হোম গদ্য রোকেয়ার বাংলা ভাষা শেখার সংগ্রাম ও গদ্যরীতি

রোকেয়ার বাংলা ভাষা শেখার সংগ্রাম ও গদ্যরীতি

রোকেয়ার বাংলা ভাষা শেখার সংগ্রাম ও গদ্যরীতি
422
0

রোকেয়া সাখাওয়াত হােসেন (১৮৮০-১৯৩২) নামটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে এক সংগ্রামী মানুষের প্রতিকৃতি জেগে ওঠে মনে। তাঁর সংগ্রাম ছিল নিজের সঙ্গে নিজের সংগ্রাম। তাঁর সংগ্রাম ছিল বাংলাভাষা-শিক্ষা ও চর্চার সংগ্রাম। তাঁর সংগ্রাম ছিল পুরুষতন্ত্র, কুসংস্কার, তথাকথিত ধর্মীয় বিধান এবং নারীর সর্বাত্মক পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। ‘তিনি স্ত্রী হন পিতার বয়স্ক এক পুরুষের’। ‘বিবাহিত জীবনে কেবল স্বামীর রােগের সেবা’ করেছেন। ‘২২ বছর যাবৎ বৈধব্যের আগুনে পুড়েছেন’। এটি ছিল তাঁর নিজের জীবনের সঙ্গে নিজের সংগ্রাম; ধূপের অন্তর্দাহ। অন্যদিকে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন আরবি-ফারসি-উর্দু এবং পরবর্তীকালে ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে। এর মধ্যে বাংলা ভাষার প্রবেশাধিকার ছিল না। বাংলা-বৈরী ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে বাংলা ভাষা তাঁকে সগ্রাম করে আয়ত্ত ও চর্চা করতে হয়েছে। এটি তাঁর ভাষাসংগ্রাম। আর ‘তাঁর রচনাবলি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ধারাবাহিক মহাযুদ্ধ’। রােকেয়ার জীবনের এই নানামাত্রিক সংগ্রাম থেকে একটি সংগ্রাম—ভাষা-শিক্ষা ও চর্চার সংগ্রাম—এই বিষয়ের ওপর আলােকপাত করা হয়েছে বর্তমান প্রবন্ধের প্রথম অংশে। এই ভাষা-শিক্ষা ও চর্চার সংগ্রাম রােকেয়ার গদ্যভঙ্গি এবং গদ্য-কাঠামোর ওপর কিভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে, কিভাবে গড়ে উঠেছে রােকেয়ার গদ্যশৈলী তা নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়েছে প্রবন্ধের দ্বিতীয় অংশে।


রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন জন্মগ্রহণ করেছিলেন এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে। রােকেয়ার পূর্ব-পুরুষ বাবর আলি আবুল বাবর তাব্রিজি ছিলেন ইরানের তাব্রিজ শহরের অধিবাসী। তিনি আনুমানিক ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ভাগ্যান্বেষণে বিহার হয়ে রংপুরের পায়রাবন্দে আসেন। রােকেয়ার পিতা জহিরউদ্দিন আবু আলি হায়দার সাবের ছিলেন ইরান থেকে আগত বাবর আলি আবুল তাব্রিজির বংশধর। ‘রােকেয়ার পূর্ব-পুরুষগণ যে মুঘল সরকারের উচ্চ সামরিক পদেও নিয়ােজিত ছিলেন তা সরকারি নথিপত্রেও লিপিবদ্ধ আছে’ (মুহাম্মদ শামসুল ২০০৯ : ৫৭)। রােকেয়ার পিতা ছিলেন ধনাঢ্য জমিদার। ‘সাড়ে তিনশত বিঘা লা-খেরাজ জমির মাঝখানে ছিল রােকেয়ার পিতৃপুরুষের বাসভবন’ (শামসুন নাহার ১৯৩৭ : ৫)। রোকেয়ার পূর্ব-পুরুষ যেমন মুঘলদের সুবিধাভােগী ছিলেন, তেমনি পরবর্তীকালে তাঁরা ইংরেজ শাসকদেরও অনুগ্রহভােগী ছিলেন। সংগত কারণেই রােকেয়া বেড়ে উঠেছিলেন এক সর্বাত্মক বৈভব এবং আভিজাত্যের মধ্যে। এই আভিজাত্য তিনি পেয়েছিলেন পিতৃকুল এবং মাতৃকুল দুই দিক থেকেই। তাঁর মাতা ছিলেন ঢাকার বনেদি পরিবারের হোসেন উদ্দিন চৌধুরীর কন্যা রাহাতুন্নেসা। রোকেয়ার প্রথম জীবনীকার শামসুন নাহার, রােকেয়ার পারিবারিক বৈভব বােঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘রােকেয়ার হাত ধােয়ার জল ঢেলে দিত পরিচারিকা আলতার মা’ (শামসুন নাহার ১৯৩৭ : ৭)। এই বিত্ত-বৈভব এবং বংশগত আভিজাত্যের সঙ্গে তাঁর শিক্ষা গ্রহণের সম্পর্ক ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রােকেয়ার পূর্ব-পুরুষ বহিরাগত মুসলমান হওয়ায় এবং তারই উত্তরাধিকার হিশেবে জমিদার হওয়ায় মুসলিম ও বাংলাভাষী অধ্যুষিত পূর্ব-বাংলায় বাস করা সত্ত্বেও জীবন-যাপনে, চিন্তা-চেতনায়, শিক্ষা-দীক্ষায় এবং সংস্কৃতিতে তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলার অন্যান্য বহিরাগত অভিজাত মুসলমানের মতােই রােকেয়ার পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও যােগাযােগের ভাষা হিসেবে বাংলা কখনােই মর্যাদা পায় নি। তাঁদের দৃষ্টিতে বাংলা ছিল অনভিজাতদের ভাষা, সাধারণের ভাষা। ফলে সংগত কারণেই রােকেয়াকে শিক্ষাদীক্ষার ভাষা হিশেবে গ্রহণ এবং চর্চা করতে হয়েছে উর্দু, আরবি এবং ফারসিকে। রোকেয়ার ভাষাজ্ঞান ও চর্চা সম্পর্কে সমালােচক বলেছেন, ‘উর্দু ছিল রােকেয়ার বলতে গেলে মাতৃভাষা। উর্দুতে তিনি তাঁর রচনাও প্রকাশ করেছিলেন। ফারসিও তিনি খুব ভাল শিখেছিলেন’ (গোলাম মুরশিদ ২০০০ : ১২২)। রােকেয়া বা তাঁর মতো অভিজাত পরিবারের নারীশিক্ষা এবং ভাষাচর্চা সম্পর্কে সমালােচকের মন্তব্য লক্ষণীয় :

অভিজাত পরিবারে স্ত্রীশিক্ষা সম্পর্কিত ধারণা টিয়া পাখীর মত কোরান শরীফ পাঠ, নামাজ-রােজা প্রভৃতি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বিষয়ে জ্ঞান, রান্না, সেলাই-ফোঁড়াই, স্বামী বা নিকট আত্নীয়স্বজনকে চিঠি লিখতে পারা, বড়জোর দু-একখানা উর্দু-ফারসি পুঁথি-পুস্তক পড়ার ক্ষমতা—এর মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। বাঙালি মুসলমান পুরুষরাও তৎকালে উর্দু ভাষায় বাতচিৎ করাকেই প্রকৃত শরাফতের (আভিজাত্য) পরিচয় বলে মনে করত। মেয়েদের জন্য বাংলা শেখা তাে ছিল যাকে বলে হারাম! (মােরশেদ শফিউল ২০০৮ : ৮)।

উদ্ধৃতাংশের দুটি বিষয় লক্ষণীয়; প্রথমত, অভিজাত বিশেষত মুসলিম পরিবারের নারীশিক্ষা সম্পর্কিত চেতনার স্বরূপ এবং বাংলা ভাষা-বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দুটি প্রতিকূলতা, অন্ধতাকে রােকেয়ার মােকাবিলা করতে হয়েছে। রােকেয়ার বিভিন্ন ব্যক্তিগত রচনা থেকে একথা স্পষ্ট যে, তাঁর পরিবারে পুরুষদের আরবি-ফারসি-উর্দুর পাশাপাশি বাংলা শেখায় কোনাে বাধা ছিল না। এর কারণ হয়তাে দুটি—এক, পুরুষের বহুমাত্রিক জ্ঞানার্জন আবশ্যক বলে রােকেয়ার জমিদার বাবা এবং সমাজের সকলে মনে করতেন; দুই, জমিদারির সঙ্গে সম্পর্কিত বাংলাভাষী প্রজাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক যােগাযােগ রক্ষার জন্য বাংলা জানা দরকার ছিল। প্রথম কারণটি নিঃসন্দেহে পুরুষতান্ত্রিক এবং দ্বিতীয়টি অর্থনৈতিক। রােকেয়া এবং তাঁর বােন করিমুন্নেসা প্রথমটির বলি ছিলেন। আর দ্বিতীয়টি—অর্থনৈতিক সম্পৃক্তি—প্রশ্নটিই তখন অবান্তর ছিল নারীর জন্য। এতসব কিছুর মধ্যেও রোকেয়ার বড় বোধ করিমুন্নেসা বাবার খেয়ালি-স্নেহে বাংলা পড়ার এবং শেখার অনুমতি ও সুযােগ পেয়েছিলেন। কিন্তু বাধা আসলাে অন্য প্রান্ত থেকে। রােকেয়া তাঁর বােনের বাংলা ভাষাশিক্ষা ও তাতে প্রতিবন্ধকতার বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন এভাবে—

