হোম গদ্য মর্যাদার সভ্যতা

মর্যাদার সভ্যতা

মর্যাদার সভ্যতা
1.12K
0

১ম পর্ব ‘লজ্জার সভ্যতা’


পর্ব- ২

লজ্জার সভ্যতার মৌলিক নীতি হলো অন্যের ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে সুখী হবার ইচ্ছা বা অন্যের রক্ত-মাংস-ঘাম দিয়ে আরাম-বিলাসের সামগ্রী তৈরি করা। সেখান থেকে বের হয়ে কোথায় যাব?

মর্যাদার সভ্যতায় যেখানে অল্প শ্রমে অধিক উৎপাদন করতে পারি।

কিভাবে?

প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। সময়-শ্রমের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে অকারণে বহু খাতে সময়-শ্রম ধ্বংস করা হয়।

আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে পাঁচজনের একটি দল পাঁচ হাজার মানুষের জন্য মাছ ধরতে পারে। এই প্রযুক্তি তৈরি করতে আর রক্ষণাবেক্ষণে হয়তো আরো পাঁচজন লাগে। কিন্তু মানুষ যদি সেই জলাশয়ই খেয়ে ফেলে আর চিল্লায়, আমাদের শান্তি নাই, আমাদের সুখ নাই, তাহলে… কী বলে যে একটা শক্ত গাল দেবো!

শাসকশ্রেণি আবার গালাগাল পছন্দ করে না। গালাগাল হচ্ছে ক্রোধের ভাষা। মানুষের ক্রোধ হবে না? মানুষ রাগ-ক্ষোভ-ঘেন্না প্রকাশ করবে না?

রাগ-ক্ষোভ-ঘেন্নাকে শাসকশ্রেণি ভয় পায়। এসব বেড়ে গেলে তাদের শোষণ বন্ধ হয়ে যাবে।


কোনো স্বেচ্ছাচারী সুখী হয় না। সুখের ধারণা যেমনই হোক। যতই ভিন্ন হোক।


এককালে বিপুল সংখ্যক প্রাকৃতিক মাছ ও পাখি ছিল কিন্তু মানুষ ধরতে পারত না। সেসব ধ্বংস করে তারা এখন খামারে শ্রমের অপচয় করছে। দূষিত খাবার উৎপাদন করছে। আর তাই নিয়ে সকাল-সন্ধে চিল্লাচিল্লি।

বাড়ির আশপাশে ফাঁকা জায়গা থাকলে, উত্তর-দক্ষিণ দেয়ালে দুটি উপযুক্ত জানালা রাখলে, ফ্যানের চেয়ে ভালো আরাম লাগে। এতে বিদ্যুৎ-ফ্যান বাবদ শ্রম/খরচ কমে আসে আশি শতাংশের বেশি। যেকোনো জলাশয়ের ধারে এই সুবিধা আরো ভালো মেলে। বাতাস পানিতে নেয়ে আসে কিনা! এই উদ্বৃত্ত শ্রম অন্য খাতে কাজে লাগানো যায়।

কিন্তু মানুষ অজস্র জন্ম দিয়ে দিয়ে জমি ও মানুষের অনুপাত নাজুক করে ফেলেছে। এখন আর কোনো নদীর দিকে তাকানো যায় না। গা ঘিনঘিন করে। মানুষ এখনও এতটাই আহাম্মক রয়ে গেছে যে, একদিকে পানির জন্য হাহাকার করছে আরেক দিকে আরো জন্ম দিয়ে সবাই মিলে নদী-নালা-খাল-হাওর-গাছপালা সব গোগ্রাসে গিলে ফেলছে।

মাত্র ৩৫ বছর আগে দশ-বার ফুট কুয়ো খুঁড়ে তরমুজ ক্ষেতে পানি দিয়েছি। এখন সেখানে দেড়শ ফুট নিচে থেকেও নলকূপ দিয়ে পানি ওঠে না। আরো ৩৫ বছর পরে কী হবে?

জন্ম দিয়ে সুখ নেই তা অনেকেই এক সময় বুঝতে শেখে বটে, কিন্তু বোঝার আগেই জন্ম দিয়ে ফেলে। তরুণ প্রজন্মকে এটা শেখানো সম্ভব। বছর ত্রিশ এক নারী এক সন্তান হলে অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। তাতে বয়স্ক লোকের সংখ্যা বেড়ে যে সমস্যা দেখা দেবে তা নিতান্ত সাময়িক। বিরাট সমস্যার সামনে একেবারেই নগণ্য।

এটা আইন দিয়ে হবে না। এর জন্য চাই জ্ঞান বিস্তার আর দক্ষতা বৃদ্ধি। মানুষকে বোঝাতে হবে আর বৃদ্ধ কালের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সামাজিকভাবে। সরকারিভাবে।

জন্ম দিয়েই যদি এত সুখ তাহলে কোন সুখের অভাবে হাপিত্যেশ কর, হুম?

যা ইচ্ছা তাই করে সুখী হতে চাও?

