হোম গদ্য সরল সাম্যের ধ্বনি

সরল সাম্যের ধ্বনি

সরল সাম্যের ধ্বনি
1.36K
0

পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা
দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা

উনিশশো চুরাশি বা পঁচাশি’র কোনো এক শীতের ভোরবেলা। রাস্তা দিয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে এই ক’টি লাইন আউড়াতে আউড়াতে হেঁটে যাচ্ছে এক তরুণ। উদাসীন এবং অন্যমনস্ক। হাতে খোলা বই। খুব কাছ থেকে খেয়াল করলে বোঝা যায়, বইখানার নাম ‘সোনালী কাবিন’ । খুব উদ্ভট আশ্চর্য কোনো বই নয়। হরহামেশাই পাওয়া যায় শহরের বইয়ের দোকানে। ইসলামি ও হিন্দু বিবাহ-আইন সংক্রান্ত বইয়ের র‌্যাকে। ঐ দোকানে দোযখের ওম বইটাও পাওয়া যায়। সেটা থাকে মোকসেদুল মোমেনিন এবং বেহেশতী জেওর বইগুলোর পাশে।

আমরা যারা ভোরবেলায় ফুটবল খেলতে কিংবা সাইকেল চালাতে বের হতাম, তারা সেই উদাসীন অন্যমনস্ক তরুণটিকে এভাবেই চিনতাম। তখন স্কুলপরীক্ষা দিয়ে কলেজে উঠি-উঠি করছি, অল্প অল্প চিন্তাশীল হয়ে উঠছি। কবিতা লেখা শুরু করেছি আরো আগেই, কিন্তু কবিতা জীবনের অংশ হয়ে ওঠে নি। সে সময়ে কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়া এমন একজন ঘোরগ্রস্ত তরুণ আমাদের চিন্তাশীলতা এবং কবিতাশীলতার ম্যাপে গুরুতর ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিল। সে ছিল শহরের মিথগুলোর একটা। তার অনেক ক্যারিশমা ছিল।এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল নিজ আঙুলে ঘুরন্ত অবস্থায় রেখেও চাবিটিকে খুঁজে না পাওয়া, এবং এর ওর কাছে চাবিটির সন্ধান করা!

সোনালী কাবিন-এর কথা উঠলে আমার আল মাহমুদের আগে বরং এই তরুণটির কথা মনে পড়ে। সে ছিল সোনালী কাবিন-এ ‘হাফেজ’। পুরো কবিতাটাই তার মুখস্থ। পরে যখন তার সাথে সখ্য হলো, দেখতাম নানান গলিঘুপচি থেকে সোনালী কাবিন-এর লাইন আউড়ে দিয়ে আমাদের ক্রমাগত চমকে দিচ্ছে সে। প্রেমে পড়ল কার যেন, চিঠি বলতে স্রেফ সোনালী কাবিন। মফস্বলের মেয়েদের যৌনতাসংক্রান্ত টাবু বিষয়ে আমি অবহিত ছিলাম, ফলে পরামর্শক হিসাবে ওকে এই সোনালী কাবিন-ভরা এক্স-রেইটেড চিঠি লেখার ব্যাপারে বারণ করেছিলাম। হেলাল হাফিজের বইখানা এগিয়েও দিয়েছিলাম, নিশ্চিত গ্যারান্টিসহ। কিন্তু তার কাছে সাফল্য পাওয়াটাই মুখ্য ছিল না সম্ভবত। বরং প্রেমের জগতেও যে সে সোনালী কাবিন তথা তার নিজের কাব্যরুচিকে বার্তা আকারে হাজির করতে পেরেছে—এটাই তার কাছে বেশি কাম্য ছিল বোধ করি। ফলে সেই মফস্বলি বালিকার কাছে তার সোনালী কাবিন প্রস্তাবনা নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়ে গেলেও তাকে বিচলিত হতে হয় নি। বরং সে তার প্রত্যাখ্যাত হবার গল্প বলত অবলীলায়, হাসতে হাসতে, আর গল্প শেষ করে পরম গর্বের সাথে আউড়াতো—’পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা…’


