হোম গদ্য ‘স্তালিন’ : ইতিহাসকে নতুন করে দেখা

‘স্তালিন’ : ইতিহাসকে নতুন করে দেখা

‘স্তালিন’ : ইতিহাসকে নতুন করে দেখা
432
0

বাংলাদেশের সাহিত্য-শিল্পজগতে কোনো শিল্পকর্ম বন্ধের দাবি উঠলে সেটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তা শিল্পমান সম্পন্নই হোক কিংবা না হোক। কৌতূহলী পাঠক বা দর্শকের সংখ্যা তখন বেশ জোরেসোরেই বাড়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশের শিল্পকলা একাডেমিতে ঘটল নাটক বন্ধের আন্দোলন। গত ১০, ১১ ও ১২ জুন, ২০১৯ তারিখে শিল্পকলা একাডেমির মূল অডিটোরিয়ামে প্রদর্শিত হলো নাটক ‘স্তালিন’। পেশাদার নাট্য সংগঠন সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার প্রযোজিত এ নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন কামালউদ্দিন নীলু। ১০ জুন নাটকটির উদ্বোধনী প্রদর্শিত অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দিন নাটকটি প্রদর্শিত হবার পর অডিটোরিয়ামে এক দর্শক ‘নাটকে ইতিহাস বিকৃতি ঘটেছে’ বলে উচ্চস্বরে চিল্লায়ে ওঠেন। নাটকটির তৃতীয় দিন ১২ জুন কমিউনিজম ধারার রাজনৈতিক কর্মীরা মানববন্ধন করে নাটকটি বন্ধের দাবি জানান। তারা তাদের বক্তব্যে ইতিহাসের নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরেন, মার্কসবাদী আদর্শ নিয়ে বক্তৃতা করেন এবং নাটকটি বন্ধের জোর দাবি জানান। তারা আরো বলেন, ‘কামালউদ্দিন নীলু সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি, তিনি সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে এমন কাজটি করে চলেছেন।’ তারা মানবন্ধন ও প্রতিবাদ করলেও কোনো সহিংসতার দিকে যান নি। তবে নাটকটি সেদিনও প্রদর্শিত হয়। তারা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদেই সীমিত ছিলেন। তবে শিল্পকলার বরাদ্দকৃত সময় অনুসারেই নাটকটি ১০, ১১ ও ১২ তারিখ পরপর ৩টি সন্ধ্যায় প্রদর্শিত হয়। আমরা এ আলোচনায় মার্কসবাদের মূলনীতিকে মাথায় রেখে স্টালিন প্রসঙ্গ, প্রচলিত বিভ্রান্তি ও নাটকে বিধৃত ইতিহাস আলোচনায় ব্যাপৃত থাকব। মার্কসবাদের তত্ত্বীয় ডিসকোর্সে না গিয়ে নাটকে বিধৃত বিষয়বস্তু, প্রযোজনা মনস্তত্ব, উপস্থাপন কৌশল, নান্দনিকতা, অভিনয়-আলো-আবহ, নাট্যপ্রক্রিয়া নিয়েই এ আলোচনায় ব্যাপ্ত থাকব।

কামালউদ্দিন নীলু বাংলাদেশের প্রথিতযশা নাট্য নির্দেশক। দীর্ঘদিন ধরে নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব অসলোতে নাট্যকলা বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন। গত আশির দশক থেকে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে নাট্যনির্দেশক হিসেবে তিনি বেশ সুপরিচিত। ভারতের ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে স্নাতক কামালউদ্দিন নীলু একসময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলায় শিক্ষকতা করতেন। নব্বইয়ের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন পেশাদার নাট্য সংগঠন সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি)। সিএটি প্রথম দিকে বিদেশি অনুদানে পরিচালিত হলেও পরবর্তীতে সাধারণ নাট্যদলের মতোই নাট্য প্রযোজনা করেছে। ইউরোপীয় রীতির নাট্য উপস্থাপনে কামালউদ্দিন নীলু সিদ্ধহস্ত। মঞ্চ ব্যবহার, উপস্থাপনের বৈচিত্র্য, গভীর দর্শনজাত অনবদ্য বৈশ্বিক মানদণ্ডে অনবদ্য হয়ে উঠেছে তার প্রতিটি নাটক। সিএটি দেশজ আঙিকের নাটক, রবীন্দ্রনাথের নাটক, সংস্কৃত নাটক মঞ্চায়ন করলেও বাংলাদেশে ইবসেনের নাটককে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অপরিসীম। শুধু বাংলাদেশ নয় সমগ্র এশিয়ার মধ্যেই ইবসেনের নাটকগুলো প্রচার-প্রসারে তার ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। তাদের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা—ইবসেন-এর ‘গোস্টস’ অবলম্বনে ‘কৃষ্ণবিবর, হেনরিক ইবসেনের দ্য ওয়াইল্ড ডাক অবলম্বনে ‘বুনোহাঁস’ (১৯৯৯), পীরের গিন্ট অবলম্বনে ‘পীরচাঁন’ (২০০০), আ ডলস হাউস অবলম্বনে ‘পুতুলের ইতিকথা’ (২০০১), ‘ব্র্যান্ড’ (২০০৪), ‘দ্য লেডি ফ্রম দ্য সী’ (২০০৮), ‘ঊরুভঙ্গম’ ‘রাজা’ ‘দ্য লেসন’, ‘ম্যাকাব্রে’ প্রভৃতি। বাংলাদেশ ছাড়াও তিনি ইন্ডিয়া, নরওয়ে, চীন, জার্মানসহ বিভিন্ন দেশে নাট্য নির্দেশনা দিয়েছেন।

