হোম গদ্য ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’র আন্দোলনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভূমিকা

‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’র আন্দোলনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভূমিকা

‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’র আন্দোলনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভূমিকা
0

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মূল সূত্রপাত যেহেতু ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর তাই সূত্রপাত থেকেই বিসমিল্লা করছি।

১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর জিয়াউদ্দীন আহমদ হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশের অনুকরণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন। এ সম্পর্কে পূর্ব-পাকিস্তানের জনসাধারণ ও শিক্ষিত সমাজকে অবহিত করার উদ্দেশ্যে এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম প্রবন্ধ লেখেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ; ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৫ই শ্রাবণ ১৩৫৪ মোতাবেক ৩০ জুলাই, ১৯৪৭ তারিখে। তিনি লিখেছেন: ‘কংগ্রেসের নির্দিষ্ট হিন্দির অনুকরণে উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গণ্য হ‌ইলে তাহা শুধু পশ্চাদগমন‌ই হ‌ইবে। ইংরেজী ভাষার বিরুদ্ধে একমাত্র যুক্তি এই যে, ইহা পাকিস্তান ডোমিনিয়নের কোন‌ও প্রদেশের অধিবাসীর‌ই মাতৃভাষা নয়। উর্দুর বিপক্ষেও এক‌ই যুক্তি প্রযোজ্য। যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজী ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোন যুক্তি নাই। যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোন রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করতে হয়, তবে উর্দু ভাষার দাবী বিবেচনা করা কর্তব্য। ডা: জিয়াউদ্দীন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ে শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার  সপক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র নিন্দা জানাইতেছি।’

উল্লিখিত উদ্ধৃতিতে অন্তত ৩টি বিষয়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ঐতিহাসিক কৃতিত্ব লক্ষণীয় :

১. তৎকালীন পরিস্থিতিতে যে কারণে আমরা ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা থেকে উৎখাত করতে প্রস্তুত, ঠিক একই কারণে যে উর্দুকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বহাল করা যায় না—এ যুক্তি সর্বপ্রথম উপস্থাপন করেছেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।

২. একজন বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ হিসেবে বাংলাকে পাকিস্তানের প্রধান রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্ৰহণ করার দাবি সর্বপ্রথম তুলেছেন তিনি,  ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির আধোমাস পূর্বে।

৩. তখনকার সময়ে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে‌ই অনেক বাঙালি বুদ্ধিজীবী স্বজ্ঞানে জীবিত থাকা সত্ত্বেও ডক্টর জিয়াউদ্দীনের অযৌক্তিক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম ‘তীব্র নিন্দা’ জানিয়েছেন তিনি।

এ ঐতিহাসিক প্রসঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ‘তকবীর’ পত্রিকায়, ১৭ই পৌষ ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ১৯৪৮ সালের পহেলা জানুয়ারিতে। ‘পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার ভাষা সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধটিতে তিনি বাংলা, আরবি, উর্দু এবং ইংরেজি—এ চারটি ভাষা শিক্ষা-ব্যবস্থায় ব্যবহারের ব্যাপারে স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করেন।


উন্মাদ ব্যতীত কেহ‌ই ইহার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করিতে পারে না।


বাংলা সম্পর্কে বলেন : ‘হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে প্রত্যেক বাঙালীর জন্য প্রাথমিক শিক্ষণীয় ভাষা অবশ্যই বাঙলা হ‌ইবে। ইহা জ্যামিতির স্বীকৃত বিষয়ের ন্যায় স্বতঃসিদ্ধ। উন্মাদ ব্যতীত কেহ‌ই ইহার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করিতে পারে না। এই বাঙ্গালাই হ‌ইবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা।’

আরবি সম্পর্কে বলেন : ‘মাতৃভাষার পরেই স্থান ধর্মভাষার, অন্ততঃ মুসলমানের দৃষ্টিতে। কিন্তু বর্তমানে আরবী পাকিস্তান রাষ্ট্রের একটি বৈকল্পিক ভাষা ভিন্ন একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের যথেষ্ট অন্তরায় আছে।’

উর্দু সম্পর্কে বলেন : ‘পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে যোগ স্থাপনের জন্য, যাঁহারা উচ্চ রাজকর্মচারী কিংবা রাজনৈতিক হ‌ইবেন, তাঁহাদের জন্য একটি আন্তঃপ্রাদেশিক (interprovincial) ভাষা শিক্ষা করা প্রয়োজন। তজ্জন্য উর্দুর আবশ্যকতা আছে। এই জন্য রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উচ্চ রাজকর্মচারী ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী প্রত্যেক নাগরিকেরই উর্দু শিক্ষা করা কর্তব্য।’

