হোম গদ্য সাহিত্যে মহামারীর রূপ বিশ্লেষণ

সাহিত্যে মহামারীর রূপ বিশ্লেষণ

সাহিত্যে মহামারীর রূপ বিশ্লেষণ
1.75K
0

১৯৪৫ সালে আলবেয়ার ক্যামু [১৯১৩-১৯৬০] বিখ্যাত উপন্যাস দ্য প্লেগ প্রকাশের প্রায় তেত্রিশ বছর আগে ১৯১২ সালে জ্যাক লন্ডন [১৮৭৬-১৯১৬] রচনা করেন দ্য স্কার্লেট প্লেগ। এটি মূলত আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাসে পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক উপন্যাসের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছে। উপন্যাসটি রচিত হয়েছিল আমেরিকায় রেড ডেথ মহামারীতে একটি জনপদ উজাড় হওয়ার পরে বেঁচে যাওয়া মানুষের জীবন-আখ্যান নিয়ে। এটি মূলত আমেরিকার সান-ফ্রান্সিসকো এলাকায় ঘটে যাওয়া মহামারীর প্রায় ষাট বছর পরে টিকে যাওয়া মানুষের গল্প। মুষ্টিমেয় যে ক’জন বেঁচে ছিলেন তাদের মধ্যে জেমস হাওয়ার্ড স্মিত ওরফে গ্রানসার অন্যতম। উপন্যাসে তিনি তার বন্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা নাতির কাছে সেই পরিস্থিতির বর্ণনা করেন—কিভাবে মহামারীতে লোকজন মারা গিয়েছিল। মৃত্যুর প্রতি তখন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল। যদিও উপন্যাসটি একশ বছরের বেশি সময় আগে প্রকাশিত হয়েছে; তবু মানবসমাজে বারংবার হানা দেয়া এই অদৃশ্য মহামারী ছড়িয়ে পড়লে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং হতাশার রূপ কেমন হতে পারে তারই অক্ষয় চিত্রায়ণ আছে এতে। অবশ্য জ্যাক লন্ডন এই উপন্যাস রচনার প্রায় সত্তর বছর আগে ১৮৪২ সালে অ্যাডগার অ্যালান পো [১৮০৯-১৮৪৯] আমেরিকার রেড ডেথ নিয়ে একটি গল্প লেখেন—যার নাম দ্য মাস্ক অব দ্য রেড ডেথ। ইহুদিদের আদি পুস্তক এবং নিউ টেস্টামেন্টে উল্লেখ আছে, বনি ইসরাইলিদের প্রভু কিভাবে শাস্তি দিয়েছিলেন তাদের পাপের ফলে। আর টেস্টামেন্টের দাবি অনুসারে ঈশ্বর অবাধ্যতার জন্য মাঝে মাঝে মানুষকে এ ধরনের শাস্তি দিয়ে থাকেন। ঈশ্বরের আরো অনুগত হওয়া ছাড়া যে শাস্তি থেকে মানুষের রেহাই নেই।

দ্য স্কার্লেট প্লেগ উপন্যাসেই যে প্রথম এ ধরনের পাপের কথা উল্লেখ আছে তা নয়। প্রাচীনকালের প্রায় সব সাহিত্যেই মহামারীকে মনে করা হতো দৈবনিয়ন্ত্রিত পাপের শাস্তি। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় সাড়ে চারশ বছর আগে গ্রিক সাহিত্যে সফোক্লিস রচিত বিখ্যাত নাটক ইদিপাস রেক্সে-ও সেই পাপের উপস্থিতি আমরা লক্ষ করি। রাজার পাপের ফলে একদা সমৃদ্ধশালী থেবেস রাজ্যে নেমে আসে মহাদুর্যোগ। কিন্তু এতে রাজার কোনো হাত ছিল না। গ্রিসের মানুষজন মনে করত, মানুষের ভাগ্যের উপরে তার কোনো হাত নেই; অদৃষ্টে যা লেখা আছে তা হবেই; আর মানুষ অজান্তেই সেই পাপের পথে পা বাড়াবে। তবে তৎকালীন গ্রিসে এমনকি সফোক্লিসের আগেও অনেক লেখক মহামারীকে দৈবের অভিশাপ হিসাবে মেনে নিতেন না।

আদি পৃথিবীতে মানুষের কাছে জীব ও জগৎ সম্বন্ধে নানা রহস্যের জবাব ছিল অপ্রতুল। দৈবের হাতে নিজেকে ছেড়ে দেয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। জিউফ্রে চসার [১৩৪০-১৪০০]-এর কেন্টাবারি টেলস কিংবা জিভান্নি বোকাচ্চি [১৩১৩-১৩৭৫]-এর ডেকামেরন-এ আমরা মানুষের পাপের শাস্তির ধারণা দেখতে পাই। তবে সেই পাপ ঈশ্বরের অনিবার্য রহস্যময়তার দ্বারা আবৃত নয়; এই পাপ মানুষের চরম বস্তুবাদী চিন্তা ও লোভের দ্বারা অর্জিত। কোনো মানবসমাজ যখন মানসিকভাবে মৃত্যুবরণ করে তখন শারীরিকভাবে তার বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। আর তখনই তাদের উপরে নেমে আসে মহামারীর মতো অভিশাপ।


চিন এই মহামারীর দ্বারা লোকসংখ্যার চাপ কমিয়ে এনে বৈশ্বিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।


জ্যাক লন্ডনই প্রথম সাহিত্যে মহামারীর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজেছেন। এমন দুর্যোগকালে সমাজ রাজনীতি অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি তিনি বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করেছেন। তাছাড়া ততদিনে বিজ্ঞানের উন্নতি, পুঁজির বিকাশ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে জীব-রাজনৈতিক বিষয়াদি তার পুস্তকে ধরা পড়েছে। জ্যাক লন্ডনের উপন্যাস রচনার দীর্ঘকাল পরেও এখনো এ ধরনের দুর্যোগ একটা প্রতীকী রূপ নিয়ে হাজির থাকে। মহামারীকালে মানুষের অসহায়তা, বিপর্যস্ততা, হতাশা, ভেঙে-পড়ার করুণ পরিণতি আর একই সঙ্গে মানুষের লোভ ও বৈশ্যবৃত্তিরও ঘৃণ্য-প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। একটি লোকালয়ে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার কালে পুরনো ওষুধ কাজ করতে চায় না। মহামারী তার নতুন রূপ নিয়ে হাজির হয়। ভাইরাসগুলো তার চরিত্র পরিবর্তন করে। তখন এর একমাত্র প্রতিকার এই রোগের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা, বিচ্ছিন্ন থাকা বা অন্তরীণ থাকা। কিন্তু এর মধ্যেও চলতে থাকে ক্ষমতাকে প্রশ্নাতীত করার জন্য নানারকম অযৌক্তিক অবৈজ্ঞানিক বিষয়াদি, এবং ধর্মের দ্বারাও তা সমর্থিত করার চেষ্টা করা হয়। যেমন রেড ডেথের সময় শাসককুলের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাইবেলে প্রভু বলেছেন, এটি মানুষের পাপের শাস্তি। আর ঈশ্বর যখন শাস্তি দেন তখন কেউ রক্ষা করতে পারে না। ঈশ্বর মানুষকে রোগ দ্বারা ক্ষুধা ও বিপদ দ্বারা পরীক্ষা করে থাকেন। কারণ ঈশ্বর সর্বাবস্থায় মানুষের কাছে আনুগত্য প্রত্যাশা করেন। মানুষ সীমা লঙ্ঘন করলে তিনি কুপিত হন। তবে খ্রিস্টপূর্বকালে ল্যাটিন কবি লুক্রেটিয়াস [খ্রি.পূ ৯৯-৫৫] তার লেখায় উল্লেখ করেছেন প্লেগ ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে টানাপড়েনের ফল নয়; বরং মানুষ যখন সামজিক দায়বদ্ধতা হারিয়ে ফেলে এবং স্বার্থপরতা বৃদ্ধি পায় তখনই এ ধরনের আঘাত নেমে আসে।

