হোম গদ্য শিল্পীর দায়

শিল্পীর দায়

শিল্পীর দায়
157
0

আমি বুঝতে পারি আমি কেন সবসময় নীরব থাকতে পারি না। কিন্তু নীরব না থাকার কারণে আমি নিজেকে দোষীও মনে করি না, বরং আমার তৃপ্তি হয় এই ভেবে যে, আমি একা নই, আরো অনেকে আছেন যারা অন্যায্যতার বিরুদ্ধে সরব। যখন সকল ভয়ভীতি মানুষকে আঁকড়ে ধরে তখন তার একমাত্র কাজ ভয়কে তাড়ানো। ভয়মুক্ত থাকা। কিন্তু সময় এমনও হয়, সাময়িক হলেও, সরবতার ফলাফল খুব ভালো হয় না। ইতিহাস সাক্ষ্য, শাসকের নির্মমতার শিকার হতে হয়েছে বাঙালিদের বারবার। জীবনে নেমে আসে অনেক গ্লানি, অনেক হয়রানি পোহাতে হয়, এমনকি প্রাণনাশের সম্ভাবনাকেও নাকচ করে দেয়া যায় না। এমন নজির বহু আছে আমাদের সমাজেই। তাই মুক্তির আন্দোলন করতে হয়েছে আমাদের বারবার।


গণতন্ত্রকামী সরকারও ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে।


অনাচার, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষায় মহান মুক্তিযুদ্ধে সুনিশ্চিত মৃত্যু জেনেও দেশের জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছে অকাতরে। তারা বীর সেনানী। দুনিয়ার দেশে দেশে মুক্তিকামী মানুষ আছে এখনো। লক্ষ্য, সাম্য ও ন্যায্যতার সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

এ কারণেই অনেক সময় শাসকগোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড ও নীতিমালাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে মানুষ। সরকারের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেছে। সরকার বিরোধিতা রাষ্ট্রদোহিতা নয়। কর্মকাণ্ড ও নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় সুবিবেচনার জায়গা থেকে, সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবার জন্য, বা শাসকগোষ্ঠীর কর্মসূচি ও রীতিনীতিকে সঠিক পথে আনবার জন্য, যাতে সরকার জনগণের পক্ষে কাজ করে। কারণ অনেক সময় দেখা গেছে, দুনিয়ার গণতন্ত্রকামী সরকারও ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে। তখন জাগতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। সম্মিলিত কল্যাণের জন্য।

সাধারণত বিরোধী দলের কাজ হয় শ্যাডো মিনিস্ট্রি গঠন করে সরকারের সমালোচনা করা। এটা পজেটিভ অর্থেই। কিন্তু দেশে যখন কোনো বিরোধী দল নাই, এমনকি বিরুদ্ধ মত, মতামত ও সমালোচনা করা রিস্ক ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়, ভয় এসে জড়িয়ে ধরে তখনই মোক্ষম সময় সচেতন নাগরিককে তার গলার আওয়াজকে আরও স্পষ্ট করে তোলা। কারণ, মানবাধিকার সমুন্নত রেখে মানবিক মর্যাদা, ন্যায্য ও সাম্যের রাষ্ট্র গঠনে সম্মিলিত আওয়াজ সহায়ক শক্তি হিসেবে মানুষের পক্ষে সফলতা আনে।

আমাদের সমাজের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহু মত ও পথের। বহু জাতপাতের। এ সমাজ বহুত্ববাদী সমাজ, মানবিক সমাজ। মানুষে মানুষে ঐক্যের সমাজ। এটা আমাদের ঐতিহ্য। হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান, আদিবাসী, বাঙালি পাহাড়ি যেমন আছে তেমনি রয়েছে নানা ধর্মের মানুষ, নানা মতের মানুষ, নানা রাজনীতির ছায়াতলের মানুষ। দেশের নাগরিক হিসেবে পরস্পরের প্রতি রয়েছে দায়বোধ, দায়িত্ববোধ। শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত ঐক্য ও প্রচেষ্টা জরুরি। কিন্তু, এ-ও ঠিক যে, সমাজে দুষ্টু লোকের অভাব নেই, মন্দ মানুষের অভাব নেই। ধর্মের নামে রাজনীতির নামে তারা নিজেদের মতপথ সাধারণের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়, কখনো নৈরাজ্য তৈরি করে। সেসব সরকার প্রচলিত আইনে কঠোরভাবে দমন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা কখনোই ত্রাস সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নয়, ক্ষুদ্র স্বার্থে নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় নয়। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিচ্ছে আমাদের প্রজন্ম। তাদের মধ্যেই কেউ হবে আগামীদিনের রাষ্ট্রনায়ক, তারাই পরিচালনা করবে দেশ। ফলে ত্রাসের মাধ্যমে ভয়ভীতির সংস্কৃতি জারি রাখা সরকারের সুবিবেচনা হতে পারে না। বরং যারা নির্ভীক তাদের কথা শোনা কাজের হতে পারে। সংবিধান সেই অধিকার নাগরিকদের দিয়েছে।


রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে মানুষ খুন হচ্ছে প্রতিদিন।


শাসকগোষ্ঠীর উচিত হবে সেইসব ভয়হীন মানুষের কণ্ঠ শোনা যারা সরকার ও রাষ্ট্রকে জনগণের পক্ষে কথা বলা ও কাজ করবার তাগাদা দেয়। সরকারের সমালোচনা করে। কারণ সেটা দেশের জনগণের মঙ্গলের জন্য।

বর্তমানে দেশে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। এই অভিযানের প্রতি আমার সমর্থন আছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে মানুষ খুন হচ্ছে প্রতিদিন। এটা বিদ্যমান আইন ও বিচারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশের সামিল। দেশের সংবিধানের প্রতি, বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে কোনো অবস্থাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নির্বিচার খুন হতে পারে না। এটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। এই ত্রাস বন্ধ করা জরুরি। রাষ্ট্রকে মানবিক হতে হবে। আর যারা রাজনীতি করেন, লেখালেখি করেন, সাংবাদিকতা করেন তাদের সংবেদনশীল হওয়ার কথা, সহনশীল হওয়ার কথা, সৃজনশীল হওয়ার কথা, মানবিক হওয়ার কথা। সাধারণ মানুষ এইটা আশা করে।

আমরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করতে পারি না। আমি এই রাষ্ট্রের নাগরিক, এবং একজন লেখক হিসেবে, শিল্পী হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতি আমার দায় ও কর্তব্য আছে। রাষ্ট্রেরও রয়েছে তার নাগরিকের প্রতি কর্তব্য। কিন্তু নাগরিক ও সরকার, এমনকি রাষ্ট্র, প্রত্যেকে আমরা ভুলে যাই সেই দায়িত্বের কথা। তখন সমাজ হয়ে পড়ে আস্থাহীন, বিভক্ত। বিবাদ এসে হানা দেয়। আমরা চাই সমষ্টির সমাজ।

কখনো কখনো যদি সমাজে অন্ধত্ব নেমে আসে, যদি প্রত্যেকে আমরা বোবা-কালা-বধির হয়ে যাই, তখনো শ্বাস-প্রশ্বাস জারি থাকলে মুক্তির গান গয়ে উঠবেই ভোরের পাখি।

আমরা সেই অমরপাখির গান শুনতে চাই।

আহমেদ স্বপন মাহমুদ

জন্ম ২১ মাঘ ১৩৭২, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬; নেত্রকোনা। বিএ (অনার্স), এমএ। পেশা: গবেষণা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
অতিক্রমণের রেখা [শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০০০]
সকল বিকেল আমাদের অধিকারে আছে [জয়ামি, ২০০৪]
অবিচল ডানার উত্থান [জয়ামি, ২০০৬]
আদিপৃথিবীর গান [পাঠসূত্র, ২০০৭]
আগুন ও সমুদ্রের দিকে [পাঠসূত্র, ২০০৯]
আনন্দবাড়ি অথবা রাতের কঙ্কাল [অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ২০১০]
প্রেম, মৃত্যু ও সর্বনাম [প্রকৃতি, ২০১৪]
অতিক্রমণের রেখা (নির্বাচিত কবিতা) [লোক, ২০১১]
ভূখণ্ডে কেঁপে ওঠে মৃত ঘোড়ার কেশর [শুদ্ধস্বর, ২০১৩]
রাজার পোশাক [শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০১৪]
অনেক উঁচুতে পানশালা [চৈতন্য, ২০১৪]
দাহকাব্য [শমপ্রকাশ, ২০১৫]
শ্রীমতি প্রজাপতি রায় [তিউড়ি প্রকাশন, ২০১৭]
এখান থেকে আকাশ দেখা যায় [তিউড়ি প্রকাশন, ২০১৮]

প্রবন্ধ—
সমূহ সংকেতের ভাষা [শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০০১]
কলমতালাশ : কবিতার ভাব ও বৈভব [শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০১৪]
কবিতার নতুন জগৎ [ঐতিহ্য, ২০১৭]
Facing the Challenges of Corporate Globalization: Role of Media, Information and Communication Technology [2002]
কর্পোরেট বিশ্বায়ন: তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক উন্নয়ন [২০০২]
স্বাধীন সাংবাদিকতা: গণমাধ্যম ও সুশাসন [২০০৬]
ঋণসাহায্যের শর্ত ও রাজনীতি [২০০৭]
Monga: the art of politics of dying [2008]
কর্পোরেট বিশ্বায়ন ও কৃষির রাজনীতি [২০০৯]

ভ্রমণ—
নিরবধিকাল

ই-মেইল : ahmed.swapan@gmail.com

Latest posts by আহমেদ স্বপন মাহমুদ (see all)