হোম গদ্য বিসর্জন : ‘সত্য-কারাগারে বন্দি’ অসত্য জীবন

বিসর্জন : ‘সত্য-কারাগারে বন্দি’ অসত্য জীবন

বিসর্জন : ‘সত্য-কারাগারে বন্দি’ অসত্য জীবন
396
0

বাংলা ভাষার কাব্যশক্তি তার সকল পেশল রক্তমাংসময় ঘ্রাণ-আঘ্রাণের ধ্বনি ঝনৎকার সৌন্দর্য আর আখ্যানের ঘাতপ্রতিঘাত নিয়ে আছড়ে পড়েছে যে রচনায়, তার নাম ‘বিসর্জন’; মানুষ দৈব আর ঐহিকতার আদর্শ বিবেক মানবতার সংঘাতের মধ্য দিয়ে নিজেকে ফিরে ফিরে ফিরে পাওয়ার যাত্রা যে নাটকে করতে পেরেছে, সে ‘বিসর্জন’; একটি বিশেষ ধর্মভাবনার হাওয়ায় পাল উড়িয়ে চিন্তার যে তরী বিশ্বাসের চলচ্ছক্তির ঘাটে ঘাটে ভিড়েছে বারবার, সে-ই ‘বিসর্জন’।

‘বিসর্জন’ রঘুপতি নামের এক সামন্তীয় কুলপুরোহিতের ইতিহাস-পরম্পরায় আত্মনির্মিত ক্ষমতার অঙ্গ টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের ট্র্যাজিক পরিণতির বয়ান, যিনি নিজের ধর্মীয় ক্ষমতা টেকানোর জন্য মরিয়া হয়ে নিজের পুত্রবৎ শিষ্যকে এই জ্ঞান দিতে পারেন :

‘এ জগৎ মহা হত্যাশালা। জানো না কি
প্রত্যেক পলকপাতে লক্ষ কোটি প্রাণী
চির আঁখি মুদিতেছে। সে কাহার খেলা?
হত্যায় খচিত এই ধরণীর ধূলি।
প্রতিপদে চরণে দলিত শত কীট—
তাহারা কি জীব নহে? রক্তের অক্ষরে
অবিশ্রাম লিখিতেছে বৃদ্ধ মহাকাল
বিশ্বপত্রে জীবের ক্ষণিক ইতিহাস।
হত্যা অরণ্যের মাঝে, হত্যা লোকালয়ে,
হত্যা বিহঙ্গের নীড়ে, কীটের গহ্বরে,
অগাধ সাগরজলে, নির্মল আকাশে—
হত্যা জীবিকার তরে, হত্যা খেলাচ্ছলে,
হত্যা অকারণে, হত্যা অনিচ্ছার বলে—
চলেছে নিখিল বিশ্ব হত্যার তাড়নে
ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রাণপণে, ব্যাঘ্রের আক্রমে
মৃগসম, মুহূর্ত দাঁড়াতে নাহি পারে… ’

অথচ এই হত্যার ভাষ্যবেসাতি-তোলা পুরোহিত তার মিথ্যা যুক্তিতির ফিরিয়ে নিয়ে নিজের বুকে আমূল বিদ্ধ করেন আপন পুত্রতুল্য জয়সিংহের আত্মাহুতির বেদনায়, আহা, যে ছিল তার ‘একমাত্র প্রাণ,/ প্রাণাধিক/ জীবন-মন্থন-করা ধন!’ অস্বীকার করেন আজন্মলালিত দেবীভক্তি, ছিঁড়ে ফেলে বিশ্বাসের ভণিতার তুলকালাম ধর্মধ্বজা, অশ্রু-উন্মত্ত উচ্চারণ করেন :

‘দেবী নাই।
…কোথাও সে নাই।
ঊর্ধ্বে নাই, নিম্নে নাই, কোথাও সে
নাই, কোথাও সে ছিল না কখনো।’


জয়সিংহ রবীন্দ্রের চিন্তাঝড়ে ভাবের সঙ্গত সম্ভাব্য সীমা ছেড়ে ছুড়ে আপন গুরুর কথায় রাখে আস্থা, নঞর্থক ব্যঞ্জনায়, গায় মিথ্যার জয়গান


‘বিসর্জন’ জয়সিংহ নামের এক ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ হওয়া তরুণের প্রাণোচ্ছ্বাসের আবেগের বেদনার আঘাতের রক্তাক্ত বিপর্যস্ত হওয়ার কাহিনি, আজীবন পিতাসম আঁকড়ে-বেঁচে-থাকা মহা-পুরুষের বাণীর সম্মুখে জগৎ-অন্ধ হয়ে আপনাকে বারবার মানুষের হৃদয়ের সকল ইশারাসন্ধানের দর্পণসম্মুখে দাঁড় করানোর ভাষ্যরোল :

‘প্রেম মিথ্যা,
স্নেহ মিথ্যা, দয়া মিথ্যা, মিথ্যা আর সব,
সত্য শুধু অনাদি অনন্ত হিংসা!’ (?)