ডানিয়েল ডিফো [১৬৫৯-১৭৩১]-র এ জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার গ্রন্থে ১৬৬৫ সালে ঘটে যাওয়া লন্ডনের প্লেগ মহামারীর বিশদ চিত্র পাওয়া যায়। প্লেগের প্রতি মানুষের মৌল প্রতিক্রিয়া ও ধারণা নিয়ে মূলত ডিফো এটি রচনা করেন। ১৯৩০ সালের দিকে মিলান শহরে যে ব্যাপকভাবে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে; ইতালীয় ঔপনাসিক আলেসান্দ্র মানজানি-র [১৭৮৫-১৮৭৫] বইতে তার ভয়াবহ বর্ণনা রয়েছে। তবে ঔপন্যাসিক মেরি শেলি [১৭৯৭-১৮৫১]-র দ্য লাস্ট ম্যান [১৮২৬]-কে এ ধারার প্রথম উপন্যাস মনে করা যেতে পারে। এ গ্রন্থের লেখক প্লেগে বেঁচে যাওয়া কিছু মানুষের টিকে থাকার ক্ষমতা নিয়ে আখ্যান রচনা করেছিলেন।

জ্যাক লন্ডন মার্কিন লেখক হলেও তিনি সে-দেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তার রচনার অন্যতম দিক হলো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পুঁজিবাদী সমাজের অবক্ষয় ও যুদ্ধংদেহী মানসিকতার তীব্র সমালোচনা। ফলে মহামারী ও ছোঁয়াচে ভাইরাল রোগ নিয়ে তার কাজ পুঁজিবাদী সমাজের অবক্ষয়কে মানবধ্বংসের জন্য দায়ী করা। লন্ডন তার সাইন্স ফিকশন দ্য আনপ্যারালাল ইনভেশন [১৯১০]-এ দেখান যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপীয় মিত্রদের নিয়ে কিভাবে চিনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কারণ তারা এশিয়ায় তাদের উপনিবেশ টিকিয়ে রাখতে চায়, যাতে চিনের অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা এশিয়ার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে না পারে। অথচ বর্তমান করোনা মহামারীকালে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি তথ্যসমূহে বলা হচ্ছে চিন এই মহামারীর দ্বারা লোকসংখ্যার চাপ কমিয়ে এনে বৈশ্বিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। অর্থাৎ বৈশ্বিক ক্ষমতাসীন পক্ষগুলো মহামারী সংকটকালেও তাদের বাণিজ্যিক ও ক্ষমতার লড়াইটি ভুলতে পারে না।

প্লেগের মতো মহামারীর উদ্ভব, ভয়াবহতা ও নিরসনের সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক সংকট উত্তরণে লন্ডনের দ্য স্কার্লেট প্লেগ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রচনা হিসাবে বিবেচনা করা যায়। কারণ তিনি বিশ শতকের শুরুর দিক পর্যন্ত এ সংক্রান্ত বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব আবিষ্কারগুলোও তার রচনায় ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। বিশ শতকের শুরুতে মানুষ এ কথা আর বিশ্বাস করত না যে মহামারী বাইবেলবর্ণিত পাপের শাস্তি—যা ঈশ্বর দিয়ে থাকেন। কারণ ততদিনে লুই পাস্তুর ও রবার্ট কোচের মতো বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে মানুষ জেনে গেছে যে, এই সব রোগের জন্য ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস নামের অণুপরজীবীরা দায়ী। আর এ ধরনের রোগ নির্মূলের জন্য টিকা বা প্রতিষেধকও আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষজনের মধ্যে মহামারী সম্বন্ধে ধারণা পরিবর্তন খুব কমই হয়। এ ধরনের সংকটে পড়লে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি আরো বেশি করে।

স্কার্লেট প্লেগের শুরুর দিকে লেখক এইভাবে বর্ণনা করেছেন যে, ‘যখন এই ব্যাকটেরিয়াল রোগটি ছড়িয়ে যেতে শুরু করল তখন মানুষজন খুব একটা গা করল না, তারা ভাবল—এ এমন কিছু নয়, বিজ্ঞানীরা আগের মতো খুব শিগগির এটিকেও বাগে নিয়ে আসবেন।’ কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তারা ভয় পেয়ে গেল, এই রোগের ভয়ংকরী রূপ দেখে। যাকে ধরছে তাকেই হত্যা করে ছাড়ছে, প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। লন্ডনের স্কার্লেট প্লেগের কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্রানসার এই রোগের এইভাবে বর্ণনা দেন—‘হৃৎপিণ্ডে দ্রুত ধুকপুকানি শুরু হয় এবং শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। তারপর শরীরে ফুসকুঁড়ি দেখা দেয়; কালো হয়ে ওঠে, মনে হয় যেন শরীরের উপর দিয়ে দাবানল বয়ে গেছে। অধিকাংশ লোকই শরীরের তাপমাত্রা এবং বুকের ধুকপুকানি বুঝতে পারে না; আর যখন তা বুঝতে পারে তখনই টের পায় শরীরে এক বিদ্‌ঘুটে ফুসকুঁড়ি বের হয়েছে। সাধারণত ফুসকুঁড়িগুলো দৃশ্যমান হতেই শরীরে খিঁচুনি শুরু হয়। আর সেটাও যে দীর্ঘস্থায়ী হয় এমন নয়। এর আগেই তাদের হাঁটু পা নিতম্বগুলো অসাড় হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।’

