হোম গদ্য প্রবন্ধ ‘বিদায় অভিশাপ’ : উপেক্ষিত প্রাচ্য পুরাণ এবং একটি বিকলাঙ্গ বিনির্মাণ

‘বিদায় অভিশাপ’ : উপেক্ষিত প্রাচ্য পুরাণ এবং একটি বিকলাঙ্গ বিনির্মাণ

‘বিদায় অভিশাপ’ : উপেক্ষিত প্রাচ্য পুরাণ এবং একটি বিকলাঙ্গ বিনির্মাণ
3
0

সংঘাত-ই যেন ধরণীর আজন্ম নিয়তি। চক্রাকারে চলিষ্ণু আগ্রাসন—আধিপত্য স্থাপন—প্রকাণ্ড প্রতাপে পৃথিবী শাসন—অতঃপর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে সৃষ্ট সামগ্রিক ফ্রাস্টেইশন। বিবমিষাময় বিক্ষিপ্ত মনে, শান্তি-কপোতের অন্বেষণ। এই, শুধু এই হয়েছে ধরণীতে আজীবন! অনার্যের সঙ্গে আর্যের দ্বন্দ্ব। সাদার সঙ্গে কালোর দ্বন্দ্ব। ক্ষমতার সঙ্গে ক্ষমতাহীনের দ্বন্দ্ব। পৃথিবীর সমস্ত সঙ্গত দ্বান্দ্বিক বাস্তবতায় বর্ধিষ্ণু এই মানবসত্তায় লেখকের একটি মাত্র সুখ যে, উপনিবেশের দায়মুক্ত একটি ভাষা-সংস্কৃতি এবং আপসহীন একটি কলমের সে উত্তরাধিকার। ঔপনিবেশিক শাসক শোষণ-সুবিধায় বাঙালি জাতির যে সুবিধাজনক ভ্রান্ত ব্যাখ্যা নির্মাণ করে গেছে, তার সমস্ত কিছুর এখানেই হোক বিসর্জন। সত্য-জ্ঞান, ধৈর্য, দেশ-কাল, ন্যায়-নীতি, ভালো-মন্দসহ সৎবোধ ও জাতিসত্তার প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে বাঙালির আত্ম-পরিচয়ের সন্ধান আজকের লেখকের সর্বোচ্চ দায়। এই দায় থেকেই আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাট্য-কাব্য ‘বিদায়-অভিশাপ’-এর আলোচনা-পর্যালোচনা।

শুক্র বলে, কচ তুমি কহ বিবরণ।
আমার উদরে এলে কিসের কারণ।।
কচ বলে, আমারে মারিল দৈত্যগণ।
করাইল সুরাসহ তোমায় ভক্ষণ।।


হাজার বছর ধরে যে দেবসন্তান এক মানবীর সঙ্গে ছিনালপনা করে গেলেন সে কী করে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় হয়ে উঠল?


শুধু মাত্র দেবযানীর আবদার রক্ষার কারণে শুক্রাচার্য কচের জীবন ফিরিয়ে দেন। এই চরম নাটকীয় মুহূর্তে শুক্রাচার্য নিজ গর্ভস্থ কচকে মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্রদানে বাধ্য হন। নিজের উদর চিরে কচকে উদ্ধার করে শুক্রাচার্য মারা যান। সদ্য রপ্ত করা মন্ত্রে গুরু শুক্রাচার্যকে পুনর্জীবিত করে কচ। বিদ্যাশিক্ষা শেষ। এবার কচের বিদায়ের পালা। এই বিদায়ের পালাকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিনির্মাণ করলেন নতুন এক কচ এবং দেবযানী চরিত্র। রচনা করলেন তার অন্যতম নাট্য-কাব্য ‘বিদায় অভিশাপ’। ব্যাসের কচ বিদায়বেলায় তাদের সম্পর্ক বিষয়ে ভয়াবহ নির্লিপ্ত। হাজার বছর পর যে বিদায়মুহূর্ত, সেখানে কচকে দেখে মনে হয় যেন কোথাও কিছু হয় নি। অহেতুক দেবযানী এসব প্রেমের কথা তুলছে আজ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কচ-এ খানিকটা কৃতজ্ঞতার প্রকাশ দেখা যায়। যদিও তা দেবতাদের আচরণের সঙ্গে একদম বেমানান। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ শুরু থেকেই তার নায়কের সহায়, এবং যথারীতি নায়িকার বিপক্ষে তার অবস্থান। আসুন দু’টি আখ্যানের উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ স্বচক্ষে দেখে নেয়া যাক।

কচ।
শঙ্কা ছিল মনে,
পাছে দানবের গুরু স্বর্গের ব্রাহ্মণে
দেন ফিরাইয়া।
দেবযানী।
আমি গেনু তাঁর কাছে।
হাসিয়া কহিনু, ‘পিতা, ভিক্ষা এক আছে
চরণে তোমার।’ স্নেহে বসাইয়া পাশে
শিরে মোর দিয়ে হাত শান্ত মৃদু ভাষে
কহিলেন, ‘কিছু নাহি অদেয় তোমারে।’
কহিলাম, ‘বৃহস্পতিপুত্র তব দ্বারে
এসেছেন, শিষ্য করি লহো তুমি তাঁরে
এ মিনতি।’ সে আজিকে হল কত কাল,
তবু মনে হয় যেন সেদিন সকাল।

দারুণ মুনশিয়ানায় রবীন্দ্রনাথ সংযোগ করেছেন এই অংশটুকু। ব্যাসের রচনায় কচ সরাসরি শুক্রাচার্যের কাছে সব কথা উপস্থাপন করেন। শুক্রাচার্য সব জেনেই কচকে বরণ করে নেন। তবে বাবা-মেয়ের সম্পর্কের গভীরতা এখানে স্পষ্ট। বিদ্রোহী ভৃগু মুনির পুত্র শুক্রাচার্য যতই রাগী হন না কেন, মেয়ের বিষয়ে মাটির মানুষ। মহাভারতের ‘দেবযানী আখ্যানের’ সমস্তটা জুড়েই রয়েছে পিতা-পুত্রীর আবদারের সম্পর্ক। ভৃগু মুনির নাতনি হিসেবে দেবযানীও ভয়ংকর জেদি আর একরোখা, ব্যাসের বয়ানে তাও আমরা জেনেছি।

রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেছিলেন একটা গভীর প্রণয়-সম্পর্কের ট্র্যাজিক চিত্র অঙ্কন করতে। কিন্তু তা করতে গিয়ে অন্যায়ভাবে তিনি কচের সহায় হয়েছেন, এদিকে অসহায় করে তুলেছে দেবযানীকে। ব্যাসের মতো তিনিও বারবার প্রলুব্ধ করেছেন দেবযানীকে, যার একমাত্র কারণ মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা অর্জন। দেবযানী যেন কেবলই বলির শিকার হয়েছে কচের স্বার্থের পথে। ব্যাস এবং রবীন্দ্রনাথ এ বিষয়ে দারুণ মিলে গেছেন।

কচ।
আর যাহা আছে তাহা প্রকাশের নয়
সখী। বহে যাহা মর্মমাঝে রক্তময়
বাহিরে তা কেমনে দেখাব।

কচের এই সব বিনয়বাণীর স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ। এই সব আপ্তবাক্য দেবযানীকে প্রলুব্ধ করার কারসাজি, ইংরেজিতে যাকে বলে ফ্লারট করা, বাংলায় বলে ছিনালপনা। কী দোষ করেছিল দেবযানী? দোষ কি কেবল এই যে, সে দৈত্যকুলের সঙ্গে সম্পর্কিত? নাকি তার নারীজন্মই দোষের একমাত্র কারণ? অথবা দোষ কি এই যে, সে কচের প্রেমে পড়েছিল? হাজার বছর ধরে যে দেবসন্তান এক মানবীর সঙ্গে ছিনালপনা করে গেলেন সে কী করে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় হয়ে উঠল? কচের এই ছিনালপনার মূল কেন্দ্র স্বর্গ। সেখান থেকেই তাকে শিখিয়ে দেয়া হয়েছে—

শিষ্য হৈয়া শুক্র স্থানে কর অধ্যয়ন।
দেবযানী তাঁর কন্যা করিবে সেবন।।

এই সেবার নামে দিনের পর দিন দেবযানীর মনোরঞ্জনের মধ্যে দিয়ে একটু একটু করে জাগিয়ে তোলেন নি তার নারীমনের সুপ্ত বাসনাকে? নারী-পুরুষের প্রেম-বিয়ে-সংসারের এই স্বাভাবিক বাসনার জন্য কি কেবল দেবযানীই দায়ী? এতে কি কোনো দায় নেই দেবতাপুত্র কচের? কচের দেবযানী সেবার মূল লক্ষ্য দেবযানীর বাবার অমূল্য সম্পদ, মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়া—নিজের স্বার্থ রক্ষা করা। নিজেদের স্বার্থে দেবতাদের যা-তা রকমের অপকর্ম করার প্রমাণ ‘মহাভারতে’ অনেকবার দেখা গেছে। তাই দেবতাদের এই নিষ্ঠুরতায় ব্যথিত হবার কিছু নেই। কচ ঠিক তাই করেছিলেন, স্বর্গের দেবতাগণ তাকে যা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তাই সেই পুতুল মতো বলে, কচের উপর আমার কোনো অভিযোগ নেই।

কচ।
ঈর্ষাভরে তিনবার দৈত্যগণ মোরে
করিয়াছে বধ, তুমি দেবী দয়া করে
ফিরায়ে দিয়েছ মোর প্রাণ, সেই কথা
হৃদয়ে জাগায়ে রবে চিরকৃতজ্ঞতা।

আহা ভদ্রলোক, আর্যপুত্র বলে রবীন্দ্রনাথের চোখে কতই না ভালো কচ! কিন্তু ব্যাসের কচ এত ভদ্র না, দেবতাদের আচরণের সঙ্গে এইসব কৃতজ্ঞতা-স্বীকার-প্রবণতা হাস্যকর। তবু রবীন্দ্রনাথ কচকে নির্মাণ করলেন যথেষ্ট মানবিকতা দিয়ে, যার মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধের মতো মহান গুণও রবীন্দ্রনাথ সংযোজন করেছেন। সত্যি অসাধারণ বিনির্মাণ রবীন্দ্রনাথের, কৃতজ্ঞতা স্বীকারের মতো এই মহৎ গুণটি দেবতাদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায় না। কিন্তু যার বিপক্ষে এই বিনির্মাণ-বাসনা, তার কুষ্ঠিবিচার রবীন্দ্রনাথ একবারও করেন নি। তিনি বুঝতেই পারেন নি, দেবযানীর সঙ্গে তার সম্পর্ক এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা।

দেবযানী।
কৃতজ্ঞতা! ভুলে যেয়ো, কোনো দুঃখ নাই।
উপকার যা করেছি হয়ে যাক ছাই—
নাহি চাই দান-প্রতিদান। সুখস্মৃতি
নাহি কিছু মনে? যদি আনন্দের গীতি
কোনোদিন বেজে থাকে অন্তরে বাহিরে,

কী অদ্ভুত উদারতা! কী অভিনব ভাবনা রবীন্দ্রনাথের! নতুন এক দেবযানী যেন এসে দাঁড়ায় পাঠক/ দর্শকের মানসপটে। এই দেবযানী কী করে পারে তার কাঙ্ক্ষিত পুরুষকে নগ্ন অভিশাপে অভিশপ্ত করতে? কী করে পারে তার অমঙ্গল কামনা করতে? অথচ ব্যাসের দেবযানীর মধ্যে ঠিক উল্টো আচরণই দেখা যায়। কারণ ব্যাস তাকে কমলতুল্য কোনো মানবীরূপে উপস্থাপন করতে চান নি।

