হোম গদ্য প্রাণের মহাযাত্রায় বাঙালি-মানুষ

প্রাণের মহাযাত্রায় বাঙালি-মানুষ

প্রাণের মহাযাত্রায় বাঙালি-মানুষ
7.75K
0

বিজ্ঞানীরা বলেন, সাড়ে চার শ থেকে পাঁচ শ কোটি বছর আগে হেডিয়ান মহাকালে আণবিক মেঘের মধ্যে জন্ম হয়েছিল আমাদের নক্ষত্র—সূর্য। দ্বিতীয় প্রজন্মের মাঝারি মানের এই নক্ষত্রটি জন্মের সাথে সাথে মহাকর্ষীয় বলের কারণে তার চারপাশে ঘূর্ণায়মান হয়ে ওঠে পুরনো নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ। ধীরে ধীরে জন্ম নেয় বেশ কিছু গ্রহ এবং উপগ্রহ। যার একটি আমাদের পৃথিবী।

মানুষের শত শত বছরের অতীতমুখী অনুসন্ধান আর গবেষণা থেকে আজ আমরা জ্ঞাত—সেই সদ্যজাত পৃথিবী ছিল প্রাণহীন এবং ক্রমশই অগ্নিকুণ্ড। লক্ষ কোটি বছর সে জ্বলেছে, তরল হয়েছে, পৃষ্ঠদেশ কঠিন বরফ শীতল হয়েছে, অজৈব পদার্থের পাশাপাশি জৈব পদার্থের সৃষ্টি হয়েছে, সূর্য এবং নানা রকম মহাজাগতিক কারণে।

একদা গ্রহ-সদৃশ এক বস্তু পৃথিবীর উপর আছড়ে পড়ে—অতিক্রম করতে গিয়ে আটকে যায় মহাকর্ষের বাঁধনে, জন্ম হয় চাঁদের। ফলে পৃথিবী তার প্রাচীন কক্ষপথ থেকে অনেকখানি সরে যায় এবং পারস্পরিক আকর্ষণে আসে জোয়ার ভাটার মতো নতুন অভ্যন্তরীণ গতি। প্রাচীন পৃথিবীর জলসায়ে জৈব পদার্থের মাঝে জন্ম নেয় এমন এক সক্রিয় বস্তু যা অক্রিয় হয়ে যাওয়ার আগেই নিজেকে নবায়ন করে ফেলে। এক স্বয়ংক্রিয় জৈব তথ্য—যা প্রাণ। সে কোষী হয়। নিজেকে ভেঙে দুটো করে, দুটো থেকে চারটে। এর মধ্যে আবার দুটি রকম দেখা দেয়। একদল স্বয়ংসম্পূর্ণ, সূর্য থেকে আলো শুষে খাদ্য তৈরি করে, ক্রমে এরা হয় বৃক্ষ। আরেক দল পরনির্ভর, অন্য কিছু শোষণ করে বাঁচে; এরা হয় প্রাণী।

এই এক কোষী প্রাণীদের মধ্যে আবার একদল দেখা দেয়—যারা নিজেকে ভেঙে দুটো না করে ভেতরের বাড়তি ডিএনএ-টা ঢুকিয়ে দেয় আরেকটির কোষে, আর তা থেকে বেরিয়ে আসে তৃতীয় কোষ। এতে পুরনো কোষ দুটি আপন অস্তিত্বে আরও কিছুকাল বাঁচার সুযোগ পায়। শুরু হয় প্রাণের যৌন নবায়ন।

আবার কিছু কিছু কোষ সংঘবদ্ধ হয়ে নামে খাদ্যসংগ্রহে। হয়তো তা যৌন নবায়নের বিকৃতি থেকে জমজ কোষদের যূথ। সংঘবদ্ধ এই যূথের একেক অংশের কোষ এক এক কাজ করে, একদল খাবার ধরে তো আরেক দল ভাঙে, একদল শোষণ করে, একদল সিদ্ধান্ত নেয়, একদল সবাইকে বয়ে নিয়ে চলে। এই ভাবে জন্ম হয় বহুকোষী প্রাণীর। পৃথিবীর জলে জলে সেই বহুকোষী প্রাণীর হয় মহা বিস্ফোরণ। সে নানা রকম অমেরুদণ্ডী মাছ আর জলজ কীট। ধীরে ধীরে অমেরুদণ্ডীদের মধ্যে দেখা দেয় একদল মেরুদণ্ডী প্রাণী, তাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আরো সুগঠিত।


গ্রিক এবং নরওয়েজিওরা এক জাতি এক দেশের লোক নয়—তেমনি ভারত মহাদেশের তামিল এবং বেলুচরাও এক নয়। 


ওদিকে উদ্ভিদেরাও তো বসে নেই, পাল্লা দিয়ে দখল করে পৃথিবীর জলতল। তাদের কারণে সমুদ্র থেকে উঠে আসে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন টন অক্সিজেন। গঠিত হয় বায়ুমণ্ডল। বৃক্ষেরা শুধু সমুদ্রতল দখল করেই ক্ষান্ত থাকে না, দখল করতে শুরু করে পৃথিবীর প্রাচীন ডাঙা। ডাঙা ভরে ওঠে নানা রকম বৃক্ষ আর ফলে ফুলে। সাথে আসে বিচিত্র কীট পতঙ্গ। মাছদের মধ্যে দেখা মেলে উভচরের। উভচর থেকে সরীসৃপ। ছোট-মাঝারি-বড় নানা রকম সরীসৃপে ভরে যায় ডাঙা। সে এক হুলুস্থূল কাণ্ড। এবার প্রাণীরা জল আর স্থল দখল করেই ক্ষান্ত হয় না। সরীসৃপদের একদল উড়তে শুরু করে। প্রাণে পূর্ণ হয় ধরণীর জল-স্থল-আকাশ।

আবার এই সরীসৃপদের মধ্যেই দেখা মিলে দুর্বল একদল প্রাণীর, যাদের শরীর থেকে ডিম বের করে বাচ্চা ফুটানোর সুযোগ খুব কম। ফলে শরীরের মধ্যেই ডিম নিয়ে ছুটতে ছুটতে বাচ্চা ধারণ করতে হয়। এরা হলো গর্তবাসী ক্ষুদ্র অসহায় স্তন্যপায়ী। এ হলো উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের মহাযাত্রার বিজয় গাথা।

কিন্তু খোদ ধরণী—পৃথিবী মাতাও তো আর স্থীর-স্থবির নয়। তার শরীরেও কালে কালে আসে নানা পরিবর্তন, জাগতিক মহাজাগতিক প্রভাবে। সেরকমই এক মহাজাগতিক উল্কাপাতে ধ্বংস হয়ে যায় বিশাল বিশাল সরীসৃপ তথা ডাইনোসরদের কোটি কোটি বছরের রাজত্ব। সেই মহা-ধ্বংস যজ্ঞের পরে গর্তচারী ক্ষুদে স্তন্যপায়ীদের সামনে মিলে যায় আত্মবিকাশের মহা সুযোগ। সুযোগ তো আর কেউ ছাড়ে না। স্তন্যপায়ীদেরও হলো মহা-বিকাশ। দখল হলো ডাঙা। বাদুড়ের মতো একদল স্তন্যপায়ী শুরু করে উড়তে আবার তিমি আর ডলফিনদের মতো স্তন্যপায়ীদের পূর্বজরা ফিরে যায় জলে।

আজ থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি বছর আগে সেই পেলিওসিন যুগে স্তন্যপায়ীদের মধ্যে উদ্ভব ঘটে এক জাতের প্রাণী। বিজ্ঞানীরা যাকে শনাক্ত করেছেন প্রাইমেট বর্গ বলে। যাদের চার পায়ের নিন্মভাগ কিছুটা সমতল, আলাদা হাড় যুক্ত, কিছু আঁকড়ে ধরতে পারে, গাছে উঠতে পারে, মাথার খুলির আয়তন বড়, চোখও তুলনামূলক সামনের দিকে। লক্ষ কোটি বছরের বিবর্তনে এদের মধ্যে দেখা দেয় শতশত প্রজাতির। যার একটি হোমিনয়ডিরা বা এপ বা অর্ধমানুষ ধরনের প্রাণী। আবার এই হোমিনয়ডিরা বা এপদের মধ্যে কালে কালে উদ্ভব হয় বিভিন্ন প্রজাতির, যার একটি হোমিনিডি। তেমনি হোমিনিডিদের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে কালক্রমে উদ্ভব হয় হোমিনিন প্রজাতির এবং প্রায় ষাট লক্ষ বছর পূর্বে আফ্রিকা মহাদেশে হোমিনিন থেকে উদ্ভব হয় দুই পায়ে ভর দিয়ে চলা হিউম্যান বা আদিমতম মানুষের। কিন্তু সে তো আজকের এই মানুষ নয়। সেই আদিমতম মানুষ বা হিউম্যান বা হোমোদের মধ্যেও হয়েছে নানা প্রজাতির উদ্ভব, হোমো ইরেকটাস, হোমো হাইডেলবারগেনসিস, হোমো সেপিয়ান, হোমো নিয়েনডারথালেনসিস। সাক্ষ্য প্রমাণসহ এ এক মহা ইতিহাস, অল্প কথায় তো আর বোঝানো যাবে না!