ইংরেজি সম্পর্কে বলেন: “আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্রকে একটি আধুনিক প্রগতিশীল রাষ্ট্ররূপে দেখিতে চাই। তজ্জন্য ইংরেজী, ফরাসী, জার্মান, ইতালীয়ান বা রুশ ভাষাগুলির মধ্যে যে কোন একটি ভাষা আমাদের উচ্চ শিক্ষার পঠিতব্য ভাষারূপে গ্রহণ করিতে হইবে। এই সকলের মধ্যে অবশ্য আমরা ইংরেজীকেই বাছিয়া ল‌ইব। ইহার কারণ দুইটি (১) ইংরেজী আমাদের উচ্চ শিক্ষিতদের নিকট সুপরিচিত; (২) ইংরেজী পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক প্রচলিত আন্তর্জাতিক ভাষা।”

উদ্ধৃতিগুলোতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে চারটি ভাষার মধ্যে সমন্বয়ের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন এবং এই সমন্বয়-সাধনে বাঙলাকে ‘প্রত্যেক বাঙালীর’ জন্য শিক্ষার ভাষা হিসেবে অপরিহার্য জ্ঞানে উপস্থাপন করেছেন। এর বিরুদ্ধে মতপ্রকাশকারী ব্যক্তিকে ‘উন্মাদ’ বলতেও তিনি কুণ্ঠিত হন নি। এ ব্যাপারে ভাষা আন্দোলনের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাসবিদ বদরুদ্দীন উমরের মন্তব্য : ‘ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র উপরোক্ত ভাষা বিষয়ক মন্তব্য এবং সুপারিশগুলির মধ্যে অনেক জটিলতা এবং পরস্পরবিরোধিতা থাকলেও এগুলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।’ [পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (প্রথম খণ্ড) : বদরুদ্দীন উমর, সুবর্ণ সংস্করণ, ২০১২, ১৯-২১ পৃষ্ঠা]

রাষ্ট্রভাষার কুতর্ক উঠতে না উঠতেই ১৯৪৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান শিক্ষক সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তৃতায় শিক্ষাসচিব ফজলুর রহমান ‘আরবি হরফে বাংলা’ প্রকল্পের কু-প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি সৈয়দ আলী আহসান, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ নেতৃস্থানীয়দের নিয়ে ফজলুল হক মাওলার বাসায় এ প্রসঙ্গে একটি আলোচনা সভা করেন। এ সভায় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ‌র বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন : ‘সিন্ধী ভাষার জন্য আরবী অক্ষর ব্যবহার করা হয়েছিল, কিন্তু সিন্ধী ভাষায় এমন কতগুলি ধ্বনি আছে যেগুলো আরবী বর্ণমালার সাহায্যে পরিস্ফুট করা যায় না। তাই তাদের নতুন কিছু চিহ্ন উদ্ভাবন করতে হয়েছিল। যার ফলে সিন্ধী লিখনপদ্ধতি আরবী লিখনপদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলেও বর্তমানে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলার জন্য যদি আরবী হরফ ভিত্তি করতে হয়, তাহলে সিন্ধীর মতো সেখানে অনেক নতুন চিহ্ন এবং সংকেত সৃষ্টি করতে হবে, যার ফলে আরবী বর্ণমালা আর আরবী থাকবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার অধিকাংশ ধ্বনি বাংলায় বর্ণলিপির সাহায্যে ব্যক্ত করা যায়। সুতরাং, এই বর্ণলিপি অস্বীকার করবার কোন বৈজ্ঞানিক যুক্তি থাকতে পারে না।’ [জীবনের শিলান্যাস : সৈয়দ আলী আহসান, ২০০২, ১৫৫ পৃষ্ঠা]


করাচীর কুখ্যাত ‘ডন’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল : ‘শহীদুল্লাহ সাহেব ইচ্ছা করলে তার নিজের দেশ পশ্চিমবঙ্গে চলে যেতে পারেন।’


