হোম গদ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান্ধিমার্কা উপন্যাস

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান্ধিমার্কা উপন্যাস

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান্ধিমার্কা উপন্যাস
154
0

আভাস অথবা ভণিতা

জন স্টুয়ার্ট মিল দাবি করেছিলেন ইংরেজ শাসন না থাকলে ভারতমুল্লুক সভ্য হতো না। ‘জঙ্গল বুক’ খ্যাত রুডিয়ার্ড কিপ্লিংও ভাবতেন ইংরেজরা চলে গেলে ভারত খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাবে। আরেক প্রথিতযশা জোসেফ কনরাডও বলেছিলেন, সাম্রাজ্যবাদ জিনিসটা যতই খারাপ হোক অসভ্যদের এই তো নিয়তি। এমনকি মহাত্মা কার্ল মার্ক্সও ১৮৫১ সালে ফরাসি চাষিদের প্রসঙ্গে বলেছিলেন—ওরা নিজেদের কথা বলতে পারে না, ওদের কথা ওদের হয়ে অন্য কাউকে এসে বলতে হয় [দ্রষ্টব্য : এডওয়ার্ড সায়িদ, ওরিএন্টালিজম]। সায়িদের কিতাব পড়লে আমরা দেখব তিনি এইসব কথাবার্তার জন্য তাদের ইউরোপ-আমেরিকান মননকে দায়ী করেছেন, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘প্রাচ্য-ব্যবসায়’।

বাঙালি শিক্ষিত সমাজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম-মৃত্যু ইতি-আদি বিষয় নিয়া আত্মহারা হয়ে থাকে কারণ তিনি আমাদের লোক—এই প্রাচ্যের লোক। জন্মবার্ষিকী-মৃত্যুবার্ষিকী আসে যায়, তার বিরাট কীর্তি নিয়ে আমরা মেতে উঠি উৎসবে, আলাপ-আলোচনায়। কিন্তু আলোচনাগুলো খুবই নিয়মতান্ত্রিক। আমাদের নাগরিক ডিসকোর্সে রবীন্দ্রনাথ অনেকটা নিষ্কলঙ্ক অর্থেই মহান পুরুষ হিসেবে পরিগণিত। নিয়মভাঙা কঠিন। সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে ক্রিটিক করাটাও কঠিন। কিন্তু পলিটিক্যাল রবীন্দ্রনাথকে? সেখানেও দু-একজন ব্যতীত তেমন কেউ তাকে কাঠগড়ায় হাজির করেন নাই। ব্রিটিশ আমলে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষ নেওয়ার অপরাধে কেউ তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করতে জোরালভাবে এগিয়ে আসেন নাই। কিন্তু সেই ১৯২২ সালে একজন মার্কসবাদী চিন্তাবিদ তাকে কাঠগড়ায় তুলেছিলেন। প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন তার প্রতি-বিপ্লবী ভূমিকাকে। তিনি গেয়র্গ লুকাচ।


একজন সৃজনশীল লেখক এবং চিন্তক হিসেবে ঠাকুরজি পুরাপুরি গৌণ কাতারের অধিভুক্ত।


লুকাচের এই লেখাটির ব্যাপারে জ্ঞাত হই আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. এ আই মাহাবুব উদ্দিন মারফত। আমি লেখাটির ইংরাজি সংস্করণ সেদিনই আকাশপাড়া থেকে নামিয়ে দেখি। কিছুটা একচোখা লেখা মনে হলেও লুকাচের কিছু প্রশ্নের কাছে হার মানতেই হয়। প্রকৃতপক্ষেই লেখাটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং জরুরি। রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন সময়ে যেভাবে ব্রিটিশদের ঢোলকনাথে পরিণত হয়েছিলেন সেটার এবং তার ঐতিহাসিক কর্তব্যবোধের পূর্ণাঙ্গ সোসিওলজিক্যাল বিশ্লেষণ দাঁড় করানোটা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে হয়। লুকাচের Tagore’s Gandhi Novel লেখাটি প্রথম প্রকাশিত [১৯২২] হয় বার্লিনের Die rote Fahne নামক সাময়িকীতে। লেখাটি অত্যন্ত কঠিন এবং দুর্বোধ্য। বোধগম্য করার জন্য যথাসাধ্য সহজে ভাষাবদল করার চেষ্টা চালিয়েছি। কোনো কোনো স্থানে ভাষাবদল করতে গিয়ে মূল অর্থ থেকে সরে আসতে পারি, ভুল-ত্রুটিও থাকতে পারে সেজন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।


