হোম গদ্য মর্যাদার আন্দোলন

মর্যাদার আন্দোলন

মর্যাদার আন্দোলন
708
0
২য় পর্ব মর্যাদার সভ্যতা

পর্ব-৩

মানুষ কি লজ্জার সভ্যতা থেকে বের হতে পারবে? কোনো রাস্তা আছে?

আছে।

দ্বিতীয় পর্বে সে সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা দিয়েছি। এখানে তা নগ্ন করে দিচ্ছি, যাতে যে কেউ চাইলে কিছু করতে পারেন।

ধরুন সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাণ্ড। প্রায় সব ব্যয়ই সরকার বহন করে কিন্তু সামান্য একটু বেতন এবং পরীক্ষার জন্য ফি নিয়ে থাকে। আবার সরকারি হাসপাতালেও একই কাণ্ড। নামমাত্র ফি নেয়।

কেন নেয়?

স্রেফ শয়তানি চরিত্র টিকিয়ে রাখার জন্য। মানুষকে নাজেহাল করার জন্য। অন্য কোনো কারণ নাই। কিন্তু তারা নানা রকম অজুহাত দেখায়।

এই লেখার প্রথম দুই পর্ব পড়ে থাকলে আপনি একমত হবেন বলে আমার বিশ্বাস।

যদি একমত হন যে ‘শয়তানি চরিত্র টিকিয়ে রাখার জন্যই’ সরকার ওই সামান্য একটু ফি, সামান্য একটু বেতন নেওয়া অব্যাহত রেখেছে, তাহলে এ নিয়ে কাজ শুরু করে দিতে পারেন। ব্যক্তিগতভাবে বা দলগতভাবে।

প্রচার করুন: সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী/অভিভাবকের সঙ্গে সরকারের সব ধরনের লেনদেন বা টাকার কারবার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হবে। তাহলে সেখানে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার পথ অনেকখানি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ইত্যাদি।

সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা হাসপাতালে বাজেটের কতটুকু সরকার দেয় আর কতটুকু শিক্ষার্থীরা/রোগীরা দেয় সেই পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কেন পুরোটা দেবে সেই যুক্তি-দর্শন হাজির করাই আসল কাজ। যুক্তি-দর্শন সুলিখিত হলে ভালো হয়।

এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা যায়। দেনদরবার চলতে পারে। মিডিয়ায়, সভা-সমাবেশে প্রচার করে জনমত গঠন করতে পারেন। জনমত গঠন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এটা হতে হবে ঘরে-বাইরে সব জায়গায়। হতে হবে নানা খাতে। যেমন:


তরুণ সমাজ ও বৃদ্ধাশ্রম

স্বাস্থ্যকর বসবাসের জন্য জনপ্রতি কমপক্ষে তিন শতক জমি দরকার। রাস্তাঘাট, চলাফেরা, বেড়ানো, ইত্যাদির জন্য আরো অন্তত দুই শতক। খাবারদাবার আর সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য দরকার জনপ্রতি কমপক্ষে চার একর।

এখন আছে সব মিলিয়ে ২৫ শতকের মতো।

তাহলে জনসংখ্যা কমিয়ে আনতে হচ্ছে। এই দাবি জোরদার করতে হবে।

জন্ম না দিলে বুড়োকালে দেখবে কে?

হা, মানুষ জন্ম দেয় প্রধানত বুড়োকালের অবলম্বনের জন্য। এটা লজ্জার।

বুড়োকালের জন্য গ্রামে গ্রামে, মহল্লায় মহল্লায় বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তুলতে হবে। বৃদ্ধরা বৃদ্ধাশ্রমেই ভালো থাকে। ছেলেমেয়ে-নাতিপুতির মাথার ওপর বোঝা হয়ে থাকার খাসলত মন থেকে ঝেড়ে ফেলা উচিত। মানুষ কাজ করবে শিশুদের ভালো রাখার জন্য। কারুর ওপর বোঝা হবার জন্য না। সরকারি-বেসরকারি উভয় তরফে বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তুলতে হবে। এসব ইতিমধ্যেই নামমাত্র আছে। চেষ্টা করলে বাড়িয়ে তোলা যায়।