মরেছিলা তুমি, জিয়াইনু বারে বার।
মোর বাক্য নাহি রাখ কেমন বিচার।।

কচ তাকে প্রত্যাখ্যান করার পর দেবযানী নিজের মুখে এসব কথা বলে কচের অকৃতজ্ঞতার চিত্রটি উন্মোচন করেন। এতে ব্যাসের কাব্যগুণ এক বিন্দুও ম্লান হয় না, কারণ ব্যাসের মূল লক্ষ্য মডেল চরিত্র নির্মাণের মাধ্যমে জীবন ও ধর্মতত্ত্ব প্রচার করা।

দেবযানী।
…বিদ্যা এক ধারে,
আমি এক ধারে—কভু মোরে কভু তারে
চেয়েছ সোৎসুকে; তব অনিশ্চিত মন
দোঁহারেই করিয়াছে যত্নে আরাধন
সংগোপনে।…

দেবযানী বারবার চেষ্টা করেছে কচকে বোঝাতে। দেবযানীর সংলাপে স্পষ্ট অভিযোগ। তবে কি তাদের হাজার বছরের সম্পর্ক কেবলই প্রতারণা ছিল? শেষ পর্যন্ত কচের এই নির্লিপ্ত ভণ্ডামি সহ্য করতে না পেরে দেবযানী তাকে অভিশাপ দেন। কিংবা অভিশাপ দিতে বাধ্য হন। ব্যাসের দেবযানীর কাছ থেকে যা খুব স্বাভাবিক আচরণ বলেই মেনে নেয়া যায়, রবীন্দ্রনাথের দেবযানীর কাছে তা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত আচরণ নয়।

দেবযানী।
…তোমা-’পরে
এই মোর অভিশাপ—যে বিদ্যার তরে
মোরে কর অবহেলা, সে বিদ্যা তোমার
সম্পূর্ণ হবে না বশ—তুমি শুধু তার
ভারবাহী হয়ে রবে, করিবে না ভোগ;
শিখাইবে, পারিবে না করিতে প্রয়োগ।


কচের মতো চোরের মুখে রবীন্দ্রনাথ তুলে দিলেন সাধু-সাধু বলে চিৎকার করবার মতো স্বনির্মিত সুচিন্তিত স্বর।


শেষ অংশের এই ‘শিখাইবে’ মানে অন্যদেরকে শিখাতে পারার এই নমনীয় অংশটি রবীন্দ্রনাথের উদারতা। কাশীরাম দাস-অনূদিত ব্যাসের রচনায় দেবযানী বলে,

যত বিদ্যা তোরে পড়াইল মোর বাপে।
সকল নিস্ফল তোর হবে মোর শাপে।।

শিখাতে পারার এই ঘটনা ব্যাসের মহাভারতে উঠে এসেছে কচের দম্ভোক্তির মাধ্যমে, দেবতাসুলভ প্রভুত্ব ভাব কচের চরিত্রে আগাগোড়া উপস্থিত। কচ বলে,

মোরে শাপ দিলা তুমি, না যাবে খণ্ডন।
বিফল হইবে যত করিনু পঠন।।
আমি যত পড়াইব আর শিষ্যগণে।
সে সবারে ফলদায়ী হৈবে অধ্যাপনে।।

‘তুই তাও পারবি না, আবার দিলাম অভিশাপ, যা!’—দেবযানীর হয়ে রবীন্দ্রনাথ এই রকম কড়া কথা কিছু একটা বলে দিতে পারতেন। কিন্তু না, তিনি তা করলেন না। তিনি তা করতে চান নি। কারণ তিনি দেবযানীকে ছোট করবার এক তুমুল বাসনা বুকে নিয়েই কাব্য করতে বসেছেন। যে করেই হোক কচকে সাধু সাজাতেই হবে তার। এক তরফা অভিশাপ দিতে গিয়ে খুব ঠুনকো করে তুলেছেন তিনি দেবযানীকে, খুব খেলো মনে হয় তার নির্মাণকে। ব্যাস কিন্তু ঠিকই অভিশাপের বদলা নিতে পাল্টা অভিশাপে অভিশপ্ত করেছিলেন দেবযানীকে। কচ বলে,

কচ বলে দেবযানী, করিলা কি কর্ম।
বিনা দোষে শাপ দিলা, নহে এই ধর্ম।।
ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠ শুক্র, তুমি কন্যা তাঁর।
মোর শাপে ক্ষণ্ড্রভর্তা হইবে তোমার।।

ক্ষণ্ড্রভর্তা শব্দটি দিয়ে বোঝায় যে, কোনো নারীর উপস্থিতিতে তার স্বামী অন্য কোনো নারীর দ্বারস্থ হবে। সংস্কৃত সাহিত্যে নায়িকার আটটি অবস্থার মধ্যে সবচে বিরহকাতর অবস্থা হলো এই খণ্ডিতাবস্থা। কচের এই অভিশাপ সত্যিই ফলেছিল দেবযানীর জীবনে। এ নিয়ে তৈরি হয়েছিল আরও এক বিশাল নাটক। সে-নিয়ে কথা বাড়াবার মতো সময় আজ আমাদের হাতেও নেই, এমনিতেই এই লেখার কলেবর নিয়ন্ত্রণের প্রায় বাইরে।

সহস্র বছরের সমস্ত ঘটনার সবটুকু দোষ, তিনি যেন তুলে দেন দেবযানীর কাঁধে। তাই কচের মতো চোরের মুখে রবীন্দ্রনাথ তুলে দিলেন সাধু-সাধু বলে চিৎকার করবার মতো স্বনির্মিত সুচিন্তিত স্বর।