সোনালী কাবিন বাংলা কবিতার আধুনিকতা প্রকল্পের একটি সজ্ঞান সমালোচনা।


এভাবেই আশির দশকের ভৈরবে সোনালী কাবিন আমাদের কবিতাশীলতা মাপার প্রধান অস্ত্র হয়ে দাঁড়াল। কবিতা লিখতে এসেছ? তুমি কি সোনালী কাবিন-এ হাফেজ? নেহাত ‘পড়েছি’ বা ‘ভাল লেগেছে’ দিয়ে এই বৈতরণী পার হওয়া যেত না। একমাত্র হাফেজ হতে পারলেই তুমি সত্যিকারের কবি। নয়তো স্রেফ পল্লবগ্রাহক, রবাহূত। বলাবাহুল্য, আমি সেই ছোটবেলার সোনালী কাবিন পরীক্ষায় কোনোদিনই পাশ দিতে পারি নি। চাই নি-ও। ফলে আমার কবিতা ক্যারিয়ার বহুদিন পর্যন্ত চালাক ছেলের পল্লবগ্রাহী কর্মরূপেই বিবেচিত হয়েছে সেখানকার সাহিত্যমহলে। একমাত্র সে-ই ‘জেনুইন’ কবি, কারণ ওর পুরো সোনালী কাবিন মুখস্থ! ফলে, পরে যখন আমাদের সেই কবি কবিতা লেখা ছেড়ে দিল, তখনো সে কবিই থেকে গেল। সোনালী কাবিন-এর কল্যাণেই।

ভাবলে ভুল হবে যে, এটা কেবল একটা মফস্বলের বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বস্তুত ১৯৬৬ সালে প্রকাশের পরপরই সোনালী কাবিন বাংলা কবিতায় এ ধরনের একটি হিস্যা দাবি করতে আরম্ভ করে। বাংলা কবিতার যে চরিত্রটি তিরিশে আর চল্লিশে তৈরি হয়েছে, সোনালী কাবিন সেখানে লক্ষণীয় ব্যতিক্রম। ‘আধুনিক কবিতা’ বলতে আমরা যা বুঝে এবং শিখে এসেছি, সোনালী কাবিন সেই প্রবণতাগুলোকে সচেতনভাবে প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করেছে। সেই অর্থে, সোনালী কাবিন বাংলা কবিতার আধুনিকতা প্রকল্পের একটি সজ্ঞান সমালোচনা। সেটা আল মাহমুদ করেছেন প্রথমত বাংলা কবিতায় ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকা ‘নাগরিক কবিতা’ নামক প্রপঞ্চটিকে চ্যালেঞ্জ করবার মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, সোনালী কাবিন-এর মাধ্যমে আধুনিকতার বিপরীতে একটা পোয়েটিক ইউটোপিয়া সন্ধান করবার মাধ্যমে।