তবে হোমো সেপিয়ান নামে যারা আজ নিজেদের বুদ্ধিমান মানুষ বলে পরিচয় দেই, প্রাণের মহা ইতিহাসে সেই আমরা কিন্তু খুবই নবীন। মাত্র দুই থেকে তিন লক্ষ বছর আগে, আফ্রিকার এক কোনে আমাদের উদ্ভব। অন্যান্য প্রজাতির মানুষরা—যেমন : হোমো নিয়েনডারথালরাও ৩৫ হাজার বছর আগে আমাদের প্রতিবেশী হয়ে বাস করে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। হয়তো সে আমাদেরই পূর্বপুরুষদের আগ্রাসনে অথবা অন্য কোনো কারণে টিকতে না পেরে। তবে আমরা মানে হোমো সেপিয়ানরা আজ সমগ্র পৃথিবী দখল করে আছি। তাহলে কবে আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে পড়েছিল আমাদের প্রজাতি? কিভাবে জন্ম হলো মঙ্গলয়েড, অস্ট্রলয়েডদের মতো মহা রেসগুলোর এবং বাঙালি, জার্মান, ইংরেজ, জাপাননিসহ আধুনিক জাতিগুলোর?

সাম্প্রতিক সময়ে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-র পরম্পরার উপর গবেষণা করে জেনেটিক সাইন্সের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন—আমাদের প্রজাতির জন্মভূমি আফ্রিকার মহাদেশের বোতসোয়ানার মাকগাডিকগাডি ও ওকাভাঙ্গো হ্রদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। ১ লক্ষ ৩০ হাজার বছর আগে পরিবেশ বিপর্যয়ের শুরু হলে ১ লক্ষ ১০ হাজার বছরের দিকে আমাদের পূর্ব পুরুষরা লেক অঞ্চল ছাড়তে শুরু করে এবং আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর পশ্চিম আফ্রিকার দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

জেনেটিক মার্কারের উপর গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এদেরই একটি গ্রুপ ৭০ থেকে ৮০ হাজার বছর আগে পূর্বদিকে অর্থাৎ এশীয় অঞ্চলে প্রবেশ করে এবং সমুদ্র তীর ধরে বঙ্গের উপর দিয়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার বছর আগে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে গিয়ে পৌঁছায়। এ তো আর একবারে হেঁটে চলা না—স্থানে স্থানে প্রজন্ম ফলিয়ে যাওয়া। মানুষের দ্বিতীয় মহাযাত্রা শুরু হয় ৬০ হাজার বছর আগে। এটি পশ্চিম এশিয়ার মধ্য দিয়ে ইরান হয়ে আজকের পাকিস্তানের কাছে এসে দুই ধারায় ভাগ হয়, এক ধারা দক্ষিণ ভারতের দিকে চলে যায়, অন্যটি তিব্বতের উপর দিয়ে এসে বঙ্গ-আসামের উত্তর পূর্ব দিক থেকে নেমে বার্মা-থাইল্যান্ডের দিকে এগিয়ে তিন ভাগ হয়ে যায়। আপাতত আমাদের এ পর্যন্তই দরকার।

মস্তিষ্কের বিকাশের সাথে সাথে মানুষ অর্জন করে ভাষা, অর্জন করে চিন্তা এবং কল্পনা করার শক্তি। কবিতার সেই লাইনের মতো—‘যা নেই তা নেই, তবু থাকে মনে/ খুলি ঠেলে বাড়ছিলো ফ্রন্টাল লব।/ মন! কী আজব কী আজব…/ ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দগুলো পেয়ে গেল/ বিচিত্র বোধ/ জন্ম নিলো কথা!/ তাতে নামে গল্প/ নামে আবেগ ঢলক।’ মানুষ ধীরে ধীরে অন্য প্রাণীদের থেকে নিজেকে আলাদা করেছে, প্রকৃতিকে পাঠ করে রপ্ত করেছে বাঁচার নতুন কৌশল। জগৎ নিয়ে কৌতূহল আর উত্তরের যন্ত্রণায় সৃষ্টি করেছে মিথ এবং ধর্ম। আর ছড়িয়ে পড়েছে গ্রহ জুড়ে।

আজ থেকে ৫০ হাজার বছর পূর্ব অব্দি আফ্রিকা থেকে যে দুটি গ্রেট হিউম্যান মাইগ্রেশন হয়েছে তা কোনো না কোনো ভাবে বাংলাকে ছুঁয়ে গেছে। বিশ্ব জুড়ে এই মহা-যাত্রায় হাজার হাজার বছর ধরে স্থানীয় প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে মানুষের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য। যেমন : প্রখর সূর্যতাপে মেলানিনের প্রভাবে কারো ত্বক হয়েছে নিকষ কালো আবার মেলানিনের অভাবে কেউ হয়েছে ফ্যাঁকাসে সাদা। বরফ ঠান্ডায় নাক চেপে শ্বাস নিতে গিয়ে কোনো নরগোষ্ঠীর নাক হয়েছে উঁচু আবার বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় কারোরটা চ্যাপটা। এসব কারণে মানুষের কয়েকটি মহা নৃ-ধারা বা গ্রেট হিউমান রেস তৈরি হয় পৃথিবীতে। যেমন : অট্রালয়েট, মঙ্গলয়েড, নিগ্রয়েট, ককেসায়েড ইত্যাদি।

প্রথম যে মানুষের মহাযাত্রা আফ্রিকা থেকে সমুদ্রকূল ধরে বাংলার উপর থেকে প্রবাহিত হয়ে আস্ট্রেলিয়া পৌঁছেছিল—আমরা জানি সেটি অস্ট্রালয়েড নৃ-ধারা, তা পশ্চিম থেকে এসে প্লাবিত হয়ে গেছে। অতঃপর মানুষের দ্বিতীয় যে মহাযাত্রা বঙ্গ ও আসামের উত্তর পূর্ব থেকে নেমেছে তা মঙ্গলয়েড নৃ-ধারা, কাল ক্রমে ধেয়ে এসেছে পশ্চিম দক্ষিণ দিকে। অনেকটা গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্রের জল মিলেমিশে মেঘনায় প্রবাহিত হওয়ার মতো—প্রাচীন বঙ্গভূমে হাজার হাজার বছর ধরে জন্ম হয়েছে অসংখ্য ক্লান, ট্রাইব, মিশ্র জনগোষ্ঠী।

এবার একটু দেশ বা ভূমির কথা বলি। মানুষের মতো চিরকাল এই দেশ বা ভূমিও এখানে ছিল না। এরও জন্মের ইতিহাস আছে। সে-লম্বা আলাপে যাব না। তবে যে কটি টেকটনিক প্লেটের উপর স্থলচর প্রাণীদের বাস—তার একটি ইন্ডিয়ান প্লেট। আরাকান থেকে আফগানিস্তান অব্দি বিস্তর ভূখণ্ডের এক মহাদেশ। প্রকৃতার্থে এটি কিন্তু এশিয়া মহাদেশের অংশ নয়! এর অবস্থান ছিল আফ্রিকার নিন্মভাগে। কোটি কোটি বছর ধরে এই প্লেটটি এশিয়ার দিকে এগোতে থাকে, সাড়ে পাঁচ কোটি বছর আগে এসে ধাক্কা লাগে এশিয়ান প্লেটের সাথে। অন্যদিকে ইন্ডিয়ান আর এশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষে জন্ম হয় হিন্দুকুশ, হিমালয় এবং আরাকান পর্বত শ্রেণির। সে কালে তো আর মানুষ ছিল না—এসব তথ্য বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে প্রমাণসহ বের করেছেন। তো এই ইন্ডিয়ান প্লেটের এক এক অঞ্চলের এক এক রকম প্রকৃতি, কালে কালে জন প্রবাহে প্রতি অঞ্চলের তৈরি হয় বৈচিত্র্যময় জীবনাচার, নৃ-ধারা। এটি ইউরোপের মতো একটি মহাদেশ। রয়েছে অনেকগুলো বৃহত্তর সাংস্কৃতিক বলয়। ইউরোপে যেমন : গ্রিক এবং নরওয়েজিওরা এক জাতি এক দেশের লোক নয়—তেমনি ভারত মহাদেশের তামিল এবং বেলুচরাও এক নয়। যদিও ঐতিহাসিক কালে কয়েকজন সম্রাট ইন্ডিয়ান প্লেটের অনেকখানি দখল করে শাসন করেছিল কিন্তু সে সাময়িক। একদেশ সে কখনই ছিল না।