1

সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার এবারের প্রযোজনা হিসেবে বেছে নিয়েছিল নাটক ‘স্তালিন’। নির্দেশনায় কামালউদ্দিন নীলু কিন্তু তিনি কেন যে এবারের বিষয়বস্তু হিসেবে স্টালিন চরিত্রটি গ্রহণ করলেন তা দর্শককে প্রথমেই ভাবনায় ফেলেছিল। গত প্রযোজনা ‘ম্যাকাব্রে’-তে প্রযুক্তিনির্ভর ইউরোপীয় থিয়েটার তত্ত্বের একটি প্রায়োগিক রূপ দেখিয়েছিলেন তারা। তা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল অসংখ্য নাট্যদল। এ বারের বিষয়বস্তুসোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রনায়ক স্টালিন (১৮৭৮-১৯৫৩)। যার প্রকৃত নাম জোসেফ বেসারিওনি জুগাসভিলি। ’তাকে ‘কোবা’ ‘সোসোলো’ নামেও ডাকা হতো। তবে জোসেফ স্টালিন নামে ছিলেন সমধিক পরিচিত। স্টালিন ছিল তার নিজের তৈরি করা ছদ্মনাম। স্টালিন নামের মধ্যে আছে Man of Stall. নিজেই নিজেকে লৌহ মানব এমন আখ্যা আছে। সিএটি তাদের নাটকের নামকরণ করেছেন ‘স্তালিন’। প্রসঙ্গত যে, লেনিনের নামের ক্ষেত্রেও এমন ধরনের প্রবণতাই ছিল। লেলিনের নেতৃত্বাধীন রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টির বলশেভিক গোষ্ঠী থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির লেলিন পরবর্তী মূল দায়িত্ব (১৯২২-১৯৪০, ১৯৪১-১৯৫৩) ছিলেন স্টালিন।‘স্টালিন’ কৃত্রিম নামের এ দৃঢ়চেতা মানুষটি সারা পৃথিবীকে প্রায় ৩০ বছর দাবড়িয়েছে। মার্কসবাদকে কেন্দ্র করে লেনিনের আন্দোলনকে নবতর স্টালিনবাদে রূপান্তরিত করেছে। স্টালিনের দাদা জার পুলিশের গুলিতে হত্যা এবং দলীয় কারণে ব্যাংক ডাকাতিসহ নানা বিপ্লবাত্মক ঘটনায় কয়েক দফা সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দণ্ডে দণ্ডিত হবার কারণে তৎকালীন দলপ্রধান লেলিনের বেশ সুনজরে ছিলেন। জর্জীয় বংশোদ্ভূত স্টালিনের পাদুকাশিল্পী মদ্যপ পিতা বাল্যকালেই কর্ম নিযুক্ত করলে মা কিটোভেন পাদ্রিদের মিশনারি স্কুলে দেন। যদিও মা শিক্ষা ব্যয়ভার বহন করতে পারতেন না বলে নানা অপবাদ জড়িত আছে। তবে বাল্যকাল থেকেই স্টালিনের ছিল অসাধারণ বস্তুবাদী দৃষ্টি। মার্কসবাদ দ্বারা সেই বাল্যকালেই প্রভাবিত হয়েছিলেন।


মার্কস-এঙ্গেলস-লেলিন-স্টালিনের বস্তুবাদী মতাদর্শের কমিউনিস্ট রাজনীতির ধারা সারা বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্ববহ।


বলশেভিক পার্টিতে লেনিনের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃত ট্রটস্কিকে প্রথমে নানা কৌশলে লেনিনের চোখে বিষিয়ে তুলেছেন স্টালিন। এবং শেষ পর্যন্ত দেশছাড়া করেছেন তাকে। নিজের অস্তিত্ব ও আধিপত্য রক্ষায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছে। জার্মানির হিটলারকে পরাস্তে তার ভূমিকাও ছিল অপরিসীম। অনেকের মধ্যে প্রশ্ন জাগে হিটলার বড় খুনি নাকি স্টালিন? যাই হোক, অতি ধূর্ত প্রকৃতির এ লোকটিকে টাইম ম্যাগাজিন বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজবেল্ট কিংবা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সঙ্গে নানা বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক ছিল তার। জানা যায় পার্টির বন্ধুদের সঙ্গে সারা রাত সিনেমা ও আড্ডা দিয়ে পরদিন নিজের রুমে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে ছিলেন। গায়ে নিজের মূত্র মেখে অপ্রকৃতিস্থ পড়ে থাকা অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে মারা যান। যদিও তার মেয়ে স্ভেতলানা আলুলায়েভা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন। তার মেয়ে মনে করেন,  বাবার পরিণতির জন্য তার পলিব্যুরোর বন্ধুরাই দায়ী। তার ইউনিয়নের সহকর্মী লাভ্রেন্তি বেরিয়া, নিকিতা ক্রুশ্চভ প্রমুখের ভূমিকা ছিল এর পিছনে বলে মনে করেন। যদিও নিকিতা ক্রুশ্চভ পরবর্তীতে স্টালিনেরই স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন।