লন্ডন লেখেন, স্কার্লেট প্লেগে মৃতদেহগুলো দ্রুত সৎকার করতে না পারায় কোটি কোটি জীবাণু এই রোগের প্রসারণকে আরো ত্বরান্বিত করে তোলে। ডাক্তাররা এই রোগ নিরাময়ের জন্য কোনো ওষুধই কাজে লাগাতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে এর প্রতিষেধকমূলক সিরাম আবিষ্কার হলেও তা প্রয়োগ করতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। এমনকি যারা ল্যাবরেটরিতে এসব নিয়ে গবেষণা করছিল, তাদের জ্ঞান ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া বিষয়ক হলেও নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারেন নি। একদিকে তারা গবেষণা করছিল অন্যদিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিলেন। যত দ্রুত সম্ভব অন্যরা সেই সব জায়গা পূরণ করছিল।

এ সময় বিজ্ঞান ও ওষুধের প্রতি মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিল। আর তার জায়গায় মানুষের মনে এক আজানা ভয় স্থান করে নিচ্ছিল। এই উপন্যাসের নায়ক গ্রানসার, যিনি একদা ক্যালিফোর্নিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি তার নাতিকে বলছিলেন—‘বিষ্যুদবার রাতে দেশে প্রথম এই আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল। একটু ভেবে দেখ আমার নাতি, মানুষ গিজগিজ করছিল সলেমন নদীর তীরে। শহর থেকে বানের জলের মতো মানুষ বাঁচার জন্য পালিয়ে আসছিল আর সঙ্গে আনছিল এই মহাসড়কের জীবাণু। এমনকি ধনীরা যারা বিমানে করে পাহাড়ে জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিল, তারাও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল এই জীবাণু।’ কিন্তু তাদের পালানোর কোনো উপায় ছিল না। কারণ জীবাণু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। কেউ তাদের থামাতে পারছিল না; এমনকি এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন আগে কখনো পৃথিবীর মানুষ হয় নি। মহামারীকালে মানুষজন একেবারে অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করছিল। ‘যখন সাধারণ রোগ আমাদের মধ্যে ছড়ায় তখন আমরা এমন আচরণ করি না। আমরা এ ক্ষেত্রে শান্ত থাকি, ডক্তার কিংবা নার্সের কাছে যাই, আর তারা যা বলে সেভাবে চলতে থাকি। প্লেগ যখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল তখন কিছু লোক বাঁচার জন্য লোকালয় ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকে। আবার যারা লোকালয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিনতাই, মদ্যপান, ডাকাতি এমনকি খুনের মতো ঘটনার শিকার হচ্ছিল। এই অনিয়ন্ত্রিত আচরণের দ্বারাও প্লেগ ছড়িয়ে পড়ছিল। গ্রানসারের কথায়, ‘বুঝলে নাতি, আমরা আমাদের সভ্যতার মধ্যে, আমাদের বস্তি আর শ্রমিকদের মধ্যে একটি বর্বর প্রজাতির জন্ম দিয়েছিলাম; আর তারই ফলে আমাদের এই বিপর্যয়, প্রকৃতি আমাদের বুনো জন্তুর মতো পিষে মেরেছিল। তারা নিজেরাও তাদের ধ্বংস করেছিল।’

লন্ডন তার বইয়ে দেখান প্লেগের পরে বেঁচে থাকা অবশিষ্ট মানুষকে কিভাবে আদিম পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াই করতে হয়েছিল। তার বইতে ডারউইনের তত্ত্বের প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। ‘সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং যে যার মতো বাঁচার চেষ্টা করছিল।’ লন্ডন এ অবস্থার জন্য তার পূর্ববর্তী কয়েকজন লেখকের মতো কায়েমি সমাজব্যবস্থাকেই দায়ী করছিলেন। বিশেষ করে লন্ডনের মতে পুঁজিবাদ এই মহামারীর দায় এড়াতে পারে না। শিল্পের প্রয়োজনে কারখানার প্রয়োজনে তারা মানুষকে একত্রে জড়ো করে তোলে; আর এই উপচেপড়া ভিড়, জনাকীর্ণ বসতি মহামারী সৃষ্টির জন্য সহায়ক হয়। লন্ডনের মতে পুঁজিবাদই এই মহামারীর জন্য একমাত্র দায়ী।

বইয়ের বর্ণনায় মানবজাতি তখন মারা যাচ্ছিল আর পৃথিবী অগ্নিকুণ্ডে নিপতিত হচ্ছিল : ‘জ্বলন্ত ধোঁয়া আকাশকে ভরিয়ে তুলছিল, মধ্যাহ্নের উজ্জ্বলতা গোধূলির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিল, বাতাস হালকা হয়ে আসছিল এবং মাঝে মাঝে সূর্যের আলো নিস্তেজ ও রক্তবর্ণ ধারণ করছিল। সত্যিই এটি পৃথিবীর শেষ দিনের মতো ছিল।’ সেদিনের লোকজনের কাছে পৃথিবীর অনুভূতিগুলো ঠিক এমনই ছিল। তারা কেবল এমনটিই মনে করছিল না যে তারা মারা যাচ্ছে, তারা অনুভব করছিল তারা পৃথিবীর শেষদিনের কাছে চলে এসেছে। শহরগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, লোকজন মূর্ছারোগীর মতো মোহাচ্ছন্ন হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। মানুষের মনে এই আতঙ্ক আরো বেড়ে গিয়েছিল এই জন্য যে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তের সঙ্গে তাদের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আর এটিই আশ্চর্যজনকভাবে লোকজনকে ভীতগ্রস্ত করে তুলেছিল যে, পৃথিবীর বাকি আর সব সম্ভবত আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে।’


প্রায় সব ঔপন্যাসিকই মানব সমাজে অতিরিক্ত বস্তুবাদিতা এবং নীতিহীন পুঁজির বিকাশকে সমর্থন করেন নি। 