একদিন করিমুন্নেসা গােপনে একটা বটতলার পুঁথি লইয়া অস্ফুটস্বরে পড়িতেছিলেন,—

কোরানেতে আলাতালা কয়েছে এমতি,
ফাদ খুলী ফী ইবাদী ওয়াদ খুলী জান্নাতী

সেই সময়ে হঠাৎ পিতা আসিয়া পড়েন। ইহাতে তিনি অত্যন্ত ভয় পাইয়া ভাবিলেন যে, ‘আজ আমার সৰ্ব্বনাশ,—বুঝি এখনই আমাকে যমালয়ে যাইতে হইবে!’ কিন্তু না, শােকর আল্‌হামদোলিল্লাহ! পিতা কন্যার হাতে পুঁথি দেখিয়া রাগ করিলেন না, বরং ভয়ে মূর্ছিতপ্রায় বালিকাকে কোলে লইয়া আদর করিলেন এবং সেই দিন হইতেই একটু একটু ‘সাধুভাষা’র বাঙ্গালা পড়াইতে লাগিলেন। বাস্! আর যায় কোথা? যত মােল্লা মুরব্বির দল একযােগে চটিয়া উঠিলেন,—হেঁ-মেয়েকে বাঙ্গালা পড়ান হইতেছে!’ উহাদের নিন্দা ও বাক্য-জ্বালায় অধীর হইয়া পিতা তাহার পড়া বন্ধ করিয়া দিলেন’ (রােকেয়া ২০০৮ : ৩৮৯)।

বাংলা ভাষা শিখতে গিয়ে ‘যমালয়ে’ যাওয়ার ভয় এবং ‘মােল্লা মুরব্বি’-দের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রােকেয়াকেও নিশ্চয় পড়তে হয়েছে। কিন্তু বােন করিমুন্নেসা। এবং ভাই ইব্রাহিম সাবেরের সহযােগিতা, প্রশ্রয় এবং সান্নিধ্যে রােকেয়া বাংলা ভাষা শেখেন। উর্দু-আরবি-ফারসি-সর্বস্ব পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যে রােকেয়ার বাংলা ভাষা শেখা এবং পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার এক বিশেষ গদ্যকার হয়ে ওঠার বিষয়টি খুব একটা সরল নয়। বাংলা ভাষার শিক্ষাকে ধারণ, লালন এবং চর্চা করা রােকেয়ার জন্য ছিল যেন এক নিরন্তর সংগ্রাম। এই সংগ্রামকে আমরা বলতে চাই, এ-এক রাজনৈতিক সংগ্রাম। এই সংগ্রামের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য উদ্‌ঘাটনের পূর্বে রােকেয়ার সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত একটি উক্তি স্মর্তব্য :

অপর আত্মীয়গণ আমার উর্দু ও পারসী পড়ায় তত আপত্তি না করিলেও বাঙ্গালা পড়ার ঘাের বিরােধী ছিলেন। একমাত্র তুমিই বাঙ্গালা পড়ার অনুকূলে ছিলে।…চৌদ্দ বৎসর ভাগলপুরে থাকিয়া, বঙ্গভাষায় কথাবার্তা কহিবার একটি লােক না পাইয়াও যে বঙ্গভাষা ভুলি নাই, তাহা কেবল তােমারই আশীর্বাদে, অতঃপর কলিকাতায় আসিয়া ১১ বৎসর যাবৎ এই উর্দু স্কুল পরিচালনা করিতেছি; এখানেও সকলেই,—পরিচারিকা, ছাত্রী, শিক্ষয়িত্রী ইত্যাদি সকলেই উর্দুভাষিণী। প্রাতঃকাল হইতে রাত্রি পর্যন্ত উর্দু ভাষাতেই কথা কহিতে হয় (রােকেয়া ২০০৮ : ৭৫)।

উদ্ধৃতাংশটি রােকেয়া রচিত মতিচূর (১৯০৪) দ্বিতীয় খণ্ডের উৎসর্গপত্র থেকে নেওয়া। গ্রন্থটি তিনি বড় বােন করিমুন্নেসাকে উৎসর্গ করেছেন। উদ্ধৃতাংশে লক্ষ করার মতাে কয়েকটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত, চৌদ্দ বছর তিনি বিহারের ভাগলপুরে ছিলেন স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হােসেনের সঙ্গে। এই পরিবেশটি ছিল বাংলাবিবর্জিত। তাঁর বিয়ে হয়েছিল ঊর্দুভাষী সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। অর্থাৎ ‘স্বামীর’ ঘরে-পরিবারে বাংলার প্রচলন ছিল না। উর্দুর বাইরে যে-ভাষাটি চালু ছিল, তা হচ্ছে ইংরেজি। সমালােচকের মতে—

সাখাওয়াত উর্দুভাষী ছিলেন, আনুষ্ঠানিক বাংলা হয়তাে সামান্যই জানতেন। তবে তিনি হুগলিতে লেখাপড়া করেছেন এবং কবছর বঙ্গদেশে চাকরি করেছেন। সেই সুবাদে তিনি মৌখিক বাংলা হয়তাে জানতেন। কিন্তু তাঁর বাড়িতে বাংলা বলা হতাে না। স্বামীর বাড়িতে রােকেয়া যে কখনাে বাংলা বলার সুযােগ পাননি নিজেই তা বলেছেন মতিচূরে (গোলাম মুরশিদ ২০০০ : ১২৬)।

তবে বিহারে বাংলার প্রচলন ছিল না তা নয়। বিহারের একাংশের অধিবাসীর মধ্যে বাংলার প্রচলন ছিল, প্রবাসী বাঙালিও ছিলেন প্রচুর। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, রােকেয়ার স্বামী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। এই ঘরের স্ত্রী হিশেবে তাঁর চলা-চলতি, কথাবার্তা নিশ্চয় সাধারণ বাংলাভাষী মানুষের সঙ্গে থাকার কথা নয়। সুতরাং অনুমান করা যায়, ভাগলপুরে রােকেয়ার অন্তত মৌখিক বাংলায় ভাবপ্রকাশের মানুষের অভাব প্রকট ছিল। দ্বিতীয়ত, রােকেয়ার স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর যে কলকাতাবাস শুরু হয়, সেখানেও মৌখিক বাংলা ভাষা চর্চার সুযােগ ছিল না। কারণ রােকেয়ার স্কুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্রী থেকে শুরু করে পরিচারিকা পর্যন্ত সবাই ছিল উর্দুভাষী। এমনকি রােকেয়ার প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিই ছিল উর্দুমাধ্যম স্কুল। ‘১৯২৭ সালে তিনি ঘােষণা করেন, ৪০ জন বাংলাভাষী ছাত্রী পেলেই, বিদ্যালয়ে তিনি একটি বাংলা শাখা খুলবেন। বাংলা ভাষাভাষী (sic) মুসলমান বালিকাদের জন্য তখনাে কলকাতায় কোনাে বিদ্যালয় ছিল না। তা সত্ত্বেও বাংলা খােলার তার বাসনা কখনাে সফল হয়নি’ (গােলাম মুরশিদ ২০০০ : ১৩১)।


রোকেয়া তাঁর চিন্তাচর্চার ভাষা হিশেবে সহজেই বেছে নিতে পারতেন উর্দু, ফারসি বা ইংরেজিকে। কারণ ‘উর্দু ছিলাে রােকেয়ার বলতে গেলে মাতৃভাষা।…’