কাজ ও মালিকানা

সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক-কারখানা ইত্যাদি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি অভিন্ন মজুরিকাঠামো থাকতে হবে।

সব প্রতিষ্ঠানে তাদের সব কর্মীর জন্য বেতনের পাশাপাশি লভ্যাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। এতে ব্যবসায়ীর লাভ কমবে না। বরং বাড়বে। কারণ কর্মীরা কাজকে নিজের মনে করে অধিক মনোযোগী হবে। এমন নজির ইতিমধ্যেই আছে। কিন্তু তা নামমাত্র। এটা হতে হবে সব প্রতিষ্ঠানে।

সব মানুষ সমান কি অসমান সেই তর্কে না গিয়ে তাত্ত্বিক-মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখুন। আপনার পড়শি বা গরিব আত্মীয়টি যখন না খেয়ে রাত কাটায়, চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে মরে, অসহায় লোকজন যখন খাবারের জন্য দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তখন কি আপনার ভালো লাগে?

সরকারি আর বেসরকারি গাড়িচালক একই স্কেলে বেতন পেলে কার কী সমস্যা হয়?

আলাদা নয়, একই কমিশনকে সরকারি-বেসরকারি সব কর্মীর সব অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সব দপ্তরে, কারখানায়, গৃহকর্মে এবং অন্য সব খাতে। সরকারি-বেসরকারি সবার কর্মঘণ্টা, বেতন, ছুটি ও অন্য সব অধিকার এক স্কেলে হওয়া উচিত। খামারি-কৃষক-মজুরদের আয়-অধিকারও সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি বেতন আসে কোত্থেকে? সপ্তায় দুই দিন ছুটি, সারা বছর এ ছুটি সে ছুটি, রিক্রিয়েশন, সিক, ক্যাজুয়াল, আর্ন, ইচ্ছা হলেই বেতন বাড়িয়ে নাও—উয়াও!

যাদের ট্যাক্স থেকে তারা এসব সুবিধা পান, সেই জনগণের আয় কত?

আসলে এটা হলো জনগণের মুখের ওপর জোরসে একটা থাপড় মারা। তারপর তারা জনগণের কাছে গিয়ে বলে, আমরা তোমাদের বন্ধু, বুঝেছ?

তারা হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার পায় না, ওষুধ পায় না, হাসপাতালে ঢুকলে নোংরায়-দুর্গেন্ধে বমি আসে। আর তাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে তাই দিয়ে তারা লন্ডন-সিঙ্গাপুর যান চেকআপ করাতে। মেধাবীরা সেই খাজনার টাকায় দেশে-বিদেশে পড়ালেখা করেন। তারপর যারা তাদের লেখাপড়া শেখার জন্য খাজনা দিয়েছিল তারা তাদের মুখের ওপর থপাশ থপাশ করে থাপড় মারেন। তাদের সংগঠনের নাম হলো সুশীল সমাজ।

এটা কি বিস্ময়কর? তারা এটা কিভাবে পারেন?

এটা স্রেফ মন। মনের বিষয়। যেমন তাদের সভ্যতা। আরাম-বিলাস নিশ্চিত করার জন্য তারা মুখোশের আড়ালে সবকিছুর জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকে। মুহূর্তের মধ্যে খোলস বদলে ফেলে।


দক্ষতাই মূলকথা

কোনো কাজ কেউ কেউ সূক্ষ্মভাবে করতে পারে। কেউবা পারে স্থূলভাবে। অনেকে পারেই না। কোনো কাজ কেউ করে তিন ঘণ্টায়। একই কাজ অনেকে করতে পারে এক ঘণ্টায়। অল্প শ্রমে/সময়ে অনেক কাজের জন্য চাই দক্ষতা বৃদ্ধি।

বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির বেশির ভাগই অকাজের। দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা-প্রক্রিয়া নগণ্য। এই শিক্ষায় বরং লজ্জার সভ্যতাকেই আরো পাকাপোক্ত করা হয়। একে মূল থেকে বদলাতে হবে।

সনদ-নির্ভর শিক্ষা নয়। প্রতিটি শিশুকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষিত করতে হবে যাতে তারা স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য রক্ষার জন্য কাজ করতে পারে। গণিতের জ্ঞান যেন তারা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে। তারা যেন সব বিশ্বাস যাচাই করতে শেখে। নানা রকম সম্পর্ক, সংগঠিত থাকার কৌশল ও নেতৃত্ব নির্বাচনের শিক্ষা থাকতেই হবে। ইত্যাদি।

গণরুচি এমনি এমনি বদলাবে না। বৃত্তিমূলক শিক্ষার মতো সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো সুসম্পর্ক গড়ে তোলা ও রক্ষার উপায়, অন্যের দুঃখের কারণ না হওয়া, অন্যকে ভালো রাখার চেষ্টা, ইত্যাদি।

ঢাকার বহু অফিসে দেখেছি যেখানে সবাই বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস কিন্তু হাগার পর সবাই ফ্ল্যাশ করে না। নোটিশ টাঙিয়ে রাখার পরও না। তার মানে হলো এসব দুচার কথার কাজ না। প্রতিটি শিশুকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষত করা আবশ্যক। তাদের সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত স্কুলে রাখার মতো পরিবেশ-অবকাঠানো গড়ে তুলতে হবে। এমন ধরনের প্রতিষ্ঠান দেশে ইতিমধ্যেই দুএকটা আছে। আরো অনেক বাড়ানো যায় হুহু করে। যদি মর্যাদার সভ্যতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন থাকে।

প্রাথমিকভাবে, চার থেকে বিশ বছর বয়স পর্যন্ত সব শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক মৌলিক শিক্ষা জরুরি।

দ্রষ্টব্য: যেকোনো নীতি প্রণয়নের জন্য চাই বহু শ্রেণি-পেশার সাধারণ সদস্য ও প্রতিনিধিদের মত, বক্তব্য। সেই মতগুলো গুছিয়ে নীতি প্রণয়ন করা কঠিন কাজ। এটা পেশাদার গবেষক ও আমলাদের যৌথ কাজ। আমলারা সেখানে ছাঁচে ঢালাই করা মত গছিয়ে দিলেই সর্বনাশ।


নেতৃত্ব

যার মধ্যে নেতৃত্বের গুণ আছে তাকে উৎসাহিত করলে তা হতে পারে দারুণ পদক্ষেপ। এমন লোক অনেক আছে। কিন্তু পরিবেশ ও অন্যান্য কারণে ঝিমাচ্ছে। এমন লোকদের সঙ্গে উপযুক্ত আলোচনা হলে তাদের অনেকেই আগ্রহী হবে নিশ্চয়।

যে শিশুর কথায় অন্য শিশুরা মুগ্ধ হয়, যার কথা অন্য শিশুরা মেনে চলে, তাকে বড় নেতাদের জীবনী পড়তে দিন। সেই সঙ্গে গণিত, লজিক, সাহিত্য, ইতিহাস আর সমাজ-অর্থনীতি বিষয়ে নানা গ্রন্থ আবশ্যক। হয়তো সে-ই আগামী দিন মহত্তম মানব জাতি গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেবে।

যারা পরীক্ষায় ভালো করে তারা এসব অতিরিক্ত পাঠ সহজেই আত্মসাৎ করতে পারে। এতে পরীক্ষা খারাপ হয় না, বরং আরো ভালো হয়, কারণ এতে মন খুলে যায়, কাণ্ডজ্ঞান বাড়ে।

