হোম গদ্য লজ্জার সভ্যতা

লজ্জার সভ্যতা

লজ্জার সভ্যতা
2.57K
0

পর্ব- ১

সভ্যতা মানে সুখের সন্ধানে ছুটে চলা। যারা ছুটেছে তারাই সভ্যতা গড়ে তুলেছে। তাদের প্রধানতম হাতিয়ার বুদ্ধি। নিন্দুকেরা বলে চালাকি।

বুদ্ধি বা চালাকি, যা-ই হোক, এর সামনে রয়েছে সীমাহীন হিংস্রতা। সুখের জন্য তারা যা-কিছু করেছে তার শিরায় শিরায় হিংস্রতা, নিষ্ঠুরতা। তারপর তার সঙ্গে তারা যোগ করে নিয়েছে বদমায়েশি, শয়তানি। মেধাবীরা বলে ডিপ্লোম্যাসি।

সবাই সুখী হতে চায় কিন্তু তারা শুধু নিজের ক’জন স্বজন নিয়ে সুখী হতে চায়, যা সমাজে দ্বন্দ্বের জন্ম দেয় এবং তারা অন্যের ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে সুখী হতে চায়, যা সংঘাত হাজির করে।

তবু তারা এভাবেই সুখী হতে চায়। এসব নিয়েই সভ্যতার বুদ্ধিচর্চার সমস্ত ইতিহাস।

এভাবে কি সুখী হওয়া যায়?

এভাবে সুখী হবার কোনো তত্ত্ব-সূত্র দুনিয়ায় এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই। এ যুগে কেবল সবাই মিলেই সুখী হওয়া সম্ভব। অথবা ফিরে যেতে হবে কৌম সমাজে।

তারা তা জানে, কিন্তু বরদাশ্‌ত করে না।

সুখের ধারণা জনে জনে ভিন্ন বটে। জৈবিক-মানসিক পার্থক্য আছেই। তবু নির্দ্বিধায় স্বীকার করবেন যে, যে-কেউ অসুস্থ হতে পারে। তাকে তখন অন্যের কাছে যেতে হয়। শুধু টাকা দিলেই ভালো সেবা মেলে না। যার কাছ থেকে সেবা নেব তার মনে সুখ থাকা চাই। ধরা যাক তারা হলো ডাক্তার, ড্রাইভার। শুধু টাকা দিলেই তাদের কাছ থেকে ভালো সেবা পাবেন না। তারা কিসে সুখী হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

অসুখী হবার পেছনে স্বেচ্ছাচার, অতিলোভ, অসততা, অসুস্থতা ইত্যাদি থাকতে পারে। সব সমস্যা সমাধান করেই এগোতে হবে।


ভিখারি আর প্রভুর সভ্যতা

সবাই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল এতে সন্দেহ নাই। সবাই স্বীকার করে কিন্তু কেউ সহ্য করতে চায় না। কারণ তারা প্রভু হতে চায়। এ সভ্যতা ভিখারি আর প্রভুর সভ্যতা। প্রায় সবাই অন্যের দরজায় ধন্না দেয়। ভিখারিপনা করে বেড়ায়। বাধ্য হয়েও করে স্বেচ্ছায়ও করে।

দুইটাই লজ্জার।

সবাই কিছু মানুষকে নতজানু দেখতে চায়। কৃতজ্ঞতা চায়। কারণ তারা নিজের দায়িত্বকে মর্যাদা দিতে পারে না। তারা অন্যের অধিকার স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হয় আর অহংকারীকে মোটেও পছন্দ করে না। এসব কারণে তাদের সভ্যতায় সম্মান-মর্যাদা-ভালোবাসা দুর্লভ।

মর্যাদার সভ্যতায় অহংকারকে স্যালুট। মিছে অহংকার বিপজ্জনক জেনেও।

অফিসের বস অফিসের প্রয়োজনে একটা লোককে চাকরি দিলেন। তার কাছে তিনি কৃতজ্ঞতা চান কেন? বসের দায়িত্ব কী? আর ওই লোকটার কি কোনো অধিকার নাই? মুখে বলবে আছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।

লজ্জার সভ্যতায় এসব সমস্যার সমাধান নাই। কারণ তারা অন্যের ঘাড়ের ওপর দাঁড়ানোর তত্ত্বে গড়ে উঠেছে।

(১) সভ্যতা ব্যক্তির বিকাশ চায় (২) আবার সামষ্টিক ছন্দ-সৌন্দর্য সুখশান্তির জন্য অনিবার্য। এই দুইকে দুই বিপরীত মুখে রেখে নিদারুণ দ্বন্দ্বে ভুগছে সারা দুনিয়া।

আসলে কিন্তু এখানে কোনো দ্বন্দ্ব নাই। এটা হলো নিছক ইচ্ছার বিষয়। যেমন, কোমল পানীয়র জন্য কাচের বোতল কোনো দোষ করে নাই। তবু তাকে তারা ঝেঁটিয়ে দিয়েছে। তারা মনে করেছিল লাভ কম হচ্ছিল। লাভ বাড়াতে গিয়ে নোংরা প্লাস্টিক বোতলে দেশ সয়লাব হয়ে গেল। ‘লাভ’ ‘কম’ ‘বেশি’ বলতে তারা কী বুঝেছিল? কিচ্ছু বোঝে নাই। কেবল তাদের ইচ্ছা হয়েছিল। সে-কারণে দেশের প্রায় সব পানিতে, বাতাসে এখন বিষ।

