হোম গদ্য রবীন্দ্রনাথ : দরিদ্র পোস্টমাস্টার ও আরণ্যক উলাপুর

রবীন্দ্রনাথ : দরিদ্র পোস্টমাস্টার ও আরণ্যক উলাপুর

রবীন্দ্রনাথ : দরিদ্র পোস্টমাস্টার ও আরণ্যক উলাপুর
326
0

‘অজ্ঞতা’ শব্দটির নেতিবাচক চারিত্র্য সর্বজন মান্য, প্রতর্কহীন; বহু ব্যবহৃত। তবে, এটিও কখনো কখনো হতে পারে আশীর্বাদের কারণ; কিংবা, দিতে পারে কিছু সুবিধা। আলোচনা করা যেতে পারে প্রায় এক শ কুড়ি বছর ধরে গড়ে ওঠা রবীন্দ্রসাহিত্য সমালোচনার সঙ্গে অধিক পরিচয় না থাকার অজ্ঞতা প্রসঙ্গে। সম্ভবত, এই অজ্ঞতার সবচেয়ে বড় সুবিধা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কলম ধরার ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। আমরা অবগত রয়েছি যে, বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি অঞ্চলেরই কম-বেশি দারিদ্র্য রয়েছে; রয়েছে মানহীনতা, অপশিল্পের নজির; সংকট। নেতিবাচক শোনালেও, বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের জন্য বিবেচনাটি আরও গুরুত্ব সহকারে প্রযোজ্য। এটি কেবলমাত্র অভিযোগ নয়; বরং প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের ধারাটি এখনো অপরিণত। বহু পূর্বেই এখানে সমালোচনা সাহিত্যের একটি ধারা জন্মলাভ করেছে বটে; কিন্তু, এর গড়নে মৌলিক ঘাটতির ফলে বিকাশটা ঠিকমতো সম্ভবপর হয় নি। বরং, একটা জায়গায় স্থির হয়ে আছে। যেখানে দৃষ্টিভঙ্গির অভিনবত্বহীনতাই মুখ্য; নব-নিরীক্ষার বাইরে পূর্ববর্তীদের পথকে অনুসরণ করাই কর্তব্য, অবশ্যমান্য হিসেবে বিবেচিত হয়। রবীন্দ্রনাথও বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের এই দুর্বলতা হতে অক্ষত থাকেন নি; ফলে রবীন্দ্রসাহিত্য সমালোচনার অঞ্চলটিও আচ্ছন্ন হয়েছে বহুমাত্রিক খাদে, দূষণে। এবং, এই দূষিত জলবায়ুর সংক্রামক শক্তিও প্রবল; যা সার্বিকভাবে আজকের একজন পাঠককেও পরিচিত ধাঁচে, পদ্ধতিতে, পন্থায় ভাবতে প্ররোচিত করে; মৌলিক চিন্তন শক্তিটা কমিয়ে দেয়, অকেজো করে নিজের মতো করে গড়ে নেয়। কাজ করে একজন রবীন্দ্রনাথের নিকটে পৌঁছুবার রাস্তায় প্রধান অন্তরায় হিসেবে। মূলত, এই দিকটি বিবেচনা করেই রবীন্দ্রসাহিত্য সমালোচনার সঙ্গে প্রায় সম্পর্কহীন পাঠককে শ্রেয় বলে জ্ঞান করেছি; এই অজ্ঞতাকে দেখেছি আশীর্বাদপুষ্টতা হিসেবে। বুদ্ধদেব বসু ‘কথাসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে ‘সোনার তরী’র কৃষকের ফেলে যাওয়া শস্যের ন্যায় রবীন্দ্রনাথের শস্য ঘরে তুলছে, গোছাতে, বাছতে, সাজাতে বলেছিলেন; এই ঘরে তোলার পারিভাষিক নাম দিয়েছিলেন সমালোচনা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কয়েক দশক অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ভাবুকেরা সে পথে খুব দূর অগ্রসর হতে সক্ষম হন নি। রবীন্দ্রনাথকে আমরা কিভাবে পেতে পারি? এটি নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে; একবিংশ শতাব্দীর আস্ত দুটো দশক অতিক্রম করেও সে আলোচনার দ্বার সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয় নি। অবশ্য, রুদ্ধতা, অচলতা কোনো ব্যাপারেই কাম্য সমাধান হতে পারে না। এটি রবীন্দ্রনাথ, যিনি ‘মানব ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়’; তার সম্পর্কে আরও অধিকভাবে সত্য ও প্রায়োগিক। রবীন্দ্রনাথের অবদান সম্পর্কে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের একটি পরিচিত, বহুচর্চিত উপমা রয়েছে যে, ‘রবীন্দ্রনাথ হাল বাংলার সিদ্ধিদাতা গণেশ।’ এই সিদ্ধিদান রবীন্দ্রনাথ কেবল বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেই করেছেন, এটি সীমাবদ্ধ বিবেচনা; বরং, এই সিদ্ধির প্রসারণ বহুরৈখিক, দিগন্তবিস্তারী। রবীন্দ্রনাথের রচনার সঙ্গে, কাজের সঙ্গে যাদের অল্পবিস্তর পরিচয়, জানাশোনা রয়েছে; বোধকরি, তারাও এটি নির্বিবাদেই স্বীকার করবেন। কেবলমাত্র, সাহিত্যের গ্রন্থগত সীমা অতিক্রম করে রবীন্দ্রনাথের এই সিদ্ধিদান বাঙালি জীবনের সংযোগ ঘটিয়েছে অভিনব এক বোধের সঙ্গে, উন্মুক্ত করে দিয়েছে রুচির এক সুবিশাল অর্গল। বহুক্ষেত্রে এই নতুন ‘বোধ ও রুচি’ জাতিগতভাবে বাঙালির হাজার বছরের একাধিক দারিদ্র্যকে ঘুচিয়ে দিয়েছে; প্রতিষ্ঠা করেছে নতুন প্রাণশক্তি, উপযুক্ততা এবং বৈশ্বিক আবহ।


রবীন্দ্রনাথও এই প্রবণতার ব্যতিক্রম নন, নন কল্পনাসর্বস্ব কথক; এত বছর বাদেও তার স্মৃতি কিংবা স্বীকারোক্তি সেটিই আমাদের জানান দেয়।


২.
বাঙালি জীবনে এই নতুন প্রাণশক্তির পরিচয় লিপিবদ্ধ রয়েছে বাংলা গল্পের পরিমণ্ডলেও; বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ নিজে যে সাহিত্য প্রকরণটির জন্মদাতা। গল্পকার রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠত্ব এখনো প্রশ্নাতীত, অনতিক্রম্য। নিঃসন্দেহে বলা চলে এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই এবং গল্পকার হিসেবে তার বিকল্প তৈরি করতে এখনো বাংলা সাহিত্যকে বহু রাস্তা অতিক্রম করতে হবে। বুদ্ধদেব বসু যাকে বলেছিলেন ‘আশ্চর্য বই’; সেই গল্পগুচ্ছ  যখন হাতে নেয়া যায়, আমরা বিপুল বিস্ময়ে উপলব্ধি করি—‘দেনা-পাওনা’ থেকে আরম্ভ করে ‘মুসলমানীর গল্প’ অব্দি পাঠকের গমনটা ভারি অনায়াসলব্ধ, সুখপ্রদ। বাহুল্য না থাকলেও, তার গল্পের যে সার্বিক প্রবাহ, সেটি বর্ণনার কিংবা ভাষার; সামান্য রসবোধ সম্পন্ন পাঠকের জন্যও সেই বিপুল ঘটনা সংহার থেকে মন ফেরানোটা এক আপাত দুরূহ কর্ম; অসম্ভব। তবে, আজকের আলোচনায় আমরা ‘মুসলমানীর গল্প’ অব্দি অগ্রসর হতে চাই না। বরং, বিরতি নিতে চাই একেবারেই নিকটে, ‘পোস্টমাস্টার’-এ। গল্পটি হিতবাদীতে প্রকাশিত হয়েছিল ১২৯৮ সনে। অবশ্য, গল্পের সমাপ্তিতে সাল উল্লেখ করার পর রবীন্দ্রনাথ একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়েছেন; তবে, এ সংশয় তার নিজস্ব; অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের আলোচ্য নয়। গল্পটি শিলাইদহে বসে লেখা। তখন সৃষ্টিশীল রবীন্দ্রনাথের অন্যতম ও প্রথম উর্বর অধ্যায় অতিবাহিত হচ্ছে; তার ভাড়ার ঋদ্ধ হচ্ছে নতুন শস্যে-প্রাণে-সৃষ্টিতে। গল্পটি সম্পর্কে ছিন্নপত্রাবলীর স্মরণ নিয়ে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরা দেবীকে লিখেছিলেন : ‘যখন আমাদের কুঠিবাড়ির একতলাতেই পোস্টঅফিস ছিল এবং আমি এঁকে [পোস্টমাস্টার] প্রতিদিন দেখতে পেতুম, তখনি আমি একদিন দুপুরবেলায় এই দোতলায় এসে সেই পোস্টমাস্টারের গল্পটি লিখেছিলুম।’ একজন সাহিত্যিক যত বিপুল সৃজনশীল কল্পনাশক্তির অধিকারীই হোন না কেন; তার গল্পেরও একটা বাস্তব ভূমি থাকে; থাকে অঙ্কুর উৎস। রবীন্দ্রনাথও এই প্রবণতার ব্যতিক্রম নন, নন কল্পনাসর্বস্ব কথক; এত বছর বাদেও তার স্মৃতি কিংবা স্বীকারোক্তি সেটিই আমাদের জানান দেয়। একই পত্রে আমরা এটিও জেনেছি যে, হিতবাদীতে গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার পর সেই পোস্টমাস্টারের কী দারুণ লজ্জারাঙা প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পটি যে গ্রামের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে; তার কাঠামোগত পরিচয়; সম্ভবত, গল্পের একটি বাক্যের মাধ্যমেই প্রদান করা সম্ভব—‘অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল।’ একটা আরণ্যক পরিবেশের ছাপ আমরা বাক্যটিতে পেতে পারি। যা কেবলমাত্র পোস্টমাস্টারের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি পর্ণগৃহের অঙ্গনেরই নয়; বরং, জনপদ হিসেবে সমস্ত উলাপুরের প্রাকৃতিক চিত্র উন্মোচিত করে। গ্রামের প্রকৃতি এবং পোস্টমাস্টার ও রতনের সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে, গল্পটিকে অনেকে ‘জীবন ও প্রকৃতি’ বিষয়ক গল্পরূপে বিচার করেছেন; তাদের চিন্তাকে আগাগোড়া প্রত্যাখ্যান করছি না; তবে তা বহুলাংশেই খণ্ডিত, সরল এবং একপেশে। আমরা নিঃসন্দেহ যে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতার কারণেই এমনটা ঘটেছে। ভিন্ন পথে বিবেচনা করলে দেখা যায়—গল্পটিতে এই প্রকৃতির কিংবা মানব মনের সমান্তরালে, পূর্ব-বাংলার উনিশ শতকের অন্তে, একটি প্রান্তিক জনপদের সমাজ ও আর্থিক পরিকাঠামোও পরিষ্কার হয়ে উঠেছে; ডালপালা বিস্তার করেছে; কাজ করেছে চরিত্রগুলোর নিয়ন্ত্রক শক্তির। উলাপুর গ্রামের প্রকৃতি থেকে মানুষের মনোজীবন; সবই অনাধুনিক, আদিমতায় পূর্ণ। যা আর্থিক দিক থেকে ভাঙা, অব্যবস্থিত, অপূর্ণ একটি সমাজের অবভাস গল্পটির প্রতি পরতেই উন্মোচিত করেছে। আরব্য রজনীর দৈত্যের নিকটে গাছপালা কেটে পাকা রাস্তা তৈরি, কিংবা গগণচুম্বী সারি সারি অট্টালিকা তৈরির যে প্রার্থনা ‘কলকাতার জল হতে উলাপুরের ডাঙায় তোলা মাছ’ পোস্টমাস্টারের অহরাত্র ক্ষুণ্ন মনে ফুটে ওঠে; সেটি মূলত এই অব্যবস্থিত প্রতিবেশ থেকে এক নাগরিক ব্যক্তির মুক্তির পথ অনুসন্ধান ব্যতিরেকে আর কিছুই নয়। রতনের গুরুত্বটা, অস্তিত্বটা সেখানে কোনোভাবেই উপস্থিত ছিল না; যে কারণে শেষ অব্দি নিজের এই অতি প্রয়োজনীয় চাকরিটিও ছেড়ে দিতে পোস্টমাস্টার দ্বিধাবোধ করেন না।

৩.