তবে সুদূর প্রাচীন কাল থেকে একটি সাংস্কৃতিক এবং প্রাকৃতিক দেশ তৈরি হয়েছিল উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে বিহার ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা থেকে পূর্বে আসাম আরাকান পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে। অস্ট্রালয়েড এবং মঙ্গলয়েড দুটি প্রধান নৃ-ধারার মানুষেরা এ অঞ্চলে বাস করেছে প্রায় অর্ধলক্ষ বছর। সে তো কম সময় নয়। পরস্পরের মিশ্রণ এবং সংমিশ্রণে জন্ম হয়েছে নব নব নৃ-ধার।

আফ্রিকা থেকে মানুষের এই মহাযাত্রার পরে কিন্তু কেটেছে বরফ যুগ। বরফ যুগে সমুদ্রের পানির স্তর যায় অনেক নিচে নেমে—মানে আজকের চট্টগ্রাম, বরিশাল, কলকাতা বা মেদিনীপুরের নিচে সমুদ্র তলের অনেক দূর পর্যন্ত উপকূলভূমি ছিল। আর অট্রোলয়েডরা তো সমুদ্র উপকূল ধরেই এসেছিল। কারণ সমুদ্র ছিল সহজ খাদ্যের যোগানদাতা। হয়তো বাঙালিদের মাছ খাওয়ার ঐতিহ্যটা সেই অভ্যেসেরই অংশ। কিন্তু বরফ যুগ শেষে যখন সমুদ্রের জলের স্তর বাড়তে থাকে তখন এই সব অস্ট্রালয়েড ট্রাইবগুলো উঠে আসে উত্তরের দিকে। আর ১২ হাজার বছর আগে যখন শেষ বরফ যুগের শেষ হয়, আমরা জানি হিমালয়ের বরফ গলে এই বিশাল প্রাকৃতিক দেশের উপর বইতে থাকে অজস্র নদী, মাছ ভরা নদী, ভূ-ভাগ আচ্ছাদিত হয় নব নব বনভূমিতে। খাদ্য বিজ্ঞানীদের ধারণা ধান নামক শস্যটির জন্ম বাংলা থেকে থাইল্যান্ডের কোনো স্থানে। অর্থাৎ শেষ বরফ যুগের পরে পৃথিবী ব্যাপী যে কৃষি সভ্যতার শুরু তার একটি কেন্দ্র যে এই বিরাট প্রাকৃতিক দেশ সে ইঙ্গিতও আছে। সমগ্র অঞ্চলের প্রেক্ষিতে হয়তো সে কৃষি সংস্কৃতির বিকাশও অসম ছিল। তবে ধারণা করা হয় খ্রিষ্টপূর্ব দুই থেকে চার হাজার বছরের মধ্যে এই প্রাকৃতিক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় বড় কৌমের বিকাশ হতে শুরু করে।

দূর প্রাচীন কাল থেকে অস্ট্রালয়েড এবং মঙ্গলয়েড রেসের নানা ট্রাইব উপ ট্রাইবের মিশ্রণ সংমিশ্রণে এই বিশাল প্রাকৃতিক দেশ জুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল একটি বিশেষ ভাষারূপ। তা হয়তো বড় কোমগুলোর অধিকাংশের ভাষা ছিল এবং বাকিদের মধ্যে কাজ করেছে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে। আদিম প্রাকৃত ভাষা—প্রাকৃতজনদের।

সেই প্রাকৃতিক দেশের ছিল নানা রকম কৌম প্রদেশ। অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র, গৌড়, মগধ, কজঙ্গল, রাঢ়, কামরূপ, প্রাগজ্যোতিষপুর, শ্রীহট্ট, কামতা, সমতট, হরিকেল কালে কালে আরও কত নাম, জনপদ ভেঙে জনপদ, জনপদের উপর গড়ে উঠেছে নতুন জনপদ। তবু সে প্রাকৃতজনদের দেশ। এই ‘দেশ’ নামটিও তাদের দেয়া। নিজ বাস্তুকে দেশ বলতেন তারা, প্রতিবেশীকে বলতেন দেশি এবং ভাষাকে দেশি ভাষা। তখন বঙ্গ বা বাংলা বলতে সমগ্র দেশ বা ভাষা বুঝাত না। যদিও বঙ্গও দেশের মতো প্রাচীন কিন্তু সে ছিল দেশেরই অংশ।

পৃথিবীজুড়ে মানুষের নানা রকম রেস, সাব রেস, ট্রাইবের জন্ম বিবর্তনেরই অংশ। খাদ্য আর সুবাস্তুর সন্ধানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের গমনাগমনের ইতিহাস তো সুপ্রচুর। ধারণ করা হয়, এই প্রাকৃতিক দেশে তখন দ্রাবিড় নামে একদল উপজাতির আগমন ঘটে। আদৌ তারা বহিরাগত ছিল না এখানকারই বিবর্তিত কোনো নরগোষ্ঠী অথবা কেবল ভিন্ন সংস্কৃতির বাহক তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। গত শতাব্দীর এমন ধারণাকৃত আরেকটি নৃ-তাত্ত্বিক প্রপঞ্চ হলো আলপাইন আর্যদের প্রাচীন বাংলায় আগমন। এর পক্ষে যুক্তি এবং বিজ্ঞান যতটুকু না আছে তারচেয়ে বেশি কল্পনার অভিযোগ রয়েছে। সমালোচকরা বলেন, কল্পকাররা সেই ভূমধ্যসাগরের পার থেকে আলপাইন আর্যদের সমুদ্রে নামিয়ে—সাঁতরিয়ে যেন পথ দেখিয়ে বাংলায় নিয়ে আসেন। কারণ তাদের আর্য যোগ জরুরি। মালভূমিতে বসবাসকারী খাটো কপালে আর খাটো নাকের মানুষদের সাথে কিছু তামাটে বাঙালির মিল আছে বলে এই আয়োজন। তা অতদূর না গিয়ে তিব্বতের মালভূমির দিকে চোখ ফেরালেও হতো। কেননা বখতিয়ার খলজিও নাকি তিব্বত অভিজানের সময় এমন জনগোষ্ঠীর দেখা পেয়েছেন। তবে আর্য জাতি না সংস্কৃতি এ নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। কেননা কিছু কাল পরে আসা আরও একটি নৃ-গোষ্ঠী ইতিহাসে পরিচিত হয়েছে আর্য বলে।


ব্রাহ্মণদের ছিল বর্ণবিভাজনের মাধ্যমে সমাজ শাসনের এক কঠিন পদ্ধতি আর তা মানুষকে বিভাজিত করে বেধে ফেলত জন্ম দাসত্বে। 


খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহাস্রাব্দের মধ্যে এই প্রাকৃতিক দেশে উদ্ভব ঘটে কৌম জনপদ বা কৌম রাষ্ট্রের। অজয় নদীর কূলে পাণ্ডুরাজার ঢিবি উৎখননের মধ্য দিয়ে আমরা জেনেছি—সাড়ে তিন হাজার বছর আগের সেই ব্রঞ্জ যুগে গড়ে ওঠা সমাজ সভ্যতার খবর। ঐতিহাসিকরা বলেন, এই সহস্রাব্দের মধ্যেই ঘটে আরও একটি ঘটনা। ভারতীয় মহাদেশ খণ্ডের উত্তর পশ্চিম থেকে প্রবেশ করে ঘোড়ায় চড়া একদল যোদ্ধা জাতি। তারা বৈদিক আর্য। তাদের বিশেষ সংস্কৃতি, ভিন্ন দেবতা। ক্রমেই পশ্চিম থেকে দখল করে এগোতে এগোতে তারা মিথিলা অব্দি এসে থেমে যায় দীর্ঘদিন। কেন থেমে ছিল? কেন আর থামে! বাধা না পেলে! ঐতিহাসিকরা বলেন—এই প্রাকৃতিক দেশের সভ্যতা সংস্কৃতি এবং সমর শক্তি বৈদিক আর্যদের চেয়ে উন্নত ছিল। যার প্রতিক্রিয়া বৈদিকদের ধর্মগ্রন্থেও গালাগাল হিসেবে দেখতে পাই। পরাজিত শত্রুর যেমন প্রতিক্রিয়া হয়! শুধু এতটুটুই না আরও ঐতিহাসিক উপাত্ত আছে। দুখের বিষয়, জাতিগতভাবে আমাদের ইতিহাস চর্চার নজির নেই। ফলে আমাদের প্রাচীন ইতিহাস পাই শত্রুর মুখে, সে তো আর গৌরবের হবার নয়, শুধুই গালি।

