হোম গদ্য বইমেলার অভিজ্ঞতা : খেলা খেলা

বইমেলার অভিজ্ঞতা : খেলা খেলা

বইমেলার অভিজ্ঞতা : খেলা খেলা
1.35K
0

প্রথম প্রকাশ হিসাবে একচোটে দুইখানি বই একই প্রকাশনী হইতে বাহির হওয়ার ঘটনা বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম না দ্বিতীয় উহা জানি নে, তবে বিরল তো বটেই; ফলে এই বিরল ঘটনার সহিত আমার নাম জড়াইয়া যাওয়াতে আমি কিছুটা বিব্রত এবং কিছুটা উচ্ছ্বসিত। যে বই দুইখানির বদৌলতে ক্ষদ্রাতিক্ষুদ্র আমার নাম ইতিহাসের পাতায় জড়াইয়া গিয়াছে উহার নাম যথাক্রমে এক. শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম [ছোটগল্প] দুই. বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা [উপন্যাস]। বিব্রত কারণ—যেই দেশে বই পড়িবার রেওয়াজ ক্রমাগত নিম্নগামী সেই দেশের মানুষের জন্য বই বাহির করিয়া পড়িবার আহবান জানানোটা হয় বোকামি নয়তো নিজের প্রতি নিজের অধিক আস্থা আর উচ্ছ্বসিত হওয়ার কারণ হইল, যাহা বাহির হইবার তাহা বাহির হইয়া যাওয়ার কারণে লেখক হিসাবে আমি কিঞ্চিৎ দায়মুক্ত; উপরন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ফুরফুরাভাবেই রহিয়াছি এবং ভাবিতেছি নববর্ষার জলে ক্ষেতের আইল ধরিয়া বইজাল পাতিয়াছি, পাঠকমাছ সেই জালে আটইকাইয়া থাকিবে, ক্ষণে ক্ষণে উজাল দিয়া তাহাদের সহিত গভীর রিস্তা পাতিব; রিস্তা তামাম জিন্দেগিভর টিকিয়া থাকিবে!


দেখিলাম, ঝলমলে আলোর দুষ্টু রোদ লাস্যময়ী এক তরুণীর পিছু লইয়াছে, পরনে তাহার হলুদ শাড়ি!


মানবজনম যেমন একটা খেলা তেমনি ইহাও একটা খেলা বলিয়াই মনে হইতেছে। অবশ্য ভ্রম হইলে হইতেও পারে। তো প্রথমবারের মতো এই খেলা উপভোগ করিবার সৌভাগ্য আমার হইয়াছে বলিয়া আমি ধন্য। একজন টিভি নাট্যকার হিসেবে অনেকবার টিভিতে সাক্ষাৎকার দিয়াছি, খবরের কাগজেও বহুবার নিজের সুরত বাহির হইয়াছে—সেই সুবাদে মনের ভিতর তালের শাঁসের মতো মৃদু অহংকার পলি হইয়া জমিয়া জমিয়া উহা প্রায় শক্ত হইতে শুরু করিয়াছিল, তখনই বইমেলা’ ১৮ আসিল। সাজিয়া-কাজিয়া মেলায় প্রবেশ করিবার প্রথম দিনই অহংকার-পলি টুটিয়া গেল, মেলা গেইটে। পকেটের ভিতর দাহ্য পদার্থের গুরু রহিয়াছে—এই অজুহাতে দ্বার প্রহরী ঠেলামামা অপরাপর দর্শনার্থীদিগকে ঠেলিয়া ভিতরে পাঠাইয়া দিলেও আমায় আটকাইয়া দিলেন। কারণ গুরু লইয়া মেলাপ্রাঙ্গনে প্রবেশ করা যাইবে না, উহাকে ফেলিয়া দিয়া যাইতে হইবে। ঘটনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া এক পর্যায়ে নিজেই দাহ্য পদার্থ হইয়া বলিলাম, উহা ফেলিব কেন, যাহার একেক শলাকার দাম ১১ টাকা? টাকা কি গাছের পাতা নাকি ঘুষ খাইয়া উৎপন্ন করিয়াছি? ঠেলামামা বলিলেন, বাংলা একাডেমি ইহাই নির্দেশ বাতাইয়াছে। কহিলাম, ঠিক আছে, তবে উহা আপনি নিজের হেফাজতে রাখিয়া একটি কুপন দিন, কুপন ফেরত দিবামাত্রই যাহাতে আমার মাল আমি বুঝিয়া লইতে পারি। ঠোলামামা কহিলেন, সম্ভব নহে, আমরা ডিউটি দিতে আসিয়াছি, আমাদিগকে যাহা বাতানো হইয়াছে আমরা তাহাই বাতাইব, বাতাইতে বলা ব্যতিত অন্য কিছু বাতানোর সাধ্যি নাহি। আপনার কিছু কহিবার থাকিলে সরাসরি বাংলা একাডেমির মুখোমুখি হউন। আমি কহিলাম, দেখুন ধূম্রজাল গ্রহণ এবং ত্যাগ করা আমার নাগরিক অধিকার, উপরন্তু মনে রাখিবেন—ধূমপান খারাপ বটে; নিষেধ নহে—এই কথাটা আপনার মাধ্যমে বাংলা একাডেমিকে জানানো হইল আর আমার গুরু-প্যাকেট যেইখানে রাখিয়া যাইব ফিরিবার সময়ে ঠিক সেইখানেই থাকিতে হইবে—নড়চড় হইলে চলিবে না—এই বলিয়া যখন চেহারা ও হাঁটন-বাটনে তারকা তারকা ভাব ফুটাইয়া ভিতরে প্রবেশিলাম—ঠেলামামারা তখন আমাকে লইয়া কানাঘুষা করিতেছেন, উহাতে ভ্রূক্ষেপ না করিয়া সামনের দিকে হাঁটিতে লাগিলাম—দেখিলাম, ঝলমলে আলোর দুষ্টু রোদ লাস্যময়ী এক তরুণীর পিছু লইয়াছে, পরনে তাহার হলুদ শাড়ি!

