হোম গদ্য ভাষা প্রমিতকরণে আধিপত্য আর মরে যাওয়া ও জিন্দা হওয়া ফের

ভাষা প্রমিতকরণে আধিপত্য আর মরে যাওয়া ও জিন্দা হওয়া ফের

ভাষা প্রমিতকরণে আধিপত্য আর মরে যাওয়া ও জিন্দা হওয়া ফের
404
0

তুরস্কের প্রমিত ভাষাকে সে দেশের মানুষ বলে তুর্কচে। ভাষাটি শিখতে শুরু করেছি। বর্ণমালা পরিচয় পার হয়ে শব্দ ও কথা পরিচয়ে ঢুকতে ঢুকতে দেখি, আমার চেনা জানা আরবি ফার্সি শব্দ আসছে প্রায় ঘন ঘন ত্যাড়া-ব্যাকা হয়ে। মানে, উচ্চারণে মোচড় খেয়ে বা চ্যাপ্টা হয়ে বা চিকন হয়ে বা মোটা হয়ে। যেমন : আরবি সালাম>সেলাম, মারহাবা>মেরহাবা>মেরাবা, আদালাত>আদালেট, আমিন>এমিন, আজান>এজান, আলামাত>আলামেট। ফার্সি বাগচে>বাহচে, [বাংলা ও হিন্দিতে বাগিচা] ফার্সি হার>হের, আফসানে>এফসানে ইত্যাদি। যদিও তুর্কচে ভাষার অরিজিন আলটায়িক [মধ্য এশিয়া], আর আরবি হলো সেমিটিক ভাষা। ফার্সি হলো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের। E-Z-Glot-এর তথ্য অনুযায়ী আজারবাইজান ও তুর্কচে ভাষাতে ৪৪% যৌথ শব্দ রয়েছে। সেগুলো তাদের প্রমিতে অপ্রমিতেও আছে। আরবি ও ফার্সি শব্দ কিঞ্চিৎ উলটপালট হয়ে তুর্কি প্রমিত ভাষাতে প্রতিষ্ঠা পেল কেমনে? ভাষার প্রমিতকরণের ইতিহাস কী দেখায়?


ভাষাবিদেরা আঞ্চলিক ভাষাকে ‘উপভাষা’ বা ডায়ালেক্ট বলেন, আসলে তো ওটা ভাষা—মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম। 


দেখায়, প্রমিত ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে কোনো অঞ্চলের প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীকে নিজেদের মুখের ভাষার প্রশ্নে অ্যারোগেন্ট মানে মগ্রা—উপ্তা মানে একরোখা—একগুঁয়ে হতে হয়, নিজেদের কথনভঙ্গিকে সুপেরিওর মনে করতে হয়। এক ধরনের গ্যাংস্টারিজম বা সম্মিলিত জবরদস্তি করা হয় নির্দিষ্ট স্থানীয় ভাষার পক্ষে, যাতে এটিই প্রমিত করা হয়। মানে, ওদের মনোভাব—আমরা এইভাবে বলি এইটাকে এই ভঙ্গিতে বলি, সুতরাং এইরকম হতেই হবে আমাদের মান ভাষা। এর মাঝে আবার আরেক হিসাব আছে; ঐ জনগোষ্ঠীর ভিতরের যারা শিক্ষায় শক্তিশালী, যারা ধন-সম্পদে শক্তিশালী, তারা স্থির করেন। বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কেন্দ্রের প্রভাবে তৈরি হয় পুরো জনগোষ্ঠীর মান ভাষা। লিংগুয়িস্টিক স্ট্যান্ডার্ডডাইজেশনের ইতিহাসটাই এমন।

