হোম গদ্য শিখরে, সুউচ্চ স্থানে

শিখরে, সুউচ্চ স্থানে

শিখরে, সুউচ্চ স্থানে
3.69K
0

ইহুদিরা

অনিষ্টকর অন্ধকারে যখন পৃথিবী
আচ্ছন্ন হয়ে যায়। চারদিকে ডাইনীদের
ফুৎকারের মতাে হাওয়ার ফিসফাস,
আর পাখিরা গুপ্ত সাপের আতঙ্কে
আশ্রয় ছেড়ে অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়
ঠিক তখুনি, ইহুদিরা হেসে ওঠে।

ভাবাে, নদীতে পানি নেই। পাপপ্রক্ষালণকারী
পয়গম্বরের কাটা মাথা থেকে রক্ত ঝরছে।
তখন কারা কায়সারের মুদ্রা চালু করতে চায়?

পর্বতের আলাে ভূমি স্পর্শ করার আগেই
এরা পশুর মূর্তির কাছে মানুষের মাথা
ঝুঁকিয়ে দিয়েছে। আহা
কোন্ বালুবেলায় হারিয়ে এসেছো
খেয়াঘাটের দশটি কড়ি?

ফারান পর্বত থেকে আলাে আসছে।
আল্লার অশ্বের সােয়ারী পার হয়ে যাচ্ছেন
সমস্ত রহস্যের দরােজা। তার হাতেই
শেষতম বাণী। পৃথিবীর আগের
পৃথিবীর পরের। আর পৃথিবীতে
বসবাস করার।

ইহুদিরা হাসুক,
তবু সম্পদের সুষম বন্টন অনিবার্য।
ইহুদিরা নাচুক, তবু
ধনতন্ত্রের পতন আসন্ন। আর

মানুষ মানুষের ভাই।

গত শতাব্দীর ৮০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে আল মাহমুদের এই কবিতাটি পড়ে আমি প্রথমে স্তম্ভিত, পরে ঘোর সংশয়ে পড়ে যাই। কবির অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না কাব্যগ্রন্থটির এই কবিতাটি আমার বিশ্বাসকে দুলিয়ে দেয়, মনে প্রশ্ন জাগায়। কবিতাপাঠক হিসেবে, কবিতাপ্রয়াসী হিসেবে আমি মনে করি ব্যক্তি- বা জাতি-বিদ্বেষে, কোনো অসুয়াপ্রসূত উদ্দেশে কবিতা রচনা সম্ভব নয়। রচিত হলেও তা কবিতা-পদবাচ্য হতে পারে না। আমার এ বিশ্বাস দুলে যায় আল মাহমুদের এই কবিতাটি পড়ে। ইহুদিজাতির প্রতি এই বিদ্বেষপ্রসূত রচনাটি কিভাবে কবিতা হয়ে উঠল, আমি বিস্ময়াবিষ্ট হই, তদুপরি সংশয়ে দুলতে থাকি।

আজ যখন গাজায় যুদ্ধে সুসজ্জিত, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইজরায়েলি সেনারা জঙ্গিনিধনের নামে ১৯০০ প্যালেস্তিনিকে হত্যা করছে; যাদের অধিকাংশ, বস্তুত ৯৫ শতাংশ নিরীহ মানুষ, তাদের অনেকেই, শিশু, নারী, বৃদ্ধ; অপরদিকে বিশৃঙ্খল জড়াে হওয়া গেরিলা দল হামাসবাহিনী রকেট ছুড়ে, সুড়ঙ্গহানায় যে ৬৭ জনকে খুন করেছে তার ৬৪ জনই ইজরায়েল সেনা, ৩ জন অসামরিক—সেই অসম যুদ্ধের ২৬তম রাতটিতে এই লেখা লিখতে লিখতে আল মাহমুদের এই ‘ইহুদিরা’ কবিতাটি আবার পড়লাম। গাজায় এই গণহত্যাকালীন সময়ে আল মাহমুদের এই কবিতাটি সুড়ঙ্গপথের আলােছায়ায় ওঁত পেতে থাকা এক হামাস গেরিলা যােদ্ধার মতােই অপরূপ। এই কবিতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বিপুল ক্ষমতার বিরাট বড় কবি বলেই আল মাহমুদ এটা সম্ভব করতে পেরেছেন। ৩০ বছর আগে এই কবিতাটি পাঠে আমি সংশয়াচ্ছন্ন হয়েছিলাম। আমার বিশ্বাস দুলে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু আমার বিশ্বাসের বদল হয় নি।