2

তবে স্টালিন সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিম্ন কৃষিপ্রধান দেশ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী শিল্প-সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরিত করেছিলেন সত্য। কৃষকদের একক জমিজমার পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ খামার তৈরি করেছেন। সারা বিশ্বে কমিউনিস্ট প্রজন্মকে গড়ে তোলার কাজে তিনিই ছিল সর্বাগ্রে। তিনি ছিলেন বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের বিরোধী। স্টালিনের আরেকটি বড় কাজ হলো—ফ্যাসিবাদকে মানবজাতির চরমতম শত্রু হিসেবে ঘোষণা করা। এবং এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। যে ফ্যাসিবাদ শুরু হয়েছিল মুসোলিনকে দিয়ে এবং অবদমিত হয়েছিল হিটলারের উৎখাতের মধ্য দিয়ে। যদিও নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ে। তবু তার রাজনৈতিক প্রভাব সারা বিশ্বে এখন দুর্দণ্ড প্রতাপে বিদ্যমান। বিশ্ব-রাজনীতির একটা শিক্ষা তার মধ্য দিয়ে পাওয়া যায়।

স্টালিনের মৃত্যুটা ছিল অনেকাংশেই অপমানজনক। অনেকে বলেন মৃত্যুর পর রাতের অন্ধকারে কবর থেকে তার দেহাবশেষ তুলে এনে ছাই করে দেওয়া হয়। সে-সময় রাশিয়ায় ফতোয়া জারি করা হয়—পুড়িয়ে শেষ করে দাও স্টালিনের সমস্ত কৃতি ও স্মৃতি। স্টালিনের রচনাবলি মার্কসবাদী কমিউনিজম ধারার অনন্য সম্পদ। তার ইংরেজি রচনাবলি থেকে বাংলায় চৌদ্দখণ্ডে অনুবাদ প্রকাশিত হয়। প্রকাশক মজহারুল ইসলাম। কলকাতার ‘নবজাতক প্রকাশন’ থেকে চৌদ্দখণ্ডে প্রকাশিত এ ‘স্তালিন রচনাবলী’র সম্পাদকমণ্ডলী ছিলেন : পীযুষ দাশগুপ্ত, কল্পতরু সেনগুপ্ত, প্রভাস সিংহ, শঙ্কর দাশগুপ্ত, সুদর্শন রায় চৌধুরী। স্টালিনের রচনাবলি কমিউনিস্ট রাজনীতি ধারার অমূল্য সম্পদ।

মার্কস-এঙ্গেলস-লেলিন-স্টালিনের বস্তুবাদী মতাদর্শের কমিউনিস্ট রাজনীতির ধারা সারা বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চিলি, মেক্সিকো, পেরু, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ব্রিটেন, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড, ইতালি প্রভৃতি অসংখ্য দেশে অসংখ্য বৈশিষ্ট্যে এ ধারার রাজনীতির চর্চা খুব জোরালভাবে বিদ্যমান। এ মার্কসবাদ ধারার রাজনীতির চর্চায় মার্কস, এঙ্গেলস, ট্রটস্কি, লেলিন কিংবা স্টালিনকে আদর্শ বলে মনে থাকে। কমিউনিস্ট ধারার ক্ষমতার চর্চা ও বিশ্ববিস্তারে স্টালিন অন্যতম আর্দশ। তবে, স্টালিনের মৃত্যুর পর থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর পর্যন্ত আমেরিকান বুর্জোয়া শক্তিসহ বিভিন্ন দেশ থেকেই গল্প, কৌতুক, নাটক, ডকুমেন্টারি, বিভিন্নজনের সাক্ষাৎকার, সিনেমায় স্টালিনের চরিত্রের নানা নেতিবাচক বিষয়গুলো উত্থাপিত হতে থাকে। এগুলোর কোনোটি সত্য; কোনোটি ঘটনার কোনো উৎসমূল নেই, আবার কোনো ঘটনা পুরোটাই মিথ্যা আর কোনোটা বা বিতর্কিত। তবে প্রচলিত প্রায় সবগুলোই স্টালিনের বীভৎসতাকে ঘিরে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত সেগুলো বিষয়গুলোর অধিকাংশই তার মেয়েসহ অসংখ্য গবেষণার তথ্য-উপাত্তে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। স্টালিনকে নিয়ে এত নিন্দা, সমালোচনা, হিংসা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। অনেকে মনে করে, হিটলারের মধ্যদিয়ে এ প্রোপাগান্ডার শুরু হয়েছিল। জার্মানির পতন হলে ট্রুম্যান ও চার্চিলের অবদানও কম ছিল না। ভেঙে যাওয়া মার্কসবাদকে পরবর্তী সময়ে ট্রটস্কি, জিনোভিয়েত, কামেনেভ, বুখারিন, রাইকভ প্রমুখের পরিচালিত কার্যত পদক্ষেত্রে মার্কসবাদ-লেলিনবাদ বিকশিত হয়েছে।

3

সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার তাদের ‘স্তালিন’ নাটক নির্মাণে সুভ্যিনিয়রে উল্লেখ করেছেন যে, নাটকটির বিষয় বা পাণ্ডুলিপি তৈরিতে সাইমন সিব্যাগ মন্টিফিওরের ‘স্তালিন : দ্য কোর্ট অব দ্য রেড জার’, স্ভেৎলানা অ্যালিলুয়েভার ‘অনলি ওয়ান ইয়ার’ ও ‘টোয়েন্টি লেটার্স টু আ ফ্রেন্ড’, ডেভিড পিনারের ‘দ্য টেডি বিয়ার্স পিকনিক’ এবং রোজমেরি সুলিভানের ‘স্তালিন্স ডটার’ থেকে নাটকের ঘটনা ও নাট্যক্রিয়ার উপকরণ সংগ্রহ করছেন।