সেই মান ভাষাটি পুরো জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা না। একটা ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের ভাষাটি মান বা প্রমিত ভাষা হওয়ার পরে, শাসিত পুরো জনগোষ্ঠীর অন্য জেলা/ প্রশাসনিক অঞ্চলের লোকেরা শিশুকাল থেকে তাদের আঞ্চলিক ভাষার বাইরের মান ভাষাটি পড়া লেখা শিখতে হয়, বহু শব্দার্থ শিখতে হয়, বহু অজানা থাকে আশি বছর বয়সে পৌঁছলেও। যার যার ভাষার ব্যাপারটি এমন যে, সিলেটের মানুষ বলবেন ‘খরিয়ার’ প্রমিতে সেটা ‘করছি’, নোয়াখালিতে ‘কইত্তেছি’, চিটাগাংয়ে ‘গরির’, নাটোরে ‘করিচ্চি’ ইত্যাদি। মানে প্রমিতের ক্রিয়াপদটিও শিখতে হয়। যদিও ভাষাবিদেরা আঞ্চলিক ভাষাকে ‘উপভাষা’ বা ডায়ালেক্ট বলেন, আসলে তো ওটা ভাষা—মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম। ওটা Lingo না, Language-ই।


চলিত বাংলা প্রমিতের গোড়া সামান্য

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীপারের সুতানুটি গ্রাম আর তার পাশের কাল-কাটা>ক্যালকাটা>কলিকাতা গ্রামকে শহরে পরিণত করেছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। [যদিও ঐতিহাসিক কেউ কেউ লিখেছেন কোম্পানির প্রশাসক জব চার্নক কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা। ২০০৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট রায় দেয় কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা না।] হুগলি নদীর মুখে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রস্তাবকও ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ভারতের তৎকালীন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সুবেদার [প্রাদেশিক শাসক] শায়েস্তা খানের সৈন্যরা একবার সুতানুটি থেকে জব চার্নকের টিমকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা আস্তানা গাড়ল বঙ্গোপসাগরের দ্বীপ গ্রাম হিজলিতে। হিজলি থেকে শায়েস্তা খানের সৈন্যরা তাদেরকে তাড়ায় নি, কারণ বাঘ সাপ আর মশার আক্রমণে ওখানে টিকতে পারবে না বেশি দিন তারা। তিন মাসের মধ্যে চার্নকের অর্ধেক সৈন্য মারা গেল। বাকি অর্ধেক হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। এরি মাঝে বাদশা আওরঙ্গজেবকে আপস মীমাংসায় আনতে বাধ্য করায় কোম্পানি, হাজিদের জাহাজে যাতে আক্রমণ না করে ইংরেজরা।

