হোম গদ্য বাংলার নাট্য ঐতিহ্য

বাংলার নাট্য ঐতিহ্য

বাংলার নাট্য ঐতিহ্য
328
0

হাজার বছরের বাঙলার নাট্য ঐতিহ্য কেমন ছিল সে প্রশ্নই চালিত করেছে এ অধ্যয়ন। বাঙলার অতীত নাট্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া দুরূহ হলেও ইতিহাসের প্রতিনিধিত্বশীল নানা নিদর্শনে বিচ্ছিন্নভাবে প্রাপ্ত তথ্যগুলো ভিত্তি করে আমরা রূপরেখামূলক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি। এ প্রবন্ধে আমরা বাঙলার হাজার বছরের ইতিহাস ও প্রতিনিধিত্বশীল সাহিত্য নিদর্শনকে ভিত্তি করে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করব আবহমান বাংলার নাট্য ঐতিহ্য ও নাট্যরীতির স্বরূপ-বৈশিষ্ট্য।

নদী মাত্রিক ভূভাগের ফলে প্রাচীন বাঙলার স্বাতন্ত্র্যতার সৃষ্টি হয়েছিল প্রাচীন সময়ে। বৈদিকযুগে সমস্ত ভারত যখন শাস্ত্রের দিকে ঝুঁকে ছিল তখন বাংলা অঞ্চল ছিল গীতপ্রবল। সংস্কৃত সাহিত্য-কলাবিদ্যার কৌশলকেও অন্ধ অনুকরণ করে নি প্রাচীন বাংলা। বাংলার প্রাচীনকালেই নৃত্য এবং গীতের সাহায্যে নাট্যাভিনয়ের প্রচলন ছিল। পরিবেশনায় কাঁসর, করতাল, ঢাক, বীণা, বাঁশি, মৃদঙ্গ, মৃৎভাণ্ড ইত্যাদি নানা বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতো। ভরতমুনি তার নাট্যশাস্ত্রে এ অঞ্চলের নাট্য প্রবৃত্তিকে ‘ওড্রমাগধী’ নামে আঞ্চলিক রীতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ওড্রমাগধী রীতিটি অপ্সরা সৃজন নৃত্য থেকে উদ্ভব কৈশিকী প্রবৃত্তি ও ভারতী প্রবৃত্তির সমন্বয়ে গঠিত বলে ক্রিয়া ও রসের বহুনৃত্যগীতবাদ্য সংযুক্ত লাস্যময়ী অভিনয়নীতির নাটক। ‘দীনেশচন্দ্র সেন ‘ওড্রমাগধী রীতি’তে সংলাপের প্রাধান্যের প্রসঙ্গ টেনেছেন। বাংলার প্রাচীন যে তম্বুরু নাটক-এর উল্লেখ যাওয়া যায় তা বাংলা অঞ্চলের নৃত্যগীতের পরিচয়কেই সুদৃঢ় করে। নীহাররঞ্জন রায় বলেন—‘প্রাচীনকালে নৃত্য বা নৃত্ত ছাড়া নাটক ছিল না; কাজেই বুদ্ধনাটকই হউক আর তুম্বুরুনাট্যই হউক, নৃত্য ছিলই, বাদ্যও ছিল এই অনুমানে বাধা নাই।’


মধ্যযুগ ছিল বাঙলা সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ। নানা নাট্য আঙ্গিক, নানা বিষয়ে, নানা বৈচিত্র্যে মধ্যযুগের বাংলা নাট্যসংস্কৃতি প্রবহমান ছিল।