১২ জুন, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭টায় শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকটির প্রদর্শনী হয়। শিল্পকলা একাডেমির বড় হলে প্রবেশ করতেই দেখা যায়—সমস্ত লবি জুড়ে প্রায় লাল রঙের আবহ। একপাশে পিয়ানো রাখা এবং সিএটির কর্মীদল কমরেড ক্যাপ বিলি করছে। প্রথমেই বুঝা গেল দর্শকেও মানসিকভাবে মার্কসীজমে প্রবেশ করিয়ে তারপর নাট্যস্রোতে ভাসাতে। বেশ মজারই অভিজ্ঞতা। কমিউনিস্ট ক্যাপ পড়ে নাটকটি দেখা। বেশ উপভোগ্য। সমস্ত লবিতেই দর্শকে একাকার ছিল। তিল দাঁড়াবার জায়গা প্রায় ছিল না।

দর্শক যখন মাথায় কমিউনিজমের প্রতীকী ক্যাপ পরে অপেক্ষা করছে তখন হঠাৎ করেই উপরের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল একটি মেয়ে।এবড়োখেবড়ো মানসিক বিপর্যস্ত চেহারা। হঠাৎ করে সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করা শুরু করল স্টালিন প্রসঙ্গ নিয়ে। দর্শককে যখন কটাক্ষ করে কথা বলছিল তখন আঁচ করা গেল এ হচ্ছে স্টালিনের মেয়ে সভেৎলানা (সাবিনা সুলতানা)। যে কিনা স্টালিনের জীবনের প্রচলিত বিকৃত ইতিহাস নিয়ে খুব ক্ষিপ্ত। সে তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সম্পর্কে অবহিত করে যে : ‘সে মরে গেছে, কিন্তু তার ছায়া এখনো আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ছায়াটা আমাদেরকে একের পর এক নির্দেশ দিয়ে যায়। আর আমাদের ওপরে জমে থাকা মেঘ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় অন্ধকারে।’ তারপর এক মানসিক অভিঘাত ও খচিত ভগ্ন হৃদয়ে আমাকের দর্শকদের নিয়ে গেল তার বারার প্রকৃত ইতিহাসের নির্যাসে।

4

নাটকটিতে স্টালিনের মেয়ে সভেৎলানার (Svetlana Alliluyeva) দৃষ্টিভঙ্গিতে স্টালিনের শেষ জীবন, পারিষদবর্গ ও রাজনীতিক জীবন অধ্যায়ের মাধ্যমে বাবার চরিত্রের নানা বিষয়ের অপনোদন ও চরিত্র বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। স্টালিনের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছে তিনজন—সাবিনা সুলতানা, চিন্ময়ী গুপ্তা ও কাবেরী জান্নাত। সাবিনা সুলতানা মূল মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করলেও বাল্যকালের ঘটনাগুলোর নির্মাণে বাল্যকালের চরিত্রে চিন্ময়ী গুপ্তা ও কাবেরী জান্নাত অভিনয় করেছেন। নির্দেশক মূলত স্টালিনের মেয়ে Svetlana Alliluyevaএর ১৯৬৭ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত Twenty Letters to a Friend (Dvadtsat’ pisem k drugu) দ্বারাই সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছেন ঘটনার উপস্থাপনে।


‘স্তালিন’ নাটককে ইতিহাসের চরিত্রের পাশাপাশি কৌতুক-হাস্য ও বিনোদনের জন্য কিছু কল্পিত চরিত্রের সৃষ্টি হয়েছে বলেও মনে হয়েছে। 


তখন দর্শক মঞ্চে প্রবেশ করা শুরু করেন। মঞ্চে প্রবেশ করতেই দেখা যায় উপরের বসবার স্থানে দাঁড়িয়ে স্টালিন সিনেমা দেখছে মঞ্চে। মঞ্চ তখন সিনেমা চলছে আর সিনেমার পর্দার সাথে পুুলিশের বন্দুকের নলের সামনে সিনেমার পরিচালক আইজেনস্টাইন দাঁড়াল।সের্গেই আইজেনস্টাইন নির্মিত এই সিনেমাটিতে দেখানো হচ্ছিল রাশিয়ার চতুর্থ ইভানের জীবনী। জার নিকোলাস-২ পতনের মধ্য দিয়ে জার শাসনের অবসান হলেও রাশিয়াতে জার বংশ কোনোভাবে টিকে ছিল। এ সিনেমায় পতন হওয়ার জার ধারার ইভানের প্রশংসা করতেন স্টালিন এবং নিজেকে তার সাথে তুলনা করতেন। এটা দেখে ভিন্ন অজুহাত তুলে স্টালিন এ সিনেমাটিকে বন্ধ করে দেন। যদিও পরে আইজেনস্টাইনের সমস্ত কাজই নষ্ট করে দিয়েছিলেন স্টালিন। আইজেনস্টাইন চরিত্রে অভিনয় করেছেন একে আজাদ সেতু। এ সিনেমার একটি দৃশ্যে জার যখন দীর্ঘক্ষণ ধরে চুম্বন করছিল তখন উপর থেকে স্টালিন (রায়হান আখতার) হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন :

‘সিনেমা বন্ধ কর। একজন ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রপ্রধান এতক্ষণ ধরে দৃশ্যে চুমো খেতে পারে?’