নজরুল মঞ্চ পার হইবার ঠিক একটু পরেই সাংবাদিক আমার বুক বরাবর বুমপিস্তল তাক করিয়া জিজ্ঞাসিলেন, আপনি কী মনে করিয়া জমজ সন্তান প্রসবিলেন? সাংবাদিকের আঁতকা প্রশ্ন শুনিয়া উহার দিকে আমি অগার মতো ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকাইয়া রহিলাম, এ বেটা কী কহিতেছে, আগামাথা কিছুই তো বুঝিতে পারিতেছি না। শেষে তিনি নিজেই গোমর ফাঁক করিয়া আমাকে উদ্ধার করিলেন, জমজ সন্তান বলিতে দুইটা বই একবারে বাহির করাকে বোঝানো হইয়াছে। এতক্ষণে আসল ব্যাপার হৃদয়াঙ্গম করিতে পারিয়া কহিলাম, ও আচ্ছা আচ্ছা, ব্যাপার কিছুই নহে, গল্পগ্রন্থে ১৯৯৮ সালে লেখা ‘চাল ডাল লবণ তেল ও ধর্মাচার’ নামক একখানি গল্প যেমন রহিয়াছে তেমনি রহিয়াছে ২০১৭ সালে লেখা গল্প ‘ফেইসবুক লাইভ।’ প্রায় ১৮ বছরের ক্ষুদ্র একটা জার্নি আর কী! অন্যদিকে বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা উপন্যাসটি অনেক পরের লেখা। উপরন্তু ইহা একটা বাণিজ্যিক-চিন্তা প্রসূত বই। ফলে গুরুত্ব বিচারে গল্পগ্রন্থটি অগ্রাধিকার পাওয়াই স্বাভাবিক। যদিও প্রকাশক উপন্যাসখানিই শুধু বাহির করিতে চাহিতেছিলেন। আমি আমার মনের ব্যাপারটা খুলিয়া বলিলাম, গল্পগ্রন্থ বাদ দিয়া উপন্যাস বাহির করিলে মনোতৃপ্তিতে ব্যাঘাত ঘটিবে, শুনিয়া প্রকাশক সাহেব তাহার বরিশাল্যা সুরে একটামাত্র শব্দই শুধু বলিয়াছিলেন, ‘ও অইবে।’ তাহার পর সত্যি সত্যিই দুইখানি বই বাহির হইয়া গেল, আজ অবধি সেই মুগ্ধতার সহিতই মাখামাখি জড়াইয়া রহিয়াছি। যেন শরৎ আকাশে শাদা শাদা মেঘে ভাসিতেছে রেশমতুলা, ক্ষণে ক্ষণে আনন্দরোল বাজিতেছে—মিঞাও মিঞাও!