এসময় নাটকগুলো পরিবেশিত হতো কিভাবে। প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতিতে নানা ধারা নানা বৈচিত্র্য পাওয়া যায়। কোনটি বর্ণনানির্ভর আবার কোনটা বা উক্তি-প্রত্যুক্তি প্রাধান্যে পরিবেশিত। তবে প্রতিটির সঙ্গেই নৃত্য-গীত কমবেশি করে জড়িত ছিল। পাল যুগে চন্দ্রগোমীর ‘লোকানন্দ’ বা বৌদ্ধ নাটকগুলো নৃত্য-গীত সহযোগে বিভিন্ন বিহারগুলো কিংবা বিহারের বাইরে উপস্থাপিত হতো। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পাদিত চর্যাগীতিকাগুলোর ১৭ সংখ্যক চর্যার দৃশ্যকল্পে গান্ধি দেবী নৃত্যপর আর বুদ্ধ নাটক সম্পন্ন হওয়ার মধ্যে নৃত্য-গীত নির্ভর নাট্য চরিত্রকেই প্রতীয়মান করে। চর্যাপদে ডমরু বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এখনো নেপালে চর্যা বা চারিয়া উন্মুক্ত স্থানে চারদিকে দর্শকবেষ্টিত স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী মঞ্চে উপস্থাপিত হতে দেখা যায়।

‘রাজতরঙ্গিনী’ গ্রন্থে বাংলার নাট্য-নৃত্য পরিবেশনার গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া যায়। কাশ্মিরের কলহন রচিত এ গ্রন্থে যুবরাজ জয়াপিড় বগুড়ায় নৃত্য-গীত দেখার জন্য তিনি কার্তিকের মন্দিরে প্রবেশ করেন। সেখানে নর্তকী কমলা শাস্ত্রীর নৃত্যের সাথে নিজস্ব ঢঙে নৃত্য করছিলেন। জয়াপিড় শিলাতলে বসে নৃত্যগীত নাট্যের অপূর্ব মাধুর্য দেখছিলেন। তৎকালীন বাঙলা অঞ্চলে বিভিন্ন মন্দিরে নর্তকী-দেবদাসীদের নৃত্য-গীত নাট্যাভিনয়ের বহুল প্রচলন ছিল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রসহ নানা গ্রন্থেই দেবদাসীদের নৃত্যগীত-নাট্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় নেটো বা নাটুয়া নৃত্য-গীত ও অভিনয় সহযোগে পালা আকারে পরিবেশিত হতো। যাত্রার ফর্মের মতো অথচ গীতল। সাথে বাদক দল থাকত। বন্দনা দিয়ে পরিবেশনা শুরু হতো। নানা কৌতুকপূর্ণ অভিনয়ও সংযোজিত থাকত। নানা ধরনের পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক বিষয় আশ্রিত ছিল এ নাটুয়ার পরিবেশনা। এ নেটো বা নাটুয়ার গায়েন পুরোপুরি পেশাদার অভিনেতা ছিল। এটি মৌখিক রীতির নাট্য ছিল। এখানে ছেলেরা মেয়ে সেজে অভিনয় করত। একেকজন নানা চরিত্রে অভিনয় করত। বাজনার আধিক্য পরিলক্ষিত হতো।

‘নবদ্বীপ’কে রাজধানী করে সেন বংশীয়দের নাট্যচর্চা আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্ববহ। লক্ষণসেনের সভাকবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম’ সংস্কৃত ভাষায় রচিত গীতনাট্য। ভগবত পুরাণের রাধা-কৃষ্ণের ছোট্ট কাহিনিকে আশ্রয় করে ভক্তিবাদী পরিবেশনা এটি। এর লেখক জয়দেব নিজেই ছিলেন প্রধান গায়ক। তার স্ত্রী নৃত্য-গীতে পারদর্শী পদ্মাবতী ছিলেন এর মূল অভিনয়শিল্পী। আসরকেন্দ্রিক পরিবেশিত হতো গীতগোবিন্দম। নৃত্যশিল্পীরা নাচের সাথে সাথে গান গাইতেন এবং আঙ্গিক অভিনয় করতেন। যা বাংলার লোকায়ত যাত্রাপালার সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। উক্তি-প্রত্যুক্তি ও সংগীত নির্ভর এ নাট্য পরিবেশনা। এতে একজন সূত্রধরও নৃত্য-গীতের মাঝে কাব্যধর্মী বর্ণনা করতেন। এটি বর্ণনাত্মক নাট্যকৌশলের আশ্রয়ে গড়ে উঠেছে।