কোনো স্বেচ্ছাচারী সুখী হয় না। সুখের ধারণা যেমনই হোক। যতই ভিন্ন হোক।

জমি কেনার জন্য কেন প্রতিযোগিতায় নামতে হয়? জন্ম দেওয়া কমালেই ত জমি বেড়ে যায়। তা না করে তোমরা বিদেশের দাস হও! ধুলো আর ধোঁয়ার মধ্যে ডুবে থাক। যত বেশি লোক বিদেশ যায় আর জমি কিনতে চায়, জমির দাম ততই বাড়ে। এই আক্কেলটুকু কার না আছে? অথচ তারা তাদের মূল্যবান শ্রম বিদেশে বিলিয়ে দিচ্ছে।

দেশের জনসংখ্যা এক কোটির নিচে নেমে গেলে জমি এমনিতেই মিলবে। জমি কেনার জন্য বিদেশের দাস হওয়া লাগবে না। শ্রম নষ্ট হবে না। এই শ্রম বিজ্ঞান চর্চায় বিনিয়োগ করলে তারা প্রয়োজনীয়, অসাধারণ সব যন্ত্রপাতি আবিষ্কার-উদ্‌ঘাটন-উৎপাদন করতে পারবে। স্বাস্থ্যকর, সুস্বাদু খাবার উৎপাদন করতে পারবে। নান্দনিক বাড়ি, পোশাক ইত্যাদি বানাতে পারবে। শ্রম শোষণের কারণগুলোও কমে আসবে।

স্বাস্থ্যকর খাবার, পরিষ্কার বাতাস, সুন্দর পরিবেশ থাকলে রোগব্যাধি কমে যায় ৯০ শতাংশের বেশি। ডাক্তার আর ওষুধ বাবদ সাশ্রয় হয় তেমনি। ওষুধ-বর্জ্যের দূষণও কমে যায় ৯০ শতাংশ, কমপক্ষে।

পর্যাপ্ত তৃণভূমি থাকলে মাংসের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। তা না করে মানুষ মাংসের দাম নিয়ে চিল্লায়।

বনভূমিতে কাঠ এমনিতেই জন্মায়। দরকার শুধু বহন খরচ। তখন এত বেশি পাখি থাকবে যে শিকার করেও কমানো যাবে না। আইনেরও প্রশ্ন আসবে না। পরিবেশ এমনিতেই ভালো থাকবে। তা না করে তারা নদী ও বন রক্ষার আন্দোলন করেন।

রড-সিমেন্ট-বালি-পাথর দিয়ে বাড়ি বানাতে গিয়ে ব্যাপক সময়-শ্রম ক্ষয় হয়। আবার পরিবেশ ধ্বংস হয়। কাঠ দিয়ে বাড়ি বানালে পরিবেশ ধ্বংস হয় না। এটা বরং অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। আবার সময়-শ্রম কম লাগে। এই বাড়তি শ্রম অন্য কাজে লাগানো যায়।

এখন সবচেয়ে বেশি মামলা হয় জমি নিয়ে। জমির দাবি আর দখল নিয়ে খুনোখুনি-হানাহানি করতে গিয়ে। তখন উকিল-বিচারক-ডাক্তার দরকার হয়।

আদিম সমাজে মানুষ অভাব মেটাতে চুরি-ডাকাতি করত। তাই নিয়ে হতো যুদ্ধ-হাঙ্গামা। এখন সেটা হয় আদালতে। সুশীল প্রক্রিয়ায়। শাসকশ্রেণি এমন সমাজই চায় বলে এসব বন্ধ হয় না। তারপর তারা জেলখানার মতো বাড়ি বানায়। সেখানে এমন করে থাকে যে আগুনে পুড়ে মরার সময় বের হবার রাস্তা পায় না। পড়শিকে পুড়ে মরতে দেখে তারা মজা পায়? তাদের ঘরে কোনো দিন আগুন লাগবে না বলে তারা মনে করে? কোনো জনপদে ভয়ংকর ভাইরাস ঢুকে পড়লে তখনও তারা পলানোর পথ পায় না।

তারা এর নাম দিয়েছে সভ্যতা। মেধাবীদের আমি বিকল্প সমাজ গড়ার আমন্ত্রণ জানাই।

মানুষ কমে গেলে জমি পড়ে থাকবে। যার যেমন ইচ্ছা বাড়ি বানাতে পারবে। চাষাবাদ করতে পারবে। জমি ঘিরে রাখা লাগবে না। জমি ঘিরে রাখার জন্য কিন্তু প্রচুর ব্যয় হয়। অর্থ/শ্রম।

যারা বহুতল ভবন দিয়ে জমির অভাব মেটাতে চায় তারা কি আহাম্মক নাকি ধুরন্ধর?

নির্মাণ শ্রমিকদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিলে ব্যয় বাড়বে কমপক্ষে তিন গুণ। আর নির্মাণ সামগ্রী যারা উৎপাদন করে, রড-সিমেন্টের কারখানা ও কাঁচামালের খনিতে যারা কাজ করে, কাঠ-কাচ-রং ইত্যাদি যারা উৎপাদন করে, তাদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের উপযুক্ত মজুরি দিলে ব্যয় বাড়বে আরো তিন গুণ, কমপক্ষে।

ব্যাপারটা আসলে এই, বহুতল ভবন কেবল শ্রম শোষণ করেই বানানো যায়। সেখানে কেবল শোষকশ্রেণিই থাকতে পারে। সবার জন্য বহুতল ভবন বানাতে গেলে খাদ্য-বস্ত্র উৎপাদনের জন্য কোনো সময় থাকবে না।

বহুতল ভবনে পানি উঠানো, লিফট ও অন্যান্য বাবদ আরো ব্যাপক সময়-শ্রম ক্ষয় হয়। সময়-শ্রম বাঁচাতে হলে বাড়ি হতে হবে একতালা। তার মানে জমি বাড়াতে হচ্ছে। মানে জনসংখ্যা কমিয়ে আনতে হচ্ছে।

বিকল্প আছে।

কী?

বহুতল পায়রার খোপের মতো খাঁচায় আবদ্ধ হয়ে পুড়ে মরা। আগুনে সেদ্ধ হওয়া। খামারের মুরগি হয়ে যাওয়া। দেশের বড় বড় শহরে ইতিমধ্যেই হয়েছে অনেকে।

খোলা মাঠ হলো শিশুদের প্রাণ আর খোলা পানির নিচে একটা আকাশ হলো তাদের মন। কিন্তু এখন আছে শুধু গা ঘিনঘিন করা খামার। আর আছে নোংরা নদী।

মন-প্রাণ কোনোটাই ছাড়া শিশুরা কিভাবে ঠিকমতো বেড়ে উঠবে?

