হোম গদ্য সুফিপথ ও প্রেমের সৌরপরিধি

সুফিপথ ও প্রেমের সৌরপরিধি

সুফিপথ ও প্রেমের সৌরপরিধি
792
0

আল্লাহ-প্রেমের অভিজ্ঞান আরিফদের বিষয়ে খাজা গরীব নওয়াজ মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতী বলেন : আরিফের গুণাবলি সূর্যের মতো, যার দ্বারা সমস্ত জগৎ আলোকিত হয়।

খাজা গরীব নওয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন এই কাজগুলো একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে উত্তম ও অর্থবহ—
১। বিপদে পতিত মানুষের ফরিয়াদ শ্রবণ করা এবং তার সঙ্গ দেয়া।
২। প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা গ্রহণ করা।
৩। ক্ষুধার্তকে আহার প্রদান করা।
৪। শৃঙ্খলাবদ্ধকে শৃঙ্খলমুক্ত করা।
এ কাজগুলো আল্লাহর নিকট খুবই প্রিয় এবং মর্যাদা সম্পন্ন।

প্রায় আটশত বছর আগে ভারত উপমহাদেশে ইসলামের বাণী নিয়ে খাজা গরীব নওয়াজ মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতী সঞ্জরী রাদিআল্লাহু আনহু যখন এসেছিলেন তখন এই কথগুলোকে কাজে পরিণত করে তিনি অজস্র মানুষকে আলোর পথে এনেছিলেন মহান আল্লাহর কৃপায়। কথাকে কাজে পরিণত করার কথা বললাম এই কারণে যে, এই সাধিকদের সাধক এই মহান পথপ্রদর্শক বলেছেন : ‘ইবাদত’ কর্মে কথা বলে। অর্থাৎ, অনুসরণ কতখানি করি, বিশ্বাস কতখানি করি, প্রেম কতখানি করি তার প্রমাণ পাব কর্মে। এখান থেকে আমরা ইবাদিল্লাহিস সালেহিনদের কথা মনে রাখতে পারি। যাদেরকে নিয়ামতপ্রাপ্ত বলে পবিত্র কুরআনের প্রথম সুরাতেই উল্লেখ করা হয়েছে এবং যাদেরকে আবশ্যিক প্রার্থনা নামাজের বৈঠকে সালাম দেয়া হয়। ইবাদিল্লাহিস সালেহিন তারাই, যারা আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের হক তথা অধিকার পূর্ণ করেন। তারাই আউলিয়া তথা আল্লাহর বন্ধু। লক্ষণীয় যে, কেবল আল্লাহর হকই নয়, বান্দাকেও এখানে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পবিত্র কুরআনের শুরু রব (প্রতিপালক প্রভু) দিয়ে এবং শেষ নাস (মানুষ) দিয়ে। রবের প্রতি এবং রবের জন্য যারা সব কিছু করবে তাদের মানুষের প্রতি থাকবে অকৃত্রিম ভালবাসা—এটিই ইসলাম ও ইসলামের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ‘তাসাউফ’-এর বাণী।

তাসাউফ—যার জনপ্রিয় নাম আজ ‘সুফিবাদ’—তার কেন্দ্রীয় দিক প্রেম নিয়ে কথা বলার উদ্দেশ্যে এই রচনা লিখতে বসেছি। খাজা মুঈনুদ্দিন তথা আমার গরীব নওয়াজ-এর মতে সালেক তথা আল্লাহর পথে চলা শিক্ষার্থীর তথা প্রেমিক বা আশেকের অন্তরে থাকে অগ্নিপূজারীদের উপাসনাগারের মতো প্রেম। যা কিছু এর মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে সে সবই জ্বলে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে। কোনো প্রকারের আগুনই প্রেমের আগুনের চেয়ে অধিক শক্তিশালী নয়। ‘জ্বলে পুড়ে যাবে অপবিত্রতা, দুনিয়ার মোহ, অহম। সুফিগণ হৃদয়ের পরিশুদ্ধি (তাজকিয়াতুন নফস)-এর দিকেই সর্বাধিক জোর দেন, কেননা তারা জানেন প্রশান্ত (বিশুদ্ধ) হৃদয়ই (কালবিন সালিম) কেবল শেষ বিচারে আল্লাহর কাছে মুখ্য হবে। প্রেম পোড়ায় ও ঝরিয়ে ফেলে আবর্জনা তথা গাইরুল্লাহ (যা আল্লাহ ও তার থেকে বিচ্যুত করে), এই দহন হৃদয়কে বিশুদ্ধ করে।

শামস তাবরিজি যেমন আল্লাহু আকবর-কে ব্যাখ্যা করেন ‘মাক্বালাত’-এ, ‌‌’আল্লাহু আকবার-এর অর্থ আল্লাহ সেসব কিছু থেকে বড় যা তুমি কল্পনা করেছিলে। এর অর্থ ওখানেই থেমো না, আরও নিকটে এসো, যেন বিশালতাকে দেখতে পাও। খোঁজো যেন পাও।’

