হোম গদ্য ফররুখের কবিতার ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক ও নান্দনিক ভিত্তি

ফররুখের কবিতার ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক ও নান্দনিক ভিত্তি

ফররুখের কবিতার ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক ও নান্দনিক ভিত্তি
2.54K
0

মুহূর্তের কবিতা কাব্যে ‘চল্‌তি ভাষার পুঁথি’ নামে একটি কবিতা আছে। অষ্টকে কবি বাংলা ভাষার এক গতিহীন মুমূর্ষু ছবি এঁকেছেন। ষটকে বদলে-যাওয়া বাংলার এক সজীব প্রাণবান অবস্থার পরিচয় আছে। কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি নিম্নরূপ :

হে জীবন্ত মাতৃভাষা! হলে তুমি মৃত্যুর শিকার।
দুই চোখে নেমে এলো কাল সিয়া রাত্রির আঁধার,
অচেনা পিঞ্জরে দেখি রক্তমাখা প্রাণ শরাহত!
দুঃসহ দুঃখের পালা শেষ হ’ল একদা, যেদিন
মুক্তি পেল জীবনের ভাষা, আর নিরুদ্ধ জবান
জিন্দানের রাত্রিশেষে পেল খুঁজে রোশ্‌নি অমলিন;

এ কাব্যের পরের কবিতা ‘শাহ গরীবুল্লাহ’র শুরুর অংশটা এরকম :

যখন কাহিনী তুমি গেয়ে গেলে চলিত জবানে…
আবরের ছায়া দেখে যেন মত্ত ময়ূরের প্রাণ

ফররুখ এ ধরনের কয়েকটি কবিতায় বাংলা ভাষার যে ইতিহাস প্রণয়ন করেছেন, তাতে বেশ কতকটা কালবিভ্রাট আছে। বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন প্রাচীন ও মধ্যযুগেও যথেষ্ট হয়েছে। কিন্তু ভাষা কৃত্রিম, গুরুভার এবং জনভাষার সাথে সঙ্গতিহীন হয়ে ওঠার ঘটনা সেকালের নয়। এ ঘটনা ঘটেছে কলকাতার সাহিত্যের ‘আধুনিক’ কালে—ঔপনিবেশিক শাসনের প্রত্যক্ষ অভিভাবকত্বে, সাহেব-পণ্ডিতের ঐতিহাসিক যৌথতায় [মোহাম্মদ আজম ২০১৪]। ঘটনাটা শুরু হয়েছিল অন্তত ১৭৭৮ সালে, হ্যালহেডের ব্যাকরণ প্রকাশের মধ্য দিয়ে। তবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সামগ্রিক তৎপরতায় বাংলা গদ্যে তার সর্বাঙ্গীণ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কলকাতার সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই কৃত্রিম প্রতিষ্ঠার বিপরীতে ‘চলিত’ রীতির প্রতিষ্ঠার লড়াই চলেছে দীর্ঘদিন। জ্ঞাতসারে এবং অজ্ঞাতে। বিদ্যাসাগরের ছদ্মবেশী রচনা, আলালের ঘরের দুলাল আর হুতোম প্যাঁচার নক্‌শার প্রকাশ, প্রয়োজনে যে কোনো ধরনের শব্দ ব্যবহারের পক্ষে বঙ্কিমচন্দ্রের সুবিখ্যাত ওকালতি, রবীন্দ্রনাথ ও অন্যদের ব্যাপক-গভীর তৎপরতা—এসব সে লড়াই-সংগ্রামের কয়েকটি দাগমাত্র। ফররুখ এই কালসীমাকে খানিকটা পিছিয়ে দিয়েছেন। আঠার শতকের শেষাংশে ‘দোভাষী পুঁথি’ নামে পরিচিত পুঁথির ভাষায় সাহিত্যচর্চার যে জোয়ার এসেছিল এই বাংলা মুল্লুকে তাকেই তিনি সাব্যস্ত করেছেন ‘চল্‌তি ভাষা’র প্রতিষ্ঠা হিসাবে। তার এই শনাক্তি যে ‘ঠিক’ নয় তার এক প্রমাণ এই যে, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গল-এর বহু অংশে ‘চল্‌তি বাংলা’র নিপুণ ব্যবহার আছে। শব্দরূপ, পদবিন্যাস ও বাগবিধিগত তাৎপর্যে আজকের দিনের নিত্যদিনের ভাষার সাথে ওই বাংলার বিশেষ ফারাক নাই। কিন্তু ফররুখের দাবি ঐতিহাসিকভাবে এক আংশিক সত্য আর ভাবগত দিক থেকে গভীরতর কিছু সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। সেদিকগুলো খতিয়ে দেখা দরকার।

বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিকদের অনেকেই ‘আধুনিক’ জমানার আগেও ‘সংস্কৃত-বাংলা’র সাথে ‘প্রাকৃত-বাংলা’র বিচিত্র টানাপড়েনের হদিশ দিয়েছেন। ‘সংস্কৃত-বাংলা’ ও ‘প্রাকৃত-বাংলা’ কথা দুটো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উনিশ-বিশ শতকের ভাষা-পরিস্থিতি বোঝাতে বিশেষ তাৎপর্যে ব্যবহার করতেন। কিন্তু উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গড়াপেটার আগেও যে ‘সংস্কৃত-বাংলা’র জোর-চর্চা ছিল তার সাক্ষ্য দিচ্ছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং দীনেশচন্দ্র সেন। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের অভিভাবকত্বে চলা সেই চর্চা দীনেশচন্দ্র সেনের মতে হাজার বছরের পুরনো [দীনেশ ২০০৬ : ৪০৩]। সংস্কৃত-নির্ভর অভিজাত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নদীয়ার উপভাষায় সংস্কৃত শব্দের পরিমাণ বেড়েছিল—এ সাক্ষ্য দিয়েছেন গ্রিয়ারসন [গ্রিয়ারসন ১৯০৩ : ১৮)] নদীয়ার ওই ভাষাই নানা ঐতিহাসিক বাস্তবতায় কলকাতার ‘প্রমিত বাংলা’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে কলকাতায় উনিশ-বিশ শতক জুড়ে চল্‌তি বাংলার যে লড়াই চলেছে, যার সবচেয়ে বিখ্যাতটি প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল, তা এক প্রকারের চল্‌তি বাংলা মাত্র। একমাত্র নয়। ফররুখ আহমদ এবং অন্য অনেকে দাবি করেছেন, চল্‌তি বাংলার এরকম এক উৎসারণ ঘটেছিল আঠার শতকের শেষাংশে, কথিত পুঁথিসাহিত্যের চর্চার মধ্য দিয়ে। তাদের ওই দাবির পক্ষে অন্তত দুই প্রস্ত কড়া সমর্থন খোদ ইতিহাসেই পাওয়া যাচ্ছে।