5

ক্ষমতা রক্ষায় স্টালিনের বিরুদ্ধ ক্ষমতা বা ইমেজগুলোকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে নাটকের পর্দা উঠে। দেখা যায় মঞ্চটি প্রায় লাল রঙের আভায় বিভাসিত। একপাশে স্টালিনের বসার চেয়ার টেবিল এবং অন্যপাশে তার সহকারীর চেয়ার টেবিল। সংলাপনির্ভর উপস্থাপন। বাস্তববাদী ধারার সঙ্গে কখনো সাজেস্টিক-প্রতীক ধারার মিশ্রণ ঘটেছে।

মঞ্চের দুপাশে দুটো টেবিল-চেয়ার। বাঁ বাশে স্টালিন (মো. শাহদাত হোসেন) এবং অন্যপাশে তাঁর সেক্রেটারি আলেকসান্দর পসক্রেবিশেভ সাশা (মোহাম্মদ রাফী সুমন)। স্টালিনের ক্ষিপ্ত আচরণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় কথোকথন। দুজনের সংলাপে উঠে আসতে থাকে ওই সময়কার রাশিয়ার নানা রাজনৈতিক ঘটনা। সেখানে আরও উপস্থিত হন দেহরক্ষী মেজর ভ্লাসিক (শাওন কুমার দে)। নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যেন মরিয়া উঠতে থাকেন স্টালিন। স্টালিন চরিত্রে মো. শাহদাত হোসেনের অসাধারণ প্রাণবন্ত বিশ্বাসযোগ্যতা দর্শককে মুগ্ধ না করে পারে না। সংলাপ-চলন-আচরণে ও ভাবপ্রকাশের স্বচ্ছন্দতা স্টালিন চরিত্রের ঠান্ডা মস্তিষ্কের রূঢ় হিংস্রতার রূপই তুলে ধরে। তবে ঠান্ডার অভিনয়ে অনেক সময় কৌতুকতার সৃষ্টিই বেশি হয়ে উঠেছে। এমন সময় প্রবেশ করে বেয়ারা ভালেশকা (শিপ্রা দাস)। চরিত্রটি নিতম্ব দুলিয়ে দুলিয়ে মদ্য পরিবেশনে দর্শকদের বেশ বিনোদিতই করেছে। ‘স্তালিন’ নাটককে ইতিহাসের চরিত্রের পাশাপাশি কৌতুক-হাস্য ও বিনোদনের জন্য কিছু কল্পিত চরিত্রের সৃষ্টি হয়েছে বলেও মনে হয়েছে। স্টালিন সেখানে ডেকে পাঠান তাঁর পলিটব্যুরোর সদস্যদের। কিন্তু পলিটব্যুরোর সদস্যরা উপস্থিত হওয়ার আগে সেখানে উপস্থিত হন স্টালিনের গুপ্ত পুলিশ বাহিনীর প্রধান নিকোলাই ইয়েঝভ (শান্তনু চৌধুরী)। স্টালিনকে তিনি একটি তালিকা ধরিয়ে দেন, যাতে তিনি লিখে এনেছেন পলিটব্যুরোর সদস্যদের মধ্যে কাকে কাকে ছাঁটাই করতে হবে। সে তালিকায় ইয়েঝভের অধস্তন কর্মচারীর নামও ছিল। এ নিয়ে নানা কৌতুক ও হাস্যরসের মধ্য দিয়ে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে আসলে প্রতিপক্ষকে শেষ করে দিয়ে নিজের অস্তিত্ব ও আধিপত্য রক্ষাটাই কাজের মূল। স্টালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নে সংঘটিত রাজনৈতিক দমনমূল অভিযানে ইয়েঝভ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও স্টালিনের নির্দেশে তাকেও অল্পকিছু কাল পরে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। ধীরে ধীরে স্টালিনে বীভৎসতা ও মানসিক বৈকল্য প্রকাশিত হয়ে উঠতে থাকে।

6

পুলিশ বাহিনীর প্রধান নিকোলাই ইয়েঝভ (শান্তনু চৌধুরী) অসাধারণ সাত্ত্বিক বিশ্বাসের পরিচয় দিয়েেেছন। স্বচ্ছন্দ ছিল তার মঞ্চ চলন। মঞ্চে দৃশ্য নির্মাণের জন্য খুব বিশেষ কিছু উপকরণ ব্যবহার করেন নি। টেবিল-চেয়ার, বক্স, ফুলদানি, ইজি চেয়ার ইত্যাদি সাধারণ জিনিসপত্র দিয়েই বিভিন্ন দৃশ্য নির্মাণ করেছেন। ধীরে ধীরে মঞ্চে উপস্থিত হন স্টালিনের পলিব্যুরোর সদস্য ক্রুশ্চেভ (সুব্রত প্রসাদ বর্মন (মিঠু)। যে রাজনৈতিক ক্ষমতায় স্টালিনের পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। স্টালিন পরিবারের অতি ঘনিষ্ঠ ছিল। স্টালিনের মৃত্যুর পর তার মেয়ে স্টালিন সম্পর্কে অপপ্রচার ও মৃত্যুর জন্য ক্রুশ্চেভকে দায়ী করেছিল। সুব্রত প্রসাদ বর্মন অত্যন্ত তেলমর্দন ও কথার ফুলছুড়ি ও কৌতুকে মোহিত করে রাখতেন স্টালিনকে। আরো উপস্থিত হয় পলিবুর‌্যোর সদস্য মলোতভ, মালেনকভসহ কয়েকজন। নির্দেশক সম্ভবত নাটকীয়তা তৈরি করার জন্যই এক নারীকে দিয়ে পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করিয়েছেন। পলিবুর‌্যোর সদস্য হিসেবে সেও ছিল সক্রিয়। স্টালিন তাঁদের সঙ্গে রাজনীতির এক জটিল ও নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠেন এবং স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে তিনি একের পর এক মৃত্যু পরোয়ানা জারি করতে থাকেন। তার একসময়কার সহকর্মী নিকোলাই বুখারিনকে গ্রেপ্তার করেন এবং লোকদেখানো বিচারকাজ চালিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। যদিও বুখারিনকে মঞ্চ উপস্থাপন করেন নি। এদিকে তাঁর আরেক সহকর্মী ট্রটস্কি নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য পালিয়ে বেড়ান। জনগণের মধ্যে ট্রটস্কি সম্পর্কে নানা অপপ্রচার চালাতে থাকেন। মার্কসবাদ সমাজতন্ত্রী শ্রমিকনির্ভর রাজনীতি হয়ে হয়ে একনায়ক তন্ত্রে নব্য স্টালিন বাদে।

