হোম গদ্য মধ্যবিত্তের বিপ্লব, মধ্যবিত্তের সাহিত্য

মধ্যবিত্তের বিপ্লব, মধ্যবিত্তের সাহিত্য

মধ্যবিত্তের বিপ্লব, মধ্যবিত্তের সাহিত্য
3.27K
0

পঞ্চাশের সঙ্গে তেইশ যোগ করলে তেহাত্তর। তার মানে নিশ্চিত করেই বলা যায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সেবার, মানে ১৯৮১ সালের মাঝামাঝি সময়ে অথবা উর্দিপরা কেউ রক্তে হাবুডুবু খেতে খেতে একেবারে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে দেয়াল, ছাদ, মেঝে, চৌকাঠ, বিছানা ইত্যাদি স্থানে ছড়িয়ে পড়ার মাসদুয়েক বাদে আমাদের ১৯৭৩ সালের এক গল্প শোনান—যে গল্পের শুরু ছিল আমাদের এখনকার এই পঞ্চাশ আর তেইশ যোগ করার কথোপকথনের মতোই সংক্ষিপ্ত এক বাক্য দিয়ে; যে বাক্যের শেষেই আবার দীর্ঘ আরেকটি বাক্য ইনিয়েবিনিয়ে অনেক কিছুর ইঙ্গিত দিয়ে শেষ করেছিল তার সেই প্রারম্ভিক অনুচ্ছেদকে।

তবে অনুচ্ছেদের শেষ হওয়ার মানে তো গল্পের শেষ হওয়া নয়। কিংবা এমনও নয় যে, সংক্ষিপ্ত বাক্য বলেই তাতে হয়ে পড়েছে সব কিছু সংক্ষেপিত—যেমনই থাকুক, যত তুচ্ছ-ক্লান্ত-চুপচাপ কিংবা সংক্ষিপ্ত জীবনই হোক না কেন, গল্প তো শেষ হয় না, গল্প মানুষ বলেই চলে, কখনো সরব হয়ে, কখনো বা তার ভগ্ন জীবনের অরব অন্ধকারে।

ইলিয়াসের এই গল্প অবশ্য কোনো তুচ্ছ জীবনের নয়; প্রচল অর্থে মহীয়ান সব জীবনও এতে আছে কিংবা তুচ্ছ অগণন জীবনের অপ্রচল মহীয়ানতাও এতে রুদ্ধশ্বাস আবেগের স্রোত নিয়ে বয়ে চলেছে। তুচ্ছতার প্রবল স্রোতে জীবনেরই এক বিপুল তরঙ্গ দুলে দুলে বয়ে চলেছে। প্রবল প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র ও শ্রেণিশক্তির অস্ত্রের ঝনঝনানির মুখে জীবনকে তুচ্ছ করে অকাতরে মৃত্যুর জন্যে রুষে উঠা ছাড়া এইসব তুচ্ছ জীবনের আর কোনো অর্জন নেই। এভাবে সমাজের প্রতিষ্ঠিত সত্যকে নাকচ করে নতুন এক উদ্বোধনের দৃশ্যপট দেখি বটে আমরা, কিন্তু তার পরও কোথায় যেন ছন্দপতন থাকে, কোথায় যেন এই আভাসই মুচকি হাসে, মধ্যবিত্তই মহীয়ান বটে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, যিনি মধ্যবিত্তকে নতুন দৃষ্টিতে দেখেছেন, সাহিত্যকে নিম্নবর্গের মানুষের চালচিত্রও করে তুলেছেন বলে আমাদের সাহিত্য সমালোচকদের কাছে যার স্বীকৃতি রয়েছে, তার গল্পে মধ্যবিত্তের মহীয়ান হয়ে ওঠার আভাস রয়েছে বললে সমূহ বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পর্যাপ্ত আশঙ্কা রয়েছে বটে। কিন্তু ইলিয়াসের ‘দখলে’র সফলতা এখানেই। মধ্যবিত্তের বিপ্লব যেমন নানা কমপ্লেক্সে আকীর্ণ, মধ্যবিত্তের সাহিত্যও তেমনি নানা দোলাচলে বিস্তৃত। আর সে কারণেই ইলিয়াসের ‘দখল’ ষাট-সত্তর দশকের মধ্যবিত্ত জীবনের অন্যতম দ্রষ্টব্য; দ্রষ্টব্য মধ্যবিত্তকে ছাপিয়ে নতুন কোনো সুর জাগানোর প্রচেষ্টার দিক থেকেও।


বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঙ্গে পূর্বসূরী সামন্ত ও অভিজাতদের রক্ত বহনকারী মধ্যবিত্তের মিথস্ক্রিয়াও এই গল্প।


কবে পড়ি এই ‘দখল’? ঠিকঠাক তা আর মনে পড়ে না। তবে পুরানো পত্রপত্রিকার হিশেবে, ‘দখল’ ছাপা হয়েছিল গাজী শাহাবুদ্দীন সম্পাদিত ‘সচিত্র সন্ধানী’র জুলাই, ১৯৮১ সংখ্যায়। গল্পের শুরুতেই জেনে যাই আমরা, তেইশ বছর পর ছেলে এসেছে পিতার সম্পত্তির ভাগ দাবি করতে। তবে খানিকটা কুণ্ঠিতও সে—ব্যক্তিমালিকানার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে করতে যে-বাবার মৃত্যু ঘটেছে, তার বাবা মানে দাদা আর ভাই মানে চাচাদের কাছে সে সম্পত্তি দাবি করে কী করে! সেই দাবি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারে না—না ধর্মের বিচারে, না আইনের বিচারে, না নৈতিকতার বিচারে। ধর্মের বিচারে টেকে না, কারণ দাদা বেঁচে থাকতেই মৃত্যু ঘটেছে বাবার, তাই ইসলামি পারিবারিক সম্পত্তি আইন অনুযায়ী সম্পদে নাতির কোনো অধিকার নেই। আবার আইনের মাপকাঠিতেও এ দাবির ন্যায্যতা নেই, কারণ আইয়ুব খান শরীয়তের নিয়ম পাল্টে সম্পদ বণ্টনের নতুন যে আইন করেছিল, বাবার মৃত্যু ঘটেছে সেটা হওয়ার আগেই। গল্পের মধ্যে প্রসঙ্গক্রমে তার এপিটাফও দেখি আমরা, ‘শহীদ কাজী মোহাম্মদ মোবারক হোসেন, জন্ম ১৯২৬, মৃত্যু ১৯৫০, স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রাজশাহী কারাগারে নিহত।’ এইভাবে এই গল্পের তলদেশে উদ্ভাসিত হতে দেখি ইতিহাসকে। এইভাবে এ গল্পে এই জনপদের বর্তমান মানুষগুলো যুক্ত হয় দীর্ঘ এক ধারাবাহিকতার সঙ্গে, প্রবাহমানতার সঙ্গে। কেননা ১৯৫০ মানেই তো রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে রাজবন্দি হত্যার ইতিহাস, কারাগারে থেকেও অধিকার আদায়ের জন্যে কম্যুনিস্টদের সংগ্রাম করার ইতিহাস। আবার এই ১৯৫০-এর বন্দি কম্যুনিস্টরা তো মূলত তেভাগা আন্দোলনের নেতা, সংগঠক ও কর্মী। নিরন্ন, সম্পদহীন, নিরক্ষর ও অধিকারহীন কৃষকদের সঙ্গে বোধকরি সেই প্রথম সামন্তবাদজাত মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি ক্ষুদ্র ও শিক্ষিত অংশ নিজেদের সংযোগ গড়ে তুলেছিল, মৈত্রীর বন্ধনে তাদের উদ্বেলিত করেছিল, বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিল, দেখিয়েছিল।