এক. সেকালের চালু বাংলার যেসব নমুনা নানান সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে, তার সাথে কথিত পুঁথির ভাষার বেজায় মিল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এ ভাষাকে বলতেন ‘বিষয়ী লোকের ভাষা’ [হরপ্রসাদ ২০০০ : ৫৬২]। তার মানেই হলো, এ ছিল বাংলা অঞ্চলের জীবনযাপনের সাথে সংশ্লিষ্ট দৈনন্দিন ভাষা। আনিসুজ্জামান [১৯৮২] ও দেবেশ রায় [১৯৮৭] পুরানা বাংলা গদ্যের যেসব নথিপত্র প্রকাশ করেছেন, তা থেকে পুরোমাত্রায় এ কথার সমর্থন মেলে। এমনকি আনিসুজ্জামান তার অন্য বইতে আদালতের ভাষার যে উদাহরণ দিয়েছেন [আনিসুজ্জামান ১৯৮৪ : ৮৬-৮৭], তাও নিঃসংশয়ে প্রমাণ করে, উনিশ-বিশ শতকের কলকাতায় স্বীকৃতি না মিললেও বা তদ্দিনে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ভদ্রলোকি বাংলা ভাষার রসায়ন আমূল বদলে গেলেও ওই ভাষাটি চল্‌তি বাংলাই বটে।

দুই. কথিত মুসলমানি পুঁথি বা দোভাষী পুঁথিগুলোর বিপুল পাঠক ছিল সাধারণ বাঙালি জনতা। এ ধরনের বই-বিক্রির যে পরিমাণ ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্যসূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায়, তা এক কথায় বিস্ময়কর। এগুলোর লেখক-পাঠকদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা বেশি ছিল, কিন্তু হিন্দু পাঠকও ছিল প্রচুর; আর লেখক-তালিকায়ও যথেষ্ট হিন্দু নাম পাওয়া যাচ্ছে। শুধু তাই নয়। এ ধরনের একটি ‘চল্‌তি’ বা ‘কেজো’ বাংলা যে গড়ে উঠল—ক্ষমতাসম্পর্কের বদলের পর যে ভাষা নিন্দিত হবে ‘মুসলমানি বাংলা’ বলে—তার পেছনে খুবই কার্যকর প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল বাংলার কায়স্থ কেরানিকুল [উব ১৯৬২: ২৫৩-৫৪]।

ফররুখ আহমদের কবিতা নিয়ে আলাপকালে এ প্রসঙ্গ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ফররুখসহ বাংলাদেশের চল্লিশের দশকের কবিদের একটা বড় অংশ কাব্যভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে তারা নানা তরফ থেকে নিন্দার ভাগি হয়েছিলেন। নিন্দাটা প্রধানত হয়েছিল ‘বিদেশি’ শব্দ ব্যবহারের বাড়াবাড়ির কারণে। ‘বিদেশি’ শব্দ ব্যাপারটা সকল পক্ষের মনে এতটাই বদ্ধমূল ছিল যে, ওই কবিকুলেরই একজন—সৈয়দ আলী আহসান—নিজের এবং ফররুখের কবিতা সম্পর্কে আলোচনায় এ ব্যাপারটাকেই প্রধান করেছিলেন :

আমি এক সময় কবিতায় প্রচুর আরবী-ফারসী শব্দ ব্যবহার করেছি একটি বিশেষ পরিমণ্ডল নির্মাণের উদ্দেশ্যে। … সে-সব শব্দ তাদের নিজস্ব লৌকিক এবং ঐতিহাসিক রূপকল্পে এবং ব্যঞ্জনায় আমার কাছে উপস্থিত হয় নি। সে-সব শব্দের নিজস্ব ভাষাগত অর্থের বিস্তার এবং গভীরতা সম্পর্কে আমার কোনও জ্ঞান ছিল না। …

ফররুখ আহমদ এভাবেই রোমান্টিক আবহ নির্মাণ করেছে ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থে। দেখা যাবে যে, আরবী-ফারসী শব্দ এক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করেছে তাদের নিজস্ব অর্থের অধিকারে নয়, কিন্তু বাংলা শব্দের ধ্বনিতরঙ্গের সাযুজ্যে। … কিন্তু যেহেতু এ-শব্দগুলো তাদের নিজস্ব লৌকিক এবং ঐতিহাসিক অধিকারে বাংলা কাব্যে প্রবেশ করছে না, তাই তাদের মনোমুগ্ধকর ধ্বনি-প্রবাহ একটি রীতির বন্ধনে সর্বসময়ের জন্য কবিকে আবদ্ধ রেখেছিল। [সৈয়দ আলী ১৯৮৪]


মোগল-পাঠান শাসনকে ‘বিদেশি শাসন’ হিসাবে সাব্যস্ত করা, মুসলমানদের ‘বিদেশি’ হিসাবে চিহ্নিত করা এবং আরবি-ফারসিকে ‘বিদেশি’ শব্দ হিসাবে বিতাড়ন করা আসলে একই প্রক্রিয়ার তিন রূপ মাত্র।


ফররুখ আহমদের কবিতা উত্তরকালে ‘একটি রীতির বন্ধনে সর্বসময়ের জন্য’ আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল—এ কথাটা বিচিত্রভাবে বলা হয়েছে। সৈয়দ আলী আহসান তার নিজস্ব পদ্ধতিতে সে অবস্থার একটা নন্দনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ ব্যাখ্যা মূল্যবান হতেও পারে। কিন্তু যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে তিনি ব্যাখ্যাটা করেছেন, তা বিভ্রান্তিকর। কারণ তার ভিত্তিটি হলো ‘বিদেশি’ শব্দ। ফররুখের কবিতার ব্যাপারে বিপুল পাঠকের অনীহা আছে এ কারণে যে, তারা আরবি-ফারসি প্রভৃতি ‘বিদেশি’ শব্দের ‘বেশি’ ব্যবহার অপছন্দ করেন। এ ধরনের শব্দ ব্যবহারে আহসানের কোনো আপত্তি নাই; কিন্তু তিনিও শব্দগুলোকে ‘বিদেশি’ শব্দই মনে করেন। ভাষাবৈজ্ঞানিক দিক থেকে ‘বিদেশি’ শব্দের ধারণা কুসংস্কার মাত্র। কারণ কোনো বিদেশি শব্দ আদতে কোনো ভাষায় থাকতেই পারে না। গৃহীত হওয়ার সময় ঋণী ভাষার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য মেনেই ওগুলো ভাষায় প্রবেশ করে। কালক্রমে জনগোষ্ঠীর নিত্যদিনের ব্যবহারে শব্দগুলোর নানামাত্রিক পরিবর্তন হয়। বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণের অন্যতম গোড়ার গলদ এই ‘বিদেশি’ শব্দের ধারণা। ধারণাটি তৈরি হয়েছিল উপনিবেশিত সাম্প্রদায়িকতাপুষ্ট কলকাতায়, যেখানে রীতিমতো আরবি-ফারসির অভিধান প্রণয়ন করে ভাষা থেকে চালু আরবি-ফারসি শব্দগুলো বিতাড়ন করা হয়েছিল। মোগল-পাঠান শাসনকে ‘বিদেশি শাসন’ হিসাবে সাব্যস্ত করা, মুসলমানদের ‘বিদেশি’ হিসাবে চিহ্নিত করা এবং আরবি-ফারসিকে ‘বিদেশি’ শব্দ হিসাবে বিতাড়ন করা আসলে একই প্রক্রিয়ার তিন রূপ মাত্র। বিশ শতকের চল্লিশের দশকের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া প্রকৃতপক্ষে সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ফল। আমরা পরে দেখব, ফররুখের কবিতা তার জনগোষ্ঠীর ওই সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার সর্বোত্তম প্রকাশ।