যারা কিশোর-তরুণ তাদের মধ্যে এই গুণ থাকলে তাদের বলুন, কেবল এজন বড় নেতাই বড় কিছু করতে পারে। একজন বড় প্রকৌশলী বা বড় অফিসার সেই নেতাকে কেবল একটু সহযোগিতা করতে পারে।

এটা ঠিক যে রাজনীতির লোকদের বদ খাসলতের শেষ নাই। কিন্তু মনে রাখা আবশ্যক, এরা রাজনীতি করতে আসে দেদার চুরিচামারি করার জন্য। এদের দেখে দেখে এখন ‘দেশের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের সৎ-শান্ত-ভদ্র-মেধাবী’ ডিগ্রিধারীরাও নির্লজ্জভাবে আলোচনা করে, কোন চাকরিতে সবচেয়ে বেশি ঘুস মেলে। কোন চাকরিতে মানুষকে ভালো মতো ঠেঙানো যায়।

এই প্রাণীদের হাতে এখন কোটি কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত নাকানি-চুবানি খাচ্ছে। মানুষের প্রাণের দাবি, মর্যাদা-সম্মান-ভালোবাসা, এখনও দুর্লভই রয়ে গেছে। এর পেছনে আছে অজ্ঞতা অন্ধতা জড়তা। একে জৈবিক সীমাবদ্ধতা বলে স্রষ্টার ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া যায়। তাতে লজ্জার সভ্যতা থেকে মুক্তি মিলবে না। দরকার একজন বড় নেতা যার আছে সংগঠিত করার ক্ষমতা।

মানবতার কথা বলেন এমন লোকের সংখ্যা অনেক। তারা সবাই শ্রমিকের স্বাস্থ্যকর জবীন চান তাও নিশ্চিত। তারা যদি সত্যিই তাই চান তাহলে তারা প্রত্যেকেই হতে পারেন একেকজন নেতা। শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের বলতে পারেন কেমন লজ্জার সভ্যতা গড়ে তুলেছেন তাদের পূর্বসূরি মেধাবীরা আর সেটা তারা এখন কেমন নির্লজ্জ-হিংস্র কায়দায় টিকিয়ে রাখছেন। সব শিক্ষার্থীকে বলুন মর্যাদার সভ্যতার কথা।

অনেক শিক্ষকই জানেন কোন শিক্ষার্থীর কতটুকু নেতৃত্বগুণ আছে। তাকে বলুন লজ্জার সভ্যতা আর মর্যাদার সভ্যতার কথা।

প্রায় সব শিক্ষক-অভিভাবক রাজনীতিকে ঘেন্না করেন।

কেন?

লজ্জার সভ্যতায় রাজনীতি মানে বদমায়েশি। শয়তানি।

আর ওই শিক্ষক-অভিভাবকরা আসলে কারা যারা রাজনীতিকে ঘেন্না করেন?

তারা ওই রাজনীতির এঁটো ও উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকেন তা আগেই বলেছি।

এই শিক্ষক-অভিভাবকের চরিত্র তাহলে সম্পূর্ণ ভণ্ডের চরিত্র? এ নিয়ে অনেকেই হীনম্মন্যতায় ভোগে।

মানুষ প্রতিনিয়ত নানা সমস্যায় নাস্তানাবুদ। তারা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে কিন্তু একটা সমাধান করলে আরেকটা হাজির হয়। ভণ্ডামিই এর প্রধান কারণ। অন্য কারণগুলো খুবই গৌণ।

মর্যাদার সভ্যতায় কেউ হীনম্মন্যতায় ভুগবে না। দ্বিচারী, পরস্পরবিরোধী, হিপোক্রিসি থেকে সবাই মুক্তি পেতে চায়। মর্যাদার সভ্যতায় তা সম্ভব, যা প্রতিষ্ঠায় শিক্ষকরাই সবচেয়ে ভালো নেতৃত্ব দিতে পারেন।