তবে
‘কেন মেঘ হতে ঝরে আশীর্বাদ সম
বৃষ্টিধারা দগ্ধ ধরণীর বক্ষ ’পরে—
গ’লে আসে পাষাণ হইতে দয়াময়ী
স্রোতস্বিনী মরুমাঝে—কোটি কন্টকের
শিরোভাগে, কেন ফুল ওঠে বিকশিয়া?’

সেই জয়সিংহ সুদূরপারের আর এক নাট্যকবি-বিরচিত বিপন্ন দ্বিধা-আন্দোলিত হ্যামলেট নামের এক যুবকের কথা যেন আপনস্বরেই নেয় তুলে : To be or not to be; that is the question… কিংবা সেই আত্মজিজ্ঞাসা : ‘জীবনের সমস্ত আঘাত আর যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করা শ্রেয়, নাকি এদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করা ভালো?’ [Whether it’s nobler in the mind to suffer./ The shings and arrows of outrageous fortune,/ Or to take arms against a sea of troubles,/ And, by opposing, end them. -Hamlet/ William Shakespeare.]

ছুরি হাতে করণীয় কর্মের মুখে অসহায় থরথর তার কথাগুলো বেশ পালটে স্বর খুঁজেছে এই প্রাচ্যতরুণের কন্ঠে, নিজেকে বোঝায় সে :

‘দূর হোক চিন্তাজাল! দ্বিধা দূর হোক।
চিন্তার নরক চেয়ে কার্য ভালো, যত
ক্রুর যতই কঠোর হোক।’

কারণ—
‘কার্যের তো শেষ আছে, চিন্তার সীমানা নাই কোথা—
ধরে সে সহস্র মূর্তি পলকে পলকে
বাষ্পের মতোন, চারিদিকে যতই সে
পথ খুঁজে মরে, পথ তত সরু হয়ে যায়।’

‘বিসর্জন’ এইমতো এক তরুণের আপনমনের দ্বিধাবাসনার ভাবকল্পনার অবোধ-প্রবোধের সংঘর্ষের বাক্যরাশি ওড়ায় গগনে। ‘গগনে গগনে আপনার মনে’ কী খেলা চলে তখন! বাস্তব সংহতি সংগতি দূরেই থাক, রবীন্দ্রনাথ লুকিয়ে যান জয়সিংহের মনের ভেতর। এইখানে প্রাচ্যশিল্পরচনাকৌশল মহান সৌন্দর্যে তার ভিন্ন হয় বারবার প্রতীচ্যের বস্তুনিষ্ঠ কনক্রিট গাণিতিক যন্ত্রবৎ পরিশুদ্ধ নিখাদ ভাব-কথা-ঘটনার বিস্তারকলার থেকে।

তাই এক জয়সিংহ রবীন্দ্রের চিন্তাঝড়ে ভাবের সঙ্গত সম্ভাব্য সীমা ছেড়ে ছুড়ে আপন গুরুর কথায় রাখে আস্থা, নঞর্থক ব্যঞ্জনায়, গায় মিথ্যার জয়গান, মনেরে প্রবোধ দিতে :

‘বাঁশি যদি সত্যই কাঁদিত বেদনায়
ফেটে গিয়ে সংগীত নীরব হত তার।’

এই জয়সিংহ-ভাবনা নির্মাণ করেছে রঘুপতি, বিসর্জনের নায়ক, বেপরোয়া, নির্ভীক, চিরায়ত-ক্ষমতাপূজারি, ধর্মীয় শক্তিতে বলে প্রথার শাসন যার আপ্তমন্ত্র মনে। জয়সিংহকে বোঝাতে গিয়ে ভক্তগণের মূর্খতাকে পরিহাস করেন যিনি :

‘সত্যের প্রতিমা সত্য নহে, কথা সত্য
নহে, লিপি সত্য নহে, মূর্তি সত্য নহে,
চিন্তা সত্য নহে। সত্য কোথা আছে—কেহ
নাহি জানে তারে, কেহ নাহি পায় তারে।
সেই সত্য কোটি মিথ্যারূপে চারিদিকে
ফাটিয়া পড়েছে; সত্য তাই নাম ধরে
‘মহামায়া’, অর্থ তার ‘মহামিথ্যা’।’