আমি গহিন বাংলার তুচ্ছাতিতুচ্ছ কবি আল মাহমুদ, আর কবিদের কবি মহান শেক্সপিয়ার সাহেব, শাইলককে দুষেছেন কী ভাষায়, কী বলেছেন ইহুদিদের!


ঐ সময়ই ঐ মধ্য ৮০-র দশকে আল মাহমুদ, শামসুর রাহমানকে আমি দেখি। কলকাতায় আবৃত্তিলােকের কবিতা-উৎসবে ওঁরা দল বেঁধে এসেছিলেন বাংলাদেশ থেকে। এর পর ১৯৮৬ সালে আমি প্রথমবার বাংলাদেশে যাই। যাওয়ার কয়েকদিন আগে ফৌজি প্রেসিডেন্ট এরশাদ দেশে সামরিক শাসন জারি করেছেন। লেখক-কবি-বুদ্ধিজীবীরা তলে তলে স্বৈরতন্ত্রবিরােধী আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ আমাকে আল মাহমুদের কাছে যাওয়ার সময় সঙ্গ দিতে চাইলেন না। শুনলাম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাব্যগ্রন্থ নিয়ে সংবাদপত্রে সবিস্তারে আলােচনা লিখেছেন আল মাহমুদ। বিপুল প্রশংসা করেছেন কবি এরশাদের। রিকশা চেপে আমি একাই চলে গেলাম শিল্পকলা একাডেমির ভবনটিতে। আল মাহমুদ তখন শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক। দুঘণ্টা কথা হলো তার সঙ্গে। সে সময় কবি-লেখকরা কেউ যান না তার কাছে। অকপটে অনেকের নামে অনুযােগ করলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কথা খুব বললেন, বিনয় মজুমদারের খোঁজখবর নিলেন। আমি তাকে শুনিয়ে বললাম ‘ইহুদিরা’ কবিতাটির বিষয়ে। আমার বিশ্বাসের কথা বললাম। প্রশ্ন করলাম, ‘…কিন্তু মাহমুদ ভাই, ইহুদি শিশুদের হাসি, তাও কি বিষাক্ত, সাপের নিশ্বাস শব্দের মতাে?’ মাহমুদ ভাই বললেন, ‘আমাকে দুষ দিচ্ছ মৃদুল, আমি গহিন বাংলার তুচ্ছাতিতুচ্ছ কবি আল মাহমুদ, আর কবিদের কবি মহান শেক্সপিয়ার সাহেব, শাইলককে দুষেছেন কী ভাষায়, কী বলেছেন ইহুদিদের!’ এরপর আমি জিগ্যেস করলাম, ‘প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেবকে প্রতিভাবান কবি বললেন কী করে?’ হেসে ফেললেন মাহমুদ ভাই। তারপর বললেন, ‘মুদুল, তােমরা সত্তরের কবি, আমি পঞ্চাশের, কলকাতায় গিয়ে তােমাদের প্রশংসা কি করি নাই? সর্বদা তা করা উচিত। বয়সে বড় যারা, তারা নতুন কবিদের প্রশংসা করবেন, তুমি সত্তরের কবি, আর এরশাদ সবে কবিতা লিখছেন, ‘৮০র দশকে, তিনি আশির দশকের কবি। তােমারও তো উচিত এরশাদ সাহেবের কবিতাকে একটু তারিফ জানানো, যাতে তিনি ভালাে ল্যাখতে পারেন।’

