হোম গদ্য যে মৃত্যুকে অপমান করে সে বাঙালি নয়

যে মৃত্যুকে অপমান করে সে বাঙালি নয়

যে মৃত্যুকে অপমান করে সে বাঙালি নয়
4.73K
0

সম্প্রতি ভারতীয় ইউনিয়ন রাষ্ট্রের বাঙালি অধ্যুষিত প্রদেশে প্রদেশে চলছে এনআরসি কাণ্ড। কে নাগরিক কে নাগরিক নয়। এর স্পষ্ট লক্ষ্য এবং শিকার যে বাঙালি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রীতিমতো সে দেশে ‘বাংলাদেশ’ এবং ‘বাংলাদেশি’ শব্দ দুটো প্রায় ভয়ংকর অপমানজনক শব্দে পরিণত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো ভারত সরকার বাংলাদেশকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাসম্পন্ন বন্ধু বলে প্রচারও করে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এই বাঙালি খেদানোর উৎসব বা এনআরসি এবং সেখানে বসবাসরত বাঙালিদের হালহকিকত নিয়ে কথা বলার আগে একটু আলো ফেলতে চাই দিল্লি এবং বাংলা ও বাঙালির ঐতিহাসিক সম্পর্কের উপর। দেখব আজকের ভারত রাষ্ট্রের জন্মবৃত্তান্ত।

শুরুতেই একটি সত্যের মুখোমুখি হতে চাই। ভারত কি কোনো কালে একটি দেশ ছিল? না। এটা একটি মহাদেশীয় অঞ্চল, ইউরোপের মতো। জার্মানি এবং ফ্রান্স যেমন একটি দেশ নয়, তেমনি বাংলা এবং দিল্লি-পাঞ্জাবও একটি দেশ নয়। বেলজিয়াম এবং গ্রিস যেমন একটি দেশ নয় তেমনি বেলুচিস্তান ও তামিল নাড়ুও একটি দেশ নয়। মহাদেশীয় সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের একটি ঐক্য যেমন ইউরোপিয়ানদের মধ্যে আছে, তেমনি দক্ষিণ এশিয়া বা ভারতবর্ষেও আছে। ইউরোপ জুড়ে যেমন বিভিন্ন সময় নানান জাতির নানা রকম সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন হয়েছে—গ্রিক, রোমান, জার, ফ্রেন্স, জার্মান, ব্রিটেন ইত্যাদি, তেমনি দক্ষিণ এশিয়া জুড়েও হয়েছে—নন্দ, মৌর্য, গুপ্ত, সাতবাহন, পাল, দিল্লি সালতানাত, বাংলা সালতানাত, মুঘল সাম্রাজ্য ইত্যাদি। ভৌগোলিকভাবেও আফগানিস্তান থেকে আরাকান পর্যন্ত অঞ্চল আসলে এশিয়া মহাদেশের অংশ নয়। আলাদা ভূ-প্লেট। এটি সাড়ে পাঁচ কোটি বছর আগে এসে এশিয়ান প্লেটের সাথে ধাক্কা খায় এবং হিন্দুকুশ-হিমালয়-আরাকান পর্বতশ্রেণির জন্ম দেয়।


হাজার হাজার বছর ধরে প্রায় স্বাধীন এবং দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল বাংলা বলয়।


হোমোসেপিয়ান সেপিয়েন্স তথা আমাদের প্রজাতির মানুষ আফ্রিকা থেকে এ অঞ্চলে আসে আনুমানিক সত্তর থেকে ষাট হাজার বছর আগে। মজার ব্যাপার হলো পূর্বমুখী যে দুটি গ্রেট হিউম্যান মাইগ্রেশন হয়েছে তার পথরেখা বয়ে গেছে বঙ্গীয় অঞ্চলের উপর দিয়ে। এ সময়কালের মধ্যে পৃথিবী থেকে অতিক্রান্ত হয়েছে একাধিক বরফযুগ। দক্ষিণ এশিয়া নিরক্ষীয় অঞ্চল বরাবর হওয়ায় বরফযুগে এখানে সূর্যের আলো ও তাপ বেশি পাওয়া যেত। এ কারণে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এ অঞ্চলে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর ঘনসন্নিবেশ ছিল। ফলে এ অঞ্চলের নৃ-বৈচিত্র্যও বিপুল। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উত্তরপূর্বের একটা বিরাট এলাকা জুড়ে—বিশেষ করে অধুনা বিহার, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, আসামসহ পূর্বের পার্বত্য অঞ্চল অবধি বসবাসরত জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে ভাষা-সংস্কৃতি এবং নৃতাত্ত্বিক ঐক্যের কিছুটা লক্ষণ দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই। মগধ-কেন্দ্রিক সাম্রাজ্যের এ ক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা থাকতে পারে।