আল মাহমুদের কাব্যিক অভিনবত্ব সম্পর্কে অন্তত দুটো প্রেজুডিস চালু আছে শিক্ষিত কবিতানুরাগীদের মধ্যে। অনেকে এমন মনে করেন যে, আল মাহমুদ যেহেতু তেমন শিক্ষিত ছিলেন না, নাগরিক মেজাজের কবি নন, তিরিশ দশকবাহিত আধুনিকতার মর্ম আয়ত্ত করতে তিনি অপারগ ছিলেন। ফলে যা কিছু নতুনত্ব এসেছে, তা স্বতঃস্ফুর্ত। অনেকটা হিন্দি ‘লগন’ সিনেমার স্পিনারটির মতো, হাত বাঁকা ছিল বলেই বল স্পিন করত যার। অন্য এক দলের মতে, সোনালী কাবিন মার্কসবাদী কবিতা। আল মাহমুদ একদা সমাজতন্ত্রের রাজনীতিতে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তাদের মতে, এই কবিতা সেই কমিটমেন্টেরই প্রকাশ। ফলে এই কবিতার যা কিছু নতুনত্ব, তার লায়ন শেয়ার মার্কসের প্রাপ্য! এসব প্রেজুডিস নিয়ে বিস্তারিত আলাপ হতে পারে। এই লেখায় করতে গেলে কিঞ্চিৎ প্রসঙ্গচ্যুতি ঘটতে পারে, তাই করছি না। এসব প্রেজুডিসের বিরূদ্ধে আমার সোজাসাপ্টা প্রকল্পনা হলো, আল মাহমুদের কমিটমেন্ট একটাই। সেটি সাহিত্যে। রাজনীতি বা ধর্ম বড়জোর কাঁচামাল সেখানে। সে বামপন্থাই হোক, আর ইসলামপন্থাই হোক। এ হলো একটা। আর দ্বিতীয়ত, আমি মনে করি, মনেপ্রাণে সাম্যবাদ চাইছে বলেই কাউকে ‘মার্কসবাদী’ বলে দাগিয়ে দেয়াটা ভুল। আল মাহমুদ সাম্যের মন্ত্রে মুগ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু সাম্যবাদকে একটা ইউটোপিয়ার চেয়ে বেশি নিবিড়ভাবে কবিতায় মোকাবেলা করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে নি। সোনালী কাবিন এক অর্থে ভবিষ্যবাদী কবিতা, সমসাময়িক সমাজ এখানে গরহাজির। ভবিষ্যতের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে শুধু কবির আকাঙ্ক্ষাকেই এই কবিতায় শনাক্ত করা যায়। আর তা গড়ে উঠেছে ভাবাদর্শের আলোকে, সরল সাম্যবাদী প্রণোদনা থেকে। কিন্তু পরবর্তীতে আল মাহমুদ যখন ‘ইসলামি’ হয়ে উঠছেন, তখন তার ‘ইসলামি’ কবিতার পেছনে ধর্মতাত্ত্বিক কিংবা ভাবাদর্শগত প্রণোদনা ছিল যতখানি, সমাজ নিরীক্ষণ ছিল তার চেয়ে বেশি। সেই নিরীক্ষণের ভুলত্রুটি অন্য আলোচনা। কিন্তু এর ফলে সেসব কবিতায় তার ‘আধুনিক’ ব্যক্তিত্ব হাজির থাকতে পেরেছে। সোনালী কাবিন-এ যেটি বিরল ঘটনা। সেখানে বরং পুরাতাত্ত্বিক অতীতের কাঁচামাল দিয়ে ভবিষ্যৎকে বানাতে চেয়েছেন কবি। এই ঐতিহাসিকতার সাথে আবার মিশেছে এমন এক যৌনতা, গোপনীয়তা যার শর্ত নয়। যেমন এখানে:

তারপর তুলতে চাও কামের প্রসঙ্গ যদি নারী
ক্ষেতের আড়ালে এসে নগ্ন করো যৌবন জরদ
শস্যের সপক্ষে থেকে যতটুকু অনুরাগ পারি
তারো বেশি ঢেলে দেবো আন্তরিক রতির দরদ

(সোনালী কাবিন ১০)

ক্ষেতের আড়ালে যেতে নারীকে বলছে কবি বটে, কিন্তু এ বড় সামান্য আড়াল। যেনবা এই আড়ালখানি কেবল ‘শস্যের সপক্ষে’ থাকবার উসিলা! আধুনিক ব্যক্তিমানসের যৌনতা অতটুকু আড়ালে অভ্যস্ত নয়। সে আরো আড়াল চায়। ফলে এটা তার রুচির ওপর সচেতন আঘাত। উপর্যুপরি আঘাত বলতে হয়। কারণ, প্রথমে ব্যক্তিবাদী সমাজব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে সোনালী কাবিন মুক্তি খুঁজেছে প্রাগাধুনিক এবং সাম্যবাদী কৌমব্যবস্থায়। তারপরে, এই কৌমব্যবস্থার পত্তনের সাথে জড়িয়ে দেয়া হলো এমন এক খোলামেলা যৌনতাকে, যাকে আধুনিক কাব্যমানসে হজম করা মুশকিল। ফলে, আদিম সাম্যবাদ ও অগোপন যৌনতার বয়ান মিলিয়ে সোনালী কাবিন আমাদের সামনে যে কাব্যিক প্রপঞ্চ হাজির করে, তা তিরিশবাহিত আধুনিকতার পটভূমিতে কান লাল করে শুনবার মতোই।


আধুনিক কবিতার কেন্দ্রীয় প্রবণতা হচ্ছে তার অন্তর্নিহিত ব্যক্তিস্বর, যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যটি বিকশিত হয়েছে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়, তার অর্ন্তনিহিত শর্তগুলোকে মেনে।