উপভােগ করলাম মাহমুদ ভাইয়ের এই সারল্যে ভরা চাতুর্যকে। কবি সে চতুর হবেই। সে আত্মযুক্তি তৈরি করবে। টনটনে রাখবে আপন বিবেকটিকে। সংস্কৃত সাহিত্যে কবির এসব ধর্মের কথা বলা হয়েছে।

আল মাহমুদের একটি প্রবন্ধ-নিবন্ধের বই আছে। ২০০০ সালে ঢাকার ‘অনন্যা’ প্রকাশন সংস্থা থেকে প্রকাশিত ‘কবির আত্মবিশ্বাস’ নামের এই বইটিতে গ্রন্থনামেই লেখা প্রথম প্রবন্ধটিতে আল মাহমুদ ওই ‘ইহুদিরা’ শীর্ষক নিজ কবিতাটির প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘প্রফেসর শিবনারায়ণ রায় আমার “ইহুদিরা” কবিতাটিকে একটি “সাংঘাতিক কবিতা” নামে আখ্যায়িত করেছেন এবং এজরা পাউন্ড যে ইহুদিদের বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছেন, এর ইঙ্গিত দিতে ছাড়েন নি।… কিন্তু শ্রীরায় আমাকে পাউন্ডের একজন অনুকারী ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে বর্ণনা না করে বরং আমাদের উভয়ের মানসিকতার মধ্যে একটা কাকতালীয় যােগসূত্র আন্দাজ করে প্রকারান্তরে ফ্যাসিজমের ইঙ্গিত দিয়েছেন।…আমার হাত দিয়ে ইহুদিদের বিরুদ্ধে যে সাংঘাতিক কবিতা বেরিয়েছে তা তার বিচারে প্রচণ্ডভাবে মানবতাবিরােধী।’ এর পর মাহমুদ ভাই ফের সেই শেক্সপিয়ারের কথা তুলে লিখেছেন, ‘অথচ একথা প্রফেসার রায়ের অজানা নয়, ইউরােপে ফ্যাসিজমের তথা হিটলারের জন্মের কয়েকশাে বছর আগে থেকেই শেক্সপীয়ার ইহুদিদের অনিষ্টকারিতার যে বর্ণনা তাঁর নাটকে উত্থাপন করেছেন তা প্রকৃতপক্ষে শাইলকের জাতির বিরুদ্ধে নয় বরং তাদের টাকা খাটিয়ে সুদ আদায় করার পদ্ধতির বিরুদ্ধেই।’ এই প্রবন্ধেই আল মাহমুদ লিখেছেন, ‘বিংশ শতাব্দীর মধ্যযুগে কেন হিটলার তার ‘থার্ডরাইখ’ অর্থাৎ জার্মানি তথা সমগ্র ইউরোপ থেকে ইহুদি শব্দটিকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন তা আজ ভেবে দেখতে দােষ কি? এ কি শুধু সেমেটিক জাতিবিদ্বেষ? না এর পিছনে অন্য কোনাে রহস্য আছে? এজরা পাউন্ড কি কোনাে সত্যদ্রষ্টা কবি? নাকি ইহুদি জাতির প্রতি বিদ্বিষ্ট মানসিক রােগী ছিলেন, তা আজ আবার তলিয়ে দেখতে আপত্তি কোথায়?’

কবিতাপ্রয়াসী হিসেবে, কবিতার পাঠক হিসেবে নিজের যে বিশ্বাসের কথা গােড়ায় বলেছি, যে বিশ্বাস সুদৃঢ় ও অটলভাবেই আমার ভিতরে রয়েছে। আল মাহমুদের ‘ইহুদিরা’ কবিতাটি তিরিশ বছর আগের পাঠে আমার মনে নানা প্রশ্ন জাগিয়েছিল। আল মাহমুদের এই রচনাটি মানবতাবিরােধী। এই কবিতাটির শেষ পঙ্‌ক্তি ‘মানুষ মানুষের ভাই’ যুগে যুগে কবিদের চিরন্তন উচ্চারণ। প্রশ্ন এটাই, ইহুদিরা কি মানুষ নয়? তথাপি আল মাহমুদের এই রচনাটি কিভাবে কবিতায় উত্তীর্ণ হলো, কিভাবে তা হয়ে উঠল সবুজ মখমলে। সােনার সুতােয় বােনা নকশায় ঝলমলে? কবির কোন শক্তিতে?