কিছুদিন পর তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষা-উপদেষ্টা ডক্টর মাহমুদ হাসান মারফতে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়। সারমর্ম হলো : ‘বৈজ্ঞানিকভাবে আরবী বর্ণমালা বাংলা ধ্বনির উপযুক্ত করতে গেলে কি কি সংশোধন প্রয়োজন তা যেন তিনি পরীক্ষা করে সরকারকে জানান।’ এ চিঠি পেয়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চরম ক্ষুব্ধ হন এবং ঢাকায় উপস্থিত ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকার প্রতিনিধির নিকট ‘আরবী হরফে বাংলা লেখার সরকারি প্রয়াস’কে নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন। তা যথারীতি আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কিছুদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর মোয়াজ্জেম হোসেনের বাসায় একটি চা-চক্রের আয়োজনে ডক্টর মাহমুদ হাসান ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ‌কে উদ্দেশ্য করে বলেন : ‘ইউ শহীদুল্লাহ, ইউ আর অ্যা ট্রেটর!’ এ অপ্রীতিকর ঘটনার পর তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে বিভিন্ন কথিকা বা ইসলামী অনুষ্ঠানে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে নিষিদ্ধ করা হয়। করাচীর কুখ্যাত ‘ডন’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল : ‘শহীদুল্লাহ সাহেব ইচ্ছা করলে তার নিজের দেশ পশ্চিমবঙ্গে চলে যেতে পারেন।’ এ ঘটনায় দুঃখ পেয়ে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সৈয়দ আলী আহসানকে বলেছিলেন : ‘আমি রাজনীতি করি না, রাজনীতির কলা-কৌশল‌ও জানি না; ভাষার ক্ষেত্রে যা ন্যায়সঙ্গত এবং বৈজ্ঞানিক তা আমি বলেছি এবং চিরকাল বলব।’ [প্রাগুক্ত, ১৫৬ পৃষ্ঠা]

সব বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে স্বৈরাচারী নীতিতে ১৯৫০ সালে কেন্দ্রীয় শিক্ষা দফতরের উদ্যোগে ‘আরবী হরফে বাংলা’র সরকারি কার্যক্রম শুরু হয় এবং এ কাজে প্রাথমিকভাবে প্রায় এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়। এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সে বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন : ‘এছলামী ভাবধারায় উর্দু বিশেষ সমৃদ্ধিশালী। কাজেই পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের মাতৃভাষা যাহাই হ‌উক না কেন, উর্দু শিক্ষার মারফৎ তাঁহারা বিশেষ লাভবান হ‌ইবেন। কিন্তু উর্দু হরফের সাহায্যে বাংলা শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করিয়া অর্থ অপব্যয়ের কি মানে থাকিতে পারে? আশ্চর্যের কথা এই যে, উহার সহিত পূর্ববঙ্গ সরকারের কোন সম্পর্ক নাই। এই অর্থহীন ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার এক লক্ষ টাকা ব্যয় করিবেন। আমার আশঙ্কা হয়, উহা বন্ধ করা না হ‌ইলে সরকারী টাকা অপব্যয় করা হ‌ইবে।’ [প্রাগুক্ত, বদরুদ্দীন উমর, ২৫৩ পৃষ্ঠা]

পাকিস্তানের সর্বপ্রথম সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর। মূল অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি সভাপতির বক্তব্যে ‘আরবী হরফে বাংলা’র প্রসঙ্গ টেনে বলেন : ‘আমাদের বাংলাভাষী প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। কাজেই বাংলা অক্ষর ছাড়তে পারা যায় না। পাকিস্তান রাষ্ট্র ও মুসলিম জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার প্রয়োজনীয়তা আমরা স্বীকার করি। তার উপায় আরবী হরফ নয়; তার উপায় আরবী ভাষা। আরবী হরফে বাংলা লিখলে বাংলার বিরাট সাহিত্যভাণ্ডার থেকে আমাদিগকে বঞ্চিত হতে হবে।’ [শহীদুল্লাহ সংবর্ধনা গ্ৰন্থ : মুহম্মদ সফিউল্লাহ সম্পাদিত, ১৯৬৭, ৪১ পৃষ্ঠা]

১৯৫১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ববাংলার বুদ্ধিজীবী কর্তৃক পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীন বরাবর পহেলা এপ্রিল থেকে বাংলাকে সরকারি ভাষারূপে চালু করার জন্য যে স্মারকলিপি প্রদান করা হয় সে স্মারকলিপিতে সর্বপ্রথম নাম ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ‌র। [বদরুদ্দীন উমর, প্রাগুক্ত (তৃতীয় খণ্ড), ৮০ পৃষ্ঠা]


বাংলা ভাষা অবহেলিত হ‌ইলে আমি ব্যক্তিগতভাবে ইহার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিব।