অর্থাৎ, সালাত তথা নামাজে তাকবির বলে হাত বেঁধে আমরা নিজেদের যখন পবিত্র বৃত্তে প্রবেশ করাই তখন নৈকট্যের দিকে ধাবিত হই প্রেম নিয়ে। এখানে তাসাউফের আরেকটি ব্যখ্যায় হাজির হতে পারি আমরা। তাসাউফ কাজ করে ইহসান নিয়ে। প্রসিদ্ধ হাদিস জিব্রিলে ইসলাম, ইমান ও ইহসান নিয়ে ফেরেশতা জিবরাইল প্রশ্ন করেছিলেন মহানবীকে। ইহসানকে আল্লাহর রাসুল ব্যাখ্যা করেছিলেন—এমনভাবে নামাজে মনোনিবেশ করা যেন বান্দা আল্লাহর সামনে উপস্থিত অথবা সে বিশ্বাস করবে আল্লাহ তার সামনে উপস্থিত—এমন ধ্যান রাখা। প্রেমহীনের মনে একমন ধ্যান থাকে কি? মনে রাখা ভালো যে সালাত-এর অর্থ নৈকট্য, ইবাদত-এর অর্থ অনুসরণ, স্বভাব বা গুণাবলি অর্জনে প্রবৃত্ত হওয়া।

প্রেমের সহজ, কঠিন ও জটিল নানা পথ রয়েছে তাসাউফের শিক্ষায়। তবে তাসাউফের মূলসূত্র কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা সরল বটে। আল্লাহ বলেছেন তিনি আমাদের কাছেই থাকেন, শাহা রগেরও অধিক নিকটে। কথাটা আল্লাহ যাকে বলতে নির্দেশ করেছেন, জিজ্ঞাসুর প্রশ্নের জবাবে, তিনি অর্থাৎ আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর বিষয়ে আল্লাহ কুরআনে বলেই দিয়েছেন যে, তাঁকে অনুসরণ করাই আল্লাহকে ভালোবাসার নাম। অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহর জীবনাচরণ তথা সুন্নাহসমূহ অনুসরণ করাই আল্লাহকে তথা মহাবিশ্বের স্রষ্টাকে ভালোবাসা। আমরা সুন্নাহর অনুসরণ তাদের জীবনে দেখি যারা আশীর্বাদ তথা নিয়ামতপ্রাপ্ত—যাদের কথা বলা হয়েছে কুরআনের প্রথম সুরাতেই। এই মহাত্মাগণই ইবাদিল্লাহিস সলেহিন তথা পুণ্যাত্মা, আল্লাহ যাদের আউলিয়া তথা তাঁর বন্ধু বলে কুরআনে সম্বোধন করেছেন। তাদের জীবনে রাসুলের প্রতিটি জীবনাচরণের অনুসরণ এমনভাবে বর্তমান যা নিয়ে ভাবা দরকার। ইসলামের শরিয়ত ও প্রেমের মাঝে যে আসলে বিরোধ নেই, বরং দুইয়ের মাঝে সম্পর্কটি প্রেমের দাবির—এই সত্যকে বুঝবার জন্যেই ইবাদিল্লাহিস সালেহিনের জীবনে আলো ফেলা দরকার। নবীজির একেকটি সুন্নাত তাঁরা কেমনভাবে পালন করতেন, কত ভালোবাসার সাথে পালন করতেন তা অনুসরণীয়। অজুর মতো বাহ্যিক ধৌতকরণের একটি আচারকে তাঁরা এমন নিষ্ঠার সাথে পালন করতে চাইতেন যে অজুর যা আবশ্যিক নয় তাও তাঁরা কখনও বাদ দিতেন না। এমনকি মনের ভুলে বাদ দিলে পরে মনোকষ্টে ভুগতেন। এবং এই অজু থেকেই যে ধ্যানের শুরু এবং অজুতে মন বিচ্যুত হলে যে নামাজেও মন বিচ্যুত হয় তা শায়খ ফরিদউদ্দিন গঞ্জে শকর বলে গেছেন। তাঁদের শিক্ষা ও চর্চার দিকে তাকালে আরও কিছু বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়, বোঝা যায় একই যাত্রায় ভিন্ন ফল কত সহস্রবার এসেছে তাঁদের জীবনে। একজনের কাছে সালাত আদায় কেবল একটি সময়মতো কাজ শেষ করা, অন্য জনের কাছে তা পরম সত্তার কাছ থেকে রহস্য গ্রহণ করার একেকটি পর্ব। শরিয়ত ও তরিকত (সুফিদের পরম্পরা) বা মারিফাত যে পাশাপাশি বয়ে চলা দুই জলধারা সুরা আর-রহমানের এক আয়াতের এমন ব্যখ্যাও রয়েছে। বলা হয়েছে দুই জলরাশিতেই ফলে মহামূল্য রত্ন।


তাসাউফ বিভিন্ন নামে পরিচিত। একে মাহাব্বাহ (প্রেম), তাজকিয়া (শুদ্ধি), সুলুক (শিক্ষার্থীর পথ), ইলমুল ইহসান (ইহসান-এর শিক্ষা) প্রভৃতি নামেও ডাকা হয়।


সুফিধারা বিষয়ে চর্চা যে হারে হচ্ছে, এখন তাতে এই পথকে নতুন করে চেনানোর দরকার নেই। কোন শব্দ থেকে এসেছে এই শব্দ, কেন এসেছে তা নিয়ে অনেক লোকই বেশ ভালো জানেন। তাসাউফের প্রায় হাজার দুই সংজ্ঞা থেকে তবু একটি সংজ্ঞা দেখে নিতে পারি। সিদি আহমদ যাররুক একে সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে—আল্লাহর দিকে ধাবিত হবার জন্য অন্তর থেকে আসা নিষ্ঠাময় নির্দেশনা।