শুধু এই ‘ইহুদিরা’ কবিতাটিতেই নয়। আল মাহমুদ তাঁর সারা জীবনের কাব্যসাধনায়, জীবনযাপনের বিবিধ পদক্ষেপে বিতর্ক তুলেছেন। ঘটনাচক্রে ওই ১৯৮৬ সালে প্রথমবার ঢাকা যাওয়ার পর এই ২৮ বছরে বেশ কয়েকবার আমি বাংলাদেশ গিয়েছি। বেশিরভাগই সাংবাদিকতার কাজে। প্রতিবারই মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখাও করেছি। প্রথমবার সেই ১৯৮৬-তে এরশাদ সাহেবের সামারিকতন্ত্রের ভিতর মাটির নিচে তখন গুম গুম করছিল স্বৈরতন্ত্রবিরােধী আন্দোলনের ভ্রূণ। আল মাহমুদ সেসময় অভিযুক্ত ছিলেন এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে। আমার বন্ধুরা শিল্পকলা একাডেমিতে আল মাহমুদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় সঙ্গ দিতে চান নি।


মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। মুক্তিযােদ্ধাদের সঙ্গে ওই সময় কিছুকাল কলকাতায় ছিলেন, সেখান থেকে ফের রণাঙ্গনে।


ঢাকার নামী প্রকাশকরা সে সময় গণতান্ত্রিক শিবিরে। তারা আল মাহমুদের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করছেন না। প্রেসিডেন্ট এরশাদ তখন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘােষণা করে ইসলামি শক্তিকে বাগে আনতে সচেষ্ট। ইসলামি বইপত্র প্রকাশ করে এমন কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা ছাপতে শুরু করে আল মাহমুদের কবিতার বই। কলকাতা বইমেলায় সেসময় বাংলাদেশ প্যাভেলিয়নে ঢাকার নামী প্রকাশনা সংস্থাগুলিতে আল মাহমুদের বই খুঁজতে গিয়ে দেখেছি, আঙুল তুলে তারা ইসলামি প্রকাশনের খুপরিটি দেখিয়ে দিয়েছেন। ঐ সময় এরশাদ একবার শিলাইদহে রবীন্দ্রজয়ন্তীর আয়ােজন করেন। উভয় বাংলার কবি-লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে কলকাতা থেকে শান্তিদেব ঘােষ, সুবিনয় রায়, অমিতাভ চৌধুরী গিয়েছিলেন। শামসুর রাহমান এরশাদের আমন্ত্রণের সাঁড়াশি এড়াতে আগেভাগে আমেরিকা চলে গিয়েছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে শিলাইদহের সরকারি বাংলােয় গিয়ে পৌঁছােতে দেখি সহাস্যে মাহমুদ ভাই বাংলাদেশের কয়েকজন শিল্পী, কবি-লেখকের মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন। তাকে রিকশায় তুলে ছেউরিয়া চলে গেলাম লালন সাঁইয়ের মাজারে।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। মুক্তিযােদ্ধাদের সঙ্গে ঐ সময় কিছুকাল কলকাতায় ছিলেন, সেখান থেকে ফের রণাঙ্গনে। ঐ সময় কলকাতায় বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়ে লিখেছিলেন একটি কবিতা, মুক্তির আমলে কারাবাসে বসে বুদ্ধদেব বসুর প্রয়াণের খবর পেয়ে। কবিতাটি রয়েছে আল মাহমুদের মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো গ্রন্থে—