26993491_10210446529071454_8746274089172011907_n
মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

আরেক দিন সাংবাদিক শিমুল সালাহ্উদ্দিন লাইভ সাক্ষাৎকারের প্রথম প্রশ্নে আমাকে ধরাশায়ি করিয়া ফেলিলেন, আমি কেন রম্যসাহিত্যে ঢুকিলামন? সাংবাদিকের প্রশ্ন শুনিয়া আমি মহাঅগার মতো ভাবিতে লাগিলাম কী উত্তর দেওয়া যায়। ভাবিতে ভাবিতে একটা জুতসই উত্তর পাইয়া গেলাম। বলিলাম, বাংলাদেশ রম্যসাহিত্যের জন্য একটা উর্বর ভূমি। উত্তর শুনিয়া সাংবাদিকের বুমপিস্তল কিঞ্চিৎ নড়িয়া-চড়িয়া উঠিল। আমি এমনিতেই ভয়ে একসার হইয়া ছিলাম, বুম নড়িয়া ওঠামাত্র আঁতকাইয়া উঠিলাম। সাংবাদিকের দিকে তাকাইয়া উহার বদনখানি প্রসন্নই দেখিলাম। অর্থাৎ ভয়ের কিছু নাই। আমি বলিয়া চলিলাম রম্যসাহিত্য রচিবার উপকারী দিকসমূহ।

সাক্ষাৎকার শেষ হইতেই উন্মাদ সম্পাদক আহসান হাবীবের সহিত দেখা হইয়া গেল। উনি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করিয়া উন্মাদ স্টলে যাইতেছিলেন। বলিলাম, হাবীব ভাই, টিভি ক্যামেরার সম্মুখে ফশ করিয়া মারাত্মক একখানা কথা বলিয়া ফেলিয়াছি। উনি জিজ্ঞাসিলেন, কী বলিয়াছেন? যাহা বলিয়াছি তাহা বলিলাম। শুনিয়া হাবীব ভাই বলিলেন, না না না, আপনি ঠিকই বলিয়াছেন। এখন হইতে আমিও এই কথাটা বলিব!

তুচ্ছ এক মহিউদ্দীন আহ্‌মেদের ক্ষুদ্র একখানি কথা যখন আহসান হাবীবের মতো বড় মানুষ নিজের করিয়া লইলেন তখন বুঝিলাম, তবে মন্দ বলি নাই! মনে প্রভূত আনন্দ লইয়া মেলায় মিশিয়া গেলাম।

জীবনে অটোগ্রাফ একবারই লইয়াছিলাম আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের নিকট হইতে, তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সে সময় খোয়াবনামা লিখিতেছেন। তিনি একদিন আমাকে বিশ্বাসাহিত্য কেন্দ্রে যাইতে পরামর্শ দিয়াছিলেন। আমি ওখানে গিয়া বইপড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়া প্রথম দিনই অটোগ্রাফ নামক বিল্যাইটিকে মারিয়াছিলাম।


সারাজীবন সিরিয়াসসাহিত্য রচনা করিলাম কেহ চেখেও দেখিল না অথচ একখানি রম্যরচনা (!) লিখিয়া রম্যসাহিত্যের তকমা পাইয়া গেলাম। মন্দ নহে। চলে।


