হোম গদ্য সে ভাষা ভুলিয়া গেছি

সে ভাষা ভুলিয়া গেছি

সে ভাষা ভুলিয়া গেছি
1.22K
0

রবীন্দ্রনাথ নিজে সাধু ভাষায় লিখলেও পরে তিনি চলতি ভাষায় লিখতে শুরু করেন। এক অর্থে রবীন্দ্রনাথের সময়ই সাধু ভাষার প্রয়াণ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথের পরেও অবশ্য দুএকজন লিখেছেন অতীতের খোঁয়ারি থেকে, যেমন কমল কুমার মজুমদার, কিংবা হয়তো আরও কেউ কেউ, কিন্তু সেসব চেষ্টা ছিল প্রচলের প্রতি এক অসার প্রত্যাখ্যান। সংস্কৃত বা লাতিন ভাষা যেমন গণমানুষের মুখের বুলি ছিল না, তেমনিভাবে সাধু ভাষাও সাধারণের মুখের ভাষা ছিল না কখনোই। কিন্তু তবু, লাতিন ও সংস্কৃত ভাষার মতোই তা দীর্ঘদিন প্রবহমান ছিল মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক পেশার সাথে সম্পর্কিত গুটিকয় মানুষের চর্চার বাহন হিসেবে। আজও আদালত ও সংবিধানসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সাধু ভাষার মুমূর্ষু অস্তিত্ব রয়েছে—তা কেবলই রায় বা বিধান প্রকাশের ক্ষেত্রে। আমার ধারণা এক সময় আদালত ও সংবিধানের ভাষাকেও মানুষের মুখের ভাষায় কথা বলতে হবে। তা নাহলে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।


সাধু ভাষা মরে গেছে, ওটি আর কখনোই যিশুর মতো পুনরুজ্জীবিত হবে না।


যখন পত্রপত্রিকা পড়ার মতো বয়স হয়েছে তখন ইত্তেফাকের সাধু ভাষায় সংবাদ ও সম্পাদকীয় পড়তে গিয়ে বারবার বাধাগ্রস্ত বোধ করতাম। মনে হতো পরলোকের অচেনা ভাষায় ইহলোকের ঘটনা পড়ছি। কিছুতেই ওতে মনঃসংযোগ করা যেত না। তখনই মনে প্রশ্ন জেগেছিল কেন তারা এই ভাষায় পত্রিকা প্রকাশ করছে? আরও পরে যখন লক্ষ করি আমাদের চেয়ে ঈষৎ বয়োজ্যেষ্ঠ দুএকজন সাধু ভাষায় লিখছেন তখন তা দেখে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছি। এখনও তারা লেখেন, তবে এখন আর বিস্মিত হই না, বরং হাসি, তারা মৃতদেহ বহন করছেন ব’লে। সাধু ভাষা মরে গেছে, ওটি আর কখনোই যিশুর মতো পুনরুজ্জীবিত হবে না। প্রতিটি জিনিসেরই আবির্ভাব হয় যুগের প্রয়োজনে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে মানুষ তা বর্জন করে, কিংবা সেই বস্তুটি নিজেই প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলে মৃত্যুবরণ করে।

কিন্তু তবু আমাদের কাছে এই প্রশ্ন আসবে যে ইতিমধ্যে যারা লিখেছেন আমরা কি তাদের লেখা বর্জন করব কিংবা আজকের দিনের গুটিকয় সাধুভাষী লেখকদের লেখা পড়লেও কি একই প্রতিক্রিয়া হয়? না, একই প্রতিক্রিয়া হয় না। না হওয়ার কারণ বঙ্কিম কিংবা রবীন্দ্রনাথের সাধু ভাষার লেখা রচনাগুলো আমরা পড়ি বটে, তবে আমাদের সচেতন মন আমাদেরকে আগেই এই তথ্য দিয়ে রাখে যে আমরা আমাদের কাল থেকে দূরবর্তী এক লেখকের লেখা পড়ছি। সেই লেখকের সাংস্কৃতিক আবহ আমাদেরকে অজ্ঞাতে প্রস্তুত করে রাখে তার লেখাটিকে সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে পাঠ করার জন্য। ফলে বঙ্কিমের লেখাটি পড়ার সময় আমার কাছে তা অস্বাভাবিক মনে হয় না। কেননা, তখন চলতি ভাষায় যেহেতু কেউ লিখতেন না, ফলে তার ওই সাধু ভাষাকে অদ্ভুত বলে মনে হয় না। এমনকি তা পাঠের সময় মনের মধ্যে কোনো ভাষিক বৈষম্যও বোধ হয় না।  ঠিক যেমনভাবে আমরা যখন বিদেশি কোনো সাহিত্য পড়ি তখন ভিন্ন সংস্কৃতির আবহে কাহিনিটি আবর্তিত হলেও আমাদের পাঠকে তা বাধাগ্রস্ত করে না, অচেনা ও অজানা হওয়া সত্ত্বেও। কারণ পড়ার আগেই আমি জানি যে ফকনার, কিংবা হেমিংওয়ে, তুর্গেনিভ কিংবা আঁদ্রে জিদ—এরা বিদেশি লেখক। সুতরাং তাদের চরিত্র, ঘটনার স্থান ও কাল আমাদের কাছে অচেনা হবে, কিন্তু তা বাধা হয়ে উঠবে না রস আস্বাদনের ক্ষেত্রে। বঙ্কিম, অক্ষয় কুমার বড়াল, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কিংবা স্বর্ণকুমারী দেবী অথবা বেগম রোকেয়ার সাধু ভাষায় রচিত রচনাবলি পাঠের সময় ভাষার এই ব্যবধান লুপ্ত হয়ে যায়—মূলত কালের দূরত্বই এই বিলুপ্তির কারণ। কিন্তু আজ জীবিত কোনো লেখক যখন ওই সাধুভাষায় লেখেন তখন তা দেখলে মনে হয় উনি বুঝিবা বর্তমানকে ভেঙচি কাটার জন্য ওই জড়ানো ভাষায় কথা বলছেন, রচিত প্রতিটি বাক্যকে মনে হয় আরূঢ় ভণিতা, এমনকি তিনি যখন অত্যন্ত গুরুভার কোনো বিষয়ে কথা বলছেন তখনও অব্যবহারের কারণে ভাষাটিকে ভাঁড়ামিপূর্ণ বলে মনে হয়। লেখকের সমস্ত কথাকেই স্রেফ কৃত্রিম মনে হয়। মনে হয় তিনি পাঠকের মধ্যে কোনো বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য নয়, নিছক একটি ভাষিক কসরত দেখাবার মাধ্যমে সার্কাসের ভাঁড় হয়ে উঠছেন। বক্তব্যের সঙ্গে ভাষার অসঙ্গতি লেখাটিকে করে তোলে হাস্যকর। এ হলো মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাতের দিক।