আবার আসা যাক কবিতায় শব্দ ব্যবহারের প্রকৃতি প্রসঙ্গে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার ১৯২৬-এর মহাগ্রন্থ ওডিবিএলে জানাচ্ছেন, বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের মুখের ভাষায় অন্তত আট শতাংশ আরবি-ফারসি আছে। মুসলমানদের ভাষায় এ সংখ্যা, তার মতে, আরো বেশিই হওয়ার কথা। তাহলে চালু বাংলায় এ ধরনের শব্দ যতটা আছে কবিতার ভাষায়ও ততটা বা কাছাকাছি হওয়া খুব অস্বাভাবিক হতো না। ‘আধুনিক’ বাংলা কবিতার প্রভাবশালী ধারায় সে ঘটনা যে ঘটে নি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আরবি-ফারসি শব্দ যে প্রায় শূন্যের কোটায়, আর মোহিতলাল-সত্যেন্দ্রনাথ-নজরুলের ব্যবহার যে বিবেচিত হয়ে আসছে মুখ্যত সৌন্দর্যবর্ধক আবহসংগীত হিসাবে, তাতে প্রমাণিত হয়, বাংলা কাব্যভাষার ওই উপভাষাটি অনেকদূর পর্যন্ত জনবিচ্ছিন্ন। ফররুখ আহমদরা লোকপ্রচলিত আরবি-ফারসি কাব্যভাষায় আত্মসাৎ করে পূর্বগামীদের সাম্প্রদায়িকতা কমাতে পারতেন, এবং জনবিচ্ছিন্ন কবিভাষাকে অধিকতর জনলগ্ন করতে পারতেন। কিন্তু তারা তা পারেন নি। মুসলমানিত্বের সাথে তারা হিন্দুত্ব বা অপরাপর ধর্মাবলম্বী বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমন্বয় করতে পারেন নি। ‘আরবি-ফারসি’ জনভাষায় তালাশ না করে তারা গেছেন প্রধানত পুরনো পুঁথির দিকে।

পুরনো পুঁথির ভাষার নতুন কাব্যিক ব্যবহার—এ ঘটনাকে নানাভাবে দেখার সুযোগ আছে। সৈয়দ আলী আহসান থেকেই একটা উদাহরণ দেয়া যাক। আহসান বৈষ্ণব কবিতার নানা অনুষঙ্গ তার উত্তরকালীন কবিতায় ব্যবহার করেছেন। ওই অনুষঙ্গগুলো পাঠক বুঝতে পারবে কেবল বৈষ্ণব কবিতার সাথে তার নিবিড় পরিচয়ের দৌলতে। একথা অন্যভাবে, ধরা যাক, বিষ্ণু দে’র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যিনি শেক্সপিয়রের চরিত্র অনুষঙ্গ হিসাবে ব্যবহার করেছেন কবিতায়, কিংবা শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে, যিনি বিপুল পরিমাণ পশ্চিমা মিথ-কাহিনি এবং মিথ-আশ্রয়ী নামপদ ব্যবহার করেছেন। এ কবিতাগুলো বোঝার জন্য উৎস-টেক্সটগুলোর সাথে পরিচয় থাকা জরুরি। তাহলে ফররুখ আহমদের কবিতা পড়ার জন্য যদি গোলেবকাওলি বা আলেফ লায়লার সাথে পরিচয়ের প্রয়োজন হয়, সমস্যা কোথায়? গোলেবকাওলি বা আলেফ লায়লার ক্ষেত্রে বরং বলার অবকাশ আছে যে, এগুলো একসময় হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বিপুল সংখ্যায় পঠিত হতো, এবং আমজনতাও এ সাহিত্যের রস আস্বাদন করত। তার মানেই হলো, প্রধানত হিন্দু-মুসলমান জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য তুলনামূলক জনলগ্ন কাব্যভাষা খুঁজতে গেলে পুঁথিসাহিত্য একটা দূরবর্তী বাতিঘর হতেই পারে। উপনিবেশিত বাঙালি মধ্যবিত্তের শিল্পসাহিত্যের জনবিচ্ছিন্নতা এবং দেশজ অনুষঙ্গ সাফল্যের সাথে ব্যবহারের অক্ষমতার প্রসঙ্গ না হয় বাদই দিলাম।

ফররুখ আহমদের কবিতার গুরুত্বপূর্ণ শব্দসম্ভার এবং উপকরণ সম্পর্কে আলাপটা বরং অন্যভাবে উঠতে পারে। বলা যেতে পারে, বাংলা কবিতার ওই ধারার সাথে আমাদের বিচ্ছেদ এতটাই গভীর আর স্থায়ী হয়ে গেছে যে, কার্যকরভাবে তার পুনরুৎপাদন আর সম্ভব নয়। উপনিবেশিত কলকাতায় জাতীয়তাবাদী পুনরুজ্জীবনের কালে মধ্যযুগের সাহিত্যের যে অংশ পুনর্ব্যবহার ও ভোগের আওতায় এসেছিল, দোভাষী পুঁথির জগৎ তার মধ্যে তো ছিল না, বরং অসদ্ভাব ছিল প্রবল। ফলে চোর-পুলিশ খেলা চলেছে একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। এ কারণেই ফররুখ আহমদদের কবিতায় ওই উপাদানগুলোর আকস্মিক আবির্ভাব পাঠকের পরিচয়জনিত পাঠক্ষমতাকে চাপে ফেলে দিয়েছে। কথাটা আরেকভাবেও তোলা যায়। ‘আধুনিক’ কবিতায় শব্দব্যবহারের যে রীতি-রেওয়াজ যুগপৎ কাব্য-রচয়িতা আর ভোক্তার কাছে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠেছে, ফররুখ আহমদের কবিভাষা তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ প্রতীয়মান না-ও হয়ে থাকতে পারে।