অর্থাৎ বাংলা ভাষা এবং তার চর্চার প্রতি রােকেয়ার ঐকান্তিক আগ্রহ ও আবেগ থাকলেও তাঁর পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা কখনােই বাংলা চর্চার অনুকূলে ছিল না। রােকেয়ার বিচিত্র আত্মভাষ্য, জীবনী এবং পর্যালােচনায় একথা স্পষ্ট যে, রােকেয়ার বাংলা ভাষা-চর্চা ও লালন করার বিষয়টি ছিল রীতিমতো এক নিরন্তর সংগ্রামের বিষয়। আর এই সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁর প্রবল আবেগ, আগ্রহ এবং রাজনৈতিকতা। কারণ সংগ্রাম, আবেগ, আগ্রহ কোনাে ঐশী ব্যাপার নয়। এগুলাের উৎস হচ্ছে ব্যক্তির রাজনৈতিক উপলব্ধি। ব্যক্তির রাজনৈতিকতা বা রাজনৈতিক আগ্রহ বলতে কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত আদর্শ এবং সেই মােতাবেক দলগত বা সাংগঠনিক তৎপরতাকেই বােঝায় না। জ্ঞানচর্চাও রাজনৈতিকতার একটি বিষয়। কে, কী জ্ঞান, কী উদ্দেশ্যে, কিভাবে, কোন ভাষায় প্রকাশ করবে তাও এক রাজনৈতিকতাই বটে।। মোদ্দা কথা, রাজনৈতিকতা হচ্ছে বিশেষ বিষয়ের প্রতি ব্যক্তির বিশেষ পক্ষপাত।অনেকগুলাে বিকল্প থেকে ব্যক্তি যখন কোনো এক বিশেষ আদর্শ বা বিষয়ের প্রতি তার আগ্রহ, উৎসাহ, উদ্যম এবং তৎপরতা প্রদর্শন করে, তখন তা আর নিরীহ বিষয় থাকে না। তা হয়ে ওঠে ওই বিশেষ বিষয়ের প্রতি ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানেরই নামান্তর। রােকেয়ার বাংলা ভাষায় চিন্তাচর্চাও এক রাজনৈতিক অবস্থান। কারণ রোকেয়া তাঁর চিন্তাচর্চার ভাষা হিশেবে সহজেই বেছে নিতে পারতেন উর্দু, ফারসি বা ইংরেজিকে। কারণ ‘উর্দু ছিলাে রােকেয়ার বলতে গেলে মাতৃভাষা।…ফারসিও তিনি খুব ভাল শিখেছিলেন’ (গােলাম মুরশিদ ২০০০ : ১২২)। এমনকি রােকেয়ার ইংরেজি ভাষার দক্ষতা ছিল প্রথম শ্রেণির। ইংরেজিতে তিনি Sultana’s Dream (১৯০৮) গ্রন্থটিও রচনা করেন। এই গ্রন্থের ইংরেজি ভাষার প্রশংসা অনেকেই করেছেন। যেমন—‘পুস্তকখানি যেরূপ সুমার্জিত বিশুদ্ধ ইংরেজি ভাষায় লেখা, সেরূপ ভাষা আয়ত্ত করা আমাদের অনেক ইংরেজি শিক্ষিত যুবকের পক্ষে কঠিন’ (আবুল হুসেন, বা. ১৩২৮)। তা সত্ত্বেও রােকেয়া স্থায়ীভাবে উর্দু, ফারসি বা ইংরেজি ভাষায় চিন্তাচর্চা করতে যান নি। তিনি বাংলা ভাষাকেই তাঁর চিন্তাচর্চার ও চিন্তা-প্রকাশের মাধ্যম হিশেবে বেছে নিয়েছেন। নানা-বিকল্প থেকে একটি ভাষাকে চিন্তাচর্চা ও চিন্তা-প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়া—এটিই যে রােকেয়ার চিন্তা-প্রকাশ ও প্রচার-সংশ্লিষ্ট ভাষাগত রাজনীতি, তা স্পষ্ট হয়েছে ইংরেজিতে লিখিত Sultana’s Dream-এর স্বকৃত বাংলা অনুবাদের মধ্য দিয়ে। বাংলা ভাষায় এ-এক বিরল দৃষ্টান্ত। বাঙালি লেখক-চিন্তকরা সাধারণত বাংলায় লিখে পরে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। এর পিছনে কাজ করে দুটি বিষয়; এক, বাংলা ভাষা-বিষয়ক হীনম্মন্যতা ও ইংরেজি ভাষা-বিষয়ক উচ্চাদর্শ এবং দুই, আন্তর্জাতিক চিন্তা-পরিমণ্ডলে নিজের চিন্তার প্রচার ও প্রসারের আগ্রহ। কিন্তু রােকেয়ার মধ্যে এ-দুটির কোনােটিই ছিল না। তিনি যা করেছেন তাকে সমালােচকগণ বলেছেন ‘উল্টো’ কাজ। সমালােচকের ভাষায়—’তাঁর Sultana’s Dream বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনূদিত নয়, বরং উল্টো ইংরেজি থেকে বাংলায় অনূদিত। তাঁর আগে আরও দু-তিনজন বাঙালি মহিলার ইংরেজি রচনা প্রকাশিত হয়েছে বটে, কিন্তু বাংলায় তাঁরা লেখেননি’ (গােলাম মুরশিদ ২০০০ : ১২২)।

রােকেয়ার এই স্বরচিত ইংরেজি থেকে বাংলায় স্বকৃত অনুবাদ—সমালােচক যাকে ‘উল্টো’ বলেছেন—এটি কোনাে খেয়ালি বিষয় বা ভাষা-দক্ষতা প্রদর্শনের বিষয় নয়। এটি রােকেয়ার চিন্তার উদ্দেশ্যের সঙ্গে জড়িত। রােকেয়া কাজ করতে চেয়েছিলেন মূলত বাঙালি মুসলমান নারী-সমাজের মধ্যে; যদিও তাঁর দৃষ্টি ও উদ্দেশ্যের মধ্য থেকে অন্য সম্প্রদায়ের নারীমুক্তির অভিপ্রায়ও বাদ যায় নি। তবে তাঁর মূল উদ্দেশ্য যে নারী-জাগরণ একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সমালােচকের ভাষায়—

একথা ঠিক, তার কাজ ছিল বিশেষভাবে মুসলমান মেয়েদের মধ্যেই। কিন্তু তার ভাবনায় ছিল সব ধর্মের সব সম্প্রদায়ের মেয়েদের চোখের জল মুছিয়ে দেবার আকুলতা। মেয়েদের জন্যে তার ভালােবাসার মধ্যে বয়সের শ্রেণীর সম্প্রদায়ের কোনাে ভেদ ছিল না’ (সুতপা ২০০২ : ৮)।

রােকেয়া বুঝেছিলেন যে, তিনি যে-নারীসমাজের সর্বাত্মক মুক্তি কামনা করেন, তারা বাঙালি এবং বাংলাভাষী। বাংলাভাষী অঞ্চলে বেড়ে ওঠা রােকেয়া তাঁর জাগরণী চিন্তাকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন মূলত বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যে। এজন্য তিনি সাধারণ বাঙালি মুসলমানের ভাষা বাংলাকেই বেছে নিয়েছিলেন তাঁর চিন্তাচর্চার ভাষা হিশেবে। অর্থাৎ গণ-উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা থেকে রােকেয়া গণমানুষের ভাষাকে চিন্তাচর্চার আশ্রয় হিশেবে বেছে নিয়েছিলেন। রােকেয়ার চিন্তা যেহেতু বহিরাগত চিন্তা নয়, সহজ কথায় পাশ্চাত্য চিন্তা নয় বা প্রত্যক্ষত পাশ্চাত্য চিন্তার স্থানীয় ভাষাপ্রকাশ নয়; উদ্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র যেহেতু বৈশ্বিক নয় বরং স্থানীয়, সেহেতু তিনি ভাষার প্রশ্নেও দারুণভাবে স্থানীয় এবং গণপ্রবণ। রােকেয়ার চিন্তার স্বকীয়তা এবং স্থানীয়তা সম্পর্কে সমালােচক যথার্থই বলেছেন যে, ‘রােকেয়ার নারীমুক্তি সম্পর্কিত চিন্তাধারা কোনো মতবাদ থেকে ধার করা নয়। এটি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব এবং নারীবাদ সম্পর্কিত সকল মতবাদ থেকে স্বতন্ত্র’ (মােতাহার হােসেন ২০০৮ : ২৮৬)। এই নিজস্বতা, স্থানীয়তা, স্বাদেশিকতা, মৃত্তিকাস্পষ্টতা রােকেয়াকে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও (প্রবন্ধের শুরুতে উল্লেখিত) স্থানীয় জনগােষ্ঠীর প্রধান, শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় ভাষা বাংলায় তাঁর চিন্তার প্রকাশকে অনিবার্য করে তুলেছে। বহুমানুষের উপকারার্থে, কল্যাণার্থে রােকেয়া বহুমানুষের ভাষায় চিন্তাচর্চা করেছেন। এ-কারণেই তিনি ইংরেজিতে লিখে পরে তা নিজেই বাংলায় বহুমানুষের জন্য অনুবাদ করেন। আবার তাঁর উদ্দেশ্য, কাজ ও চিন্তার সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ রচনাকে বাংলায় অনুবাদ করেন। তিনি যখন মেরি কারেলির The Murder of Delicia-এর বাংলা অনুবাদ করেন, তখন এই কারণেই অনুবাদ করেন যে, এর সঙ্গে রােকেয়ার উদ্দেশ্য, চেতনা ও কর্মগত সাদৃশ্য রয়েছে। অর্থাৎ যেসব বাংলাভাষী ইংরেজি জানে না, অথচ তাদের এ-সম্পর্কে জানানাে প্রয়ােজন, এই জানানাের প্রয়ােজনেই তিনি বাংলা ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন।’ অনুবাদের কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে রােকেয়া বলেন :

ডেলিশিয়া কাহিনীর সহিত আমাদের নারীসমাজের এমন চমৎকার সাদৃশ্য আছে যে গ্রন্থখানি পাঠকালে অবাক হইয়া বলিতে ইচ্ছা করে—

এ পােড়া ভারত অন্তঃপুরের কথা।
জানিল কি ছলে মেরী কারেলী।

…এই চমৎকার উপন্যাসের অবিকল অনুবাদ করা সহজ ব্যাপার নহে, তবু ইহা গল্পাংশের অনুবাদ পাঠিকা ভগিনীদিগকে উপহার দিবার লােভ সম্বরণ করিতে পারিতেছি না (রােকেয়া ২০০৮ : ১৩০)।