80461143_813601072401745_8585044342236774400_n
১৬৯০ সালের কলকাতা।

এই সুযোগে শায়েস্তা খানের সাথেও জব চার্নকের শান্তি চুক্তি হয়। সুতানুটিতে ফিরে আসে চার্নক। বাংলায় থাকতে দেয়া হয় তাদের। এই সুতানুটি—কলিকাতা গ্রামের উপভাষা ব্রিটিশ শাসনামলে সমগ্র বাংলা বিহার ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যাসহ বিশাল ভূখণ্ডে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। [ভারতে ব্রিটিশের শাসনের প্রথম অধ্যায়ে ব্রিটিশ অধিকৃত অঞ্চলগুলোর রাজধানী ছিল কলকাতা—বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি।] পরে পণ্ডিতদের একাট্টা শক্তির প্রভাবে ঐ অঞ্চলের ভাষাকেই করা হয় বাংলা মান ভাষা বা প্রমিত ভাষা বা শুদ্ধ ভাষা। বাংলা ভাষা তার আদিযুগ মধ্যযুগ পার হয়ে এসেছে। মাত্র তিন শ বছর আগের প্রমিত ভাষা বিস্তর রদবদল হয়েছে এই যুগে পৌঁছতে পৌঁছতে। আঠার শতক থেকে ক্রিয়াপদ সংক্ষেপিত হয়ে নতুন রূপ পাওয়া চলিত বাংলা ভাষা একবিংশ শতকে পৌঁছে শব্দ ব্যবহার ও শব্দবিন্যাসে বিস্তর পরিবর্তিত। উল্লেখ্য, কালক্রমে কলকাতাকেন্দ্রিক প্রমিত বাংলা ও ঢাকাকেন্দ্রিক প্রমিত, দুটি রূপ ধরে ফেলেছে। যদিও গোয়ালে আছে কিতাবে নাই অবস্থায় ঢাকার প্রমিত। একাধিক স্ট্যান্ডার্ড ভাষা তো হতে পারে। বাংলা কেন পারবে না? একই ভাষার দুই কমন মান ভাষা তো ইংরেজি ভাষার আছেই। ইংলিশ-ইউকে, ইংলিশ-ইউএস। তাছাড়া, সারা বিশ্বে দেশভিত্তিক বহু ইংলিশ স্ট্যান্ডার্ড ভাষা আছে। সেগুলোতে উচ্চারণ [Pronunciation] ও নিজস্ব কিছু শব্দতালিকার [Vocabulary] পার্থক্য আছে। যদি সুতানুটিতে না উঠে ইংরেজরা বরিশালের কলাপাড়া উপজেলায় আস্তানা গড়ত, যদি কলাপাড়া-কুয়াকাটাকে বাণিজ্য কেন্দ্র বানাত, শহর বানাত, ব্রিটিশ-বাংলার রাজধানী বানাত, তাহলে ঐ অঞ্চলের উপভাষা প্রমিত বাংলা হয়ে যেত।

80538145_537849956805447_302065333395521536_n
ওসমানীয় খেলাফত আমলের আরবি হরফে তুর্কি বর্ণমালা।

গৌতম বুদ্ধ পালি ভাষায় ধর্মের পাঠ দিতেন। পালি ও প্রাকৃত ভাষা থেকে জন্ম নেয়া সংস্কৃত প্রভাবিত বাংলা ভাষা ভবিষ্যতে কোন ভাষার জন্ম দিয়ে মারা যাবে তা এখন সুনিশ্চিত বলা সম্ভব না। হয়তো বাংলা ভাষার প্রভাব বিস্ময়করভাবে বেড়ে যাবে। পালি ও প্রাকৃত ভাষা এখন বিলুপ্ত। [সূত্র : নিউ এনসাইক্লোপেডিয়া ও ব্রিটানিকা]


প্রমিত খারাপ কেমনে?

যারা ভাষার ভিতর বাহির ভালোভাবে দেখেন, ভাষার দর্শন বোঝেন, তারা ঠিকই দেখেন যে, প্রমিত ভাষা সমস্যাপূর্ণ। কারণ ওটা একরৈখিক। নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধতে হয় কৃত্রিমভাবে। কিন্তু প্রমিত তৈরি করতে হয় ব্যবহারিক প্রয়োজনে। প্রমিত মানে পরিমিত, মানে মাপা ভাষা। মানে, নির্দিষ্ট সীমাতে রাখা ভাষা। কাজের টুল্‌স হিসাবে, সংযোগের সেতু হিসাবে দরকার এটি। একটা মাপকাঠি তো দরকার। প্রমিত মানে শুদ্ধ ভালো ভাষাও না। এর শুদ্ধতা নিরূপণ কেবল কাজে ব্যবহারের এরিয়ার ভিতর। হাঁ, প্রমিত ‘খারাপ’ মানে বিশেষ অর্থে খারাপ বলা যায়। এই অর্থে যে, তাতে সৃষ্টিশীলতার স্বাভাবিক নতুন স্বচ্ছন্দ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবের অনুবাদ শব্দে বাক্যে আসে না। প্রমিতের গঠনশৈলী বহুব্যবহৃত বলে জীর্ণ ভাব থাকে—ক্লিশে—আনইভেন্টফুল থাকে। থাকে কারণ সে-ভাষা সীমাতে বাঁধা।