১৯৭১ সাল।
আমি পালিয়ে এসেছি আমার দেশ থেকে
আমার স্ত্রী কোথায় আমি জানি না। আমার বন্ধুরা আছে কি নেই
বেতারে সেই উদ্বেগ উচ্চারিত হচ্ছে বুদ্ধদেব, আপনার মুখদর্শনের
জন্য আমি এক বিদ্বেষী কূটনীতিকের ভােজসভায় অনাহূত বেহায়ার
মতো ঢুকে গিয়েছিলাম।

আমার শরীর ঘেষে এক বিদেশিনী অনবরত বলতে লাগলেন
বেংলাদেশ..
বেংলাদেশ…
বেংলাদেশ…
চোখে তার বিবমিষা। যেন মেঘনা পাড়ের রসিক যুবতীরা
ঠাট্টা করে তাকে সিদলের ঝাল ভর্তা খাইয়ে দিয়েছে

অনাহূত, তাড়িতের মতো কারো পাত্রর নুন স্পর্শ না করে
আমি যখন কলকাতার একটি অন্ধকার গলি পার হচ্ছি
সাম্রাজ্যবাদীদের ভোজসভার বাতি তখন জ্বলে উঠছে।
আর বুদ্ধদেব, ধনতন্ত্রের শেষ ভোজসভায় আপনি আমন্ত্রিত।

মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে মৌলানা ভাসানীর ন্যাপ দলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন আল মাহমুদ। ঐ সূত্রে উগ্র চীনপন্থি। কমিউনিস্ট দর্শনে উদ্বুদ্ধ। সংবাদপত্রে শেখ মুজিবের বাকশালের কড়া সমালােচনা লেখায়, উগ্র বামমার্গী রাজনীতির কারণে মুজিব সরকার তাঁকে কারাবন্দি করে। তাঁর সম্পাদিত সংবাদপত্র ‘গণকণ্ঠ’ও মুজিব সরকার বন্ধ করে দেয়।


এযাবৎকাল বার বার ঢাকা যাওয়ার সুবাদে কবি আল মাহমুদকে কোণঠাসা করে রাখার ‘গণতান্ত্রিক’ প্রক্রিয়াটি গভীরভাবে দেখেছি, ব্যথিত হয়েছি।


কারাগার থেকে কবি আল মাহমুদ মুক্তি পান ১৯৭৫ সালে। মুজিবহত্যা ও সেনা-অভ্যুত্থানের পরবর্তীকালে তিনি শিল্পকলা একাডেমির প্রকাশনা বিভাগে সহ-পরিচালক পদে যােগ দেন। পরবর্তীকালে ঐ একাডেমির পরিচালক হন। এরশাদ আমলের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশে ইসলামি শক্তিগুলি মাথা তুলতে থাকে। ঘটনাচক্রে আল মাহমুদ গণতান্ত্রিক মহলে পরিত্যক্ত হওয়ায় তার কাব্যগ্রন্থগুলি প্রকাশ করতে থাকে ইসলামি বা ইসলামি শক্তি-ঘনিষ্ঠ প্রকাশনালয়গুলি। এতকাল যিনি বামমার্গীয় ছিলেন, সেই আল মাহমুদ ধর্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন, ইসলামে তার আস্থা তিনি ঘােষিতভাবেই প্রকাশ করেন। ব্যাস, মৌলবাদী আখ্যা জুটে যায় তাঁর। ঐ সময় থেকেই এযাবৎকাল বার বার ঢাকা যাওয়ার সুবাদে কবি আল মাহমুদকে কোণঠাসা করে রাখার ‘গণতান্ত্রিক’ প্রক্রিয়াটি গভীরভাবে দেখেছি, ব্যথিত হয়েছি। একটি দুটি ঘটনা উল্লেখ করে বিষয়টি বােঝাতে চেষ্টা করব।