লেখক পরিচিতি

বিচিত্র জীবনাভিজ্ঞতার অধিকারী ছিলেন গেওর্গ লুকাচ। হাঙ্গেরির এক ধনী ইহুদি পরিবারে ১৮৮৫ সালে তার জন্ম হয়। ১৯১৮ সালে হাঙ্গেরির কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তারপর থেকে নানা উত্থানপতন সত্ত্বেও মার্কসবাদে অবিচলিত আস্থা রেখে সারস্বত জীবন নির্বাহ করেন। ১৯১৯ সালের ক্ষণস্থায়ী কমিউনিস্ট শাসনে হাঙ্গেরির শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। যুদ্ধান্তে নির্বাসনে যান অস্ট্রিয়া, জার্মানি হয়ে শেষ পর্যন্ত রাশিয়ায়। ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরির অভ্যুত্থানের সময়ও মন্ত্রিসভায় ছিলেন। বিফল অভ্যুত্থানের পর আবার পলায়ন করেন। তবে ধরা পড়ে বুদাপেস্টে গৃহবন্দি থাকেন। ১৯৭১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মার্কসীয় নন্দনতত্ত্বের আলোচনার ইতিহাসে লুকাচের অবস্থান অনেক ওপরে। তার কর্মে ও চিন্তায়, মতানুগত্যে ও মননশীলতায় রাজনৈতিক অবিচলতার ও নন্দনতাত্ত্বিক মৌলিকতার সমাহার তাকে অনন্য সাধারণ খ্যাতি দিয়েছে। লুকাচের কয়েকটি বিখ্যাত বই Soul and Form [১৯১১], Theory of the Novel [১৯১৬], History and Class Consciousness [১৯২৩], Lenin: A Study on the Unity of His Thought [১৯২৪], The Young Hegel [১৯৩৮], Realism in the Balance [১৯৩৮], Goethe and His Age [১৯৪৬], Studies in European Realism [1948], German Realists in the Nineteenth Century [১৯৫১], Essays on Thomas Mann [৯৫৫] The Meaning of Contemporary Realism [১৯৫৭]।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান্ধিমার্কা উপন্যাস

জার্মানির কুলীন সমাজে ঠাকুরজির [রবীন্দ্রনাথ] উত্তরোত্তর (অপ)যশ বৃদ্ধির ঘটনা এদেশের সংস্কৃতি জগতে বড় ধরনের কেলেঙ্কারিগুলোর অন্যতম। এরূপ কেলেঙ্কারির পুনরাবৃত্তি জার্মানি কুলীন সমাজের অন্তঃসারশূন্যতার নিদর্শন বৈকি। তার এইরূপ যশপ্রাপ্তি আর কিছুই নয়, বরং প্রকৃত আর নকল লেখনীর মাঝে ফারাক করতে পারার ক্ষমতা বিনাশের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

একজন সৃজনশীল লেখক এবং চিন্তক হিসেবে ঠাকুরজি পুরাপুরি গৌণ কাতারের অধিভুক্ত। তার সৃজনশীলতার জোর অস্তিত্বহীন, তার রূপায়িত চরিত্রগুলো ছকে বাঁধা, ফ্যাকাশে, গল্পগুলো অতি-ব্যবহারে আকর্ষণহীন, নীরস, তার অনুভবশক্তিও দুর্বল এবং অসংহত। তিনি তার কর্মের মাঝে উপনিষদ আর ভগবত-গীতার কিছু জঞ্জালের টুকরো আর নিজস্ব একঘেয়ে, নিষ্ক্রিয় চিন্তার মিশ্রণ করে টিকে আছেন। সমকালীন জার্মান পাঠকদের নৈসর্গিক বুদ্ধি এতটাই আত্মপ্রত্যয়হীন হয়ে পড়েছে যে তারা কোনটা গ্রন্থমূল আর কোনটা উদ্ধৃতি তা শনাক্ত করতে পারে না এবং এটা ঠাকুরজি টিকে থাকার আরো একটি কারণ।


তিনি দেশপ্রেমিকদের নেতা মহাত্মা গান্ধির ঘৃণ্য পথ অনুকরণ করেছেন—তাকে নিরাপদ ছাউনি দিয়েছেন।