সমস্ত নাটকটাই স্টালিনের দমন-পীড়নকে ঘিরে। ট্রটক্সিকে মঞ্চে দেখানো হয় না। তাকে মেরে ফেলার জন্য স্টালিনের গুপ্ত পুলিশ বাহিনীর প্রধান নিকোলাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়। স্টালিনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে বাক্‌স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায়। তিনি মায়ারহোল্ডকে গ্রেপ্তার করেন। তারপর তাঁকে প্রচণ্ড নির্যাতন করেন এবং মৃত্যুদণ্ড দেন। স্টালিনের এই নিষ্ঠুরতার কারণে পলিব্যুরোর সদস্যরা সব সময় মৃত্যুভয়ে ভীত থাকেন। স্টালিনের চারপাশে গতিশীল থাকে এসব চাটুকারের দল। স্টালিন তাঁর পৈশাচিক আচরণ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সহকর্মীদের কাছ থেকে তো বটেই, পরিবারের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হওয়া ছেলেকে ফিরিয়ে আনার কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেন না স্টালিন। এ কারণে মেয়ে স্ভেৎলানার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। নানা ঘটনায় স্টালিনের মতো একজন একনায়ক জীবনসায়াহ্নে পুরোপুরি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। বিশ্বাসঘাতকতা করার কারণে নিজের স্ত্রীকে হত্যার প্রসঙ্গ ওঠে। প্যারাডক্সীয় ধারায় স্টালিনের সংলাপে ফুটে উঠে, ‘তিনিই স্টালিনকে হত্যা করে গেছেন।’ নাটকের সবচেয়ে কুচক্রী চরিত্রে বেরিয়া চরিত্রে অভিনয় করেছেন এ কে আজাদ সেতু। যদিও তার কৌতুক ও অতি অভিনয়ে ঠাসা ছিল দৃশ্যের পর দৃশ্য তবু তার অভিব্যক্তি ও সংলাপগুলোকে কুচক্রের প্রতীক রূপায়িত হয়ে উঠেছে। অত্যন্ত প্রাণবন্ত ছিল তার চলন, সংলাপ ও ভাবপ্রকাশ। জটিল ঘটনার অত্যন্ত সরলী কৌতুকপূর্ণ প্রকাশ ছিল তার অভিনয়ে। এ বেরিয়াকে ইতিহাসে জল্লাদ বলে অভিহিত করা হয়েছে। চল্লিশের দশকে নানা অজুহাত তুলে নির্বিচারে হত্যার পর হত্যা চালিয়েছেন এক বেরিয়ার। নাটকের শেষে সিনেমা প্রতীকীমৃত্যু দেখানোর মধ্য দিয়ে ‘স্তালিন’ নাটকের সমাপ্তি ঘটে।

7

এ নাটকটি প্রকৃত অর্থে স্টালিনের মেয়ের পারসপেকটিভে স্টালিনের রাজনৈতিক জীবনের শেষ সময়। নির্দেশক এ ‘স্তালিন’ নাটকে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রনায়ক স্টালিনের জীবন পরিক্রমাটি দেখান নি।নাটকে বিধৃত গল্প বিন্যাসের সমকাল হিসেবে চল্লিশদশক ও তার পরবর্তী সময়কে তুলে ধরেছেন। ব্যক্তিগত জীবন চরিত্রের কোনো ঘটনার দৃশ্যরূপায়নই ঘটে নি নাটকে। দু-একবার নানা প্রসঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে দুএকটি বিষয় যদিও এসেছে। নির্দেশক শিল্পনির্মাণে শিল্পসৌন্দর্য সৃজনের চেয়ে স্টালিনের জীবনের শেষ সময়ের বৈকল্য কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ দেখানোতেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। নাট্যবৃত্ত নির্মাণে কোনো অভিঘাত তৈরি করেন নি।