হলায়ুদ মিশ্রের চম্পুকাব্য ‘সেক শুভোদয়া’র পরিবেশনারীতি ছিল কথকথার ধারায় আসর কেন্দ্রিক। তৎকালীন অন্য আরেকটি সাহিত্যকর্ম রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ পাঁচালি রীতিতে পরিবেশিত হতো। শূন্যপুরাণ উপস্থাপনে গায়েন দোহার থাকত। তাছাড়াও সেসময় বিদ্যাপতির ‘পুরুষ পরীক্ষা’ গ্রন্থেও এ অঞ্চলে অভিনেতা ও অভিনয় কৌশলের পরিচয় পাওয়া যায়। চরিত্রকে ধারণ করার পদ্ধতি সম্পর্কেও বিস্তার কথন আছে এতে। ‘হর্ষচরিত’ ‘নাথগীতিকা’ পরিবেশনাগুলো বর্ণনাত্মক এবং নাচ-গান-অভিনয় সহযোগে উপস্থাপিত হতো। নাথগীতিকায় সিদ্ধা চরিত্র গায়েন উপস্থাপন করত। গানের ধুয়া থাকত এবং পালাগানের মতো ছিল এর পরিবেশনা। বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যে ছিল ঢাক, ঢোল, ধাঙসা, নাকাড়া, শিঙ্গা ইত্যাদি। সেকালে নাটকের পেশাবৃত্তির পরিচয় এতে পাওয়া যায়। এতে পুরুষরা মহিলার সাজে সজ্জিত হতেন।

প্রাচীন যুগেই আরব্য থেকে আসা শিল্প-সংস্কৃতি বিশেষত তাজিয়া, পুতুল নাট্য, নেটো প্রভৃতির ব্যাপক প্রচলন শুরু হতে থাকে। ‘ইউসুফ-জুলেখা’ ‘লাইলী-মজনু’ গ্রাম বাংলার মুসলিম ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলায় ‘পালা’ ‘কেচ্ছা’ ‘কথকতা’ ‘গান’ নানা পরিবেশনায় ঋদ্ধ ছিল। আবহমান বাংলার পালাগুলো চারপাশে দর্শকবেষ্টিত খোলা মঞ্চে অভিনীত হতো। কখনো কখনো কৃত্রিম মঞ্চও স্থাপিত হয়। পালাগানে একজন মূল গায়েন বা বয়াতি থাকেন। পালার সংগীত, কাহিনি ও নাট্যিক উপস্থাপনে দোহারগণ সাহায্য করে থাকেন। প্রচলিত ‘মালঞ্চমালা’ পালাটিকে অধিক প্রাচীন বলে দাবি করা হয়। ‘মহুয়া’ ‘কাজল রেখা’ চতুর্দশ শতকের আগেই রচিত হয়েছিল বলে অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেন। মধুমালার কেচ্ছা, সখিসোনা, মালঞ্চকন্যার কেচ্ছা; শীত-বসন্ত; কাঞ্চনমালা আর মালতীকুসুমমালা নানা পালার বিকাশ ঘটেছে সেসময়।