সবাই টের পায় না বাতাসে কতটুকু বিষ। কতটুকু দুর্গন্ধ। কোনো একটা ক্ষুদ্র কাজের ফলও কতটা ভয়ানক হতে পারে তা খুব কম মানুষই বোঝে। তাই সবাই কথা বলবে না। দুচারজন মানুষকেই সরব হতে হবে। তারা হলো নেতা।

দুনিয়ার সব বড় কাজ, বড় রূপান্তর দুচারজন মানুষই করেছে। একা নয় বটে। অন্যদের সঙ্গে নিয়ে। অনেককে সঙ্গে নেওয়ার কাজটা দুএকজনই করতে পারে।


রাজনৈতিক সংগঠন যা করতে পারে

বিভিন্ন সংগঠন ভালো কিছু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গায় সভা-সেমিনার, মানববন্ধন, মিছিল-শোভাযাত্রা করছে। বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। তারা খুব সহজেই মর্যাদার সভ্যতা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন।

যেসব সংগঠন সভা-সেমিনার, মানববন্ধন, মিছিল-শোভাযাত্রার আয়োজন করতে পারেন তারা নিয়মিত কর্মসূচি দিতে পারেন। যেকোনো ব্যানারে। মর্যাদার সভ্যতার ব্যানারে সারাদেশের সব ধরনের সংগঠনকে নিয়ে আসার চেষ্টা করুন। তারা একযোগে কর্মসূচি দিতে পারেন। মাঠে-ময়দানে-ঘরে বা অন্য যেকোনো জায়গায় হতে পারে। সেমিনার বা সমাবেশ বা অন্য কিছু।

আলোচনা করে অন্যান্য সিদ্ধান্ত নিন। বাঙালি হঠাৎ হঠাৎ একটা কিছু ভেবে কাজ শুরু করে দেয়। এই খাসলত বাদ দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গঠন করতে হবে।


মনে হওয়ার কোনো মানে আছে

কাজে নামার জন্য চাই বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা থেকে গঠিত সিদ্ধান্ত। মনে হওয়া একটা প্রাচীন, অলৌকিক খাসলত। মনকে মুক্ত করে আলোচনা শুরু করতে হবে। কোনো ধর্ম আপনাকে অন্যের দাস হতে বলে নাই। ধুলো-ধোঁয়া আর নোংরার মধ্যে ডুবে থাকতে বলে নাই। বিষাক্ত খাবার খেতে বলে নাই।

মাঝেমধ্যে নিজের মনের বাইরে গিয়ে দেখা দরকার অন্য আর কী আছে। সেগুলো কেমন। বদ্ধ ঘরে থাকার চেয়ে ভয়ানক হলো নিজের মনের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকা।

যাদের মন জড় তারা সংস্কারের মধ্যে আটকা পড়ে থাকে। কুসংস্কারের মধ্যেও আটকা পড়ে সুসংস্কারের মধ্যেও। আবার যাদের মন অস্থির তারা ছটফট করে বেড়ায়। ভালোমন্দ ঠিকঠাক চিন্তা করতে পারে না। মাঝেমধ্যে সংস্কার থেকে বের হয়ে, নিজের ভাবনা ও অবস্থান থেকে বের হয়ে, চিন্তা করে দেখা দরকার কী হচ্ছে। আর কী আছে।

বাঙালি বড় সংকুচে জাতি। কারণে-অকারণে সংকোচে ভোগে। সেই সংকোচ এতটাই বেশি যে বিপদ জেনেও গর্তে পা ফেলে। তারপর বন্ধুরা-স্বজনরা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে বহুকাল নাস্তানাবুদ হয়।

লোকে কী বলবে একারণেই বহু লোক বিয়ে করে, জন্ম দেয়। এমনকি পেট বাঁধার বিপদ জেনেও চোদন খাওয়ার সময় না বলতে পারে না। অথচ যাদের কারণে তারা এই সংকোচে ভোগে তারা প্রায় সবাই কাঠের মতো। প্রায় প্রতিটা বাঙালি কোনো-না-কোনো বিষয়ে সংকোচে ভোগে। সংকোচ মানুষের চিরশত্রু।