এখানেই থামেন না বৃদ্ধ পুরোহিত, নিজের অসার কর্মের দায়ভার তুলে নেন নিজস্কন্ধে তার:

‘সত্য মহারাজ বসে থাকে রাজ-অন্তঃপুরে
শত মিথ্যা প্রতিনিধি তারি, চতুর্দিকে
মরে খেটে খেটে।’

‘বিসর্জন’ ফের ফের সেই দুনির্বার দোর্দণ্ড ভাব-লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পরিণয়পুরাণ-রচনা-করা বিরল আখ্যান, যেখানে প্রতিষ্ঠান-অধিষ্ঠানের দোদুল আসনে বসা শ্রেণিমানুষের শ্রেণিচ্যুত হৃদয়ের আন্দোলনে দুর্দম সংশয়ের ঝড়, যেখানে ভাসিয়া চলে নয়নরায়, চাঁদপাল, নক্ষত্ররায়…. সত্য কিবা মিথ্যাবহ ধোঁয়াকুয়াশায় কিংবা মেঘে ঢাকা স্ফটিকমানুষ….

সন্তানাকাঙ্ক্ষী স্নেহথরথর আত্ম-প্রাপ্তি-অন্ধ রাজমহিষী গুণবতীর অপ্রতিরোধ্য একরৈখিক যাত্রা, অন্যসর্বচ্ছিন্ন দেবীভীতিভক্তির আড়ালে যাঁর কেবলি সেই চির-মাতৃ-কাম :

‘আপনার প্রাণের ভিতরে/ আরেকটি প্রাণাধিক প্রাণ করিবারে/ অনুভব।’

সেই প্রাণাকাঙ্ক্ষা যার চোখের সম্মুখে অন্ধকারে রাখে আপন প্রিয়পতি প্রিয়মানুষের জীবপ্রাণ-সংহারে অনীহার বেদনার সকল বয়ান, এবং নিমেষে এ-সত্য এড়িয়ে যান : ‘অবোলা দুর্বল জীব/ প্রাণভয়ে কাঁপে ধরথর—নৃত্য করে/ দয়াহীন নরনারী রক্তমত্ততায়।’

প্রথানুগত যে নারী দৃঢ় বিশ্বাসে বলে : ‘চিরদিবসের সূর্য উঠিবে আবার/ চিরদিবসের প্রথা জাগায়ে জগতে’, বিসর্জন গুণবতী নাম্নী সেই মাতৃত্বমোহমত্ত নারীর বিশ্বাসের দুর্গ ভেঙে অনুভবের ‘দেবতা’র কাছে ফিরে আসার গল্পও।

এক ভিখারিনী কিশোরী অপর্ণার অবরুদ্ধ ক্রন্দনের হৃৎরক্তবিচ্ছুরিত আলোর কণায় কণায় অন্ধকার-ফেটে-যাওয়া গল্পের অনন্যপরিণয়ের আখ্যান ‘বিসর্জন’। যার আদরের ছাগশিশু বলি দেয়ার মধ্য দিয়ে ঘটে যাওয়া সংবেদনার বীজাবলী রাজহৃদয়ের জমিনে জন্ম দিল চেতনার শস্যরাশি, সে-ও তো আদতে এই কাহিনির অঙ্কুর, সকলের সকল দামামার আড়ালে সবকিছু-মিথ্যা-করা চিরসত্যটুকু যার কণ্ঠ করে উচ্চারণ : ‘যেথা হতে আসিয়াছি, সেথা যাব ভাসি।’


প্রণতি তাকে যুগে যুগে করি, আপাত প্রখর এক মূর্তিমান অন্ধপ্রতিষ্ঠান ভাঙার লড়াইয়ে তিনি—সেইকালে—নামতে পেরেছিলেন বলে!