তবে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের চেয়ে খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের ইতিহাস কিছুটা পাওয়া যায়। শ্রীলঙ্কায় রচিত দীপবংশ- মহাবংশে এক প্রাচীন বঙ্গবীরের নাম পাই, বিজয় সিংহ নামে। যে সিংহল দখল করে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। কেউ কেউ এই উপাখ্যানের নায়ককে খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকের বলে মনে করেন। তবে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের ফলে মেগাস্থিনিসের উদ্ধৃতিতে এ অঞ্চলের সমর শক্তিধর গঙ্গাহৃদি রাজ্যের খবর জানা যায়। হয়তো আমাদের এমন অনেক গর্বের ইতিহাস অতীতের গর্ভে হারিয়ে আছে—জানিও না।

এই সহস্রাব্দে পৃথিবীতে ব্যাপক লোহার ব্যবহার শুরু হয়। বড় বড় সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। বড় বড় ধর্ম সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। সভ্যতাগুলোয় বেশ কিছু দার্শনিকদের উদ্ভব হতে দেখি। বলতে গেলে প্রাচীন বিজ্ঞানেরও সূচনাকাল। দর্শন চর্চা আমাদের এ ভূখণ্ডেও হয়েছে। অধ্যাপক রিচার্ড গার্বে গবেষণা করে মত দিয়েছেন—সাংখ্য দর্শনের জনক কপিল মুনি বঙ্গের লোক। যার প্রভাবে গৌতমের হাত ধরে প্রাকৃতদেশের প্রান্তে জন্ম হয়েছিল বৌদ্ধ ধর্মের। এখানে আরও ধর্ম প্রচার করেছেন মহাবীর, মখলি পুত্র গোশালসহ প্রাচীন পৃথিবীর অনেক বাঘা বাঘা ধর্ম প্রচারকেরা। ছিল আরও নানা রকম জড়োপাসক সম্প্রদায়, স্থানীয় পৌত্তলিক ও দার্শনিক সম্প্রদায়। ধর্ম নিয়ে বাঙালিদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তিক্ত হলেও প্রাচীন পৃথিবীর এই সব ধর্মগুলো জাতি গঠন এবং  সংস্কৃতি বিনির্মাণে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। এটা অবশ্য পরবর্তীতে হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের বেলায়ও সত্য। সে আলাপ পরে করব। ওই সময়ে এদেশে বৌদ্ধ ধর্মের যে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল তা মোটামুটি বলা যায়। কিছুদিন আগে নরসিংদীর ওয়ারী বটেশ্বরে গিয়ে দেখলাম পুরাতাত্ত্বিকরা খ্রিষ্টপূর্ব সাড়ে চার শ’ বছর আগের একটি বৌদ্ধ মন্দিরের অস্তিত্ব উন্মুক্ত করেছেন।

তখনও কিন্তু বৈদিকরা এ অঞ্চলের মানুষকে দাস-দস্যু-ম্লেচ্ছ বলে গালি দিচ্ছে। এ ভূমিতে কেউ এলে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করার বিধান দিচ্ছে। প্রাকৃতজনের ভাষাকে পাখির ভাষা বলে ঘৃণা করছে। বৈদিকদের এই ঘৃণার ধারা তাদের উত্তরসূরিদের মধ্যদিয়ে হাজার বছর প্রবাহিত হয়েছে। প্রাচীন বাংলা এবং বাঙালি বা প্রাকৃতজনের প্রতি এত দীর্ঘ ঘৃণার ইতিহাস বোধ করি বিরল। তবে বৈদিকরাও ততদিনে আর ততটা বৈদিক ছিল না, ভারতীয় মহাদেশে প্রবেশ করে শত শত বছরে স্থানীয়দের ভাষা সংস্কৃতির প্রভাবে হারিয়ে ফেলতে শুরু করে নিজেদের ভাষা। অন্যদিকে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গৌতম বুদ্ধ তৎকালীন প্রাকৃত লোকভাষা পালিতে প্রচার করেন তার ধর্ম দর্শন। অবশ্য মৃত প্রায় বৈদিক ভাষার কঙ্কালের উপর প্রাকৃত ভাষার সমন্বয়ে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে ভাষা সংস্কার করেন পণ্ডিত পানিনি। যার নাম হয় সংস্কৃত ভাষা। সে সাধারণের ভাষা ছিল না এবং না তা থেকে কোনো নতুন ভাষার জন্ম হয়েছিল।

খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর কথা, আলেকজান্ডার চলে যাওয়ার পরে মুরা নামক এক শুদ্রানীর পুত্র চন্দ্রগুপ্ত মগধে পত্তন করেন এক মহা সম্রাজ্যের। যদিও মগধে তার আগেও ক’টি রাজ বংশের ইতিহাস রয়েছে। অচিরেই চন্দ্রগুপ্তের এই সম্রাজ্য চতুর্দিকে বিরাট আয়তন প্রায়। শুরু হয় রাজধানী অভিমুখে নানা সংস্কৃতির স্রোত। যার প্রভাব মগধের প্রাকৃত ভাষার উপরও পড়ে, অন্যদিকে মিথিলা অব্দি আর্যদের প্রভাব তো আগেই ছিল। ফলে মগধের প্রাকৃত ভাষার যে অপভ্রংশ হয় তাকে পণ্ডিতরা বলেন মাগধি প্রাকৃতি। তা থেকে পরবর্তী সহস্রাব্দে উদ্ভব ঘটে মৈথিলী, মগহী, ভোজপুরি ভাষার। আর বাকি সমগ্র অংশেও কালের ছোঁয়ায় যে অপভ্রংশ তৈরি হয় ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাকে বলেন গৌড়ীয় প্রাকৃতি, গৌড়ীয় অপভ্রংশ। সে প্রাচীন বাংলা ভাষা। এ থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম হয় আধুনিক বাংলা, উড়িয়া এবং অসমী ভাষার। অসমীয়া নিয়ে একটু সংশয় বাচ্য আছে তা পরে বলব। ওই সময় ভারত মহাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের প্লাবন ঘটে। ফলে কোণঠাসা হয়ে যায় বৈদিক ধর্ম সংস্কৃতি। বৈদিকদের মধ্যে আবার একদল ছিল ধর্ম সংস্কৃতির বাহক, এরা ব্রহ্মণ, এদের হয় মহা-সংকট। কিন্তু দমে গেলেন না। বুঝে গেলেন বৈদিক দেব-দেবী দিয়ে আর পেট চলবে না।

অতএব জনপদে এতদিন যাদের তুচ্ছ ভেবে ঘৃণা করে আসছে, সেই পরাজিত সাধারণের দেব-দেবীর পুরোহিত হলেই রক্ষা। সাধারণ লোকে তো আর দর্শন বোঝে না, তারা গলে-গল্পে। হাতে ছিল দু দু’খান মহাকাব্য, তার উপরে জনপদের জনপ্রিয় লোকদেবতাদের নিয়ে রচনা করলেন নানা পুরাণ। শুরু হলো পুরাণ পাঠ। শুরু হলো পৌরাণিক হিন্দু ধর্মের। সে এমনই প্রভাব সৃষ্টিকারী যে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় বলেন—খাঁটি বৌদ্ধও গলে গিয়ে দেব উপাসক হলো। ব্রাহ্মণরা এক-দু’জনকে ধরে ব্রাহ্মণ্য ধর্মে ঢুকানোর ঝামেলায় গেলেন না। একেবারে গোত্রসুদ্ধ ঢুকিয়ে নেয়ার কৌশল বের করলেন। যে যে দেবদেবী চায় সে তাই পূজা করবে শুধু পুরোহিত হবে ব্রাহ্মণ, তাকে মানলেই হবে। আবার ব্রাহ্মণ্যের কাজ হলো সেই দেবদেবীকে নিয়ে একটা গল্প রচনা করে বৈদিক যোগ সৃষ্টি করে দেয়া। এতটুকুতেই শেষ হলে তো রক্ষা ছিল, কিন্তু না, এই ব্রাহ্মণদের ছিল বর্ণবিভাজনের মাধ্যমে সমাজ শাসনের এক কঠিন পদ্ধতি আর তা মানুষকে বিভাজিত করে বেধে ফেলত জন্ম দাসত্বে। এবার বৌদ্ধ ধর্মকে হটিয়ে এর বিস্তার হলো সমগ্র উত্তর দক্ষিণ আর মধ্য ভারতে। মৌর্যদের পরে মগধে আরও একটি বড় সাম্রাজ্যের উদ্ভব হয় খ্রিষ্টীয় ৪র্থ শতকে। সে গুপ্ত সাম্রাজ্য। তাদের ছিল সকল ধর্মের প্রতি উদার নীতি। তবে গুপ্ত রাজারও এই পৌরাণিক হিন্দু ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন। ফলে প্রাচীন বাংলায় দানপ্রাপ্ত কৃষি ভূমিতে কিছু ব্রাহ্মণ উপস্থিতি পাই, অনেকটা প্রবাসীদের মতো। তবে এই ধর্মের অনুসারী আমলা এবং সামন্তদেরও আগমন ঘটেছিল বলা যায় খ্রিষ্টীয় ষষ্ট শতকে।