৮০-র দশকে কলকাতার ‘আবৃত্তিলােক’ আয়ােজিত কবিতা-উৎসবের মঞ্চে আমি একবারই একত্রে দেখেছি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদকে। নির্মলেন্দু গুণও সেবার এসেছিলেন। ঢাকার কোনো কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানে আমি তাঁদের একসঙ্গে দেখি নি। ঢাকায় আমি সরকারি-বেসরকারি বহু অনুষ্ঠানে, উৎসবে, আলােচনা চক্রে থেকেছি, কখনও দেখি নি তাঁদের একত্রে।

কয়েক বছর আগে টাঙ্গাইল শহরে উভয় বাংলার একটি কবিতা-অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। ‘কবিসম্মেলন’-এর সম্পাদকত্রয়ী শ্যামলকান্তি, শংকরদা, গৌরশংকর—তােমরাও ছিলে। ঐ কবিতা-উৎসবে বাংলা ভাগের পর পূর্বপাকিস্তান আমল থেকে আজকের বাংলাদেশের কবিতা বিষয়ে অসাধারণ বললেন উভয় বাংলায় সুপরিচিত সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। তার বিশ্লেষণ, বিবেচনা, ব্যাখ্যা মনোমুগ্ধকর। কিন্তু বিস্মিত, স্তম্ভিত বােধ করলাম, তিনি ১৯৪৭-পরবর্তী বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে একবারও আল মাহমুদের নাম উচ্চারণ করলেন না। রাজশাহীতে তিনি তার কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, আমি দেখতে যাব মহাস্থানগড়ের পুরাকীর্তি, হাসান ভাই আমাকে গাড়িতে তুলে নিলেন। সাড়ে ৩ ঘণ্টার পথে অনেক কথা হলো। তিনি গোঁ ধরে রইলেন, আল মাহমুদ বিরাট কবি, কিন্তু তিনি তার নামােচ্চারণ করবেন না।

বিশদ বলার দরকার নেই, আমি কবির এই নিগ্রহ দেখেছি। বন্ধুরা পরিত্যাগ করেছেন, এক কোণে পড়ে আছেন, তথাপি সহাস্যে অমলিন। আমি ঈষৎ মিল পেয়েছি প্রয়াত কবি বিনয় মজুমদারের সঙ্গে আল মাহমুদের। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বিনয় সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘বিনয় মজুমদার পড়েছেন জীবনানন্দের পাল্লায়, আর বেরুতে পারেন নি। বিনয়ের বেশ কিছু স্মরণযােগ্য পঙ্‌ক্তি আছে, কিন্তু রচনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে বার বার।’ বিনয় তাঁর কবিতা রচনার সূচনাকালেই ক্রমে মানসিক স্থিতি হারিয়েছেন, কিন্তু আল মাহমুদ তার বিশ্বাসে সুস্থির, এই বয়সেও তিনি টানটান। বিনয় তার আপন অপরূপ জগৎ গড়ে বন্ধুস্বজনদের কাছে পরিত্যক্ত হয়েছেন, বিশৃঙ্খলতার অভিযােগে দুষ্ট হয়ে। আল মাহমুদ পরিত্যক্ত হয়েছেন তাঁর স্থির বিশ্বাসের শাণিত স্বভাবে, সৌন্দর্যময় সৃষ্টির কারণে।


আমার বিবেচনায় তিনি হিন্দু-সংস্কৃতির সঙ্গে তামাম বাংলায় চর্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ইসলামি সংস্কৃতির মহামিলন ঘটিয়ে দিয়েছেন।


ইসলামে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন বলেই আল মাহমুদ মৌলবাদী, গণতান্ত্রিক মহল থেকে উত্থিত এই অযুক্তি মেনে নিতে পারি নি। বার বার আল মাহমুদ এভাবে অভিযুক্ত হওয়াতে শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন, আল মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযােগ আদতে সাহিত্যিক ঈর্ষাসঞ্জাত।

