দোকানদারও এসে দাঁড়িয়েছে। লোকজন কেউ তার খুব বেশি কাছে ঘেঁষছে না। যদিও দেখে মনে হচ্ছে তিনি এদের অপরিচিত নন খুব একটা। তারা ফিসফিস করছে আর সেই ফিসফিসানি থেকে বের হওয়া একটা শব্দ আমাকে বিস্ময়ে নিথর বানিয়ে দিল। সিনিক-দুপুরে মনে হওয়া গত রাতের স্বপ্নের মতো মনে পড়ল একটি নাম। আমি ঠোঁট কাপিয়ে অস্ফুট স্বরে নিজেকেই বললাম, ডিজোনিয়াস!!!

তিনি কিন্তু আমাকে আমার বিস্ময়টুকু হজম করার সময় দিলেন না। হ্যাঁচকা একটা টান দিয়ে পাশের গলিতে নিয়ে গেলেন। বললেন পানি দিয়ে গা পরিষ্কার করলে ওই সরাইখানায় যাও। না হলে ড্যাশ মাছির মতো গায়ে কাদা লাগিয়ে থাকো।

আমি সম্বিত ফিরে পেলাম যেন। বললাম আপনি একটু থাকবেন? আমি খুব দ্রুত পরিষ্কার হয়ে আসছি। এবার তিনি যেন একটু হেসে ফেললেন। সেই হাসি ঠোঁটে আসার আগেই আবার ভেতরে মিলিয়ে গেল। বললেন, নিজেকে পরিষ্কার করার কাজে কখনো তাড়াহুড়ো করো না। মনে রেখো, অপরিষ্কার আর অপবিত্র দুটো আলাদা বিষয়। মানুষ খুব পরিষ্কার শরীর আর পোশাকে অপবিত্র মন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এই অপবিত্র মন পরিষ্কার করবে কী করে মানুষ!!


দেখো, এই হলো দুনিয়া। এখানে বড় চোর ছোট চোরকে মারছে। অনৈতিকতাও এখানে চর্চা হয় বড়ত্ব দিয়ে। 


আমি অবাক হয়ে গেলাম। এভাবে তো ভাবি নি আমি। তবে কি গা ধুতে যাওয়া ঠিক হবে না? ডিজোনিয়াসকে যদি খুঁজে না পাই আর। তার শরীরেও তো ময়লা। হাঁটু পর্যন্ত ধুলোর আস্তর পড়ে গেছে। মনে হয় গোসলও করেন নি বেশ কদিন।  কী করব এখন?

এবারও তিনি আমার মনের কথা যেন পড়লেন। বললেন যাও, অন্তত শরীর পরিষ্কার করো। অন্তত। মনে রেখো, যা তোমার সাধ্যের মধ্যে আছে সেটাতেই মন দিও আগে। সাধ্যের বাইরে যা কিছু থাক, যত মুগ্ধকর হোক সেটা, তার চিন্তায় সাধ্যের মধ্যে যা আছে তাকে অপচয় করো না।

এই বলে তিনিও সরাইখানার দিকে হাঁটতে লাগলেন। আমার বিস্ময় তখন মাত্রা-ছাড়া। মাত্র কিছু সময় আগেই উনার সাথে পরিচয়, কিন্তু এমনভাবে কথা বলছেন যেন তার হারানো সাগরেদ। অথবা সন্তান। একটা স্নেহের উত্তাপ আছে কণ্ঠে। কিন্তু এত রুক্ষ ব্যবহার আর স্বরে এমন দূরত্ব প্রকাশ পায়,  যে আপন ভাবতেও সাহস হয় না।

সরাইখানার সামনে এসে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। চুপ করে। সূর্য তখন আরও পশ্চিমে। মেওন করে আকাশে তাকালেন যেন তিনি কবি। আকাশে রঙের খেলা দেখছেন। আমি কোনো কথা না বলে ভেতরে গেলাম।

সরাইখানা বেশ জমজমাট। এই নগরীটি গ্রিসের সিমানার মধ্যে অন্যতম সমৃদ্ধ। নানান দেশ থেকে বণিকরা এসেছে। উট আর ঘোড়ার বহর আর নানান ভাষায় কথা বলা দেখে বেশ ভালো ভালো লাগছে। দেখলাম মিশরিয়ান যেমন আছে, আছে পার্সিয়ান, আছে উসবেক, তুর্কি এমনকি কিছু কি ইন্দোনেশিয়ান দেখলাম?