মধ্যযুগ ছিল বাঙলা সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ। নানা নাট্য আঙ্গিক, নানা বিষয়ে, নানা বৈচিত্র্যে মধ্যযুগের বাংলা নাট্যসংস্কৃতি প্রবহমান ছিল। নৃত্য-গীত ও অভিনয়সহ অদ্বৈত মাধুর্যে উপস্থাপিত হতো। সেলিম আল দীন তার বাঙলা নাট্যকোষ গ্রন্থে বাঙালির প্রাচীন ও মধ্যযুগের নাট্যসংস্কৃতির প্রায় ছয় শ-এর অধিক অন্তর্ভুক্তি তুলে ধরেছেন। এগুলো স্থায়ী, অস্থায়ী বা কৃত্রিম মঞ্চে উপস্থাপিত হতো। ‘রামকীর্তন’ ‘রায়মঙ্গল’ ‘রামলীলা’ ‘কুশান গান’ নানা নামে পরিচিত রামায়ণী গান পাঁচালি আঙ্গিকে পরিবেশিত হতো। পাঁচালি মূলত একধরনের পালাভিনয়। আসর কেন্দ্রিক ছিল রামায়ণের উপস্থাপনা। মূল গায়েন দুই হাতে দুই চামর দুলিয়ে রসভারে অভিনয় করতেন। সংগীত দ্রুত, উত্তেজিত নৃত্য, অঙ্গভঙ্গি সহকারে উপস্থাপন হতে দেখা যেত। এতে কাহিনির বর্ণনাকে আকর্ষণীয় করার জন্য গায়েন বা দোহার বিভিন্ন চরিত্রের ভূমিকায় অভিনয় করে। বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতির হিসেবে বিবেচিত। পাঁচালি ও পালা নাট্য মধ্যযুগের বাঙালি নাট্য পরিবেশনারীতি। মুসলিম শাসনের কারণে ‘ইউসুফ জুলেখা’ ‘রসুল বিজয়’ প্রভৃতিও পাঁচালি আঙ্গিকে পরিবেশিত হতো। কারবালার কাহিনি নিয়ে ‘মুকতুল হোসাইন’ ‘কাসেমের লাড্ডি’ ‘কারবালা’ ‘জঙ্গনামা’; পীরের মাহাত্ম্য নিয়ে ‘খোয়াজ খিজির’ ‘মাদার’ ‘মাদার গাজী’ মাদার পীরের জারি’ ‘খোয়াজ খিজিরের জারি’ সত্যপীর’ ‘গাজীর গান’ ‘মানিক পীর’ ইত্যাদি পরিবেশনা বিদ্যমান ছিল। মধ্যযুগে সারাবিশ্বে ইসলামি সংস্কৃতির জনপ্রিয় নাট্য আঙ্গিক ছিল পুতুল নাট্য বা পাপেট থিয়েটার। ছায়া নাট্যও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।


‘থিয়েটার’ নামের ইউরোপীয় তত্ত্বের আড়ালে হারিয়ে যেতে থাকে আমার ইতিহাস ঐতিহ্যের সবকিছু।


পাঁচালি আঙ্গিকে মহাভারত পরিবেশিত হতো। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কাহিনি পরিবেশিত হলো কীর্তন, পদাবলি কীর্তন, নটপালা, নৌকাবিলাস, রাখালনৃত্য, কৃষ্ণলীলা প্রভৃতি নামে। সতের শতকে এ ধারা ‘অষ্টকগান’, ‘রাসলীলা’ হিসেবেও বিকশিত হয়। বৈষ্ণবধর্মগুরু শ্রীচৈতন্য ও তার অনুসারীদের জীবন মাহাত্ম্য প্রকাশ পেত কৃষ্ণলীলা, কৃষ্ণযাত্রা কিংবা কখনো কখনো পদাবলি যাত্রা হিসেবে। বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন দোহার কেন্দ্রিক নাট্যাভিনয়। বড়ু চণ্ডীদাস ছিলেন গায়েন। নৃত্য, গীত ও অভিনয়ের অদ্বৈতনিক মাধ্যমে এ পরিবেশিত হতো। উক্তি-প্রত্যুক্তি ছাড়াও মাঝে মাঝে বর্ণনা থাকত। কখনো এ পরিবেশনায় এক চরিত্রই সবগুলো চরিত্রের অভিনয় করত। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন অষ্টক গান, অষ্টগান, নৌকাবিলাস, পদাবলি কীর্তন, মণিপুরী নটপালা, রাখালনৃত্য ও গোষ্ঠ, রাসলীলা প্রভৃতি নানা নামে পালা পরিচিত। সেলিম আল দীন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর পরিবেশনরীতি সম্পর্কে মন্তব্য করেন—‘এ ছিল মূলত গায়েন কেন্দ্রিক নাট্যাভিনয়।’

বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্য ভাগবত’-এ চৈতন্য ও তার শিষ্যদের নাচ-গান ও অভিনয় সমন্বিত পরিবেশনার পরিচয় পাওয়া যায়। ড. সুকুমার সেনের মতে বাংলা নাটকের পরিপূর্ণ স্পষ্ট রূপ ‘চৈতন্য ভাগবত’তেই পাওয়া যায়। এটি দর্শক বেষ্টিত মধ্যমঞ্চে উপস্থাপিত হতো। পাশে সাজঘরও থাকত। কখনো কখনো অভিনয়ের স্থানও পরিবর্তন হতো নাট্যমধ্যে। মধ্যযুগের বাঙলায় শিবের গীতে দেখা যায় এতে একজন অভিনেতাই নাচত, গাইত এবং অভিনয় করত। একই সাথে ডমরু বাজাত। বাড়ির দহলা/ আঙিনা কিংবা পাশের কোনো খোলা জায়গায় পরিবেশিত হতো এ বর্ণনাত্মক রীতির নাট্য।

মধ্যযুগের জনপ্রিয় নাট্য ছিল মঙ্গলনাট্য। নানা প্রকারের মঙ্গলকাব্যের মধ্যে মনসামঙ্গল ছিল সবচেয়ে প্রাচীন। মনসামঙ্গল ‘মনসার গীত’ ‘পদ্মার নাচন’ ‘রয়ানী গান’ ‘পদ্মপুরাণ’ ‘বেহুলার নাচাড়ি’ ‘ভাসান যাত্রা’ ‘কান্দনী বিষহরির পালা’ নানা নামেও সমকালে পরিচিত। মনসামঙ্গল ‘পদ্মপুরাণ’ যে গায়েন উপস্থাপন করত তা বিজয় গুপ্তের ভণিতা থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নৃত্য-গীত-অভিনয়ের মাধ্যমে গায়েন-দোহার মিলে পরিবেশনা ছিল পদ্মপুরাণ। এতে নৃত্যশালার উল্লেখও আছে। কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলে পালাকার নিজেই অভিনয় করতেন। সাথে ছিল অভিনয়কর্মী বা নাটুয়া এবং সুুশিক্ষিত বাদক দল ছিল। রূপরাম চক্রবর্তীর ‘ধর্মমঙ্গল’-এ মঞ্চস্থাপত্যের পরিচয় পাওয়া যায়। মধ্যযুগের শেষ পাদে মক্তুল হোসেন, জঙ্গনামা, কাশিমের লড়াই, শহীদ-ই কারবালা, সখিনার বিলাপ ইত্যাদি জারি মর্সিয়া এবং গাজীর গান, মানিকপিরের গান, একদিল পির প্রভৃতি জনপ্রিয় ছিল। ঘাটু গানে ছোকরার দল নারী-রূপ স্বভাব নকল করে নৃত্য-গীতের মাধ্যমে উপস্থাপন করত।

হঠাৎ করেই ১৭৫৭ সালে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ঘটে এক নাটকীয় পরিবর্তন। পলাশীর প্রান্তরে নাটকীয় যুদ্ধের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের দাস বা গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ হয়ে পড়ে ভারতবাসী। মুখ থুবড়ে পড়ে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। এসময় ইউরোপীয় আদলে তৈরি হতে থাকে নতুন ইতিহাস। ‘থিয়েটার’ নামের ইউরোপীয় তত্ত্বের আড়ালে হারিয়ে যেতে থাকে আমার ইতিহাস ঐতিহ্যের সবকিছু।