এভাবে নন্দনতত্ত্বের সীমার মধ্যেই গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারত। তা না হয়ে আলোচনাটা হয়েছে ‘বিদেশি শব্দ’ বর্গের ভিত্তিতে। যারা ফররুখের অনুকূল সমালোচনা করেছেন, যেমন আবদুল মান্নান সৈয়দ, তারা বর্গটি মেনে নিয়ে প্রচলিত নন্দনতত্ত্বের আওতায় কাজ করেছেন। আর যারা প্রতিকূলে গেছেন, তারা গেছেন সরাসরি খারেজি পন্থায়। অথচ দুই পক্ষেরই প্রথমে ‘বিদেশি শব্দ’ বর্গটি নিয়ে আলাপ সেরে নেয়া জরুরি ছিল। বলা দরকার ছিল, বর্গটি উৎপাদিত হয়েছে কলকাতায়; বর্গটি ডাহা সাম্প্রদায়িক; এবং এ বর্গ-নির্ভরতা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাঠকে অন্যায়ভাবে বহুদিন ধরে প্রভাবিত করে আসছে। ফররুখ আহমদের কবিতা-পাঠ এভাবে হয়ে উঠতে পারত বাংলা কাব্যভাষার নতুন ধরনের রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ও নান্দনিক সমীক্ষা। কোনো পক্ষই সে সুযোগ গ্রহণ করে নি।

২.
এ লেখায় আমরা ফররুখের কবিতার গুরুত্বপূর্ণ একাংশ সম্পর্কে আলোকপাত করব। তার অংশ হিসাবে শব্দসম্ভারের বিশেষ এক দিক নিয়ে আলোচনা করা গেল। এবার আসা যাক ফররুখের কবিতার আরেক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ‘ঐতিহ্য’ প্রসঙ্গে।

বিশ শতকের চল্লিশের দশকে মুসলমান সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা প্রায় সমস্বরে দাবি করতে শুরু করেছিল, বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমান ঐতিহ্যের যথেষ্ট প্রতিফলন নাই। এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে ভিন্নমত প্রায় ছিলই না। তারা রীতিমতো সভা-সমিতি গঠন করে নিজেদের সাহিত্যিক তৎপরতার ঘোষণা দিয়েছিল। তার মধ্যে একটি ছিল এরকম : ইসলামি বা মুসলমানি ঐতিহ্য বলা যায় এমন মধ্যপ্রাচ্যীয় চরিত্র বা কাহিনির আমদানি। তাদের যুক্তিবোধ এবং বিশ্বস্ততা যতটা ভাবা হয়, তার চেয়ে বেশিই ছিল। প্রমাণ এই যে, আনকোরা আমদানির পক্ষে তারা বিশেষ সাফাই গান নি; এমনকি কবিরাও নতুন ‘মধ্যপ্রাচ্য’ বা নতুন ‘ইসলাম’ও আমদানি করেন নি। এ ইতিহাস যাদের সামান্য মাত্রায়ও জানা আছে, তারাই বুঝবে, আসলে ওই কবিকুল পুরনো পুঁথিসাহিত্যে ব্যবহৃত কাহিনির নতুন কাব্যিক রূপায়ণ চেয়েছিলেন মাত্র। তবু তারা নিন্দিত হয়েছিলেন। আজ, সময়ের নিরাপদ দূরত্বে এসে বিচার করলে দেখা যাবে, ওই কবিদের দাবি অংশত সত্য, তাদের সাফল্য অংশত উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বাছবিচারহীনভাবে তাদের নিন্দা করেছেন যারা, তাদের পক্ষে ঐতিহাসিক সত্য নেই, সাহিত্যিক-বুদ্ধিবৃত্তিক সত্যও নয়। ব্যাপারটা সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করা যাক।


এ অঞ্চলের ইতিহাসে ইসলাম বা মুসলমান প্রসঙ্গ তো পাকিস্তান আন্দোলন বা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শুরু হয় নাই।


ঐতিহ্যের ধারণাটি বহুদিন হলো নৃবিদ্যা বা সংস্কৃতি-অধ্যয়নশাস্ত্রের বিষয়। কাকে ঐতিহ্য বলা যাবে আর কাকে নয়, এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্ডিতদের মতৈক্য নাই। কিন্তু এটা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, ঐতিহ্য স্থির-নির্দিষ্ট কিছু নয়। এটা স্থান বা কালে সীমাবদ্ধও নয়। এককালে চাপা-পড়া অনুষঙ্গ আরেক কালে আবির্ভূত হতে পারে তাজা ঐতিহ্য হিসাবে। ঐতিহ্য ‘আবিষ্কৃত’ হতে পারে, যেভাবে হয়েছিল উনিশ শতকের কলকাতায়। প্রাচীন ভারতের বেশ কল্পিত মূর্তি তখন জোরালোভাবে বন্দিত হয়েছিল ‘সোনালি অতীত’ হিসাবে। ভৌগোলিকভাবে বেশ দূরের উত্তর-ভারতীয় কাহিনি কলকাতায় জাঁকালোভাবে কাজ করতে পারে ঐতিহ্য হিসাবে, যখন আসাম বা বার্মা হয়তো কারো নজরেই নাই, এবং এমনকি ঘরের পাশের লোককাহিনিও ঐতিহ্য-তালিকায় কলকে পাচ্ছে না—যেমনটি হয়েছিল তিরিশের সুখ্যাত কবিদের ক্ষেত্রে।

চল্লিশের কবিদের ব্যবহৃত উপাদানগুলো উড়ে এসে জুড়ে বসা উপাদান নয়; বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মন-মর্জির দিক থেকে অস্বাভাবিকও নয়। প্রথমত, আরব-ইরান থেকে যত দূরেই থাকুক না কেন, মুসলমান জনগোষ্ঠী তার বিশ্বাস-ব্যবস্থা আর আনুষ্ঠানিক ধর্মকর্মহেতু এ কাহিনিগুলোর অংশ হয়েই বড় হয়। তার ভাষা-কাঠামো এবং অনুভূতির গড়নে উপাদানগুলো প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। কথাটা নাস্তিক, ধর্মভীরু-ধর্মহীন নির্বিশেষে প্রযোজ্য। সকল ধর্মাবলম্বীর জন্যই সত্য। বাংলাদেশি খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে সত্য; সত্য মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানদের ক্ষেত্রেও। দ্বিতীয়ত, ওই কাহিনিগুলো চল্লিশের স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনার অংশ হয়ে প্রথমবারের মতো বাংলা মুল্লুকে বেড়াতে আসে নি। পুরনো ‘মূলধারা’র মুসলমান কবিরা এসব নিয়ে এন্তার কাব্য লিখেছেন। বিপুল পরিমাণে লিখেছেন দোভাষী পুঁথির কবিরা। বিশ্লেষকরা ব্যতিক্রমহীনভাবে দেখিয়েছেন, এসব কাব্যে—মূলধারার কাব্য বা দোভাষী পুঁথিতে—স্থান এবং কালের প্রচণ্ড প্রতাপ ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাবে-স্বভাবে এবং উপকরণের দিক থেকে সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে কাহিনিগুলো এ অঞ্চলেরই হয়ে উঠেছে। চল্লিশের কবিদের কাহিনি-উৎস ছিল এই পুরনো বাঙালি কবিরাই। এঁদের কেউ আরবি-ফারসি বিশেষ জানতেন বলে বা অন্য উৎস থেকে কাহিনিগুলো সংগ্রহ করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।