বাঙালি তা জানে না। মনের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে বুঝিয়ে দিলে তারা বলে, তাদের দেশে মানুষ বেশি। তারপর তারা আরো বেশি করে জন্ম দেয়। আর শিশুদের তারা নরকে অভ্যস্ত করে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। বিশেষত শহরে। সেখানে বিরূপ পরিবেশে শিশুরা সহজেই বেয়াড়া হয়ে ওঠে। তখন তাদের যুদ্ধ করে শেখাতে হয়, মা-বাবা হচ্ছে সবচেয়ে আপনজন! তারা যেন কিছুতেই কষ্ট না পান!

বুড়োকালের অবলম্বন তৈরির জন্য কী নির্লজ্জ প্রশিক্ষণ!

শিশুদের সব মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদ ভালোবাসার প্রশিক্ষণ দিন। সবকিছু বোঝার শিক্ষা দিন। সবকিছু যাচাই করার শিক্ষা দিন। আর নান্দনিকতার বোধ হলো অপরিহার্য। এই শিক্ষার বিকল্প নাই।

মানুষের কান ফাটিয়ে যুদ্ধবিমান মহড়া দেয় সময়-অসময়। মাথার ওপর দিয়ে, বহুতল ভবন কাঁপিয়ে দিয়ে, কোটি কোটি মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষতি করে। মানুষ সভ্য হতে গিয়ে এত বর্বর হলো কিভাবে?

ফাঁকা জায়গার অভাবে।

চীন-জাপানে জন্মহার কমে যাওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন। কেন?

জনসংখ্যা কমে যাওয়া মানে প্রভুদের দাসের সংখা কমে যাওয়া। তারা তাই মনে করে। আসলে কিন্তু এই ধারণার কোনো তাত্ত্বিক ভিত্তি নাই।

যেসব উন্নত দেশে অসুস্থ হলে বা অন্য কোনো বিপদে পড়লে অসহায় থাকতে হয়, ধুঁকতে হয়, সেই উন্নতির কী মানে আছে? জাপান, ইউরোপ, আমেরিকার মতো সব উন্নত দেশেরই এই হাল। জাপানের বহু শিশু স্কুল ছুটির দিন তিন বেলা খেতে পায় না। তাদের বাবা-মায়ের আয় কম। ধিক, এই উন্নতি।

ইউরোপ-আমেরিকায় বহু মানুষ রাস্তায় থাকে। চিকিৎসা পায় না।

শোষণপদ্ধতির সমাজকাঠামোই এর জন্য দায়ী।

অনেকে বলে, অতীতে ত মানুষ কম ছিল। ব্যাপক ভূমি উদ্বৃত্ত ছিল। কিন্তু মানুষের দুর্দশা ত আজকের চেয়ে বেশি ছিল।

কারণ তখন জ্ঞানগম্যি ছিল না। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ছিল না।

আমি সেই সভ্যতার কথা বলছি যেখানে শ্রমের শোষণ-অপচয় বন্ধ করে উৎপাদনে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

সব জায়গায় ট্রেন চালিয়ে দিলে পরিবহন খাতে ব্যাপক সময়-শ্রম সাশ্রয় হবে। অফিসের কাছে বাসা হলে আরো সাশ্রয় হবে। যেসব কারখানায় কেমিক্যালের ব্যবহার নেই বা স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই সেসব কারখানার কাছেই শ্রমিক-কর্মচারীসহ কারখানার সবার বসবাসের ব্যবস্থা থাকা চাই। তাহলে যাতায়াত বাবদ সময়/শ্রম/কষ্ট কমবে। এই শ্রম খামারে-কারখানায়-খনিতে বিনিয়োগ করলে উৎপাদন বাড়বে। দৈন্য কমবে। শোষকের তকমা থেকে রক্ষা পাবেন সভ্যরা।


শোষণ করে কি তারা খুব সুখে আছে? তারা নানা রকম সমস্যায় আছে কিন্তু শোষণকেই তারা সুখের কাজ মনে করে।


নানা খাতে খাজনা আদায় করতে গিয়ে যেমন কেরানি খরচ বাড়ে তেমনি আইনি জটিলতায় অন্যান্য খরচ বাড়ে। ধরুন একটা জামার কথা। জামা কেনাবেচার সময় খাজনা দেওয়া হয়। জামার আগে কাপড় কেনাবেচার সময়। কাপড়ের আগে তুলো কেনাবেচার সময় দেওয়া হয়। তুলো দিয়ে সুতো তৈরি হলো। সুতো কেনাবেচার সময় খাজনা দেওয়া হয়। সুতো তৈরির জন্য মেশিন লাগে। মেশিন কেনাবেচার সময়। মেশিন তৈরির জন্য লোহা লাগে। লোহা কেনাবেচার সময় খাজনা দিতে হয়।

বোতাম কেনাবেচার সময় দেওয়া হয়। বোতামের কাঁচামাল রাবার কেনাবেচার সময়। বোতাম তৈরির জন্য মেশিন লাগে। এটা কেনাবেচার সময় দেওয়া হয়। এই মেশিন তৈরিতে যে লোহা লাগে তা কেনাবেচার সময়ও দিতে হয়।

নানা রকম যন্ত্র লাগে একটা জামা তৈরি করতে। সেলাই মেশিন, সুঁই-কাঁচি ইত্যাদি কেনাবেচার সময়, এসব তৈরির কাঁচামাল কেনাবেচার সময়, এসবের মেশিন, ইত্যাদি। সব যন্ত্র ও কাঁচামাল পরিবহন বাবদও খাজনা দিতে হয়।

অন্তত শতবার খাজনা দেওয়া হয় একটা জামা তৈরির পেছনে। শুধু জামা নয়, প্রতিটি বস্তুর ক্ষেত্রেই এমন অসংখ্য ধাপে পৃথকভাবে খাজনা আদায় করা হয়।

শুধু খুচরা বিক্রেতা বা শুধু ভোগ্যপণ্যের ওপর একবারে সব কর বসিয়ে দিলেই চলে অথবা শুধু আয়কর বাড়িয়ে দেওয়া যায়। তাহলে কর আদায় বাবদ ধাপে ধাপে সময়-শ্রম খরচ হবে না। কিন্তু মেধাবীরা এটা মানতে চাইবে না। তারা যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে অন্যদের অন্ধ করে রাখার চেষ্টা চালাবে। এটাই তাদের সভ্যতা। এটা তাদের ফাঁদ।

সভ্যতা মানে ফাঁদ?