সাধু ভাষা যোগাযোগে সক্ষম হলেও তা নির্যাতনমূলক এক সক্ষমতা। সাধারণ মানুষ এই নির্যাতন কেন চাইবেন?


সাধু ভাষা ব্যবহারের বিপক্ষে যাওয়ার বাস্তব কারণও আছে। সাধু ভাষার ক্রিয়াপদ যেহেতু ধ্বনিগতভাবে চলতি ভাষার চেয়ে প্রলম্বিত এবং অন্য শব্দগুলোও চলতি ভাষার শব্দের চেয়ে গুরুভার ও দীর্ঘ, ফলে তা আমাদের অভ্যাসের প্রতিকূল। তাছাড়া এই ভাষা ভাব ও প্রকাশের গতিকে কেবল ধীরই করে না, উপরন্তু তা যেন শব্দের গুরুভার চাপিয়ে ভাবের স্বাভাবিক প্রকাশে জড়তা এনে দেয়। এখনও যারা সাধু ভাষায় লিখতে চান তারা ভাষার স্বাভাবিক গতিকে কেবল অস্বীকারই করেন না, তারা মনোভাবের দিক থেকেও প্রতিক্রিয়াশীলতারই অনুবর্তী হয়ে ওঠেন। প্রতিক্রিয়াশীলতা শব্দটি যেহেতু রাজনৈতিক বিশ্বাসকে প্রকাশ করে, ফলে সাধু ভাষার রাজনৈতিক ‍দৃষ্টিভঙ্গিটিও আলোচনা করা উচিত। যে-ভাষার ব্যবহার সাধারণ্যে নেই তা ব্যবহারের মাধ্যমে তারা জনরুচি বা জনসম্পৃক্ততার প্রশ্নটি উপেক্ষা করছেন। জন-বিচ্ছিন্ন একটি ভাষা-রূপকে ব্যবহারের মাধ্যমে জন-বিচ্ছিন্ন মনের পরিচয় দিচ্ছেন তারা। একজন কবি কিংবা ঔপন্যাসিক বা গল্পকার বলতেই পারেন যে তিনি জনগণের জন্য লেখেন না, এই বলার মধ্যে আমি দোষের কিছু দেখি না। কারণ যে-কোনো বড় লেখক তার সমকালের প্রয়োজন ও জনরুচির দায় মেটানোর জন্য লেখেন না, লেখেন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে, ভবিষ্যতের পাঠকদের জন্য। অতএব, সমকালের কাছে তার বোধগম্য হওয়ার দায় থাকে না। কিন্তু প্রাবন্ধিক এই দায় এড়াতে পারেন না। প্রাবন্ধিককে অবশ্যই বোধগম্য হতে হয়, প্রকাশের ক্ষেত্রে বেছে নিতে হয় সেই ভাষা যা যোগাযোগে সক্ষম। সাধু ভাষা যোগাযোগে সক্ষম হলেও তা নির্যাতনমূলক এক সক্ষমতা। সাধারণ মানুষ এই নির্যাতন কেন চাইবেন?

যে কমল কুমারের কথা শুরুর দিকে উল্লেখ করেছিলাম তিনিও যখন প্রবন্ধ লিখেছেন তখন তা লিখেছেন চলতি ভাষাতেই। এমনকি আজকের দিনে যারা সাধু ভাষায় লিখছেন তারা কথা বলেন চলতি ভাষায়। ভাষার অভিমুখ চিরকালই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দিকে, তাদেরকে ছাড়া ভাষার অস্তিত্বকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে অল্প কিছুদিন আইসিইউতে বাঁচিয়ে রাখা যায়, কিন্তু সে কেবল ক্ষণজীবী এক তৃপ্তিবোধ থেকে, কারণ তার শরীরের বেশির ভাগ অঙ্গপ্রত্যঙ্গই ইতিমধ্যে মৃত।

(1222)

রাজু আলাউদ্দিন