হোম গদ্য মৌসুমি সাহিত্যের ফরমায়েশি লেখক

মৌসুমি সাহিত্যের ফরমায়েশি লেখক

মৌসুমি সাহিত্যের ফরমায়েশি লেখক
339
0

বেশ ক’বার একটি পত্রিকার তরফ থেকে একটা লেখা চাইছে। প্রত্যেক প্রস্তাবই প্রতিক্রিয়ার উদ্‌গাতা। একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে কোনো অনুরোধ বা আদেশ বা পরামর্শ দিলে সেই মানুষটির স্নায়ু যদি খুব শক্তও হয় তবু প্রায় নিজের অজান্তেই তার ভেতর প্রতিক্রিয়া শুরু হতে বাধ্য। ফলে এই লেখা চাওয়াটা নিজের অজান্তেই প্রায় আমাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে। তারা আমাকে বলেছিল, ‘অমুক বিষয়ে আপনার একটা লেখা চাই।’ এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে আমি ভাবছি সত্যিকার অর্থে একজন লেখক ফরমায়েশি লেখা লিখতে পারে কিনা। তবু ‘অমুক’ বিষয়ে একটা ‘লেখা’ লেখার বাসনায় নিজের কাছে তদবির করে দেখলাম একেবারেই শূন্য আমার লেখার দেশ। ফলে যেখান থেকে ফরমায়েশি লেখা জন্ম নিতে পারে তার নাম দেয়া যেতে পারে ‘না-লেখার দেশ।’

অর্থাৎ নিজের দায়িত্ববোধ বা কাণ্ডজ্ঞান থেকে যে লেখা জাত নয়। হয়তো কারো অনুরোধে বা দরকারে বা টাকার বিনিময়ে লেখাগুলো যে দেশ থেকে নির্গত হয় তাকে আমরা বলতে পারি ‘না-লেখার দেশ।’ আর লেখা বা সাহিত্য নামে যে বস্তু সেখান থেকে নির্গত হয় তাকে আমরা সহজ কথায় বলতে পারি ফরমায়েশি লেখা।


সাহিত্য পাতার সম্পাদক এখন এমন সাহসও দেখাচ্ছেন যে তারাই নির্ধারণ করে দিচ্ছেন কারা কারা আজ সাহিত্যিক আর কী কী নিয়ে সাহিত্য হয়।


বস্তুত সেভাবে ভাবতে গেলে, দুচোখে যা দেখা যায় তাকে সাক্ষ্য মানতে গেলে বলতে হয় এদেশের সাহিত্য এখন পরিণত হয়েছে ফরমায়েশি সাহিত্যে। দেশের সাহিত্য উৎপাদন এখন দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের হাতে। সাহিত্য পাতাকে পত্রিকার মালিকগোষ্ঠী খানিকটা পত্রিকার শোভাবর্ধন বা পেট ভরানোর পাতার বেশি মনে করেন না। ফলে পত্রিকার সাহিত্যপাতাগুলোর ঋতু সাহিত্যে ঋতুমতি দেশের সাহিত্য জগৎ। দেশে যারা নিজেদের লেখক মনে করেন তারা আজ কাঁচামাল এইসব সাহিত্য পাতার। সাহিত্য পাতার সম্পাদক এখন এমন সাহসও দেখাচ্ছেন যে তারাই নির্ধারণ করে দিচ্ছেন কারা কারা আজ সাহিত্যিক আর কী কী নিয়ে সাহিত্য হয়। তাদের জন্য পুরস্কারও দেয়া হচ্ছে।

সত্যিকার অর্থে সাহিত্য পাতার সম্পাদকরা আবহাওয়ার লোক মনে হয়। কারণ তারা বর্ষা এলেই বর্ষার কবিতার আয়োজন করেন, ঠিক এইভাবে বসন্তের কবিতা, শরতের কবিতা, শীতের কবিতা ইত্যাদি। তাদের কাঁচামালগুলোকে তখন তারা বাধ্য করে ঋতু অনুযায়ী সাহিত্য উৎপাদনে। এই সব কাঁচামালগুলোর আত্মা ‘অনন্ত না-লেখার দেশ।’ পত্রিকার অনুরোধ ও টাকা বরাবর কিছু একটা বানিয়ে তুলতে তারা কসরত করেন, এবং এনারা এসব ঋতুবিষয়ক বা মৌসুমি কবিতা, গল্প, উপন্যাস উৎপাদনে এত দক্ষতার পরিচয় দেন যে কারো কারো জীবিকা তো স্রেফ এই মৌসুমি সাহিত্য। কেউ কেউ তালিকা বানায় কোনদিন কোন লেখকের জন্ম-মৃত্যুদিন, কোন দিন কোন দিবস। সেই অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গা থেকে ঠুকে নিয়ে তিনি আগেই প্রস্তুত হয়ে থাকেন চাহিবা মাত্র সরবরাহের জন্য। অনেকে ফেরিওয়ালার মতো এসব লেখা নিয়ে ঘুরে বেড়ান এইসব সংবাদপত্রের দরজায় দরজায়।