লন্ডনের দ্য স্কার্লেট প্লেগ বইটি কেবল তার নিজের সৃষ্টির মধ্যেই সেরা নয়, এটি আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্রের মানুষজনের কাছেও মহামারী অবস্থার সতর্কবার্তা। তার এই বই লেখার মাত্র ছয় বছর পরে ১৯১৮ সালে প্রধানত ইউরোপ আমেরিকায় মহামারী হিসাবে ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয় তৎকালীন পৃথিবীর প্রায় এক চতুর্থাংশ মানুষ এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং এতে প্রায় পাঁচ কোটি লোক মারা গিয়েছিলেন মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে। এই স্প্যানিশ ফ্লু নিয়েও বেশ কয়েকটি ফিকশন রচিত হয়েছে তার মধ্যে ইদানীং কালে রচিত টমাস মুলার [১৯৭৪] এর দ্য লাস্ট টাউন অন আর্থ [২০০৬] উল্লেখযোগ্য। কমনওয়েলথ নামে একটি কাল্পনিক শহরকে কেন্দ্র করে এর আখ্যান গড়ে ওঠে। স্প্যানিশ ফ্লু’র মহামারীর সময়ে শহরটিকে বাঁচানোর জন্য বহির্বিশ্ব থেকে এটি আলাদা করে ফেলা হয়। কিন্তু শহরের প্রতিষ্ঠাতা চার্লস ওয়ার্দির দত্তক পুত্র ফিলিপ ওয়ার্দি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হারিয়ে একজন সৈন্যকে হঠাৎ করে শহরে নিয়ে আসে। যদিও শুরুতে তাকে সুস্থ মনে হচ্ছিল; কিন্তু ওই সৈন্য শহরে আসার কিছুদিন পরে শহরের লোকজন স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হতে শুরু করে। এ থেকে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস শুরু হয় এবং একে অপরের বিরুদ্ধে যেতে শুরু করে। পোস্ট অ্যাপকিলিপটিক উপন্যাসে আমরা একটি বিষয় লক্ষ করেছি যে, প্রায় সব ঔপন্যাসিকই মানব সমাজে অতিরিক্ত বস্তুবাদিতা এবং নীতিহীন পুঁজির বিকাশকে সমর্থন করেন নি। এমনকি তারা মানুষের এ ধরনের লোভ ও লাগামহীন বৈশ্যবৃত্তিকেই মূলত মহামারীর জন্য দায়ী করেছেন। কারণ মানুষ যখন অর্থ ও ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে, সমাজের অসম বিকাশ এবং প্রকৃতির প্রতি নির্বিচারতার ফলে সবকিছুর মধ্যে একটা ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। তখন এক ধরনের প্রকৃতির প্রতিশোধ হিসাবে মহামারীর আবির্ভাব ঘটে। টমাস রবার্ট ম্যালথাস [১৭৬৬-১৮৩৪] এর মতে এটি প্রকৃতির স্থিতি অবস্থার নীতি। জনসংখ্যা বেড়ে গেলে, কিংবা মহাপ্রকৃতির জন্য যা বহনযোগ্য নয় তা আপন নিয়মের এক সময় প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের পথ বেছে নেয়।

এবার আলবেয়ার ক্যামু’র দ্য প্লেগ নিয়ে কিছু আলোকপাত করা যাক। মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে আলবার্ট ক্যামু সাহিত্যে নোবেল পান। তিনি সাহিত্যে দ্বিতীয় কনিষ্ঠ নোবেল বিজেতা। মাত্র ৫৭ বছর বয়সে তিনি প্যারিসে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। মার্কসবাদের প্রতি আস্থাশীলতার পাশাপাশি অস্তিত্ববাদী এই দার্শনিক লেখক তার আউটসাইডারের জন্য যেমন খ্যাতিমান তেমনি মহামারী নিয়ে লেখা দ্য প্লেগ বা লা পেস্তে উপন্যাসের জন্যও বিশ্বব্যাপী সমানপরিচিত। বিশেষ করে পৃথিবীতে যখন মহামারী নেমে আসে, তখন এই বিপর্যয়ের সামাজিক দার্শনিক ও রাজনৈতিক চরিত্র নিরূপণে এই বইটির প্রাসঙ্গিকতা পাঠককে মুগ্ধ করে থাকে। ক্যামুর উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য কেবল জীবন ও জীবিত মানুষের সমাজ কাঠামোর সংঘাত নয়। তার উপন্যাসে অস্তিত্ববাদী দর্শনের আলোকে মৃত্যু জীবনবোধের নতুন মাত্রা তৈরি করে। লা পেস্ত বা দ্য প্লেগ উপন্যাসেও এই মহামারীর কেবল মৃত্যুর প্রতিনিধিত্ব করে নি; বরং প্লেগকে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করেছেন। ক্যামুর উপন্যাসের কাহিনি সংক্ষেপ এখানে বলে নেয়া ভালো।

ঘটনাস্থল ফরাসি উপনিবেশ আলজেরিয়ার উপকূলীয় ওরান ওঁরা শহর। হঠাৎ করেই দেখে গেল রাস্তায় বাড়িতে হোটেলের লবিতে শত শত ইঁদুর মারা যাচ্ছে। তখনো কেউ সন্দেহ করে নি—এটি প্লেগের পূর্ব-লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু স্থানীয় পত্রিকায় খরবটি ছাপা হওয়ার পরে শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়ে। লোকজনের চাপের মুখে নগর কর্তৃপক্ষ মৃত ইঁদুর পরিষ্কারের কাজ শুরু করলেও তাদের অসতর্ক কর্মকাণ্ডের ফলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব আরো ত্বরান্বিত হয়ে পড়ে। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বার্নাড রিউ পেশায় ডাক্তার, শহরের একটি ফ্ল্যাট বাড়ির বাসিন্দা। সেখানেও মৃত ইঁদুরের উপস্থিতি লক্ষ করেন তিনি। এরই মধ্যে দেখা গেল তার ভবনের নিরাপত্তা রক্ষী কয়েক দিনের জ্বর নিয়ে হঠাৎ মারা গেল। বিষয়টি নিয়ে ডা. রিউ তার সহকর্মী ড. ক্যাস্টেলের সঙ্গে আলাপ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন—শহরের প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তারা বিষয়টি নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে নিয়োজিত তাদের সহকর্মী ডাক্তারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানালেন যে, তাদের মনে হচ্ছে শহরে প্লেগ দেখা দিয়েছে। কিন্তু এই একটি মাত্র মৃত্যুর ঘটনায় তিনি বিষয়টি পাত্তা দিতে চান নি। সময় মতো সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে; এবং মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। তখন আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এর মধ্যে ডা. রিউয়ের স্ত্রী অসুস্থতাজনিত কারণে অন্য এক শহরের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি হন।