এই বৈচিত্র্যের মধ্যে নৃ-ধারার ঐক্যের প্রবাহটি বোঝা যায় তাদের প্রাকৃত ভাষাটির কারণে। যে ভাষা এখন আমাদের কাছে এক আলো-আঁধারি ভাষা। যে ভাষা থেকে আজ জন্ম হয়েছে—মৈথিলি, বাংলা, উড়িয়া, অসমি, মণিপুরিসহ নানান ভাষার। আধুনিক নৃ-বিজ্ঞানীরা এই সমগ্র অঞ্চলের নৃ-ধারাগুলোকে শনাক্ত করে থাকেন বাঙালি রেস বলে। চাইনিজ ম্যান্ডারিন রেসের পর এটাই পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম রেস। এটি একটি সাংস্কৃতিক বলয়ও। দক্ষিণ এশিয়ায় এমন বলয় আরও কয়েকটি আছে। যেমন : আফগানিস্তান-পাকিস্তানের একটা বিরাট অঞ্চল জুড়ে পসতুন বলয়, উত্তর ভারত এবং পাকিস্তানের একটা অঞ্চল নিয়ে হিন্দুস্থান বলয়, দক্ষিণ ভারতের তামিল বলয়। মধ্য ও পশ্চিম ভারতের গুজরাট-মারাঠা বলয়। এই সব বলয় থেকে ঐতিহাসিক কালপর্বে নানা রকম সাম্রাজ্যের উত্থান এবং বিলয় হয়েছে। বিহার বা মগধ ছিল বাংলা বলয়ের একটি প্রধান কেন্দ্র। প্রাচীন কাল থেকেই কখনও কখনও এই মগধ থেকে কেন্দ্রীয় বাংলা শাসিত হয়েছে, আবার দেখা গেছে দীর্ঘকাল ধরে মগধও কেন্দ্রীয় বাংলা থেকেই শাসিত হচ্ছে। কাজেই প্রাচীন কাল থেকে কেন্দ্রীয় বাংলার সাথে মগধের সম্পর্ক ছিল প্রায় অবিচ্ছেদ্য। একারণেই বোধহয় বিহার বা মগধকে কখনও কখনও বগধও বলা হতো [যদিও আজকের বিহার অঞ্চল তাদের ভাষা সংস্কৃতি হারিয়ে হিন্দুস্থান বলয়ের অংশ হয়ে উঠেছে]।

উপকথায় এই বাংলা বলয়ের খ্রিস্টপূর্ব যুগের এক রাজপুত্র, বীর যোদ্ধা বিজয় সিংহের খবর আমরা পাই। যে শ্রীলংকা দখল করে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। উপকথারই-বা কী দরকার! এ অঞ্চল যে প্রাচীন সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল তার তো প্রমাণ অজস্র পুরাকীর্তিই দিয়ে থাকে। যদিও উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় বৈদিক হিন্দু ঋষি পুরোহিতরা বাংলা বলয় সম্পর্কে যথেষ্ট বিদ্বেষমূলক উক্তি করেছেন খ্রিস্টপূর্ব যুগে। বোঝাই যাচ্ছিল—এ অঞ্চলের শক্তিশালী সামরিক এবং সাংস্কৃতিক উপস্থিতি ছিল এর মূল কারণ। তার একটি বড় প্রমাণ আমরা পাই খ্রি. পূ. ৪র্থ শতকে—আলেকজান্ডারের সাথে আসা মেগাস্থিনিসের বর্ণনায়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলার শক্তিশালী সমর উপস্থিতির কথা। যা আলেকজান্ডারকে হতোদ্যম করেছিল। বাঙালিরা তো তাদেরই বংশধর। এর অব্যবহিতকাল পরেই আমরা দেখতে পাই সাত-আটশ বছর জুড়ে বাংলা বলয়ের মগধ কেন্দ্র থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দু’দুটি বড় সাম্রাজ্যের উত্থান। মৌর্য সাম্রাজ্য এবং গুপ্ত সাম্রাজ্য। এর পরই দেখতে পাই কেন্দ্রীয় বাংলায় শশাঙ্ক সাম্রাজ্য, অতঃপর ইতিহাসের দীর্ঘ রাজবংশ—ভূমিপুত্র পালদের বাংলা-কেন্দ্রিক পাল সাম্রাজ্য, চারশত বছরের পাল শাসন। অতঃপর বাংলায় সূচনা হয় সেন সাম্রাজ্যের। সেনরা বিদেশি হলেও তাদের কোষাগার এবং শাসনকেন্দ্র বাংলাই ছিল। ফলে দেশ পরাধীন ছিল না এবং শাসককেও বিদেশি বলা যায় না। এই পর্যন্ত হিশেব করে দেখুন, বাংলা বা বাংলা বলয় কি পরাধীন ছিল? না, হাজার হাজার বছর ধরে প্রায় স্বাধীন এবং দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল বাংলা বলয়।

এবার আসা যাক দিল্লি প্রসঙ্গে। শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে এতকাল দিল্লির তো কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে? হাঁ, দিল্লি শক্তিশালী রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় বিজয়ী তুর্ক-আফগান মুসলমানদের হাতে। মুহাম্মদ ঘোরি এ অঞ্চল জয় করে যে সাম্রাজ্য স্থাপন করেন তার শাসক হন তারই এক ক্রীতদাস।