সেই ১৯৫০ সালের ২৩ বছর পরে বাবার গ্রামে ফিরে আসে মোবারক হোসেনের সন্তান। ১৯৫০-এর জীবনের প্রবাহ এসে তরঙ্গিত হয় ১৯৭৩-এ; যখন দেশ স্বাধীন হয়েছে কেবল, যখন মানুষের যুদ্ধ থেকে প্রাপ্তির প্রত্যাশা আরও প্রবল হয়ে উঠেছে; তাই সমাজ-রাষ্ট্রে সংক্ষুব্ধতা আর সংঘাতও প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে, আর এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে রাষ্ট্রযন্ত্রের পশ্চাৎপদতা ও রক্ষণশীলতা, নিপীড়ন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সরকারদলীয় প্রচেষ্টা। তবে কেবল এটুকু বললে কমই বলা হবে। কেননা, এই গল্পকেই তো আবার দেখা যায় ধরে রাখতে সমাজ ও রাষ্ট্রের একাধিক শ্রেণির অবস্থান এবং রাজনৈতিক দর্শন ও মধ্যবিত্তের বিপ্লবচিন্তা। বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঙ্গে পূর্বসূরী সামন্ত ও অভিজাতদের রক্ত বহনকারী মধ্যবিত্তের মিথস্ক্রিয়াও এই গল্প। পাশাপাশি তা নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে তার নৈকট্য সৃষ্টির প্রচেষ্টার পরও রয়ে যাওয়া দূরত্বটুকুর ইঙ্গিতে বিভোর। ‘দখল’ তাই এককথায়, মধ্যবিত্তের সাহিত্যচিন্তা ও বিপ্লবভাবনার ডিসকোর্স—আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নিজেও যার অন্তর্ভুক্ত।

এই কথাটায় আপত্তি উঠতে পারে, ইলিয়াস নিজে কেন এর অন্তর্ভুক্ত হবেন। কারণ লেখকের ব্যক্তিগত অবস্থানের সুলুকসন্ধান করতে গিয়ে অধিকাংশ মানুষই ভাবেন না, লেখকের রাজনৈতিক বোধের প্রকাশও তার ব্যক্তিগত অবস্থানই বটে। এই অধিকাংশ মানুষের কাছে ব্যক্তিগত অবস্থানের অর্থ হলো তার পারিবারিক ও যৌন জীবনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়। ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান তাদের কাছে অত স্পর্শকাতর নয় যে, তার প্রকাশ ঘটলে অস্বস্তিতে পড়ে যাবেন। অতএব আমরা স্বস্তিবোধ করতে পারি, এই গল্পের ধারাবাহিকতা ও পরিণতির মধ্যে দিয়ে ইলিয়াসের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বোধের যে প্রকাশ ঘটেছে, তার পর্যবেক্ষণ নিয়ে কোনো আপত্তি উঠবে না। ‘দখল’ যে শেষ পর্যন্ত শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে ওঠে, তার কারণ মূলত এই যে, এই গল্পের পারিপার্শ্বিক চরিত্রগুলো মধ্যবিত্তের বিপ্লবচিন্তার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। বাস্তবেও বার বার দেখা গেছে, সামগ্রিকভাবে মধ্যবিত্তের বিপ্লবচিন্তা যে পরিণতি বয়ে আনে, শেষ পর্যন্ত তাকে তা তত আহত করে না; বরং এমনকি দলচ্যুত হলেও একদা ‘মার্কসবাদ চর্চা’ করার জন্য বিপুল সহানুভূতি অর্জন করেন এবং কেউ কেউ সেই সহানুভূতিকে ব্যবহার করে বেশ বিত্তবানও হয়ে ওঠেন। কিন্তু ভুগতে হয় মেহনতিদেরই। মধ্যবিত্ত বলে বটে, ওদের তো শৃঙ্খল ছাড়া আর কিছু হারানোর নেই বা ছিলও না; ওদের আর ভোগান্তি কী! কিন্তু ভোগান্তির দশচক্র বিত্তহীন মেহনতিকে আরও বিপন্ন করে তোলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা বা যান্ত্রিকভাবে মার্কসবাদ চর্চাকারীরা ভুলে যাই, ব্যক্তিসম্পদ না থাকলেও যত ‘অপরিশীলিত’ই হোক না কেন, তারও সংস্কৃতি আছে, তারও সামাজিকতা আছে। আর তা আমাদের মধ্যবিত্তের কাছে যত ‘অপরিশীলিত’, যত ‘দীন’ বা ‘রুক্ষ’ই মনে হোক, সংস্কৃতি ও সামাজিকতার ওপর আক্রমণ তাকে মধ্যবিত্তের চেয়েও বিপন্ন করে তোলে। মধ্যবিত্ত তার সংস্কৃতির ওপর আক্রমণের প্রতিরোধে নামার মতো শক্তি রাখে, এমনকি সেই প্রতিরোধে বিত্তহীনকেও যুক্ত করতে পারে বিপন্নতার জুজু দেখিয়ে; কিন্তু মেহনতিদের সেই ক্ষমতা নেই।মধ্যবিত্তকে তেমন না ভোগালেও নির্যাতন, বিপন্নতা ও নিরুপায়তা চেপে ধরে মেহনতিকে। এইদিক থেকে দেখতে গেলে, আপাতদৃষ্টিতে উজান স্রােতের মনে হলেও, ইলিয়াসের ‘দখল’ কিংবা অন্যান্য লেখাও শেষ পর্যন্ত মধ্যবিত্তেরই সাহিত্য। বড়জোর আমরা বলতে পারি, এটি মধ্যবিত্ত সাহিত্যেরই একটি সংখ্যালঘু অংশ।

তার আগে সংক্ষেপে এ গল্পকে জেনে নেই আমরা : এ গল্প মূলত সেইসব কৃষকের, এককালে যারা সোচ্চার ছিলেন এই স্লোগানে—‘লাঙল যার, জমি তার’; এ গল্প মূলত সেইসব সামন্তের, যারা জমির মালিকানার জোরে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় ফসলের উৎপাদন আর বণ্টনকে; আবার এ গল্প মূলত সেইসব মৃত-জীবিত শ্রেণিচ্যুত হওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত মধ্যবিত্তের—যারা স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখায় বিপ্লব ও ভূমি সংস্কারের; এ গল্প রাষ্ট্রশক্তিরও বটে, যারা সামন্তদের, ভূ-মালিকদের পক্ষে দাঁড়িয়ে নির্মমভাবে দমন করতে সক্ষম প্রতিবাদী ও আন্দোলনকারীদের। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কৃতিত্ব হলো, নিরেট এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটকে তিনি কাহিনির গতিময়তার মধ্যে একেবারে লোপাট করে ফেলেছেন। তাই গল্প পড়তে গিয়ে এসব আমাদের আর মনে আসে না। ঘটনার পরম্পরায় তা হয়ে ওঠে উত্তপ্ত ধারাবাহিক জীবনধারা। সেখানে বাবার সম্পত্তির জন্যে দীর্ঘ ২৩ বছর পর আসা ইকবালকে তার দাদা মোয়াজ্জেম কাজী কোনো সাহায্য করতে না পারলেও ‘বড় ছেলের জন্য গদগদ ভাব তার কাটে না।’ শ্রেণিনির্বিশেষে মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক মানবিকতার বয়ান উঠে আসে তাই ইলিয়াসের কলমে :

ইকবালের বাপ তার প্রথম যৌবনের প্রেম ও সঙ্গমের ফল; কী হৃদয়ে কী শরীরে সেই তীব্রতা আর কোনোদিন অনুভব করা যায় নি। বড় ছেলের কথা বলতে বলতে মোয়াজ্জেম হোসেনের গোসল করতে বেলা বয়ে যায়, খাওয়া দাওয়া শেষ হতে না হতে আসরের আজান পড়ে। বাড়িতেই মসজিদ; বাড়িতে মসজিদ থাকলে সেখানে নামাজ পড়া ফরজ, তাই খাওয়ার পর পরই মসজিদে গিয়ে প্রথম কাতারে দাঁড়াতে হয়। একটু গড়ানো আর হয়ে ওঠে না। বড় ছেলের কথা বলতে বলতে রাত হয়, তার জন্য দুধরুটি ভিজিয়ে বসে থাকে গেন্দুর মা, লম্বা টেবিলের পাশে ইকবালের ভাত আগলে অপেক্ষা করে ছোট চাচিআম্মা। এশার নামাজ পড়ে সবার বিছানায় শুতে শুতে আদ্যিকালের দেওয়াল ঘড়িতে রাত ১২টার ঘণ্টা বাজে।