কর্তৃপক্ষের গড়িমসি তথ্য গোপন ও পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। খারাপ পরিস্থিতিও সরকারি কর্মকর্তাদের অহেতুক আশা-ব্যঞ্জক ভাষা আসল চিত্র ধোঁয়াশার করে তোলে। তারা বলতে থাকে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার সকল প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। অথচ মাত্র তিন দিনের মধ্যে হাসপাতালের বেডগুলো প্লেগ রোগীতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। একের পর এক মানুষ মরতে থাকে; অন্ত্যেষ্টিয়ার স্থান সংকুলান হয় না। বাড়িগুলো তখন কোয়ারেন্টাইন হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্লেগের ওষুধ আসলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এক হাসপাতালেই প্রতিদিন ত্রিশ জনের বেশি লোক মারা যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় শহর সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়; এবং মহামারীর কথা সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। শহর পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়। শহরের সকল প্রবেশ ও বহির্গমন পথ বন্ধ করে দেয়া হয়; সড়ক রেলপথসহ যাবতীয় যোগাযোগ বন্ধ করা হয়; এমনকি চিঠিপত্র ডাক যোগাযোগও নিষিদ্ধ করা হয়। কেবল দুএকটি জরুরি টেলিযোগাযোগ খোলা থাকে শহরের বাইরে আত্মীয় পরিজনের জরুরি খবরাখবর আদান প্রদানের জন্য। এই বিচ্ছিন্নতার ফলে কাজ-কর্ম ব্যাহত হতে থাকে এবং শহরের লোকজনের মধ্যে একাকিত্ব, হতাশার জন্ম দেয়ায় নানারকম অসুবিধা তৈরি হতে থাকে।

রেমন্ড রেম্বার্ট নামে প্যারিসের এক নামী কাগজের সাংবাদিক অরনের স্থানীয় আরব জনগণের ওপরে সংবাদ সংগ্রহে এসে আটকে পড়ে। প্লেগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লে সে প্যারিসে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পুরো শহর লকডাউন থাকায় তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। অবশ্য সে আন্ডার গ্রাউন্ডের হোতাদের ধরেও শহর থেকে পালানোর চেষ্টা করে। এদিকে ফাদার প্যানেলু মহামারীর সুযোগকে তার বিশ্বাসের পক্ষে সুযোগ তৈরি করতে চেষ্টা করে যে, এটি ঈশ্বরের পক্ষ থেকে পাপের শাস্তি। মানুষ যতই চেষ্টা করুক, ঈশ্বর না চাইলে এই মহামারী থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় নেই। শহরের লোকজন অন্য সময়ের চেয়ে তার এই ধর্মীয় উপদেশে বেশি আকৃষ্ট হয়। কোটাড নামের আরেকজন অসাধু ব্যবসায়ী যে অবৈধ পথে প্রচুর অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছে। বিরূপ পরিস্থিতিতে হতভম্ভ সে আত্মহত্যারও চেষ্টা করে। পুলিশ তাকে তার অপরাধের জন্য গ্রেফতার করে। এদিকে ছুটি কাটাতে আসা আটকে পড়া জ্যাঁ তারু, প্রকৌশলী জোশেফ গ্রান্ড এবং ডা. রিউ মিলে মহামারী থেকে লোকজনকে বাঁচানোর জন্য রাতদিন পরিশ্রম করতে থাকে। জ্যাঁ তারু অবশ্য প্রথমে শহর থেকে পালানোর পরিকল্পনা করে। কিন্তু ড. রিউয়ের সঙ্গে আলাপের পর সে তার মত পরিবর্তন করে প্লেগ রোগীদের সেবায় নিয়োজিত হন।

আগস্টের মাঝামাঝি অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ে। লোকজন শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। শহরে কিছুটা লুটপাটেরও ঘটনা শুরু হয়। শেষে পরিস্থিতি সামাল দিতে সামরিক শাসন জারি করা হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দেয় লাশের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়ে; এত লাশ সৎকারের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষকে। পরিবারের সদস্যদের কাছে থেকেও দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হয়। মানুষজন শারীরিক ও মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়ে।

সেপ্টেম্বর অক্টোবরেও শহরে প্লেগের প্রকোপ থেকে যায়। এর মধ্যে ডা. রিউ খবর পায় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে তার স্ত্রীর অবস্থা ভালো নয়। কিন্তু শহরের মহামারী আক্রান্ত মানুষদের সেবাব্রতকেই তার অন্তর সর্বাধিক সাড়া দেয়। এদিকে কোটাডও নিজেকে প্লেগাক্রান্তদের সেবায় নিযুক্ত করছেন; কারণ তারও মনে হয়েছে সব লোকের ভাগ্যই যখন একসূত্রে গাথা হয়ে গেছে তখন পালানোর তো কোনো মানে হয় না। কোটাড ও তারু স্থানীয় একটি মঞ্চে যাত্রা দেখতে গিয়ে লক্ষ করেন, নায়ক অভিনয়ের সময়ে প্লেগের লক্ষণ নিয়ে মঞ্চেই ঢলে পড়ছেন। রেম্বার্ট শেষে উৎকোচের বিনিময়ে শহর থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও তার মন সায় দেয় নি। মনে হয়েছে, এই অবস্থায় শহর ছেড়ে গেলে সে তার নিজের কাছে ছোট হয়ে যাবে।

অক্টোবরের দিকে ক্যাস্টেলের প্লেগ নিরাময় সিরাম প্রথম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই ওষুধ ব্যবহার করেও ওথনের শিশু সন্তানকে বাঁচানো গেল না। তারু পেনেলু ও ড. রিউ সেই ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করলেন। পাদ্রি পেনালু শেষমেশ স্বেচ্ছাসেবী দলে যোগ দিয়ে আবার তার দ্বিতীয় বাণী প্রচার করলেন। সে এই নিষ্পাপ বাচ্চার মৃত্যু যন্ত্রণাকে খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের পরীক্ষা হিসাবে প্রচার করলেন। তিনি বললেন খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস ঈশ্বরের প্রতি শর্তহীন সমর্পণ। মাঝামাঝি বলে কিছু নেই। তিনি ধর্মকে রক্ষা করেই প্লেগের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ের আহ্বান জানান। এই ধর্মীয় বাণী প্রচারের কয়েক দিনের মাথায় পেনালু নিজেও প্লেগে আক্রান্ত হন।

তারু এবং রবার্ট একটি আইসোলেশন ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে সেখানে ওথনের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ হয়। সেখানে তার কোয়ারেন্টাইনের সময় শেষ হয়েছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, এখানে থেকে তিনি প্লেগ নিরাময় ক্যাম্পে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করবেন। তাতে তার ছেলের আত্মা শান্তি পাবে। তারু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রিউয়ের কাছে তার জীবনের সব কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন। গ্রান্ডকেও প্লেগে ধরেছিল। তিনি ড. রিউকে তার সব কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলতে বলেছিলেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে গ্রান্ড প্লেগ থেকে সেরে উঠেছিলেন।


মহামারী মানব সভ্যতার সমান বয়সী। ফলে সাহিত্যেও আদি কাল থেকে মহামারীর প্রতিফলন রয়েছে।