চল্লিশের দশকে বিশেষ প্রেক্ষাপটে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যের ধারণায় ‘মুসলমানি’ উপাদানগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। শুধু কাব্যধারায় নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক সকল ধরনের রচনা ও চর্চায়। ষাটের দশকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ওই উপাদানগুলোর প্রাধান্য আর সেভাবে বজায় থাকে নি। রাজনৈতিক তৎপরতা আর ক্ষমতা-সম্পর্কের নতুন ব্যাকরণ খুব সঙ্গত কারণেই ঐতিহ্যের জোরারোপের নতুন সব পাটাতন তৈয়ার করেছিল। জনগোষ্ঠীর তৎপরতার দিক থেকে ব্যাপারটা শুধু স্বাভাবিকই ছিল না, জরুরিও ছিল। কিন্তু বহুদিন পরে, আরো পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে, বহুদিন ধরে, ‘মুসলমানি’ উপাদানগুলোকে ষাটের দশকের মতো করে পাঠ করা নিশ্চয়ই সুষ্ঠু পাঠের লক্ষণ নয়। অথচ বাংলাদেশে ওরকম পাঠ খুবই প্রভাবশালী আর কর্তৃত্বপূর্ণ। কেন?

প্রথম আর প্রকাশ্য কারণ এই যে, ব্যাপারটা সরাসরি পাকিস্তান-আন্দোলনের সাথে যুক্ত। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই আমাদের ইতিহাসে বিভীষিকা হিসাবে গণ্য হয়। বাস্তবের এবং চিন্তার বিপুল রক্তক্ষরণের মধ্য দিয়ে আমাদের ‘পাকিস্তান’ নামের অযৌক্তিক দায় থেকে মুক্ত হতে হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান বাংলাদেশের মানুষই করেছিল। এ জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও বাস্তবতা পাকিস্তান আমলের তেইশ বছর বাদ দিয়ে পাঠ করা সম্ভব নয়। পাঠ আসলে করাও হয় না। যে মধ্যবিত্ত সমাজ বাংলাদেশ রাষ্ট্র চালায়, তার উত্থান ও বিকাশ পাকিস্তান পর্বেই সম্পন্ন হয়েছিল; ঠিক যেমন কলকাতার বাঙালি মধ্যবিত্তের বিকাশ সম্পন্ন হয়েছিল ইংরেজ আমলে। বাংলাদেশের সাহিত্যের যে কোনো আলোচনা সঙ্গত কারণেই পাকিস্তান আমলের লেখালেখিসহই হয়ে থাকে। রাজনীতি ও সমাজনীতির আলোচনাতেও তাই। তাহলে শুধু ‘ইসলাম’ বা ‘মুসলমান’ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত স্পর্শকাতরতা দেখানো হয় কেন? এ অঞ্চলের ইতিহাসে ইসলাম বা মুসলমান প্রসঙ্গ তো পাকিস্তান আন্দোলন বা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শুরু হয় নাই। পাকিস্তানে প্রসঙ্গগুলো বিশেষ মাত্রায় ও দৃষ্টিভঙ্গিতে চর্চিত হয়েছিল মাত্র। বাংলাদেশের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হতে পারত, পাকিস্তান রাষ্ট্রের কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের নির্মাণ থেকে ‘ইসলাম’ ও ‘মুসলমান’-সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে মুক্ত করা। কাজটা হয় নাই। কথিত ইসলামপন্থি গোষ্ঠী পাকিস্তান-আন্দোলন বা পাকিস্তান-ধারণার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে কাজটা করার তরিকা উদ্ভাবন করতে পারে নি। হয়তো চায়ও নি। বিপরীতে মূলধারার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ব্যাপারটা হয় এড়িয়ে গেছে বা পাকিস্তানের সাথে গুলিয়ে ফেলেছে। এভাবে সহজ ও সম্ভব হয়েছে খারিজি পন্থা নেয়া। বস্তুত, ঐহিহ্যের—বা বিশেষভাবে বললে সাহিত্যিক ঐতিহ্যের—বনেদিয়ানা থেকে ‘মুসলমানি’ প্রসঙ্গগুলো যে বাংলাদেশে খারিজ হয়ে গেল, তার প্রকাশ্য কারণ ‘পাকিস্তান’। কিন্তু এটিই প্রধান কারণ নয়। অপ্রকাশ্য কারণ আছে। সেই গোপন এবং প্রধান কারণটি প্রকাশ করা যাক।

পর্যাপ্ত দলিলের বরাত দিয়ে এখন নিশ্চিত করে বলা যায়, আধুনিকতার ধারণাটি পুঁজি ও তৎসংশ্লিষ্ট সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত। সাম্রাজ্যবাদ এরই সহোদর। তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আধুনিকতার ধারণা সঞ্চারিত হয়েছে ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়ার হাত ধরে। এই প্রক্রিয়ায় জন্মানো মধ্যবিত্তের কাছে আধুনিকায়ন আর পশ্চিমায়ন স্বভাবতই সমার্থক ছিল; আর প্রগতির পশ্চিমে প্রতিষ্ঠিত আদর্শই ছিল তার নিশানা। এই যখন ছিল কেন্দ্রাতিগ টান, তখন কেন্দ্রমুখী প্রবণতা হিসাবে ‘নিজ’-এর পুনঃসংজ্ঞায়নও জরুরি হয়ে পড়েছিল। বড় হয়ে উঠেছিল স্থানীয় ঐতিহ্য নতুন করে পড়া—পশ্চিমের নিরিখে উপাদানগুলোকে হালনাগাদ করে তোলা। কলকাতায় রামমোহন রায় থেকে শুরু করে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত—সাদা চোখেই পড়া যায়—এ কাজ হয়েছিল। একদিকে ইংরেজি-বিদ্যা যথেষ্ট মাত্রায় এস্তেমাল করতে না পারায় আধুনিকায়নের যাত্রায় তাকে পশ্চিমের তুলনায় কলকাতার উপর অধিকতর নির্ভর করতে হয়েছে। শিখা গোষ্ঠীর সামগ্রিক ভাব-স্বভাব এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অন্যদিকে, তার সামনে হাজির তদ্দিনে সুপ্রতিষ্ঠিত প্রভাবশালী ‘সাহিত্যিক বাংলা’ এ ব্যাপারে তাকে খুব একটা সাহায্য করে নি। কেন করে নি সে কথায় পরে আসব।


বাংলার সামাজিক ইতিহাসে নিপীড়িতের এত দীর্ঘশ্বাস ভূগোলের বেশে, সম্প্রদায়ের বেশে যে এতটা জমাট হয়ে ছিল, তা আগে বোঝা যায় নি।