মজার ব্যাপার হলো, ঠিক ওই সময়ই দিল্লির কোনো সমর-প্রতিনিধি নয় একজন স্বাধীন তুর্কি অভিযানকারী যোদ্ধা বখতিয়ার খলজি বাংলা বলয়ে প্রবেশ করেন। প্রথমে বিহার জয়, তারপর কেন্দ্রীয় বাংলা। দিল্লির সাথে তার সম্পর্কও প্রভু-ভৃত্যের ছিল না। তবে ঐ শতাব্দীতে তথা ত্রয়োদশ শতকে অধিকাংশ সময়ই বাংলার শাসকরা সার্বভৌম ছিলেন। খণ্ড খণ্ড কয়েক দশক কেবল দিল্লির অধীনতা ছিল। এই শতকেই বোধহয় প্রথম দিল্লি থেকে বাংলা শাসনের চেষ্টা দেখা যায়। পরের শতাব্দীর শুরুর দিকেই ব্যাপারটি গেল উল্টে। সোনার গাঁয়ের সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের স্বাধীন সুলতানি শাসনের কিছুদিন পরেই গৌড়ের সুলতান হন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। তিনি দখল করে ফেলেন প্রায় সমগ্র বাংলা বলয়। শাহ-ই-বঙ্গাল উপাধি নিয়ে সূচনা করেন বৃহত্তর বাংলা সালতানাতের। প্রতিপক্ষ হিসেবে অর্ভিভূত হন দিল্লি সালতানাতের। অচিরেই আক্রমণ করে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক। কিন্তু বাংলার জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, কৌশলে প্রতিহত হয় সে আক্রমণ। সেই থেকে টানা দুই শত বছর অর্থাৎ ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত অক্ষুণ্ন ছিল বাংলা সালতানাতের সার্বভৌমত্ব। কিন্তু ষোড়শ শতকের শেষের দিকে এসে প্রথম দিল্লি থেকে শতাব্দীকালের অধিক সময় বাংলা শাসনের ইতিহাস সৃষ্টি হয় মুঘলদের হাতে। অবশ্য মুঘলদেরই সুবেদার মুর্শিদকুলি খাঁর হাত ধরে আঠারো শতকের শুরুর দিকে প্রায় সমগ্র বাংলা বলয় আবার সার্বভৌম এক দেশ হয়ে ওঠে। সে ছিল স্বাধীন নবাবি আমল, মাত্র ৪০ বছরের।


ব্রিটিশরা সবার আগে দখল করেছিল বাংলা, সবচেয়ে বেশি ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন হয়েছিল এই বাংলায়।


এরপরই দেশ যায় দূর মহাদেশের ব্রিটিশ বেনিয়াদের হাতে। দেশ হয় কলোনি। শুধু কি বাংলা বলয়! ধীরে ধীরে তারা দখল করে মুঘল সম্রাটদের দখলি অঞ্চল, মারাঠাদের দখলি অঞ্চল, অনেক রাজা মহারাজাদের দেশ অর্থাৎ পুরো দক্ষিণ এশিয়াই তাদের করতলগত হয়। বিশ্বজোড়া তাদের সাম্রাজ্য, কেন্দ্র ইংল্যান্ডে। তারা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নাম দেন কলোনি ‘ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া’। এই ব্রিটিশ ইন্ডিয়া নামক কারাগারের আয়তন পৌঁছে বর্মা অব্দি। দক্ষিণ এশিয়ার নানা দেশের নানা মানুষ, সবাই পরাধীন দূর মহাদেশের এক জাতির কাছে, সবাই ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার বাসিন্দা। সেই জবর দখলকারী প্রভুর দেয়া সাধারণ পরিচয় ইন্ডিয়ান বলে পরিচিত। রাজপ্রভু যে নামে চিনবেন সেটাই তো পরাধীন কলোনির লোকদের পরিচয় হবে, আবার একই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইরত জাতিগুলোর ইন্ডিয়ান পরিচয়টিও একটি প্লাটফর্মের মতো কাজ করতে থাকে। দীর্ঘ সময় এই কলোনির শাসনকেন্দ্রও ছিল বাংলায়, কলকাতায়। অবশ্য বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তা আবার চলে যায় দিল্লি, সেই সুলতান-বাদশাদের নগরে। ব্রিটিশরা সবার আগে দখল করেছিল বাংলা, সবচেয়ে বেশি ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন হয়েছিল এই বাংলায়।

কথায় বলে শোষকের চরিত্রদোষ শোষিতদের মধ্যেও সংক্রামিত হয়। ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার স্থানীয় শাসনকেন্দ্র কলকাতার কিছু বাংলাভাষী লোক স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন সাদা প্রভুকে এই শাসনকেন্দ্র এবং অজস্র দেশ-জাতির বিশাল এই কারাগার বা কলোনি সাম্রাজ্য একদিন অবশ্যই ফেলে যেতে হবে। সেদিন আমরা হব এর মালিক। অতএব তারা অল-ইন্ডিয়ান ইজম বা সর্ব-ভারতীয় জাতিবাদের সলতে পাকাতে শুরু করলেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেই সলতে আর তাদের হাতে থাকল না। চলে গেল গুজরাটি-মারাঠাদের হাতে। দুঃখের ব্যাপার, শুরুতে তারা একবারও ভাবল না—এই সমগ্র অঞ্চলটি ব্রিটিশদের জবরদখল করা ভূমি, এখানে বিকাশ-উন্মুখ অনেক ভাষার অনেক জাতির মানুষ গুমরে মরছে। ন্যায়ত বাঙালিরা চাইতে পারত তাদের দেশের স্বাধীনতা, যে দেশ ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশরা তাদের থেকে দখল করেছিল। কিন্তু না, কলোনিয়াল কারাগারের কয়েদি পরিচয়ই হয়ে উঠল তাদের জাতীয়তাবাদ। পুরো কলোনি সাম্রাজ্যই হয়ে উঠল তাদের দেশ। এই বিভ্রম এক অভিশপ্ত বাস্তবতার জন্ম দিল পরবর্তী সময়ে।