রােকেয়ার সমগ্র রচনা লক্ষ করলে একথা স্পষ্ট যে, সাহিত্যাদশের বিচারে তিনি ছিলেন উপযােগবাদী। ‘কলাকৈবল্যদের নীতিতে তাঁর আস্থা ছিল না বলে মনে হয়’ (মুহম্মদ শামসুল ২০০৯ : ২১৩)। ‘বিশুদ্ধ শিল্পসৃষ্টি তাঁর লক্ষ্য ছিলো না’ (হুমায়ুন ২০১১ : ২৮৪)। রােকেয়ার উদ্দেশ্যবাদিতার অভিমুখটি ছিল সর্বদা বাংলাভাষী বিশেষত মুসলিম নারী-পুরষ-সমাজ। এই বাংলাভাষী ‘প্রচুরতম’ মানুষের ‘প্রভূততম’ উন্নতি সাধনের জন্য রোকেয়া ভাষার প্রশ্নে ঘরকে বাহির এবং বাহিরকে ঘর করেছেন। অর্থাৎ তাঁর পরিবার-পরিপার্শ্বে যে ভাষা (উর্দু-ফারসি) ‘নিজের’ (self), তাকে তিনি চিন্তাচর্চার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ না করে, যে-ভাষা (বাংলা) তাঁর ‘অপর’ (Other), তাকেই তিনি ‘নিজ’ করে নিয়েছেন। বাংলাভাষা হয়ে উঠেছে রােকেয়ার নারীবাদী চেতনার রাজনৈতিক হাতিয়ার। এই যে, বহুমানুষের কল্যাণের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিশেবে রােকেয়া বাংলা ভাষাকে ব্যবহার এবং চর্চা করেছেন, এর একটা প্রত্যক্ষ প্রভাৰ তাঁর গদ্যরীতি বা গদ্যভঙ্গিতে পড়েছে। রােকেয়ার জনগণতান্ত্রিক চেতনা তাঁর গদ্যের চাল-চলনকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে। উদ্দেশ্যবাদিতার বিবেচনায় এবং নির্মেদ কাঠামাের বিবেচনায় রােকেয়ার গদ্যকে বলা হয়, ‘কেজো গদ্য’ অর্থাৎ কাজ করার বা কাজ আদায়ের গদ্য (তবে এ গদ্য বিদ্যাসাগরের কেজো গদ্যের অনুরূপ নয়। এ বিষয়ে পরে আলােচনা করা হয়েছে)। সাধারণ নারী-পুরুষ সমাজের জাগরণ ঘটানাের উদ্দেশ্যে কিভাবে রােকেয়ার গদ্যের চালকে প্রভাবিত করেছে, তার স্বরূপ বিশ্লেষণই এখন আমাদের উদ্দেশ্য।


ভাষা হচ্ছে বিষয়কে, লেখকের চেতনাকে, উদ্দেশ্যকে ধারণ করার আধার বা কাঠামাে। ভাষার খাপ বা কাঠামাে কেমন হবে তা লেখকের প্রকাশিতব্য বিষয়, চেতনা এবং উদ্দেশ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে কোনাে লেখকই—তা তার বিষয়, চেতনা বা উদ্দেশ্য যতই অভিনব হােক না কেন—সৃষ্টিছাড়া, অলৌকিক, অভূতপূর্ব, ঐশী কোনাে ভাষাকাঠামাে বা ভাষাভঙ্গি নির্মাণ করতে পারেন না। প্রথাগত ভাষাকাঠামাের মধ্যে নতুন চেতনার লেখক নতুন সুর, অভিঘাত, ভাঙচুর, সজ্জা ইত্যাদির অবতারণা করে থাকেন। বাংলা ভাষার গদ্যের ইতিহাসে রােকেয়ার গদ্যভঙ্গিকে বিবেচনার সময়ও বিষয়টি স্মরণ রাখা দরকার। রােকেয়া বাংলা গদ্যের ইতিহাসকে আমূল বদলে দিয়ে পূর্বাপর সম্পর্কহীন নতুন কোনাে গদ্য-কাঠামাের অবতারণা করেন নি। তবে তাঁর গদ্য পূর্ববর্তী, সমকালীন ও পরবর্তী গদ্যকারদের থেকে চলনে-বলনে-উদ্দেশ্যে অর্থাৎ অন্তঃপ্রকৃতিতে যে ভিন্ন, ব্যক্তিত্বপূর্ণ, নিজস্ব একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অথচ রোকেয়ার রচনা নিয়ে যেসব আলোচক-গবেষক আগ্রহী হয়েছেন, তাঁরা কেউই রােকেয়ার গদ্যের স্বাতন্ত্র্য তাে দূরে থাক, তাঁর গদ্যরীতির ভিতর-বাড়িতে ভালাে মতাে দৃষ্টিও দেন নি। মােটামুটিভাবে সবাই চকিত মন্তব্য করে চলে গিয়েছেন; কেউই স্বাতন্ত্র্যের সূত্রাবলি একত্র করে তাঁর গদ্যের প্রাণ-প্রকৃতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত টানেন নি। সবাই তাঁর রচনার শাঁস (নারীবাদী চেতনা) নিয়ে কথা বলেছেন, রস (শৈল্পিকতা) নিয়ে কথা বলেন নি।

রোকেয়া যখন গদ্যে তাঁর চিন্তাপ্রকাশ শুরু করেন, তখন বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমচন্দ্রের যুগের অবসান ঘটেছে, সূচিত হয়েছে রবীন্দ্র-গদ্যের যুগ। রবীন্দ্রনাথের হাতে বাংলা গদ্য হয়ে উঠেছে নির্ভার, গতিশীল, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রোমান্টিক ভাবাবেগ ধারণের ক্ষমতাসম্পন্ন। রােকেয়ার প্রথম গ্রন্থ মতিচূর (প্রথম খণ্ড) প্রকাশিত হয় ১৯০৪ সালে, যার আগেই রবীন্দ্রনাথের শক্তিশালী উপন্যাস—যাকে রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক উপন্যাস—চোখের বালি (১৯০৩) প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং বুদ্ধদেব বসু কথিত ‘রবীন্দ্র-চোরাবালি’-তে (ভাব এবং ভাষা উভয় অর্থেই) পা দেওয়াটা সমকালীন অধিকাংশ লেখকের মতাে রােকেয়ার পক্ষেও অস্বাভাবিক হতো না। তা ছাড়া রােকেয়া যে রবীন্দ্রনাথের নিষ্ঠপাঠক ছিলেন তা বােঝা যায় মতিচূর প্রথম খণ্ডের ‘অর্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের মানসী (১৮৯০) কাব্যের ‘নবদম্পতির প্রেমালাপ’ কবিতার এবং বিভিন্ন স্থানে রবীন্দ্রনাথের রচনার বিস্ময়কর প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতির ব্যবহার থেকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও রােকেয়া সেদিকে যান নি। ‘রবীন্দ্রযুগের অধিবাসী হলেও তাঁর মনােগঠনে বঙ্কিম-বিদ্যাসাগরের ছাপই স্পষ্ট ও প্রবল’ (আবদুল মান্নান ১৯৯৩ : ৫৮)। রােকেয়া কাজ করতে চেয়েছিলেন। ফলে তিনি কাজের জন্য ঊনবিংশ শতাব্দীর দুই কর্মী-সাহিত্যিকের—বিদ্যাসাগর ও বঞ্চিচন্দ্রের গদ্য-কাঠামােকেই বেছে নিয়েছিলেন। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, রােকেয়া কি তবে গদ্যভঙ্গি বা গদ্য-কাঠামাের দিক থেকে একালে বসে সেকালকে হুবহু অনুসরণ এবং অনুকরণ করেছেন? তা নিশ্চয় নয়। রােকেয়ার হাতে ওই সাবেকি রীতিই নিজের বিষয়, চেতনা, উদ্দেশ্য-আদর্শের চাপে-তাপে-ভাঁপে এক নবরূপপ্রাপ্ত হয়েছে। বিষয়, চেতনা, উদ্দেশ্য-আদর্শকে আমরা পূর্বে বলেছি বহুমানুষের মুক্তি, জাগরণ, হিত-সাধনের রাজনৈতিক চেতনা। এটাকে গণ-যােগাযােগের আকাঙ্ক্ষাও বলা যায়। এই গণযােগাযােগ ও গণজাগরণের আকাঙ্ক্ষা রােকেয়ার গদ্যের মধ্যে কী স্বাতন্ত্র্য এনেছে, এই স্বাতন্ত্র্যের চিহ্নগুলাে কী কী—এটিই আমাদের অন্বিষ্ট। তবে স্মর্তব্য যে, এখানে ‘গণ’ বলতে সংগত কারণেই মার্কসীয় রাজনৈতিক চেতনা দ্বারা সংজ্ঞায়িত ‘গণ’-কে বোঝাবে না। আবার ‘গণ বলতে জনমানুষের উপর থেকে তলানি পর্যন্ত সব বাংলাভাষী জনগণকেও বােঝাবে না। কারণ স্মরণ রাখা দরকার যে, রােকেয়ার কর্মক্ষেত্র ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু সমাজ।