তবু চর্চা হয়েছিল। শিখা গোষ্ঠীর সমসাময়িক বা খানিকটা পরের একটা গুরুত্বপূর্ণ দল ধর্মীয় ভাব-ভাষার আধুনিকায়ন, মানবিকীকরণ এবং এমনকি নিধর্মীকরণ নিয়েও কাজ করেছিলেন। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, ইব্রাহীম খাঁ, এয়াকুব আলী চৌধুরী, মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ প্রমুখের রচনায় এসব লক্ষণ খুবই স্পষ্ট। শিখা গোষ্ঠীর লেখকদের ‘আধুনিকায়ন’ প্রকল্পে বেশি নিবিষ্ট থাকার কারণে খুব ভালোভাবে খেয়াল করা হয় নাই যে, অংশত কাজী মোতাহার হোসেন আর বিশেষভাবে কাজী আবদুল ওদুদও নিজ নিজ ধরনে এ কাজ করেছিলেন। আর পূর্বোক্ত লেখকদের কাজ তো আমাদের মনোযোগের আওতায় আসেই নি। ষাটের দশকের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তা ওই কালের জন্য প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় নতুন ভাবধারায় নিরত হওয়ায় পূর্ববর্তী এ ধারা শুকিয়ে যায়। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে এই জরুরি কাজ আবার শুরু হতে পারত। হয় নি। ‘ইসলাম’-প্রসঙ্গ চিন্তাধারার মূল আবহে অপর হিসাবেই থেকে যায়। আগেই বলেছি, এর প্রকাশ্য কারণ পাকিস্তান রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর ইসলাম-ব্যবহার। কিন্তু মূল কারণ এটি হতেই পারে না। কারণ, জনগোষ্ঠীর আধুনিকায়নের স্বার্থে ধর্মতত্ত্বের নানামাত্রিক মোকাবেলা জরুরি—অপরায়ণ বা অনুল্লেখ নয়। স্বাধীন বাংলাদেশে যে এটা হতে পারল, মূলধারার সামাজিক প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর ও পশ্চিমায়িত লেখক-বুদ্ধিজীবীসমাজ যে ইসলাম প্রসঙ্গের মুখোমুখি হতেই চাইল না—চলই তৈয়ার হলো না—তার কারণ আসলে অন্য। প্রধান কারণ দুটিকে সংক্ষেপে এভাবে বর্ণনা করা যায় :

এক. বাংলাদেশের ইংরেজি-শিক্ষিত সমাজের আধুনিকায়নের মূল বাতিঘর বা নিশানা থেকে গেল পশ্চিম, যে পশ্চিম প্রাচ্যবাদী মানসিকতার অতিরেকের কারণে ঘোষিত বা অঘোষিতভাবে ইসলামকে ‘অপর’ হিসাবে সাব্যস্ত করে আসছে বহুকাল ধরে, যেমনটা গভীরভাবে দেখিয়েছেন এডোয়ার্ড সাইদ (১৯৯৫); আর অন্যতম বাতিঘর বা নিশানা থেকে গেল কলকাতা, যে কলকাতা তার আলোকিত উনিশ শতকের বিপরীতে ইসলাম ও মুসলমান-প্রসঙ্গগুলোকে অন্ধকার হিসাবেই চিত্রিত-চিহ্নিত করেছে, যেমনটা দেখিয়েছেন সুমিত সরকার [২০০০] এবং আরো অনেকে।

দুই. উনিশ শতক ও বিশ শতকের প্রথমাংশের কলকাতায় গভীরতম ও মহত্তম চর্চার মধ্য দিয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জীবনদৃষ্টির যে ভাষা জমে উঠল, তাতে মুসলমান সমাজ ও ইসলাম-প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ লাপাত্তা হয়ে গেল। রামমোহনের যুগে যে মুসলমানি উপাদানগুলো আভিজাত্যের স্মারক ছিল, একশ বছরের মধ্যেই সেগুলো কেবল হারিয়েই যায় নি, মোটের উপর নিন্দনীয়ও হয়ে উঠেছিল [Kaviraj 2003]। ফলে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের ‘ঘরের কথা’ বলার কোনো রেওয়াজ তৈয়ার হলো না [Chakrabarty 2002]।

এ ভাষা তৈরির কঠিন ব্রতে অগ্রসর না হয়ে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ নিলেন সহজতর খারেজি পন্থা। সরলচিত্ত বিশ্লেষকগণ বুঝতেই চাইলেন না, ইসলামি বা মুসলমানি প্রসঙ্গগুলোকে যে সাহিত্য-সংস্কৃতির ময়দানে কিংবা অভিজাত পাড়ায় বেমানান লাগে, ‘বিদেশি’ মনে হয়, তার কারণ এগুলোর কোনো এসেন্সিয়াল বা সার-বৈশিষ্ট্য নয়—চর্চার ইতিহাস মাত্র।

এ দৃষ্টিভঙ্গি ফররুখ-পাঠকে ভীষণভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ঐতিহ্যের যে বিশিষ্ট আয়োজন তার কবিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশের মূল পাটাতন, তাকে আরবীয়-ইরানীয় স্বপ্ন বলে আখ্যায়িত করার রেওয়াজ এ কাব্যপ্রকল্পের জনভিত্তির দিকে নজর দিতে দেয় নি। মোটেই বিস্ময়কর নয় যে, ফররুখ নিজে এই ঐতিহ্য-বিতর্ক সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন ছিলেন। বহু রচনায় তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সাক্ষ্য মিলবে। এখানে একটি কবিতা উদ্ধৃত করা গেল :

পদ্মা, মেঘনার দেশ; চিত্রা, হেনা, তিতাসের দেশ
              —যে দেশে রজতরেখা, কর্ণফুলী, কপোতাক্ষী আর
              গোমতী, যমুনা, তিস্তা, মধুমতী, হরিণ-ঘাটার
বহমান গতি স্রোত খুঁজে ফেরে পূর্ণতা অশেষ;
অসংখ্য নদী ও নদে যে দেশের মাঝি নিরুদ্দেশ
              গেয়ে যায় ভাটিয়ালী, স্বপ্নে দেখে যে দেশ আমার
              সুপ্তোত্থিত, সাথে নিয়ে অভিজ্ঞান— মুঠো মৃত্তিকার
এসেছিল এ জমিনে একদা জালালী দরবেশ।

এ মাটিতে মিশে আছে আরবের সেই মাটি আর
              একটি অদৃশ্য নদী বয়ে যায় মদিনা অবধি
              লক্ষ কোটি উম্মতের অশ্রু-তপ্ত যার স্রোতোধারা
              চলে দুর্নিবার, পথে থামে না সে বাধা পায় যদি
কত বাঁক পথ ঘুরে জানি না সে কোন্ সুর্মা নদী
              মদিনার সাথে যোগ রাখিয়াছে এ পাক বাংলার ॥ [‘নদীর দেশ’, মুহূর্তের কবিতা]

বোঝা যায়, ফররুখদের অনুপাতজ্ঞান ভালো ছিল। নিজেদের বিশেষ সময়ের অবলম্বনকে তারা বাংলার একমাত্র ঐতিহ্য হিসাবে ঘোষণা করেন নি। বাদ-পড়া উপাদানের কোনো কোনোটিতে প্রয়োজনমাফিক জোরারোপ করেছিলেন মাত্র।