নানা কারণে আধুনিক-প্রাগাধুনিক-উত্তরাধুনিক তর্কটা বাংলাদেশের সাহিত্যে এক বিশেষ বাগাড়ম্বরে গিয়ে ঠেকে। অনেকের এমন ধারণা যে, আধুনিক মানেই উত্তীর্ণ, অনাধুনিক বা প্রাগাধুনিক মানেই মূর্খ বা পিছিয়ে পড়া, এবং উত্তরাধুনিক মানেই পোঁদ-পাকা। ফলে আমরা গোটা আলোচনাকেই এ ধরনের ভ্যালু জাজমেন্টে রিডিউস করে ফেলি। যাই হোক, কিঞ্চিৎ সরলীকরণের ঝুঁকি নিয়ে যদি ‘আধুনিক’ কবিতার একটা লক্ষণতালিকা বানাই, সেটা কেমন হতে পারে? সেখানে ব্যক্তির উত্থান থাকবে, রাষ্ট্রকাঠামোর কেন্দ্রীয় ভূমিকা থাকবে চিন্তাপদ্ধতির মধ্যে, ফলত ইতিহাসচেতনা থাকবে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা থাকবে, সীমিত গর্জন থাকবে, সেক্যুলারিজম থাকবে, বিজ্ঞানচেতনা থাকবে, প্রকৃতিপ্রেম থাকবে, মানবীয় প্রেমও থাকবে অপরাপর শর্তের অধীন হয়ে, প্রাইভেট এবং বিষমকামী যৌনতা থাকবে। এসবের সাথে সংশ্লিষ্ট আরো নানা বিষয় থাকতে পারে আধুনিক কবিতায়। আঙ্গিক বিচারে, গদ্য কিংবা অক্ষরবৃত্তকে আধুনিক কবিতার নির্ণায়ক ছন্দ বলে ভাবা যায়, যদিও মাত্রাবৃত্ত কিংবা স্বরবৃত্তে হরহামেশাই আধুনিক কবিতা লেখা হয়েছে। বলা ভালো, এগুলো অবিমিশ্র কোনো দশা নয়। একই কবিতায় আধুনিক এবং প্রাগাধুনিক দশা মিলমিশ হয়ে থাকতে পারে। এমনকি পাঁড় আধুনিক কবির পক্ষেও খানিকটা উত্তরাধুনিক হয়ে ওঠা সম্ভব। ফলে, যখন আমরা কাউকে আধুনিক বা উত্তরাধুনিক বলছি, তখন সেটা বলছি তাঁর কেন্দ্রীয় প্রবণতাটিকে শনাক্ত করবার জায়গা থেকে। সেই বিচারে, আধুনিক কবিতার কেন্দ্রীয় প্রবণতা হচ্ছে তার অন্তর্নিহিত ব্যক্তিস্বর, যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যটি বিকশিত হয়েছে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়, তার অর্ন্তনিহিত শর্তগুলোকে মেনে। সেইসাথে টি এস এলিয়ট-বাহিত কাব্যিক প্রকরণগুলো তো আছেই।
মোটা দাগে, উত্তরাধুনিক কবিতা মূলত আধুনিকতার শর্তগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। তবে বিষয়টা অত সরলও না। কবিতায় পুঁজিবাদ কিংবা বিশ্বায়নের প্রতিবাদ থাকলেই তাকে উত্তরাধুনিক বলে দাগানো যায় না। প্রতিবাদের যে ভাষা, বা যুক্তিপদ্ধতি, সে কি আধুনিকতা প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠছে? ফলে, পদ্ধতির প্রশ্ন আসে, আঙ্গিকের প্রশ্নও আসে। আধুনিক কবিতা যেসব আঙ্গিককে ধ্রুব গণ্য করে বিকশিত হয়েছে, তাকেও ক্রিটিক করা উত্তরাধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য। যেমন, কবিতার ন্যারেশন। আধুনিক কবিতার একটা নিজস্ব ন্যারেশন স্টাইল আছে, যা প্রাগাধুনিক কবিতায় যেমন পাওয়া যাবে না, তেমনি উত্তরাধুনিক কবিতায়ও অনুসৃত হবে না।