হুন আক্রমণে দুর্বল গুপ্ত সাম্রাজ্য ধ্বংস হয় যশবর্মার হাতে। এসময় দক্ষিণ বাংলায় ধর্মাদিত্য-গোপচন্দ্র-সমাচারদেব রাজ বংশের খবর পাই। সমতটে বৌদ্ধ খড়গ এবং পরে রাত বংশের উত্থান ঘটে। ঈশান বঙ্গের প্রাগজ্যোতিষপুর, কামরূপ, শ্রীহট্টেও বিভিন্ন রাজ বংশের উত্থান হয়।

উত্তর বঙ্গে সপ্তম শতকে শশাঙ্ক নামে এক সামন্ত নৃ-পতির উত্থান ঘটে। তিনি সমর অভিযান চালিয়ে উত্তর ভারতের বিরাট অংশ দখল করেছিলেন। ইতিহাসে তার বৌদ্ধ নিপীড়নের দুর্নাম রয়েছে। শশাঙ্ক আদৌ এ অঞ্চলের স্থানীয় লোক ছিলেন কিনা তা নিয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্য রয়েছে মতপার্থক্য। বলা বাহুল্য তখনও বাংলার জনসমাজে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার হচ্ছে। জড়োপাসক, জৈন, আজিবক এবং স্থানীয় পৌত্তলিকদের পাশাপাশি সম্ভবত বৌদ্ধ ধর্মই ছিল জনসমাজের প্রধান ধর্মমত। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর সমগ্র বাংলা জুড়ে প্রায় শত বর্ষের এক কেন্দ্রিক শাসনের শূন্যতা বিরাজ করে। অষ্টম শতকের মাঝামাঝি উত্তর বঙ্গের বরেন্দ্র ভূমি থেকে উদ্ভব ঘটে পাল রাজ বংশের। পালরা ছিল ধর্মে বৌদ্ধ। অন্যদিকে সমকালীন বঙ্গ তথা দক্ষিণ বঙ্গের শাসকও ছিল বৌদ্ধ চন্দ্র বংশ। এসব ইতিহাস এখন আমাদের মাঝে কমবেশি স্পষ্ট। তবে পালরা বাংলাকে কেন্দ্র করে উত্তর ও মধ্য ভারত জুড়ে যে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা নানা চড়াই উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে প্রায় চার শ বছর টিকে ছিল। বর্ণাশ্রম ধর্ম বা হিন্দু অধ্যুষিত বিরাট অঞ্চল তারা দীর্ঘদিন শাসন করেছেন। ফলে সাম্রাজ্যের নানা কাজে ব্রাহ্মণ এবং তাদের অনুসারী প্রজারা অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। ধীরে ধীরে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রভূমি এই বাংলায় তারা আসতে শুরু করে। কেউ কেউ আমলা, সামন্ত, মন্ত্রীও হয়। কোনো কোনো পাল রাজা ব্রাহ্মণ কন্যাও বিয়ে করেন।

খ্রিষ্টীয় দশম শতকের দিকে বাংলায় ধর্ম মিশনে ব্রাহ্মণদের আগমন ঘটে। ধারণা করা যায় তা সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করার মতো নয়। ঐতিহাসিকরা বলেন, পালদের সময়ে বৃহৎ বঙ্গের ভাষা সংস্কৃতি এবং জাতি চরিত্রের একটি সংহত রূপ স্পষ্ট হতে শুরু করে। কিন্তু একাদশ শতকে রাজনৈতিক চিত্রটা পাল্টে যায়। রাঢ়-গৌড়-বরেন্দ্র দখল করে বহিরাগত হিন্দু সেন বংশ। বঙ্গ দখল করে আরেক বহিরাগত হিন্দু বর্মন বংশ। সমাজ সংস্কৃতিতে একটা বড় পরিবর্তন আসতে থাকে। জনপদে নামে বর্ণ প্রথা বর্ণ শাসনের সংস্কৃতি। সেনরা সমগ্র অঞ্চল ভাগ করে দেন কিছু সামন্ত মহাসামন্তদের মধ্যে। তাদের আশ্রয়ে গতি পায় ব্রাহ্মণদের ধর্ম মিশন। বল্লাল সেনের দান সাগরে আদর্শ রাজার কর্তব্য হয় বৌদ্ধ নিধন। ফলে সমাজ থেকে বিলুপ্তির পথ ধরে বৌদ্ধ সম্প্রদায়। প্রতিরোধের দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় নানা রকম পৌত্তলিক লোক ধর্ম। উদ্ভব হয় কিছু কিছু সমন্বয়বাদী ধর্মেরও।

ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে সেনদের হটিয়ে উত্তর বাংলা দখল করেন খলজি তুর্কিরা। তারা ছিল ধর্মে মুসলমান। সে তো আর জাতি রাষ্ট্রের যুগ ছিল না! বাহু বলে যে রাজ্য দখল করে সেই রাজা। যেমন পালদের হটিয়ে সেনরা দখল করে ছিল পালদের দেশ। যদিও বখতিয়ার দিল্লির সমর প্রতিনিধি ছিলেন না, স্বাধীন অভিযানকারী ছিলেন। তবুও দিল্লির মুসলিম শাসকের প্রতি তার আনুগত্য ছিল। কিন্তু তার পরবর্তী শাসকরা নিজেদের স্বাধীন শাসক ঘোষণা করেছেন বারবার। তুর্কিদের হাত ধরে শুরু হয় বাংলায় মুসলিম শাসনের যুগ। শতাব্দী কাল কেটে যায় সমগ্র অঞ্চল দখল করতে। জনসমাজে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায় ইসলাম ধর্ম এবং সেন আমলের রায়-রাজা-জমিদার যারা টিকেছিলেন বশ্যতা স্বীকার করে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা পায় ব্রাহ্মণ্য ধর্ম। যদিও ইসলাম ধর্মের প্রচার সেন আমল থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে বাংলায় উপস্থিত ছিল। তবে এবার তার গতি বেড়ে যায়। আবার এসময় বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটা নতুন ঘটনা ঘটে। এ শতকের বিচ্ছিন্ন কয়েক দশক বাংলা দিল্লির অধীনে শাসিত হয়। যা প্রথম। সেই মৌর্য্য, গুপ্ত, শশাঙ্ক, পাল এমনকি সেন আমলেও শাসক যেই থাক রাজনৈতিক কেন্দ্র এ অঞ্চলেই ছিল। এই প্রথম দূর দেশ দিল্লির অধীনতার নজির সৃষ্টি হয়। কিন্তু তা ছিল সাময়িক।

বখতিয়ারের বাংলায় আগমনেরও সিকি শতাব্দী পর ঈশান বাংলার কামরূপ দখল করে বর্মা অঞ্চল থেকে আগত সুকাফা নামক ভাগ্য বিতাড়িত ৮/৯ হাজার লোকের এক দলপতি। সুকাফা প্রতষ্ঠিত এই রাজবংশ টিকে ছিল দীর্ঘদিন। তাদের রাজ্যের নাম হয় আসাম, এটি সমতটের বিপরীত শব্দ না ট্রাইবের নাম বলা মুশকিল। তবে কালে কালে তারা বাংলা ভাষা সংস্কৃতি ধারণ করলেও স্থানীয় আঞ্চলিক বাংলা ভাষা রূপটিকে অসমী বলে নিজেদের আলাদা পরিচয় দেন।


১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বুলেটের চেয়ে বহুগুণ তীব্রতায়, মহাকাব্যিক চিৎকারে জন্ম হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের।