তাসাউফ বিভিন্ন নামে পরিচিত। একে মাহাব্বাহ (প্রেম), তাজকিয়া (শুদ্ধি), সুলুক (শিক্ষার্থীর পথ), ইলমুল ইহসান (ইহসান-এর শিক্ষা) প্রভৃতি নামেও ডাকা হয়। অহমকে বিসর্জন দিয়ে, নিম্ন চিত্তবৃত্তিকে মিটিয়ে দিয়ে, আল্লাহর পরিচয় ও সান্নিধ্যলাভের পথ এটি। আল্লাহর পরিচয় লাভের কথা কুরআনে বর্ণিত ইবাদত আবশ্যিক হবার আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লাহর রাসুলের সাহাবা ইবন আব্বাস নিজেই বলে গেছেন—‘লি আবুদুন’-এর আসল উদ্দেশ্য ‘লিআরিফুন’ তথা ইবাদতের উদ্দেশ্যে সৃষ্টির উদ্দেশ্য সত্যার্থে আল্লাহর পরিচয় লাভেরই উদ্দেশ্য। পরিচয় লাভের পথ দীর্ঘ ত্যাগ, ধৈর্য, সাধনা, শিক্ষাগুরু ধরা, ইত্যাদির মাধ্যমে পাড়ি দিতে হয়। সেই পথ সুলুক বা শিক্ষার্থীর পথ এবং এ পথের শিক্ষার্থীকে বলা হয় সালেক। প্রেমের কারণে সংসার ত্যাগ করা বাধ্যতামূলক নয় ইসলামে। তবে সংসারে থেকেও বহু সালেক আসলে সংসার তথা দুনিয়া থেকে তথা দুনিয়ার মোহ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রেও ইসলামে নির্দেশিত মধ্যপন্থা (সিরাতুল মুস্তাকিম)-ও অলম্বন করেন সুফিরা। দুনিয়ায় থেকেও তারা দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত থাকেন কেবল তাই নয়, যা কিছু প্রাত্যহিক বাস্তব ও দুনিয়ার কাজ সেসব কর্মসাধন এবং আল্লাহর ধ্যান থেকে সরে না থাকা এই দুইয়ের মাঝে তারা ‘হক’ (অধিকার, সত্য) পূরণ করার মাধ্যমে মধ্যপন্থা অবলম্বনকে নিশ্চিত করেন। হক-কে তাঁরা ঐশী বলে ধরেন, যদিও তার কর্মক্ষেত্র এই পৃথিবীই বটে।

প্রেমকে তাসাউফের তথা ইসলামের মহারথীগণ বিবিধভাবে দেখেছেন। তাসাউফের জগতে একটি মহান ও বহুচর্চিত প্রবাদ হচ্ছে—গূঢ়ভাবে ভাবলে দেখবে প্রেম, প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ সবই এক। অর্থাৎ একে অন্যের ভেতর ঠাঁই নিচ্ছে। (এই প্রবাদের সত্যার্থের দিকে গেলে কেউ কেউ তাসাউফের নুর-তত্ত্বকেও খুঁজে পেতে পারেন—তবে সেই আলোচনা অন্য সময় করা যাবে।) প্রেমকে হুব্ব এবং ইশক—এই দুই নামে অভিহিত করা হয় সাধারণত। হুব্ব, ইশক-কে খাজা মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতী বলেন ‘বিরতিহীন প্রেম’। ওমিদ সাফি একে radical love বলেন। রিসালাতুল কুশাইরিয়াতে একটি মত উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুব্ব শব্দটি হাব্ব থেকে নেয়া হয়েছে। হাব্বাতুল কালব কথার অর্থ হৃদয়ের মূল। ইমাম কুশাইরির মতে, ‘মাহাব্বাহ একটি মর্যাদাকর অবস্থা। আল্লাহ বান্দার ব্যাপারে এর সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং বান্দাকে তাঁর ভালোবাসা জানিয়েছেন’। এখানে আরব গাথার সেই লাইলি ও মজনুর কথা বলা যায়। লাইলির রূপ কেমন ছিল তা মজনু (পাগল)-র চোখই কেবল বলতে পারবে। বাদশাহ লাইলির সুনাম শুনে তার সামনে যেয়েও সেই রূপে পাগল হবার মতো কিছু পান নি। লাইলি তাকে জবাব দিয়েছিল, তুমি তো মজনু নও। অর্থাৎ প্রেমের দরিয়ায় ডুব না দিলে তার সৌন্দর্য বোঝা যায় না। এই লাইলিকে শায়খ হামদি বেন ঈসা বিশ্বাসের বাক্য ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ভিন্ন কোনো মোক্ষ নেই)-এর তথা প্রেমের রূপায়ণ বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহই পথ চলার একমাত্র অভিমুখ, তাঁর থেকেই আসে প্রেম ও ন্যায়, তিনি বান্দাকে নিজের মাঝে গ্রহণ করবেন।

মুহাব্বত গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, হক তায়ালা বলেছেন, ‘হে আমার বান্দাগণ, আমার যিকির তোমাদের ওপর জয়ী হয়েছে, আমি তোমাদের আশেক হয়েছি’, অর্থাৎ তোমাদের সাথে আমার প্রেম হয়েছে। খাজা মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতী রাহে মুহব্বত (প্রেমের পথ) ও ইশক (বিরতিহীন প্রেম) বিষয়ে যথাক্রমে বলেন :