বিদ্যাসাগরীয় সাহিত্যিক এবং পুঁথিগত গদ্যের মধ্যে মৌখিক, সরস, প্রাণবন্ত, বৈঠকি গদ্যের স্বাদের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন।


রােকেয়া বাংলা ভাষায় চিন্তাচর্চা করেছেন বাঙালির অন্তঃপুরের জাগরণ ঘটাতে। কিন্তু যে-গদ্যরীতিটিকে গ্রহণ করেছিলেন তা ছিল বিদ্যাসাগরীয়। এ কথার মধ্যে একটু সরলীকরণ রয়েছে। কারণ বিদ্যাসাগর সবসময় একই গদ্যরীতিতে চিন্তা প্রকাশ করেন নি। তাঁর বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭) বা শকুন্তলা-র (১৮৫৪} গদ্যরীতি আর সমাজ-সংস্কারমূলক রচনাগুলাের গদ্যরীতি নিশ্চয় এক নয়। বিদ্যাসাগরের সব গদ্যই ‘কজো গদ্য’—একথার মধ্যেও সাধারণীকরণের সমস্যা রয়েছে। মূলত বিদ্যাসাগরের সমাজ-সংস্কারমূলক রচনাগুলোর গদ্যই কেজো গদ্য। রোকেয়াও যখন সমাজ সংস্কারই করতে চেয়েছেন, তখন সংগত কারণেই রোকেয়ার পক্ষে বিদ্যাসাগরীয় ওই ‘কেজো গদ্যে’-র কাঠামােটি অনুসরণ করাটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু মৌখিকভাবে বাংলা গদ্য ব্যবহারের সুযােগের অভাবেই হােক, আর পুঁথিগত বাংলা-ভাষাচর্চার কারণেই হােক, রোকেয়া বিদ্যাসাগরের ‘কেজো গদ্যে’-র—যা কিনা মুখের ভাষার কিছুটা কাছাকাছি—কাঠামােটিকে গ্রহণ করেন নি। তিনি গ্রহণ করেছিলেন বিদ্যাসাগরের তৎসম শব্দবহুল, জটিল-যৌগিক বাক্যের বহুলতায় বিশিষ্ট, প্রথাগত সাহিত্যিক সাধু গদ্য-কাঠামােটিকে। এই বিদ্যাসাগরীয় সাহিত্যিক সাধুগদ্যের। কাঠামাের মধ্যেই রােকেয়া অধিকতর যােগাযোগ-সক্ষমতার গুণকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ বিদ্যাসাগরীয় সাহিত্যিক এবং পুঁথিগত গদ্যের মধ্যে মৌখিক, সরস, প্রাণবন্ত, বৈঠকি গদ্যের স্বাদের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। রােকেয়া কেন এমন কৌশল অবলম্বন করেছেন, তা তাঁর চিন্তাচর্চার উদ্দেশ্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে। বহুমানুষের ব্যবহৃত বাংলাকে রােকেয়া চিন্তাচর্চার মাধ্যম হিশেবে নিয়েছেন, তাঁর চিন্তাকে বহুমানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এই বহুমানুষের বাসনাই তাঁর গদ্যের ভঙ্গিকে শাসন করে গদ্যকে গণযােগাযােগের বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট করে তুলেছে। একটি উদাহরণ দেখা যেতে পারে—

কিন্তু ডাক্তারী জান বা না জান, রােগীর সেবা সকলকেই করিতে হয়। এমন দুহিতা কে আছেন, যিনি অশ্রুধারায় পদ প্রক্ষালন করিতে করিতে ভাবেন না যে, ‘এত যত্ন পরিশ্রম সব ব্যর্থ হ’ল; আমার নিজের পরমায়ুঃ দিয়াও যদি মাকে বাঁচাইতে পারিতাম।’ এমন ভগিনী কে আছেন, যিনি পীড়িত ভ্রাতার পার্শ্বে বসিয়া অনাহারে দিন যাপন করেন না? এমন পত্নী কে, যিনি স্বামীর পীড়ার জন্য ভাবিয়া ভাবিয়া নিজে আধমরা হন না? এমন জননী কে আছেন, যিনি জীবনে কখনাে পীড়িত শিশু কোলে লইয়া অনিদ্রায় রজনী যাপন করেন নাই। যিনি কখনও এরূপ রােগীর সেবা করেন নাই, তিনি প্রেম শিখেন নাই । না কাঁদিলে প্রেম শিক্ষা হয় না (রােকেয়া ২০০৮ : ৫৪)।

উদ্ধতাংশটি বিদ্যাসাগরীয় রীতির তৎসম শব্দে আকীর্ণ। তবু ধ্রুব পদের ব্যবহার, বলার ভঙ্গি এবং বিষয়ের প্রত্যক্ষতার প্রযােজনায় উদ্ধৃতাংশের গদ্যরীতিটি সরলতা এবং সহজতায় বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে। রােকেয়ার সমগ্র গদ্যের মধ্যে উপযুক্ত বৈশিষ্ট্য ক্রিয়াশীল থাকায় অধিকাংশ সমালোচক রােকেয়ার গদ্য সম্পর্কে বলেছেন যে, তাঁর গদ্য সাধু হলেও সহজ-সরল। একজন সমালােচকের পর্যবেক্ষণ স্মৰ্তব্য :

বাংলা গদ্যের যে-দ্বিভাজন—সাধুরীতি ও চলতিরীতি—কয়েক দশক ব্যেপে তা স্রোতঃশীলভাবে একসঙ্গেই চলতে থাকে।…রােকেয়া মূলত ঐ সাধু গদ্যেই লিখেছেন, কিন্তু সহজ সরল অকাব্যিক কিন্তু সংহত গদ্যে। আর-একটু নির্দিষ্ট করে বললে বিশেষণটি হবে এরকম—রােকেয়া সহজ সরল সাধু গদ্যেই লিখেছেন মূলত (আবদুল মান্নান ১৯৯৬ : ৬৭)।

ব্যঙ্গ-পরিহাস গদ্যকে সরস, প্রাণদ এবং দীপ্তিমান করে তােলে। ব্যঙ্গ-পরিহাস গদ্যকে পাঠকের সঙ্গে মিতালি পাতাতে সাহায্য করে। ব্যঙ্গ-পরিহাসের আরেক কাজ হচ্ছে, এটি লেখকের কথার খরচা কমিয়ে দেয়। যা অনেক কথা দিয়ে বােঝানাে হতো বা বােঝানাে যেত না, তা ক্ষুদ্র ব্যঙ্গ-পরিহাস দিয়ে সম্ভব। এতে গদ্যের দীপ্তি যেমন বাড়ে, তেমনি পাঠকের মন জয়ের মধ্য দিয়ে পাঠক ও লেখকের মধ্যে আন্তরিক সম্বন্ধ স্থাপনও সহজ হয়। ব্যঙ্গ-পরিহাসের সঙ্গে গণমানুষের একটি সম্পর্ক রয়েছে। এর প্রমাণ বাংলা প্রহসনগুলাে। প্রহসনের গদ্যও গণমুখী। অর্থাৎ, প্রহসনের গদ্য হয় সাধারণত মৌখিক ভাষারীতির গদ্য। ভাষা যখন মুখের ভঙ্গির কাছাকাছি চলে আসে, ব্যঙ্গ-পরিহাস তখন তত জমে ওঠে। ব্যঙ্গ-পরিহাস তৈরির আরেকটি ভাষাভঙ্গি রয়েছে; সেটি হচ্ছে, ভাষাকে বিষয়ের চেয়ে উচ্চতায় এবং অতিরিক্ত গাম্ভীর্যে নিয়ে যাওয়া। রােকেয়ার গদ্যে পর্যাপ্ত ব্যঙ্গ-পরিহাসের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এই ব্যঙ্গ-পরিহাস রােকেয়ার গদ্যকে অধিকতর যােগাযােগ-সক্ষম করে তুলেছে। তাঁর গদ্যকে পাঠকের ঘরের মধ্যে স্থান দিয়েছে। ব্যঙ্গ-পরিহাস তৈরির জন্য রােকেয়াকে তাঁর গদ্য-কাঠামােয় কোনাে পরিবর্তন আনতে হয় নি। তাঁর নিজস্ব গদ্যভঙ্গির মধ্যেই তিনি যত্রতত্র ব্যঙ্গ-পরিহাসের অবতারণা করেছেন। তাছাড়া রােকেয়ার চিন্তা-কাঠামাের রাজনৈতিকতার কারণে অর্থাৎ তাঁর চিন্তাচেতনার মধ্যে পক্ষ-বিপক্ষের সুস্পষ্ট অবস্থান থাকার কারণে এই ব্যঙ্গ-পরিহাস কখনাে কখনাে কশাঘাত এবং শ্লেষে রূপান্তরিত হয়েছে। সমালােচক যথার্থই বলেছেন যে :

রােকেয়া যাদের ভালােবাসেন, তাদেরই তিনি জাগাতে চান, আর তাই, তাদের প্রতিই তাঁর ব্যঙ্গ। তাঁর ব্যঙ্গ বাঙালির প্রতি, তাঁর ব্যঙ্গ মুসলমানের প্রতি, তাঁর ব্যঙ্গ মেয়েদের প্রতি। আর পুরুষের প্রতি ব্যঙ্গ বললে কম বলা হয়, তাকে বলা যায় কশাঘাত।…মেয়েদের প্রতি বিদ্রূপ তাে অবরােধবাসিনী’র পাতায় পাতায়, তবে সে বিদ্রূপে তলায় তলায় আছে তাদের পুরুষ প্রভুদের প্রতি তীব্র শ্লেষ (সুতপা ২০০২ : ৩৭-৩৮)।