বিষ খাব? লাভ করব? কম করব? বেশি করব? তারা জানে না তারা কী করবে। তারা দিশেহারা।


আমরা যাদের ভালোবাসি, আমরা যাদের ভক্তি করি

ব্যক্তির বিকাশের নামে দুনিয়াজুড়ে সবাই এখন দানব হতে চায়।

ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বিশ্বে শিল্পী-খেলোয়াড়রা সবচেয়ে বড় দানবের প্রতীক হয়ে উঠেছে। মানুষ শিল্পীদের ভালোবাসে। খেলোয়াড়দের ভালোবাসে। তাদের ভক্ত হয়। আর সেই শিল্পীরা, খেলোয়াড়রা টিভির পর্দায় নির্দ্বিধায় পচা জিনিসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে থাকে। এই কাণ্ডকে প্রতারণা বললে কম বলা হয়। এসব বদমায়েশিকে সংসদ স্বীকৃতি দিলেই বৈধ হয়ে যাবে?

তারপর তারা দানবীর হয়। দানবীর হওয়ার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নাই। এটা হলো বড়সড় তামাশা। মানুষকে পিঁপড়া বানিয়ে খেলা করা। দান করার ওই টাকা-পয়সা জমে এ কারণে যে, কোথাও-না-কোথাও অনেকে বঞ্চিত হয়। অনেক দানকারীর মনে মমতা-মানবতা আছে তাও নিশ্চিত। কিন্তু তারা কি লজ্জার সভ্যতা থেকে বের হতে চায়?

চায় বলেই আমার মনে হয়েছে। তারা রীতিমতো হাঁসফাঁস করছে তা ত দেখতেই পাচ্ছেন। এসব বিষয়-আশয় নিয়ে এই খুদে রচনা। চিন্তার জগতে বিশেষ নতুন কিছু না। কেবল এখনকার প্রেক্ষাপটে, আমার উপলব্ধি থেকে একসঙ্গে সংক্ষেপে হাজির করছি।


আরাম-বিলাসের নিয়ম-কানুন

যারা খাদ্য-বস্ত্র উৎপাদন করে; লোহা, জ্বালানি, সিমেন্ট ইত্যাদি যারা উৎপাদন করে, তারা ঠিকমতো খেতে পায় না। কিন্তু কিছু লোক এসব উৎপাদন না করেও কিভাবে দালানে থাকে, ভালো খাবার খায়, নানাভাবে আরাম-বিলাস করে?

নিয়মটা সবাই জানেন। সব প্রতিষ্ঠানে প্রধানত সেসবই পড়ানো হয়। সবাই তাদের শিশুদের সেটাই শেখায় এবং আরো শেখাতে চায়। বেশির ভাগ কিতাবেরও প্রধানত সেটাই উদ্দেশ্য।

সব শিক্ষা বা কিতাবের একটাই উদ্দেশ্য, জ্ঞান বৃদ্ধি, হুম?

কী সেই জ্ঞান?

রাজনীতি, ব্যবসা, আইন, বিজ্ঞান, শিল্প, রুচি, ইত্যাদি। এই জ্ঞান কারা ব্যবহার করেন?

সভ্যজগতের নেতৃস্থানীয় সবাই। তারা মূলত শাসক। যারা উৎপাদন করে না কিন্তু ভোগ করে। এ নিয়ে তর্ক করা যেতে পারে। তর্ক জরুরি না।

আলোচনায় সুবিধার জন্য শাসকদের দুটি মোটাদাগে ভাগ করা যাক। প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ। যারা সরাসরি শাসন করে, যেমন মন্ত্রী, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, ইত্যাদি হলো প্রত্যক্ষ শাসক। যারা প্রত্যক্ষ শাসকদের সহযোগিতা করে, যেমন শিক্ষক, সাংবাদিক, উকিল, কেরানি, ইত্যাদি হলো পরোক্ষ শাসক।

আর যারা সেবক শ্রেণির, ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, তারা এতটা ক্ষমতাধর হয়ে গেছে যে তারা এখন প্রত্যক্ষ শাসকদের মতোই।

বস্তুত মানুষের কোনো শাসক দরকার নাই কিন্তু তারা সবার জান-মাল-মন ইত্যাদি সবকিছু দখল করে রেখেছ। খল প্রেতাত্মার মতো। সবাই তাদের থাবা থেকে মুক্তি চায়। সেই আদিম যুগ থেকে।

সে-কালের গোত্রপতিরা কিছু উপহার-উপঢৌকন পেলেও তাতে তারা খুশি হতে পারল না। তাই অন্য গোত্রের ওপর হামলা-ডাকাতি-লুট-ছিনতাই শুরু। তারপর তারা এসব ঝক্কি কমিয়ে ফেলল। চাঁদা, খাজনা, কর চালু করল। আর তারা নিজেদের লর্ড, রাজা, বাদশা, সম্রাট উপাধি দেয়। তারা মানুষের কানের মধ্যে ফুঁ দিয়ে দিয়ে চিল্লিয়ে বলল, আমরা মহান, বুঝেছ? আমরা যা করি তা মহৎ। আমাদের সম্মান করতে হবে। আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলা চলবে না। আমাদের সব কাজ, কাণ্ড ও বক্তব্যকে সমীহ করতে হবে। আমরা যা বলি তাই আইন। আমিই রাষ্ট্র, আমিই আইন, হুম!