১। প্রেমের পথে সেই আশিক, যে উভয় জাহান হতে মন-প্রাণ ধুয়ে ফেলে।
২। ইশকের পথ এমন, যে সে পথে চালিত হয় তার নাম ও নিশানা থাকে না।

একই রকম কথা আশ শিবলীও বলেছেন। ইমাম কুশাইরির দৃষ্টিতে—উদ্ভিদের সারবস্তু যেমন বীজ (হিব্ব), জীবনের সারবস্তু তেমন ভালোবাসা। শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহেলভী বলেছেন : ‘প্রেমের দৃষ্টিই (তাওয়াজ্জুহে হুব্বি) হচ্ছে প্রথম সৃষ্টি, যা আল্লাহতাআলা থেকে মাখলুক সৃষ্টির মাধ্যমে পরিণতি লাভ করেছে। বাকি সমস্ত মাখলুক সেই প্রথম সৃষ্টির শাখা এবং সমস্ত প্রেমের (হুব্ব) হাকিকত এবং মাধ্যমে (ওয়াসেতা) প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম সৃষ্টি যে প্রেম (হুব্ব), তা যদি না হতো তাহলে কোনো মাখলুকই পয়দা হতো না।’ তিনি প্রেমের নয়টি স্তর ভাগ করেছেন, এবং নবম স্তর বিষয়ে তিনি বলেন : ‘প্রেমিক আপন সত্তার থেকেও ফানা হয়ে যায় এবং প্রেমাস্পদের তরফ থেকে এমন অবস্থা হয় যে, দু’জন এক সত্তায় পরিণত হয়ে যায়। তখন তাকে ‘হুব্বে মুতলাক’ বলা হয়। এর অন্য নাম এশক। মাখলুকের (সৃষ্টির) জন্য ভালোবাসার ক্ষেত্রে এই হচ্ছে সর্বশেষ স্তর (মাকাম)। এই স্তরে প্রেমিক প্রেমাস্পদে রূপান্তরিত হয় এবং প্রেমাস্পদ প্রেমিকে রূপান্তরিত হয়ে যায়। একে অন্যের রঙে রঞ্জিত হয়ে যায়। কারণ আশেকের রুহ মাশুকের সুরতের মধ্যে স্থান করে নেয়।’


তারা তো এও ভুলে যায় যে, আল্লাহ মজলুমের সাথে—মজলুমের পরিচয় ধর্ম দিয়ে হয় না।


প্রেম-প্রেমিক-প্রেমাস্পদের মাঝে ভেদ না থাকার বহুল প্রচলিত সেই প্রবাদের প্রতিধ্বনি শুনলাম আবার। এবং মনে এল কুরআনে বলা ‘সিবগাতাল্লাহ’ তথা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হবার কথা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে ব্যক্তির অস্তিত্ব বিলোপ করে আল্লাহর অস্তিত্বে বিলীন হবার কথা বলা হচ্ছে বার বার। ব্যক্তির বিলোপ-এর পর্যায়গুলো এমন—

শায়খ (শিক্ষক) এর মাঝে নিজেকে বিলীন করা (ফানা ফিশ শায়খ), এর পর ফানা ফির রাসুল (রাসুলের মাঝে বিলোপ), আর চূড়ান্ত পর্যায়ে ফানাফিল্লাহ (আল্লাহতে বিলীনতা)।

প্রথমত ইউরোপীয় ব্যক্তির ধারণা থেকে এই ধারণা একেবারেই বিপরীত, দ্বিতীয়ত আজকের পৃথিবীতে ধর্মের নামে অন্য সম্প্রদায়ের উপর চড়াও হওয়ার যেসব প্রদর্শনী দেখছি তা থেকে লক্ষ যোজন দূরে এই মতবাদ। ব্যক্তি যদি অহমের তাড়নায় নিজের শক্তিমত্তা নিয়ে সমগ্রকে উত্তেজিত করে সমগ্রের অহম সমেত অন্যায় ও অত্যাচারের দিকেই ধাবিত হয় তাহলে ধর্মই-বা থাকে কোথায়? তারা তো এও ভুলে যায় যে, আল্লাহ মজলুমের সাথে—মজলুমের পরিচয় ধর্ম দিয়ে হয় না।