গোঁয়ারতুমি নিজস্বতার স্বার্থে

আরবি মান ভাষাতে বলে ‘মারহাবা’, তুর্কচে মান ভাষাতে বলে ‘মেরহাবা’ বা ‘মেরাবা’ [ইনফর্মাল]। হিব্রুতে বলে ‘শলেম আলেইকেম’, আরবিতে ‘আসসালামু আলাইকুম’ اسلام عليكم, তুর্কচে-তে ‘সেলাম’ selam সংক্ষেপে, বা ‘সেলামুন আলেইকুম’ selamün aleyküm [আসসালামু আলাইকুমও তুর্করা ব্যবহার করেন কেউ কেউ]। বাঙালিরা বলেন ‘স্লামালেকুম’ বা ‘সালামালিকুম’ বা ‘সালামালাইকুম’। শিক্ষিত মুসলিমেরা অনেকে বলেন ‘আসসালামু আলাইকুম’। ইংরেজি আলফাবেট, তুর্কচে-তে ‘আলফাবে’। ইংলিশ ‘টেলিভিশন’ আরবিতে ‘তিলিফিজিউন’ تليفزيون, টার্কিশ [তুর্কচে] ভাষায় ‘থেলিভিজিউন’ teliviziün. আরবি وجود—উযুদ, [অর্থ অস্তিত্ব সত্তা, দেহ, বর্তমানতা] তুর্কি ভাষায় vücut—ভুজুথ বলে বোঝায় কোনো আকার, রূপ, স্বরূপ। [ভুজুথ এর ভ বাংলায় ভ উচ্চারণের মতো আসলে না, বা ইংরেজি V-এর উচ্চারণ স্থান বাংলা ভ-এর উচ্চারণ স্থান এক না আসলে। আমরা দেখাই আরকি। v উচ্চারণ আসলে আরবি ওয়াও হরফের উচ্চারণের কাছাকাছি।] আরবি شكل—শাক্কাল, তুর্কচে-তে Şekıl—শেকিল, মানে আকার, ধরন; আরবি ও তুর্কি দুই ভাষাতেই শাক্কাল আর শেকিল এর অর্থ একই।  ফারসি ‘আলেফ বা’ হয় তুর্কচে-তে আলফাবে। harf বলে বর্ণকে তুর্কচে ভাষায়, আরবিতে حرف হারাফ, ফার্সিতে এই তিন বর্ণেই লেখা হয় حرف, উচ্চারণ হার্ফ; মানে লিখতে অভিন্ন, বলতে একটু ভিন্ন। ফার্সিতে বর্ণকে نامه নামা-ও বলে।


একটি ডায়ালেক্ট প্রমিত হওয়ার পর তার আশপাশের বহু ডায়ালেক্টের উপর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। 


বাংলা শব্দ ‘প্রত্যেক’ হিন্দিতেও আছে ‘प्रत्येक’, উচ্চারণ ‘প্রাতিয়েক’। অন্য শব্দ ‘হার এক’—हर एक তো আছেই। ‘হার এক’ উর্দুতে হচ্ছে  ہر ایک—’হার ইক’। আরবি لكن—লাকিন, ফার্সিতে ليكن—লিকিন হয়ে উর্দু হিন্দি পর্যন্ত পৌঁছেছে লেকিন হয়ে, অর্থ একই, কিন্তু। ফার্সি ‘কামিনে’ উর্দু হিন্দিতে বরাবর থেকেছে, বাংলায় এসে ‘কমিন’ হয়েছে; মানে একই দুর্বল, নীচ, কমজাত।

এই যে কাছাকাছি ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত প্রমিত ভাষাগুলো, এগুলো প্রতিষ্ঠা করতে নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষা বা উপভাষার পক্ষে সম্মিলিত এলিট গ্যাংস্টারিজম চর্চা করতে হয়েছে। যারা খবরদারী করেছে প্রতিষ্ঠা করতে, তাদেরকে আবার নিকটবর্তী অন্য মান ভাষার রূপটি বেশিভাগ প্রত্যাখ্যান করার জন্যে একগুঁয়ে থাকতে হয়েছে। মানে ঐ শব্দটি ওরা যেমনে বলে বলুক, আমাদের মুখে যেমনে সহজে আসে, আমরা সেভাবেই বলব লিখব। এই গোঁয়ারতুমি নিজস্বতার স্বার্থে হতে পারে।