কিছু লোক দেখল তারা ত খাজনা আদায় করতে পারছে না। তারা ব্যবসা আবিষ্কার করল। ব্যবসা মানে হলো বেশি নিয়ে কম দেওয়া।

তারা সবাই মিলে মানুষকে দাস বানাল। শেকলে বেঁধে পশুর মতো কাজ করাল। কিন্তু এখানেও তারা থামে নি। মানুষকে তারা জমি থেকে উচ্ছেদ করে বুনো পশুর কাতারে নামিয়ে দেয়। আর তারা তাদের জমি অল্প কিছু লোকের কাছে বিক্রি করল, বর্গা দিল, বন্ধক দিল। খাজানাদার, কেরানি, পুলিশ, মিলিটারির সঙ্গে যোগ হলো ইজারাদার, বর্গাদার, ইত্যাদি।

তারা নিজেরাই চালাক। তার ওপর তারা সবচেয়ে চালাক লোকটাকে গুরু মানল আরো চালাক হবার জন্য। তার মানে শিক্ষক নামক মেধাবী সভ্যদের আবির্ভাব হলো।

অনেকে বলে, পরে ত তাদের জমি ফেরত দেওয়া হয়েছে।

ব্যাপারটা আসলে এই, কিছু জমি কিছু মানুষকে অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। সেখানে আবার জুড়ে রাখা হয় নানা রকম শর্ত। এসব নানা প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষকে ভূমিহীন করে রেখে এক সময় তাদের শ্রম ছিনতাই করা হয়। তারপর মানুষ বেড়ে মাথাপিছু জমির পরিমাণ হয়ে গেল শোচনীয়। জনসংখ্যা এত বাড়ল যে তাদের খাদ্য-বস্ত্রের জন্য যতটুকু আবাদি জমি, মিঠাপানি ও বনভূমি দরকার তা আর টিকে থাকল না। ফলে শ্রম ক্রেতা বা চালাক লোকদের পোয়াবারো হলো। আর সরল মানুষের শ্রম বেচা ছাড়া উপায় থাকল না।

তবু চালাক লোকেরা বলে, না পোষালে তারা কেন কাজ করে। তাদের ত বাধ্য করা হয় না।

কথাটার কোনো ভিত্তি নাই। কথাটাকে অবৈধ ঘোষণা করা উচিত। শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে আইন থাকা আবশ্যক।

চালাক শব্দটা কালে কালে নেতিবাচক হয়ে দাঁড়াল। তাই মেধাবী। তারা জানে, একজন মানুষ খেতে-খামারে-কারখানায়-খনিতে যতটুকু উৎপাদন করতে পারে তা দিয়ে তার পক্ষে আরাম-বিলাস করা সম্ভব না। তাই অন্যকে দিয়ে, অন্যের শ্রম দিয়ে উৎপাদন করাতে হবে। অথবা ছিনিয়ে নিতে হবে। সেটা খাজনাই হোক বা ঘুস, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বা ব্যবসার নামে মুনাফা/উদ্বৃত্ত সৃষ্টি।

এজন্য তারা বিচিত্র সব আইন বানায়। তা প্রয়োগের জন্য নানা রকম কৌশল খোঁজে। সারা জীবন তারা শিশুদের সেইসব কৌশল শিখিয়ে যায়। সব প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যপুস্তক এমন অসংখ্য কৌশলে ভরপুর। দুনিয়ার সব অভিভাবক প্রতিটা মুহূর্ত তাদের শিশুদের এসব কৌশল শিখিয়ে যাচ্ছে। শেখানোর চেষ্টায় গলদঘর্ম হচ্ছে প্রায় সবাই। এই অভিভাবকদের মধ্যে মাত্র দুএকজন জানে তারা জোঁকের মতো অন্যদের রক্ত খেয়ে যাচ্ছে। তারা অন্য কোনো উপায় পাচ্ছে না।

এই সভ্যতা লজ্জার নয়?

মানুষ সভ্য হতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করেছে। সভ্যতা মানেই আবিষ্কার। আবিষ্কার মানেই সভ্যতা। মাটির থালা-বাসন থেকে শুরু করে কাঠের চাকা, অক্ষর-ধ্বনি, সংখ্যা, শূন্য, ইত্যাদি। সবই আরাম-বিলাসের জন্য যা সভ্যতার একমাত্র উদ্দেশ্য।

খুব ভালো কথা।

কিন্তু মানুষ সেগুলো উৎপাদন-সম্প্রসারণ করতে গিয়ে, কেনাবেচা করতে গিয়ে বাধিয়েছে গোল। এর মূলে রয়েছে শ্রম। বেচার প্রতিযোগিতা চলে বলে শ্রমের দাম কমে যায়। আবার চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম বলে পণ্যের দাম আরো বাড়ে।

কেন চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হয়?