মিটার, মিটার রিডার, বিল তৈরি, বিল দেওয়া, ইত্যাদি বাবদ ব্যাপক সময়-শ্রম ধ্বংস হয়। মিটার-বিল বাদ দিয়ে ফ্যান-লাইট-টিভি ইত্যাদির ওপর একবারে বেশি করে ট্যাক্স বসিয়ে দিলেই চলে। এমন কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোক চিল্লাচিল্লি শুরু করবে। কারণ তাতে তাদের ছল-চাতুরি বন্ধ হয়ে যাবে।  তারা বরং নিত্যনতুন মিটার আবিষ্কার করে চলেছে।

লজ্জার সভ্যতা এমন বহুলোকের জন্য ধাপে ধাপে কর আদায়ের ব্যবস্থা করে। তাদের আশ্রয় করে নানা শ্রেণির পরগাছা। সবাই মিলে বৈষম্য জন্ম দেয়।

বৈষম্য কী করে?

অস্থিরতা, ক্ষোভ, হতাশা, অপরাধ সৃষ্টি করে।

আবার ধরুন আয়কর। এটাও স্রেফ একটা শয়তানি কাণ্ড।

আপনি প্রতিটি বস্তু কিনতে গিয়ে কর দিচ্ছেন। কিন্তু শুধু কর নিয়ে মেধাবীরা খুশি না। আয়কর ফর্মুলায় ভালোমতো নাজেহাল করা যায়। যেমন, প্রতিষ্ঠান বেতন দেওয়ার সময় আয়কর কেটে রাখে। অথচ তাদের দপ্তরে গিয়ে আপনাকে রসিদ দেখিয়ে বলতে হবে, এই দেখ, আমি কর দিয়েছি। এ সময় তারা আপনাকে ঠেঙ্গানোর জন্য সব বন্দোবস্ত আগেই করে রেখেছে। আবার আয়কর না দিলেও পদে পদে হেনস্তা করবে। একেই বলে মেধা। একেই তারা বলে আধুনিক সভ্যতা।

সবকিছু কেনাবেচা করতে হবে এই ধারণা ভয়াবহ। এ কারণেই প্রতিটা মানুষ চিরকাল অশান্তির মধ্যে বাস করে। কিন্তু শাসকশ্রেণি তা স্বীকার করে না। স্বীকার করলে ত আর শোষণ করতে পারবে না।

শোষণ করে কি তারা খুব সুখে আছে? তারা নানা রকম সমস্যায় আছে কিন্তু শোষণকেই তারা সুখের কাজ মনে করে। ‘শোষণ’ তাদের মনে সুখ দেয়।

স্বাস্থ্য, পরিবহন, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, এমন কিছু খাত ফ্রি করে দিলে ব্যবস্থাপনা ব্যয় ব্যাপক কমে যায়। ফ্রি করার ব্যয়টা কি কেউ বাপের বাড়ি থেকে এনে দেবে? দেবে কর থেকে। এতে মানুষ এক প্রকার স্বস্তি পাবে, যেখানে এখন শোষিতশ্রেণি, এবং শোষকশ্রেণিরও অনেকে, প্রতিনিয়ত অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে জীবন যাপন করে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৯৫ শতাংশ ওষুধ উৎপাদন-খরচের চেয়ে বিপণন-খরচ তিন-চার গুণ বেশি! কর বা সরকারি বিমার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাত ফ্রি করা যায়। এতে মানুষ স্বস্তি পাবে। এটা হলে লোকজন আর বেসরকারি হাসপাতালে যাবে না এমন মনে করার কোনো কারণ নাই। মানুষ সবকিছুতে আগ্রহী।

রোগের কারণে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। একেবারে পথে বসে অনেক সচ্ছল পরিবার। অসংখ্য মানুষকে নিঃস্ব করে কারা ধনী হয়?

সেইসব মেধাবীরা।

কর্মসংস্থান ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজ হাঁটাদূরত্বের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। আত্মীয়-স্বজন কাছাকাছি বাস করতে পারে। দূরের যাত্রা হোক উচ্চতর শিক্ষা, জটিল রোগের চিকিৎসা ও বেড়ানোর মতো অল্প কটা খাতে। এই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাহলে যাতায়াত বাবদ ব্যাপক পরিমাণ সময়-শ্রম বেঁচে যাবে।


মানুষকে যারা সম্পদ মনে করে তারা কারা

যারা ব্যবহার করে সরলবুদ্ধি কাজের মানুষদের। তারা অজুহাত দেখানোর জন্য বলে, মানুষ রাষ্ট্রের সম্পদ।

এই বক্তব্য লজ্জার।

মানুষ রাষ্ট্রের সম্পদ না। রাষ্ট্র মানুষের সম্পদ। রাষ্ট্র মানুষ সৃষ্টি করে নি। মানুষ রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে। মানুষ একটি চিরন্তন সত্তা। প্রশ্নহীন। এর কোনো প্রমাণ দরকার নাই।