নাটকে কোনো রাজনৈতিক অভিঘাত তৈরি করা কিংবা কাউকে আঘাত করার কোনো প্রবণতা ছিল না।


নাটকের গল্পটি খুবই সাধারণ। একরৈখিক সংলাপ নির্ভর ও শারীরিক ক্রিয়ায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে নাটকটি। ধ্রুপদী ক্ষুদ্র পরিসরের বিষয়ের দৃশ্য নির্মাণে এত সময় ব্যয় হয়েছে তা বাহুল্যদোষেই দুষ্ট করে। এ নাটকে ডিনারের দৃশ্যই এসেছে চারবার। শুধু কিছু ডায়ালগের ভিন্নতা ছাড়া আর বিষয় বা গল্পগত খুব বড় কোনো পার্থক্য নেই। মেয়ের সঙ্গে বাবার ড্রয়িং রুমের দৃশ্য দুটো। একটি দৃশ্যে মেয়ে নিজের বিয়ের কথা বলে। আরেকটি দৃশ্যে মার মৃত্যুর প্রসঙ্গ স্থান পায়। দুটো ঘটনা একটি দৃশ্যে করলে এমন কী ক্ষতি কিছু হতো। স্থান-কাল পাত্রভেদ বলে বিষয় আছে। ইউরোপীয়দের থিয়েটার দেখা আর বাঙালির নাট্য দেখার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। সে ক্ষেত্রে সময়ের ব্যাপ্তিও একটা বড় বিষয়। বর্তমান সময়ে বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতা পাঠে নাটকটির গুরুত্ব অপরিসীম। নাটকটিকে নির্দেশক ডার্ক কমেডি হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছে। কারণ চরিত্রগুলোর মধ্যে কৌতুকত্ব থাকলেও দর্শক সে কৌতুকত্বে না হেসে নীরব উপলব্ধি করেছেন বলে এ ধরনের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করতে চেয়েছে। নির্দেশক যদি এক তাত্ত্বিকভিত্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তবে নাটকের বিষয়ের যে গুরুত্ব তা হ্রাস পেয়ে সস্তা ভিন্নমাত্রা তৈরি করবে। কিন্তু নির্দেশক যদি অতিক্ষমতায় মানসিক বৈকল্য, পলিব্যুরোতের সাইকো ফ্যানত্ব কিংবা নৃশংসতার ভিন্ন দৃষ্টিকোণ দেখাতে চান তাহলে চরিত্রের ধ্রুপদী রূপকেই চিহ্নিত করবে। আলো, পোশাক, প্রপস, ভিড়িওগ্রাফি সবকিছু মিলিয়ে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হলেও শিল্পের উচ্চাঙ্গে পৌঁছার প্রবণতা ছিল। সেট ব্যবহারের কোনো বাহুল্যতা ছিল না। নাটকের টিমওয়ার্ক ছিল অসাধারণ। মাত্র তিন মাসের পরিশ্রমে এক কষ্টসাধ্য একটি নাটক মঞ্চে উপস্থাপন করতে পেরেছে তা নিঃসন্দেহে অধিক পরিশ্রম সাপেক্ষ।

8

নির্দেশনা ডিজাইনের দিক থিকে এর চেয়ে অসংখ্য শৈল্পিক নাটক বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে ইতঃপূর্বে। সাম্প্রতিক এধাঁচে ‘ক্যালিগুলা’ নাটকের নির্মিত দৃশ্যকল্পগুলোও শিল্পনন্দনে অনেক উন্নত বলে প্রশংসিত হয়েছে। আর সৈয়দ জামিল আহমেদের ‘রিজওয়ান’ নাটকটি বিষয়, মঞ্চবিন্যাস, অভিনয় ও আবহে বাংলাদেশের নাট্যজগতের সর্বকালকে ছাড়িয়ে গেছে। ‘স্তালিন’ নাটক নির্দেশনায় নতুনত্বের খুব কিছু নেই। অত্যন্ত সাধারণী। তবে আছে বিষয়ের নতুনত্ব। তবে উপস্থাপনে বহুমাত্রী উপকরণে উপস্থাপন করেছেন। ক্ষমতাধর স্টালিনের চারপাশের পলিব্যুরোর সাইকো ফ্যানদের প্রভাব ও রাজনৈতিক মতাদর্শ দেখানো ঘিরেই কমেডি-কৌতুক। এমন ক্ষমতাধর বিপ্লবী রাষ্ট্রনায়কের জীবনের পরিণতির বাস্তবতা আজকেও বিশ্বরাজনীতিতে সমভাবে প্রবল। চারপাশের অতিভক্তরা কিভাবে বিকৃত করে; স্বৈরাচারী করে; কিংবা হয়ে ওঠে; ক্ষমতা-স্খলনের দিকে নিয়ে যেতে পারে তারই একটি নমুনা। মৃত্যুকে সর্বক্ষণ মেনে নেওয়া কমরেড আদর্শের প্রতীকে সমস্ত মঞ্চটাই রক্তাভ ব্যঞ্জনায় বিধৃত করেছেন নির্দেশক। ইউরোপীয় আঙ্গিকে নাটকটি উপস্থাপিত। প্রসেনিয়াম ধারায় তার সমস্ত মঞ্চবিন্যাস। অভিনয়, চরিত্রায়ণ, আলোসহ নানা নাট্যপ্রযুক্তির কৌশলে তুলে ধরেছেন স্টালিনীয় কমিউনিজম ও তার অন্তঃসারশূন্যতা। প্রচলিত স্টালিন চরিত্রের বিতর্কিত নানা নোংরা বিষয়গুলোকে নির্দেশক পাশ কাটিয়ে মহত্তর দৃশ্যকল্পে নির্মাণ করেছেন। ধর্ষণ, ডাকাতি, মূত্র গায়ে মাখা এসবকে উপেক্ষা করে স্টালিন চরিত্রের কৌতুকপূর্ণ আরেক নতুন ডিসকোর্স তৈরি করেছেন।