৩.
সাত সাগরের মাঝি কাব্য প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৪ সালে। কবিতাগুলো লেখা হয়েছে ১৯৪৩-৪৪-এ। তখনো এ অঞ্চলে পাকিস্তান আন্দোলন জমে ওঠে নাই। ছেচল্লিশের নির্বাচন তখনো হয় নাই। কিন্তু পাকিস্তান প্রস্তাব ঘোষিত হয়েছে। খুবই অস্পষ্ট প্রস্তাব। রাজনৈতিক দর-কষাকষির একটা কৌশল তখনো। কিন্তু এই দূরবর্তী সম্ভাবনা এ অঞ্চলের মানুষকে এতটা উদ্বেলিত করবে কে ভেবেছিল? মানুষ বলতে কৃষক, নিম্নশ্রেণির হিন্দু-মুসলমান, নতুন উত্থিত শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মুসলমান তরুণ, আর বয়স্ক মুসলমান জোতদার শ্রেণি। বাংলার সামাজিক ইতিহাসে নিপীড়িতের এত দীর্ঘশ্বাস ভূগোলের বেশে, সম্প্রদায়ের বেশে যে এতটা জমাট হয়ে ছিল, তা আগে বোঝা যায় নি। প্রান্তীয় মানুষ অবশ্য জমিদার বা ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে অনেকবার। কিন্তু মধ্যবিত্ত সমাজের সাথে তার কোনো মিলমিশ তৈয়ার হয় নাই। সেরকম মধ্যবিত্তই তো ছিল না। পাকিস্তান আন্দোলন সে তুলনায় অনেক কম রক্তক্ষয়ী। অনেক বেশি টেবিল-রাজনীতির বিষয়। কিন্তু জনসমর্থনে বিস্ময়করভাবে ধনী। বিচিত্র শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি এতটা গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে না, যদি তার সুস্পষ্ট রূপরেখা বা কর্মসূচি থাকে। পাকিস্তান প্রস্তাবের এরকম কোনো স্পষ্টতা ছিল না। জয়া চ্যাটার্জি [২০০৩ : ২৬৫] ঠিকই বলেছেন, সব পক্ষ নিজ নিজ স্বপ্নের মতো করে পাকিস্তানকে ব্যাখ্যা করতে পেরেছিল বলেই পাকিস্তান আন্দোলন এত জনপ্রিয় হয়েছিল। গণমানুষের কাছে এ ছিল স্বপ্ন, এ ছিল মুক্তি। পাকিস্তান রাষ্ট্রে সে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল, সে মুক্তি আরো দূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু সেসব বাস্তবের পাকিস্তানের কথা। স্বপ্নের পাকিস্তানে জনমানসে মুক্তির চেয়ে কম কিছু ছিল না। অনেক পরে পাকিস্তান আন্দোলনের উন্মাদনা আর হতাশার অসামান্য রূপায়ণ ঘটিয়েছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার খোয়াবনামা [১৯৯৬] উপন্যাসে। কিন্তু সে তো পরের কথা। সাতচল্লিশের আগে মুক্তির স্বপ্নই যখন সত্য ছিল জনমানুষের মনে, তখনকার কাব্যিক প্রতিনিধি ফররুখ আহমদ—মানুষের স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষাকে শিল্পকলায় রূপান্তরিত করলেন সাত সাগরের মাঝি-র একগুচ্ছ কবিতায়।

কবিতাগুলোর সামগ্রিক রূপকল্প হয়েছে ভারি সুন্দর। সমুদ্রের বিপুল প্রেক্ষাপটে এক নাবিকের গল্প বলেছেন কবি। এ নাবিক দিগ্বিজয়ী। পালতোলা জাহাজ তার বাহন। যাত্রা তার বিপদসঙ্কুল। কিন্তু বিপদ অতিক্রম করে বন্দরে পৌঁছে যাওয়ার বিস্তর অভিজ্ঞতা তার সঞ্চয়ে। স্পষ্টতই আরব্যরজনীর অন্যতম নায়ক সিন্দাবাদ এই রূপকল্পের মূল। মুসলমানরা একসময় সমুদ্রের উপর দখল কায়েম করেছিল, আর শতাব্দী-পরম্পরায় তা বজায়ও রেখেছিল—এ ঐতিহাসিক তথ্য কবিকে উদ্বুদ্ধ করে থাকবে। কিন্তু অতীতের গল্প বলা তার লক্ষ্য নয়। অতীতের ভিত্তিতে বর্তমানের গল্পই বলেছেন কবি, যে বর্তমান ভবিষ্যতে পাড়ি দিতে উন্মুখ।

ভবিষ্যতের এক স্বপ্নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সে স্বপ্নের কোনো রূপরেখা নাই। কেবল মুক্তির বার্তা আছে। মুক্তি খুবই জরুরি। কারণ, বিপর্যস্ত মানুষের হাহাকারে চারপাশ ভারি হয়ে আছে। এই ক্ষুধিতের কান্না আর মজলুমের আহাজারি কবিতাগুলোকে স্থান আর কালের দিক থেকে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে বর্তমানের সাথে। বাংলার বিপুল মানুষের আর্তনাদ বহন করে কবিতাগুলো তাদের অব্যক্ত কান্নাকেই ভাষা দিয়েছে। মুক্তির যে পথ কবি বাতলেছেন তা বিশ্লেষণধর্মী। স্বপ্নই যে মুক্তি নয়, তাকে বিশিষ্ট কর্মকৌশলে এবং গভীর প্রত্যয়ে বাস্তবে রূপায়িত করতে হয়, সে বোধই কবিতাগুলোকে বিশ্লেষণধর্মী করে তুলেছে।


ফররুখের সাত সাগরের মাঝি-তে অনেক পাঠক মিছাই আরব-ইরান তালাশ করে হয়রান হয়েছেন।


জাহাজের জনকাঠামোয় একটা রাষ্ট্রের ছায়া আছে। দক্ষ মাঝি-মাল্লার কথা আছে, যারা অভিযানকে সফল করার জন্য উন্মুখ। আর তাদের দলপ্রধানের কথা আছে, যাকে ‘মাঝি’, ‘নাবিক’ বা ‘পাঞ্জেরী’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। কখনো বা অন্য রূপ ধরে সে হয়েছে ‘তাজী’ বা ‘ঈগল’। এই কর্তৃপক্ষই অভিযান সফল করতে পারে। কিন্তু দলপ্রধানের তৎপরতার ব্যাপারে বোধ হয় কবির দ্বিধা আছে। অভিজ্ঞ সে। বহু অভিযানের সাফল্যে মহিমান্বিত। অথচ আজ যখন বন্দরে লোক জমা হয়েছে অনেক, বিপর্যস্ত জাহাজে মরণশঙ্কায় দিন গুনছে বহুজন, তখনো দলপ্রধানের ঘুম ভাঙে নি। কবির আর্ত মিনতি, সে যেন কালবিলম্ব না করে জেগে ওঠে, অভিযান শুরু করে। এ যাত্রার সাফল্য আসলে বহু মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ। অভিযানটি যেহেতু সামুদ্রিক, সিন্দবাদের অভিজ্ঞতাই এ নেতার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু কবি নেতার জন্য আরো অন্তত দুপ্রস্ত নমুনা সঞ্চয় করেছেন। একটি ঈগল পাখির, ক্ষিপ্রতায় আর উদ্দেশ্য-সাধনের নিবিষ্টতায় যে অনন্য। অন্যটি ‘দরিয়ার সাদা তাজী’র, দুনিয়ার তাবত সমুদ্র যার নখদর্পণে।