কচ
আমি বর দিনু, দেবী, তুমি সুখী হবে।
ভুলে যাবে সর্বগ্লানি বিপুল গৌরবে।

রবীন্দ্রনাথ কচের সারথি সেজে, পুনর্নির্মাণ বাসনায় ব্যাকুল হয়ে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে দিলেন সূর্যের মতো সত্যকে। ঢেকে দিলেন ‘বিদায় অভিশাপ’ নাট্য-কাব্যের সবটুকু শিল্প-সম্ভাবনাকে। বিচ্ছেদ যাদের শেষ পরিণাম, তাদের বিচ্ছেদ অন্য উপায়েও সম্ভব ছিল। কাটা ঘায়ে কেন এই নুনের ছিটা? সে-যুগের দেবযানী হয়তো শুনতে পায় নি রবীন্দ্রনাথের স্বর, কিংবা দেখতে পায় নি তার তাচ্ছিল্যভরা দুটি চোখ। কিন্তু এ যুগের দেবযানী, নিশ্চিত এই অন্যায় আচরণের বিচারপ্রার্থিনী।

‘মহাভারতে’র দেবযানীর আখ্যানটিকে ভীষণ ভালো ভেঙেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। দারুণ দাঁড়িয়েছিল দেবযানী, ‘মহাভারতে’র পৌরাণিক পৃষ্ঠা থেকে উঠে এসেছিল অত্যন্ত আধুনিক মন ও মানের একজন নারী। উঠে এসেছিলেন বাংলার কোনো আধুনিক পণ্ডিত বাবার ঘরে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত পারলেন না তার নির্মাণকে যোগ্য সম্মানে ভূষিত করতে। বরং পুরাণকে ভেঙে নতুনত্ব আনতে গিয়ে অদ্ভুতভাবে পক্ষপাতদোষে দুষ্ট হন তিনি। ‘মহাভারতে’র পারস্পরিক অভিশাপে ব্যাসের তেমন কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না, অনার্য-রচিত আর্য-আখ্যান রচনায় ব্যাস সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। অসাধারণ কবিত্ব ও অভূতপূর্ব ঐতিহাসিকতা রক্ষায় ব্যাস কালোত্তীর্ণ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই একপাক্ষিক অভিশাপ-দানের দায়ে পক্ষপাতদোষে তিনি দায়ী। পারস্পরিক অভিশাপ-দানে যে দায় ব্যাসের নেই। হয়তো তখন তা বিনির্মাণ না হয়ে পুনর্নির্মাণ হতো, নতুন ব্যাখ্যায় তবু বিনির্মাণও হতে পারতো। তাতেও কচ-দেবযানী দুজনই তার নব নির্মাণে যথেষ্ট দেশজ হয়ে উঠত। নতুন ব্যাখ্যাদানের জন্য বিনির্মাণই করতে হবে এমন তো না, পুনর্নির্মাণেও নতুন ব্যাখ্যাদানের পথ খোলাই ছিল। উপরন্তু তার সামনেই ছিল মেঘনাদবধ কাব্যের মতো প্রকৃষ্ট পুনর্নির্মিত কাব্য।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত মেঘনাদবধ কাব্যের মধ্য দিয়ে পৌরাণিক জাত-মহাকাব্য রামায়ণের সময়োচিত ব্যাখ্যা তৈরি করে বিনির্মাণের বিশিষ্ট মডেল নির্মাণ করে গেছেন সেই কোন কালে। রবীন্দ্রনাথ তা পড়েছেন, অল্প বয়সে তার সমালোচনাও তিনি লিখেছেন। যদিও রবীন্দ্রনাথ নিজেই সেই সমালোচনা নাকচ করেছেন। সমালোচনা না বলে অসংলগ্ন আবেগ বলাই বেশি ঠিক মনে হবে। সদ্য ‘রামায়ণ’ পাঠশেষে মাইকেলের বিনির্মিত লঙ্কাকাণ্ডকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না যেন সদ্য কিশোর রবীন্দ্রনাথ, কারণ তাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল তার প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস। কিন্তু তারপরও রবীন্দ্রনাথ থেমে থাকেন নি, একদিন এই রবীন্দ্রনাথই মাইকেলকে নিয়ে লিখলেন, ‘জীবনমন্থনবিষ নিজে করি পান/ অমৃত যা উঠেছিল করে গেছ দান।’ মধুসূদন দত্তের সাহিত্য আজ আর কথা নয়, এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি সামনে হবে বলেই আমার ধারণা। তবে তাদের দুজনের মননগত তফাত আসলে তাদের ধর্মবিশ্বাসজাত। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ধর্ম বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত, রবীন্দ্রনাথ প্রকটভাবে ধর্মসংযুক্ত। আর এজন্যই আজকে এই বিষয়ে লেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ৩১ বছরের যুবক রবীন্দ্রনাথ, পরিণত রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে টু-শব্দটি এখনও করি নি।

‘বিদায় অভিশাপ’-এ রবীন্দ্রনাথ তার ধর্মীয় চেতনা থেকে পুরাণকে ডিল করতে গিয়েই, ধর্মীয় বিশ্বাসের দেব-দানব বোধ থেকে দেবতাদের গুণগান সাজিয়ে ফেলেছেন। এইসব দেবতাপ্রীতি মধ্য যুগেই শেষ। আধুনিক কাল পুরাণকে আকরগ্রন্থ হিশেবেই বিবেচনা করে, পুরাণের ধর্মীয় বিবেচনা নিতান্তই সম্প্রদায়গত, সম্প্রদায়ের পূজা-অর্চনা ব্রত সর্বোপরি বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। ‘ধর্ম ইতিহাস কিংবা পুরাণ কাহিনী।/ শ্রবণে মানস কিবা কহ মহামুনি।।/ সৌতির বচন শুনি কন মহামুনি।/ তব তাত সূত ছিল সর্বশাস্ত্র জ্ঞানী।।/ নানাচিত্র বিচিত্র কথন পুরাতন।/ সূতমুখে বহু শাস্ত্র ক’রেছি শ্রবণ।।’—কাশীরাম দাস-অনূদিত ‘মহাভারত’। ‘মহাভারত’ পরম্পরার ঐতিহাসিক সত্য। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, ‘হিন্দু’ শব্দটির কোনো উল্লেখ নেই এতে, অষ্টম শতকী ‘হিন্দু’ শব্দটি নিতান্ত কম বয়সী এর তুলনায়। আধুনিক শিল্পসাহিত্যে তাই ইতিহাস কিংবা পুরাণের গল্প-চরিত্রগুলি নানা মাত্রায় ব্যবহৃত ও বিনির্মিত হতে হতে মানুষের কোল ঘেঁষে কখনও জীবনের সঙ্গে, কখনও শিল্পের সঙ্গে, কখনওবা অন্তর্গত চেতনার সঙ্গে মিশে গেছে।