নিজস্বতা কেন অমন হয়? এর সদুত্তর যা, তা বরাবর সদুত্তর না। ভাষাবিদ বলবেন—এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হয় ফনোলোজি, মরফোলজি। সহজ কথায়, অন্য ভাষার শব্দটি যাদের, তাদের মতো উচ্চারণ করতে না পারা। ‘ঠাকুর’ হয়ে যায় ‘টেগোর’। বাংলা ঠ ইংরেজি ধ্বনিতে নাই। Thakur লিখলেও Th = ঠ হয় না। আরবি ‘খলিল’ ইংরেজিতে ‘Khalil’ লিখলেও ইংরেজি যাদের প্রথম ভাষা তারা kh-কে কাহ্ বলে। খলিল জিবরান কেন হয়ে গেল কাহলিল জিবরান? এর কারণ আরবি নামটি anglicize করিয়েছিলেন জিবরানের ইংরেজির শিক্ষক। তথ্যটি এই—As for Gibran’s given name: “Gibran’s full name in Arabic was Gibran Khalil Gibran, the middle name being his father’s. It is a convention among the Arabs to use the father’s name after one’s first name. Gibran always signed his full name in his Arabic works; however, in his English writings, he dropped the first name and changed the correct spelling of “Khalil” into “Kahlil”, this at the instigation of his English teacher at the Boston school he attended between 1895 and 1897.” [সূত্র : জিবরানখলিলজিবরানডটঅর্গ]


প্রমিত ভাষাও মারা যায়

সংস্কৃত ছিল প্রাচীন ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর লিংগুয়া ফ্রাংকা মর্যাদায় উন্নীত ভাষা। এখন সে ভাষা মৃত। যুক্তরাজ্যের প্রাচীন মান ভাষা ছিল কর্নিশ ভাষা। সেলটিক ভাষা পরিবারের এ ভাষাটি মূলত দক্ষিণ পশ্চিম ইংল্যান্ডের কর্নওয়েল অঞ্চলের হলেও এটি বেশিরভাগ ব্রিটেন জুড়ে চালু ছিল ব্রিটনিক ভাষা হিসাবে। কর্নিশ Dydh da মানে ইংরেজিতে Hello, Na vynnav মানে ইংরেজিতে No thanks. এখন কর্নিশ ভাষা কর্নওয়েলের কয়েক হাজার মানুষের মুখে আছে। গ্রেট ব্রিটেনের মান ভাষা আকারে নাই। সেখানে মান ভাষা হয়ে এসেছে ওয়েস্ট জার্মানির ভাষা থেকে আগত ইংলিশ ভাষা। কেন? কারণ হাজার হাজার বছর আগে জার্মানদের আগ্রাসনে ব্রিটেন কাবু হয়েছিল। আগ্রাসী জার্মানরা ইউরোপের উত্তর উপকূলে বসতি স্থাপন করেছিল। একটি জার্মান উপজাতি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ব্রিটেন দখল নেয়। এই দখলদার বংশধরেরা হাজার হাজার বছর ব্রিটেনে থাকায় তাদের ভাষাটি ইংলিশ ভাষার আদি রূপ হয়। সেই পুরান ইংলিশ খুব জটিল ছিল বিশেষজ্ঞদের মতে। আধুনিক ইংরেজিতে বহু ভাষার শব্দ ঢুকছে। [সূত্র : ভয়েস অব আমেরিকা] ইংরেজি Guru, Jungle, Karma ইত্যাদি হিন্দি থেকে আগত শব্দ।