শর্তহীন ও দাবিভিন্ন প্রেম কে কবে দেখেছে? সবচেয়ে কম দাবি—আমারই হও, আমারই থাকো। প্রেম দাবি করে, পরীক্ষা নেয়, সেই পরীক্ষাতে উত্তীর্ণও হতে হয়। প্রেমের দাবিতে পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণের কে কতটা ডুবেছেন, ফিরে দেখি চলুন। সুরস্রষ্টা ও কবি আমির খুসরৌ-এর গুরু (মুরশিদ) খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া বলেন, প্রেমের দাবিতে প্রথম পরীক্ষা দিয়েছেন আমাদের পিতা আদম আলাইহিস সালাম। বেহেশ্ত থেকে পিতা আদমের যে পতনের কথা আমরা শুনি খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া সেই ঘটনার ভিন্ন ব্যখ্যা দিয়েছেন। খাজা নিজামউদ্দিনের দর্শনে নুরে মুহাম্মদী (মুহাম্মদের নুর) পেয়েও হারিয়ে ফেলেন আমাদের আদিপিতা আদম আলাইহিস সালাম, এবং যখন সেই নুর খুঁজে পেলেন আবার, তা সেই বহুকথিত নিষিদ্ধ ফলের মাঝে দেখতে পান, এবং দেরি না করে সেই ফল খেয়েও ফেলেন। তার পরই আল্লাহ ঘোষণা করেন, আপনার স্বর্গবাস ঘুচল, পৃথিবীতে বংশবিস্তার করার ও তাদের মাঝ থেকে আমার প্রতিনিধি (খলিফা) বাছাই করার উদ্দেশ্যে সেখানে জীবন শুরুর কাল এল আজ। সেই থেকে প্রেমের পরীক্ষার শুরু। প্রেমে দগ্ধ পয়গম্বর ইবরাহিমের ভেতর এমন অগ্নি ছিল যে নমরুদের কয়েক মাইলব্যাপী আগুনে তাঁর কিছুই ঘটল না। মনে পড়ে কি মজনু (মজনুন, পাগল)-র অগ্নিতে দগ্ধ হবার কথা? কারো প্রেমের অগ্নির কাছে নমরুদের অগ্নি তুচ্ছ হয়, কারো প্রেমের অগ্নি নির্বাপণ করতে তাঁকে মাছের জঠরে ঠাঁই নিতে হয়। হ্যাঁ, খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া বলেন, নবী ইউনুস আলাইহিস সালামের প্রেমের উত্তাপ নির্বাপনের তরেই আল্লাহ তাঁকে মাছের পেটে রেখেছিলেন চল্লিশ দিন। সংখ্যাটি শুনে অভিজ্ঞদের মনে পড়তে পারে আজকের সুফিদের পালন করা চিল্লাহর দিনসংখ্যাও কিন্তু চল্লিশ। নবী নুহ আলাইহিস সালাম বিশ্বাসীদের নিয়ে যাত্রা করলেন। নবীদের সৌন্দর্যের উপমা হজরত ইউসুফের কারাবাসকে সুফিতাত্ত্বিক ও বিপ্লবী সাঈদ নুরসী বলেন হিজাব, যা দিয়ে ঈশ্বর তাঁকে দুনিয়া (সর্বনিম্ন স্থান ও অবস্থা) থেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছিলেন এবং যেখানে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি খুলে গেল, স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন তিনি। প্রেম ও ন্যায়ের দাবিতে নবী মুসা আলাইহিস সালাম একটি জাতিকে নিয়ে এলেন নতুন দেশে ও দিশায়। যষ্টিবিহীন বেহেল নবী ঈসার কেবলই ক্ষমার ও স্নেহময় প্রেমের শরিয়ত পেরিয়েছে পৃথিবী। সবশেষে আমাদের প্রিয় নবীজি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি মধ্যম পন্থার বিধানের দিকে এনেছেন মানবতাকে।

প্রেম মিলনের আকাঙ্ক্ষা করে—প্রেমাস্পদ মিলতে চায় প্রেমিকের সাথে। সেই আগুনে প্রেমিক দগ্ধ হয় নিরন্তর। প্রেমের দান এলেও অগ্নি জ্বলমান থাকে, প্রেমের ধারা বহমান থাকে। কেননা প্রেমাস্পদের নৈকট্যে শান্তি পেতে চায় প্রেমিক। যে ভুবন সে ফেলে এসেছে পরমের দ্বারে, সেই ভুবনে সে ফিরতে চায়। ভূমির প্রতি প্রেম তার বিশ্বাসের অংশ। সেই ভুমির এক রূপ এই পৃথিবীতে তার দেশ, তবে মূল ভূমি সেই জগতে, যেখানে প্রিয় থাকেন। এই জগৎ তার জন্য ফসল তোলার জায়গা। মনে পড়ে গেল হেনরি ভনের ‘রিট্রিট’ কবিতাটি, যেখানে তিনি ফেরত যেতে চান সেই জগতে যেখান থেকে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন বলেন—’তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মন রে আমার’ অথবা ‘কবে আমি বাহির হলেম তোমারই গান গেয়ে—/ সে তো আজকে নয়, সে আজকে নয়।/ ভুলে গেছি কবে থেকে আসছি তোমায় চেয়ে…’। যদিও সেই জগতে ফেরা কেবল ঐশী ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করবে, তবে সেই জগতের সাথে তথা সেই পরম সত্তার সাথে যোগ ঘটানোর পথ বন্ধ নয়, পদ্ধতি রয়েছে এবং খোলা রয়েছে নৈকট্যের দ্বার। স্বীকৃত পথ রয়েছে সেই পথে এগুবার—বাধ্যতামূলক এবং ঐচ্ছিক। পরম সত্তা বাধ্যতামূলক পথ রেখেছেন, যেন ভুলে যেতে না পারি, কেননা তিনিও নৈকট্য চান; ঐচ্ছিক পথে তাঁর সন্তুষ্টি বরং বাড়ে। এমন ঐচ্ছিক পথের নানা শৈলীর মাঝে ভুবনবিখ্যাত হলো মাওলানা জালালউদ্দিন রুমীর অনুসারীদের ঘূর্ণিনৃত্যের যিকর। এক হাতের তালু ওপরে আকাশের দিকে তথা ঐশী জগতের দিকে উন্মুক্ত রেখে, এক হাত নিম্নমুখী করে তথা ঐহিক জগতের দিক করে রেখে ঐশী করুণা, ক্ষমা ও প্রেমকে পার্থিব জগতের দিকে আনবার এক অনন্য আচার। অর্থাৎ দরবেশ কেবলই সেই জগতের সঙ্গে সংযোগ কামনা করে কঠোর তপস্বা ও কৃচ্ছ্রসাধনে সীমাবদ্ধ না থেকে পৃথিবীর সাথে তথা পৃথিবীর মানুষ ও প্রাণির সাথেও সংযোগ কামনা করেন, কেননা আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসেন। সেই কারণে সুফিদের প্রেম কেবল নির্জনতায় নিজের আত্মিক উন্নতির সাধনামাত্র নয়। তাদের প্রেম ঈশ্বরের সর্বজনীন দয়া, ভালোবাসা ও ন্যায়বিচারের সাধনাও বটে। তাদের মাঝে আমরা যোদ্ধাও দেখি সেই কারণে—ফরিদউদ্দিন আত্তার, শামিল, উমর মুখতার এমন যোদ্ধা-সুফির কথা আমরা জানি। ক্ষমতাকাঠামোর বিরোধিতা করা, রাজ-দরবারের সাথে তাদের দূরত্ব এবং বিরোধের ইতিহাস দীর্ঘ। খাজা মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতী উপমহাদেশে রাজা পৃথ্বীরাজের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন অবিচারের প্রতিবাদ করতে যেয়ে। কাজেই বিংশ শতকের কিছু রাজনীতিঘনিষ্ঠ উপমহাদেশীয় ধর্মবেত্তার প্রচারণা মোতাবেক আউলিয়াদের কেবলই নির্জনবাস এবং উম্মাহর প্রতি উদাসীন থাকার তত্ত্ব কেবল ভ্রান্তই নয়, বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীও বটে।