পুরো দুই শত বছর দক্ষিণ এশিয়াকে চুষে ছোবলা বানিয়ে ফেলেছিল ব্রিটিশরা, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ তারা নিয়ে গেছে এ অঞ্চল থেকে। আর এই অপকর্মের উপযুক্ত সহযোগী তৈরির জন্য যেমন শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন, দালাল সংস্কৃতি প্রয়োজন তার সবটুকুই সার্থকভাবে তারা করে গেছেন।

প্রথাগত ইতিহাসে বলা হয়—১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়া স্বাধীন হয়েছে। আসলেই কি? না। সমস্ত নথিপত্র বলছে—ব্রিটিশদের দালাল এমন সব রাজনীতিবিদদের হাতে সুবিধা মতো কলোনির দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে সটকে পড়েছে ব্রিটিশরা। তবে কেন তাদের এই হঠাৎ চম্পট দেওয়া! এটাই ব্রিটিশ চিন্তার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। তারা তাদের অনিবার্য বিধ্বস্ততাকে এড়াতে পারেন কৌশলে। ভারতবর্ষের তথাকথিত স্বাধীনতায় যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষর করেছিলেন তিনিই পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন : গোয়েন্দা মারফত তাদের কাছে খবর ছিল—পুরো কলোনির অভ্যন্তরে একটা বড় বিদ্রোহের আয়োজন চলছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর পক্ষে সামাল দেয়া মোটেই সম্ভব নয় এবং আরও একটি বড় ভয় ছিল তাদের ঘোরতর বিরোধী এক বাঙালি নেতা, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। যে কিনা বিদেশে বসেই পুরো কলোনির জন্য সরকার, সেনাবাহিনীসহ ব্যাংক পর্যন্ত তৈরি করে ফেলেছিলেন। ব্রিটিশরা জানতেন ঘোর শত্রুর চেয়ে দালাল বন্ধুদের হাতে ক্ষমতা দেয়া নিরাপদ। তাতে করে এই অঞ্চলে তাদের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় থাকবে। ব্রিটিশদের হিন্দু-মুসলমান পাতানো খেলায় এই রাজনৈতিক দালালিতে এগিয়ে ছিল কিছু গুজরাটি হিন্দু-মুসলমান নেতা। এদের হাতেই মূলত ব্রিটিশরা ১৯৪৭ সালে ভারতীয় ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান নামক প্রধান দুটি জাতিরাষ্ট্রের কারাগার রচনা করে দেন। কলোনি কলোনিই থাকে, শুধু তার প্রভুর বদল হয়। যদিও প্রস্তাবিত তিনটি ডমিন বর্মা ইউনিয়ন, ভারতীয় ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান ডমিনের সাথে স্বাধীন বাংলা ডমিনেরও প্রস্তাব ছিল। শরৎ বোস, সোহরাওয়ার্দি, আবুল হাসিম, কিরণ শঙ্করসহ বাংলার বেশ কয়েকজন নেতা চেষ্টা করেছেন বাংলা বলয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের। কিন্তু বাঙালি হিন্দুদের একটি উগ্র অংশ সমগ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এতটাই বিরোধ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল যে, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে গেলেও তাকে ভেঙে পশ্চিমের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে একটি হিন্দু বাংলা প্রদেশ তৈরি করতে হতো।

বঙ্গীয় আইন পরিষদে এ নিয়ে ভোটাভুটিও হয়। বাঙালি মুসলমান সংসদ সদস্যরা ভোট দেন বাংলা না ভাঙার পক্ষে, কিন্তু হিন্দু সদস্যরা ভোট দিলেন ভাঙার পক্ষে। অতএব বাংলা আর স্বাধীন হওয়ার সুযোগ পেল না। সুভাষ বোসের দেশ—দু’টুকরো। পশ্চিমের প্রায় এক তৃতীয়াংশ চলে গেল ভারতীয় ইউনিয়নে। বাকি বৃহত্তর অংশটি পাকিস্তানে। অন্যদিকে ১৮৭৪ সালে তৎকালীন নতুন প্রদেশ আসামকে স্বাবলম্বী করার জন্য ব্রিটিশরা বাংলা থেকে আসামের সাথে যুক্ত করেছিল গোয়ালপাড়া এবং সিলেট অঞ্চল। গোয়ালপাড়া তো রয়ে গেল আসামের সাথে, কিন্তু সিলেটের একটা অংশ আবার ফিরল পূর্ববঙ্গে, সিলেট নামে। কেন্দ্রীয় বাংলা ভাগ না হলে অবশ্যই আসাম যুক্ত হতো বাংলা ডোমেইনের সাথে। কিন্তু সেখানে পড়ে রইল মূল বাংলার বিরাট ভূখণ্ড এবং ভূমিপুত্ররা। যারা একাধিকবার সেখানে গণহত্যার শিকার হয়েছে, এথনিক ক্লিনজিংয়ের শিকার হয়েছে এবং এখন মরছে এনআরসির জাঁতাকলে।


বাঙালিদের প্রধান শত্রু আর কেউ নয়, তারা নিজেরাই, তাদের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, তাদের অনৈক্য। 


উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের হিন্দিস্তান-পাকিস্তান বলয়ের লোকেরা মূলত একই জনগোষ্ঠীর। এদের মধ্যে ধর্মীয় পার্থক্য ছাড়া বিশেষ তেমন পার্থক্য নেই। খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই এদের পূর্বপুরুষরা বাংলা বলয় সম্পর্কে বিদ্বেষ এবং হীনম্মন্যতায় ভুগেছে। দীর্ঘকাল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বাংলা বলয়ের প্রতি এদের শত্রুতা যেন অনেকটা রক্তের মধ্যে বিরাজমান। সে যতই ধর্মে মিল থাকুক বা নাই থাকুক। এদের মুসলিম পার্ট ১৯৭১ সালে পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের হাতে মার খেয়ে পালিয়েছে। ফলে হিন্দিস্থানীরা ভারতীয় বাংলার বাঙালিদের নিয়ে যে উদার-উদাসীন তা মোটেই নয়।