বলে কী লাভ

বললে কাজ হয়। না বলে কোনো কিছু হয় নাই। দুনিয়ায় যা কিছু হয়েছে তার সবই হয়েছে বলে বলে। বহুবার বলা হয়েছে বলেই ডায়েরিয়া হলে লোকেরা এখন স্যালাইন খায়। ডাক্তারের কাছে যায়। ঠিকমতো বলা হয় নি বলেই সাপ কামড়ালে এখনও অনেকে ওঝা খোঁজে।

কোনো কোনো শব্দ বা বিষয় শিশুদের ৩০ হাজার বারের বেশি বলা হয়। শিশুর বয়স দুই-আড়াই বছর হতে-না-হতেই অভিভাবকরা কিছু শব্দ-বাক্য দৈনিক দশবারের বেশি বলে থাকে। ‘খাও’ ‘পড়’ ‘সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়’ ইত্যাদি। কুড়ি বছর পরও অনেকে এসব বলে।

শিশুর ধারণক্ষমতা, বুঝতে পারার ক্ষমতা যতই বেশি হোক, কিছু শব্দ-বাক্য শৈশবে হাজার বার বলতে হয়। ব্যতিক্রম লাখে একটা-দুইটার বেশি না।

এই বলা মানে খোদাই করা। শিশুর মস্তিষ্কে এগুলো খোদাই হয়ে থাকে। কৈশোরে কোনো কোনো কথা কারো কারো মস্তিষ্কে একবার বললেই খোদাই হয়ে যায়। একই কথা কাউকেবা হাজার বার বলতে হয়। সবার বোঝার ক্ষমতা এক রকম না। জৈবিক সীমাবদ্ধতা আছে।

দরকারি কথাটা একবার বলে কাজ না হলে বারবার বলতে হবে। শতবার, হাজারবার বলতে হবে। দুএকজনকে কোটিবার বললেও কাজ হবে না তাও মনে রাখুন।

যারা মনে করে বললে কাজ হয় না, তাদের এই মনে করার পেছনে যথেষ্ট আক্কেলবোধ নাই। কেন তারা এটা মনে করে তারা তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। ব্যাখ্যা করতে পারলে তারা বুঝতে পারবে তাদের এই মনে করার মধ্যে ভুল রয়েছে।


যারা বলে ‘হবে না’ তারা এটা কেন বলে

তারা নিজেরা সমাধান দেখতে পায় না বলে মনে করে এটা হবে না। তাদের কেউ কেউ রোবটজাতীয় মাল। কেউ কেউ হতাশ। কারো কারো মাথা স্রেফ একটা মশার মতো। সবই স্বাভাবিক জৈবিক। এমন মাল দেখে হতাশ হওয়া চলবে না।

বড় কোনো সমস্যার সমাধান তখনই হয় যখন অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হয়। হবে না বললেই সব শেষ। দুনিয়ার সব আবিষ্কারচেষ্টা ও কল্যাণ-আন্দোলন অনেকেই থামিয়ে দিতে চেয়েছে। না বুঝেও চেয়েছে শয়তানি করেও চেয়েছে। তারা ব্যর্থ হয়েছে। জয় পেয়েছেন আবিষ্কারকরা, মহান নেতারা।

‘দূষণমুক্ত, নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর নগর চাই,’ নগরের বেশির ভাগ মানুষ কথাটা জোর দিয়ে সব সময় বলতে থাকলে, সরকারি জন্তুরা বোবা হয়ে থাকলেও, উপায় নিয়ে হাজির হবেন কোনো এক পথ প্রদর্শক। এটা নিশ্চিত। তাই, বলাই যথেষ্ট, ‘মর্যাদার সভ্যতা চাই,’ ‘দূষণমুক্ত, নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর নগর চাই’ ইত্যাদি। বলুন, আপনিও।