এই আধুনিক-উত্তরাধুনিক নিয়ে বাগাড়ম্বর করবার হেতু একটা আছে এখানে। ঐ যে বললাম, সোনালী কাবিন তিরিশবাহিত আধুনিক কবিতা বিষয়ক ধারণার একটি সজ্ঞান সমালোচনা। কোন কোন লক্ষণ বিচারে বললাম? প্রথমত, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জয়রথ এই কবিতায় ছোটে নাই। এই কবিতার ন্যারেটর কোনো আধুনিক ব্যক্তিমানুষ নয়, ব্যক্তি হলেও সে ‘কৌম সমাজের লোক’। তার কোনো গোপনীয়তা নাই, আলাদা জানলা নাই, পূর্বপুরুষদের ছায়ার মধ্যে বেড়ে উঠেছে সে। বরং সে তার নজর বাঁকা করেই দেখছে, যখন এই যৌথতার মধ্যে ‘অস্তিবাদী জিরাফেরা বাড়িয়েছে ব্যক্তিগত গলা’।

দ্বিতীয়ত, বিস্ময়করভাবে, সোনালী কাবিন প্রায় উপমাশূন্য কবিতা। একটাই উপমা আছে পুরো কবিতায় ‘গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল কবুল’। আরেকটা উপমা শনাক্ত করা যায়, তবে তাকে টেনে এত লম্বা করা হয়েছে যে, এর উপমাসন্দেশ কবিতার মূল ন্যারেটিভে আত্তীকৃত হয়ে গিয়েছে : ‘রাতের নদীতে ভাসা পানিউড়ী পাখির ছতরে/ শিষ্ট ঢেউয়ের পাল যে কিসিমে ভাঙে ছল ছল/ আমার চুম্বনরাশি ক্রমাগত তোমার গতরে/ ঢেলে দেবো চিরদিন মুক্ত করে লজ্জার আগল’। কী কারণ থাকতে পারে এই উপমাশূন্যতার, যখন আল মাহমুদ অন্যত্র যথেষ্ট উপমাপ্রয়াসী কবি? আমার বিচারে, উপমাশূন্যতা মূলত আল মাহমুদের আধুনিক কবিতার সমালোচনা প্রকল্পেরই অংশ। উপমা আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য, কারণ তা ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গিকে কবিতায় রেজিস্টার করে।


অচিন্ত্য আর ফররুখ বেশি রোমান্টিক আর কম কুশলী ছিলেন, ভাবাদর্শের প্রতি তাদের কমিটমেন্টও ছিল আল মাহমুদের চেয়ে বেশি।


এভাবেই সোনালী কাবিন তিরিশি আধুনিকতার বিপুল হেজেমনির সাথে সামান্য বেয়াদবি করতে চেয়েছে। আল মাহমুদের আগে এই লাইনে খুব বেশি প্রচেষ্টা চোখে পড়ে নি। চল্লিশে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত আর ফররুখ আহমদ ছিলেন। তাদের কবিতার বিশেষত্ব নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা হয়েছে নানা জায়গায়। তাদের উভয়ের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, তাদের ধর্মতত্ত্ব তাদের কাব্যতত্ত্বকে দিশা দিয়েছে। আল মাহমুদের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটেছে। অচিন্ত্য আর ফররুখ বেশি রোমান্টিক আর কম কুশলী ছিলেন, ভাবাদর্শের প্রতি তাদের কমিটমেন্টও ছিল আল মাহমুদের চেয়ে বেশি। ফলে তারা এর বলয় থেকে বেরিয়ে আসেন নি। তুলনায়, সোনালী কাবিন আল মাহমুদের একটা নিরীক্ষামাত্র। এর আগে ও পরে তিনি অন্যরকম। ভঙ্গিতে একটু বেয়াড়া হলেও সোনালী কাবিন-এর বাইরে তিনি আধুনিক কবিই। এমনকি যখন ‘ইসলামি’, তখনও। এখানেই কবি হিসেবে তার চাতুর্য ও কৃতিত্ব।