অন্যদিকে, জীবনে একবারই অটোগ্রাফ দিয়াছিলাম তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। বন্ধুবর বারীণ ঘোষ নেত্রকোনাস্থ শিল্পকলা একাডেমিতে মৎ রচিত ‘ঘুম ভূত পিঁপড়া’ নামক একখানি মঞ্চনাটক ডিরেকশন দিয়া মঞ্চস্থ করিয়াছিলেন। সেই সন্ধ্যায় আমি ছিলাম আমন্ত্রিত অতিথি। মনে আছে, আমাকে মঞ্চে ডাকিয়া লইয়া ফুলের তোড়া হাতে ধরাইয়া দিয়া বক্তব্য দিতে বলা হইয়াছিল। পুরো ঘটনা মনে থাকিলেও কী বলিয়াছিলাম তাহা মনে নাই। শুধু এইটুকু মনে রহিয়াছে, মঞ্চে দাঁড়াইয়া আমার পা কাঁপিতেছিল, কণ্ঠও কাঁপিতেছিল। যাই হোক, শো শেষে যখন বাহিরে আসিয়া স্থানীয় জ্ঞানী-গুণীদের প্রশংসা গিলিতেছিলাম তখনই ঘটিয়াছিল সেই ঘটনা—নবম বা দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া অপূর্ব সুন্দরী এক বালিকা আমার সামনে খাতা-কলম ধরিয়া সিনেমাটিক স্টাইলে অস্ফুট কণ্ঠে বলিয়াছিল, ‘অটোগ্রাফ প্লিজ!’—ঘটনাখানি স্মৃতির অতল গহ্বরে তলাইয়া গিয়াছিল, মহাত্মা সোহেল হাসান গালিবের পত্রিকার জন্য এই রচনা লিখিতে বসিয়া পুরনো স্মৃতি মনে পড়িল, দেখিলাম, সেই বালিকাটির হাস্যোজ্জ্বল পবিত্র মুখাবয়ব আমার মস্তিষ্কের এক কোণায় সহিসালামতেই রহিয়াছে। ইহার অনেক দিন পরে, ২০১৮ সালের পুরো ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী অটোগ্রাফ দেওয়ার সৌভাগ্য হইল। শুধু অটোগ্রাফ নহে সাথে ফটোগ্রাফও। পাঠক-বন্ধুগণ সেলফি তুলিয়া ফেসবুকে শেয়ার করিয়া পুরো ফেব্রুয়ারি মাস আমাকে পথের দিশা দিয়াছেন। এখনো সেই দিশা লইয়া ঘুরিফিরি, ঘুমাই। কখনো দিবাস্বপ্নে কিংবা রাত্রিস্বপ্নে ঘুরিতে যাই বইমেলাতে! দেখিতে পাই, বড়ভাই-বন্ধু খালিদ সাইফ আমার লাগি অপেক্ষা করিয়া আছেন কিংবা আমি তাহাকে হন্যে হইয়া খুঁজিতেছি।

মেলাখেলা শেষ হইবার পর আমাকে বলা হইতেছে, আমি নাকি রম্য লেখক। সেই মোতাবেক লেখা চাওয়া হইতেছে। ভবতরঙ্গ দেখিয়া-শুনিয়া আমি অভিভূত, আপ্লুত। এক্ষণে প্রয়াত সঞ্জীব চৌধুরীর কথা না কহিলেই নহে। এই বোহিমিয়ান ভদ্রলোক সাংবাদিকতার পাশাপাশি গান করিতেন। তিনি যখন বাপ্পা মজুমদারের সহিত দলছুট নামক একখানি গানের দল গঠন করিয়া গানের অ্যালবাম প্রকাশ করিলেন তখন রাতারাতি তারকা বনে গেলেন। ইহা হইবার পর তিনি আক্ষেপ করিয়া বলিতেন, সারাজীবন সাংবাদিকতা করিলাম, কেহ চিনিল না অথচ কিছু গান গাহিয়া তারকা হইয়া গেলাম। আমার দশা ওইরকম না হইলেও অনেকটা কাছাকাছি হইয়াছে বলিয়া বোধ করিতেছি। আমি সারাজীবন সিরিয়াসসাহিত্য রচনা করিলাম কেহ চেখেও দেখিল না অথচ একখানি রম্যরচনা (!) লিখিয়া রম্যসাহিত্যের তকমা পাইয়া গেলাম। মন্দ নহে। চলে।

অন্যদিকে প্রকাশকজি বলিতেছেন, আমি নাকি বিরল প্রজাতির সৌভাগ্যবান লেখক যাহার প্রথম বই প্রত্যাশার চাইতেও বেশি বিক্রি হইয়াছে। শুনিয়া আমি মেঘের মতো ভাসিতে যাইব ঠিক তখন বউ আমাকে টানিয়া ধরিলেন, কহিলেন, রহো, কোনটা খুশি করিবার কথা—এখন পর্যন্ত তাহাও বুঝিলে না গো! তাহার পর মৃদু হাসিয়া কহিলেন, নিজের বোকামি সম্পর্কে যে বোকা ওয়াকিবহাল নহে, সে বোকাশ্রেষ্ঠ!

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com