ফলশ্রুতিতে ভারতীয় দর্শনের এই জরাজীর্ণ উচ্ছিষ্টগুলো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয় না, উল্টো তারা [জার্মান] এসব অগণ্য বিষয়বস্তুকে দূর হতে দীক্ষিত ব্যক্তির বোধগম্য, নিগূঢ় জ্ঞান হিসেবে অনুমোদন দিয়ে সাকার করে। এটা বিস্ময়কর কিছু না। যখন জার্মানির শিক্ষিত জনগণ নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকল্পের সাথে সমন্বয় করে চলেছে, যখন তারা ধ্রুপদী ও স্পেংলারীয় দর্শনের ফারাক করতে পারে না, এমনকি ইয়ার্স, হফম্যান, পো [এডগার এলান] এবং আর সবার মাঝের পার্থক্য বোঝে না তখন ভারত থেকে পৃথিবীর সুদূর প্রান্তে বসে আসল সোনা তারা চিনবে কী করে? ঠাকুরজিকে বলা যেতে পারে ভারতীয় ফ্রেঞ্জেন [গুস্তাব ফ্রেঞ্জেন ১৮৬৩-১৯৪৫], যদিওবা তার প্রতিভার জোর ফ্রেঞ্জেনের চেয়ে কম, তিনি তাকে তার তৈলাক্ত একঘেয়েমিপূর্ণ রচনাবলিতে কদাচিৎ-ই স্মরণ করেছেন। তথাপি তার বিশাল সফলতার তাৎপর্যের মাঝে আমরা সমকালীন জার্মান মনোবৃত্তির প্রতিচ্ছবিকে দেখতে পাই।

রবীন্দ্রনাথকে এতটা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্য হলো তার আন্তর্জাতিক খ্যাতিকে [বিশেষ করে ব্রিটিশ খ্যাতিকে] প্রশ্নবিদ্ধ করা। ইংরেজ বুর্জোয়া গোষ্ঠীর কাছে ঠাকুরজিকে ধন ও মান [নোবেল প্রাইজ] দ্বারা ভূষিত করার যথেষ্ট কারণ ছিল। এটা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিনিধিকে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার প্রতিদান। পূর্ণ সম্মতি কিংবা অহিংসতা মতবাদের মতো প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানমণ্ডলের বিভিন্ন জঞ্জালের টুকরো যখন স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত করা হয় তখন তা ব্রিটিশদের জন্য অবশ্যই অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তব অর্থ বহন করে। ঠাকুরজির নাম-যশ, দাদাগিরি যতই বাড়বে ততই কার্যকরভাবে তার লেখনী দ্বারা স্বদেশি মুক্তি আন্দোলনকে দমিয়ে রাখা যাবে। আখ্যান রচনা করতে রবীন্দ্রনাথ তার একঘেয়েমিপনা আর নিষ্প্রাণ উপন্যাসে খুবই নিম্নমানের নিন্দামূলক লেখনীর আশ্রয় নিয়েছেন। এই নিন্দাভরা আখ্যানগুলো জ্ঞানসম্পন্ন পাঠকের কাছে বিস্বাদময়তা ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনে না। তারা যতই প্রজ্ঞা দ্বারা নিজেদের পরিব্যাপ্ত করেছেন ঠিক ততই তিনি প্রতারণামূলক চেষ্টা চালিয়ে ‘চিরন্তন মনুষ্যত্ব’ নামক জটিল দর্শনের ভিতর মুক্তিসংগ্রামের প্রতি তার যে অক্ষম ঘৃণা তাকে আড়াল করেছেন।

উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে রচিত বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘর্ষগুলো কিন্তু সহিংসতার প্রশ্নের সাথে জড়িত। ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করার সংগ্রাম চালানো, একে ভারতীয় বাজার থেকে বিতাড়িত করা এবং স্বদেশি পণ্যকে এর স্থলাভিষিক্ত করা—ঠাকুরজি তার উপন্যাসে জাতীয় সংগ্রামের সূত্রপাতকে চিত্রায়িত করেছেন এভাবে। এবং ঠিক পরেই তিনি তার লাখ টাকার প্রশ্ন উত্থাপন করলেন—মুক্তিসংগ্রামে সহিংসতার প্রয়োগ কি নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য? এখান থেকে তার মনোভাবকে অনুমান করা যায় যে ভারতমাতা অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে ক্রীতদাসে পরিণত হলেও ব্যাপারগুলো তাকে কোনো নাড়া দেয় নাই। তিনি এসব প্রশ্নের প্রতি কোনো আগ্রহ না দেখিয়ে একজন দার্শনিক এবং নীতিবিদ হিসেবে শুদ্ধ ‘পরকালীন সত্য’ নিয়া চিন্তিত ছিলেন। তিনি মনে করেন, ব্রিটিশরা এসে যা খুশি করুক, হিংস্রতার আশ্রয় নিয়ে তাদের আত্মাকে দূষিত করে করুক—তাতে আমাদের কী? তার দায় হলো ভারতীয়রা যাতে মুক্তি সংগ্রামে তাদের মতো সহিংসতা, প্রবঞ্চনার সুযোগ নিয়া নিজেদের আত্মাকে দূষিত না করে সেদিকে দৃষ্টি রাখা এবং এর সাথে জড়িত বিপদ থেকে তাদের আত্মাকে রক্ষা করা। তিনি লিখেছেন, যারা সত্যের জন্য প্রাণ বিলীন করে তারা অমর; এবং যদি সমস্ত মানবসন্তান সত্যের জন্য জীবন দান করে তবে মানুষ সভ্যতার ইতিহাস হবে চিরন্তন, অক্ষয়।

এরূপ চিন্তা-চেতনা ভারতমাতার চিরন্তন পরাধীনতার ভাবাদর্শকেই প্রকাশ করে। কিন্তু ঠাকুরজি এই মনোভাবকে আরো সরাসরি প্রকাশ করেছেন তার উপন্যাসের চরিত্র এবং ঘটনাবলির মাধ্যমে। এগুলোতে যে মুক্তি আন্দোলনের চিত্র তিনি এঁকেছেন তা বুদ্ধিজীবীদের কাছে রোম্যান্টিক আন্দোলনের বাড়া বৈ কিছু না। পারিপার্শ্বিকতায় পুরাপুরি অমিল থাকায় খুব বেশি সাদৃশ্য না পেলেও ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন আমাদেরকে ইতালির কারবোনারি আন্দোলন, রুশ দেশের নারোদিক আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই সংগ্রামগুলিতে রোম্যান্টিক ইউটোপিয়বাদ, অতিরঞ্জিত ভাবাদর্শ এবং ক্রুসেডীয় স্পৃহার মতো বিষয়গুলি অবিছিন্ন অংশের ন্যায় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এগুলিকে ঠাকুরজি কেবলমাত্র তার নিন্দামূলক আখ্যানের সূত্রপাত হিশেবে ব্যবহার করেছেন। ক্রুসেডীয় রোম্যান্টিকতার আদর্শ প্রতিনিধিরা নিঃসন্দেহে মৌলিক ভাববাদ এবং আত্মবিসর্জনের চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাদের বানালেন দুঃসাহসিক অপরাধী। তার চিত্রায়িত নায়ক একজন গৌণ ভারতীয় কুলীন, যে তার মতবাদের ঢোলবাদক হিশেবে কাজ করে। সে দেশপ্রেমের অন্যায্য আকর্ষণকে উপেক্ষা করায় অন্তর-বাহির উভয় দিক থেকেই বিপর্যস্ত এক মানুষ। তার ঘরেও সুখ নাই। সে প্রায়শই দেশপ্রেমের পীড়ায় পীড়িত হয়ে নিজের বিবেকের সাথে যুদ্ধ করে। ঠাকুরজির নিকট তিনি অবশ্য জাতীয় আন্দোলনের কোনো শত্রু নয়, বরং জাতীয় শিল্পব্যবস্থার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী। ঠাকুরজি এভাবেই স্বদেশি উদ্ভাবনীসমূহ নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন, যদিও এসবের জন্য তাকে কোনো মূল্য গুনতে হয় নাই। তিনি দেশপ্রেমিকদের নেতা মহাত্মা গান্ধির ঘৃণ্য পথ অনুকরণ করেছেন—তাকে নিরাপদ ছাউনি দিয়েছেন।