তবু তারা এ নিয়ে তর্কে লিপ্ত হয়।

তাদের পরিচয়, রুচি-সংস্কৃতি সম্পর্কে আমি সম্যক ওয়াকিবহাল।

তারা ধুলো আর ধোঁয়ার মধ্যে ডুবে থাকে। তাদের বাচ্চারা খামারের ভেড়ার মতো বেড়ে ওঠে। মাঝেমঝ্যে অবশ্য রাস্তায় ক্রিকেট খেলে! তাদের লজ্জা নাই। তারা খাওয়া আর করার জন্য শোষণের কৌশল ছাড়া আর কিচ্ছু শেখে নাই। চিন্তাও করে না।

তারা নিজেরা শ্রম বেচে না কিন্তু বেচার পক্ষে প্রশংসা-প্রচারে লিপ্ত হয়। তারা অসহায় মানুষদের ক্ষেতে-খামারে-কারখানায়-খনিতে নিয়ে শ্রমিক বানায়।

সেখানে তাদের কী হয়?

এসি ইত্যাদি বানাতে গিয়ে তাদের রক্ত-মাংস গলে ঘাম হয়ে বেরিয়ে আসে। আর তীব্র গরমের মধ্যে সেই এসির তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রির নিচে নামিয়ে এনে তারা কোট পরে পকেটে হাত ঢুকিয়ে রাখে। তারা কারা? মেধাবীরা। তাপমাত্রা ২৩ ডিগ্রির ওপরে রাখলে কিন্তু আর কোট বানানোর জন্য আরো কিছু কৃষক-শ্রমিক-মজুরকে ঠেঙ্গানো লাগে না।

তারা ঠেঙ্গিয়ে মজা পায়?

এসব এসি-রড ইত্যাদি তৈরির জন্য কারখানায়, এসবের কাঁচামালের জন্য নানা রকম খনিতে কত মানুষকে যে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়! এতে যারা সহযোগিতা করে, সেইসব প্রকৌশলী, মধ্যস্থতাকারী বা ব্যবসায়ী, আর যারা এসব কর্মকাণ্ডকে আইন বানিয়ে বৈধ ঘোষণা করে, বা যারা আইন প্রয়োগ করে, এবং যারা এর বিজ্ঞাপনের সঙ্গে জড়িত, তারা সবাই এর জন্য সমান দায়ী।

এভাবে তারা লোহা-গ্যাস-বিদ্যুৎ ইত্যাদি অপচয় করার জন্য মানুষের রক্ত-মাংস ব্যবহার করে। আর পরিবেশ ত ধ্বংস করেই।

তারা এসব কেন করে? তারা কি বুঝিয়ে দিতে চায় তারা কত বেশি ঠেঙ্গাতে পারে?

ধরা যাক তারা জানে না তারা কী করছে।

অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, খেলনা ইত্যাদি এনে ঘর সাজায়। একটা পোশাক কদিন পরার পর নতুন আরেকটা নিয়ে আসে অনেকে।

অমুক একটা জিনিস দ্বিতীয়বার পরে না!

তারা কি জানে কারা এসব তৈরি করে এবং কিভাবে তারা বেঁচে থাকে?

খেলোয়াড় বা অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক লাগামছাড়া বাড়ে কিভাবে?

তাদের যারা ব্যবহার করে, তাদের যারা নাচিয়ে নিয়ে বেড়ায়, সেই শাসকশ্রেণি দেখিয়ে দেয় তারা কত বেশি ঠেঙ্গাতে পারে।

ধাতব অলংকার—সোনা, রুপা, হিরা, পান্না, চুনি, মুক্তাসহ অন্যান্য—এবং সব ধরনের গয়না কেনাবেচা নিষিদ্ধ করা উচিত। ফুল ও অন্যান্য হালকা পদার্থ দিয়ে মানুষ নিজেই সাজের জিনিস বানিয়ে নিতে পারে। এতে তাদের ব্যক্তিগত রুচিবোধ, কর্মদক্ষতা ও সৃজনশীলতা বাড়বে, অবশ্যই।

গয়না পরা নারীরা মনে রেখো, অতি প্রাচীনকালে মানুষকে দাস বানিয়ে তাদের দিয়ে খনি থেকে সোনা সংগ্রহ শুরু করে খাজনা আদায়কারীরা। এখনও খনি থেকে সোনা-হীরা সংগ্রহকারীরা ঠিকমতো খেতে পায় না। আর এসব গয়না যারা বানায় তাদের জীবনও অন্য শ্রমিকদের মতোই।

মানুষ সভ্য হয়ে ওঠার শুরু থেকেই গয়না পছন্দ করেছে। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে মেধাবীরা। লুটেরা শ্রেণি।

এসব ব্যবসায়ী, তাদের জন্য বিজ্ঞাপন নির্মাতা, নির্মাতার শিক্ষক—এরা সবাই মিলে গয়নাকে আভিজাত্যের প্রতীক বলে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এতে আভিজাত্যের কিচ্ছু নাই। এটা নিছক মন। আর তার পেছনে আছে চালাকি ও কারসাজি।

গয়নার বিনিময়ে সেক্স ডল হয়ে থাকা নারীর সংখ্য বহুত! বহুত! সংখ্যাহীন!