অধুনা নারীবাদী মহল একবার কথা তুলেছিল ‘বিদায় অভিশাপ’ প্রসঙ্গে, কথা তুলেছিল দেবযানীর পক্ষের উকিল হয়ে। কিন্তু সেও এক ভয়ানক প্রোপাগান্ডা। দেবযানীকে খোঁজা নয়, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল রবীন্দ্রনাথ যে যথেষ্ট নারীবাদী ছিলেন না সেটা প্রমাণ করা। ফলে তাদের আলোচনাতেও পাওয়া গেল না কাঙ্ক্ষিত দেবযানীকে। ‘মহাভারতে’র দেবযানীর নৃতাত্ত্বিক ধারণা তাদের লেখায় ভয়ংকর অস্পষ্ট। তাদের দেয়া অস্পষ্ট ধারণা কিংবা অপাঙ্‌ক্তেয় ব্যাখ্যার বিন্দুমাত্র গ্রহণযোগ্যতাও হয়তো আজ আর নেই। আছে কিছু ভুল ধারণা এবং কিছু অর্ধ-শিক্ষিত মানুষের অন্ধবিশ্বাস। আর এই অন্ধত্বকে পুঁজি করেই নিজের কালের বাহ্‌বা কুড়িয়েছেন তারা। অনেকের কথা বাদই দিলাম, রবীন্দ্রনাথ কিংবা হুমায়ুন আজাদের মতো অত বড় লেখকদ্বয় কী করে এড়িয়ে গেলেন প্রাচ্যের নান্দনিক দার্শনিকতা! দুজন সমাজসচেতন আধুনিক লেখক সমাজতাত্ত্বিক-নৃতাত্ত্বিক পর্যালোচনাকে পাশ কাটিয়ে কী দুর্ভাবনায় তাদের নতুন পাঠ নির্মাণ করলেন? যদিও এ নিয়ে গবেষণা এই লেখার প্রকৃত পাঠ না। তবে আমার ব্যক্তিগত অনুমান, তারা দু’জনই সম্পূর্ণ অচেতন ছিলেন দু’জনের প্রোপাগান্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ফেঁসে গেছেন, পুরাণের সচেতন বিনির্মাণ কৌশলের মধ্য দিয়ে মহান আর্ট তৈরির ফাঁদে; আর হুমায়ুন আজাদ, ‘নারীবাদ’ নামের পাশ্চাত্য স্থূলতায়। উপনিবেশের এক মস্ত বড় অবদান—আমাদের উৎকৃষ্ট কচি মাথাগুলি পূর্ণমাত্রায় গ্রাস করে নেয়া, হয়তো তারাও সে-গ্রাসের শিকার। আর এই ঔপনিবেশিক দায় থেকেই নির্মিত তাদের পৌরাণিক পাঠ এবং দেবযানী। উপনিবেশের এই দায়কে এড়িয়ে গিয়ে আজ তাই নতুন করে খুঁজতে যাচ্ছি দেবযানীকে। প্রিয় পাঠক, আসুন আমরা ব্যাসের ‘দেবযানী আখ্যানে’র পৌরাণিক স্থান-কাল-পাত্র বিষয়গুলি একটু গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করি।

তিলেক প্রমাণ কৈল খড়গতে কাটিয়া।
ঘৃতে ভাজে অস্থি-মাংস একত্র করিয়া।।
তবে সব দৈত্যগণ করিল বিচার।
অন্যজনে খেলে তার নাহিক নিস্তার।।
পুনঃ জীয়াইবে শুক্র মন্ত্রের প্রভাবে।
কচ প্রাণ পাবে আর তার প্রাণ যাবে।।
এতেক বিচার করি যত দৈত্যগণ।
করাইল সুরাসহ শুক্রেরে ভোজন।।


রবীন্দ্রনাথের বিনির্মাণ কৌশলগত দিক থেকে যত বেশি সার্থক, ভাবগত দিক থেকে তার অধিক হারে ব্যর্থ।