বর্তমান আরব দুনিয়ায় বহু আগে আফ্রো-এশিয়াটিক পরিবারের ভাষা আরামায়িক ভাষাটি মান ভাষা ছিল, লিংগুয়া ফ্রাংকা ছিল বিস্তারিত ঐ অঞ্চলের। আরবি ও হিব্রু ভাষারও আগের ভাষা। আরামায়িক ভাষাকে আরামায়া ভাষাও বলা হয়। এর লিখিত রূপ—ܐܪܡܝܐ, ארמיא, 𐡀𐡓𐡌𐡉𐡀। এখন কেবল সিরিয়ার একটি ট্রাইবের কয়েক হাজার মানুষের মুখে আছে আরামায়িক ভাষা।

ইতিহাসবিদেরা একমত যে, ঈসা আ. আরামায়িক ভাষায় কথা বলতেন। তার সেই বিখ্যাত কান্নাজড়ানো চিৎকারের কথাটির আরামায়িক ভাষার নানা রূপ পাওয়া যায়। নিউ টেস্টামেন্টের প্রথম বই ম্যাথিউ-তে e’-loi, e-lo’i, la’-ma, sa-bakh-tha’-ni. দ্বিতীয় বই মার্ক-এ Eloi, eloi, lama sabachthanei. আর ‘এলি এলি’ হলো তৎকালীন আরামায়িক ভাষার ভিতরে থাকা কেনান এলাকার কেনানিয়া উপভাষা। সাধারণভাবে আমরা জানি, ‘এলি এলি, লামা সাবাক্তানি’ মানে ‘ও আমার আল্লাহ, তুমি কি আমারে পরিত্যাগ করেছ?’

এখানে প্রসঙ্গত খেয়াল করা যায়, কিছু শব্দ আরবি হিব্রু আরামায়িক ভাষার প্রায় কাছাকাছি পরস্পর। Eli/ Ellahi [Aramaic], Allah [Arabic], Elo [Hebrew], God [English].—অর্থ একই, আল্লাহ।  lema [Aramaic], lema [Arabic], why [English], অর্থ একই, কেন। sabachtani [Aramaic] sebatani [Arabic], abandon me [English]. অর্থ একই, পরিত্যাগ করা।

ইতালির একটি ট্রাইবের ভাষা লাতিন ভাষাটি রোমান সাম্রাজ্যের প্রমিত ভাষা হয়েছিল। এখন লাতিন ভাষা মরা বিবেচিত হলেও, রূপ বদল হয়ে স্পেনিশ, ফ্রেঞ্চ, পর্তুগিজ, ইতালীয় ও রোমানীয় ভাষাতে কিছুটা আছে।

ওসমানীয় খেলাফত আমলের তুর্কি প্রমিত ভাষার আরবি বর্ণমালা এখন নাই। এক অসাধারণ প্রভাবশালী নেতা মরার দীর্ঘকাল পরে দুসরা অসাধারণ প্রভাবশালী নেতা আসেন। জগৎ সিস্টেমে এটা আছে। এক প্রমিত ভাষা মারা যাওয়ার পরে নতুন প্রমিত আসে। কখনো পুরোনো প্রমিত পরিবর্তিত রূপে ফিরে আসে বল বলয় বিস্তারের ফলে। যেমন : হিব্রু। ইসরাইল সম্প্রসারণ হচ্ছে মানে আধুনিক হিব্রু ভাষার প্রভাব বাড়ছে। সেই প্রাচীন হেব্রায়িক ডায়ালেক্ট এখন আধুনিক হয়ে ইসরাইলের মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের ভাষা।