বস্তুত বাঙালি এবং বাংলা বলয় চেতনে-অবচেতনে তাদের কাছে আতঙ্কজনক এক প্রতিপক্ষ। কাজেই ভারত জুড়ে বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত, শতধা ছিন্নভিন্ন এই বাঙালিকে হীন করতে, কোণঠাসা করতে তারা মরিয়া। তারা চায় বাংলা বলয়ের ভূমির দখল, তারা চায় বাংলা বলয়ের মেরুদণ্ড বাঙালিদের উৎখাত করতে, তারা চায় বাংলা বলয়ের সংস্কৃতি এবং ইতিহাসকে নিশ্চিহ্ন করতে। ফলে জরুরি হয়ে উঠেছে বাঙালি খেদানো এবং তাদের ভূমিতে হিন্দিস্তানি সাম্রাজ্যের চাপরাশ বহনকারীদের রোপণ করা। অতএব নামল এনআরসির খেলা। অথচ ব্রিটিশ শোষণের যুগে যখন কলোনির স্থানীয় শোষণকেন্দ্র বাংলায় ছিল, এই উত্তর-ভারতীয়রা কলকাতায় এসে বাঙালিদের অগ্রসর জনগোষ্ঠী মনে করত। যেহেতু বাঙালিরা দালালি শিক্ষায় অগ্রসর ছিল, সেই সাথে অনেক আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানও তাদের জানা ছিল, ফলে হিন্দিস্তান বলয়ের লোকরা এদের সমীহ করত। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা জেনে ফেলে বাঙালিদের বিরাট অসুখ এবং দুর্বলতার খবর। বাঙালিদের প্রধান শত্রু আর কেউ নয়, তারা নিজেরাই, তাদের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, তাদের অনৈক্য। বাংলা বলয়ের উত্থান না হওয়ার প্রধান কারণও তাই। কেন্দ্রীয় বাংলা বলতে আজ বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ বোঝালেও প্রান্তিক বাংলা—ত্রিপুরা, আসাম, বিহার, ঝাড়খণ্ড থেকে উড়িষ্যা পর্যন্ত। এই পুরো অঞ্চলেই বাঙালি এবং তাদের কাছাকাছি নৃ-গোষ্ঠীর লোকেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করে। এরা এ অঞ্চলের ভূমিপুত্র। এ তো নবাবি বাংলা, সুবা বাংলা, বাংলা সালতানাতের ভূমি। এটা সেন বাংলা, পাল সাম্রাজ্যের মূল ভূখণ্ড। বাঙালির দেশ।

আজকের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ তো সেই ডুবে যাওয়া বৃহৎ বাংলাদেশের এক টুকরো সার্বভৌম মুখ মাত্র, সুকান্তের সেই ‘দুর্মর’ কবিতার মতো ‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয়/ জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়’। ১৯৪৭ সালে ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে ডুবে গেছে বিরাট বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে ডুবে যাওয়া বাংলাদেশ অংশ আবার জেগে উঠেছে—বাংলাদেশ নামে ১৯৭১ সালে, এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর। এই গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশের মানচিত্রটুকু তৈরি হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, স্রেফ ধর্মীয় কারণে, প্রধানত বাঙালি মুসলমানদের জন্য। [এটিও যদি বাকি অংশের মতো ভারতে ডুবে যেত তাহলে আজও স্বাধীন হতো কি না সন্দেহ!] ফলে বাঙালি হিন্দুরা ভারতীয় বাংলা বলয়ে যাবে—এটাই ছিল তখনকার ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত। তবুও যে চরম সত্যটি এখন উপেক্ষিত, তা হলো ভূমিপুত্র নিজভূমেই আছে, শুধু দেশের প্রান্ত বদল মানে বিদেশ নয়। যে বাঙালির বাংলা বা বাংলা বলয়, সেখান থেকে বাঙালি খেদানো এক ঘোরতর নৈতিক অপরাধ। অনিবার্যভাবেই এ অঞ্চল তাদের দেশ, তাদের ঠিকানা। সমগ্র বাংলা বলয়ের মাটি তাদের পূর্বপুরুষদের মাটি, রয়েছে নিঃশর্ত অধিকার। একটি বিরাট জনগোষ্ঠীকে তার নিজভূমে পরবাসী বানানোর সিদ্ধান্ত ন্যায়ত কোনো আইন হতে পারে না। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ থেকে পাওয়া এক তথ্যে দেখা গেছে সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ ভোটার বানিয়েছে হিন্দিভাষীরা, যার ৭০ ভাগই ভুয়া। অর্থাৎ মূল ভূখণ্ডেই ক্ষমতাহীন সংখ্যালঘু হওয়ার প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা । ঝাড়খণ্ড, ছত্রিশগড়, উড়িষ্যা, বিহারের কথা আর নাই বললাম।