জানুয়ারির দিকে হঠাৎ করেই শহর থেকে প্লেগ উধাও হয়ে যায়। লোকজন ঘর থেকে বের হতে শুরু করল। শহরের ফটকগুলো খুলে দেয়া হলো। ওথান এই মহামারী থেকে বাঁচতে পারে নি। কটোডও মহামারী শেষে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অবৈধ ব্যবসার দ্বারা বিপুল অর্থ উপার্জনের দায়ে সরকারি তলব পড়লে সে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। মহামারী শেষ হয়ে এলেও তারু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ডা. রিউ টেলিফোন বার্তায় জানতে পারেন তার স্ত্রী হাসপাতালে মারা গেছেন। ফেব্রুয়ারিতে শহরের মূল ফটক খুলে দেয়ো হয়। অন্য শহরের সঙ্গে পুনরায় যোগযোগ স্থাপন হয়; এবং শহরের বাসিন্দারা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পুনর্মিলনের সুযোগ পায়। রেম্বার্ট তার স্ত্রীর কাছে ফিরে যান। কোটাড মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং তার বাড়ি থেকে একজনকে গুলি করে হত্যার দায়ে গ্রেফতার হন। গ্রান্ড তার উপন্যাসে লেখার কাজ আবারো শুরু করেন। তবে এই উপন্যাসের বর্ণনাকারী শেষমেশ পাঠকের কাছে অধরাই থেকে যায়।

আলবেয়ার ক্যামুর দ্য প্লেগের সঙ্গে বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক মহামারী করোনা পরিস্থিতির এক আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে। বিশেষ করে, কর্তৃপক্ষের তথ্য গোপন ও শুরুতে গুরুত্ব না দেয়া। জনগণকে সঠিক সংকটটি বুঝতে না দিয়ে প্রস্তুতি নিতে বিলম্ব করা। সংকট মোকাবেলার সামর্থ্য না থাকার পরেও মিথ্যা বড়াই করা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন না ঘটানো। মহামারীর একমাত্র কার্যকরি ব্যবস্থা আইসোলেশন ও লকডাউনের মতো ব্যবস্থা সময় মতো গ্রহণ না করা। মৃতদেহ সৎকার ব্যবস্থা ভেঙে পড়া। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সংকট উত্তরণে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ না দিয়ে জনগণের মধ্যে ভুল বার্তা প্রদান করা। মহামারীকে ঈশ্বরের অভিশাপ হিসাবে বর্ণনা করা। আবার পরিস্থিতি তাদের বিরুদ্ধে গেলে নতুন করে ব্যাখ্যা প্রদান করা। এই সময়ে অনেকেই নিজে বাঁচার জন্য শহর ছেড়ে পালাতে চান। এতেও রোগ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই অস্থিতিশীল অবস্থায় অর্থবিত্ত অর্জনের উপায় খুঁজে পায়। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, খুন ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটে। তাছাড়া দীর্ঘদিন একা বিচ্ছিন্ন থাকা এবং মৃত্যুর মিছিল দেখার ফলে অনেকের মধ্যে হতাশা ও মানসিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। আবার অনেকে মানব সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে নিঃস্বার্থভাবে মহামারী মোকাবেলায় নিজেকে সমর্পণ করে থাকেন।

অবশ্য আলবেয়ার ক্যামুর উপন্যাসটি এতটা সরল নয়। প্রতীকী ব্যঞ্জনার দ্বারা বর্ণিত বিষয়ের সরলার্থের বাইরে যাওয়ার প্রয়াস রয়েছে। হতে পারে সেটা ঔপনিবেশিক শাসনে আলজেরিয়ার অবস্থা; আবার নাজি শাসনের ভয়াবহতাও তিনি তুলে ধরেন। কিন্তু বর্তমান করোনাকালে এই উপন্যাস আমাদের বাস্তবতা এমনকি বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গেও দারুণভাবে খাপ খেয়েছে। হালে দ্য সেভেন প্লেগ নামে জেমস রলিন্স [১৯৬১] এর একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। যার মূল প্রতিপাদ্য ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত মোসেজের টেনথ কামানডমেন্টে সেই প্লেগ কি সত্যিই ঘটেছিল। নানা ঐতিহাসিক তথ্যকে আশ্রয় করে কল্পনার ডানা বিস্তার করেছেন লেখক। বাইবেলে টেনথ ইজিপসিয়ান প্লেগের কথা উল্লেখ আছে। ফারাও সম্রাটের পাপের শাস্তি হিসাবে ঈশ্বর এই মহামারী দিয়ে তাকে সংশোধনের চেষ্টা করেছেন। যখনই ফারাও রাজ মহামারীর মতো সংকটে নিপতিত হয়, তখনই সে বনি ইসরাইলিদের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি করে। কিন্তু সংকট কেটে গেলে আবার সে আগের অবস্থানে ফিরে যায়। শেষে টেনথ কমেনডমেন্টে প্রভু তাদের মহামারী দিয়ে চূড়ান্ত শাস্তি দেয়। বিগত কয়েক দশকের মধ্যে লিখিত এই ধারার উপন্যাসের সংখ্যা একেবারে কম নয়। তবে অন্তত আরো একটি উপন্যাস আলোচনার দাবি রাখে।

মহামারী কালের চরিত্র বোঝার জন্য হোসে সারামাগো [১৯২২-২০১০]-র ব্লাইন্ডনেস উপন্যাসটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী এই লেখক উপন্যাসের কাহিনি ও আঙ্গিকে কিছুটা ভিন্নতা এনেছেন। নাম উল্লেখ করা হয় নি এমন এক শহরে এক অজ্ঞাত কারণে লোকজনের মধ্যে দ্রুত অন্ধত্বের মতো রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। লেখক এটাকে শ্বেত-অন্ধত্ব বলে অভিহিত করেছেন। এই উপন্যাসটি মূলত সেই দুর্ভাগাদের কাহিনি নিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে, যারা এই মহামারীর শুরুতেই আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে আছেন একজন ডাক্তার—যিনি নিজেও অন্ধত্বে আক্রান্ত হয়েছেন। চরিত্র হিসাবে আরো আছেন তার স্ত্রী, দুর্ভাগ্যক্রমে একত্রিত হওয়া ডাক্তারের কিছু অন্ধ রোগী—যারা কোয়ারেন্টাইনের সময় একত্রিত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে কেবল ডাক্তারের স্ত্রী অন্ধত্বের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে কোয়ারেন্টাইনে স্বামীর সঙ্গী হওয়ার জন্য তিনি অন্ধত্বের ভান করে তাদের সাথে থাকার সুযোগ করে নেন। কোয়ারেন্টাইনের দীর্ঘ একঘেয়ে জীবনের নানা সুখ-দুঃখ, অতীতের স্মৃতিময় কাহিনির বর্ণনা ও কৌতুকপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টির দ্বারা তারা কিভাবে একটি পরিবারের মতো কাছাকাছি এসেছিলেন—এটি তারই গল্প। আকস্মিক এই অন্ধত্ব মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ায় জনগণের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। উপরন্তু সরকারের অব্যবস্থা ও দমননীতির ফলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। উপন্যাসে দেখা যায় কোয়ারেন্টাইনে অন্ধ ঘিঞ্জি নোংরা পরিবেশে তাদের দুর্বিষহ জীবনের সূচনা। অবশ্য এটি বাইরের জীবনেরই একটি প্রতিফলন মাত্র।