তুর্কিদের মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এসে দিলেন ওসমানীয় আরবি বর্ণমালা আউট করে। প্রধান কারণ ফোনেটিকস। মানে তাদের স্থানীয় ভাষার ধ্বনি বরাবর কভার করে না ওসমানীয় আরবি স্ক্রিপ্ট। ওগুলো সরিয়ে কামাল সেখানে রাখলেন আধুনিক তুর্কচে ভাষার লাতিন বর্ণমালা। তাতে ধ্বনি বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি বিশেষ রূপের বর্ণ যোগ করা হয়। ২৯টি বর্ণের মধ্যে ২৩টি বর্ণ আছে ইংরেজির মতো কিন্তু সবগুলোর উচ্চারণ ইংরেজির মতন না। দেখতে C উচ্চারণ জে।

আরেকটা ব্যাপার নজরে পড়ে, [E-Z-Glot-এর তথ্য অনুযায়ী]—এ যুগে আরবি ভাষার শব্দ ৫৯%  ফার্সিতে, উর্দুতে ৩২%, হিব্রুতে ১৭% রয়েছে। বাংলাতে ২০% শব্দ সংস্কৃত শব্দ, হিন্দিতে ২৭% সংস্কৃত শব্দ আছে।

তুর্কি ভাষার ১৯% শব্দ আর্মেনীয়তে, ১৮% আছে চেক ভাষাতে, পোলিশ ১৬%, এস্তোনীয় ১৫%, হাঙ্গেরীয় ১৪%। মানে এই পরিমাণ কমন ওয়ার্ডস শেয়ারিং আছে তাদের মাঝে। ৮৮ মিলিয়ন মানুষের আধুনিক তুর্ক ভাষাতে কিছু ডায়ালেক্ট তো আছেই। একটি ডায়ালেক্ট প্রমিত হওয়ার পর তার আশপাশের বহু ডায়ালেক্টের উপর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। কারণ প্রশাসন তো প্রমিতের দখলে থাকে। এই দখলদারি এক সময় থাকে না।


কেন মারা যায় ভাষা?

ভাষাতত্ত্ববিদ জানান, বর্তমান পৃথিবীর প্রায় ৬৯০০ ভাষার অর্ধেকের বেশি একবিংশ শতকের শেষের দিকে মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। [সূত্র : ব্রিটানিকা] প্রশ্ন হলো, সুপ্রতিষ্ঠিত ভাষা, প্রমিত ভাষা মারা যায় কী কারণে? কখনো কোনো ভাষা জলদি মারা যায়। এটা হতে পারে কোনো দুর্যোগের কবলে পড়ে যুদ্ধে কোনো ক্ষুদ্র জাতি নিশ্চিহ্ন হলে। এল সালভাদরের ‘লেনকা’ ও ‘কেকাওপেরা’ নৃগোষ্ঠী তাদের ভাষা ত্যাগ করে ইন্ডিয়ান বলে পরিচিত হওয়ার ভয়ে। কারণ ১৯৩২ সালে সালভাদর সৈন্যরা কৃষক বিদ্রোহ দমন করতে লাখো মানুষ মেরে ফেলে, যাদের অধিকাংশ স্বদেশজাত কৃষক শ্রেণির মানুষ ছিলেন।


হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে শক্তিশালী হতে হয়, প্রবল আন্দোলন, দমন, পীড়ন করতে হয়, ‘শত্রু তুমি বন্ধু তুমি’ হতে হয়।


তাছাড়া, পরম্পরাগত প্রজন্ম যখন তাদের নিজের ভাষার চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ ভাষার সামাজিক অর্থনৈতিক সুবিধার দিকে মনোযোগী হয়, তখন সে তাদের ঐতিহ্যের ভাষার দক্ষতার দিকে অমনোযোগী হয়। ফলে তাদের কাছ থেকে তার নিজের ভাষা মরে যেতে থাকে। একটি উদাহরণ হলো, আরবি ভাষার অগ্রগতির ফলে সপ্তম শতকে মিশরের ‘কপটিক’ ভাষা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এভাবে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বহু প্রতিষ্ঠিত ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে।