সবাই উৎপাদন করে না। খেতে-খামারে-কারখানায়-খনিতে যায় না কিন্তু তারাই আরো ভোগের জন্য মত্ত হয়।

ফলে চাহিদা ও দাম পাল্লা দিয়ে বাড়ে। বাড়তি দাম কোত্থেকে আসে?

শোষণ থেকে। আরো বেশি উদ্বৃত্ত সৃষ্টি থেকে। উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করা হয় আরো কম মজুরি দিয়ে আর পণ্যের দাম আরো বাড়িয়ে। ফলে বৈষম্য বাড়তেই থাকে। এটা আরো বাড়ানোর জন্য মেধাবীরা নিত্যনতুন কৌশল আবিষ্কার করে। মেধা শানিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কঠিন যুদ্ধে নামে। কৌশল উদ্‌ঘাটনে তাদের একনিষ্ঠ লিপ্ততা (গবেষণা) দেখলে টাস্কি লেগে যায়। এভাবে প্রতিনিয়ত তত্ত্ব-সূত্র বাড়তেই থাকে। হাজার হাজার নিয়ম দিয়ে জটিল প্রক্রিয়ায় তারা ঘাম-রক্ত ছেঁকে এনে তাই দিয়ে রঙিন জিনিস বানাতে শেখে। সেই রঙিন জিনিসের তালিকা এত দীর্ঘ!


লজ্জার সভ্যতার কলবল

শিল্প, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, আইন, ধর্ম, ইত্যাদি—এগুলো কারা ব্যবহার করে? এককথায়, যারা তাদের খাদ্য-বস্ত্র-গৃহ ইত্যাদি কিছুই নিজেরা উৎপাদন করে না এবং করবে না বলে পণ করেছে।

তবু তারা এসব ভোগ করে কিভাবে?

এসবের মূলে রয়েছে খাজনা। (১) দেবতা, গড, ভগবান আমাকে পাঠিয়েছে তোমাদের শাসন করার জন্য। খাজনা আদায়ের জন্য। (২) তোমরা বিশৃঙ্খল। আমাকে খাজনা দাও। আমি তোমাদের শৃঙ্খলার মধ্যে রাখব।

কিন্তু কেউ কি মাথার ঘাম পায়ে ফেলা আয়/ সম্পদ অন্যকে দিতে চায়?

না।

তবে চাওয়া-না-চাওয়ায় কিছুই যায়-আসে না। (১) দেবতার কথা তোমাদের শুনতেই হবে (২) তোমাদের শৃঙ্খলিত থাকতে হবে।

না, বুঝি নাই।

ঠিক আছে। মিলিটারি তোমাদের বুঝিয়ে দেবে।

খাজনাকে কেন্দ্র করেই সব হচ্ছে। খাজনা আদায় ও খাজনাদারের আশেপাশে তাকাও। খাজনা শুনতে ভালো লাগছে না? ঠিক আছে। ট্যাক্স বলা যাক। খাজনাদার বলা যাবে না। ট্যাক্স অফিসার বলতে হবে। তার অনিবার্য সঙ্গী হলো  কেরানি। না, কেরানি বলা যাবে না। সচিব বলতে হবে।

খাজনার ভাগ নেওয়ার ধান্দায় নেমে গেল একদল লোক। তারা দেবতার বিরুদ্ধে শত্রুতা শুরু করল। তার বিরুদ্ধে বই লিখে বেচতে শুরু করল। ফল হলো এই যে দেবতাও থাকল লেখকও থাকল।

দুই দলে যুদ্ধ বেধে গেল।

তারপর লেখকদের সঙ্গে যোগ দিল আরো কিছু লোক। তারা চিত্র এঁকে বলল, তোমাদের এগুলো কিনতে হবে। না হলে ত তোমরা বর্বর থেকে যাবে। আর এগুলো হচ্ছে ভাস্কর্য, এগুলো হচ্ছে সাহিত্য, ইত্যাদি, বুঝেছ?

চালাক লোকের সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে তারা গিরা পাকাতে লাগল। তাদের জন্য দরকার হল বিচারক, উকিল। তারা গিরা ছাড়াতে গিয়ে আরো ‘তালগোল মানে আইন’ পাকায়।

শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, আইন, ইত্যাদি—এসবের কি দরকার নাই?

এই প্রশ্ন করলে পরিপূরক আরেকটি প্রশ্ন আসবে, আপনি যেসব খাদ্য-বস্ত্র ও অসংখ্য খনিজ পদার্থ ভোগ করেন, সেসব যারা উৎপাদন করে, তাদের কাছ থেকে সেসব কিসের বিনিময়ে নিয়ে আসেন? তারা আপনার কাছ থেকে কী নেয়? কতটুকু?