কেবল সমুদ্রে নামলেই চলবে না। যতই চৌকস হোক না কেন, নেতার তিলেক অবহেলা সমস্ত আয়োজন বানচাল করে দিতে পারে। কারণ, এ আর কিছু নয়—সমুদ্র। তার বিশালতা, দিকচিহ্নহীন গতিপথ, আকাশের নিশানা চিনে পথচলা, ঝড়-ঝঞ্ঝা বিপর্যয়—সবকিছুর পাক্কা হিসাব দাখিল করেছেন কবি। আর এর মধ্য দিয়ে জনগোষ্ঠীর মুক্তিপথের দারুণ রূপকপ্রতিমা নির্মিত হওয়ার পাশাপাশি আরেকটা ঘটনা ঘটেছে—সমুদ্র তার জান্তব অস্তিত্ব নিয়ে অতিশয় প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে। বাংলা সাহিত্যে এরকম সফল সমুদ্রাভিসারের চিত্র সম্ভবত দ্বিতীয়টি নেই। কবিতাগুলো স্পষ্টতই রূপকস্বভাবী। কিন্তু বিচিত্র মাত্রা আর সম্ভাবনা প্রকাশের কৌশলে প্রায়শই আবির্ভূত হয়েছে প্রতীক হয়ে। মুক্তক মাত্রাবৃত্তের ধীর-স্থির চাল জাহাজের দোলার মতো কাব্যসঙ্গী হয়েছে। কবিতাগুলোর সম্পূর্ণতা আর সম্পন্নতাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ফররুখের সাত সাগরের মাঝি-তে অনেক পাঠক মিছাই আরব-ইরান তালাশ করে হয়রান হয়েছেন। ‘হেরার রাজতোরণ’ ভূগোলের দিক থেকে আরবের বটে, কিন্তু কোন কোন অর্থে বাংলাদেশের বা তামাম দুনিয়ার নয়? সিন্দবাদকে কাব্যিক ঐতিহ্য হিসাবে ব্যবহারের জন্য তো মুসলমান কবি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আর আরবরা যে সমুদ্র-অভিযানে নেমেছিল শতকের পর শতক, বাংলাদেশ বা মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মানুষ তাকে ‘বিদেশি’ ঘটনা হিসাবে কিভাবে চিহ্নিত করবে? এ কাব্যে আরবি-ফারসি শব্দ যতটা বলা হয় ততটা নাই। আরো বেশি থাকলেও মুখের বাংলার আরবি-ফারসির অনুপাত ছাড়িয়ে যেত না। সামগ্রিক কাব্যিক আবহে আরবের ভাগ নাই, আছে ইরানের—যে ইরান অসংখ্য সাহিত্যিক উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়ে ‘মুসলমানি’ সুরত পেয়েছে, আর আছে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত বেহেশতের কিছু ছবি। এসব গৌণ ব্যাপারে লিপ্ত হতে গিয়ে পাঠকদের একাংশ খেয়ালই করেন নি যে, সাত সাগরের মাঝি-র এ অসামান্য কবিতাগুচ্ছে নিখিল মুসলমান সমাজকে কখনোই সম্বোধন করা হয় নি; নেতার জন্য বর্ণিত এত এত গুণের মধ্যে একবারও শরিয়ত-মারেফতের উল্লেখ করা হয় নি। কবিতাগুলো আসলে এক বিশেষ সময়ে বিশেষ জনগোষ্ঠীর মনের বার্তা। ওই বার্তার শৈল্পিক অনুবাদ হয়েছিল বলেই তা নির্বিশেষ মহিমা পেয়েছে। আর দশ মহত্তম কাব্যের মতোই।


উল্লেখপঞ্জি :

আনিসুজ্জামান ১৯৮২, আঠারো শতকের বাংলা চিঠি, বাংলা সাহিত্য সমিতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
আনিসুজ্জামান ১৯৮৪, পুরোনো বাংলা গদ্য, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
জয়া চ্যাটার্জী ২০০৩, বাঙলা ভাগ হল, আবু জাফর অনূদিত, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা।
দেবেশ রায় ১৯৮৭, আঠার শতকের বাংলা গদ্য, প্যাপিরাস, কলকাতা।
দীনেশচন্দ্র সেন ২০০৬, বৃহৎবঙ্গ, প্রথম খণ্ড, ৩য় মুদ্রণ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
মোহাম্মদ আজম ২০১৪, বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ, আদর্শ, ঢাকা।
সৈয়দ আলী আহসান ১৯৮৪, ‘ফররুখ আহ্‌মদ’, ফররুখ আহ্‌মদ : ব্যক্তি ও কবি, শাহাবুদ্দীন আহ্‌মদ সম্পাদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা।
Chakrabarty, Dipesh 2002, ‘Memories of Displacement: The Poetry and Prejudice of Dwelling’, in Habitations of Modernity : Essays in the Wake of Subaltern Studies, The University of Chicago Press, Chicago.
De, Sushil Kumar 1962, Bengali literature in the nineteenth century (1757-1857), 2nd edition, Firma K. L. Mukhopadhyay, Calcutta.
Grierson, G. A. 1903, Collected and Edited, Linguistic Survey of India, vol. v, Indo-Aryan Family, Eastern Group, part I, Motilal Banarsidass, Delhi, Varanasi, patna.
Kaviraj, Sudipta 2003, ‘The Two Histories of Literary Culture in Bengal’, in Literary Cultures in History : Reconstructions from South Asia, Edited by Sheldon Pollock, University of California Press, Berkeley-Los Angeles-London.
Said, Edward W. 1995, Orientalism, Penguin Books.
Sarkar, Sumit 2000, A Critique of Colonial India, 2nd edition, Papyrus, Calcutta.

ঈদসংখ্যা ২০১৮
Mohammad Aza

মোহাম্মদ আজম

জন্ম ২৩ আগস্ট ১৯৭৫, হাতিয়া, নোয়াখালী। এম এ বাংলা, ঢাবি, পিএইচ ডি, ঢাবি। সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাবি।

প্রকাশিত বই :
বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ [আদর্শ, ঢাকা, ২০১৪]

ই-মেইল : mazambangla1975@gmail.com
Mohammad Aza