পরবর্তী শতাব্দীর শুরুতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। তিন খণ্ড বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করে ১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দে শাহ-ই-বাঙাল উপাধি নিয়ে উত্থান হয় সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের। সে ছিল দুই শ বছরের সার্বভৌম বাংলা সালতানাতের সূচনা। এই বাংলার হিন্দু মুসলমান সম্মিলিত সমর শক্তি রুখে দেয় দিল্লির আগ্রাসন। গৌড় হয় রাজধানী অঞ্চল কিন্তু সমগ্র সালতানাত পরিচিত হয়ে ওঠে বঙালা নামে। এতকাল যেন এমন একটি সামগ্রিক পরিচয়ের অপেক্ষায় ছিল সমগ্র অঞ্চল। কেননা একাদশ শতকেও বঙাল সৈন্যরা পাহাড়পুর বিহার আক্রমণ করেছিল বলে ইতিহাস আছে। তখনও বঙ্গ বলতে স্রেফ বৃহত্তর ঢাকা, বরিশাল, ফরিদপুর, যশোর অঞ্চল বোঝাত। মাঝে মধ্যে বঙ্গের আয়তন বেড়ে সমতট থেকে দক্ষিণ রাঢ় অব্দি যেত, আবার কখনও পুণ্ড্র বরেন্দ্রসহ সমগ্র পূর্ব বাংলার নাম হতো বঙ্গ। এমন বৃদ্ধি-সংকোচন রাঢ়, পুণ্ড্র, গৌড়, সমতট এবং কামরূপের ক্ষেত্রেও হয়েছে। আমরা সুপ্রাচীন বঙ্গ জনপদের নামে পরিচিত হলাম। আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—জাতি কখনও মৌলিক হয় না। নৃতাত্ত্বিক মৌলিক বৈশিষ্ট্য হয়তো ট্রাইব পর্যায়ে কিছু থাকে কিন্তু জাতি পর্যায়ে তার শঙ্করায়ন হয়। আর বাঙালির মতো বড়  জাতি অনেকটা মহানদীর মতো—প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে মানুষের মহাসমুদ্রে। সে তো আর একটি দুটি ছোট নৃ-স্রোতে হয় নি! এই শঙ্করায়নেরও রয়েছে ইতিবাচক দিক। সমন্বিত জিনভাণ্ডার এবং সংস্কৃতিই জাতি পরিচয়ের মূলত বৈশিষ্ট্য। বাঙালির ক্ষেত্রে যা সম্পন্ন হয়েছিল মধ্যযুগে, বিশেষ করে সুলতানি আমলে।

তবে ইলিয়াশ ছিলেন ভাগ্য বিতাড়িত মানুষ। তিনি হাজি ইলিয়াশ, দিল্লি থেকে পালিয়ে এসেছিলেন বাংলায়। পূর্ব পুরুষের বাস সিজিস্থানে ছিল বলে কোনো কোনো ঐতিহাসিক প্রচ্ছন্ন তথ্য দেন। ঐতিহাসিক অতুলসুর লিখেছেন—ইলিয়াশ বিয়ে করেছিল ঢাকার বজ্রযোগিনি গ্রামের এক বামুন কন্যাকে আবার কেউ কেউ বলেন তার মা ছিল বঙ্গের কন্যা, সেই সূত্রে তার ডাক নাম ছিল বঙ্গাল। এমন অতিকথন বাদ দিলেও এটা বোধহয় ঠিক যে শাহী বঙ্গাল উপাধি ধারণ করার আগ থেকেই তার বঙ্গাল বা ভাঙরাল উপনাম ছিল। শত্রু দিল্লি শাসকদের ঐতিহাসিকরা তাকে ভাঙখোর বলে নিন্দা করেছেন বটে তবে ভাঙরাল বা ভাঙখোর কেউ নিজের উপাধি হিসেবে লালন করার কথা নয়। ইলিয়াশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিণতি কালক্রমে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশে আশীর্বাদ হয়ে উঠেছিল। সুলতানি আমলে বাংলা ভাষাও ক্রমে একটি সংহত রূপ লাভ করে। সমৃদ্ধ হয়েছিল সাহিত্য সংস্কৃতি।

এই কালে দেশের শাসক এবং জনগণের পরিচয় বাঙালি হিসেবে বহির বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ১৩৯৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ মক্কায় যে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার নামও ছিল মাদ্রাসাতুল গিয়াসিয়া আল সুলতানিয়া আল বাঙ্গালিয়া। চিনাদের বর্ণনাতেও এর সমর্থন পাই।

সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সময়কে ঐতিহাসিকরা চিহ্নিত করেন সুলতানি বাংলার সবচেয়ে গৌরব উজ্জ্বল সময় বলে। এই সময়ে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে উদ্ভব ঘটে ধর্মান্দোলনের নেতা শ্রী চৈতন্যের। বাংলা ভূখণ্ডে হিন্দু ধর্মের বিস্তার একাদশ শতকের দিকে শুরু হলেও মূলত মুসলিম শাসনের মধ্যেই এটি গণধর্মে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। যদিও একাদশ শতকের নৃপতিরা ধর্মটির বিস্তারে যথেষ্ট উদ্যোগী ছিলেন বলেই মনে হয়। বঙ্গ সমতটের এক নৃপতি তো সিলেট দখল করে ব্রাহ্মণদের একটি উপনিবেশ তৈরি করে দিয়েছিলেন সেই সময়। সে যাই হোক, সমন্বিত বাংলায় সংস্কৃতির স্বরূপ নির্মাণে হিন্দু ধর্মের বেশ অবদান রয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম শাসনের শুরুতেই স্থানীয় ব্রাহ্মণরা ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে শৈব ও বৈষ্ণব উপধর্মের যে সাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন কালক্রমে তা আমাদের জাতীয় সাহিত্যের একটা বড় অংশ দখল করে। তবে জাতি গঠনের ক্ষেত্রে সে বড় অন্তরায়ও ছিল। এই বর্ণাশ্রম ধর্মে ঢোকা যাবে কিন্তু থাকতে হবে নির্দিষ্ট কোনো বর্ণে। অনেকটা একই প্যাকেটের আলাদা আলাদা তাসের মতো। সে জেনেটিক মিশ্রণ ঘটাবে না। যে কাজটা প্রাচীন বাংলায় বৌদ্ধ, জৈন ও অন্যান্য ধর্ম করেছে বহুদিন। অর্থাৎ গোত্র বা ক্লানের অতিরিক্ত একটি সম্প্রদায় পরিচিতি। যার মধ্য দিয়ে জিনের মিশ্রণ এবং জাতীয় নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ হয়। এ ক্ষেত্রে মধ্য যুগে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয় ইসলাম ধর্ম। নানা রকম আদিবাসী, উপজাতিতে ভরা এই বাংলায় সমন্বিত বাঙালি জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ধর্মটি কাজ করেছে অনেকটা ইঞ্জিনের মতো।

দেশি-বিদেশি, রাজা-বাদশা, সৈন্য-সামন্ত থেকে বাংলার বৌদ্ধ, হিন্দু, ব্রাহ্মণ, জেলে, মালো, কৃষক সবাইকে একাকার করে দিয়েছে। দীর্ঘ মুসলিম শাসনে প্রজন্মের পর প্রজন্মের অভিজাত বর্গ বিলুপ্ত হয়েছে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে। এর একটি উদাহরণ আমরা পাই রাজা গণেশ বংশের সুলতানদের উচ্ছেদের পর দ্বিতীয়বার যখন ইলিয়াশ শাহের বংশধরদের খোঁজ করলেন অভিজাতরা। তখন তাদের পাওয়া গেল গ্রামে, কৃষি খামারের মালিক হিসেবে। একদল ঐতিহাসিক খুব জোর দিয়েই বলেন—মুসলিম শাসনের প্রথম তিন শতাব্দীতে বাংলায় ইসলাম সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মে রূপান্তরিত হয়। হয়তো অনুসারীর হিসেবে তখনকার ধর্মগুলোর মধ্যে এগিয়ে ছিল। কারণ এর পক্ষে ইদানীং বেশ তথ্য প্রমাণ জোরাল হচ্ছে। ওই সময়ের নৃপতিরা অসংখ্য মসজিদ-মাদ্রাসা স্থাপন করেছিল। ১২৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত সোনারগাঁয়ে আবু তাওয়ামার মাদ্রাসা ছিল বিশ্ব বিদ্যালয়সম। ভারত বর্ষের মধ্যে খ্যাত। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় মুসলিম খেলাফতের পতনের পর ভারত বর্ষের মধ্যে প্রথম ১৩৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুলতান সিকান্দার শাহ নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। খলিফা উপাধি তার পরবর্তী আরও চারজন সুলতান ব্যবহার করেছেন।

নৃতাত্ত্বিক জাতি বিনির্মাণে ইসলাম ধর্মের যে একটি বড় ভূমিকা ছিল তার প্রমাণ মেলে ১৮৭২ সালে বেভারলির প্রথম বেঙ্গল সেন্সাসের পর। মেদিনীপুর থেকে কাছার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত তৎকালীন ২৭টি জেলায় মোট লোক সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬১ লক্ষ ১১ হাজার ২শত ২৮জন। এদের মধ্যে অ-এশিয় ১৭১৩৫, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ৪২৯৭৩ জন, আদিবাসী ৩৪৭১৫৭ জন, অর্ধ-হিন্দু আদিবাসী ৫১১০৯৮৯ জন এবং হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৪ লক্ষ ২৫ হাজার ৭শত ৫০ জন।