রাজা গোবিন্দের চৈতন্যের উদ্বোধন সম্পর্কের ছলপাশ কাটিয়ে ছিঁড়ে ভেঙে মানুষের মুক্তির সূত্র খুঁজে যে অ-দম্য যাত্রায়, তারও নাম ‘বিসর্জন’। যদিও জানি না কেন বা তার মনে সহসাই এমন নিত্যকার প্রতিভাব জন্মায়, একটি মেয়ের বেদনার কথনের মধ্য দিয়ে বহুকাল চর্চিত ধর্মপথ থেকে রাজা ফিরে নিতে চান নতুন ধর্মের চিহ্ন, তবু যেহেতু নাট্যকবি শুরুতেই কহেন, ‘ল’য়ে নাম, ল’য়ে জাতি, বিদ্বানের মাতামাতি—/ ও সকল আনিস নে কানে।/ আইনের লৌহ-ছাঁচে কবিতা কভু না বাঁচে/ প্রাণ শুধু পায় তাহা প্রাণে’, সেহেতু কবির অহমের স্রোতে প্রতিস্রোতে ভেসে যেতে যেতে আমরাও মিশে যাই রাজা গোবিন্দের সহসার চিত্ত-জাগরণের প্রবাহে।

‘কত শত বর্ষ ধরে যে প্রাচীন প্রথা
দেবতাচরণতলে বৃদ্ধ হয়ে এল,
সে কি পাপ হতে পারে?’

মন্ত্রীর এমতো প্রশ্নের বাণের মুখে নিরুত্তর রাজা তবু স্তব্ধ নন, দোলেন না একবিন্দু আপন সিদ্ধান্ত থেকে; ততক্ষণে বাস্তবকে পাশ-হটিয়ে কাব্যের মাতাল-অশ্ব শুরু করে দৌড়, সেই গতি রবীন্দ্রনাথ নামের এক কবির শ্বাসবায়ু-নির্ধারিত। বাংলার নাট্যের মৃন্ময়তা তার সূত্রে রচিত হয়েছে।

এইমতো লজিক আর এন্টিলজিকের সিনথেসিসে গড়ে ওঠা বঙ্গীয় কাব্যের শরীর-প্রাণ, মগজ প্রায়শ হার মানে হৃদয়ের কাছে।

তবু এ-ই বিসর্জন, এইখানে মানুষেরা আপন আপন স্বভাবে কথা বলে, যুক্তি কয়, রুখে ওঠে, মত দেয়, ফিরে তাকায়, আপন আপন স্বভাবে ধেয়ে চলে সিদ্ধির নিয়মে, এই সুন্দরতা আছে ব্যাপক ব্যাপক বিসর্জন-এ।

জয়সিংহ কথিত ‘ভক্তিপিপাসিতা’ নাকি ‘রক্তপিপাসিনী’ এই দেবী?

এ প্রশ্নের সুদূরবিচ্ছুরিত তীক্ষ্ণতিরের উদ্দিষ্ট সন্ধানে নামা ‘বিসর্জন’, তাও জানি। ধর্মের বলয় তা কি আদতেই ভক্তিতে আপন তৃপ্তি খোঁজে, নাকি শোষণে শাসনে? ধর্ম কি ভক্তিতে বাঁচে, নাকি ক্ষমতার নিরন্তর বলয় নির্মাণে? আত্মনিবেদনে, নাকি সংঘর্ষে? সমর্পণে নাকি মোকাবেলায়?

এই প্রশ্ন ‘বিসর্জন’-এ পাগলা ঘোড়ার মতো সকল চরিত্রঘটনাভাববক্রপথে অন্ধকারে আলো-আলেয়ায় ছুটেই চলেছে। মূর্তির বিসর্জনের মধ্য দিয়ে যে বিশ্বাস বিসর্জিত হলো গোমতীতে, সে বিশ্বাস আরও শত সূত্র ধরে আরও নানা অঞ্চলে দেশে শত জয়সিংহকে বলিদানে বাধ্য করে যায় কিনা, একটি বিশেষ ধর্মভাবের কবি রবীন্দ্রের কাছে সেই প্রশ্ন জারি রাখা চলে; যদিও প্রণতি তাকে যুগে যুগে করি, আপাত প্রখর এক মূর্তিমান অন্ধপ্রতিষ্ঠান ভাঙার লড়াইয়ে তিনি—সেইকালে—নামতে পেরেছিলেন বলে!

শুভাশিস সিনহা

জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৮, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে নাট্যপ্রশিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

ডেকেছিলাম জল (কবিতা)
অক্ষর নতুন করে চিনি (কবিতা)
বেলা দ্বিপ্রহর (কবিতা)
হওয়া না-হওয়ার গান (কবিতা)
দ্বিমনদিশা (কবিতা)
আবছায়াদের রূপকথা (গল্প)
প্রতিরূপকথা (নাটক)
কুলিমানুর ঘুম (উপন্যাস)
ইঞ্জিন (উপন্যাস)
ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ)
রবীন্দ্রনাথ : গ্রামের ছবি (গবেষণা)
মণিপুরি সাহিত্য সংগ্রহ ২খণ্ড (অনুবাদ ও সম্পাদনা)

ই-মেইল : shuvashissinha@yahoo.com