কর্তৃপক্ষের অনিয়মের ফলে খাদ্য সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়ায় কোয়ারেন্টাইনে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এতে সংহতি নষ্ট হয় এবং ব্যবস্থাপনার অভাবে খাদ্য পরিবেশনও বাধাগ্রস্ত হয়। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। কোয়ারেন্টাইনের রোগীদের সংস্পর্শে আসায় একের পর এক সৈন্যরাও সংক্রমিত হতে থাকে। সামরিক বাহিনী প্রয়োজনীয় ওষুধ অনুমোদন না দেয়ায় খুব সাধারণ রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে সৈন্যরা খাদ্য সরবরাহকারী ইন্টার্নি নার্সদের সংখ্যা কমিয়ে আনলে সমস্যা আরো ঘনীভূত হয়। পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। খাদ্য পরিবেশনকারী নার্সরা তাদের অধীনস্ত হয়ে পড়ে এবং নতুন করে তারা বলাৎকার ও বঞ্চনার শিকার হয়। দুর্ভিক্ষের মুখে পড়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে এবং অন্ধ আশ্রম পুড়িয়ে দেয়। পরিণামে সেনাবাহিনী আশ্রম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। তারা তখন অসহায় অন্ধ লোকজনের সঙ্গে বাইরের জগতে চলে আসে। সেখানেও বিপর্যস্ত শহরের লোকজন বাঁচার তাগিদে খাদ্যের জন্য একে অপরের সঙ্গে লড়াই করতে থাকে।

কাহিনিটি ডাক্তারের স্ত্রী, ডাক্তার ও তাদের সঙ্গে পরিবারের মতো থাকা কোয়ারেন্টাইনের অন্ধ লোকদের নিয়ে এগুতে থাকে। ডাক্তারের স্ত্রী এখানে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। অন্ধ বলে পরিচয় দিলেও তিনিই একমাত্র চক্ষুষ্মান। সামাজিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, আইন-শৃঙ্খলার বালাই নেই, সামাজিক সেবা, সরকারি ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব ধ্বংস হয়ে গেছে। পরিবারগুলো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন কেউ কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না। লোকজন শহরের পরিত্যক্ত ভবনে আশ্রয় নিয়েছে খাদ্যের জন্য আহাজারি করছে। হিংস্রতা, রোগবালাই, দুর্ভিক্ষ, বৈষম্য এমনভাবে জেঁকে বসেছে যে মানবজাতির অস্তিত্ব নিয়েই সংকট দেখা দিয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে বাঁচার তাগিদে ডাক্তার, ডাক্তারের স্ত্রী এবং তাদের অন্ধ আশ্রমের সদস্যরা মিলে ডাক্তারের বাড়িতে একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। সেখানে শহর থেকে অন্ধদের ফিরিয়ে আনা হয় এবং হঠাৎ করে সেখানে নতুন ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে।

সারামাগোর অন্ধত্ব বা স্প্যানিশ ভাষায় এনসাইরো সোবরিয়া সেগেইরা উপন্যাসটিও ক্যামুর দ্য প্লেগের মতো কিংবা তারচেয়ে বেশি জটিল প্রতীকধর্মী রচনা। কারণ এটি মহামারী নিয়ে রচিত হলেও এর স্থান কাল এমনকি রোগটিও সুনির্দিষ্ট বাস্তবতা অনুসরণ করে নি। কিন্তু একটি মহামারী প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়লে একটি দেশের সরকার জনগণ চিকিৎসা ব্যবস্থা সামরিক বাহিনী কি ধরনের প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়—এই উপন্যাসে সেই গভীর বাস্তবতা ধরা পড়েছে। প্রাদুর্ভাবের শুরুতে গুরুত্ব না দেয়া, অব্যবস্থাপনা, দুর্ভিক্ষ, আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়া, ধর্ষণ, খুন, ডাকাতির মতো ঘটনা তখন নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে ওঠে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা আর সহজ হয় না।

এছাড়াও আরো কিছু উপন্যাসের নাম এখানে বলা যেতে পারে, যেগুলো মহামারী নিয়ে রচিত। যেমন: চেরি : নিকো ওয়াকার, পেইন কিলার : মেরি মেয়েবার, সুপারবাগস : ম্যাট ম্যাকক্যাথি, দ্য লাস্ট ওয়ান : এমিলি মেন্ট জন মেন্ডেল, দ্য এয়ার অব দ্য বুক: মার্গারেট এটউড, জোন ওয়ান : কোলোসন উইথহেড, দ্য স্ট্যান্ড : স্টেফেন কিং, র‌্যাবিড : বিল ওয়াসিক অ্যান্ড মনিকা মারফি, দ্য গ্রেট ইনফ্লুয়েঞ্জা : জন এম ব্যারি, দ্য ঘোস্ট ম্যাপ : স্টেফেন জনসন, ভাইরাস হান্টার : সি জেপিটার্স মার্ক ওলসাকার, ক্ল্যার্ক হোল: চার্লেস বার্ন, পক্স : মিকায়েল উইলবিচ, দ্য আমেরিকান প্লেগ : মলি কাল্ডওয়েল ক্রসবি, দ্য কামিং প্লেগ : লুরিয়ে গ্যারেট, দ্য রেমেডি : থমাস গোয়েটজ, দ্য ডেমন ইন দ্য ফ্রিজার ইমার্জি এপিডেমিক : মেডিলিন ডেক্সলার, দ্য স্টেইন ভলিউম : ডেভিড লাকাম, নেমেসিস : ফিলিপ রথ, ওয়াল্ড ওয়ার জেড : মাক্স ব্রুকস, ইয়ার অব ওয়ান্ডার্স : জেরান্ডিন ব্রুকস, দ্য হট জোন : রিচার্ড পেইসইন, সেভারেনস : লিং মা, দ্য ড্রিমারস : ক্যারেন থমাস, দ্য ক্যাম লাইক সোয়ালোস : উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েল, দ্য ইয়ার অব দ্য ফ্লাড : মার্গরেট এডউড, পেলে হর্স পেলে রাইডার : ক্যাথেরিন এনিপটার, দ্য ডগ স্টার : পিটার হলার, ওয়াইন্ডার গার্লস : ররি পাউয়ার, দ্য লাস্ট টাউন অব দ্য আর্থ : থমাস মুলার।