গয়নার বিনিময়ে কেউ তোমার দেহটা ভোগ করছে কিনা মনে রেখো। সমান অধিকার দাবি করলে, যতটুকু ভুক্ত হচ্ছ ততটুকু ভোগ করা চাই। ভোগ করতে চাইলে গয়নার আবদার চলবে না।

মর্যাদার জন্য চাই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মন, কাজের দক্ষতা, প্রাকৃতিক সম্পদ।

দাস বা শ্রমের দাম ইচ্ছামতো কমিয়ে রাখার আইন বানিয়ে তারা শ্রমিক-মজুরদের যত্রতত্র ঠেঙ্গিয়ে নিয়ে বেড়ায়। ঠেঙ্গানোর পথ মসৃণ রাখার জন্য তারা শ্রম বিক্রিকে মহৎ কাণ্ড বলে প্রচার করে।

এটা ভণ্ডামি। শ্রম বিক্রিতে কোনো মহত্ত্ব নাই। মানুষ শ্রম বিক্রিতে বাধ্য হয় লজ্জার সভ্যতায়। এটা চরম রকম অপমানজনক।

গবেষণা বা অন্য কোনো প্রয়োজনে শ্রম পুঞ্জীভূত করার দরকার হলে তা করতে হবে অংশীদারির ভিত্তিতে বা স্বেচ্ছাশ্রমে।

কারাগারে উৎপাদন একটা ভালো উদ্যোগ। এ কাজ ব্যারাকে চালু করা উচিত। সেনাসদস্যরা উৎপাদনমুখী কিছু কাজ ত করছেই। সেটা সর্বত্র চালু করে তারা লজ্জার সভ্যতা থেকে বের হয়ে মর্যাদার সভ্যতার দিকে আগাতে পারেন।

সুশিক্ষিত জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সংস্কৃতির দিকে আগাতে হবে। তাহলে আমলা-বিচারক-উকিল বাবদ অনুৎপাদনশীল খাতে শ্রম ব্যয় কমে আসবে।

সাহিত্য, চারুকলা, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয় পড়িয়ে খাওয়ার কোনো মানে হয় না। এসব হলো নিছক শ্রমের অপচয়।

এসব বিষয় নিজে পড়ে শেখা যায়। অবসরে সিনিয়রদের সঙ্গে আড্ডায় বসে শেখা যায়। গবেষণা ও উচ্চতর চর্চার জন্য জাতীয় পর্যায়ে দুচারটা প্রতিষ্ঠান থাকলেই চলে।

সব ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সবার অধিকার-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। লজ্জার সভ্যতায় তা সম্ভব না। কারণ এখানে সব সময়-শ্রম অল্পকিছু লোক শুষে নিয়ে ব্যাংকে জমিয়ে রাখে।

কাজ না করলেও থাকা-খাওয়া চলে, আমার বাপ-ভাই হেনতেন, এসব শয়তানি স্বপ্ন, যার অনিবার্য পরিণতি হলো হানাহানি, নিদেনপক্ষে মনকষাকষি, এমন মন থেকে সবাইকে বের করে আনতে হবে। এই সচ্ছলতার পেছনে রয়েছে শোষণ এ কথা সবাইকে বলতে হবে।

দশ বছর বয়স থেকেই সবাইকে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজে নিয়ে আসা উচিত।

তোমার কাজ নেই মানে তুমি একটা বোঝা।

তবে তার আগে ভূমির অনুপাত বাড়াতে হবে। যথেষ্ট পরিমাণ জমি থাকলে বেকারত্ব থাকবে না। বরং শ্রমের অভাব হবে। তখন তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিলে প্রচুর শ্রম মিলবে।

পানির অভাবে, এবং রুচি-সংস্কৃতির অভাবেও বটে, দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ যারা শহরে বাস করে, তারা ঘরে-বাইরে সব জায়গায় আবর্জনার মধ্যে বাস করে। মশা থেকে বাঁচার জন্য হাজার হাজার টন বিষ ছিটায়। একদিকে বাঁচতে গিয়ে আরেক দিকে মরে। অথচ তারা শুধু পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করলেই এই বিষের ব্যবহার নব্বই শতাংশের বেশি কমে যায়। মানুষ এসব চিন্তা না করে আড্ডা দিয়ে মজা লয়। নোংরা খাবার খায় আর মজা করে বলে, সভ্যতা মানে বিষ্ঠা খাওয়া!

শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পরিচ্ছন্নতার কাজে লাগানো যায়। তবে এটা এই মুহূর্তে কঠিন। ময়লা ফেলার যথেষ্ট জায়গা নাই। পানি নাই। তবু শুরু করা যায়।

রুচি ত রুচি, পানির অভাবে বাঙালির জীবনটাই হুমকির মুখে। তবু তারা জন্ম দেওয়া থামাবে না। বরং বলবে, আমরা ত অনেক ভাইবোন ছিলাম।

মাদারচোত!

একটা খবর কয়েক শ মিডিয়া প্রকাশ করছে। এভাবে তারা সময়-শ্রম নষ্ট করে আর তাদের জন্য তাদের শ্রেণিবন্ধুরা শ্রমিক-মজুরদের ঠেঙ্গিয়ে খাদ্য-বস্ত্র ও অন্যান্য জিনিস উৎপাদন করায়। মানে কৌশলে ছিনিয়ে আনে।

দুনিয়ায় এমন কোনো জিনিস নাই যা এই সাংবাদিকরা বিক্রি করে না। ধরুন অনেক মানুষ চাপা পড়েছে অথবা আহত হয়েছে। সেখানে অন্যরা যখন জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত তখন এই সাংবাদিকরা ছবি তুলে বা গল্প লিখে তা বেচার ধান্দায় মত্ত হয়।

ঘটনাস্থলে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে হলে তাদের আগে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া উচিত। না পারলে পরে উদ্ধারকারীদের কাছ থেকে পরোক্ষ সংবাদ সংগ্রহ করতে পারে।

তারা যে খবরে নারী নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে হাহুতাশ করে, সেই খবরের সঙ্গে, একই পর্দায়, নারীকে উন্মুক্ত করে বিলাস দ্রব্যের বিজ্ঞাপন দেখায়! তারপর আবার তারাই ‘নারীকে উন্মুক্ত করে ফেলা হচ্ছে’ বলে চিল্লায়। কী তামাশা! সভ্যতা মানে তামাশা?