প্লে হাউস নামে ফোর্ড উইলিয়ামে নাট্যশালার সন্ধান পাওয়া যায়। ইউরোপীয় নাটক উপস্থাপিত হতো প্রসেনিয়াম মঞ্চে। তারা নাটকের ক্ষেত্রে মঞ্চস্থাপত্যটাকেই বেশি গুরুত্ব প্রদান করত। গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ কলকাতায় ‘কাল্পনিক সংবদল’ অনুবাদ মঞ্চায়ন করলে বাংলা ভাষায় ইউরোপীয় নাট্যচর্চার প্রচলন বেগবান হয়ে ওঠে। অথচ সেসময়ে বাংলার আনাচে কানাচে বেহুলা লখিন্দরের পালা, কারবালার কেচ্ছা, সয়ফুল-মুলুকের সাত দরিয়ার কেচ্ছা, দেওয়ানা মদিনা, কাজলরেখাসহ শত শত পালা, হাস্তর মঞ্চস্থ হয়ে চলছিল। সেসময় ইউরোপীয় আদর্শে কলকাতায় নির্মিত হতে থাকে একের পর এক থিয়েটার। মিসেস ব্রিস্টোর প্রাইভেট থিয়েটার (১৭৮৯), হোয়েলার প্লেস থিয়েটার (১৯৯৭), চৌরঙ্গী থিয়েটার (১৮১৩), টাউন হল (১৮১৪), খিদিরপুর থিয়েটার (১৮১৫), দমদম থিয়েটার (১৮১৭) ইত্যাদি নানা নাট্যমঞ্চ। গ্রাম গঞ্জে নানাভাবে টিকে থাকে পাঁচালি, কবিগান, কৃষ্ণযাত্রা, পালা ইত্যাদি। এদেশীয় বাঙালিদের দ্বারা ইউরোপীয় স্টাইলে প্রথম নাট্যশালা স্থাপিত ১৮৩১ সালে। বাঙালিদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ থিয়েটার বেলগাছিয়া নাট্যশালা (১৮৫৮)। যার সঙ্গে মধুসূদনের নাট্যরচনার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্র অনুকৃত কিছু মঞ্চ জমিদারশ্রেণির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকলেও বাংলায় আবহমান রীতির নাটকগুলো স্থায়ী বা অস্থায়ী মঞ্চ বানিয়েই উপস্থাপিত হতো। ঐতিহ্যবাহী এ অভিনেয় ধারাগুলো ব্রিটিশ আনুকূল্য কখনোই পায় নি। এমনকি ইতিহাসকরণেও চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ধারা। সেলিম আল দীন তার ‘বাঙলা নাট্যকোষ’ গ্রন্থে ভূমি সমতল বৃত্তমঞ্চ, চৌকোণ খোলা মঞ্চ, চৌপথ খোলামঞ্চসহ নানা মঞ্চ বিন্যাসের চিত্র তুলে ধরেছেন। ব্রিটিশ শাসনে ইউরোপীয়রা প্রসেনিয়াম মঞ্চই স্থাপন করে সর্বত্র।

ধীরে ধীরে ইউরোপীয় প্রসেনিয়াম রীতিই জয়জয়কার হয়ে ওঠে। নাট্যমূল্যায়ন হয়ে ওঠে দ্বন্দ্বনির্ভর কাহিনি ও চরিত্রাভিনয়ের খেলায়। ‘ন্যাশনাল থিয়েটার’ নামে ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর বাংলায় প্রথম সাধারণ রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠা পায়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পূর্ববঙ্গেও একই আদলে পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি (১৮৬৫), ক্রাউন থিয়েটার (১৮৯০-৯২), ডায়মন্ড জুবিলি থিয়েটার (১৮৯৭) মঞ্চ স্থাপিত হয়। ধীরে ধীরে শতক ধরে প্রতিভাবান নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র, মীর মশাররফ হোসেন, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, বিজন ভট্টাচার্য, তুলসী লাহিড়ী, উৎপল দত্ত প্রমুখের স্পর্শে নতুন আরেক গতি লাভ করে নাট্যচর্চা। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকের সেসময় পূর্ববঙ্গে পালা নাট্যের অসম্ভব জনপ্রিয়তা ছিল। বিংশ শতকের শুরুতে দীনেশচন্দ্র সেন চন্দ্রকুমার দে’র সহায়তায় প্রচলিত কিছু পালা নিয়ে ‘মৈয়মনসিংহ গীতিকা’ শিরোনামে প্রকাশ করেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে নাট্য ব্যাপক বৃদ্ধি পায়।