সম্পত্তির ভাগ দিতে না পারলেও, নিজের রক্তস্রোতে বয়ে চলা মানুষটির জন্যে বুনো আকর্ষণ আর সহানুভূতি বয়ে চলে মোয়াজ্জেম কাজীর রক্তস্রোতে।পুত্রবধু কিংবা তার নাতির কোনো দেখভাল না করলেও মরার পর পুত্রের সঙ্গে মিলিত হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষায় সন্তানের কবরের পাশে আরেকটি কবরের স্থান তিনি আগলে রেখে চলেছেন ২৩ বছর ধরে। তবে ওই আকর্ষণ আর সহানুভূতি যতই প্রবল হোক, সতর্কও থাকতে হয় তাকে। কারণ তার নিজের গণ্ডগ্রাম চণ্ডিহার, যেখানে থানা হেডকোয়ার্টার থেকে হেঁটে আসতে সময় লাগে টায়-টায় একঘণ্টা, সেখানেও আগুন জ্বলে উঠেছে বাড়ির সঙ্গে চিথুলিয়া বিলের ওপারে থাকা কাঁঠালপোঁতা, শিববাটি আর কাঁটাহার গ্রামের মতো। চণ্ডিহারের মাইলখানেক উত্তরে নুনগোলার হাট, যেখানে স্বদেশিওয়ালারা একসময় কাপড় পোড়াত আর সেই কাপড় পোড়ানোর বছরেই জন্ম হয়েছিল তার বড় ছেলে মোবারক হোসেনের। বড় হয়ে সেই ছেলে কম্যুনিস্ট হয়, অথচ তার জন্মের সময় বাড়ির মসজিদে মোয়াজ্জেন আর ইমাম না থাকলেও আজান হয়েছিল, জিন সেই আজান দিয়েছিল। জিনের আছড়েই মোবারক বুঝি মাত্র ১০ বছর বয়সেই পুলিশের হাত থেকে হান্টার কেড়ে নেয়ার সাহস পায়। যে আগুন জ্বলেছিল তার জন্মের বছরে, সে আগুন আমরা জ্বলতে দেখি তার মৃত্যুর ২২ বছর পরেও। তাই অতীতের মতো এখনো রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গেই নিকট সম্পর্ক রাখতে হয় মোয়াজ্জেম কাজীদের। ওদিকে সম্পত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা না থাক, একেবারে শক্ত-সমর্থ্য হয়ে উঠে জীবনে এই প্রথম দাদাবাড়িতে এসে আদরের ঘোর কাটে না ইকবালের। যাই-যাই করেও সে থাকে আর চলাফেরা করে এদিকওদিক—ঘটনাক্রমে বিলের ওপারের গ্রামে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় হয় মোবারকের এককালের সতীর্থ ভেদু পরামাণিকদের সঙ্গে। চাষাভুষো মানুষ তারা, মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলেছে। যাদের সেই মুক্তাঞ্চলে থাবা বসাতে রক্ষীবাহিনী নিয়ে বৈঠকের পর বৈঠক করতে হচ্ছে প্রাক্তন মুসলিমলীগার কাজী মোয়াজ্জেমের আরেক ছেলে মুজিব কোটপরা মোতাহারকে। ‘স্বাধীন দেশের মধ্যে আরেক দেশ’ বানিয়ে রাখা লোকগুলোকে বীজসমেত উপড়ে ফেলতে মরিয়া সে।


আওয়ামী লীগের একাংশের এই স্বাধীনতাবিরোধিতা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনালোচিত পর্বে পরিণত হয়েছে।


অতএব রক্ষীবাহিনী আসে। কিন্তু মুক্তাঞ্চলের মানুষরা তেলিহারের দিক থেকে কয়েকটা ফায়ার করে সেই ফোর্সকে মিসগাইড করে নিয়ে কেচিকলে ফেলে দেয়। রিইনফোর্সমেন্টের জন্যে বগুড়ার দিকে জিপ নিয়ে ছুটতে থাকে রক্ষীবাহিনীর ক্যাপ্টেন। কাঁঠালপোঁতা গ্রাম শেষ হবে কী, চণ্ডিহারের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে চাষাভুষো মানুষরা। তাদের পদধ্বনি আর রাইফেলের শব্দ শুনতে শুনতে মোয়াজ্জেম হোসেন কাজী ইকবালকে জানায়, মোবারকের কবর ছাড়া এই বাড়ির সব কিছুই ধ্বংস করে ফেলবে ওরা। তবে ইকবাল নিশ্চয়ই রেহাই পাবে। কারণ তার বাবা মোবারকের সঙ্গে ভেদুর তো খাতির ছিল। কিন্তু তা-ইবা হবে কী করে? ইকবালের মনে পড়ে, রক্ষীবাহিনী তার চাচা মোতাহারের কাছে এলে বাবার কবরের মাথায় দাঁড়িয়ে বিলের ওপারে কাঁঠালপোঁতার দিকে তাকানোর কথা ছিল তার। কিন্তু সেরকম তো করতে পারে নি সে। তা হলে তার-ও তো কপাল খারাপ! এদিকে দাদা তার প্রবল বাসনা জানাচ্ছে, মৃত্যুর পর তাকে যেন এই কবরের পাশেই কবর দেয়া হয়। কিন্তু ‘বিপ্লবী বাপের’ পাশে যেন এই ‘শয়তান বুড়োটা’র কবর না হয় সে জন্যে ইকবাল নিজেই সে কবরে বসে পড়ে। লাশের মতো শুয়ে পড়ার পর পা নাচাতে থাকে একটু একটু করে। ইলিয়াস লিখেছেন :

এবার মরলে এখানেই তার চিরকালের আসন হয়ে থাকবে। চিরকাল? হ্যাঁ চিরকাল! কাঁঠালপোঁতার প্রবাহ এই তো এসে পড়ল। আসুক না! তার ভয় কী? তার জন্য নিশ্চিত অমরতা! বাপের ফলকের পাশে আরেকটি ফলক স্থাপিত হতে কতদিন আর লাগবে? বিপুল মানুষের সমবেত পদযাত্রায় প্রচণ্ড ধ্বনি শুনতে শুনতে ইকবালে চোখ চকচক করে, জিভ দিয়ে সে ঠোঁট চাটে।

বোধকরি, বলার আর অপেক্ষা রাখে না, মধ্যবিত্তের চরিত্র আসলে কী! মরলেও সুফল তার, বাঁচলেও তাই—এইসব জানান দিতে দিতে ‘দখল’ নামের গল্প শেষ হয়ে যায়। ইলিয়াস কিংবা তার কাহিনি স্পষ্ট করে না বললেও পাঠকের জানা হয়ে যায়, একদা মধ্যবিত্ত শ্রেণিচ্যুত মোবারককে এবারও আর নিজেদের দখলে নিতে পারবে না মুক্তাঞ্চলের কৃষকরা; নতুন করে তার দখলদারিত্ব নিচ্ছে তারই মধ্যবিত্ত পুত্র ইকবাল। মোয়াজ্জেম কিংবা মোতাহার নয়—মোবারকের পৈত্রিকসূত্রে মধ্যবিত্ত থাকার এবং পাল্টে গিয়ে শ্রেণিচ্যুত হওয়ার সুফল এখন আরেক মধ্যবিত্ত সুবিধাভোগী ইকবালের দখলে।

ইলিয়াস যে এমন একটি কাহিনিই বেছে নিলেন, তার কারণ প্রথম দিকেই বলেছি, তিনি নিজেও এই ডিসকোর্সের অংশ, এই সময়ের ভাগীদার। শক্তিমান লেখক তিনি, তাই সাধারণ পাঠে এ গল্পের রসাস্বাদনে কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু এ গল্পের প্রকৃত আস্বাদ নেওয়া সম্ভব বোধকরি কয়েক দশক ধরে, বিশেষ করে ষাটের দশকে এ ভূখণ্ডে বিকশিত মুক্তি আন্দোলনের রাজনৈতিকতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে পাঠ করলে। এ গল্পের আলোচনায় তাই বার বার মধ্যবিত্ত ও কৃষকের রাজনীতির প্রসঙ্গ আসবে, মুক্তি কিংবা স্বাধীনতাকে তারা কে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, তা আসবে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, ‘দখলের’ আলোচনায় এ পর্যন্ত হয়তো সব আলোচকই এগুলো এড়িয়ে গেছেন, না হয় এই তাৎপর্য উপলব্ধিই করেন নি। যে ইঙ্গিতগুলো ইলিয়াস এ গল্পে রাখেন—আধুনিকতার বা তথ্যপ্রযুক্তির ভাষায় বলতে গেলে যে ট্যাগ বা শব্দগুচ্ছ এতে আমরা উদ্ভাসিত হতে দেখি—সেই তেভাগা আন্দোলন, কম্যুনিস্ট আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, নকশাল আন্দোলন, ভূস্বামী ও বর্গাদার-দিনমজুর চাষীর দ্বন্দ্ব, রক্ষীবাহিনী, শ্রেণিশত্রু কিংবা শ্রেণিসংগ্রাম ইত্যাদি সম্পর্কে একটি প্রথানুগত আলোচনার ধারা অবশ্য এর মধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু আমরা যদি সেই প্রথানুগত, প্রতিষ্ঠিত ও শাসক শ্রেণির ইতিহাসের ধারার অতিরিক্ত কিছু খুঁজে নেওয়ার দিকে মনযোগী না হই, তা হলে ‘দখলের’ আবেদন ও রক্তক্ষরণ অনুভব করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। অনুভব করা সম্ভব নয় মধ্যবিত্ত তার বিপ্লবীপনা কিভাবে মেহনতি মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের আরও বিপন্ন করে তুলে নিজের শ্রেণিকে একটি ‘উদার, মানবিক ও সাংস্কৃতিক’ শ্রেণি হিশেবে সুরক্ষিত করে।