আমার বিবেচনায় কবিরা কোনো দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তারা ভাষার সন্তান। আল মাহমুদ বাংলা ভাষার কবি, যে ভাষা বিভক্ত হয় নি। তিনি আমার বাংলার। সারা জীবনব্যাপী বাংলা কবিতায় ভাটিবাংলার জনজীবন, নদীনির্ভর জনপদ, গ্রাম, চর, জলার কর্মমুখরিত জনচাঞ্চল্য, প্রেম-ভালােবাসা, সংগ্রাম তিনি তাে মিশিয়েছেনই, আমার বিবেচনায় তিনি হিন্দু-সংস্কৃতির সঙ্গে তামাম বাংলায় চর্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ইসলামি সংস্কৃতির মহামিলন ঘটিয়ে দিয়েছেন। যে ঘাটতি ঐতিহাসিকভাবেই ছিল, আল মাহমুদ তার প্রথম মেরামতকারী। এই কর্মে তিনি বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। সাবুদ হিসেবে আল মাহমুদ ঘােষিতভাবে ইসলামে আস্থা প্রকাশ করার ঢের আগেই তার অতিবিখ্যাত সােনালি কাবিন গ্রন্থের ১৩ সংখ্যক কবিতাটির কয়েকটি পঙ্‌ক্তি তুলে ধরছি—

শুভ এই ধানদূর্বা শিরােধার্য করে মহিয়সী
আবরু আলগা করে বাঁধাে ফের চুলের স্তবক
চৌকাঠ ধরেছে এসে ননদীরা তােমার বয়সী
সমাগত হয়ে শােনাে সংসারের প্রথম সবক
বধূবরণের নামে দাঁড়ায়েছে মহামাতৃকুল
গাঙের ঢেউয়ের মতাে বলাে কন্যা কবুল,কবুল।

এ কবিতায় কোথায় হিন্দু-সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামি সংস্কৃতির মিশেল, পাঠক, আপনাকে নিশ্চিতই তা বুঝিয়ে দিতে হবে না।

১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই আল মাহমুদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। এই সেদিন তার ৭৮তম জন্মদিন পালিত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদ জানিয়েছেন, তার বয়স আর একটু বেশি। বছর কয়েক কমানো ছিল তাঁর সার্টিফিকেটে। ৮০ ছুঁই-ছুঁই বয়সে চোখে এখন ঈষৎ ঝাপসা দেখেন, কানে একটু কম শােনেন। কিন্তু তার হৃদয়াবেগ তরুণের, প্রেমতৃষ্ণা নওল কিশােরের। অশ্রুতকে শুনতে পান তিনি, অদৃশ্যকে দেখতে পান। এই সেদিনও ‘আজকাল’-এর রবিবারের পাতার জন্য যে কবিতা পাঠিয়েছেন, তা কামনাবাসনায় টগবগ করছে। তাহলে সেই প্রশ্ন, আল মাহমুদ এই শক্তি অর্জন করলেন কোথা থেকে? করছেন তার আত্মবিশ্বাস থেকে, যা ইসলামে আস্থা স্থাপন, তাই তাকে সুউচ্চ করেছে। অভিযােগ, নিন্দা, গালিগালাজ, কর্দম নিক্ষেপে তাঁর অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে। তাঁর বিতর্কিত রচনাগুলি, বিশেষত ‘কবির আত্মবিশ্বাস’-এর প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলি পড়ে তাঁর আত্মযুক্তিতে বহুজন উত্তেজিত বােধ ক’রে, ক্রোধে তাঁর সমালােচনা, নিন্দামন্দ করেছেন। পাঠক হিসেবে আমি এতে উত্তেজনা বােধ করি নি। শিশুর সারল্য বােধ হয়েছে। খেলিছে বিরাট শিশু আনমনে।

আমি নাস্তিক, তা’বলে শিখরে, সুউচ্চ স্থানে বিরাজমান ঐ মহাকবিকে দেখতে পাব না, তেমন তাে নই।

(3689)

Latest posts by মৃদুল দাশগুপ্ত (see all)