মুকুন্দ দাস স্বদেশী যাত্রা নিয়ে দর্শক সম্মুখে আসেন। ১৯৪২ সালে সাংস্কৃতিককর্মী সোমেন চন্দর নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন দানা বাঁধে। মার্কসবাদের বিস্তার, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, শ্রেণিসংগ্রাম ইত্যাদি নানা চেতনার কলকাতা কেন্দ্রিক ‘গণনাট্য’ নামে নতুন এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। শুরু হয় গ্রুপ থিয়েটারচর্চা। বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’, তুলসী লাহিড়ীর ‘ছেঁড়াতার’ অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায় এ সময়। এগুলো উপস্থাপনকৌশলের প্রবণতা ইউরোপীয়। ১৯৪৭ পরবর্তী পূর্ববাংলায় সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, মুনীর চৌধুরী, সাঈদ আহমেদ, শওকত ওসমান, জিয়া হায়দার, আসকার ইবনে শাইখ, নূরুল মোমেন প্রমুখের লেখনীর স্পর্শে বাংলা নাটক হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য।


অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, হাজার বছরের গৌরবান্বিত নাট্য-ঐতিহ্যের অধিকারী বাঙালি হলেও বাংলাদেশে এখনো ঐতিহ্যের ধারায় চারদিকে দর্শকবেষ্টিত মধ্যমঞ্চ স্থাপিত হয় নি।


স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্যপরিবেশনা শহর পর্যায়ের মূল স্রোত প্রধানত ইউরোপীয় রীতি দ্বারাই তাড়িত হলেও গত নব্বই দশক থেকে ঐতিহ্য বিকাশী প্রবণতা বিশেষ মাত্রা লাভ করেছে। শিল্পকলা কেন্দ্রিক নাট্যচর্চা, পথ নাট্যচর্চা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাঙ্গনের নাট্যচর্চা এবং বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ের নাট্যচর্চা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় উদ্ভাসিত। আবার এ নাটকগুলো ইউরোপীয় প্রসেনিয়াম, দর্শক মধ্যমঞ্চে উপস্থাপন, খোলাস্থানে উপস্থাপন নানা বৈশিষ্ট্যমুখী। সমকালীন বাংলাদেশের নাট্য পরিবেশনা রীতি আবার দুটো পর্যায় কেন্দ্রিক ক্রিয়াশীল। একটি শহর পর্যায়ে। যার প্রধানতম উপস্থাপন মাধ্যম হয়ে ওঠে প্রসেনিয়াম ধারা। আরেকটি গ্রামীণ পর্যায়ে যার অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে আবহমান ঐতিহ্যবাহী ধারা। গ্রামীণ পর্যায়ে পালা জারি যাত্রা ইত্যাদি প্রায় সমস্ত পরিবেশনাই চারদিকে দর্শকবেষ্টিত আসরকেন্দ্রিক পরিবেশনা রীতিতে উপস্থাপিত। এখনো বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে পালা, যাত্রা, ঢপযাত্রা, রায়কীর্তন, রামলীলা, কুশানগান, নটপালা, কালীকাচ, পদ্মপুরাণ গান, ভাসান যাত্রা, কান্দনী বিষহরির পালা, ইমামযাত্রা, জারিগান, গাজী পীর, মানিক পীর, গান, জারিগান, কিচ্ছা গান, বিচ্ছেদী গান, আলকাপ, গম্ভীরা, সঙযাত্রা, কবিগান ও বিচারগান, পুতুল নাচ, মহররমের জারি ইত্যাদির চর্চা দুর্দান্ত প্রতাপে বিদ্যমান।

নব্বইয়ের দশক থেকে ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। সেলিম আল দীন তার নাট্যে উপনিবেশের জ্ঞান ও করণকৌশলকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করেন। নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন ‘ঢাকা থিয়েটার’ মধ্যযুগের বাংলা সংস্কৃতির পাঁচালি কথকতা বর্ণনার ধারায় বর্ণনাত্মক নাট্যকৌশলের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তবে উপস্থাপনায় প্রসেনিয়াম মাধ্যমকেই আশ্রয় করেছেন। সৈয়দ জামিল আহমেদ নির্দেশিত ‘বিষাদ সিন্ধু’ ‘কমলারানীর সাগরদিঘি’ ‘বেহুলার ভাসান’ ‘সং ভং চং’ ‘রিজওয়ান’ প্রভৃতি নাটকে ইউরোপীয় প্রসেনিয়াম ধারাকে ভেঙে দিয়েছেন। ‘বেহুলার ভাসান’ উপস্থাপনায় ফিরে গেছেন গ্রামীণ আসরকেন্দ্রিক পরিবেশনায়। আবহমান বাংলার নাট্যরীতিতে অর্ধশতাধিক প্রযোজনা এখনো শহর পর্যায়ে নিয়মিত মঞ্চায়ন হয়ে যাচ্ছে। নানা দলের নানা নাটকেই নানাভাবে নিরীক্ষা লক্ষ্য করা যায়।