বিনিময় হার ঠিক করা হয় কিভাবে?

যেমন ইচ্ছা। আমিই আইন।

কারা এই বিনিময় হার ঠিক করে?

শাসকশ্রেণি।

এবার আপনিই ঠিক করুন, কী দরকার আর কী দরকার না বা কিভাবে দরকার।


খুন ও ফাঁসি

হত্যার বিচার হত্যা হলে সেই হত্যাকারী আর আইনপ্রণেতার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। কেউ খুনি হয় রাগ-ক্ষোভ-ঘেন্না ইত্যাদি কারণে। বিচারের নামে এই খুনিকে ফাঁসি দেওয়া মানে হচ্ছে খুনিকে ঠান্ডা মাথায় খুন করা। পুরো শাসকশ্রেণিটা এমনি এক খুনি। এ কারণে তারা সারাক্ষণ অনুশোচনায় ভোগে। অস্তিত্ব হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন থাকে। তারা মুক্তির পথ খুঁজে হয়রান। অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে।

মানুষকে অপদস্থ করার জন্য, নাজেহাল করার জন্য কিছু লোক রাষ্ট্র গঠন করেছে। সেখানে অপরাধ সৃষ্টির সব বন্দোবস্ত আছে। অপরাধ থেকে মুক্ত থাকার জন্য আছে কঠোর প্রতিযোগিতা আর সংযম-সাধনার বিধান।

এই বিধান কারা দিয়েছে?

শাসকশ্রেণি।

যত শাস্তি দেওয়া হয় অপরাধ ততই বাড়ে। অপরাধ থেকে মুক্ত থাকার উপায় সুলভ করতে হবে। তা না করে তারা একের পর এক ব্যয় খাত খুঁজে বের করে। যেমন সর্বশেষ হলো আইডি কার্ড। আসলে এটা তাদের ব্যবসা।

কার্ড বানানোর টাকা কোত্থেকে আসে?

শ্রমশোষণ থেকে। শ্রমের মজুরি কম দিয়ে যে-উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করা হয় সেখান থেকে। এই উদ্বৃত্ত থেকেই খাজনা আসে। খাজনাই সব।

আপনার সন্তান খুন হয়ে গেল। এখন আপনি খুনির বিচার দিয়ে কী করবেন?

বিচার দিয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বাংলাদেশে প্রতিবছর শত শত লোককে ফাঁসি দেওয়া হয়। আরো শত শত লোককে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিদিন খুন-ধর্ষণ-ঘুস-চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা ঘটে। আপনি কি লাখ লাখ লোককে ফাঁসিতে ঝুলাতে চান?

তাতেও এসব থামবে না।

আসলে শাসকশ্রেণি বিচারের মতো নানা প্রক্রিয়ায় মানুষকে দমিয়ে রাখে। মানুষ ভয়ে থাকে। তখন বেশি করে খাজনা আদায় করা যায়। জিনিসের দাম যেমন খুশি বাড়িয়ে নেওয়া যায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সেবার ফি যেমন খুশি বাড়ানো যায়।

বিচার শেষ হবার আগে আটক করা সংগত না। আদালতে হাজির হওয়ার নোটিশ দেওয়া যায়।

তাহলে পুলিশ শাসন করবে কী করে?

আসলে শাসকশ্রেণি ক্ষমতা ভাগাভাগি করার সময় পুলিশকে এই অংশটা দিয়ে রেখেছে।

কেরানির কাজ দপ্তর সামলানো। তার হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার কেন?

ক্ষমতার ভাগাভাগি।

মর্যাদার সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে বিচার-কার্যক্রম ক্ষুদ্র গণ্ডিতে নেমে আসবে। তখন প্রায় সব সমস্যা কাউন্সেলিং দিয়েই সমাধান করা যাবে। শাস্তিকে অসম্মান মনে করলে সংশোধন প্রক্রিয়াই শাস্তি হিসেবে যথেষ্ট।

কিন্তু তারা এ নিয়ে তর্কে জড়ায়। তর্কশাস্ত্র এমন এক জিনিস যা দিয়ে দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানিয়ে মানুষকে আহাম্মক সাব্যস্ত করা যায়।

মানুষ একদিনে এতটা চতুর হয় নি। অন্তত চার হাজার বছর আগে এই চাতুর্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। অস্তিত্ব ছিল তারও অনেক আগে। সম্ভবত চীন, ভারত ও মিশরে প্রায় একই কালে। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপে। সেখানে গিয়ে আরো পুষ্টি লাভ করে।


বুদ্ধিজীবী শব্দটা বেদখল হয়ে গেল

চতুর লোকদের কেউ পছন্দ করে না বলে তাদের কেউ কেউ নিজেদের বুদ্ধিজীবীর তকমা দিয়ে মহৎ করে তোলার চেষ্টায় নামল। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর পত্রপত্রিকা খুলে বসল। সবাইকে প্রতিনিয়ত শেখাতে লাগল, শিক্ষক-লেখক-গবেষক হলো মহত্তম। সবার ওপরে আমাদের অবস্থান, হুম!