সোনালী কাবিন-এ যে বাঁকবদলের নিশানা ছিল, তা থেকে পরবর্তী বাংলা কবিতা তেমন কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে নি। এই কবিতা শেষমেষ একটা ইউটোপিয়াই হয়ে রয়েছে, আর আল মাহমুদের উত্তরসূরিরা শাসিত হয়েছেন আধুনিকতা আর নাগরিকতার কাছে। এর সম্ভবত একটা ঐতিহাসিক কারণ আছে। সেটা শুধু মতাদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্রের পতন বা পতন-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতাই নয়। সোনালী কাবিন-এর আগে ও পরে আল মাহমুদ বাংলা কবিতায় বিস্তর প্রভাব রাখলেও এই কবিতা আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে নি। এর প্রকরণগত অর্জন আর বিষয়গত নির্দেশনার মধ্যে একটা বৈপরীত্যও থেকে গেছে। যে সরল সাম্যবাদ আর খোলামেলা যৌনতা এই কবিতার উপজীব্য, তা যেন পয়ারের এবং সনেটের আঁটোসাটো বাঁধনে হাঁসফাঁস করে। ফলে ঘরের জিনিস দিয়ে বানানো সোনালী কাবিন-কে দূরের মন্দির বলে ভ্রম হয়। তবে এই দূরত্বের বোধটুকুর জন্য আল মাহমুদ নিশ্চয়ই দায়ী নন, বরং আমরা সেটা অর্জন করেছি আমাদের লাগামহীন নগরায়ন আর আধুনিকায়নের প্রবণতা থেকে। এতে করে কবিতার কাছে আমাদের চাওয়ার ধরনটিও অনেকখানি বদলে গিয়েছে। আল মাহমুদ প্রভাববিস্তারী কবি হতে চেয়েছেন বলেই তিনি পরবর্তীতে এই ইউটোপিয়া থেকে বের হয়ে গেছেন। নয়তো আমরা তাকে ফররুখ আহমদের মতই স্মরণ করতাম হয়তো। শিল্পে ইউটোপিয়া প্রশংসনীয় জিনিসই, যদি তাকে সমসাময়িক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে শনাক্ত করা যায়। তা করতে না পারলে ঐ শিল্প সৌখিন প্রত্নবস্তু মাত্র। বিশেষ করে এই আধুনিক ও আধুনিকোত্তর যুগে।

বলাবাহুল্য, আমাদের সেই বন্ধুটি আল মাহমুদের তুলনায় কম কুশলী এবং অধিক রোমান্টিক ছিল। সরল সাম্যের যে ধ্বনি সোনালী কাবিন-এ শুনেছিল সে, তাকেই জীবনের আরাধ্য মেনে নিয়েছিল। ফলে, পরবর্তীতে, এই একই আল মাহমুদের হাতে অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না খেয়ে তার পেটের পীড়া হয়েছে। আল মাহমুদকে বিস্তর গালাগাল করতে শুনেছি ওকে। আল মাহমুদের রাজনৈতিক ‘পাল্টিবাজি’ তার মতো অনেক শিক্ষিত ও সেক্যুলার মানুষের পীড়ার উপলক্ষ হয়ে থেকেছে। কিন্তু পাল্টিবাজি বলে আমরা যাকে শনাক্ত করছি, তা যে আল মাহমুদের সার্বিক কাব্যকৌশলের অংশও হতে পারে—একথা ভাবতে প্রস্তুত ছিল না কেউই। আমাদের বন্ধুটিও। তার কাছে সোনালী কাবিন-ই ছিল কবিতার শেষ কথা। এরকম পাঠক নিশ্চয়ই আরো কেউ কেউ থাকবেন, যারা সোনালী কাবিন-এর ঘোরলাগা বর্ষণের মাঝে আজো উবু হয়ে পড়ে আছেন। ফলত, সোনালী কাবিন কবিতার ঐ সরল সাম্যের ধ্বনির মধ্যেই তাদের কাব্যতৃষ্ণার সমাধি রচিত হয়ে গেছে।


বণিকবার্তার সিল্করুট সাময়িকীতে মুদ্রিত

সুমন রহমান

অধ্যাপক at University of Liberal Arts Bangladesh
জন্ম ৩০ মার্চ ১৯৭০, ভৈরব। দর্শনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পিএইচডি সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন-এ।

প্রকাশিত বই :
ঝিঁঝিট (কাব্য), ১৯৯৪, নিউম্যান বুকস
সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়া (কাব্য), ২০০৮, পাঠসূত্র
গরিবি অমরতা (গল্প), ২০০৮, মাওলা ব্রাদার্স
কানার হাটবাজার (প্রবন্ধ), ২০১১, দুয়েন্দে
নিরপরাধ ঘুম (গল্প), ২০১৮, প্রথমা

ই-মেইল : sumon.rahman@ulab.edu.bd