অন্যদিকে মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৬ লক্ষ ৪ হাজার ৭শত ৩০ জন। এর মধ্যে মোঘল ছিল ২২০৫ জন, পাঠান ছিল ২৩১২৬ জন। কাজেই এই ভূখণ্ডে বাঙালি জাতি গঠনে মধ্যযুগ থেকে ইসলাম ধর্মের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। তবে সাংস্কৃতিক বিনির্মাণে কিছুটা নেতিবাচক দিকও ছিল। যদিও মানুষ কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের সূচনা মধ্যযুগে বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের হাতেই হয়। ইসলাম ধর্মটি ছিল ভিন্ন সংস্কৃতির বাহক এবং শাসকরাও। তবে সরকারি সুবিধা এবং অভিজাত হওয়ার আশায় স্থানীয় হিন্দু মুসলমানরা আরবি ফার্সির চর্চা করতেন। কিন্তু অভিজাত হিন্দুটির পক্ষে ধর্ম পরিচয় মুছে নিজেকে দূর পশ্চিমা মুসলমান সংস্কৃতির উত্তরাধিকার ঘোষণার সুযোগ থাকত না ধর্মীয় কারণেই, অন্যদিকে স্থানীয় মুসলমানটি অভিজাত হয়ে উঠলে এমনটি যে করতেন তা কিছুটা বলা যায়। এই অভিজাত-প্রবণ বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে মধ্যযুগের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যে বিদ্রূপ এবং ঘৃণার উদ্ভব ঘটেছিল তার খবরও আমাদের জানা।

সুলতানি আমলের শেষ দিকে বাংলার উপকূলে আসতে শুরু করে ইউরোপীয় কিছু বেনিয়া জাতি। এদের মধ্যে পর্তুগিজরা ছিল অগ্রগণ্য। পরবর্তীতে উপকূল জুড়ে এদের ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের ইতিহাস রয়েছে এবং এই সময় থেকেই বাঙালিদের মধ্যে খ্রিষ্ট ধর্মেরও উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

শের শাহ সূরীর উত্থানের মধ্য দিয়ে ১৫৩৮ সালে সাময়িকভাবে পতন হয় প্রায় দুই শত বছরের সার্বভৌম বাংলা সালতানাতের। এর পর কয়েক দশক সূরী বংশ এবং কররানী বংশের সুলতানরা বাংলা সালতানাত শাসন করেন এবং ১৫৭৬ সালের দিকে বাংলা সালতানাতের বিলুপ্তি ঘটে, মুঘল সাম্রাজ্যের ভেতর সুবা বাংলা বা বাংলা প্রদেশ নামে।

এই প্রথম শতবর্ষের অধিক সময়ের জন্য বাংলা দিল্লির অধীনে চলে যায়। অষ্টম শতকের শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৭১৭ সালে মুর্শিদ কুলিখার হাত ধরে আবার জেগে ওঠে তুলনামূলক স্বাধীন নবাবী বাংলা। বলতে গেলে সে ছিল মাত্র ৪০ বছরের শাসন কাল। এর মধ্যে মারাঠা বর্গী আক্রমণ আর লুণ্ঠনের শিকার হয় বাংলা।

অতঃপর, ইংরেজ ষড়যন্ত্র; ১৭৫৭’র পলাশীর যুদ্ধ, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতন। ইংরেজ আধিপত্যের সূচনা। পরবর্তী দুই শ বছরের জন্য দেশ হয় দূর দেশীয় এক জাতির কলোনি।

বাংলায় চিরকালই ধনি দরিদ্র ছিল কিন্তু না খেয়ে দুর্ভিক্ষে মরার মতো দরিদ্র ছিল না বোধহয় কোনো কালেই। বেনিয়া ইংরেজদের আধিপত্য আর লুণ্ঠনে এক দশকের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় দুর্ভিক্ষ। সেই দুর্ভিক্ষে মৃত্যু হয় দেশের তিন ভাগের এক ভাগ লোকের। প্রাকৃতজনদের দেশ, সুলতানি বাংলা, সুবা বাংলা, নবাবী বাংলা—ব্রিটিশদের হাতে হয় বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি। পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে ফেলা হয় বাংলার ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র শিল্প। যার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান। ফলে নিঃস্ব হয়ে যায় বাঙালি মুসলমানদের একটি বিরাট অংশ। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দবস্তের মধ্য দিয়ে ভূমির উপর অধিকার হারায় বাংলার হিন্দু-মুসলমান কৃষক শ্রেণি। অন্যদিকে ইংরেজ বাণিজ্য কেন্দ্র কলকাতায় আগে থেকেই জড়ো হয়েছিল রাঢ় বঙ্গের কিছু অভাবী মানুষ, কিছু লুটেরা দালাল। যাদের অধিকাংশ ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক।

ইংরেজ লুণ্ঠনের সহযোগী হয়ে এদের অনেকেই রাতারাতি ধনী হয়ে যায় এবং পরে জমি কিনে হয়ে ওঠেন নয়া জমিদার। ইতোমধ্যেই সমাজে বিরাজ করছিল গণবিদ্রোহ। এই নয়া জমিদার এবং লুটেরা দালাল শ্রেণি বাঙালির গণবিদ্রোহ দমন করতে উদ্ভব ঘটায় জনগণকে হিন্দু-মুসলমানে ভাগ করে শাসন করার কৌশল। প্রাচীনকাল থেকে বিভাজন কৌশলটি ছিল বর্ণাশ্রম ধর্মের অভ্যন্তরে অনুশীলনের বিষয়। এই নয়া জমিদাররাই মূলত ব্রিটিশদের শিখিয়েছে ডিভাইড এ রুলের পদ্ধতি। ঘৃণার সেই সংস্কৃতি রচনার কাজে তারা অধিকাংশ সময়ই ব্যবহার করেছে বাঙালি পুরুত-ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়কে। এর বাহক হিসেবে জন্ম হয় বাবু শ্রেণির। ফলে ঊনবিংশ শতকে যখন সারা পৃথিবীর জাতিগুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছিল তখন আমাদের মধ্যে জেগেছে সাম্প্রদায়িক ঘৃণার রেনেসাঁ। ব্রিটিশ শাসন এবং অন্যান্য ইউরোপিদের কারণে যে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের যোগ ঘটে তা এদেশে এসেই প্যাকেটজাত হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে।

ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধের কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে প্রবলভাবে দেখা দেয় হিন্দু জাতিবাদ। বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ব্রিটিশদের দখলকৃত ইন্ডিয়ান কলোনি জোড়া এক আলিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রচার শুরু করে। বাবু শ্রেণির ঘৃণার সংস্কৃতির বিপরীতে পশ্চাৎপদ বাঙালি মুসলমান সমাজেও দেখা দেয় প্রবল ঘৃণা এবং যোগ হয় প্যানইসলামি ইজমের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা। ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই বাঙালির হাতে মার খেতে থাকে বাঙালি জাতিয়তাবাদ। এমন বাস্তবতায় মহান রাজনীতিবিদ চিত্তরঞ্জন দাশ বিংশ শতকের শুরুতে উদ্যোগী হন বাঙালির ঐক্য সাধনে। কিন্তু তা কালের আক্ষেপ হয়েই থেকে যায়। এরপর শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, শরৎ বসু-সহ বেশ কিছু বাঙালি রাজনীতিবিদদের হাত ধরে ভূমিষ্ঠ হতে চেয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিন্তু হয় নি।

১৮৭৪ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে আসামকে আলাদা করা হয়। ১৯০৫ সালে বাকি বাংলা ভাগ করা হয়। ১৯১২ সালে পূর্ণগঠনের নামে আসাম উড়িষ্যা বিহারকে ছেঁটে এক টুকরো খর্বিত বাংলা সৃষ্টি করা হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন ইন্ডিয়ান কলোনি ছেড়ে চলে যায়। বাঙালিদের সাম্প্রদায়িকতার ধাক্কায় তারা এদের দেশকে দু’টুকরো করে দিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সেই খর্বিত বাংলার বড় টুকরোটি পায় পাকিস্তান নামক এক আলিক রাষ্ট্র আর শিল্প সমৃদ্ধ ছোট টুকরোটি তথা পশ্চিম বঙ্গ পায় ভারত নামক নয়া সাম্রাজ্য। বাস্তু হারিয়ে সাম্প্রদায়িক সীমান্ত পাড়ি দেয় লক্ষ লক্ষ বাঙালি পরিবার। ক্রমশই অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় দেশ ভাগ। ৪৭-এর পরে একের পর এক পশ্চিম বঙ্গ শাসন করে গেছে সাম্প্রদায়িকতার যক্ষ্মায় আক্রান্ত সুটেট বুটেট বাবুশ্রেণি। তাদের অনেকেরই ছিল আবার জাতীয়তাবাদের চেয়ে আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি মোহ।