প্রথানুগত ইতিহাস এই, মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালেই শেষ হয়ে গেছে, কেননা বিদেশি শাসকরা পরাজিত হয়েছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে; মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে, আরও প্রথানুগতভাবে বললে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক নেতৃত্বে। প্রথানুগত ইতিহাসে এসব কথাও অনেকটা সিদ্ধান্তের মতো করেই বলাবলি করা হয় যে, মাওবাদে বিশ্বাসী বামপন্থিরা এই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, তারা পাকিস্তানি শাসকদের সহায়তা করেছে। কিন্তু প্রথানুগত ইতিহাসের তলদেশে আরও কত ইতিহাস চাপা পড়ে রয়েছে, ‘দখল’ মূলত অনুক্ত সেই ইতিহাসের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বিকশিত হওয়ার গল্প, বামপন্থিদের নেতৃত্বে সাধারণ চাষীদের মুক্তি আন্দোলনের গল্প এবং মধ্যবিত্তের দোলাচলে সেই মুক্তি আন্দোলন থুবড়ে পড়ে মধ্যবিত্তকেই আবার কী করে মহিমান্বিত করে, তারই গল্প। ছোট পরিসরের কাহিনি হলেও এর ব্যাপ্তি তাই দীর্ঘ এক কালপর্ব জুড়ে—স্বদেশি আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতাউত্তর সময়ের নকশাল আন্দোলন পর্ব জুড়ে। ছোট আখ্যান হলেও তা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে প্রচলিত অনেক ধারণার দিকে। যা প্রকৃতার্থে রাজনৈতিক আখ্যানকেও প্রত্যাখ্যান করেছে নানাভাবে। আবার প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে নিজেও জড়িয়ে পড়েছে বিভ্রান্তির জালে।

মধ্যবিত্ত এ গল্পের মূল ভরকেন্দ্র বটে, তবে তারা নানা শাখা-উপশাখায় ছত্রখান। তাদের এক অংশের প্রতিনিধি মোবারক—যে কী না যুক্ত হয়েছিল কম্যুনিস্ট আন্দোলনে, শহিদ হয়েছে খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলনের সময়, আর যার সতীর্থদের কেউ কেউ এখন স্বাধীন বাংলাদেশে একের পর এক মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলছে, কেউ কেউ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে মন্ত্রীদের চেয়েও ব্যাপক দাপট নিয়ে রাশিয়া-হাঙ্গেরি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরেক অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে মোতাহার—যার গায়ে মুজিব কোট, বলার অপেক্ষা রাখে না, কোন শ্রেণিশক্তির প্রতিনিধিত্ব করছে সে। আরও আছেন তাদের দু’জনের বাবা মোয়াজ্জেম—যিনি মুসলিম লীগ করতেন, পাকিস্তান আন্দোলন করতেন; তবে এখন তো মুসলিম লীগের অবলুপ্তি ঘটেছে, কম্যুনিস্টদের তোড়জোড় বেড়েছে, তিনি তাই পুত্রের ছত্রছায়ায় ঘরের মধ্যেই নামাজ পড়েন। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে, এই রাজনৈতিক পাঠের বিপরীতে ভাষ্য দিতে গিয়ে অবশ্য অনেক আগে থেকেই অনেককে, বিশেষত বামচিন্তার ধ্বজাধারীদের বলতে শোনা যায়, ‘যুদ্ধ তো জনগণ করেছে’।আসলে বামপন্থিরা নিজেদের রাজনৈতিক দৈন্য, ব্যর্থতা, আত্মম্ভরিতা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ লুকাতে এমন ভাষায় ব্যাপারটিকে উপস্থাপন করেন। কেননা এমন কথা বললে এই সত্য স্বীকারের ভার তাদের আর বইতে হয় না যে, জনগণ তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকেই বিশ্বস্ত মনে করেছে, তাদের নেতৃত্বেই যুদ্ধ করেছে। পূর্ব বাংলায় কি বামপন্থি কি ডানপন্থি (আওয়ামী লীগ) উভয় রাজনৈতিক ধারাই সামন্ততান্ত্রিক অভিজাত রাজনীতির ধারা থেকে বেরিয়ে এলেও বিকাশের ক্ষেত্রে এমন এক তারতম্য ঘটে যে, জনগণের কাছে আওয়ামী লীগই আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগে যুক্ত হতে থাকে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত কৃষক ঘরের উঠতি শিক্ষিত সন্তানেরা। যাদের সঙ্গে অভিজাত সামন্তদের বৈপরীত্য ও দূরত্বের জটিলতা অন্তত বামপন্থিরা উপলব্ধি করতে পারেন নি। যান্ত্রিকভাবে সাম্রাজ্যবাদ ও শ্রেণিবিরোধিতার চেতনায় বন্দি বামপন্থিরা বিবেচনা করেন নি, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষ বরং দেশীয় সামন্ত কিংবা উঠতি বুর্জোয়া যাই বলি না কেন, তাদের সঙ্গেই মৈত্রী অনুভব করেছে। ১১০০ মাইল দূরের একটি জনপদে, যেখানে এমন কোনো বামপন্থি দলের অস্তিত্বও আমরা খুঁজে পাই না, যারা পূর্ব বাংলাকে নিয়ে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছে, যাদের সঙ্গে পূর্ব বাংলার বামপন্থিদের দলগত কার্যকর সম্পর্ক আছে। তারা সম্মিলিতভাবে কিভাবে বিপ্লব করবেন, তার বিবরণও কোনো রাজনৈতিক সাহিত্যে আমরা খুঁজে পাই না। অথচ পুরো পাকিস্তান থেকে তারা সাম্রাজ্যবাদ তাড়াবেন, এমন উদ্দীপনায় তারা কাজ করে গেছেন, ছয় দফার বিরোধিতা করেছেন বছরের পর বছর। বুঝতে পারেন নি, ১৯৬৬ সালের পর কার্যত ছয় দফাই হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কর্মসূচি। তাই কথিত ডিক্লাসড অভিজাত সামন্তদের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বামপন্থি সন্তানরা ভীষণ আন্তরিকতায় শ্রেণিহিংসার পদাবলী রচনা করলেন বটে, কিন্তু পারলেন না কৃষক-শ্রমিকের সঙ্গে শ্রেণিদূরত্ব ঘোচাতে, পারলেন না নিম্নবিত্ত মানুষকে বামপন্থিদের ওপর আস্থাশীল করে তুলতে। গ্রীষ্মকালে শীতকালের মাসালা দিয়ে পিছিয়ে পড়তে শুরু করলেন তারা। ফলে মধ্যবিত্ত কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকল না, পরিণত হলো উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণির ঢালে।