সুফিগণ ধর্মপ্রচারে যে দেশে গেছেন সেই দেশের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেছেন এমন নজির রয়েছে। খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতীর একটি উপাধি হিন্দোল ওলি—হিন্দের ওলি। আজ তাঁকে কেউ ইরান অথবা বাগদাদের ওলি বলেন না। কিন্তু এই ওলিদের ভেতর আরবের শিক্ষাই ছিল। এমনকি খাজা শায়খ ফরিদউদ্দিন গঞ্জে শকর (মুঈনুদ্দিন চিশতীর শিষ্যের শিষ্য) বলতেন যে আরবের শিক্ষকগণ শব্দের ব্যুৎপত্তি ও গভীরতা নিয়ে শেখাতেন। কিন্তু এই একই দরবেশ তাঁর দরবারে আসতেন এমন একজন সনাতন ধর্মের সাধকের বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘এই লোক তো আল্লাহর ওলি’। তার মানে ধর্মের মূল যেখানে, সেখানে ভক্তি ও প্রেম সব এক পরম সত্তা তথা ঈশ্বরের দিকেই ধাবমান—এই সত্যকে তাঁরা অনুধাবন করতেন ও শেখাতেন। সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে এগোনো আসলে মানুষকে গ্রহণ করে এগোনো—মানুষকেই যে ভালোবাসতে পারে না সে আল্লাহকে ভালবাসবে কেমন করে! সুফিরা এই সত্য উপলব্ধি করতেন। ইসলামে এই শিক্ষা নবীজির জীবনেও আছে। নিজের ধর্মাচারকে শ্রেষ্ঠ মনে করা, নিজের জ্ঞানকে শেষ কথা মনে করা, নিজের মতকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া এমনকি নিজের মতের গৌরবে অন্যের প্রতি অমানবিক হয়ে ওঠা তাসাউফের শিক্ষার বিপরীত। কে নামাজ পড়ল আর কে পড়ল না তা দিয়ে সুফিরা মানুষকে মাপতেন না, তাদেরকে সেই প্রশ্নবাণে আহত করার কথা কদাচ ভাবতেনও না। আল্লাহর বান্দার হিশাব আল্লাহই নেবেন। সুফিরা শেখাতেন মানবিক হতে। হজরত ইব্রাহিমের প্রতি আল্লাহর সেই বাণী কি মনে নেই যে, বিধর্মীকে আল্লাহ যদি খাওয়াতে পারেন তবে আল্লাহর নবী কেন পারেন না!


কিন্তু একজন মুসলিম বাংলাদেশি সেখানে এমনকি মুসলমানের সামাজিক মর্যাদাও পায় না, কেননা তারা শ্রমিক।


উম্মাহ ভিত্তিক পরিচয়ের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে যে হীন মানসিকতা গত কয়েক দশকে দেখেছি আমরা, তা আমাদের মুসলমান হতেও শেখায় নি। আমরা ভুলে গেছি যে উত্তর-মুহাম্মদীয় পৃথিবীতে সবাই নবী মুহাম্মদেরই উম্মত। সেই উম্মত সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে রয়েছে। তিনি সকল সৃষ্টির জন্যই রহমত হিশেবে এসেছেন। কুরআন সকল মানুষের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। উম্মাহ বলে যারা চিৎকার করেন তারা প্রায়ই নিজের দেশকে ও দেশের সংস্কৃতিকে তাচ্ছিল্য করেন ও ঘৃণা করতে শেখান। দেশ যেন তাঁদের দরকারই নেই। যদিও এই কথা তারা সৌদি আরবে, তুরস্কে, সিরিয়া বা ইরাকে অথবা মিশরে বলতে পারেন না। কেননা সেসব দেশে আমরা কাজ করতে যাই, নাগরিকত্ব পেতে যাই না, অধিকার অর্জনের যোগ্যও হতে পারি না। তাদের দেশে আমরা মিসকিন অথবা আজনবি—কখনোই আরব নই। একজন খ্রিস্টান আরবও তাদের দেশে আরব। কিন্তু একজন মুসলিম বাংলাদেশি সেখানে এমনকি মুসলমানের সামাজিক মর্যাদাও পায় না, কেননা তারা শ্রমিক। কিন্তু একজন সুফি দরবেশের কাছে একজন মানুষ সব পরিচয়ের আগে মানুষ। তার ক্ষুধা নিবারণ দরবেশের প্রথম কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়।