এই ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, শ্লেষ, কশাঘাত, পরিহাস রোকেয়ার গদ্যকে অধিকতর পাঠক-ঘনিষ্ঠ এবং সহজবোধ্য করে তুলেছে। এজন্য রােকেয়াকে মূল গদ্য-কাঠামােতে কোনাে পরিবর্তন আনতে হয় নি। প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত লক্ষণীয় :

স্বামী যখন পৃথিবী হইতে চন্দ্র ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন স্ত্রী এখন একটা বালিশের ওয়ারের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ (সেলাই করিবার জন্য) মাপেন! স্বামী যখন কল্পনা-সাহায্যে সুদূর আকাশে নক্ষত্রমালা বেষ্টিত সৌরজগতে বিচরণ করেন, সূৰ্যমণ্ডলের ঘনফল তুলাদণ্ডে ওজন করেন এবং ধূমকেতুর গতি নির্ণয় করেন, স্ত্রী তখন রন্ধনশালায় বিচরণ করেন, চাউল ডাল ওজন করেন এবং রাধুনীর গতি নির্ণয় করেন। বলি জ্যোতিৰ্ব্বেত্তা মহাশয়, আপনার পার্শ্বে আপনার সহধর্মিণী কই! বােধহয়, গৃহিণী যদি আপনার সঙ্গে সূৰ্য্যমণ্ডলে যান, তবে তথায় পঁহুছিবার পূর্বেই পথিমধ্যে উত্তাপে বাষ্পীভূত হইয়া যাইবেন! তবে সেখানে গৃহিণীর না যাওয়াই ভাল!! (রোকেয়া ২০০৮ : ৪৫-৪৩)।

ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, শ্লেষ আর কশাঘাতের অপূর্ব মিশেলে উদ্ধৃতাংশের গদ্য উপভােগ্য এবং অধিকতর যােগাযোগক্ষম হয়ে উঠেছে; যদিও এর গদ্য-কাঠামােটি বিদ্যাসাগরীয় ধ্রুপদি রীতির।

রােকেয়ার গদ্যের পূর্বাপর লক্ষ করলে একটি ক্রমপরিবর্তন সহজেই চোখে পড়ে। এই পরিবর্তনটি ‘কঠিন’ থেকে ‘সহজ’-এর দিকে যাওয়ার সাধনা দ্বারা চিহ্নিত। এই বিবর্তনটি এক থেকে বহুর দিকে, ব্যক্তি থেকে গণের দিকে যাওয়ার বাসনা দ্বারা চিহ্নিত। রােকেয়ার প্রথম গ্রন্থ মতিচূর (১৯০৪) প্রথম খণ্ড মােটামুটিভাবে একটি বিশুদ্ধ প্রবন্ধ গ্রন্থ। কোথাও কোথাও কথকতার বিবরণ উঁকিঝুঁকি দিয়েছে হয়তো। কিন্তু দ্বিতীয় গ্রন্থ মতিচূর (১৯২২) দ্বিতীয় খণ্ডের রচনাগুলির অধিকাংশই কাহিনি ও বিবরণের দিকে ঝুঁকেছে। ‘শিশু পালন’ এবং ‘নূর-ইসলাম’ ছাড়া আর সব রচনাই—’সৌরজগত’, ‘সুলতানার স্বপ্ন’, ‘ডেলিশিয়া হত্যা’, ‘জ্ঞানফল’, ‘নারী-সৃষ্টি’, ‘নার্স নেলী’, ‘মুক্তিফল’—মূলত কাহিনিপ্রধান। আর পরবর্তী রচনা অবরােধবাসিনী (১৯৩১)-তাে সম্পূর্ণ ঘটনা-ভিত্তিক রচনা। এসব রচনায় বহুবিচিত্র মানুষ এসেছে তাদের স্বরূপে। রােকেয়ার প্রথম গ্রন্থ মতিচূর প্রথম খণ্ডকে বলা যায় তাঁর চিন্তার প্রতিপাদ্য; আর অন্য রচনাগুলাে যেন প্রমাণ। মতিচূর প্রথম খণ্ডে তিনি নারীর পশ্চাৎপদতা এবং এ-থেকে মুক্তির সূত্র নির্দেশ করেছেন এবং পরবর্তী রচনাগুলােতে তিনি এর বাস্তব প্রয়ােগ দেখিয়েছেন নানা ঘটনার প্রযােজনায়। কাহিনিবিবরণ বা বহুমানুষের ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে রোকেয়ার গদ্যে এসেছে একটি কাঠামােগত ও অন্তর্গত পরিবর্তন। মতিচূর দ্বিতীয় খণ্ডের ‘সৌরজগত’ রচনাটিতে—যাকে আবদুল মান্নান সৈয়দ ছােটগল্প বলেছেন—সংলাপের ভাষায় স্থানে স্থানে চলতি ভাষারীতির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যদিও সংলাপের ভাষা সাধারণত চলতি ভাষারীতির হয়, তবুও রােকেয়ার পূর্ববর্তী রচনাগুলির সংলাপের ভাষাও সাধুরীতিতে রচিত। এরকম চলতিরীতির সংলাপ ‘নার্স নেলী’ (আবদুল মান্নান সৈয়দের মতে এটিও ছোটগল্প) রচনাটিতেও লক্ষ করা যায়। আবার একই গ্রন্থের ‘নারী-সৃষ্টি’, ‘ডেলিশিয়া হত্যা’, ‘জ্ঞানফল’ ইত্যাদি রচনার সংলাপের ভাষাও সাধুরীতির অর্থাৎ সেখানে সংলাপের ভাষায় কেবল ক্রিয়া ও সর্বনামের পূর্ণরূপই ব্যবহৃত হয় নি, বর্ণনার ভাষার এবং সংলাপের ভাষার শব্দচয়নে তৎসম শব্দবহুলতা এবং বাক্যের দীর্ঘত্ব লক্ষ করা যায়। মতিচূর দ্বিতীয় খণ্ডে রােকেয়ার গদ্যের মধ্যে একটি দোলাচল বা পরিবর্তন-অপরিবর্তনের দ্বিধা ক্রিয়াশীল ছিল। এই দ্বিধার মধ্য দিয়েই এই পর্বে রােকেয়ার গদ্য, পূর্ববর্তী গদ্য-কাঠামাে থেকে আরাে কিছুটা সহজবােধ্যতার দিকে ঝুঁকেছে। এই সহজবােধ্যতা অবশ্য যতটা না গদ্য-কাঠামাের কারণে হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে কাহিনিভিত্তিকতার কারণে। অবরােধবাসিনী-র গদ্যে সুস্পষ্ট কাঠামাের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এ পর্বে বাক্যের কাঠামােতে এবং শব্দচয়নে এসেছে গুণগত পরিবর্তন। সরল বাক্যের অধিক সমাবেশ, প্রয়ােজন মতাে মৌখিক শব্দের সন্নিবেশ, অপ্রচলিত ও পুঁথিগত তৎসম শব্দের কম ব্যবহার ইত্যাদি অবরােধবাসিনী-র গদ্যকে অধিকতর যােগাযােগক্ষম করে তুলেছে। ‘খাড়া’, ‘দম’, ‘তা’, ‘চেঁচানাে’, ‘চোর চোট্টা’, ‘ছারখার’, ‘বহাল তবিয়ত’—এধরনের মৌখিক শব্দের অনুপ্রবেশ অবরােধবাসিনী-র গদ্যে প্রায়শই ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন—

প্রায় ২৫ বৎসর পূর্বে বঙ্গদেশের জনৈক জমীদারের বাড়ীতে বিবাহ হইতেছিল। অতিথি অভ্যাগতে বাড়ী গম্‌গম্‌ করিতেছে। খাওয়া-দাওয়ায় রাত্রি ২টা বাজিয়া গিয়াছে, এখন সকলের ঘুমাইবার পালা। কিন্তু চোর চোট্টা ত ঘুমাইবে না—এই সুযোগ তাহাদের চুরি করা (রােকেয়া ২০০৮ : ৩১০)।


রোকেয়া গদ্য পাঠককে প্রত্যক্ষভাবে বােঝানাের দায়িত্ব নেয় বলে এই গদ্যের নামকরণ হতে পারে ‘বােঝানাে গদ্য’ (Convincing Prose)। 