প্রথমে আমরা পোস্টমাস্টারের আর্থিক অবস্থাটা বিবেচনা করে দেখতে পারি। তিনি রবীন্দ্রনাথের; বিশেষত গল্পগুচ্ছের আরও বহু নায়কের মতো কলকাতার পাশ করা যুবক হলেও, তাদের তুল্য ভাগ্যবান নন। উলাপুরে চাকরি করতে এসেছিলেন নেহাতই পেটের দায়ে। গল্পকার রবীন্দ্রনাথ এটিও গোপন রাখেন নি যে, পোস্টমাস্টারের মাইনেটাও উলাপুর গ্রামের মতোই সামান্য। এর মাধ্যমে আমরা পোস্টমাস্টারের দারিদ্র্য, অভাবী জীবন সম্পর্কেও পুরোদস্তুর নিঃসন্দেহ হতে পারি। ভাবি, এই যদি না হবে; তবে উলাপুরের তুল্য গণ্ডগ্রামে, যেখানে তার প্রাণ সদা ওষ্ঠাগত, কেই বা সাধ করে চাকরি করতে আসে, বসবাস করে? দু’এক স্থানে কলকাতার কোনো অনুন্নত পাড়ার, ঘিঞ্জি গলিতে বাস করা, মাসের অন্তে একটি মানি অর্ডারের জন্য অপেক্ষারত তার বিধবা মা, ভাই এবং বোনের ছবিটিও আমাদের মানসে অজান্তেই ভেসে ওঠে; একটা সহানুভূতি তৈরি করে। পোস্টমাস্টারের এই অবস্থার বাইরে উলাপুর গ্রামে যে মানুষদের বসবাস, সামান্য খেয়াল করলেই দেখা যাবে, তারা আদতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী নয়। গ্রামের পাশে নীলকুঠির প্রয়োজনে একটি পোস্টঅফিস স্থাপিত না হওয়া অবধি তারা ছিল সার্বিকভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এমনকি কোনো শিক্ষিত মানুষের বাসও গ্রামটিতে নেই। কারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে—গল্প করার মতো উপযুক্ত; কিংবা নিজ রুচির অনুগামী কোনো শিক্ষিত মানুষ পায় নি বলেই স্টমাস্টারকে রতনের তুল্য এক অশিক্ষিত বালিকার সঙ্গে গল্প করে, বহু দুপুরের ক্লান্তিকর ব্যাপ্তি অতিবাহিত করতে হয়েছিল। অবকাঠামোগত দিক থেকেও উলাপুর গ্রামটি একেবারেই পিছিয়ে রয়েছে। আমরা পূর্বে পানাপুকুর আর জঙ্গলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছি; গল্পের বিবরণে আরও দেখা যায়—পোস্টমাস্টার কাজ করে একটি অন্ধকার আটচালার মধ্যে; কেবলমাত্র একটি সরকারি অফিসেরই নয়, সমান্তরালে উলাপুর গ্রামের অবকাঠামোগত দীনতাও এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এমন একটি গ্রামের মানুষেরা যে অর্থনৈতিকভাবে খুব একটা স্বাবলম্বী হবে না এই দিকটিও ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে একবারে গোপন থাকে নি। বালিকা রতন পোস্টমাস্টারের চব্বিশ ঘণ্টার বাধা কাজের লোক। সে পোস্টমাস্টারের জন্য রান্না করে, বিভিন্ন ফরমায়েশ খাটে। পোস্টমাস্টার আসে পোস্টমাস্টার যায়—কিন্তু রতনের কাজের বদল হয় না; পরিবর্তন হয় না ভাগ্যেরও; সে যেন দুর্নীতিগ্রস্ত কোনো রাষ্ট্রের ভাগ্যাহত নাগরিক। এর সামাজিক কারণ খুঁজলে দেখা যাবে, রতন দরিদ্র; তার বাবা-মা নেই, এ কারণে বিয়েরও কোনো গতি নেই। আবার, অন্যপ্রান্তে পোস্টমাস্টারের নিকটে রতন ছোটবেলার সামান্য পারিবারিক স্মৃতিচারণ করে, সেখান থেকেও অনুধাবন করা যায়—বাবা-মা জীবিত থাকতেও তার জীবন দারিদ্র্যের মধ্যেই অতিবাহিত হয়েছে। রতনের একটি বাক্যেই তাদের আর্থিক অবস্থা পরিষ্কার হয়ে ওঠে—‘পরিশ্রম করিয়া বাপ সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ফিরিয়া আসিত।’ আমাদের উপলব্ধি করতে মোটেও সময় লাগে না যে, রতনের বলা এই পরিশ্রম, আদতে কায়িক পরিশ্রম; শ্রমিকের বৃত্তি। এর মাধ্যম শুধু রতনের বাবারই নয়; বরং, সঙ্গে উলাপুরের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের আর্থিক সংস্থিতি সম্পর্কেও সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়; তাদের নড়বড়ে অবস্থাটা অনুমান, কল্পনা করা যায়। গল্পগুচ্ছের পরিচিত নায়িকাদের তুল্যই রতনের বয়স বারো-তেরো; এই বয়সেই গল্পকার রবীন্দ্রনাথ আশা ছেড়ে দিয়েছেন যে, তার আর বিয়ে হবে না। আদতে, এটি রবীন্দ্রনাথেরও বক্তব্য নয়; সমাজের কথা, বক্তব্য; আচরিত প্রথা, ধর্ম। কারণ, রতন যে সমাজে বাস করে বিয়ে হলে সেখানে দশ-বারো বছরেই হয়। নইলে আর হয় না; সে পায় এক অপচায়িত নারীর তকমা, জীবন। সমাজের এই দিকটা ধরে বিবেচনা করলে ‘দেনা-পাওনা’র নিরুপমার পরই গল্পগুচ্ছে বর্ণিত অনুশাসন সর্বস্ব ব্যবস্থার আরেক বলি ‘পোস্টমাস্টারে’র রতন। মৃত্যু পতিগৃহে শত-নিগৃহিতা নিরুপমাকে মুক্তি দিয়েছিল; কিন্তু, পোস্টমাস্টারদের পুরুষাক্রমিক বাধা দাসী রতনের কোনো মুক্তি নেই; গতি নেই। বরং, সে যেন খানিকটা জীবন্মৃত; একটা ফেলনা; একটা অপচয়।


মাত্র আড়াই পৃষ্ঠার একটা গল্পে সে অর্জন করে ট্র্যাজেডির অপরাজেয় নায়িকার মহিমা।


৪.
‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে পোস্টমাস্টার পদটির, পেশাটির একটি ভয়ানক গ্রাসশক্তি রয়েছে, এটি যেন এক সক্রিয় চোরাবালি; আমরা যাকে বিবেচনা করতে পারি পেশার সর্বগ্রাসিতা রূপেও। অর্থাৎ, পোস্টমাস্টারের পেশাগত পরিচয়ের নিচে হারিয়ে যায় তার ব্যক্তি পরিচয়। পোস্টমাস্টারের যে পরিচয় আমাদের রবীন্দ্রনাথ দিয়েছেন; তাতে দেখা যায়—সে কলকাতা থেকে আসা এক যুবক, তার রতন নামের একজন বাধা কাজের মেয়ে রয়েছে; কলকাতায় রয়েছে তার উপর নির্ভরশীল মা, বোন এবং ছোটভাই। কিন্তু, পোস্টমাস্টার নিজে কে? তার কি আছে কোনো নাম? এই প্রশ্নগুলোর কোনো সদুত্তর অনুপস্থিত। আর, পোস্টমাস্টার যে সমাজে বসবাস করে, সেখানেও তার নামটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং, গুরুত্ব বহন করে পেশাগত পরিচয়, তকমা। এক্ষেত্রে, নামহীন পোস্টমাস্টারকে রতনের থেকেও ভাগ্যহত বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। কাজের লোক রতনেরও একটি নাম রয়েছে, কিন্তু পোস্টমাস্টারের সেটিও নেই। সম্ভবত, কাজের লোক পরিচয়ের বাইরে; ‘রতন’ এই নামটি গল্পটিকে কেবল পোস্টমাস্টারের গল্পেই সীমাবদ্ধ রাখে না; চ্যালেঞ্জ জানায়, একটা আলাদা জায়গা তৈরি করে; করে তোলে রতনেরও গল্প। এ প্রসঙ্গে পোস্টমাস্টারের সঙ্গে রতনের সম্পর্কটি খতিয়ে দেখা যেতে পারে; এখানেও মূল অনুঘটকের কাজ করেছে সমাজ এবং আর্থিক অবস্থান। আমরা দেখি—তাদের মধ্যে যে আন্তরিক সম্পর্ক; সেখানে কলকাতার শিক্ষিত যুবক পোস্টমাস্টার নিজের দূরত্ব বজায় রাখতে পারে। এর পেছনে ক্রিয়াশীল আছে তার শিক্ষা, পারিবারিক ও শহুরে সামাজিক অবস্থান। কিন্তু, অল্পবয়স্কা, অনাথ, গ্রামীণ বালিকা রতন সেটি পারে না; ব্যর্থ হয়। একারণে গল্প শুনতে শুনতেই পোস্টমাস্টারের বাড়ির নিকট পরিজনরা রতনের মা, দাদা ও দিদি হয়ে ওঠে। সেও নিজেকে তাদেরই একজন কল্পনা করতে আরম্ভ করে; তার কল্পনার জগৎটা কখনো কখনো ভৃত্য থেকে ভগ্নির  দ্বারে গিয়ে উপনীত হয়। পোস্টমাস্টারের জন্যও রতনের হৃদয়ে জন্মে, তারই মতো ক্ষুদ্র এক ভালোবাসার মাটি ফুঁড়ে বেরুবার চেষ্টা। যার তুচ্ছতা, গ্রাম্যতা, আরণ্যিকতা পোস্টমাস্টারের মনে কোনো আবেদন জাগাতে পারে নি; অন্তত তার মনোভাবে এটা আমরা প্রত্যক্ষ করি না। গল্পের সমাপ্তিতে রতনের মাতৃসম সেবায় জ্বর থেকে সেরে ওঠার পর উলাপুরের চাকরি ছেড়ে পোস্টমাস্টার চলে যাবার উদ্যোগ নেয়। সঙ্গে কলকাতায় নিয়ে যাবার প্রস্তাবে রতনকে বলে ‘সে কি করে হবে।’ পোস্টমাস্টার চলে যায়, আহত রতন পড়ে থাকে। আমরা দেখি, চলে যাবার পূর্বে পোস্টমাস্টারের দেয়া টাকা, কিংবা ভাবীকালের পোস্টমাস্টারের নিকটে তার দায়িত্ব দিয়ে যাবার দয়া রতন প্রত্যাখ্যান করে। ‘আমাকে কিছু দিতে হবে না; তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমার জন্য কাউকে কিছু ভাবতে হবে না’—বিনয়, আবেগ ও তীব্র-ব্যথাতুর অভিমান মিশ্রিত এ প্রত্যাখ্যান রতনকে হঠাৎ যেন মেরুদণ্ডী করে তোলে। মাত্র আড়াই পৃষ্ঠার একটা গল্পে সে অর্জন করে ট্র্যাজেডির অপরাজেয় নায়িকার মহিমা। এরপরে, রবীন্দ্রনাথ পোস্ট অফিসের চারপাশে ঘুরে ঘুরে রতনের কান্নার যে বিবরণ দিয়েছেন; রতনের বয়সকে বিবেচনার বাইরে রাখলে; তা আদতে পাঠযোগ্য মনে হয় না, এই বর্ণনা তাকে বরং খানিকটা খাটো করেছে। রতনের আবদারের পরও পোস্টমাস্টারের তাকে ফেলে যাবার পশ্চাতে মৌলত দুটি কারণ ক্রিয়াশীল থেকেছে : প্রথমত, রতন এক গ্রাম্য, অনাথ বালিকা; তাকে হয়তো বেতনের সামান্য টাকাটা উদারতা দেখিয়ে হাতে ধরিয়ে দেয়া যেতে পারে, কিন্তু, কলকাতায় নিয়ে যাওয়া যায় না। সে উলাপুরেই বেশি মানানসই, তার জায়গা এটাই। পোস্টমাস্টারের নাগরিক মনে এই ভাবনা কাজ করেছে। দ্বিতীয়ত, পোস্টমাস্টার নেহাতই দরিদ্র; যার দরুণ এই গণ্ডগ্রাম উলাপুরে চাকরি করতে এসেছিলেন, সেটিও ছেড়ে এখন বেকার; আবার, তার ঘরেই রয়েছে তিনজন পোষ্য। এই রতনের জন্য; যতই সে কাজ করে খাক; অন্নসংস্থানের উপায় কি সত্যিই তার আছে—যে তাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তুলবে? এই দারিদ্র্যতাও পোস্টমাস্টারকে বাধ্য করেছে রতনকে ফেলে চলে যেতে; হৃদয়হীন হতে। ভাবলে দেখা যায়—এই রূঢ় সামাজিক এবং আর্থিক বাস্তবতার সমুখে রবীন্দ্রনাথের ‘ফিরিয়া ফল কি। পৃথিবীতে কে কাহার।’ তত্ত্ব নেহাতই জলো হয়ে ওঠে; বিপুল আবেগমথিত পরিচিত ক্রিয়াশীলতা হারায়।

৫.
দমবন্ধ করা, আরণ্যক উলাপুর পোস্টমাস্টারকে মুক্তি দেয়, প্রয়োজন হয় না আরব্য রজনীর কোনো দৈত্যের। মুক্তি দেয় অবলম্বনহীন, ক্ষুদ্র, বিজয়ী বালিকা রতনও; কিন্তু, তার পেছনে লেপ্টে থাকে দারিদ্র্য, অভাব আর জীবনের পুঞ্জ পুঞ্জ সীমাবদ্ধতা। এগুলো তাকে মুক্তি দেবে কি? নদীতে, পালে হাওয়া লাগা নৌকায়, কলকাতার পথে ধাবমান যুবক পোস্টমাস্টারের মধ্যে একারণে ক্রমশ এক পরাজিত মানবের ছবি পরিকাঠামো পায়। বোঝা যায়, ভবিষ্যতে এভাবে তাকে আরও পালাতে হবে, ছুটতে হবে; বহু উলাপুর ছেড়ে; বহু রতনকে ছেড়ে। তার মুক্তি নেই; সে একটা জালে আটকে গেছে; ব্যবস্থার জাল। এই জাল কাটাবার দায় কেবল পোস্টমাস্টারের নয়; আরও অনেকেরই।

নাজমুল হাসান পলক

জন্ম ২৮ মার্চ, ১৯৯৩; গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা।

শিক্ষা : স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল : palakhasan40424@gmail.com