ভাষার পুনরুজ্জীবন

কখনো কোনো লুপ্তপ্রায় ভাষা পুনরায় প্রভাবশালী হতে পারে। ইতিহাস দেখায়, সব ভাষার নসিবে নাই পুনরুজ্জীবন, কোনো ভাষা বিস্ময়করভাবে ফের প্রবল হয়। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে ফিলিস্তিনের ইহুদিগণ আরবি ভাষায় কথা বলতেন। কেবল তাদের ধর্মের বই পড়তেন হিব্রু ভাষাতে। আটচল্লিশের পর ইসরাইলে আরবি ও হিব্রু দুটি ভাষাকেই সরকারি দাপ্তরিক ভাষা রাখে আর পুরো লেভান্ত উপত্যকা জুড়ে লিংগুয়া ফ্রাংকা হয়ে যায় হিব্রু ভাষা। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে এসে ইসরাইল সরকার হিব্রু করে ইসরাইলের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা। আরবি ভাষাকে দেয় ‘স্পেশাল স্ট্যাটাস’। মানে, যায়নবাদী আন্দোলন হিব্রু ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করে। দ্বিতীয় শতকে মরা প্রায় ভাষা হিব্রু উনিশ ও বিশ শতকে পুনরুজ্জীবিত হয়। তাছাড়া ভারতে সংস্কৃত পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নাম সংস্কৃত শব্দে রাখা হচ্ছে। ‘পৃথিবী’ ‘অগ্নি’ ‘আকাশ’ ‘নাগ’ ইত্যাদি। ‘সামস্কৃতা ভারাতি’ নামের সংগঠন সংস্কৃত ভাষা পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে কাজ করছে। ওদিকে লাতিন ভাষা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টাও চলছে। নতুন আবিষ্কারের নাম লাতিন ভাষায় রাখা হচ্ছে। তাছাড়া ‘লাজুরি’ ‘লিভোনিয়ান’ ‘লিওনিজ’ ‘ম্যাংক্স’, ‘কর্নিশ’ ইত্যাদি ভাষা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে।


উপসংহার

দেখা যাচ্ছে, ভাষা প্রমিতকরণে জোর-জবরদস্তি করতে হয়। জীবিত রাখতে হলে অর্থনৈতিক বল থাকতে হয়, বিদ্যা বুদ্ধির প্রভাব থাকতে হয়, সংস্কৃতি প্রভাবশালী হতে হয়। নইলে নিজেদের ভাষা সংস্কৃতি হারাতে হয়। আবার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে শক্তিশালী হতে হয়, প্রবল আন্দোলন, দমন, পীড়ন করতে হয়, ‘শত্রু তুমি বন্ধু তুমি’ হতে হয়।

সারওয়ার চৌধুরী

কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও অনুবাদক। প্রাক্তন সিলেট প্রেসক্লাব সদস্য। প্রাক্তন সহকারী সম্পাদক দৈনিক জালালাবাদ। বাইশ বছর ধরে ইউএই প্রবাসী।

প্রকাশিত বই—

একমুঠো ল্যাবিরিন্থমাখা মায়াবী জীবন তৃষ্ণা [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৬]
অচিন মানুষটির নানা রঙের গল্প [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৭]
বচনে বন্ধনে ঘ্রাণে প্রশ্নোত্তর ফোটে [প্রবন্ধ; আদর্শ, ২০১২]
শিশির ও ধূলিকণা মায়া [গল্প; শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
হারুকি মুরাকামির গল্প ও বচনামৃত [অনুবাদ গল্প; চৈতন্য, ২০১৫]
ভালবাসার চল্লিশ নিয়ম [অনুবাদ উপন্যাস; মূল : এলিফ সাফাক, চৈতন্য, ২০১৬]
সাক্ষাৎকার [অনুবাদ, পাওলো কোয়েলো, হারুকি মুরাকামি, থিক নাট হান]
সংগীতশিল্পী [অনুবাদ, মূল : কাজুও ইশিগুরো, চৈতন্য, ২০১৭]

ই-মেইল : sarwarch@gmail.com