১৯৫১ সালের ১৬ মার্চ কুমিল্লায় ‘পূর্ব বাঙলা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষক সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন : ‘শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে পূর্ববঙ্গের ছাত্রদের উপর বাংলা ভাষা ব্যতীত যদি অন্য কোন ভাষা আরোপ করা হয় তবে ইহার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানো আমাদের উচিত। এমনকি প্রয়োজন হ‌ইলে ইহার বিরুদ্ধে আমাদের বিদ্রোহ করা উচিত। বাংলা ভাষা অবহেলিত হ‌ইলে আমি ব্যক্তিগতভাবে ইহার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিব। নতুন ভাষা আরোপ করা পূর্ববঙ্গে গণহত্যার‌ই শামিল হ‌ইবে।’ [প্রাগুক্ত, ৯১ পৃষ্ঠা] তৎকালীন আর ক’জন বাঙালি বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ এমন কড়া ভাষায় বাংলার সপক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট এবং সকলের উদ্দেশ্যে নির্দেশনা প্রদান করেছেন, আমার জানা নেই।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতেও তাঁর প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিল। মধ্যদুপুরে যখন পুলিশ টিয়ারশেল, কাঁদুনে গ্যাস অতঃপর গুলি চালাতে লাগল তখন ভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশগ্রহণ করতে আসা শিশু-কিশোররা ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভিতর অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তাঁর নির্দেশনায় মেডিকেল কলেজের একপাশের দেয়াল ভেঙ্গে শিশু-কিশোরদের নিরাপদে বের করে দেওয়া হয়। টিয়ারশেল ও গুলিতে আঘাতপ্রাপ্ত হ‌ওয়া ছাত্রদের দেখতে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি গিয়েছিলেন প্রায় সাথে সাথেই। [প্রাগুক্ত, ২৪৩ পৃষ্ঠা]

বিকেলের দিকে ছেলে মুর্তজা বশীরের কাছ থেকে যখন ছাত্রদের মৃত্যুর কথা শুনলেন তখন সাথে সাথে চামড়ার স্যুটকেস থেকে কালো একটি আচকান বের করে দাড়ি ছাঁটার কাঁচি দিয়ে আচকানের একাংশ কেটে ফেললেন। কালো আচকানের খণ্ডিত অংশটি ছেলের সামনে ধরে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নির্দেশ দিলেন, ‘আমার হাতে বেঁধে দাও।’ [মুর্তজা বশীরের সাক্ষাৎকার : দৈনিক সমকাল, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০]

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা থেকে বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে একজন বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ হিসেবে সর্বপ্রথম নিন্দাসূচক প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বলা যায়, বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা এবং সরকারি কার্যক্রমে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহারিক করার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের প্রধান সৈনিক ছিলেন তিনি। ‘আরবী হরফে বাংলা’ প্রচলনের ঘৃণিত প্রকল্প মূলত তিনিই প্রতিহত করে দেন—একজন ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে। এ কারণে অনেক অবজ্ঞা, নিন্দা, কটূক্তি আসলেও একজন ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে সততার জোরে তিনি সর্বদাই ছিলেন এ প্রকল্পের চরম বিরোধী। একজন সৎ ও মহৎ শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি তাঁর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে ‘বাংলা’র ঐতিহাসিক আন্দোলনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলেন। কেবল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে অপরিহার্য জ্ঞান করেই ক্ষান্ত ছিলেন না, বাংলা ভাষার চতুর্মাত্রিক বিকাশের লক্ষ্যে ‘বাংলা একাডেমি’র সর্বপ্রথম প্রস্তাবক‌ও ছিলেন তিনিই। ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিত্বে তিনি এ প্রস্তাব করেছিলেন। পরবর্তীকালে আমরা দেখেছি, বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, গবেষণা, অনুবাদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমিই বাঙালি জাতির প্রধান ছাউনি তথা আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। আর সেজন্যই মুক্তকণ্ঠে বলতে দ্বিধা নেই, বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সরব উপস্থিতি প্রাতঃস্মরণীয়।


তথ্যসূত্র :

১. পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (প্রথম ও তৃতীয় খণ্ড) : বদরুদ্দীন উমর, সুবর্ণ সংস্করণ, ২০১২
২. জীবনের শিলান্যাস : সৈয়দ আলী আহসান, ২০০২
৩. শহীদুল্লাহ্ সংবর্ধনা গ্ৰন্থ : মুহম্মদ সফিউল্লাহ সম্পাদিত, ১৯৬৭
৪. দৈনিক সমকাল পত্রিকা