এবার আসুন একুশ শতকের শুরুতে বাঙালিদের সার্বিক অবস্থাটা এক ঝলক দেখে নেই। বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কমবেশি বাঙালিদের পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের নিজেদের দেশ এখন দুটি রাষ্ট্রে বিভাজিত। একটি বাঙালিদেরই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, অন্যটি ইন্ডিয়া। রয়েছে বাঙালি হিন্দু এবং মুসলমানদের পেটে পেটে সাম্প্রদায়িকতা, এমনকি এদের শিক্ষিত এবং প্রগতিশীল বলে পরিচিতদের মধ্যেও। [বাঙালি বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টানদের সংখ্যা কম হওয়ায় এদের সাম্প্রদায়িকতার চিত্রটি স্পষ্ট নয়।] অবশ্য বাঙালি মুসলমানদের সাম্প্রদায়িকতা চামড়ার উপরে দগদগে ঘায়ের মতো, যেন স্কিন ক্যান্সার। তবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এটা সারিয়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু বাঙালি হিন্দুদের সাম্প্রদায়িকতা অনেকটা বোন ক্যান্সারের মতো, হাড়ের মধ্যের অসুখ। এটাই দুশ্চিন্তার।

যে জাতি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কারণে আপন দেশকে টুকরো করে তারা আত্মঘাতী, তারা হয় অভিশপ্ত। তাদের যাপনে নেমে আসে দুর্দশার কাল। বাঙালিরা পার করছে সেই অভিশপ্ত সময়। এরা আপন ভাইকে পর করে ধর্মের ভাইয়ের কাছে গিয়েছিল সংসার পাততে। ১৯৪৭ থেকে ৭১ সাল অবধি পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানরা পাক-পাঞ্জাবি মুসলমানদের হাতে মার খেয়ে বুঝে গেছে ধর্মীয় সম্পর্ক এক আবেগের বেলুন মাত্র। লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে তারা তাদের বাংলাকে স্বাধীন করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এবং উত্থান ঘটে বাঙালি জাতীয়তাবাদ-বিরোধী মুসলিম জাতিবাদী রাজনৈতিক শক্তির। পথ হারায় বাঙালিদের একমাত্র রাষ্ট্র। তার অভ্যন্তর থেকে হিন্দু বাঙালিরা বিভিন্ন সময়ে নির্যাতিত হয়ে, কখনও ভয়ে, কেউ কেউ ধর্মীয় আবেগে অথবা দুর্নীতির কারণে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতীয় বাংলায় গেছে। অবশ্য গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশের হিন্দুরা তৃতীয় কোনো উন্নত রাষ্ট্রের অভিবাসী হচ্ছে বেশি। যদিও কথাটি শুধু হিন্দুদের ক্ষেত্রেই সত্য নয়, বাঙালি মুসলমানরাও যাচ্ছে মরিয়া হয়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্রটি মানুষের বিকাশের উপযোগী হয়ে উঠছে না—নানা কারণে। এর অধিকাংশ অধিবাসী আত্ম-নির্মাণে এবং আত্ম-উন্নয়নে যথেষ্ট যোগ্য হয়ে উঠতে পারে নি বলে ধরে নেয়া যায়।


জাতিগত ইতিহাসচেতনা এবং বৈজ্ঞানিক শিক্ষার বিস্তার ঘটানো যায় তাহলে এই রাষ্ট্রের বাঙালিদের আশি ভাগ রোগ নির্মূল করা সম্ভব।


অথচ রাষ্ট্রটির হওয়ার কথা ছিল পৃথিবীর সমগ্র বাঙালিদের শেষ আশ্রয়স্থল। হিন্দু-ব্রাহ্মণ্য জাতিবাদীরা যেমন খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকে বাংলা ও বাঙালিকে ঘৃণার চোখে দেখত, তেমনি মুসলিম জাতিবাদীরাও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সহ্য করতে চায় না। অথচ কালের কী পরিহাস, সমষ্টিগতভাবে বাঙালিদের মহৎ যা অর্জন তা এই বাঙালি জাতীয়তাবাদেরই দান।

ধরা যাক, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বা ২১ ফেব্রুয়ারির কথা, তা ওই বাংলা ভাষার জন্যই হয়েছিল। অথবা, সবচেয়ে বড় অর্জন বাংলাদেশ রাষ্ট্র—তাও এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের দান।

ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা বাঙালিকে শতধাছিন্ন, মূর্খ, হীন এবং অন্যদের অবজ্ঞার পাত্র বানিয়ে রাখে, অথচ বাঙালি যখন বাঙালি হয়ে ওঠে তারা পায় মনুষ্যত্বের সিঁড়ি, তারা পায় বিশ্বজোড়া সম্মান, তারা হয় অজেয়, সেই প্রাচীন গঙ্গাহৃধির পূর্বপুরুষেরা ভর করে তাদের উপর। কিন্তু না, বাঙালিরা তাদের আত্ম-পরিচয়ের পথে না হেঁটে ধর্মীয় অন্ধকারের অন্তরালে ডুব দিয়ে পচতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি হয়ে উঠছে একটি ব্যর্থতার প্রতীক। যদিও এর সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায় নি। দিল্লি সাম্রাজ্য প্রতিপক্ষ পাকিস্তান সাম্রাজ্যকে দুর্বল করতে ১৯৭১ সালে বাঙালিদের যুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিল বটে কিন্তু বাংলা ও বাঙালিদের সে কোনোকালেই ভালো চোখে দেখে নি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশও তাদের মোটেই কাম্য নয়। ফলে বাঙালি রাষ্ট্রটিকে শুরু থেকেই তারা করদ রাজ্য বানানোর চেষ্টা করে এসেছে। অন্য দিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রায় গত ১৫ বছর ধরে চালাচ্ছে একটি রাজনৈতিক দল। যারা অগণতান্ত্রিকভাবে ছলে-বলে ক্ষমতা দখল করে আছে। কিন্তু দলটি মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে কথা বলে। তাদের বিরোধী প্রধান প্রতিপক্ষরা—বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মদানকারী যে জাতীয়তাবাদ তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদ—তার বিরোধী ধর্মান্ধ শক্তি। অশিক্ষিত জনগণকে ব্যবহার করে তারা ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রটি হয়ে ওঠে পাকিস্তানের আদলে একটি বাঙলাস্তান। ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার যে জনশক্তি, মূলত যাদের আন্দোলনের ফলে দেশটির রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হওয়ার ইতিহাস রয়েছে বিভিন্ন সময়, তারা নিরুপায় নিশ্চুপ। রাষ্ট্রটি একটি অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্য দিয়ে পার করছে সময়। এটি ইহুদিদের ইসরাইলের ন্যায় দুর্দশাগ্রস্ত সমগ্র বাঙালি জাতির কল্যাণে কাজ করার মতো উপযুক্ত হয়ে ওঠে নি আজও। যদিও অর্থনৈতিকভাবে রাষ্ট্রটি কিছুটা অগ্রসর হয়েছে, সেই সাথে নাগরিকদের নৈতিকতার মান গেছে হাঁটুর তলে। তবে যদি জাতিগত ইতিহাসচেতনা এবং বৈজ্ঞানিক শিক্ষার বিস্তার ঘটানো যায় তাহলে এই রাষ্ট্রের বাঙালিদের আশি ভাগ রোগ নির্মূল করা সম্ভব।

অন্য দিকে ১৯৪৭-এর আগ থেকেই হিন্দুত্ববাদ এবং সর্বভারতীয় ইজমের অসুখে আক্রান্ত ভারতীয় বাংলার অধিকাংশ বাঙালি। বিভ্রম-বাস্তবতার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের চিন্তা। এই ইন্ডিয়ান ইজমের ধোঁয়া কখনও গেরুয়া রঙে কখনও সবুজ রঙে এতটাই ভাইরাল হয়েছিল যে এখনও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু কিছু লোক হাহাকার করে ওঠে—যদি ৪৭-এ ভারত ভাগ না হতো! এ এক মায়াময় প্রহেলিকা। যা কোনো ইউরোপিয়ান ভাবে না, যেমন : অস্ট্রিয়া এবং বেলজিয়াম একই দেশের অংশ। বাঙালিদের কাছে সুভাষ বোস ট্র্যাজেডির নায়কের মতো, রূপকথার নায়কের মতো এক মিথ। কিন্তু ব্রিটিশদের দখল করা কলোনিকে নিজের দেশ মনে করে যে সাম্রাজ্য তিনি রচনা করতে চেয়েছিলেন, তাও কি আদতে একটি দেশ হতো! কলোনিয়াল ওই কারাগার ছাড়া? ভাবা যেতে পারে। হয়তো একটা ফেডারেল স্ট্রাকচারের রাষ্ট্র হতে পারত, যেমনটা মুসলিম লীগ এবং জিন্না চেয়েছিল। কিন্তু নেহেরু-প্যাটেলরা চাইলেন শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র। কারাগার যাতে কারাগারই থাকে, কলোনি যাতে কলোনিই থাকে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশই সর্বভারতীয়, কোনোটা আন্তর্জাতিকতাবাদের রাজনীতিও করে গেছে এত কাল। অথচ আপন সংসার যে ধ্বংস হচ্ছে সে বিষয়ে উদাসীনই থেকে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতার চিল এদের মাথার উপরে ফেলছে কালো ছায়া। ফলে ঝাড়খণ্ড-ছত্রিশগড় থেকে আসাম মণিপুর অব্দি সমগ্র বাংলা বলয়ের বাঙালিরা মুরগির ছানার মতো যেন ঘাসের মধ্যে মুখ গুঁজে আত্মরক্ষায় ব্যস্ত। ঐক্যহীন, আত্মশক্তিহীন, পলায়নপর এক জনগোষ্ঠী। যেন ভারত রাষ্ট্রে তাদের কোনো অধিকার নেই, চুরি করে আছে। অথচ তারা আছে নিজভূমে, বাঙালিদেরই এলাকায়। ভারত রাষ্ট্রটির জন্ম ১৯৪৭ সালে। এমনকি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটিরও একদিনের ছোট ভাই। কিন্তু এই ভূমি তো ৪৭ সালে রচনা হয় নি! এই মানুষ, মানুষের পূর্বপুরুষ, ভূমিপুত্ররা তো ৪৭ সালেই এ অঞ্চলের বাসিন্দা হয় নি! তবে কোন বোধে পলায়নপর, আত্মহারা, বিপথগামী হচ্ছে এরা?