নাট্য-কাব্যের আলোচনা সামান্য নাটকীয়তা দিয়েই শুরু করা যাক। ভৃগুর পুত্র শুক্রাচার্য। সমকালীন সময়ের একজন অসামান্য ধর্মগুরু। যিনি দৈত্যদের কুলগুরু। তিনি ঘি’য়ে ভাজা মানুষের মাংস আর মদ পান করছেন। তার মানে সে-দেশে মানুষের মাংস খাওয়া সামান্যও দোষের কিছু নয়, বরং যথেষ্ট বিধি সম্মত একটি সংস্কৃতি। মানুষ খেকো এই সংস্কৃতি আজকের দিনের প্রেক্ষিতে একটু ভয়ংকর মনে হলেও আমরা সেটা স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিচ্ছি, কারণ কোনো জাতি-গোষ্ঠীর ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে ক্রোধ বা ঘৃণা প্রকাশ করার এখতিয়ার আমাদের নেই। নৃবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনা এই লেখার বিষয় না, সে-প্রসঙ্গে আর যাব না। কিন্তু এরা যে আমাদের অঞ্চলের না, তা কিন্তু নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে। আমরা মূলত শুক্রাচার্যের সন্ধান করছিলাম এজন্য যে, ইনি আমাদের নাটকের নায়িকা দেবযানীর বাবা। নায়ক কচের শিক্ষাগুরু। নিবাস বৃষপর্বপুর। রাজা বৃষপর্ব। স্বর্গের দেবতারাও যে অঞ্চলকে দুর্গম হিসেবেই চিহ্নিত করেন, ‘বৃষপর্বপুরে হয় শুক্রের বসতি। তোমা যাইতে না পারে কোন কৃতি।।’ ব্যাস বর্ণিত দেবতাদের স্বর্গপুরীর অবস্থান সুমেরু শিখর। যে সুমেরু শিখর আজও রহস্যাবৃত বিস্ময়। সুতরাং উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত আসাটা কঠিন কাজ-ই ছিল বটে। এই বৃষপর্বপুরের পাশেই ছিল চৈত্ররথ নামের বিশাল বন। বনটির মালিক কুবের। ধনপতি কুবের। বৈদিক অসুর, ব্যাসের রচনায় ধনের দেবতায় রূপ পায়। সেই ধন সম্পর্কে কমবেশি সবার-ই কিছু আছে জানা, সে-ধন মাটির নিচে খনির আকারে থাকা অস্বাভাবিক না। তাই মনে হয়েছে ল্যাটিনের অবহেলিত নিয়ান্ডারথাল কিংবা আরও পরের, যারা ভারতের তারা ভীষণ পয় পেত ওদের। কারণ ভীষণ ম্যাজিকাল কিছু শক্তি ছিল ওদের গায়ে। তাদের কাছে দৈত্য ভয়ংকর। কাছাকাছি একটা কোথাও ভারতবর্ষীয় এলাকার শুরু। কারণ সমকালীন ভারতের আর্য রাজা যযাতি এই চৈত্ররথ বনে যেতেন হরিণ শিকার করতে। এই হরিণ শিকারের সূত্র ধরেই দেবযানীর সঙ্গে যযাতি রাজার বিয়ে হয়েছিল। ঘটনাচক্রে বৃষপর্বপুরের রাজকন্যা শর্মিষ্ঠাও একটা সময়ে যযাতি রাজার স্ত্রীর মর্যাদা পান। এই দুই রমণীর দুই সন্তান আমাদের ভীষণ পরিচিত। দেবযানীর প্রথম পুত্র যদু, যিনি যদু বংশের প্রতিষ্ঠাতা। এই যদু বংশেই আর্যগুরু কৃষ্ণের জন্ম, যিনি সমকালীন বিশ্বে ভারতীয় রাজনীতির প্রতিষ্ঠাতা। ন্যায় বিচার, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা সব মিলে সৎ এবং শক্তিমান। এই আধা মানুষ, আধা দেবতা যাদের দেখি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার অগ্রনায়ক হিসেবে। এরাই আর্য। ‘মহাভারতে’ ব্যাস খুব পুঙ্খানুপুঙ্খও বর্ণনা দিয়েছেন আর্যদের। এরা প্রায় সবাই অভিশপ্ত দেবতা। শান্তি প্রতিষ্ঠার পর, এরা সবাই দল বেঁধে চলে গেলেন। কিছু মারা গেল যুদ্ধে। বাকি ৫৬ কোটি যদু বংশের ধ্বংসের কারণ কৃষ্ণ, এবং তিনিও চলে গেলেন। সত্যি ব্রাহ্মণদের যোগ্য মাতা দেবযানী। এদিকে কৃষ্ণ চলে যাবার পর, পাণ্ডবগণও শাপ মুক্ত হয়ে স্বর্গের পথে হাঁটা দিলেন। এই দেবযানী থেকে কৃষ্ণের আগমন-গমনের মধ্যবর্তী হাজার বছরের ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ব্যাসের ভাষায় খুব স্পষ্ট। একদম আলাদা একটা লেখা লিখতে হবে তা নিয়ে। যে ইতিহাসের সঙ্গে বাঙালি জাতির ধারণা বেশ স্পষ্ট, গভীর।

শর্মিষ্ঠার গর্ভের দ্বিতীয় এবং যযাতির চতুর্থ সন্তান পুরু রাজা হলেন। এই পুরু থেকে ক্রমান্বয়ে এসেছে পরিচিত পাণ্ডব এবং কৌরবগণ। এখানেও সহস্র বর্ষের কথা বাকি রেখে মূল আলোচনায় চলে যেতে হচ্ছে।

অর্থাৎ এই উপমহাদেশের মানুষ হিসেবে যদি কিছুটা সম্পর্কসূত্র আমাদের থেকেই থাকে, তবে তা আছে অনার্য মাতা শর্মিষ্ঠার সঙ্গে। কচ-দেবযানী কিংবা আর্যদের সঙ্গে আমাদের তেমন কোনো আত্মিক সম্পর্ক নেই। আছে ধর্মীয় সম্পর্ক, আছে শাসক সম্প্রদায়ের অনমনীয় বিশ্বাস। আর্য সাম্রাজ্যে পরাধীন উপনিবেশ বাঙালি। কিন্তু ফেলনা না, যথেষ্ট শক্ত-পোক্ত।

আর্য-অনার্য প্রসঙ্গে অনার্যদেরও আছে মহান গৌরব গাথা। অনার্যগুরু ব্যাসের বর্ণনায় প্রমাণ আছে, দানব-দেবতাদের আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য মানুষের কাছে পাঠানো হতো। স্বর্গে কোনো অন্যায় করলেই শাস্তি [অভিশাপ] স্বরূপ মানুষ জন্ম দিয়ে মর্ত্যলোকে প্রেরণ করতেন, এবং আত্ম-শুদ্ধির সময় ও সুযোগ দিত। ভাবতে ভালো লাগে যে, স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল তিনলোকে মানুষ-ই শ্রেষ্ঠ জীব।