যারা খেতে-খামারে খাবার উৎপাদন করে, কারখানায় কাপড়চোপড়, রড-সিমেন্ট, বিদ্যুৎ ইত্যাদি উৎপাদন করে, তাদের খেয়ে-পরে ভালো করে বেঁচে থাকার জন্য যে মজুরি দরকার তা তারা দেয় না।

না দেওয়ার বুদ্ধি কোত্থেকে আসে? বুদ্ধি বিক্রেতাদের কাছ থেকে।

ব্যবসায়ীরা নিজেরাই বুদ্ধিমান কিন্তু প্রচুর লাভ করতে গিয়ে খেই হারায়। তাই তারা বুদ্ধি বিক্রেতাদের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিল। তারা হলো ডিরেক্টর ম্যানেজার অ্যাডভাইজার ইত্যাদি। তারপর ব্যবসায়ীরা দেখল ভারি মজা ত। মাথা ঘামানোর ঝামেলা নাই! তারা তখন ভালোমতো আরাম-বিলাসে ঝুঁকে পড়ল। মুনাফা মানে উদ্বৃত্ত মানে লুট মানে শোষণ বেড়ে গেল।

‘বুদ্ধি বিক্রেতা’ শুনতে ভালো লাগছে না?

ঠিক আছে। বুদ্ধিজীবী বলা যাক।

খেতে-খামারে-কারখানায়-খনিতে যারা কাজ করে না তারা সবাই বুদ্ধিজীবী, কিন্তু কিছু লোক শব্দটাকে নিজেদের জন্য দখল করে রেখেছে।

কেন মজুর-শ্রমিকদের খেয়ে-পরে ভালো করে বেঁচে থাকার মতো উপযুক্ত মজুরি দেওয়া হয় না? দেওয়া হলে আরো লাভ হয় না, আরো ধনী হওয়া যায় না, আরো বেশি খাজনা আদায় হয় না, বেতন নিয়মিত বাড়ানো যায় না।

তাই তারা সবাই মিলে খাজনা আদায় করার পক্ষে সাফাই গায়। বেশি খাজনা দেওয়ার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করে। মানে শ্রমের মজুরি কমিয়ে উদ্বৃত্ত সৃষ্টির পক্ষে রায় দেয়।


যারা পাল্টা দখলের পথ খুঁজে পেল

কিছু লোক আবার সবার ওপর খবরদারির ধান্দায় নামল। তারা হলো সাংবাদিক।

তারা দেখল, পুলিশ, মিলিটারি, আমলা, উকিল, জনপ্রতিনিধি তথা সবার সীমাবদ্ধতা আছে। সবাইকে নাকাল করতে পারে সাংবাদিকরা। একটা মিডিয়া খুলতে পারলে সবার দোষ খোঁজা যাবে। কিন্তু সাংবাদিকরা পত্রিকা করতে টাকা পাবে কই?

তারা সেই ব্যবসায়ীর কাছে ধন্না দিল। এভাবে একে একে সবকিছু ব্যবসায়ীর কব্জায় চলে যায়। ব্যবসায়ীদের রমরমা দেখে সবাই ব্যবসায়ী হতে চায়। ধর্ম, রাজনীতি, মর্যাদা—সবই এখন ব্যবসায়ীদের মোড়কে ভরা পণ্য।

ব্যবসায়ীরা আরো লাভের জন্য মুখিয়ে আছে। সাংবাদিকরা তাদের লোভ দেখিয়ে পটিয়ে ফেলল। একটা পত্রিকা থাকলে তোমার ব্যবসা আরো রমরমা হবে। মানে তুমি যত ইচ্ছা শয়তানি করতে পারবা। কেউ কিছু বললেই অমনি আমরা তার ঘাড় মটকে দেবো। এই শালা! এই দেখ—!

হা হা হা! ভারি মজা ত! ব্যবসায়ীরা মিডিয়া খুলতে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

আর তোমরা তরুণরা সংবাদিক হও। তাহলে ক্ষমতা দেখাতে পারবা।

সব তরুণ অন্যায়ের বিপক্ষে থাকে কিন্তু খুব কম তরুণই জানে কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়। বেশির ভাগই জানে না সাংবাদিকরা কোন ক্ষমতাটা দেখায়। ব্যবসায়ীরা চুপিচুপি মুচকি হেসে তাদের ব্যবহার করে। ভোগ্যপণ্যের মতো। ধারাল তলোয়ারের মতো। শক্তিশালী বন্দুকের মতো। যত প্রকার চিন্তা করা সম্ভব।

সাংবাদিকরা পা কামড়ে ধরে, লাথি খেয়ে, এঁটো খেয়ে, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে বৈকি। ফলে লজ্জার সভ্যতা প্রত্যক্ষ শাসকের পায়ের নিচে পিষ্ট হতে পারে না। বরং আরো পরিপুষ্ট হয়।

সবাই সাংবাদিকদের চরিত্র জেনে ফেলল। তাই তারা এখন তাদের বলে সাংঘাতিক। কিন্তু তারা কেউ কেউ এতটা ধুরন্ধর যে, সব সময় নতুন নতুন কৌশলে একটা বড়সংখ্যক পাঠকের মগজ ধোলাই করে রাখে। ফলে পাঠক মনে করে, আহা, এই সাংবাদিকটা কতই না মহৎ!