উদ্ধৃতাংশের গদ্যভঙ্গি এবং পূর্বে উদ্ধৃত মতিচূর প্রথম খণ্ডের ‘অর্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধ থেকে দেওয়া উদ্ধৃতির গদ্যভঙ্গির মধ্যকার পার্থক্য সহজেই অনুধাবনযােগ্য। ওপরের উদ্ধৃতাংশের বাক্য সরল। তাছাড়া ‘গম্‌গম্‌ করিতেছে’, ‘খাওয়াদাওয়ায়’, ‘ঘুমাইবার পালা’, ‘চোর চোট্টা’—এইসব মৌখিক বাগভঙ্গি সম্পন্ন শব্দগুচ্ছের ব্যবহারে গদ্য অনেকাংশে ঘরোয়া হয়ে উঠেছে। এছাড়া পরবর্তী পর্যায়ের গদ্যের সঙ্গে প্রথমদিককার গদ্যে কাঠামােগত এবং যোগাযােগের ক্ষমতার মাত্রাগত ভিন্নতার আরেকটি কারণ হচ্ছে, রচনার মধ্যে লেখকের অবস্থান। কারণ লেখক কোথায় অবস্থান করে কথা বলছেন, সেটির ওপর পদ্যের ভঙ্গি, চলন-বলন অনেকটা নির্ভর করে। কথাটি কেবল উপন্যাস, ছােটগল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ প্রবন্ধেও লেখকের একটি অবস্থান থাকে। এই অবস্থান কখনাে বিষয়ের বং পাঠকের খুব গা ঘেঁষে হতে পারে, কখনাে অনেক ওপরে বা কখনাে অনেক দূরে হতে পারে। এই দূরত্ব ও অবস্থানের ওপর গদ্যের চাল-চলন নির্ভর করে। রোকেয়ার প্রথম গ্রন্থ মতিচূর প্রথম খণ্ডের প্রবন্ধগুলােতে প্রাবন্ধিকের অবস্থান যেন দর্শক-সমালােচকের স্থান। আর শেষ গ্রন্থ অবরােধবাসিনী-তে তাঁর অবস্থান যেন ঘটনার একেবারে মধ্যে। এখানে তিনি নিজেও ঘটনার অংশ। এই অবস্থান বা দূরত্বের হেরফের গদ্যের হেরফের ঘটিয়েছে। যে-হেরফের রােকেয়ার চেতনা এবং উদ্দেশ্যের সঙ্গে দারুণভাবে সংগতিপূর্ণ।

রােকেয়ার আজীবন সাধনা ছিল নারী-উন্নয়ন বিষয়ে বাংলাভাষী বিশেষত মুসলিম নারী-পুরুষদের বােঝানাে তথা সচেতন করা। নারীর জাগরণ যে আবশ্যক, এই বােধের উদয় ঘটানােই রােকেয়ার জীবনব্যাপী উদ্দেশ্য ছিল। এই বহু মানুষকে বােঝানাের দায়ের কারণে রােকেয়ার গদ্য এক বিশেষ কাঠামাে বা ভঙ্গি-প্রাপ্ত হয়েছে, যা সমগ্র বাংলা গদ্যে অত্যন্ত বিরল। রোকেয়া গদ্য পাঠককে প্রত্যক্ষভাবে বােঝানাের দায়িত্ব নেয় বলে এই গদ্যের নামকরণ হতে পারে ‘বােঝানাে গদ্য’ (Convincing Prose)। রােকেয়া যে-বিষয়টি পাঠক/পাঠিকাকে বােঝাতে চান, সে-বিষয়টি আবার মীমাংসিত নয়। রোকেয়ার বক্তব্যের অগণিত শত্রু আছে এবং আছে মিত্র। এত শত্রু, কুসংস্কার, বাধা, সমস্যা, প্রতিকূলতার বােঝা মাথায় নিয়ে বাংলা সাহিত্যে রামমােহন এবং বিদ্যাসাগর ছাড়া আর কেউ বােধ হয় গদ্যচর্চা করেন নি। গদ্যের মধ্যে রােকেয়াকে যেমন বােঝাতে হয়, তেমনি শত্রুকে ঠেকাতেও হয়। ফলে এক সার্বক্ষণিক সর্তকতা অবলম্বন করতে হয়। রােকেয়ার চিন্তা বহু-চক্ষু-সর্তক-চিন্তা, একপেশে মত প্রকাশে রােকেয়ার সায় নেই। এই সতর্কতা এবং বােঝানাের তাগিদ রোকেয়ার গদ্যের প্রাণভোমরা, যা কিনা প্রতিটি বাক্যের মধ্যে ধুকপুক ধুকপুক করে। এজন্য রােকেয়ার গদ্য পড়তে গেলে যেমন কখনাে আলস্য আসে না, তেমনি তাঁর গদ্যও কখনো জড় হয়ে পড়ে না। রোকেয়ার গদ্যের মতাে প্রাণদ, সতর্ক ও বােঝানাে-গদ্য সমগ্র বাংলা গদ্যে বিরল। রােকেয়া নিজের মনে একঘেয়েভাবে প্রবন্ধের মধ্যে কথা বলেন না। তিনি যখন কথা বলেন তখন অনেককে জড়িয়ে, সম্বােধন করে, প্রশ্ন করে, বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটিয়ে, কখনাে কখনাে নিজে বিস্মিত হয়ে কথা বলেন। ফলে তাঁর গদ্য হয়ে ওঠে প্রাণবান, সদাজাগ্রত। যেমন—

পাঠিকাগণ! আপনারা কি কোন দিন আপনাদের দুর্দশার বিষয় চিন্তা করিয়া দেখিয়াছেন? এই বিংশ শতাব্দীর সভ্য জগতে আমরা কি? দাসী! পৃথিবী হইতে দাস ব্যবসায় উঠিয়া গিয়াছে শুনিতে পাই, কিন্তু আমাদের দাসত্ব গিয়াছে কি? না। আমরা দাসী কেন?—কারণ আছে। (রােকেয়া ২০০৮ : ২৯)।

রােকেয়া ছিলেন বাস্তববাদী চিন্তক। চেনা, পরিচিত, প্রত্যক্ষ, চারপাশই তাঁর চিন্তার ক্ষেত্র। রােকেয়ার নারী-মুক্তি-বিষয়ক চিন্তা কোনাে আরােপিত আদর্শবাদিতা থেকে উদ্ভূত নয়। রােকেয়া ‘ভারত অন্তঃপুরের কথা’ লিখেছেন। পাশ্চাত্য চেতনার বইপত্র খুব একটা না পড়লেও পত্র-পত্রিকা পড়ে থাকবেন হয়তো। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীর সংস্পর্শেও রােকেয়া আসতে পেরেছিলেন, সম্ভবত তাঁর স্বামীরই উৎসাহে ও ঔদার্যে’ (মুহম্মদ শামসুল ২০০৯ : ৮৫)। এছাড়া স্বামী যেহেতু ইংরেজের বড়া কর্মকর্তা ছিলেন—ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট—সেহেতু সেই সূত্রে কিছু ইংরেজ নারী-পুরুষকে দেখে-শুনে-জেনে থাকবেন হয়তো। তাছাড়া বাল্যকালে—যখন রােকেয়ার বয়স পাঁচ—একবার মায়ের সঙ্গে কলকাতা থেকে এক মেমের কাছে কিছুদিন পড়াশুনা করেছিলেন। তবে বেশিদিন নয়। পর্দার বরাতে দ্রুত তাঁর এ পাঠগ্রহণ-পর্ব সাঙ্গ হয়। এছাড়া রােকেয়ার ভাই ইব্রাহিম সাবের ইংরেজি-শিক্ষিত আধুনিক যুবক ছিলেন। তিনি রাত জেগে খেয়ে-না-খেয়ে রােকেয়াকে বিভিন্ন ধরনের বই পড়িয়েছেন। কিন্তু কোনাে জীবনীকারই কোনো বইয়ের নাম বলছেন না। এ-থেকে ধারণা করা যায়, উল্লেখ করার মতাে জগদ্বিখ্যাত কোনাে গ্রন্থ হয়তো পড়েন নি। হুমায়ুন আজাদ (২০১১ : ২৮৫) যেমন বলেছেন—’তিনি (রােকেয়া) কি ওলস্টোনক্র্যাফটের নাম শুনেছিলেন, তার বইটি দেখেছিলেন? এর কোনাে প্রমাণ তিনি রেখে যান নি, তবে মনে হয় মেরির বই তিনি দেখেন নি।’ শুধু ইংরেজি গ্রন্থ নয়, সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ অনেক গ্রন্থ রােকেয়া পড়েন নি। এটি বোঝা যায় মতিচূর প্রথম খণ্ড গ্রন্থের ‘নিবেদেন’ থেকে। সেখানে রােকেয়া বলেছেন—

মতিচূরের কোন কোন পাঠকের সমালােচনায় জানা যায় যে, তাহারা মনে করেন, মতিচূরের ভাব ও ভাষা অন্যান্য খ্যাতনামা গ্রন্থকারদের গ্রন্থ হইতে গৃহীত হইয়াছে। পূৰ্ব্ববর্তী কোন কোন পুস্তকের সহিত মতিচূরের সাদৃশ্য দর্শনে পাঠকের ওরূপ প্রতীতি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অপরের ভাব কিম্বা ভাষা স্বায়ত্ত করিতে যে সাহস ও নিপুণতার প্রয়োজন, তাহা আমার নাই; সুতরাং তাদৃশ চেষ্টা আমার পক্ষে অসম্ভব (রোকেয়া ২০০৮ : ১৯)।

কপট বিনয়ের সঙ্গেই হােক, আর সত্যিকার বিনয়ের সঙ্গেই হোক উপযুক্ত উদ্ধৃতাংশে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা রোকেয়া সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। একই প্রসঙ্গে এরপরই যেকথা বলেছে, তাতে ওপরের বক্তব্য প্রমাণিত হয়—