সংস্কৃতিকে মুসলমান-পরিচয় ও জাতিসত্তার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিতে পারার কুফল যে কত গভীর ও ভয়াবহ তা পুরো পৃথিবী দেখেছে। ক্রুসেড-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ৯/১১-পরবর্তী বিভাজনের বিশ্বে যে সন্ত্রাস ও ক্ষয়ক্ষতি দেখল পৃথিবী তার রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল দুই অসুর—পরিচয়ের ভিন্নতা ও তা নিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই এবং সম্পদের পাহাড় কোন দেশের পুঁজিলগ্নীকারীরা গড়ে তুলবে কোন অলিখিত পথে তার প্রতিযোগিতা।

এই দুই অসুর থেকেই কি সুফিদের শিক্ষা আমাদের দূরে থাকতে শেখায় না? দুনিয়ার সম্পদকে সুফিশিক্ষা কাজের জন্য দরকারি বলে মনে করে। কিন্তু এর অতিরিক্ত সঞ্চয় এবং একে সমাজ ও জীবনের মূল অভীষ্ট বলে মনে করাকে সুফিশিক্ষা নিরুৎসাহিত করে। বরং সুফিদের শিক্ষা হলো হক্ব তথা অধিকার মেটানোর বাইরে সম্পদ না সঞ্চয় করা। সম্প্রদায়ের পরিচয়ের জোর খাটিয়ে অন্যায় তথা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সুফিরা বরাবরই সোচ্চার ছিলেন। আল্লাহর ধ্যানে দুনিয়ার মোহকে ত্যাগ করার কথা তাঁরা সব সময়ই বলেছেন।

এই বাংলাদেশে পরিচয়ের রাজনীতি যেমন করে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তার ভয়াবহতা আমরা গত কয়েক দশকে দেখেছি। সামাজিক অসাম্য, পরিচয়ের সংকট, সংস্কৃতির মূল স্রোতকে শিল্পিত করে যারা তুলে ধরেন তাদের সাথে মিলতে না পারার ক্ষোভ এবং তাদের প্রতি অবিশ্বাস ও বিদ্বেষ পোষণের শিক্ষা, ধর্মের বহিরঙ্গের শিক্ষার ওপর জোর দেবার প্রবণতা, ধর্মের আধ্যাত্মিক ও কোমলতর দিকগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অবহেলা ক’রে দর্শন ও ধ্যানকে বাদ দিয়ে এক রকম অদ্ভুত ধর্মশিক্ষার নামে দরিদ্র শ্রেণিকে বঞ্চিত করে তাদের ব্যবহার করার রাজনীতি ও ব্যবসা, অসাম্যের চক্রে ধর্মের নাম ব্যবহার করে অর্থের ও শক্তির ত্রিভুজ গড়ে তোলা এবং এসবের মাঝে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম থেকে যে জঙ্গিবাদ ও কট্টরপন্থা আমরা দেখেছি নিজেদের দেশে, তা ইসলামের শিক্ষা হতে পারে না। আরও রয়েছে—সামাজিক অবিচার, পারিবারিক অসাধুতা, সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার প্রতিযোগিতা, শিক্ষার মাঝে কেবলই পেশাগত সাফল্য, সম্পদ ও সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জনের সম্ভাবনাকে উদ্দীষ্ট করে দেয়া শিক্ষা—যা এমনকি দেশি ভাষা ও সংস্কৃতিকে অবহেলা করা, বিদ্বেষ পোষণ করা শেখায়, মানুষকে তো বটেই, নিজের মা বাবাকেও আপনা ভাবতে শেখায় না—এমন শিক্ষার মাঝে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম এবং তাদের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা—এমন সব মহা-আসুরিক কর্মকাণ্ডের বলি হওয়া এক প্রজন্মকে আমরা পেয়েছি। এদের মাঝে পেশাগত দক্ষতা যতটা রয়েছে, মানবিক দক্ষতা তত নেই, কিংবা হয়তো একেবারেই নেই। তাদের নিজের সংস্কৃতি নেই। নিজের মাঝে তারা কোনো দর্শনও খুঁজে পায় না। অবৈধ পথে অর্জিত ও সঞ্চিত অর্থের প্রাচুর্যে মানুষ হয়ে একসময় পোশাকি ত্যাগের বিজ্ঞাপন তাদের কাউকে কাউকে টেনেছে। তারা সন্ত্রাসের চক্রে নিজেদের বিসর্জন দিয়েছে। লক্ষ করে থাকবেন, সন্ত্রাস ও রাজনীতির আন্তর্জাতিক চক্রের কথা বলা হয়েছে ওপরে। আন্তর্জাতিক অন্যায়কে আন্তর্জাতিক ন্যায়ের চর্চা ও শক্তিতে পরাজিত করতে হবে। সুফিশিক্ষা দেশজাতির পরিচয় অতিক্রম করে প্রেম ও ন্যায়ের শিক্ষাকে নিশ্চিত করতে বলে। আগেই বলেছি তাদের প্রেম কেবলই আবেগ নয়। তারা ক্ষমতাকাঠামোকে বরাবরই সন্দেহ করেছেন। রাজদরবারের অনুদানকে তারা প্রায়শই প্রত্যাখ্যান করতেন। বরং বাদশাহদের তারা সুবিচার প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিতেন। অজস্র উদাহরণ রয়েছে।