এই মৌসুমি সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ, সাধারণ পত্রিকার পাঠকদের মৌলিক সাহিত্য পাঠে অক্ষম করে তুলতে। বলতে গেলে এই মৌসুমি সাহিত্য ক্রমাগত পাঠকদের সাহিত্য বিষয়ে ঘৃণা উৎপাদন করে।

হয়তো পাঠক আরো বেশি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন যখন এইসব কৃত্রিম জিনিস নিয়ে বানিয়ে তোলা বইপত্রকে পুরস্কৃত করা হয় বিভিন্ন কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে। এইসব মৌসুমি সাহিত্যকে সাহিত্য হিসাবে বাজারজাত করার জন্য এই দেশের প্রকাশকরা মুখিয়ে থাকেন। দিন কয়েক আগে এরকম এক মৌসুমি লেখক আমাকে বলেছেন, প্রতিবছর তার চার থেকে পাঁচটা করে বই প্রকাশিত হয়। প্রকাশকরা তার কাছে এসে আবেদন করেন মৌসুমি বইয়ের জন্য। তিনি দুঃখ করে বলছেন, মৌসুমি সাহিত্য করবার আগে তার কিছু মৌলিক কবিতা ও গল্প লেখা ছিল। যে-গুলো ছাপার ব্যাপারে তিনি প্রকাশকদেরকে অনুরোধ করেও কোনো কিনারা করতে পারেন নাই। প্রকাশরা চায় তার কাছে ‘বিজ্ঞানের মজার ছড়া’ ‘বিখ্যাত মানুষদের খাবার-দাবার’। সম্প্রতি বাজার চলতি দেখে তিনি নাকি একটা রান্নার বইও লিখছেন, টাকাও পাচ্ছেন প্রচুর।

সত্যিকার অর্থে অবাক হতে হয় ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ছাপা হওয়া এই সব টনটন মৌসুমি সাহিত্যের পরিণতির কথা ভেবে। পত্রিকাগুলোতে, ফেসবুকে, দেয়ালে দেয়ালে, পোস্টারে, ফেস্টুনে হাজার হাজার বইয়ের এই যে বিজ্ঞাপন এই বইগুলো কি আদতেই ছাপা হয়! অথবা ছাপা হলে কই যায়? বইমেলা শেষে একমাসও তো লাগে না এইসব নামগুলো ভুলে যেতে। এখান থেকে পত্রিকাগুলো নিজেদের মতো নিজেদের ঘরানার নিজেদের ব্যবসার উপযোগী কিছু বই বেছে নেয়। সে-সবকে বছর সেরা তরুণদের দশটা বই, বছর সেরা বুড়োদের দশটা বই অথবা বাছাইকৃত সেরা দশটি বই শিরোনামে প্রচার করে। এই ব্যবসার দিকেও এখন পত্রিকাগুলোর নজর পড়েছে। ফলে দেখা যায় পত্রিকার স্বপ্রযোজিত বইগুলোর আটটা থাকে তাদের বাছাইকৃত দশটির ভেতর।

আগে প্রকাশকরা লেখকদের শ্রেষ্ঠ কবিতা-গল্প-উপন্যাস, নির্বাচিত কবিতা-গল্প-উপন্যাস, সমগ্র কবিতা-গল্প-উপন্যাস ইত্যাদি নামে বাজারজাত করতেন। এখন এসব ক্ষেত্রে তারা আরো উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিচ্ছেন। তারা এখন সংখ্যাবাচকে পদার্পণ করেছেন। এখন ছাপা হয় অমুকের ১০০ কবিতা, তমুকের ১০০০ কবিতা, বা অমুকের ৫টি উপন্যাস, ১০টি উপন্যাস। ফলে লেখকরা আবার সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছেন।

তবে ফরমায়েশি লেখাও অনেক রকম হতে পারে। আর কিছু লেখক যারা দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাংবাদিক তারাও অতি তাড়াতাড়ি অমরত্বের বাসনায় আবার নিজেরাও ছোটকাগজ করেন। সেই সব ছোট কাগজের সম্পাদকদের নিজেদের লেখক বানানোর ও অমর হবার কসরত দেখলে তাদের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ না দিয়ে পারা যায় না। এরা সমস্ত ধরনের নৈতিকতা নস্যাৎ করে দেয়। সম্পাদক হিসাবে তাদের দায়িত্বজ্ঞানের কথা ভুলে যায়। ফলে পুরো পত্রিকাজুড়ে দেখা যায় বেহায়া অমরত্বের বাসনা। যেন তার একমাত্র দায়িত্ব তাকেই তুলে ধরা। যেন আত্মপ্রচারের ছক হলো তার পত্রিকা। পাঠককে জবরদস্তিমূলক তাদের ফরমায়েশি সাহিত্যপাঠের দিকে মনোনিবেশ করাবার নানান ধরনের কসরত করে থাকেন তারা।