সম্প্রতি আসামে এনআরসি করে ১৮ লাখ বাঙালিকে নাগরিকত্বহীন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ লাখই হিন্দু বাঙালি। ৬ লাখ মুসলমান। দেখা গেছে এদের অধিকাংশেরই পরিবার এনআরসিতে টিকে গেছে, কারো হয়তো নামের বানান ভুল অথবা জমির কাগজ নষ্ট হয়েছে। খুব অবাক করা কাণ্ড হচ্ছে—দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে যেখানে কোটি কোটি ভূমিহীন মানুষের বাস সেখানে জমির দলিল খোঁজা নিতান্ত হাস্যকর। অন্য দিকে এসব রাষ্ট্র এত লোক দিয়েও যেখানে রাষ্ট্রীয় নথিপত্র ঠিকঠাক রাখতে পারে না সেখানে দরিদ্র জনগণের কাছে সত্তর বছর আগের নথি খোঁজা দুঃখজনক। এই এনআরসির আগে বেশ প্রচার ছিল বাংলাদেশ থেকে এক কোটি লোক আসামে গিয়ে অবৈধভাবে বাস করছে। কী আজব ব্যাপার! যেখানে বাংলাদেশে প্রায় দশ লাখ ভারতীয় কাজ করছে এবং যাদের ৯০ শতাংশই অবৈধভাবে, সেই বাংলাদেশ থেকে আসামের জঙ্গলে যাবে এদেশের নাগরিকরা! দুঃখের বিষয় বাংলাদেশে যত অবৈধ ভারতীয় কাজ করে তার অধিকাংশই উত্তর-ভারত, মধ্য-ভারতের লোক, বাঙালিরা হলেও দুঃখ ছিল না। সেই উত্তরপ্রদেশ ঘোষণা করেছে তাদের দেশ থেকে বাংলাদেশি তাড়াতে এনআরসি করবে। কিছুটা কৌতুকপূর্ণও বটে।


ভয়ের ভয় কেন বলছি? হাঁ, মানুষ জীবনকে টিকিয়ে রাখার জন্য, মৃত্যুকে এড়ানোর জন্য দাসত্বও বরণ করতে পারে।


ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ইতোমধ্যেই বাঙালিদের হেনস্থা করতে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন প্রদেশে এনআরসি করার ঘোষণা দিয়েছে। দিশাহীন, ঐক্যহীন, সাম্প্রদায়িকতার কাদায় আটকে যাওয়া ভারতীয় বাঙালিদের অবস্থা হলো সেই লোকটির মতো—যে দুদিন আগেও ক্ষমতাসীন সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের কর্মী হয়ে তাদের র‌্যালিতে হনুমান সেজে গাড়ির উপর উঠে নেচেছে—কিন্তু তার দলের এনআরসি করার ঘোষণার দুদিন পরেই আত্মহত্যা করেছে ভয়ে। আত্মহত্যা! হাঁ, আত্মহত্যা। ইতোমধ্যেই ভারতীয় বাংলাদেশের প্রায় শতখানিক মানুষ আত্মহত্যা করেছে—এনআরসির ভয়ে। কতটা কাপুরুষ হলে ভয়ের ভয়ে আত্মহত্যা করে? ভয়ের ভয় কেন বলছি? হাঁ, মানুষ জীবনকে টিকিয়ে রাখার জন্য, মৃত্যুকে এড়ানোর জন্য দাসত্বও বরণ করতে পারে। জীবনের সেই অপমানটুকুও হয়তো নিরুপায়ভাবে অনেকে মেনে নেয়। কিন্তু যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, মৃত্যু বা বিপর্যয় অনিবার্য হয় তখন মানুষসহ ইতর প্রাণীরাও শেষ শক্তি নিয়ে প্রতিরোধে জেগে ওঠে। অন্তত মৃত্যুকে অপমান করে না। কিন্তু এই কাপুরুষগুলো আসন্ন বিপর্যয়ে প্রতিরোধের দেয়াল তৈরি না করে ভয়ে আগেই নিজেকে মেরে ফেলেছে। এরা কি আদৌ বাঙালি? হতে পারে না। এরা কি সেই গঙ্গাহৃধির সাহসী পূর্বপুরুষদের বংশধর? এরা কি শশাঙ্ক, দেবপাল, মহীপালদের সন্তান? এরা কি বল্লাল সেন, সুলতান ইলিয়াস, সুলতান হোসেন শাহ, ঈসা খাঁর বীরত্বের উত্তরাধিকারী? এরা কি তিতুমীর, সূর্যসেন, নেতাজি, সালাম, রফিক, জব্বার, কমলা ভট্টাচার্য, মুজিবের বংশধর? এরা কি ১৯৭১-এর বাংলাদেশ রণাঙ্গনের হাজার হাজার অসম সাহসী, মুক্তিযোদ্ধাদের স্বজাতির লোক? অবিশ্বাস্য।

কেন এমনটা হচ্ছে? কেন বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে আত্মহত্যার প্রবণতা? অথচ নৃ-বিজ্ঞান এবং জেনেটিক সাইন্সের সাক্ষ্যপ্রমাণ মতে বাঙালি হিন্দু এবং মুসলমান তো একই জনগোষ্ঠীর লোক, একই রক্তের একই পূর্বপুরুষের বংশধর। তবে কেন এরা মরে যাচ্ছে ভয়ের ভয়ে!

রাজু আহমেদ মামুন

জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭৪; তালতলী, বরগুনা। এমএসএস, সমাজ বিজ্ঞান। পেশায় সাংবাদিক; সম্পাদক, সাপ্তাহিক ধাবমান।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
দহন সংক্রান্তির কবিতা [ম্যাগনাম ওপাস, ২০০৬]
ওঁ নিরর্থকতা ওঁ গতিশাশ্বত [বলাকা, ২০০৮]
ম্যানগ্রোভ মন [কাগজ প্রকাশন, ২০১৭]

ই-মেইল : razumamun@gmail.com