9

নৃশংস ঠান্ডা মাথার কৌতুকী স্টালিন চরিত্রের অনুল্লিখিত রূপটি যেন দর্শকের সামনে মূর্ত হয়েছে। নাটকের বিষয়গত ঐক্য অতি ক্ষুদ্র হবার কারণে একই রূপকল্পেরই একাধিক দৃশ্য বলে কখনো ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। রিপিটেশন, ঘটনার গতি রেখা ও নাট্যমহূর্ত তৈরিতে আরো সচেতনতা নাটকটিকে আরো উপভোগ্য করে তুলতে পারত। যে দর্শক স্টালিন চরিত্রের জন্ম-মৃত্যুর তারিখ জেনেই সীমাবদ্ধ সে মার্কস, লেলিনবাদ কিংবা ট্রটস্কির দেশত্যাগ, পলিব্যুরোর সদস্যগণ, শুদ্ধিকরণ, কমিউনিজমের ভূত-ভবিষ্যৎ বা স্টালিনমতাদর্শের সাবটেক্সট আশ্রিত অবারিত সংলাপের পর সংলাপে বরিং হওয়াটইি স্বাভাবিক। সেজন্য নাটকের শুরুতে স্টালিনের জীবনীর উপর সংক্ষিপ্ত পাঠ বা ডকুমেন্টারি কিংবা স্টালিনপ্রেক্ষিত সম্পর্কে সাধারণ ধারণা প্রদান করা প্রয়োজন ছিল। মেয়ের পাসপেক্টিভে প্রকাশিত স্টালিনের রাজনৈতিক জীবনের গোপন সত্য ও কিছু অপবাদের অপনোদন হয়েছে বটে তবে এটি আরেকটি স্টালিন চরিত্রের ব্যাখ্যানে রূপ নিয়েছে। আর দু-ঘণ্টার বেশি সময় মানে দীর্ঘ সময়। নাটকের নানা অনুভূতি নিয়ে বলার আছে আরো অনেক কিছু। তবে সিএটি নতুন করে মঞ্চে ফিরে এসেছে এটা আশাব্যঞ্জক। নাটকটির বাংলা ভাষ্য করেছেন রায়হান আখতার, শব্দ-মিউজিক ও ভিডিওগ্রাফিতে আহসান রেজা খান, সেট পরিকল্পনায় সরদার আফতার উদ্দিন, এস এম ইসমাইল হোসেন, আলোক পরিকল্পনায় নাসিরুল হক খোকন, পোশাক পরিকল্পনায় রহমতুল্লাহ বাসু, চিন্ময়ী গুপ্তা, এসএম ইসমাইল হোসেন, প্রপস একে আজাদ সেতু, অ্যানিমেশন : শাহাদাৎ হোসেন অপু ও মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় ছিলেন এসএম ইসমাইল হোসেন।

নির্দেশক কামালউদ্দিন নীলু বলেন, ‘একজন নাট্য নির্দেশক দর্শককে কী দেখাবেন, আর কী দেখাবেন না, এটা তো তার ওপরে নির্ভর করে। আমি একজন দর্শক হিসেবে সেটা গ্রহণ করতেও পারি বা নাও করতে পারি। অর্থাৎ থিয়েটারে কিন্তু নির্দেশকের যেমন একটা স্বাধীনতা থাকে তেমনিক দর্শকেরও কিন্তু স্বাধীনতা থাকে এবং সেই কারণে থিয়েটারকে কখনো বেঁধে রাখা যায় না। …কখনো এটা গভীর বাস্তবতার প্রতিফলন হয়ে উঠতে পারে, আবার কখনো গভীর বাস্তবতাকে ঢেকেও দিতে পারে বা নষ্ট করে ফেলতে পারে। আবার কখনো বাস্তবতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রেখেই সৃষ্টি করতে পারে নিজস্ব মূর্তি।’

10

নাটকে কোনো রাজনৈতিক অভিঘাত তৈরি করা কিংবা কাউকে আঘাত করার কোনো প্রবণতা ছিল না। নাটকের মনস্তত্বে স্টালিনের বৈকল্যকে বাংলাদেশের দর্শককে নতুন করে চেনানো বা দেখানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। স্টালিনের রচনাবলি দিয়ে যদি কেউ এ নাটকে স্টালিনকে খুঁজতে যান তবে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হবেন। বিষয়ের অভিনবত্ব প্রচলিত স্টালিনকে ভেঙে নতুন আরেক স্টালিন ব্যাখ্যানে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশ হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত জাতি। আমরা ফ্যাসিবাদী নই। আমরা চাই হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের আলোয় আমাদের জাগরণ ঘটুক। অতীত ঐতিহ্যকে ঘিরে বিশ্বমাত্রার সমৃদ্ধ জীবনের বিকাশ ঘটুক। উপনিবেশের দীর্ঘ বঞ্চনার বিপরীতে আমরা আত্মনির্ভরশীল ও আত্মপরিচয়ে উদ্ভাসিত হই। তাই স্টালিনের নাটক যেন ঐতিহ্যবিকাশ বিরোধী সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুপ্রেষণ না হয়ে ওঠে এ কামনা করি। উপস্থাপনার অন্তঃস্রোত যেন আমাদের জীবন-সংস্কৃতির বিকাশের কথাই বলে কিংবা বিকাশকে ত্বরান্বিত করে। আমরা অতীতকে ধারণ করে সারা বিশ্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিকশিত হব বিশ্বসভায় এটাই কামনা করি।

আবু সাঈদ তুলু

জন্ম ১ মার্চ, ১৯৭৯; জামালপুর । তিনি শৈশব থেকেই সাহিত্য-শিল্পের প্রতি অনুরাগী। দীর্ঘদিন ধরে নাটক, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখে আসছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।

প্রকাশিত বই :

লিপির উদ্ভব, ক্রমবিবর্তন ও বাংলা লিপির পরিণত পর্যায় [প্রবন্ধ; অন্তরীপ পাবলিকেশন, ২০০৭]
বিপ্রলব্ধ [উপন্যাস; শিখা প্রকাশনী, ২০০৮]
রূপান্তরবাদ [শিখা প্রকাশনী, ২০০৯]
অনন্তপথের যাত্রী [ভাষাচিত্র, ২০১৪]
জলের আয়না [ভাষাচিত্র, ২০১৫]
পাতার বাঁশি [লিটলবিট, ২০১৭]
সেলিম আল দীনের সাহিত্য ভাবনা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮]

ই-মেইল : tuluart@yahoo.com