সহজে বুঝুন, এরা কি কোনো দিন নিজেদের খাদ্য-বস্ত্র নিজেরা উৎপাদন করে?

না।

তাহলে কোন প্রক্রিয়ায় তাদের হাতে ভালো খাদ্য-বস্ত্র চলে আসে?

এরাই সব সময় বলে বেড়ায়, সবার সবকিছু করার দরকার নাই। এরা আপনাকে তা বিশ্বাসও করিয়ে ছাড়ে। এদের আবার সহযোগিতা করে বড় বড় বিজ্ঞাপন সংস্থা, গবেষণা সংস্থা। তারা সাংবাদিকদেরও বাপ। তারা কখনও সামনে আসে না। তারা দালানের ভেতর এসি ঘরে বসে চাল দেয়। আর অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ-মিলিটারি গিয়ে তাদের আগলে রাখে। কারণ তারা জানে তাদের জন্য যারা খাদ্য-বস্ত্র উৎপাদন করে, দালানকোটা ইত্যাদি তৈরি করে, তারা তা বাধ্য হয়ে করে। তারা খেপে আছে। তারা যেকোনো সময় হামলা করতে পারে।

মাঝেমধ্যেই করে বৈকি।

সহজে বুঝুন, আপনি কি বাজারে গিয়ে একটা পণ্য বেছেখুটে কিনতে পারেন না? বিজ্ঞাপনের ব্যয় মেটাতে গিয়ে শ্রমিকের বেতন কমে যায় অথবা পণ্যের দাম বেড়ে যায়। বিজ্ঞাপন বাবদ অনেক প্রতিষ্ঠান মোট বাজেটের ২৫ শতাংশের বেশি ব্যয় করে! মানে পণ্যের দাম ২৫ শতাংশের বেশি বেড়ে যায় অথবা শ্রমের মজুরি ২৫ শতাংশের বেশি কমে যায়। শুধু বিজ্ঞাপনের কারণে।

আর তাদের বিজ্ঞাপন বানানো শেখায় কারা?

মহত্তম চারুকলা ইত্যাদি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা।

সবাই মিলে শ্রমিক-মজুরের ঘাম-রক্ত শুষে নেয়। এটা করার জন্য তারা নানা রকম ধাঁধা সৃষ্টি করে।

দেশ, জাতি, রাষ্ট্র, শিল্প, রুচি, ঐতিহ্য, ইত্যাদি নামে অসংখ্য প্যাঁচ হাজির করে। প্যাঁচকে তারা প্যাঁচ না বলে তত্ত্ব নাম দিয়ে আরেকটা ধাঁধা সৃষ্টি করে। তারা হাজার রকম ধাঁধা সৃষ্টি করে। আর এগুলো তারা উঁচুকণ্ঠে বারবার প্রচার করে বেশির ভাগ মানুষকে ঘোরের মধ্যে ফেলে রাখে। ফেলে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যায় অবিরাম।

ঘোরের মধ্যে থাকা আর অন্ধ হয়ে থাকা এককথা। অদৃশ্য জালে আটকে থাকা। তারা এসব ফাঁদের সংখ্যা এত বাড়িয়ে দিয়েছে যে তরুণরা দিশেহারা। অনিশ্চয়তায় ভুগতে ভুগতে কাহিল।

এরা হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মানে পরোক্ষ শাসক। এরা চির অসুখী। সারা জীবনে নিজেদের কদাচিৎ সুখী মনে করে। কারণ এরা সরাসরি শাসন করতে পারে না। ফলে ইচ্ছামতো কিছু হস্তগত করতে পারে না। এরা প্রত্যক্ষ শাসকদের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। এরা তাদের অবিশ্রাম সহযোগিতা করে যায়। বিনিময়ে প্রত্যক্ষ শাসকরা তাদের জন্য কিছু উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়। কিছু এঁটো রেখে দেয়। কিছু ছুড়ে মারে। এরা তা চোখ বুজে চেটে খায়। আর প্রত্যক্ষ শাসক হবার স্বপ্নে বুঁদ হয়ে থাকে। এত বেশি বুঁদ হয় যে, এদের বেশির ভাগই স্বপ্ন ধরার পথ ঠিকঠাক দেখতে পায় না। তবে এরা স্বেচ্ছায়, সরাসরি ধূর্তামি করে না। কেবল আরো একটু এঁটো পাওয়ার আশায় প্রত্যক্ষ শাসকদের ফরমাশ খাটে। রাগ হলে দাঁতে দাঁত চেপে রাখে। চোখ বুজে থাকে। কারণ ঘোরের মধ্যে থাকার কারণে এরা অন্য কোনো পথ দেখতে পায় না। মধ্যবিত্তপনা ছাড়তে পারে না।

এই মধ্যবিত্তদের মাধ্যমে মজুর-শ্রমিকরা শোষিত-বঞ্চিত হতে হতে ক্রমেই বেশি করে হীনম্মন্যতায় ভোগে। তারা মনে করতে বাধ্য হয়, তাদের জীবনে প্রভু, বস, মনিবই একমাত্র সত্য।

আহ্! কী সভ্যতা!