তারা এসব কেন করে? তাদের লজ্জা নাই? তারা ধুরন্ধর?

একটি খবর সর্বাধিক তিনটি মিডিয়ায় প্রকাশই যথেষ্ট। একটি খবর সংগ্রহ বাবদ সর্বাধিক তিনজন সাংবাদিকই যথেষ্ট। ভাবনার বৈচিত্র্যের জন্য তিনজনই যথেষ্ট।


ব্যবসা মানে হাজার রকম চাতুরির খেলা। এই খেলার মধ্য দিয়ে মুনাফা করে ভালো থাকা যায় না।


তোমরা কেঁচোর মতো প্রচুর জন্ম দাও বলেই বিদেশিরা এখানে কারখানা করতে আসে। কারখানার বর্জ্যে সারাদেশ বৃহৎ ডাস্টবিনে পরিণত হচ্ছে। বর্জ্য নিয়ে তামাম দুনিয়া মহা-সংকটে রয়েছে। সেই সমস্যা সমাধানের জন্য তারা এখন এখানে কারখানা করতে আসছে। এখান থেকে শ্রমিক নিয়ে তারা তাদের দেশে কারখানা বানাতে পারে না?

এসব না ভেবে তোমরা সেখানে কাজ কর আর ডাস্টবিনের মধ্যে বাস কর। আর সেখানে তুমি বাচ্চা পয়দা করে রেখে যাওয়ার জন্য এত উদ্‌গ্রীব কেন?

সুখের জন্য চাই মুক্ত কাজের পরিবেশ। চাই মুক্ত তৃণভূমি বনভূমি জলাশয়, যেখানে সহজে উৎপাদন করা যাবে অঢেল কাঠ খাবার তুলা ইত্যাদি। দরকার শুধু দক্ষতা।

কিন্তু শোষকশ্রেণি গুটিকয় উন্নত দেশের উদাহরণ দেখিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য জোরদার করতে বলে। উন্নত দেশগুলো বৈদেশিক বাণিজ্যের নামে কী করে?

তারা নিজের দেশে যেভাবে শোষণ করে, অন্য দেশেও ব্যবসার নামে তাই করে। পোশাক কারখানার কথা ধরুন। শ্রমিকদের এত সামান্য মজুরি দেয় যা দিয়ে তারা শুধু পুষ্টিকর খাবারই কিনতে পারে না। বাড়ি-স্বাস্থ্য-মন বলতে তাদের কিচ্ছু নাই। অথচ এসব কারখানা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে আবর্জনার স্তূপের নিচে ডুবিয়ে দিচ্ছে।

মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত মানুষের মধ্যে প্রলোভন সৃষ্টি করে অস্থিরতা জন্ম দিচ্ছে। তারা আরো বেশি কথা বলতে প্ররোচিত করে মানুষের পকেট কাটে। আর মানুষ টাকাও খোয়ায় আবার প্রচুর কথা বলতে গিয়ে অসুস্থও হয়।

মেধাবীরা এ নিয়ে টুঁ শব্দটি করে না।

কেন?

তারা তারা মাসতুতো ভাই।

বিদেশে ব্যবসা করতে গেলে বাংলাদেশকে এমন কিছুই করতে হবে।

ব্যবসা মানে হাজার রকম চাতুরির খেলা। এই খেলার মধ্য দিয়ে মুনাফা করে ভালো থাকা যায় না। এতে মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা আর প্রলোভনের মধ্যে বাস করে। প্রত্যেকেই অন্য অনেকের ওপর নির্ভরশীল কিন্তু তারা অন্যদের ভালোবাসে না। তাদের খোঁজ নেয় না। বরং প্রতিনিয়ত অন্যদের আরো বেশি শোষণ করে এবং দাবিয়ে রাখে। মূল্যবোধ, মর্যাদাবোধ থাকে না। ফলে হঠাৎ হঠাৎ দুএকজন লোক ভিড়ের মধ্যে গাড়ি চালিয়ে দেয়। মসজিদ-গির্জা-অফিসে ঢুকে একচেটিয়া গুলি করে। খুন-ধর্ষণ-চুরি-ডাকাতি হয়ে যায় সুলভ।

এসব খুন-ধর্ষণ-চুরি-ডাকাতি আর মেধাবীর ছলাকলার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নাই।

সব বাণিজ্যের একটাই উদ্দেশ্য। অল্প দিয়ে বেশি নেওয়া। উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করা। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের মতো বৈদেশিক বাণিজ্যেও তাই ঘটে। যেসব দেশ বেশি শক্তিশালী-কৌশলী-চতুর, তারা অতি সামান্য দিয়ে অনেক বেশি হাতিয়ে নেয়। দেশের ভেতরেও শক্তিশালী-কৌশলী-চতুর ব্যবসায়ীরা এই প্রক্রিয়ায় ফুলেফেঁপে ওঠে। এ কারণেই বাণিজ্য প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা আর প্রলোভন সৃষ্টি করে অশান্তি জন্ম দেয়।

দেশে যেসব পদার্থ নেই সেসবের ন্যায্য বিনিময় নিশ্চিত করতে হবে। অল্প দিয়ে বেশি নেওয়ার মন সংশোধন করতে হবে। বেশি দিয়ে অল্প নিয়ে যেন না ঠকি সেই বুদ্ধিও চাই।

জাপান বাংলাদেশের ভালো বন্ধু! চীন-ভারত ভালো বন্ধু! তারা আমাদের অনেক দিচ্ছে! রেল, রোড, ব্রিজ, টানেল… উয়াও! কত্ত কিছু! বস্তুত, এর মানে হলো তারা যা দিচ্ছে তা তারা আর তাদের এদেশি বন্ধুরা প্রতিনিয়ত মিডিয়ায় চিল্লিয়ে বলছে। যে টেলিভিশনটা উৎপাদনে ১০ হাজার টাকা খরচ হয় তা যে তারা এখানে ৪০ হাজার টাকায় বেচে সে-খবর তারা বেমালুম লুকিয়ে রাখে। এর সুবিধা এখানকার পুরো শাসকশ্রেণি ভোগ করে।

যারা কল্যাণ রাষ্ট্রের কথা বলেন, সেই উন্নত দেশগুলো নানা কৌশলে গরিব দেশ থেকে সময়-শ্রম-সম্পদ হাতিয়ে নেয়। আপনিও তেমনি একটা কল্যাণ রাষ্ট্র চান?