কিন্তু বরফ যখন আর গলে নাই, তিনি তখন সহিংসবাদী দেশপ্রেমিকদের দ্বারা আক্রান্ত গোষ্ঠীকে তার নিজস্ব ক্ষমতাবল এবং ব্রিটিশ পুলিশ মারফত রক্ষা করলেন। এহেন প্রচারণামূলক, লোক খেপানো একপেশি ভঙ্গিমা তার উপন্যাসের শৈল্পিক দিককে পুরাপুরি মূল্যহীনভাবে উপস্থাপন করেছে। ঠাকুরজির নায়কের প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রতিপক্ষ নাই। মূলত তার প্রতিপক্ষ হলো একজন রোমাঞ্চাভিলাসী—যে নায়কের স্ত্রীকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে, দেশের স্বার্থ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে, কিন্তু সেগুলো সে দেশের আন্দোলনে খরচা করে না, বরং স্বর্ণের দীপ্তিময় দৃশ্যকে সে উপভোগ করতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই একসময় তার ছলনায় বিপথে যাওয়া নর-নারীদের সামনে তার মুখোশ খুলে যায় এবং তারা রাগে-বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নেয়।


তিনি তার প্রজ্ঞাকে ব্রিটিশ পুলিশের বুদ্ধিবৃত্তিক সেবা প্রদানে নিয়োজিত করেছেন।


তার প্রতিভার জোর একটি রুচিসম্মত আখ্যানেও বিস্তৃতি লাভ করে নাই। তিনি দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে কার্যকর কিছু কুৎসা রচনা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেখানেও তার কল্পনাশক্তির অভাব লক্ষণীয়। দস্তয়ভস্কি তার প্রতি-বিপ্লবী উপন্যাসগুলিতে অন্তত কিছুটা হলেও তা করে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। তার পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণিদের নিয়ে লেখা নিম্নমানের গল্পসমূহের আধ্যাত্মিক দিকগুলি ভারতীয় প্রাজ্ঞতার ভূগর্ভ থেকে একেবারেই আলাদা এবং এটা ছিল তারই যোগসাজশ। এক কথায় বলতে গেলে এগুলিতে তিনি চিত্রিত করেছেন গৃহকর্তার জটিলতা-সমস্যা : কিভাবে একজন নেহাত সৎ-ভালো মানুষের স্ত্রী একজন রোমাঞ্চসন্ধানী পুরুষের দ্বারা পুলকিত হয় এবং পর্দা ফাঁস হলে সব বুঝতে পেরে বিবেকের দংশনে পুনরায় স্বামীর বুকে ফিরে আসে।

ইনি সেই ‘মহান’ ব্যক্তি যাকে জার্মান কুলীনসমাজ পয়গম্বর ভেবে পূজা করে—তার স্বরূপ প্রকাশের জন্য এই সামান্য কিছু নমুনাই যথেষ্ট। যদিও জানি তাঁর গুণগ্রাহীরা এধরনের বাতিলমূলক সমালোচনার প্রতি অভিযোগের তির ছুড়বে এবং রবীন্দ্রনাথের লেখনীকেই অধিকতর সার্বলৌকিক হিশেবে গণ্য করবে। এই গোলমালের যুগে তারা এ বিষয়গুলিকে বিনা বিচারে মেনে নেয় নাকি এসব উত্তেজনামূলক যুগোপযোগী প্রশ্নের জবাব দেয় তার দ্বারাই বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার তাৎপর্য সূক্ষ্ম ও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে। মূলত কোনো তত্ত্ব বা দৃষ্টিভঙ্গির মূল্য বা মূল্যহীনতা যথাযথভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দুঃখ-ক্লেশ কিংবা যুদ্ধ-বিগ্রহে তা মানুষের জন্য কী বাণী প্রচার করে তার উপর। কোনো বিশুদ্ধ তত্ত্বের প্রজ্ঞাকে শূন্যের মাঝারে [কিংবা কোনো অভিজাত সমাবেশের চার দেয়ালের ভিতর] যাচাই-বাছাই করা কোনো সহজসাধ্য কাজ নয়। এটা ঠিকই একসময় মানুষের দিকনির্দেশক হবার দাবি তুলবে। রবীন্দ্রনাথও তার উপন্যাসকে পুঁজি করে সেই দাবি জানিয়ে সভ্যসমাজে এসেছেন। পূর্বেই বলেছি, তিনি তার প্রজ্ঞাকে ব্রিটিশ পুলিশের বুদ্ধিবৃত্তিক সেবা প্রদানে নিয়োজিত করেছেন—তার মতো ব্যক্তির অবশিষ্ট প্রজ্ঞার প্রতি বিশেষ মনোযোগ নিবিষ্ট করার আর কোন প্রয়োজন আছে কি?

(154)