সবকিছুর মূলে রয়েছে ইচ্ছা। তারপর বাস্তবায়নের উপায় খোঁজার কাজ। উপায় আছে। অন্ধ হয়ে থাকলে খোঁজ মিলবে না। যারা চায় না অথবা প্রকৃত ইচ্ছা নাই, তারাই নানা রকম অজুহাত দেখায়।

অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, ততোধিক প্রক্রিয়ায় চেষ্টা করতে হবে, যতক্ষণ সমস্যার সমাধান না হয়। মানে প্রতিজ্ঞা থাকতে হবে। কমিটমেন্ট থাকতে হবে। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে নড়া যাবে না। বিচলিত হওয়া চলবে না। বিব্রত হওয়া মোটেও শুভ লক্ষণ না। বিচারক বিব্রত হয় এ কারণে যে, কোনো কিছুতে তার কিছু যায়-আসে না। সে শুধু আরাম-বিলাস নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু এভাবে সম্ভব না। বিব্রত ওই বিচারক সুখে নেই, আমি নিশ্চিত।

কঠিন ও সহজ এই শব্দ দুটি যথেষ্ট অপয়া। মেধাবী সভ্যরা এমন অনেক শব্দ আবিষ্কার-উদ্ভাবন করেছে অন্যকে দমানোর জন্য, অজুহাত দেখানোর জন্য, দায়মুক্তির জন্য এবং প্রলোভিত করার জন্য।

কঠিন না সহজ এই আলোচনায় যাওয়ার কোনো মানে হয় না। যা লক্ষ্য, যা করতে হবে তা করতে হবে। কাজের পথে বাধা এলে তা অতিক্রম করার ক্ষমতা মানুষ অর্জন করতে পেরেছে।


গবেষণা

লজ্জার সভ্যতা নিয়ে বিচ্ছিন্ন অনেক নিন্দা-সমালোচনা আছে কিন্তু তা থেকে বের হবার রূপরেখা দুর্লভ। এই পুস্তিকা সেখানে কিছু ধারণা হাজির করেছে। এখন সেসব বিষয়ে সবচেয়ে জরুরিভাবে, সবচেয়ে বেশি করে চাই গবেষণা। সরকারি, বেসরকারি, প্রাতষ্ঠানিক, ব্যক্তিগত, সর্বোতভাবে। সেজন্য চাই প্রকৃত ইচ্ছা, বিস্তর চিন্তা, উত্তম চেষ্টা, নানা রকম সভা-সেমিনার, সর্বত্র আলোচনা, বিচিত্র লেখালেখি, ইত্যাদি। চাই গবেষণা থেকে অর্জিত জ্ঞান, যা দিয়ে তৈরি হবে একেকটা পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প। বহু প্রকল্পের সমন্বয়ে গড়ে উঠবে মর্যাদার সভ্যতা। স্মার্ট সিভিলাইজেশন।


উপসংহার

যাদের যোগ্যতা নাই, যাদের কাজ করার সামর্থ্য নাই এবং প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদ, সবার সব অধিকার চাই মর্যাদার সভ্যতায়। ব্যক্তিত্বে-অহঙ্কারে প্রাণোচ্ছল চাই প্রতিটা মানুষ। ফুরফুরে চাই সব প্রাণী। বহুলোক আছে যারা চাইলেই অনেক কিছু হস্তগত করতে পারে কিন্তু তারা তা করে না। তারা হোক মর্যাদার সভ্যতার দৃষ্টান্ত।

প্রায় সবাই নিজেকে সেরা দেখতে চায় কিন্তু সবাইকে সুখী দেখতে চায় এমন মানুষও অনেক আছে। তাদের মধ্যে খুব কম লোকই চেষ্টা করে। কারণ তারা পথ দেখতে পায় না। এই রচনা তাদের পথ দেখাবে বলে আমার বিশ্বাস।

মর্যাদার সভ্যতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করুন।

(708)

Latest posts by তারেক খান (see all)