দোতলা ঘরগুলো একটা বড় উঠোনের চারদিকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। সব দিক দিয়েই ভেতরে যাবার পথা আছে। উঠোনে একটা বড় চৌবাচ্চায় রাখা আছে পানি। মুখ হাত ধুতে। গোসলের জন্য বুঝি আলাদা হাম্মাম আছে। কারণ কাউকে গোসল করতে দেখলাম না উঠোনে। আমি মুখ হাত ভালো করে ধুয়ে বের হয়ে এলাম। কিন্তু কী দেখলাম!!

ডিজোনিয়াসকে ঠিক যেভাবে রেখে ভেতরে গিয়েছিলাম তখনো তিনি ঠিক সেভাবে আকাশে মুখ করে দাঁড়ানো।

আমি আসতেই উনি আমার দিকে ভালো করে তাকালেন। আমি অস্বস্তিতে পড়লাম।

বললেন নর্দমায় পড়লে কেন?

আমি বললাম, আসলে অন্যমনস্ক ছিলাম। কিছু একটা চিন্তা করছিলাম।

ডিজনিয়াস স্থির চোখে তাকিয়ে বললেন, চিন্তা করবে খুব গুছিয়ে। যেই চিন্তা দুনিয়ায় তোমাকে নর্দমায় ফেলে দেয়, সেই চিন্তা কী করে তোমাকে পথ দেখাবে। লোকেরা মনে করে যে কোনো কিছু কল্পনা করাই চিন্তা। আহাম্মক সব।

তিনি হাঁটতে শুরু করলেন।

তখন সন্ধ্যা শুরু হয়েছে। বড় বড় সড়কের মাথায় মশাল জ্বালানো হচ্ছে। লোকজন গল্প করতে করতে ঘরে ফিরছে। মশালের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে তিনি বললেন, কী আলোকিত সড়ক আর কী অন্ধকার মানুষের মন।বলেই এক নিমেষ আমার দিকে চাইলেন। মনে হলো একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস শুনলাম। আমরা যখন একটা বড় চৌরাস্তা পার হয়ে এপোলো মন্দিরের দিকে যাচ্ছি, আরেকটা ছোট মন্দির দেখতে পেলাম। সারা মার্বেল পাথরের। তার গম্বুজের নকশায় পারস্যের নকশা খোদাই দেখলাম।

সামনে যেন শোরগোল শুনলাম। ডিজোনিয়াস-এর যেন কোনো দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি যেন জানেন তার গন্তব্য কোথায় আর সেখানে যাবার তার কোনো তাড়া নেই। এক পরিতৃপ্ত মন নিয়ে নিজের ছায়ার পিছনে হাঁটছেন। এই সন্ধ্যা, মানুষের চিৎকার, ঘোড়ার খুরের ধ্বনি, নগরীর সান্ধ্যকালীন ঘণ্টা কিসুতেই তার কোনো বিকার নেই।

আমরা মন্দির চত্বরের কাছে গিয়ে দেখলাম মন্দিরের দ্বার রক্ষী দুজন লোককে বেদম মার মারছে। আশেপাশের কথা থেকে যেটা বুঝা গেল লোক দুটি মন্দিরের ভিতর হতে কিছু চুরি করতে এসে ধরা পড়েছে।

ডিজোনিয়াস কিন্তু হাঁটা থামালেন না। সেই স্থির শান্তভাবেই চলছেন। একবার শুধু মুখ ঘুরিয়ে মন্দিরের সেই হট্টগোল লক্ষ করে বললেন, দেখো, এই হলো দুনিয়া। এখানে বড় চোর ছোট চোরকে মারছে। অনৈতিকতাও এখানে চর্চা হয় বড়ত্ব দিয়ে। যেই অপরাধ ছোট পরিসরে ক্ষমার অযোগ্য সেই একই অপরাধ বড় পরিসরে বেশ প্রশংসার চোখে দেখা হয়।

হেঁটে হেঁটে আমরা নগরীর বাইরের রক্ষা দেয়ালের কাছে চলে এলাম। জায়গাটা বেশ নির্জন। কিন্তু দেয়ালের উপরে থাকা মশালের আলোতে আলোকিত। আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে ডিজোনিয়াস বললেন, এবার তুমি এসো। আমি বাইরে যাব।

আমি অবাক হয়ে বললাম, এত রাতে নগরীর বাইরে?