যদি অপর কোন গ্রন্থের সহিত মতিচুরের সাদৃশ্য ঘটিয়া থাকে, তাহা সম্পূর্ণ দৈৰঘটনা।… ইংরেজ মহিলা মেরী করেলীর “ডেলিশিয়া হত্যা” (The Murder of Delicia) উপন্যাসখানি মতিচূর রচনার পূর্ব্বে আমার দৃষ্টিগোচর হয় নাই, অথচ তাহার অংশবিশেষের ভাবের সহিত মতিচূরের ভাবের ঐক্য দেখা যায়। এখন প্রশ্ন হইতে পারে, কেন এরূপ হয়? বঙ্গদেশ, পাঞ্জাব, ডেকান (হায়দারাবাদ), বােম্বাই, ইংলন্ড—সর্বত্র হইতে একই ভাবের উচ্ছ্বাস উত্থিত হয় কেন? এদুত্তরে বলা যাইতে পারে, ইহার কারণ সম্ভবতঃ ব্রিটীশ সাম্রাজ্যের অবলাবৃন্দের আধ্যাত্মিক একতা (রােকেয়া ২০০৮ : ১১৯)।

এসব সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, রােকেয়ার নারীবাদী চিন্তা-চেতনা পাশ্চাত্য থেকে উড়ে আসে নি। রোকেয়ার চিন্তা-চেতনার উৎস এই বৃহৎ বঙ্গ। তবে ইংরেজি ভাষা ও গ্রন্থের সাহচর্য, ইংরেজি-শিক্ষিত ভাই ও স্বামীর চিন্তা-রুচির সাহচর্য, সর্বোপরি উনিশ শতকের রেনেসাঁ রােকেয়ার মধ্যে নারীমুক্তির চেতনার বীজ উদ্গমে পরােক্ষ ভূমিকা রেখে থাকবে হয়তো। তাছাড়া রোকেয়ার নারীবাদী চেতনার বয়ান, চিন্তা-পদ্ধতি ইত্যাদি এতটাই সর্বাত্মক এবং বাস্তবনিষ্ঠ যে, পশ্চিমা দুনিয়ায় তখনও এইরূপ নারীবাদী চিন্তার বিকাশ সাধিত হয় নি। পশ্চিমা দুনিয়ার রেনেসাঁ যে নারীবাদী চেতনাকে উসকে দিয়েছিল তা ছিল প্রবলভাবে আদর্শায়িত। এ-যেন ওপর থেকে নিচকে দেখা বা ঈশ্বরের বাণীর মতাে গায়েবি । কিন্তু রােকেয়ার নারীবাদী চেতনার উৎস ‘ভারত অন্তঃপুর’। অর্থাৎ নিচ থেকে তা ওপরের দিকে গিয়েছে। পাশ্চাত্য দুনিয়ার নারীমুক্তির বাণীর সাহিত্যিক প্রকাশ বাংলায় লক্ষ করা যায় মাইকেল, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের সাহিত্যকর্মে। এসব সাহিত্যে নারীর মর্যাদাবােধ আছে, ব্যক্তিত্ববােধ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোেধ আছে, কিন্তু এর বাস্তবভিত্তি নেই। প্রমীলা বা রােহিণী বা বিনােদিনীর জ্বলে ওঠার ভিত্তি কী? এর ভিত্তি কি মাইকেল বা বঙ্কিম বা রবীন্দ্রনাথের পাশ্চাত্য আদর্শায়িত ভিক্টোরীয় এবং রেনেসাঁলব্ধ নারীমুক্তির এবং নারীর প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির বােধ নয়? অর্থাৎ নারী, এসব লেখকের গল্প-উপন্যাস-কবিতায় কথা বলে নিজের জোরে নয়, লেখকের পাশ্চাত্য প্রভাবিত মন-মনন এবং বিশ্বাসের জোরে। লক্ষ করলে দেখা যাবে মাইকেল-বঙ্কিম বা রবীন্দ্রনাথের (হাতে গোনা দুএকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে) কোনো নারীরই আর্থিক ভিত্তি নাই। অর্থাৎ অর্থনৈতিক মুক্তি নেই, শারীরিক মুক্তি তো নেই-ই। তারা কেউ-ই কি সীতা-সাবিত্রীর অদির্শের বাইরে? যে সীতাকে রােকেয়া মুক্ত এবং সমাজ-সম্মানিত কখনোই মনে করেন নি তাঁর একাধিক প্রবন্ধে। কিন্তু রোকেয়া যখন নারীমুক্তির কথা বলেন, তখন আদর্শের জায়গা থেকে বলেন না, তিনি বলেন বাস্তবের জায়গা থেকে। তিনি যখনই নারীমুক্তির কথা বলেন তখন তাঁকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্ত্র যেমন দাঁড় করাতে হয়, তেমনি বলতে হয় বাস্তবের নানা প্রতিবন্ধকতার কথা। রোকেয়াকে যেতে হয় সমাজতাত্ত্বিক পর্যালােচনার মধ্য দিয়ে। এজন্য রোকেয়া যখন কথা বলেন, তখন বিখ্যাত বইয়ের উদ্ধৃতি দেন না, টীকা-টিপ্পনী দেন না; তিনি তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়েই উদ্ধৃতির কাজ সারেন। ফলে পাণ্ডিত্যপূর্ণ টীকা-টিপ্পনী নিষ্প্রয়োজন হয়ে যায়। কারণ তিনি যা বলেন, তার মধ্যে অপরিচয়ের আড়াল নেই। এখানেই রোকেয়ার নারীবাদী চিন্তার শক্তি। রােকেয়ার দু’পা চারপাশের সমাজের মধ্যে গাড়া, আর দৃষ্টি সমাজের সবকিছুর ওপর। চিন্তার এই প্রত্যক্ষতা, স্পষ্টতা, স্বদেশ ও স্বাকালীনতা রোকেয়ার গদ্যকে সংহতি দিয়েছে, দিয়েছে ঋজুতা, ‘অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’।

নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বাংলা ভাষা শিখে তাকে ব্যক্তিগত চর্চার দ্বারা চিন্তাচর্চার মাধ্যম হিশেবে ব্যবহারের দৃষ্টান্ত সমগ্র বাংলা ভাষায় এক বিরল ঘটনা। বাংলা ভাষার চর্চা ছিল রােকেয়ার নিজস্ব নিরন্তর সাধনার বিষয়। এই তপস্যার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাভাষী, বিশেষত নারীর জাগরণ ঘটানাে। রােকেয়ার হাতে বাংলা গদ্য হয়ে উঠেছিল বহু-মানুষের মুক্তির হাতিয়ার। এই বহু-মানুষের মুক্তির আকাক্ষা রােকেয়ার গদ্যকে এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব দান করেছে। আমাদের বলার উদ্দেশ্য এ নয় যে, রােকেয়া বাংলা গদ্যে এক নবতর সুর, স্বর এবং কাঠামাের প্রবর্তন করেছেন; তবে, মানুষকে নতুন চিন্তার সাহায্যে জাগানাের ইচ্ছা-কাতরতা রােকেয়ার গদ্যের মধ্যে যে-এক বিশেষত্ব এনেছে, তা বাংলা গদ্যের ইতিহাসে বিরল ব্যক্তিত্বপূর্ণ—এতে কোনাে সন্দেহ নেই।

 

সহায়ক গ্রন্থ ও প্রবন্ধপঞ্জি
আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৯৬), বেগম রোকেয়া, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা।
 আবুল হুসেন (১৩২৮), “সুলতানা”জ ড্রিম-এর সমালােচনা", সাধনা, অগ্রহায়ণ, কলকাতা।
 গােলাম মুরশিদ (১৯৯৩), রাসসুন্দরী থেকে রােকেয়া : নারী প্রগতির একশো বছর, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
 তাহমিনা আলম (১৯৯২), বেগম রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন : চিন্তা-চেতনার ধারা ও সমাজক, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
 মােতাহার হােসেন, সুফী (২০০৮), “নারীবাদী ও বেগম রােকেয়া, রােকেয়া : চিন্তার উত্তরাধিকার সম্পা, আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া, রােদেলা প্রকাশনী, ঢাকা।
 মুহম্মদ শামসুল আলম (২০০৯)। রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন : জীবন ও সাহিত্যকর্ম। বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
 রােকেয়া রচনাবলি (২০০৮)। সম্পা, মােরশেদ শফিউল হাসান, উত্তরণ প্রকাশনী, ঢাকা।
 শামসুন নাহার (১৯৩৭), রােকেয়া-জীবনী , বুলবুল পাবলিশিং হাউস, কলকাতা।
 সুতপা ভট্টাচার্য (২০০২), রোকেয়া, প্যাপিরাস, কলকাতা।
 হুমায়ুন আজাদ (২০১১), নারী, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
Kudrat E-Hud

কুদরত-ই-হুদা

জন্ম ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৮, ফরিদপুৱ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন 'ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশ ও বাংলাদেশের কবিতা' বিষয়ে। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস : আঙ্গিক বিচাৱ [আদর্শ, ২০১৩]
জসীমউদ্‌দীন [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৮]

ই-মেইল : kudratehuda@gmail.com
Kudrat E-Hud