তারা বলে, এটা বাস্তবতা। এটা সমাজ পদ্ধতি। সব মানুষ এক না। ইত্যাদি। অনেকে বলে না বুঝে। অনেকে বলে ছল করে।

বহু বছর ধরে এই পদ্ধতি গড়ে উঠেছে বলে সাধারণ মানুষ মনে করে এটাই নিয়ম।

এটা নিয়ম না। এটা সন্ত্রাস।

যারা চতুর না বা অন্যের উৎপাদনে ভাগ না বসিয়ে নিজে করে খায়, তাতে আপনি ভাগ বসাতে পারেন না। কম মজুরি দেওয়া মানেই ভাগ বসানো। কম দামে কেনা আর ভাগ বসানো এককথা। ভাগ বসানো মানে ছিনিয়ে নেওয়া। ভাগ বসানো মানে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করা।

তারা বলে, আমরা তাদের দিয়ে উৎপাদন করাই। আমরা জ্ঞান দিই। আমরা প্যাঁচ মোচন করি। আমরা সংগঠিত করি। সুতরাং এই উৎপাদনে আমাদের ভাগ রয়েছে।

ধরা যাক আছে। কতটুকু?

তারা এই হিসাবে যেতে চান না। গেলে মেধার চেয়ে ঘামের মূল্য বেশি তা স্বীকার করতে হবে। ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ মিলবে না। তাই তারা বরং নন্দনতত্ত্বের চর্চা করেন। হৃদয় খোঁড়াখুঁড়ি করেন। সংগীত চর্চা করেন।

এই সভ্যতা লজ্জার।


দালাল বনাম বুদ্ধিজীবী

মধ্যস্বত্বভোগী/ দালালদের সঙ্গে মধ্যবিত্ত/ বুদ্ধিজীবী শ্রেণির কোনো পার্থক্য নাই। তারা সবাই পরোক্ষ শাসক। তারা একই প্রক্রিয়ায়, বুদ্ধি বেচে, কৌশলে কিছু এঁটো চেটে নেয় প্রত্যক্ষ শাসকের পায়ের তলা থেকে। তাদের লজ্জা নাই।

কিন্তু মধ্যবিত্ত/ বুদ্ধিজীবীরা সব সময় নিজেদের অবস্থান ওপরে দেখতে চায়। তাই তারা দালাল নামে আলাদা একটা শ্রেণি আবিষ্কার করেছে। শুধু করেই থামে নি, অসংখ্য বইয়ে-সমাবেশে লক্ষবার চেঁচিয়ে-চিল্লিয়ে বলেছে, ওরা দালাল। ওরা হীন।

তাতে তারা সফল হয়েছে বৈকি। কিন্তু তাতে কার কী লাভ হয়েছে?

কথিত দালালরা হীনম্মন্যতায় ভুগছে। এর প্রভাব সবার ওপরই পড়ছে। যেমন, বুদ্ধিজীবীরা সময়-অসময় সামান্য কারণে ভয়ে আমচুর হয়ে যায়। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাদের সারাক্ষণ চিল্লাতে হয়। আতঙ্কে ভুগতে হয়।

মর্যাদার সভ্যতায় তারা অহঙ্কারের সঙ্গে নন্দনতত্ত্বের চর্চা করতে পারবেন। স্বাধীনভাবে হৃদয় খোঁড়াখুঁড়ি করতে পারবেন। কোথাও কাউকে ভয়ে কুঁকড়ে থাকতে হবে না। আমি তাদের মর্যাদার সভ্যতা প্রতিষ্ঠার আমন্ত্রণ জানাই।


উপসংহার

লজ্জার সভ্যতার ভিত্তিতে রয়েছে সেইসব মজুর-শ্রমিক যারা খনিজ পদার্থ সংগ্রহ করে, সেসব দিয়ে যারা কারখানায় যন্ত্রপাতি তৈরি করে, আর সবাইকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখে যেসব কৃষক-খামারি। তাদের দিয়ে ছলে-বলে-কৌশলে কাজ করিয়ে নিয়ে যে সভ্যতা মেধাবীরা গড়ে তুলেছেন তা লজ্জার। সেটা একটা দর্শন বটে। লজ্জার দর্শন।

লজ্জার সভ্যতাকে ঘেন্না করুন।


মর্যাদার সভ্যতা

তারেক খান

জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; নড়াইল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : নাকশী হাইস্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল। বাংলায় এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিক। সাব-এডিটর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

প্রকাশিত বই—

বান্ধাল [উপন্যাস, আদর্শ, ২০১০]
কনডম পলিসি [উপন্যাস, আদর্শ ২০১৪]
সাপের বাসায় চিতল মাছ [কিশোর উপন্যাস, আবহমান, ২০১১]

ই-মেইল : tareckhan@gmail.com

Latest posts by তারেক খান (see all)