তিনি খুব শান্ত স্বরে বললেন, এই প্রাচীর যারা দিয়েছে তাদের জিগ্যেস করো কেন দিয়েছে? দস্যুর কাছ থেকে ধন সম্পদ রক্ষা করতে তাই তো? তার মানে তোমার সম্পদ তোমাকে অরক্ষিত আর অনিরাপদ করে তোলে। আমার তো কোনো সম্পদ নেই।দস্যু কি নেবে আমার কাছে।


সহজ আনন্দ থেকে বিরত থেকো। মনে রেখো, আনন্দ আত্মাকে নিজের পথ হতে বিভ্রান্ত করে।


বলেই তিনি ঘুরলেন। যেন কথা শেষ। আমি দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, আমি অনেক দূর দেশ থেকে এসেছি। আলেকজান্ডার যেই পর্যন্ত যেতে পেরেছিল সেখান থেকেও অনেক পূর্বের দেশ। সে দেশে পর্যন্ত আপনার দুনিয়ার প্রতি আসক্তিহীন সহজ জীবন আর জীবন দর্শন পৌঁছে গেছে, যদিও আমি খুব বেশি কিছু জানি না। আপনি কি আমাকে এমন কিছু বলবেন যেটা দিয়ে এই পৃথিবীর জীবন খুব স্বাচ্ছন্যে ও উদ্বেগমুক্ত হয়ে আমি কাটাতে পারব?

মশালের আলোয় দেখলাম ডিজোনিয়াস-এর চোখ দুটো যেন আকাশের তারার মতো জ্বলছে। নাকটা একটু কুঁচকে প্রথমে মাথা উঁচু করলেন, এরপরে চোখ বুজলেন।

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে চোখ বন্ধ করেই বললেন, সহজ আনন্দ থেকে বিরত থেকো। মনে রেখো, আনন্দ আত্মাকে নিজের পথ হতে বিভ্রান্ত করে। একটি দুঃখী হৃদয় কেবল ভালোবাসতে পারে।

এতটুকু বলে চুপ রইলেন। আমি অধীর আগ্রহে বললাম, আরও কিছু বলুন।

তিনি বললেন, তোমার প্রত্যাশাকে ছোট করো, তাহলে সমস্ত পৃথিবী তোমার কাছে নত হয়ে রইবে।

বলেই তিনি চোখ খুললেন। কোনো দিকে না তাকিয়ে হাঁটা দিলেন।

নির্জন রাস্তায় আমি দেখলাম এমন এক মানুষ যার কোনো কিছু হারাবার ভয় নেই। আমি দেখলাম এমন একজনকে, এই সমৃদ্ধ নগর যার কাছে মুহূর্তে পরাজিত হলো বিনা যুদ্ধে। তিনি যতই দূরে যাচ্ছেন তার ছায়া ততই বড় হতে শুরু করল। নগর পাঁচিলের গেট পার হয়েই যেন, তিনি একটু দাঁড়ালেন। যেন মুক্ত নিঃশ্বাস ফেললেন মানুষের বানানো খাঁচা থেকে বেরিয়ে।

জাহিদুর রহিম

জন্ম ১৭ ডিসেম্বর ১৯৮৬; রংপুর। জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে জনস্বাস্থ্য নিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
সুন্দর দাঁড়িয়ে আছে নিঃসঙ্গ [ম প্রকাশনী, ২০১৫]
প্রবন্ধ—
কথারা আমার মন [বেঙ্গল পাবলিকেশন, ২০১৮]

ই-মেইল : rahim.zahidur@gmail.com

Latest posts by জাহিদুর রহিম (see all)