এটা অন্যায়। এর ফল আখেরে ভালো হয় না। উদাহরণ আছে ভূরি ভূরি।

তাদের গালাগাল করে লাভ নাই। শোষণপদ্ধতি থেকে বের হয়ে সামষ্টিক ছন্দ-সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্য কোনো উপায় নাই। একবার বলবেন ধানের দাম বাড়াও, আবার বলবেন চালের দাম কমাও, চিরকাল এমন তামাশাই করে যাবেন? তাহলে বন্যা-খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক মহাবিপদ থেকে রক্ষার উপায় মিলবে না।

শোষণের যাবতীয় আয়োজন এবং শোষণ আরো বাড়ানোর চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি শোষকরা দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করে। এটা তারা কেন করে?

আরো কিছু লোককে দলে ভেড়ায়। লজ্জার সভ্যতায় এমন নানাভাবে তাদের দল প্রতিনিয়ত বড় হয়।

শাসকশ্রেণি প্রায়ই শ্রমজীবীদের মন ভুলানোর জন্য মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে। কিন্তু তারা তাদের মজুরি কম দিয়ে খাজনার পরিমাণ বাড়িয়ে নিয়ে পকেটে ভরে। বেতন হিসেবে, ভাতা হিসেবে, ঘুস হিসেবে, ইত্যাদি। তার মানে তারা ওই না-খাওয়া মানুষদের কাছ থেকেই আরো খানিক খসিয়ে নিয়ে আরো খানিক আরাম-বিলাস করে। তারপর তারা তাদের মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে রাখে।

এর বিরুদ্ধে যারা কথা বলতে পারে, সেইসব সরকারি-বেসরকারি মেধাবী প্রাণীরা, ওই পকেট কাটার দলেই যোগ দিয়েছে। সেই আদিম যুগ থেকে তারা এটাই করে আসছে। আসলে তারাই এই সভ্যতা গড়ে তুলেছে!

আমি তাদের মর্যাদার সভ্যতা গড়ে তোলার আমন্ত্রণ জানাই।


মর্যাদার সভ্যতার জন্য কী চাই

জলাভূমি বনভূমি তৃণভূমি থাকবে উন্মুক্ত যাতে মানুষ আর শ্রম বেচতে বাধ্য না হয়। এগুলো চাহিদার তুলনায় অন্তত দুই গুণ বেশি দরকার। এক জমি সব সময় চাষ করলে উর্বরা শক্তি কমে যায়। জমি মরে যায়। জমি আর ফসল দেয় না। বিশেষত যে জমিতে প্রতিবছর পলি আসে না। কৃত্রিম সার দরকার হয়।

কৃত্রিম সার খাবারের স্বাদ-মান নষ্ট করে। খাবার বিষাক্ত হয়। আর জমি মরে যায়।

মোট চাহিদার চেয়ে দুই গুণ বেশি ভূমি মুক্ত রাখার পর বাকিটা নিয়ে মেধাবীরা যুদ্ধে নামুক। খামার-কারখানা বানিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করুক।

তখন সবাই মুক্ত ভূমি নিয়ে ব্যস্ত থাকবে এমন মনে করার কোনো কারণ নাই। তখনও বেশির ভাগ মানুষ মেধাবীদের কাছে ধন্না দেবে। মেধাবীদের কারখানায় শ্রম বেচার প্রতিযোগিতায় নামবে। কিন্তু তারা নিজেদের অসহায় মনে করবে না। তাদের সামনে মুক্ত ভূমিতে স্বাধীন জীবন যাপনের সুযোগ থাকবে। সেটা যতই গরিবি হোক। যতই কঠিন হোক। সেখানে মেধাবীরা চাতুরি না করেও উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করতে পারবেন।

একালে মানুষ এতটা শিক্ষিত হয়েছে যে, চাষের জন্য পর্যাপ্ত জমি, শিকারের জন্য জলা-ডোবা আর কাঠের জন্য প্রয়োজনীয় বন থাকলে তারা সহজেই স্বাস্থ্যকর জীবনমান নিশ্চিত করতে পারে। এতে তাদের নৈতিক মনোবল বাড়বে। নিজের ওপর মর্যাদাবোধ তৈরি হবে। তারা আর নিজেকে অসহায় মনে করবে না। অন্য কোনো উপায়ে সবার জন্য কাজের ব্যবস্থা করার কোনো তত্ত্ব এখনও আবিষ্কৃত হয় নাই। তবু কিছু বুদ্ধিজীবী সময়-অসময় অধিক কারখানা বানাতে বলেন।

কারখানা বাড়ালেই সবার জন্য কাজ মিলবে না। যতগুলো কারখানা দরকার তার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান-উপকরণ বর্তমান দুনিয়ায় নাই। সেই প্রচুর কারখানার জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল নাই। একারণেই প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার প্রলোভন। এটাই লজ্জার সভ্যতা।

মর্যাদার সভ্যতার জন্য চাই মাথাপিছু প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য আর সবার জন্য দক্ষতা বৃদ্ধির প্রকল্প।

মর্যাদার সভ্যতা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসুন।


৩য় পর্ব ‘মর্যাদার আন্দোলন’

(1117)

Latest posts by তারেক খান (see all)