আবহমান বাংলার ঐতিহ্যিক নাট্যরীতি মূলত নৃত্য-গীত-কাহিনি-অভিনয় ও দৃশ্যকল্পের অদ্বৈত বিন্যাস। চারদিক দর্শকবেষ্টিত মধ্যমঞ্চে তার প্রধানতম উপস্থাপন কৌশল। এখনও বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে পালা-জারি-যাত্রাগুলো চারদিকের দর্শকবেষ্টিত অস্থায়ী মধ্যমঞ্চে উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, হাজার বছরের গৌরবান্বিত নাট্য-ঐতিহ্যের অধিকারী বাঙালি হলেও বাংলাদেশে এখনো ঐতিহ্যের ধারায় চারদিকে দর্শকবেষ্টিত মধ্যমঞ্চ স্থাপিত হয় নি। ‘জাতীয় নাট্যশালা’ শিরোনামে স্থাপিত মঞ্চ ইউরোপীয় প্রসেনিয়াম এবং তাতে ইউরোপীয় জ্ঞানতত্ত্বের চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতাই প্রধানরূপে প্রতীয়মান। অথচ ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যরীতির রয়েছে উঁচুতর দার্শনিক ভিত্তি। প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ হয়ে সমকালীন পর্যায়ে বহমান বাঙালির পরিবেশনা ঐতিহ্যে নৃত্য-গীত ও অভিনয়ের এমন অদ্বৈত সুসমৃদ্ধ শিল্পরূপ অন্যকোনো জাতিসত্তায় পাওয়া দুরূহ। বন্দনা, বর্ণনা ও কথন, উক্তি-প্রত্যুক্তিসহ নানা শিল্পসম্মিলনে সৌন্দর্যবোধের অনন্যতায় বাংলা নাট্য। যা দর্শকবেষ্টিত স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী মঞ্চে পরিবেশিত হতো। এগুলো বিষয় বৈচিত্র্যে যেমন অনন্য, তেমনি পরিবেশনারীতিতেও বহুমাত্রিক। হাজার বছরের বাংলা নাট্য সংস্কৃতি পাশ্চাত্য কিংবা সংস্কৃত থেকেও পৃথক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বাংলার নিজস্ব ধারার নাট্যরীতির উত্তর-আধুনিক চর্চা জাতিগত শিল্প সাহিত্যের সমৃদ্ধি এনে দিতে পারে। হাজার বছরের নাট্যরীতির আলেখ্যে বাংলাদেশের নিজস্বতার বিকাশ ঘটুক তা আমাদের প্রত্যাশা।

আবু সাঈদ তুলু

জন্ম ১ মার্চ, ১৯৭৯; জামালপুর । তিনি শৈশব থেকেই সাহিত্য-শিল্পের প্রতি অনুরাগী। দীর্ঘদিন ধরে নাটক, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখে আসছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।

প্রকাশিত বই :

লিপির উদ্ভব, ক্রমবিবর্তন ও বাংলা লিপির পরিণত পর্যায় [প্রবন্ধ; অন্তরীপ পাবলিকেশন, ২০০৭]
বিপ্রলব্ধ [উপন্যাস; শিখা প্রকাশনী, ২০০৮]
রূপান্তরবাদ [শিখা প্রকাশনী, ২০০৯]
অনন্তপথের যাত্রী [ভাষাচিত্র, ২০১৪]
জলের আয়না [ভাষাচিত্র, ২০১৫]
পাতার বাঁশি [লিটলবিট, ২০১৭]
সেলিম আল দীনের সাহিত্য ভাবনা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮]

ই-মেইল : tuluart@yahoo.com