এই সময়ের অন্য একটি দিকও আছে। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জনসমর্থন অর্জন করে—এক বাক্যে এই কথাটি যখন আমরা বলি, তখন মনে রাখি না, ওই নির্বাচন মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বর্জন করেছিল, তাদের পতাকাতলে থাকা মাওবাদীরা ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ শ্লোগান তুলে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল এবং এর ফলে কার্যত তারা তাদের গণসমর্থকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। জাতীয়তাবাদের স্রোতে ভেসে তখন মাওবাদীদের সাধারণ সমর্থকদের অনেকেই ওই নির্বাচনে নৌকা মার্কাতে ভোট দিয়েছিল। আমরা এ-ও মনে রাখি না, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় বা পরে গণরোষ থেকে বাঁচতে প্রচুর মুসলিম লীগার ও বেসিক ডেমোক্র্যাট নেতাই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন এবং গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোর নিয়ন্ত্রক এই নেতা ও তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভোটাররা তখন আওয়ামী লীগের প্রচুর ভোটের একটি অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের মধ্যে নানা বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক চেতনার ধারাও জড়িয়ে ছিল, যেগুলোকে একটি সূত্রে গেঁথেছিল ছয় দফা। তাই যুদ্ধ শুরু হতে না হতেই আওয়ামী লীগের অনেক নেতার প্রকৃত চেহারা বেরিয়ে আসতে শুরু করে। তাদের দোদুল্যমানতা নতুন এক পর্যায়ে উন্নীত হয়। গণপরিষদে নির্বাচিত অনেক আওয়ামী লীগার এমপিএ এমএনএ-ই তখন ইয়াহিয়া খানের সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করে বসে। আওয়ামী লীগের একাংশের এই স্বাধীনতাবিরোধিতা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনালোচিত পর্বে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, আলোচিত পর্ব হয়ে উঠেছে মাওবাদীদের একাংশের স্বাধীনতাবিরোধিতার কথা; আবার প্রায় অনালোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে তাদের অনেকের অংশগ্রহণের ইতিহাস। এমনকি মোটামুটিভাবে রুশপন্থি বামপন্থি হিশেবে পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদেরও তাই এখন মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্যে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করতে হয়।


ইলিয়াসকে যেন আমরা রঙিন চশমা ছাড়াই চিনতে শিখি, তার দর্শন আর রাজনীতি যেন আবেগাপ্লুত কোনো আলোচনায় হারিয়ে না যায়।


এই মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিত রচনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগ নেতাদের নিউক্লিয়াস গঠনের কথা বহুল আলোচিত বিষয়। অন্য যে উদ্যোগগুলোর কথা প্রায় অনালোচিত, তেমন একটি উদ্যোগ হলো ১৯৬৮ সালে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে ‘পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন’ গঠন—মুক্তিযুদ্ধের সময় যা ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’ নামে কার্যক্রম শুরু করে। এ ছাড়া ১৯৬৯-এর ১১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলার প্রায় ৩০ জন কম্যুনিস্ট পার্টি প্রতিনিধি কুমিল্লার চিয়ড়া গ্রামে গোপনে একত্রিত হয়ে গড়ে তোলেন ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’—যাদের ওপর নকশালী আন্দোলনের যথেষ্ট প্রভাব থাকলেও রণনীতি ছিল পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ প্রতিষ্ঠা করা। একই বছরের এপ্রিল মাসে এই সংগঠনের পক্ষ থেকে ‘পূর্ব বাংলার জনতার নিকট কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি কর্তৃক স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার কর্মসূচি পেশ’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রচার করা হয়। অর্থাৎ যদি সংগঠনের ব্যাপ্তি ও জনসমর্থনকে বিবেচনায় না নিই, তা হলে বলতে হয়, দেশকে স্বাধীন করার আহ্বান প্রকাশ্যে সর্বপ্রথম চীনাপন্থি কমিউনিস্টরাই করেছিল। ১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের জনসভা হয়। এ সংগঠনের সভাপতি জামাল হায়দার ছিলেন ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটির’ কেন্দ্রীয় নেতা, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মতিন-আলাউদ্দিন-দেবেন-বাসারের নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠক। সভায় তারা ছাড়াও বক্তব্য রাখেন কাজী জাফর ও রাশেদ খান মেনন। এ সভা থেকে খোলাখুলি স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়, পাশাপাশি ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার ১১ দফা কর্মসূচি’ও ঘোষণা করা হয়। এ সময় সারা দেশে সমন্বয় কমিটির প্রায় ১০ হাজার পুস্তিকাও বিলি করা হয়। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানোর ‘অপরাধে’ নেতাদের নামে হুলিয়া বের হয়, তাদের অনুপস্থিতিতেই সামরিক আদালতে তাদের বিচার করা হয়। এতে কাজী জাফর আহমেদ ও রাশেদ খান মেননের সাত বছর করে এবং জামাল হায়দার ও মাহবুব উল্লাহ্‌র এক বছর করে কারাদণ্ড হয়। এ ঘটনার পর পরই ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপে ভাঙন আসে। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক মাহবুব উল্লাহ্‌র নেতৃত্বাধীন অংশের সম্মেলন হয় ১৯৭০ সালের ২৪ ও ২৫ এপ্রিল এসএম হলে। এতে ছাত্র সংগঠনের নতুন নাম রাখা হয় ‘পূর্ব বাংলা ছাত্র ইউনিয়ন’ এবং এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে মাহবুব উল্লাহ্ ও নাজমুক হক নান্নু। মাহবুব উল্লাহ্ তখন কারাগারে থাকায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় নূর মোহাম্মদ খানকে। অন্যদিকে এর সাতদিন পর পহেলা মে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’ সমর্থিত অংশের সম্মেলন হয় ইকবাল হলের মাঠে—যেখানে সংগঠনের নতুন নাম রাখা হয়, ‘পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন’। এ সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হন যথাক্রমে হায়দার আনোয়ার খান জুনো এবং আতিকুর রহমান সালু। এ সংগঠনের রাজনৈতিক প্রস্তাবনায় স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি নেওয়া হয় এবং গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুতের আহ্বানও জানানো হয়। ১৯৭১ সালের ২০ জানুয়ারি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ প্রতিষ্ঠার দাবিতে হরতালও ডাকে। ঢাকা শহরে এই হরতালও হয়েছিল। এই সংগঠনটিই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকা শহরের পল্টন ময়দানে পূর্ব পাকিস্তানের শেষ জনসভাটি করে। সেদিনের সভাতে এসে জনতার সামনে দাঁড়ান স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানোয় ১৯৭০ সালে সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত ‘পলাতক’ কাজী জাফর আহমেদ ও রাশেদ খান মেনন। সেদিনও সেখানে স্লোগান ওঠে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ প্রতিষ্ঠার। এই চীনাপন্থিরা মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় পরিষদ’ গড়ে তোলেন। সমন্বয় পরিষদের কাজ ছিল একদিকে স্বাধীন মুক্তাঞ্চল গড়ে তোলা, অন্যদিকে ভারতে প্রশিক্ষণরত মুক্তিবাহিনীতে কর্মীদের যুক্ত করে যুদ্ধপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ভারতের নির্ভয়পুর ও মেলাঘরসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে বিচ্ছিন্নভাবে প্রশিক্ষণ নিলেও চীনাপন্থি মুক্তিযোদ্ধাদের অভ্যন্তরীণ সংযোগও যে প্রবল ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে নরসিংদীর শিবপুরে চীনাপন্থিদের সংঘবদ্ধ অবস্থানের কথা ভারতেও চাউর হয়ে যায়। এ সময় শিবপুর থানার কমান্ডার মান্নান খানের ওপর নির্দেশও আসে, দলবল ও অস্ত্রশস্ত্রসহ তিন নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল শফিউল্লাহ্‌র সঙ্গে দেখা করার। এ অবস্থায় অক্টোবরের প্রথম দিকে মান্নান খান একাই আগরতলায় যান এবং ব্যারিস্টার মনসুরকে নিয়ে হাজামারা ক্যাম্পে গিয়ে শফিউল্লাহ্‌র সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে মান্নান খানকে বন্দি করে রেখে শিবপুরে একটি সামরিক তদন্ত টিম পাঠানো হয়। তারা তদন্ত করে জানায়, শিবপুর সম্পর্কে ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। এরপর মান্নান খানকে মুক্তি দিয়ে শিবপুরে আগের মতোই যুদ্ধ পরিচালনা করতে বলা হয়।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে চীনাপন্থিদের ভূমিকা সম্পর্কে এই দীর্ঘ বয়ান মনে করছি কেন? মনে করছি এ কারণেই যে, ইলিয়াসকে যেন আমরা রঙিন চশমা ছাড়াই চিনতে শিখি, তার দর্শন আর রাজনীতি যেন আবেগাপ্লুত কোনো আলোচনায় হারিয়ে না যায়। আর ইলিয়াসের এই কৃষকদেরও বুঝতে যাতে সমস্যা না হয়। ‘দখল’-এ যে তিনি আমাদের যেসব কৃষকদের মুখোমুখি করান, তারা মুক্তির প্রেরণা পেয়েছেন এই চীনাপন্থি সংগঠকদের কাছ থেকে। যারা স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলার স্বপ্ন দেখেছিল। আর সংখ্যায় এরা যে একেবারে কম ছিলেন, তাও কিন্তু নয়। কারণ, উদাহরণত ১৯৭০ সালের দিকে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন তাদের কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানায়, তাদের নিজেদের এলাকা থেকে অন্তত ২০ মাইল দূরের কোনো কৃষক এলাকায় অবস্থান করে অন্তত এক মাস সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে। এক হাজারের মতো কর্মী এই আহ্বানে সাড়া দেয় এবং ছয়শ’র মতো কর্মী সত্যিই এ আহ্বায়নের বাস্তবায়ন ঘটায়। এভাবে আরও বেশ কিছু বামপন্থি সংগঠন কৃষকদের প্রাণিত করেছে তখন। ফল হয়েছে এই যে, নেতারা যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, মুক্তি ও স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াতে কৃষকদের মধ্যে কোনো দ্বিধা জাগে নি। নয় মাসের যুদ্ধ তাদেরও পাল্টে দেয়। যুদ্ধের সুফল পেতে ক্ষমতার অংশীদার হতেও উদ্বুদ্ধ হয় তারা।

যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, যে যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতার, যে যুদ্ধ ছিল মুক্তির; তবে সুখপাঠ্য, ছোট ছোট বাক্যে ‘দখল’ আমাদের এই সাধারণ পরিতৃপ্তি থেকে বের করে নিয়ে আসে। দেখা যায়, যুদ্ধের শত্রুমিত্র বোধও মুছে যেতে শুরু করেছে তা শেষ হতে না হতেই। এইসব যুদ্ধ কিংবা আন্দোলন—মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে অবশ্য সবই গোলমাল। ব্রিটিশ আমলে স্বদেশিরা এই গোলমাল করেছে, পাকিস্তান আমলে করেছে স্বাধীনতাকামীরা, আর এখন করছে কম্যুনিস্টরা। ব্রিটিশ শাসনামলকে এখনও সমীহ করে মোয়াজ্জেম হোসেন। তাদের তাড়ানোর জন্যে মানুষজন যে হন্যে হয়ে উঠেছিল, তাও এখনও আহত করে ফেরে তাকে। কারণ,

যাই বলো না, সায়েবদের আমলে অফিসারদের কেরানিদের ঘুষ খাওয়া আর কাজে ফাঁকি আর কারণে-অকারণে জমির ওপর ট্যাক্স বসানো ছিল না। ভেজাল কী জিনিস তাদের আমলে কেউ জানতো না। তা সুখে থাকলে ভুতে কিলায় বাপু এত সুখ সহ্য হবে কেন? দেশের মানুষ সায়েব তাড়াবার জন্যে হন্যে হয়ে উঠল।

কী এক অদৃষ্টবাদিতাও কি ঝলক দেয় না এই বেলা ইলিয়াসের ‘দখলে’? কিংবা ইলিয়াস আমাদের কি দেখান না, অদৃষ্টবাদিতা কী করে জড়িয়ে আছে মধ্যবিত্তের সঙ্গে বিত্তের সৌন্দর্য ছড়িয়ে—মোয়াজ্জেম কাজীর ছেলে জন্ম নিল স্বদেশি আন্দোলনের এমন এক দিনে, যেদিন হাটে জোয়ানকালের আমোদ করতে গিয়েও তাকে ফিরে আসতে হলো হাটের পশ্চিম দিকে মতিলাল আগরওয়ালার কাপড়ের গুদামে স্বদেশিরা আগুন ধরিয়ে দেওয়ায়। তো জোয়ানকালের আমোদটা কী? তা কি আমাদের মধ্যবিত্ত পাঠককে বুঝিয়ে দিতে হবে হাতেকলমে? ইলিয়াস তো পারতেন আরও কোনো শব্দ প্রয়োগ করে ব্যাপারটা বোঝাতে। কিন্তু তিনি সে পথে এগোন নি—কারণ পরিমিতি বোধ আছে তার। কাজেই যারা ইলিয়াসের লেখায় অকথ্য (না কি অলেখ্য?) অনেক শব্দ খুঁজে পান, বাক্য খুঁজে পান, তারা হয়তো ভেবে দেখেন না, নিশ্চয়ই প্রাসঙ্গিকতা আছে এর। মোয়াজ্জেম কাজীর পক্ষে একে জোয়ানকালের আমোদ ভাবাই স্বাভাবিক। কেননা তাদের সংস্কৃতিই হলো এই যে, জোয়ানকালে চরিত্রের স্খলন হতেই পারে, ধর্মকর্ম সে সব বয়সেই করবে—তবে মধ্য বয়সের পর থেকে ধর্মকর্মের ব্যাপারটা মহা বেগবান হবে। তো জোয়ানকালের আমোদ করতে না পেরে আচানক ফিরে আসার পথে বাড়ির কাছাকাছি এসে ছেলে মোবারকের জন্ম নেওয়ার খবর জানল সে, শুনল আজানের ধ্বনি।

কিন্তু ‘কে ওই শোনাল মোরে আজানের ধ্বনি? মোয়াজ্জেন তো তার আগের পরশু দিন ছুটি নিয়ে গ্রামে গেছে, আর ইমাম সাহেব এশার নামাজ পড়ানোর পর চলে গেছে দক্ষিণ পাড়ায় ওয়াজ করতে। তা হলে জিন ছাড়া আর কে আজান দিয়েছিল সেই শীতকালের রাতে এশার ওক্তের সময়ে? আগরওয়ালের ঘরে স্বদেশিদের দেওয়া আগুন আর বাড়ির মসজিদে আগুনেরই তৈরি জিনের দেওয়া আজান—সবই কি সেজন্যে দাপটের সঙ্গে জেঁকে বসেছিল মোবারকের ওপর? শ্রেণি সচেতনতা নয়, জিনের আছড়—এমন ধারণা কেবল কি মোয়াজ্জেম কাজীর মধ্যেই খেলা করে, নাকি তার মেঘমায়া ইলিয়াসও বুলিয়ে দেন পাঠকের মনে, বিকল্প কোনো ধারণার সঙ্গে তার সাংঘর্ষিকতার আখ্যান তুলে না ধরে? আর এভাবে মধ্যবিত্তকেই কি উস্কে দেন না তিনি এমন কল্পনার মোহবৃত্তে আটকে থাকতে? হয়তো ইলিয়াস দেখেন এমন এক সামন্ত-প্রতিভূকে, যিনি তার যাবতীয় সামন্তীয় ধ্যানধারণা নিয়েও নিজের বড় সন্তানের নতুন চিন্তার উদ্বোধনকে নিজে একটুও না পাল্টেও হজম করে ফেলতে চান, শ্রেণি পরিধিকে অতিক্রম না করেও নিজেকে মহিমান্বিত করার জন্যে যেগুলোর পালক তিনি যুক্ত করতে চান নিজের সামন্তমুকুটে।আবার তার ঘরেই বেড়ে উঠতে দেখি আরেক সন্তানকে, যে কি না বড় ভাইয়ের সেই শ্রেণি বিপ্লবের স্বপ্নের ধারেকাছে যায় না, রাষ্ট্র-সমাজ পাল্টানোর কিংবা মেহনতি মানুষের মুক্তির ইচ্ছে তাকে টানে বটে—কিন্তু তা নেহাৎই ওই মুক্ত চিন্তা ও ভাবালুতার অংশ হয়ে। কোন দল করে সে, কী তার মতাদর্শ, কিছুই বলেন না ইলিয়াস, তিনি শুধু বলেন মুজিব কোট পরে সে। বোধকরি এর পর আর কিছু বলার প্রয়োজনও পড়ে না—পাঠক হিশেবে আমরা জেনে যাই, কী উদ্দেশ্য ও বিধেয় যুক্ত হয়ে আছে তার জীবন-মরণ-চলনের সঙ্গে।


মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা না করলেও কিংবা দেশের স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করলেও তারা তো আসলে পাকিস্তানিই—কারণ তাদের উদ্দেশ্যও পাকিস্তানিদের মতোই শোষণ করা, লুট করা।