দেবযানীর এই গল্পের সময়-কালও আজ-কালের না, ব্যাসদেবের জন্মের বহু আগের গল্প। পুরাণ কাহিনির আর্যদেরও পৌরাণিক গল্প, দেবযানীর উপাখ্যান। সব দিক বিবেচনা করে আমি মনে করি কুবেরের রাজ্য—বৃষপর্বপুর রাজ্য দু’টি বর্তমান লাতিন আমেরিকার কোনো অঞ্চল। সেই সময়ের কোনো ম্যাপ নেই, সুতরাং সেই ম্যাপ দেখবার একমাত্র যন্ত্র অনুভূতির চোখ। অনার্যগুরু ব্যাস রচিত ‘মাহাভারত’ কোনো আঞ্চলিক গল্প মাত্র না। তার ভাষ্য মতে, অষ্টদশ দ্বীপে গড়া সসাগরা পৃথিবীর গল্প ‘মহাভারত’। তবে গল্পে এই অঞ্চলকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে এই অঞ্চলের মানুষের এক ধরনের ধারণা যে, সমগ্র গল্পটাই এই অঞ্চলের। এই আর্য ভাবনা ভাবলে, অনার্যদের ইতিহাস অবরুদ্ধ হবে। অনার্য মানেই আর্যদের দাস না। তবে আর্যরা ততদিনে ভারত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে অনার্য রাজ্যগুলিকে উপনিবেশে পরিণত করে নিয়েছে। অনার্যরা আর্য সাম্রাজ্যের করদায়ী রাজ্য। ‘মহাভারতে’র যুদ্ধ শেষে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর রাজা যুধিষ্ঠিরের নিমন্ত্রণে পৃথিবীর অনার্য রাজারা নিমন্ত্রিত হয়ে আসেন, ভোজসভায় অপর্যাপ্ত ঘোড়ার মাংসের আয়োজন দেখে আমার ধারণা আরও স্পষ্ট হয়। কারণ ঘোড়ার মাংস তো এই অঞ্চলের খাবার না, হয়তো তা আফ্রিকান কিংবা মঙ্গোলিয়ানদের জন্য রান্না করা হয়েছিল। এ নিয়ে আরও যুক্তি উপস্থাপন করা সম্ভব, কিন্তু না—আলোচনা দীর্ঘ না করে মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।

আলোচ্য স্থান-কাল-পাত্র বিষয়ক সামান্য বোধটুকু আত্মস্থ না থাকলে তার পক্ষে ‘দেবযানী আখ্যানে’র বিনির্মাণ প্রায় অসম্ভব। প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে রবীন্দ্রনাথের কি এসব বোধ ছিল না? বোধ ছিল, তার সেই বোধের জন্ম আরও অনেক পরের গল্প, সে-অনেক গল্প। ‘বিদায় অভিশাপ’ কালে তার বয়স ৩১। ৩১ বছর বয়সের বোধে এত কিছু না থাকা-ই স্বাভাবিক। আসলে অনুবাদ, পুনর্নির্মাণ কিংবা বিশেষ কোনো শব্দ ব্যবহার খুব সহজ হলেও, পৌরাণিক গল্পের বিনির্মাণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজটি করতে গিয়ে অনেকের মতো রবীন্দ্রনাথও ভয়ানকভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। কেন না, অনার্য পুত্রের এই আর্য বিজয় মাহাত্ম বর্ণনা—উপনিবেশের অনার্য হয়ে, উত্তর উপনিবেশে বসে মনে কোনো সুখোদয় ঘটায় না। এতেই কিন্তু তার নাট্য-কাব্যটি সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন হয়ে যায় না, দরকার একটু বিস্তারিত পর্যালোচনা।

দেবযানীর আখ্যানের মধ্য দিয়ে কোনো রোম্যান্টিক প্রণয়োপাখ্যান নির্মাণ ব্যাসের মূল অভিপ্রায় নয়। ব্যাসের কাঙ্ক্ষিত অভিপ্রায় তত্ত্ব প্রচার, যে তত্ত্ব জীবনের, যে তত্ত্ব ধর্মীয় ও সামাজিক বন্ধনের। পুরাণের প্রতিটি আখ্যান-ই কোনো না কোনোভাবে এই তত্ত্ব-ই প্রচার করে লোকশিক্ষার প্রয়োজনে। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে এই আখ্যানের মূল তত্ত্ব কী?

যেই গুরু শুক্র হইতে তব জন্ম হয়।
সেই গুরু হইতে আমার জ্ঞানোদয়।।
সহোদরা তুমি হও সহজে আমার।
কিমতে এমত বল বাক্য কদাচার।।

অর্থাৎ, গুরু কন্যা নিজের বোনের সমতুল্য। তাই এদের মধ্যে প্রেম-বিয়ের মতো সম্পর্ক দাঁড়ানো অনুচিত। দেবযানীর সম্পূর্ণ আখ্যানজুড়ে আরও অনেক তত্ত্ব কথা ব্যাস উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমরা যেহেতু দেবযানীর কাছ থেকে কচের বিদায় নেয়ার অংশটুকু নিয়ে আলোচনা করছি, তাই বাকি অংশের কাহিনি কিংবা তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করে আলোচনা দীর্ঘ করব না।