অনুরোধে, বিক্রয়ের প্রয়োজনে, দরকারে যারা লেখেন তারা লেখক নয়, আত্মা-বিক্রেতা।


লেখা স্বতঃপ্রণোদিত, স্বতঃস্ফূর্ত, নিজস্ব দায়িত্ববোধ ও কাণ্ডজ্ঞানের ভেতর থেকে উৎপন্ন হয়। লেখক কখনো ফরামায়েশি লেখা লিখতে পারেন না। লেখককে দিয়ে কেউ জোরজবরদস্তিমূলক লেখা লেখাতে পারে না। অনুরোধে, বিক্রয়ের প্রয়োজনে, দরকারে যারা লেখেন তারা লেখক নয়, আত্মা-বিক্রেতা। এ সমস্ত কৃত্রিম লেখার ভেতর কোনো স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে না। যা অন্য এক আত্মার ভেতর প্রবাহিত হয়ে আন্দোলিত করতে পারে। কারণ লেখকও একজন সৃষ্টিকর্তা। তিনি যথেষ্ট প্রাণবন্ত না হলে লেখার ভেতর তিনি প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। ফলে এইসব ছাড়া যে সমস্ত লেখা উৎপাদিত হবে তা হবে ‘না-লেখার দেশ’ থেকে। যেখানে কোনো আলো নাই, আলোড়ন নাই, বিচার নাই, বিবেচনা নাই। খানিকটা মুখরোচক ভাজাপোড়ার মতো। ফলে দেশে এখন নিরন্তর এই সমস্ত লেখাই হরদম উৎপন্ন হচ্ছে। হতবুদ্ধি পাঠক হয়তো পড়াই ছেড়ে দিয়েছে ইতোমধ্যে লেখাগুলো কেন লেখা হয়েছে তা চিন্তা করতে করতে।

হয়তো এই যে নিষ্প্রাণ লেখার জগৎ এইটাও একটা প্রকল্প, চেতনাহীনতার। যে জাতির চিন্তায় স্বচ্ছতা নাই, চিন্তার স্বাধীনতা নাই তাদের ভেতর প্রাণবন্ত লেখার চিন্তা করাও বাতুলতা। লেখালেখির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। এবং এই কারণে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত পত্রিকাগুলো অজস্র ফরমায়েশি লেখা আর মৌলিক লেখাকে সেন্সরের মাধ্যমে নিয়ত নিরুৎসাহিত করে চলে। কারণ পত্রিকার যারা মালিকগোষ্ঠী অধিকাংশই সরকারি তাবেদার। যে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতা নিলেই তাদের কলম বদলে যেতে থাকে। তাদের রাজনৈতিক আদর্শ সুবিধাবাদ ও তাদের ধর্ম ব্যবসায়।

যাই হোক, এই পর্যন্ত লিখে আমি লেখাটা অত্র পত্রিকার সম্পাদক বরাবর পেশ করার পর আমাকে ভদ্রোচিতভাবে বলা হয়েছে লেখাটি ছাপা অসম্ভব কেননা এটা ফরমায়েশি লেখা নয়।

জাহেদ সরওয়ার

জন্ম ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৭৬; মহেশখালী দ্বীপে। স্নাতকোত্তর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ফ্রিল্যান্সার।

প্রকাশিত বই—

এই মিছা কবি জীবন [কবিতা]
আততায়ী একটি কবর [কবিতা]
বিকালের দাসবাজার [কবিতা]
আরো একটি কবিতা শোনাও কবি [কবিতা]
সূর্যের নিচে শুধু ভয় [কবিতা]
পায়ুবাসনার জনগণ [উপন্যাস]
দস্তইয়েভস্কির বই ও কোটিপতির সকাল [গল্প]
সম্পর্কের সন্ত্রাস ও অন্যান্য গল্প [গল্প]
রাজ্য ও সাম্রাজ্য [রাজ্যচিন্তার কারখানা-১]
সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ [রাজ্যচিন্তার কারখানা-২]
কবিতা পড়ুয়ার নোটবই [কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধের বই] ফিদেল কাস্ত্রো [জীবনী গ্রন্থ]


ই-মেইল : sjahedpoet@gmail.com