মধ্যবিত্ত পরিবারের এক সন্তান স্বপ্ন দেখেছিল, শোষিত মানুষ মুক্ত হবে, অসাম্য দূর হবে; তার সেই স্বপ্ন সঞ্চারিত হয়েছিল সাধারণ শোষিত কৃষকদের মধ্যেও। তারপর মৃত্যু ঘটেছে তার, সে-ও কত আগে, তেভাগা আন্দোলনের মৃত্যুর সময়ে, ভারতবিভক্তির কয়েক বছরের মধ্যে দিয়ে। তারপর কত দিন গেছে—মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে গৌরবদীপ্ত হয়ে উঠেছে সে; কিন্তু দিনযাপনের কাহিনির মধ্যে দিয়ে ইলিয়াস এই প্রশ্নটিই বড় করে তোলেন, এই গৌরবের ফসল কার ঘরে উঠবে? পিতৃত্বের এবং আভিজাত্যের সূত্রে, মোয়াজ্জেম কাজী তার দাবিদার। রক্তসম্পর্কের সূত্রে মুজিব কোট পরিহিত ভাই মোতাহার হোসেনও তার দাবিদার। ভাইয়ের সহযোদ্ধাদের প্রতি প্রচণ্ড আক্রোশ তার। ভায়ের সহযোদ্ধারা মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলছে, জমির অধিকার নিতে চাইছে, কোথাও এই শব্দগুলো লেখা নেই বটে, কিন্তু যারা সামাজিক ও রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রত্যয়গুলোর সঙ্গে পরিচিত, তারা জানেন, একেই বলে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটানোর স্বপ্ন। যে বিপ্লবের স্বপ্ন চীনের বিপ্লবের পর স্পর্শ করেছিল ভারত ও বাংলাদেশকে, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির আরও অনেক রাষ্ট্রকেই। মানুষের মুক্তি চায় বটে, চায় বড় ভাইয়ের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও মৃত্যুর সুফল নিতেও; কিন্তু কৃষকদের অধিকার দিতে এক বিন্দুও রাজি নয় সে। ওখানে এসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তার এত বেশি চাগিয়ে ওঠে যে তা আর ভৌগোলিক স্বাধীনতা ও মুক্তির বৃত্ত পেরুতেই পারে না। মোতাহার অবশ্য নিজের মতো করে এর একটা যুক্তি খুঁজে নিয়েছে। ভাই কম্যুনিস্ট বলে মুসলিম লীগের পাণ্ডারা কি কম জ্বালিয়েছে তাকে? ভাগ্য ভালো নিজের বাড়ির মসজিদে বেতনভোগী ইমাম ছিল, না হলে তো ওর জানাজাও হতো না। বাধ্য হয়েই তো অন্য দল করতে হয়েছে মোতাহারকে (যেন কত বড় বিপ্লবী ছিল সে-ও তার ভায়ের মতোই!)। অন্য দল মানে মুজিব কোট পরার দলে ঢুকে পড়েছে সে। কিন্তু তাতে কি জ্বলুনি কমেছে তার? ইলিয়াসের গল্পে এই কাহিনি অনুক্ত থাকে বটে। কিন্তু প্রশ্নটা জাগলে আমরা নিশ্চিত বুঝে যাই, জ্বলুনি না কমুক, নিজের ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি সে খুঁজে পেয়েছে সেখান থেকেই। আর সেটা তার সামন্ত পিতারও চোখ এড়ায় নি। তাই মোতাহার হোসেন যখন বলে ‘ভাইজান নিজে তো গেল, আমাদেরও পথে বসাল’, তখন তাতে তার সামন্ত পিতাও সায় জোগায় না; এমনকি মৃত মোবারকের সন্তান ইকবাল, যে কি না পিতার মুখও দেখে নি, কোনো বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে নি, যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত নতুন দেশ নিয়েও যার কোনো রাজনৈতিক স্পৃহা নেই, তার পক্ষেও এ কথা মেনে নেওয়া ‘একটু মুশকিল’ হয়ে পড়ে। ইলিয়াস লেখেন :

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বিধ্বস্ত দালানের স্তূপ আর সারানো হয় না। কিন্তু অন্য দালানটির নানারকম সম্প্রসারণ চলে। এই সব দামী নতুন নতুন সোফাসেট, দামি বিদেশি কম্বলের ছড়াছড়ি, হাতে সদাসর্বদা ফাইভ ফিফটি ফাইভের প্যাকেট, কথায় কথায় মুজিব কোট চড়িয়ে মোটর সাইকেল হাঁকিয়ে টাউনে ছোটা এসব দেখে তার হতাশা অনুমোদন করবে কে?

এবং ঘটনা পরম্পরায় শেষ পর্যন্ত তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও বিনির্মাণ ঘটাতে থাকে; কেননা মোয়াজ্জেম হোসেনের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে তার সেই কম্যুনিস্ট ছেলে কারও কথা শুনে কাজ করার ছেলে ছিল না। পুরো গ্রাম যখন একদিকে গেছে, তখন সে দাঁড়িয়েছে অন্যদিকে—কেননা যা সে সত্য বলে জেনেছে, তার জন্যে একা হলেও স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানোই স্বভাব ছিল সে ছেলের। তাই যে পাকিস্তান ছিল তখন মোয়াজ্জেম হোসেনের একান্ত আরাধ্য, সেই পাকিস্তান আন্দোলনকেও অগ্রাহ্য করেছে সে, করেছে তীব্র সমালোচনা :

পাকিস্তানের ভোট হলো, আমার এই বাড়িতেই তখন মুসলিম লীগের অফিস। এই ইউনিয়নের, ইউনিয়নের কি? তামাম থানার চ্যাংড়াপ্যাংড়া জড়ো হয়েছে। আর তোর বাবা কয় পাকিস্তান পাকিস্তান করো, পাকিস্তান কার জন্যে? কামলা কিষাণদের ডেকে বলে, পাকিস্তান হলে কিষাণপাট বেন্ন্যার ছোলপোলেক এক সন্ধ্যা ভাত দিবি? কও ভাত পাবা?

এইখানে এসে ইলিয়াসের ‘দখল’ নতুন এক দিকে বাঁক নেয়। তখন এই প্রশ্নের সূত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও কি বিনির্মাণ ঘটে না? এই বাংলাদেশ কার জন্যে? যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, তা কি ভাত দিতে পারছে? তা হলে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন আর দেশ গড়ার মুলো ঝুলিয়ে পাকিস্তানিদের মতো এক লুটেরা শ্রেণিই যখন থিতু হতে চাইছে, চকচকে হচ্ছে আর নিজেদের ভাগ্য গড়ছে, তখন কৃষক-শ্রমিকের কী প্রয়োজন নিজেদের টালমাটাল করে এই নব্য পাকিস্তানিদের ভাগ্য গড়ার সুযোগ দেয়ার? মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা না করলেও কিংবা দেশের স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করলেও তারা তো আসলে পাকিস্তানিই—কারণ তাদের উদ্দেশ্যও পাকিস্তানিদের মতোই শোষণ করা, লুট করা। শোষিত হওয়ার চেয়ে, লুণ্ঠিত হওয়ার চেয়ে যে আগুনে তারা নিজেরা অহর্নিশি জ্বলছে, সেই আগুনে লুটেরাদেরও জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছে তারা।

মোবারক হোসেন সামন্ত ঘরের ছেলে ছিল, কিন্তু সমাজের বেশির ভাগ মানুষের, সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের রাজনীতিকে সে জড়িয়ে ফেলেছিল; তাই পাকিস্তান আন্দোলনকে অর্থহীন চিন্তা করা তার পক্ষে তো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই মোবারক হোসেনের সন্তানকে কী ভাবে দেখবে গ্রামের কৃষক, যাদের চোখ থেকে মোবারকের দেখানো স্বপ্ন এখনও মরে যায় নি? মিশ্র প্রতিক্রিয়াই দেখি আমরা কৃষকদের মধ্যে, নিকিরি পাড়ার শেষে মোবারকের ছেলে ইকবালের সঙ্গে দেখা হয় ভেদু পরামাণিকের, সে অবশ্য চিন্তা করে এবং জানান দেয়, ‘‘তোমার বাপ হামাক দেখিছে লিজের ভায়ের অধিক। তুমি তার বেটা, তুমি বাপু হামাগ্যোরে পাট্টির মানুষ।’’ কিন্তু পরের প্রজন্মের কৃষকরা তা মানতে রাজি নয়, ‘‘সোয়াগ থোন। বাপোক দেখিছেন, দাদা চাচা চোদ্দগুষ্টি বাদ দিয়া খালি বাপোকই দেখেন?’’ তবু ভেদু পরামাণিকের ঘোর কাটে না, তাকে কখনও আবার বলতে শুনি, ‘‘তাঁই বড়নোকের বেটা, কিন্তুক বড়নোকের পাথরের জান পায় নাই। তাঁই থাকলে দেশের মানুষ লোক কর‌্যা বস্যা থাকে?’’