এদিকে রবীন্দ্রনাথেরও মূল অভিপ্রায় না ব্যাসের মতো তত্ত্ব প্রচার, তার তাই মূল অভিপ্রায় বিদায় অভিশাপের মধ্যে দিয়ে একটা চিরন্তন রোম্যান্টিক প্রণয়োপাখ্যান নির্মাণ। তাই ব্যাসের জীবন তত্ত্বকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে, পাঠককে তত্ত্ব বঞ্চিত করে রবীন্দ্রনাথ প্রেমের পথে পাড়ি জমালেন। সেই চেষ্টায় রবীন্দ্রনাথ খানিকটা সফলতার মুখ হয়তো দেখেছিলেন, কিন্তু আজকের আলোচনার পর তাঁর সফলতার ছিটে-ফোঁটাও অবশিষ্ট থাকে না। তার বিনির্মাণ প্রয়াস তাই দারুণভাবেই ব্যর্থ। বিনির্মাণের নামে তিনি বরং একটি পৌরাণিক কাহিনির বিকৃত রূপকেই উপস্থাপন করেছেন। যে জন্য আমার মনে হয়েছে বিদায় অভিশাপ একটি বিকলাঙ্গ বিনির্মাণ প্রয়াস মাত্র। কোনো সার্থক বিনির্মাণ চিত্র এখানে আদৌ নেই। কচ অভিশাপ না দিয়ে যদি সামান্য একটা ‘সরি’ বলত, দেবযানী কি পারতো অভিমান ধরে রাখতে? পারতো না, নিশ্চিত পারতো না। হয়তো শেষ পর্যন্ত প্রসন্ন চিত্তে বিদায় দিয়ে দিত কচকে। যে নারী একাধিকবার তাকে জীবন দান করার ক্ষমতা ধারণ করে, একটু বিনয় বচনে সে নারী তাকে ক্ষমাও করে দিতে পারতো। তাতে দেবতার দম্ভ কিছু একটু কমলেও কমত হয়তো, কিন্তু তাতে কচ-দেবযানী অন্তত আমাদের আপনজন হয়ে উঠতে পারতো। কচের এই দম্ভ ভরা বিদায় বাণী যতটা অপমানিত করে, ঠিক ততটা ব্যথিত করে না হৃদয়কে। ট্র্যাজিক আবহটা ঠিক তৈরি হয়, কিন্তু আবহাওয়াটা পাঠক-দর্শককে ঠিক স্পর্শ করতে পারে না। অপমানে-ঘৃণায় মন কেমন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। তাই আমার মনে হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের বিনির্মাণ কৌশলগত দিক থেকে যত বেশি সার্থক, ভাবগত দিক থেকে তার অধিক হারে ব্যর্থ।


নব ব্যাখ্যা, বিচারের নামে ‘বিদায় অভিশাপ’ নিয়ে অবিচার যদি খানিকটা হয়েই থাকে, তবে পরিণত রবীন্দ্রনাথ হয়তো নিজগুণে তা ক্ষমা করে দিবেন।


শিল্পী তার নিজের মতো সৃষ্টি করবেন। সমালোচক তার যৌক্তিক ব্যাখ্যায় সেই সৃষ্টির আলোচনা-পর্যালোচনা করবেন। দু’জন-ই ভীষণভাবে স্বাধীন তাদের কাজে। তবে দেশ-কাল-স্থান-পাত্র বিবেচনায় একজন শিল্পীও মানুষ, এই সমাজেরও মানুষ, সমাজের সঙ্গে তার ভয়ংকর দায়বদ্ধতার একটা গভীর সম্পর্কও তাকে বিবেচনায় রাখতে হয়। যখন-তখন যা নয় তাই বলে দিলাম কিংবা লিখে ফেললাম অথবা এঁকে ফেললাম, এটুকু সম্পূর্ণ অনুচিত। নইলে রাস্তার একটা পাগলের সঙ্গে তার তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না।

৩১ বছরের যুবক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘বিদায় অভিশাপ’ বিষয়ে আমার এই পর্যালোচনা কোনো বেদ বাক্য না, হয়তো তা উপনিবেশের ভার মুক্ত চিন্তার সামান্য নতুন ভাবনা। ১৬ বছরের কালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ পড়তেই যাদের ফেটে যায়, এই তাদের-ই একজন আমি এত কথা বলছি যুবক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে।

তবে একথা নিশ্চিত করে ঘোষণা করতে পারি, অনার্যপুত্রের জীবদ্দশায় এমন পর্যালোচনা লিখা হলে—তা পাঠ মাত্র তিনি বিনির্মাণ করতে বসতেন দেবযানী আখ্যানকে। অথবা দেবযানীকে নিয়ে লেখার চিন্তাই ঝেড়ে ফেলতেন মাথা থেকে। এতটা সাহসের সঙ্গে এই ঘোষণাপত্র পাঠ করবার অন্যতম কারণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আফ্রিকা প্রীতি। ল্যাটিনরা যেমন তার ‘গীতাঞ্জলি’কে অমৃত সম আকণ্ঠ পান করেছে। পরিণত রবীন্দ্রনাথও সাদা-কালোর সংঘাতে ল্যাটিনের পক্ষে লিখেছেন। ‘আফ্রিকা’ কবিতার সেই সুদূরের আফ্রিকা—

উদ্‌ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে
স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে
নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত,
তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা-নাড়ার দিনে
রুদ্র সমুদ্রের বাহু
প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে, আফ্রিকা,
বাঁধলে তোমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায়
কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে।

‘রুদ্র সমুদ্রের বাহু’—সমুদ্রের এই বাহুটি শরীর থেকে সরে যাবার অনেক আগের ‘দেবযানী আখ্যান’। ব্যাসের বয়ানে যে পৃথিবীর চিত্র, সে-চিত্রে আফ্রিকা অতটা দূরে চলে যায় নি তখনও। টলেমি তখনও জন্মান নি আদৌ কোনো ভূ-খণ্ডে। এজন্যই এই লেখায় আগে একবার উল্লেখ করেছি যে, ব্যাসের বিশ্বের ভূগোল সম্পূর্ণ জ্ঞান-চক্ষু নির্ভর এখনও। সরস্বতী নামের নদী হারিয়ে গেছে, সূর্য বিজ্ঞান হয়তো একদিন সে-নদীর গতিপথটুকু অন্তত উদ্ধার করবে। সেদিন না হয়, সমস্ত অনার্য পুত্রদের মহা মিলন ঘটবে পৃথিবীতে।

নব ব্যাখ্যা, বিচারের নামে ‘বিদায় অভিশাপ’ নিয়ে অবিচার যদি খানিকটা হয়েই থাকে, তবে পরিণত রবীন্দ্রনাথ হয়তো নিজগুণে তা ক্ষমা করে দিবেন। তাই রবীন্দ্রস্কুলের গুরুভাইদের কাছ থেকেও সে-মার্জনা আমি অবশ্যই আশা করতে পারি। তবে এই মার্জনা ভিক্ষার অর্থ এই না যে, এ বিষয়ে বাহাজ করা যাবে না। বাহাজের পথ খোলা, নইলে যে বন্ধ হয়ে যাবে আমার জানার জানালা। সে-পথ তাই হরদম খোলা।

(3)