আমি যখন আজমীর শরিফে খাজা মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতী রাদিআল্লাহু আনহুর রওজাহতে যিয়ারতে যাই তখন দেখেছি যে শিখ, হিন্দু, মুসলিম আরও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ তাঁর মাজারে এসেছেন তাঁর দর্শনে। তিনি সকলের খাজাবাবা। তিনি একজন মুসলিম ফকির হিশেবে এই দেশে এসেছিলেন কিনা সেই প্রশ্ন অতিক্রম করে তারা তাঁকে অন্তর থেকে ভক্তি করেন। সকলেই তাঁর সামনে ভক্তিভরে দাঁড়াতে চায়। একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী ট্যাক্সিচালকও মুসলমানদের সাথে অজু করতে একত্রে বসে সেই রঅজাহর অজুখানায়। পরিচয় ও হিংসার এই দুনিয়াতে এমন করে কেবল সুফিগণই মানবতাকে একত্র করতে পেরেছেন—সেই কারণেই তাঁরা সূর্য। মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী যেমন করে প্রেমের বাণীর মাধ্যমে সকলের কাছে পৌঁছেছেন—তা যত সেন্সর, ফিল্টার, ও কাটছাঁট-এর ভেতর দিয়েই হোক। ধর্মের ভেতর যে শিক্ষা নেই বা ছিল না তা আরোপ করে প্রচার করা যাবে না অথবা যেত না। তাসাউফের প্রেম ও ন্যায়ের শিক্ষা ইসলামের কেন্দ্রে ছিল বলেই কুরআন ও সুন্নাহর পরিভাষা ও উদ্ধৃতিকে ছাঁকুনিতে ফেললেও তার নির্যাসকে অস্বীকার করা যায় নি। মানুষ এই শিক্ষার দ্বারা ইসলামের প্রতি বরং আগ্রহী হয়েছে। তরবারি দিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনতার নিচু অহমকে আগ্রহী করা যায় বটে, বৃহৎ জনতার হৃদয় শান্তি, প্রেম, ন্যায় ও সাম্যের বাণীতেই আস্থা রাখে। যেমন রেখেছিল আরবে রাসুলুল্লাহর ঐশী করুণাজাত স্নেহময়তা ও উদারতার প্রভাবে। এই উপমহাদেশে আটশত বছর পূর্বে সুফি দরবেশ ফকির খাজা মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতীর কথা ও কাজেও সেই প্রভাবই গভীরভাবে কার্যকর হয়েছিল। এই ধারা ছিন্ন হবার নয়।


গ্রন্থঋণ :

১। কুতুবুল মাশায়খে, কফিলউদ্দিন আহমেদ চিশতী।
২। আনিসুল আরওয়াহ, খাজা মুইনুদ্দিন হাসান চিশতী।
৩। দালিলুল আরেফীন, খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকি।
৪। ফাওয়ায়েদুল ফাওয়াদ, মাহবুবে এলাহী খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া, অনুবাদ – কফিলউদ্দি আহমেদ চিশতী।
৫। রাহাতিল কুলুব, শায়খ ফরিদউদ্দিন মাসউদ গঞ্জে শকর, অনুবাদ – কফিলউদ্দিন আহমদ চিশতী।
৬। রাহাতুল মুহিব্বীন, বয়ান – খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া, কলম – খাজা আমির খুসরৌ, অনুবাদ – কফিলউদ্দিন আহমেদ চিশতী।
৬। মাদারিজুন নবুওয়াত, আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহেলভী।
৭। মসনবীয়ে রুমী, প্রথম খন্ড, মূল – মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী, অনুবাদ – মাওলানা আবদুল মজিদ।
৮। রুমীর অলৌকিক বাগান, মুস্তফা জামান আব্বাসী।
৯। মওলানা রুমি’র দর্শনের সমসাময়িক প্রভাব, ডক্টর এম শমশের আলী, অনুবাদ – মাসুক আহমেদ।
১০। আর রিসালাতুল কুশায়রিয়্যাহ, মূল – ইমাম আবুল কাসিম আবদুল করিম ইবন হাওয়াজিন আল কুশায়রী, অনুবাদ ও টীকা – আবদুল্লাহ যোবায়ের।

বক্তব্যশ্রবণ সূত্র :

১। শায়খ হামজা ইউসুফ
২ শায়খ আবদুল হাকিম মুরাদ
৩। ওমিদ সাফি
৪। শায়খ হামদি বেন ঈসা
৫। মুখতার শাহ নাঈমি
৫। শায়খ ইয়াহইয়া নিনোয়ি

আলাপচারিতার কৃতজ্ঞতা :

১। আবদল্লাহ যোবায়ের
২। মোহাম্মদ নুরুন্নবী আজহারী
৩। মাসুক আহমেদ
৪। জেহান আলী
৫। রাশেদুজ্জামান

মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০

তানভীর মাহমুদ

জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৮০, ঢাকা। ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এমবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপরাধতত্ত্ব ও বিচার-এ এমএসএস।
পেশা : চাকরি।

প্রকাশিত বই : প্রতিবিহার (কবিতা)

ই-মেইল : editor.hansadhani@gmail.com