কিন্তু মোবারক বেঁচে থাকলে সত্যিই কি দেশের মানুষ আর চুপ না থেকে সশব্দে জেগে উঠত? না কি তার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের মতোই হয়ে যেত? ইকবালের মনে চিন্তা আসে :

তা বেঁচে থাকলে বাবাও বোধহয় বড় নেতা হতো। বড়মামা এখন কত ইনফ্লুয়েন্সিয়াল লোক। গভর্নমেন্টে না থাকলে কী হয়, মিনিস্টারের চেয়ে কম কি? কথায় কথায় মস্কো যায়, হাঙ্গেরি যায়। তার পরামর্শে কত ছেলে আই.এস.সি. পাশ করে মস্কো যাচ্ছে। মামানির আলমারি ভরা রাশিয়ার পুতুল, হাতের কতরকম কাজ!

ইকবালের ওই চিন্তাই জানিয়ে দেয়, মস্কোপন্থি কম্যুনিস্টরা নিপুণতার সঙ্গে ভাগ্য গুছিয়ে চলেছে, মধ্যবিত্তদের সুশীল, রুচিশীল, ধোপদুরস্ত বামে পরিণত করছে তারা, চীনপন্থি কম্যুনিস্টদের মতো অত বোকা নয় যে মচকানোর বদলে ক্ষুব্ধ হয়ে বরং নিঃশেষই হয়ে যাবে। অবশ্য ইলিয়াস যখন এই গল্প লিখছেন, তখন চীনপন্থি কম্যুনিস্টদেরও ভাগ্য খুলতে শুরু করেছে, তাদের অনেকেই তখন সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমানের গৃহপালিত মন্ত্রী ও নেতা হতে শুরু করেছেন, ভূগর্ভস্থ রাজনীতি ছেড়ে উন্মুক্ত রাজনীতি করতে শুরু করেছেন—কে জানে, হয়তো ‘জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের অনুকূল পরিস্থিতি’ সৃষ্টি হওয়ায়।

ইলিয়াসের অবশ্য একটা শক্ত অজুহাত রয়েছে—এ গল্পের সময়কাল ১৯৭৩ সাল। যদিও পচন যে কখন শুরু হয়েছিল, সেই মর্মন্তুদ বিবরণই আমরা জানতে চাই লেখকের কাছ থেকে। আইয়ুব খানের কাছে ভাসানীর আশীর্বাদ পাওয়ার পর্ব থেকে চীনাপন্থিদের যে চড়াই-উৎরাই পেরুতে হয়েছে, তাতে তারা ক্রমশই মর্যাদা হারিয়েছে, বিচ্ছিন্ন মহীয়ানতা কিংবা ত্যাগ-তিতিক্ষা এই ধারাকে আর সমুন্নত রাখতে পারে নি। আর মহৎ কথাশিল্পীর মতো অন্তত এই আশঙ্কাটুকুই বোধকরি জাগিয়ে তোলেন ইলিয়াস তার ‘দখলে’। যে মধ্যবিত্ত কৃষকদের জাগিয়ে তুলছিল, যে কৃষক সেই মধ্যবিত্তের দিকে আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিল, তাদের সম্পর্কের পরিণতিও আমাদের নিয়ে যায় সেই আশঙ্কার কাছে। খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল কৃষক আন্দোলনকারী ভেদু পরামাণিকদের। ইকবালকে বলেছিল সে, রক্ষিবাহিনীর লিডার যখন তার চাচার সঙ্গে কথা বলবে ইকবাল যেন তখন তার বাবার কবরের মাথায় দাঁড়িয়ে সরাসরি তাকায় বিলের ওপারের দিকে। বলেছিল, সে যদি এ কাজ নাও করতে পারে, তারপরও তারা সব কিছু টের পাবে। তারপরও ভেদুর ইচ্ছে, ইকবাল এটা করুক, কারণ, ‘‘হামি কই তুমি খালি দেখাও, তোমার শরীলত তোমার বাপের অক্ত আছে। খালি এই, বুঝল্যা না?’’


ইলিয়াস খুব নির্দয়ভাবে মধ্যবিত্তের বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে নেড়েচেড়ে দেখিয়েছেন


বুঝতে পারবে না, ইকবাল তো এমন বোকা নয়; কিন্তু কাজটা করতে পারে নি সে। তবে আরেকটা কাজ ঠিকই করেছে—কাঁঠালপোঁতার জনগণ যখন রক্ষীবাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে এগিয়ে আসছে, মোয়াজ্জেম কাজী যখন তার ছেলের পাশে নিজেও সমাহিত হওয়ার বাসনা প্রকাশ করছে, তখন সে ফাল দিয়ে শুয়ে পড়েছে শূন্য কবরের ওপর। শুয়ে পড়তে পড়তে ভেবেছে, ‘‘এত সোজা! মোয়াজ্জেম হোসেন কে? ওর বিপ্লবী বাপের পাশে থাকবে এই শয়তান বুড়োটা? এই মানুষমারা, ঠক ও শোষক জোতদার! এত সোজা!’’ ভেবেছে সে, ‘‘তার ভয় কী? তার জন্য নিশ্চিত অমরতা! বাপের ফলকের পাশে আরেকটি ফলক স্থাপিত হতে কতদিন আর লাগবে?’’

ইলিয়াস খুব নির্দয়ভাবে মধ্যবিত্তের বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে নেড়েচেড়ে দেখিয়েছেন; দেখিয়েছেন কী করে মধ্যবিত্তের বিপ্লবীপনার সুফল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ভাগাভাগি হয়; অথচ যাদের মুক্তির জন্যে এত আয়োজন, তারা কেবলই ‘মব’ হয়ে যায়। ইলিয়াস প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনেকেই তার চটকদার, মধ্যবিত্তের বিপ্লবীপনার গল্প ‘মিলির হাতে স্টেনগানের’ কথা বলে থাকেন; কিন্তু ‘দখলে’ তিনি মধ্যবিত্তের এই বিপ্লবীপনার নির্মম ও কুৎসিত দিকটিকে এত নির্বিকারত্ব নিয়ে তুলে এনেছেন যে, তাতে বরং তিনি এই ডিসকোর্সের অংশ হয়ে উঠেছেন, আত্মসমালোচনার দলিল করে তুলেছেন এ গল্পকে।এতে কৃষকদের সরল ঐক্যবদ্ধতা আছে, আছে তাদের স্বপ্ন দেখানো মধ্যবিত্তের নগ্নতা। মধ্যবিত্ত ছাড়া তো পাঠক নেই—সেই অর্থে এটি মধ্যবিত্তের সাহিত্যই বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মধ্যবিত্ত যে এ গল্পের সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন না, এ গল্পে স্বস্তি খুঁজে পান না, আবার শত্রুর দুর্বলতা খুঁজে বেড়ানোর মতো উন্মত্ততা ও শীতলতা নিয়ে এ গল্প পড়েন, তাতেই এ আভাস স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে মধ্যবিত্তের সাহিত্যের গণ্ডিতে থেকেও এ গল্প হাড়তে বেড়াচ্ছে অন্য এক পৃথিবীকে।

ইমতিয়ার শামীম

ইমতিয়ার শামীম

ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
জন্ম: ১৯৬৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানায়। স্কুল-কলেজের পড়াশুনা শেষ করেছেন সিরাজগঞ্জেই। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন যথাক্রমে ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালে।

কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৯১ সালের এপ্রিলে, তখনকার দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকায় সাব এডিটর হিসেবে। পরে কাজ করেছেন দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক জনকণ্ঠ ও দৈনিক আমাদের সময়সহ বেশকিছু কাগজে।

প্রথম উপন্যাস ’ডানাকাটা হিমের ভেতর’(১৯৯৬)-এর পান্ডুলিপি পড়ে আহমদ ছাফা দৈনিক বাংলাবাজারে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন, ’একদম আলাদা, নতুন ......আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদেও মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।’

গল্পগ্রন্থ 'শীতের জ্যোত্স্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে'-এর জন্য পেয়েছেন 'প্রথম আলো বর্ষসেরা বই'-এর পুরস্কার।
ইমতিয়ার শামীম