ঔপনিবেশিক ভাষা সংস্কৃতি ধারণ করে কোনো জাতিই উন্নত হয় নি।


অন্যদিকে বৃহত্তর অংশ তথা পূর্ববঙ্গে ঘটতে শুরু করে অদ্ভুত ঘটনা। বাঙালি মুসলমানরা এতকাল ব্রিটিশদের সাথে সাথে স্বজাতির ভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের দ্বারা ছিল নিপীড়িত। এবার তারা উপলব্ধি করতে পারে ভিন্ন জাতির ধর্ম ভ্রাতারাও কোনো ভ্রাতা নয়, স্রেফ কুমির। তারা বাঙালির ভাষা সংস্কৃতি আর সম্পদ গিলে ফেলতে চায়। স্রেফ শোষণ করতে চায়। দাস বানাতে চায়। অন্যদিকে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই হিন্দুত্বের প্রভাবহীন এই ঢাকায়—গর্ভ যন্ত্রণা শুরু হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বুলেটের চেয়ে বহুগুণ তীব্রতায়, মহাকাব্যিক চিৎকারে জন্ম হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের। আর বাঙালি পুত্র মহান মুজিবের হাত ধরে এই জাতীয়তাবাদ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম দেয় এক টুকরো রক্তাক্ত বাংলাদেশ। এ যেন সেই দূর পূর্বজ প্রাচীন প্রাকৃতজনের এক টুকরো হাসি, চিরন্তন বাংলার মুখ।

কিন্তু জন্মের পরে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ পার করেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর অথচ তার শরীরে এখন প্যান ইসলাম ইজমের অসুখ। গাঁটে গাঁটে সাম্প্রদায়িকতা এবং দুর্নীতির বিষ। তবু সে একটু একটু করে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। একদিন সে মহাকাব্যিক উত্থানে দাঁড়াবেই, কেননা তাকে জন্ম দিয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। অন্যদিকে দু লক্ষ বর্গ মাইলের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ৭২ ভাগই এখন ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে, ছিন্ন ভিন্ন—সেখানকার বাঙালিদের মতো। তারাও প্রবল সাম্প্রদায়িকতার অসুখে আক্রান্ত, বইছে দেশ ভাগের পাপের শাস্তি। ধর্ম সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে হয়তো একদিন ঐক্যবদ্ধ হবে ভারতীয় ইউনিয়ন রাষ্ট্রের বাঙালিরা এবং পৌঁছে যাবে মুক্তির নতুন দিগন্তে।

শেষ কথা হলো, আমরা হিমালয় বেসিং জুড়ে হাজার হাজার বছর ধরে বিবর্তিত প্রাকৃতজনদের সন্তান। একদা জড়োপাসক ছিলাম, প্রাচীন পৌত্তলিক ছিলাম, তন্ত্রের সাধনা করেছি, কালে কালে জৈন-আজীবক হয়েছি, বৌদ্ধ হয়েছি। হাজার বছর আগে আমাদের অনেকেই পৌরাণিক বর্ণ ধর্ম মেনে হিন্দু হয়েছে। পীর-দরবেশের কাছে বায়াত নিয়ে মুসলমান হয়েছে। আজ হয়তো অধিকাংশ বাঙালিই ধর্ম-পরিচয়ে মুসলমান। আমাদের মধ্যে আছে কিছু খ্রিষ্টানও। কিন্তু চিরকাল আমরা যা থেকেছি—তা হলো, সেই প্রাকৃতজনদের সন্তান, আমরা বাঙালি, আমরা মানুষ।

আমাদের সংস্কৃতি সে তো মানুষেরই সংস্কৃতি। তা রক্ষা পেলে, সমৃদ্ধ হলে মানুষের সংস্কৃতিই রক্ষা পাবে, সমৃদ্ধ হবে। মধ্যযুগে আমাদের পূর্বপুরুষ বড়ু চণ্ডীদাস বলেছিলেন : ‘সবার উপরে মানুষ সত্য।’ আমরা তো সেই সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। যাকে রক্ষায় মধ্যযুগের শেষ প্রান্তে—আরেক পূর্বপুরুষ কবি আব্দুল হাকিম বলেছিলেন : ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’ এর গভীর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আজকের বিশ্বপ্রেক্ষিতে তাকিয়ে দেখুন—ঔপনিবেশিক ভাষাসংস্কৃতি ধারণ করে কোনো জাতিই উন্নত হয় নি। চিন, জাপান, কোরিয়া, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মান, ইটালি সবাই তার নিজ ভাষাসংস্কৃতি ধারণ করেই শ্রেষ্ঠ। কাজেই আমাদেরও দাঁড়াতে হবে নিজস্বতা নিয়ে। এতেই সমগ্র মানবসভ্যতার লাভ। জগৎকে আমাদেরও কিছু দেওয়ার আছে। শুধু ঋণী হলে তো চলবে না। নানা রকম সাম্প্রদায়িক বিকার, অশিক্ষা, আগ্রাসন আর অস্তিত্বসংকটে আজ পৃথিবীর ৩০ কোটি বাঙালি। প্রধানত দুটি রাষ্ট্রে এদের বাস হলেও ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীব্যাপী। আবার প্রবাসীদের দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্ম ছিন্নমূল হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে অন্য সংস্কৃতিতে। নানা অর্থে বাঙালি আজ বড় বিপন্ন। তাকে আত্মরক্ষায় যোগ্য হতে হবে। প্রাণ-প্রকৃতি এবং সভ্যতা রক্ষায় অবদান রাখতে হবে।

বর্তমান সভ্যতাও এক ঘোর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের হাতে এসেছে আত্মধ্বংসের ভয়াবহ অস্ত্র। নতুন নতুন প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে বেড়ে যাচ্ছে মূল্যবোধহীন দিশেহারা প্রজন্ম। আছে ক্ষুধা-বৈষম্য-কুসংস্কার-অশিক্ষা আর জঙ্গিবাদ। আছে মানুষ ক্রয়-বিক্রয়ের নৈতিকতাহীন পুঁজিবাদী কর্পোরেট চালাকি। বিপন্ন আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির সেই উচ্চারণ : ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’।

পদার্থ বিজ্ঞানীরা এই ভয়ংকরতম সময়টিকে বলেছেন—জিরো সিভিলাইজেশন। এখান থেকে মানুষ প্রজাতিকে উত্তরিত হতে হবে টাইপ ওয়ান সিভিলাইজেশন বা প্লানাটারি সিভিলাইজেশনে। যে স্তরে আমরা প্রাকৃতিক শক্তিকে সম্পূর্ণ নবায়ন করে ব্যবহার করতে পারব, খাদ্যে স্বনির্ভর হব, ঝড় বন্যা মহামারি ভূমিকম্পসহ সমস্ত গ্রহটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হব। না হলে প্রজাতির ধ্বংস অনিবার্য। এই বিপদ থেকে স্বপ্নের সেই স্তরে পৌঁছতে হলে দ্রুত মানুষ প্রজাতির যোগ্য হওয়া দরকার। আর মানুষের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাঙালি। এ জাতিকেও যোগ্য করে গড়ে তোলা দরকার। যারা বাকিদের মঙ্গলেও কাজ করতে সক্ষম হবে।

শুধু একা স্বপ্ন দেখলে তো হবে না, চাই সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা, চাই সংগঠন। আর সেই স্বপ্নের বোধি বৃক্ষটির নাম- বিশ্ব বাঙালি সংঘ। আমরা স্বপ্ন দেখলাম, সংগঠন হলো। এখন সে নরম পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে।

কিন্তু জাতীয় সংকট মোকাবেলা বা জাতি বিনির্মাণের কাজটা আমরা শুরু করছি কেবল তা তো নয়! অনেক শ্রদ্ধাস্পদ অগ্রজ নিরলসভাবে এই কাজ করে আসছেন অনেকদিন ধরে। কাজেই শুরুতে আমরা ভাবলাম—এই মহান অগ্রজদের চরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোটাও কর্তব্য। তাই এই ‘বিশ্ব বাঙালি পুরস্কার’।


  • লেখাটি ‘বিশ্ব বাঙালি সংঘ’ আয়োজিত [১৯ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে] ‘বিশ্ব বাঙালি পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠানে সংঘাচার্যের ভাষণ।

(7748)