মহামারী মানব সভ্যতার সমান বয়সী। ফলে সাহিত্যেও আদি কাল থেকে মহামারীর প্রতিফলন রয়েছে। সফোক্লিসের আগে গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াডে মহামারীর কথা রয়েছে। সাড়ে তিন হাজার বছর আগে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ তোরাতেও মহামারীর কথা আছে। বাংলা সাহিত্যও মহামারী এক বিশেষ জায়গা জুড়ে আছে। বিশেষ করে মধ্য যুগের মঙ্গলকাব্য কলেরার দেবী ওলাইচণ্ডী ও বসন্তের দেবী শীতলা দেবীকে নিয়ে মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে। এই কাব্য কেবল আনন্দ দানের জন্য লিখিত হয় নি; হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ মহামারীর কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পবিত্র জ্ঞানে তা পাঠ শ্রবণ ও অনুসরণ করেছে।


সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ’র কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসটিকে এক ধরনের মহামারী-সঞ্জাত উপন্যাস বললে ভুল হয় না। 


আধুনিক কালের বাংলা সাহিত্যের মহামারী দুর্লক্ষ্য নয়। বঙ্কিম উপন্যাসেও মহামড়কের উল্লেখ আছে। বিশেষ করে আনন্দ মঠে দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর উপস্থিতি একই সঙ্গে। শরৎ-সাহিত্যের পাঠক মাত্রেই মহামারী প্লেগ এসবের সঙ্গে পরিচিত আছেন। শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র সুরেশ প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চলে মানুষের সেবা করতে গিয়ে নিজেই প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মাঝুলি নামের একটি গ্রামে প্লেগে কি ভয়াবহ দশা হয়েছিল তার করুণ চিত্র গৃহদাহ গ্রন্থে বিধৃত আছে। পথের দাবীতেও মহামারীর বর্ণনা আছে। শ্রীকান্ত উপন্যাসেও দেখা যায় বার্মায় প্লেগের উপদ্রব, জাহাজযাত্রীদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার খবর। যেমন : ‘পরদিন বেলা এগার-বারটার মধ্যে জাহাজ রঙ্গুন পৌঁছিবে; কিন্তু ভোর না হইতেই সমস্ত লোকের মুখচোখে একটা ভয় ও চাঞ্চল্যের চিহ্ন দেখা দিল। চারিদিক হইতে একটা অস্ফুট শব্দ কানে আসিতে লাগিল, কেরেন্টিন। খবর লইয়া জানিলাম, কথাটা Quarantine: তখন প্লেগের ভয়ে বর্মা গভর্নমেন্ট অত্যন্ত সাবধান। শহর হইতে আট-দশ মাইল দূরে একটা চড়ায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়া খানিকটা স্থান ঘিরিয়া লইয়া অনেকগুলি কুঁড়েঘর তৈয়ারি করা হইয়াছে; ইহারই মধ্যে সমস্ত ডেকের যাত্রীদের নির্বিচারে নামাইয়া দেওয়া হয়। দশদিন বাস করার পর, তবে ইহারা শহরে প্রবেশ করিতে পায় ।’

অবশ্য শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের কেন্দ্রে মহামারী নয়। মহামারী এসেছে ঘটনার প্রয়োজনে। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ’র কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসটিকে এক ধরনের মহামারী-সঞ্জাত উপন্যাস বললে ভুল হয় না। ক্যামু ও সার্ত্রের ঘরানার এই প্রতিভাবন লেখক অস্তিত্ববাদী সংকট ও উত্তরণের নিমিত্তে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন। মানুষের কুসংস্কার, চেতনার বৈকল্য কিভাবে মহামারী আকারে একটি জনপদে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই উপন্যাসটি তারই উদাহরণ। মানুষের মনের দুর্বলতা, অদৃষ্টে বিশ্বাস এবং বিচ্ছিন্নতা বোধ মানুষকে কিভাবে ধ্বংসের মুখে নিয়ে যায় এখানে তার ইঙ্গিত আছে। অনেকটা হোসে সারামাগোর অন্ধত্ব উপন্যাসের শ্বেত অন্ধত্বের মতো প্রতীকী মহামারী এই উপন্যাসেও রূপ পেয়েছে। একদা সখিনা নামে এক স্কুল শিক্ষিকা অদৃশ্য কান্নার শব্দ শুনতে পায় বলে রটনা শুরু হয়। এরপর গ্রামে একে একে প্রায় সবাই এই কান্নার আওয়াজ শুনতে থাকে। তাদের মনে হয় কুমুরডাঙ্গা নদী থেকে এই কান্নার উৎপত্তি। অনেকেই নদীকে প্রসন্ন করতে সাধ্য মতো নানা পূজাউপাচার বিসর্জন দিতে থাকে। যাদের সাধ্য আছে তারা গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে থাকে। আসলে কুমুরডাঙ্গাবাসী যে ধরনের মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছিল তা মূলত মস্তিষ্কজনিত। তারা শরীরে বেঁচে থাকলেও মানসিকভাবে মরে গিয়েছিল। এই মানসিক রোগ কেবল তাদের চিন্তার জগতে বাসা বাধে নি তাদের কুমুরডাঙ্গা গ্রাম ছাড়তেও বাধ্য করেছিল। কিন্তু তবারক ভুঁইয়ার মতো একজন অভিজ্ঞ সারেংয়ের পরিকল্পনা এবং এক ধরনের মনোচিকিৎসায় তারা এই প্রতীকী মহামারী থেকে মুক্তি পায়। ওয়ালিউল্লাহ’র উপন্যাসটি যদিও পোস্ট অ্যাপলেপটিক উপন্যাসের ধারায় পড়ে না; তবু এই আলোচনায় যুক্ত করার কারণ যে কোনো মহামারীর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। সেটি হলো অসচেতনতার ফলে এক থেকে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা। মানুষের বাছবিচারহীন আচরণ, সময় মতো সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা, ধনীদের এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার চেষ্টা, ছোটাছুটি, যার ফলে মহামারী আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

এই আলোচনায় মহামারী নিয়ে রচিত উপন্যাস-সমূহের সাহিত্যিক শৈলী বিশ্লেষণের বিষয়টি প্রাধান্য দেয়া হয় নি। একটি মহামারীর পরে মানব সমাজ ও মনে যে ধরনের পরিবর্তন ঘটে। দেশের সরকার ও সাধারণ মানুষ কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। একই ধরনের ভুলের জন্য কিভাবে এর প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তারই একটি চিত্র এই রচনায় চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে সময়ে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবী করোনা মহামারীর ফলে যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে তা মানবজাতির অভিজ্ঞতার একেবারে বাইরে নয়। অতীত অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ সংকট উত্তরণে সর্বদা সহায়ক। আশা করা যায় বর্তমান সংকটও দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

(1748)

মজিদ মাহমুদ