হোম গদ্য প্রবন্ধ ফ্রানৎস ফানোঁ : জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের বয়ান

ফ্রানৎস ফানোঁ : জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের বয়ান

ফ্রানৎস ফানোঁ : জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের বয়ান
0

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরাধীনতা থেকে মুক্তিলাভের সংগ্রামে হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তিত্ব আজীবন লড়াই করে গেছেন। এইসব লড়াকু যোদ্ধাদের মধ্যে অসাধারণ তাত্ত্বিক ছিলেন ফ্রানৎস ফানোঁ [১৯২৫-১৯৬১]। এখনো পর্যন্ত তিনি আমাদের কাছে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও পঠিত কণ্ঠস্বর হয়ে আছেন। উল্লেখ্য, প্রধানত দুটি কারণে তাঁর স্বল্পায়ু জীবন খুবই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। প্রথমত, আলজেরীয় জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নিবেদিত চিত্তে তাঁর অংশগ্রহণ; দ্বিতীয়ত, বন্দি দশা থেকে মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে মানবসত্তাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তা সুনিবিড়ভাবে বিশ্লেষণকরণ। আফ্রিকার ভাবজগতে তাঁর লিখিত ভাষ্য প্রধান পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। বিপুল জনগোষ্ঠী তাঁর রচনায় আকৃষ্ট হওয়ার ফলে বহুজাতির দৈহিক মিলনে গঠিত জাতি এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেশী-গোষ্ঠী একই মতাবলম্বী হয়ে মানবদরদি চিন্তা ও বন্দি দশা থেকে মুক্তিলাভের সংস্কৃতি নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। সাধারণত পরাধীনতা থেকে মুক্তির সংগ্রামে ক্ষমতার মুখোমুখি পাল্টা জবাব হিসেবে এই মিশ্রিত সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেয়া হয়, যা সংস্কৃতি নির্মাণের ক্ষেত্রে কেবল জাতীয় সংস্কৃতি গ্রহণের পন্থা অবলম্বন করে। আফ্রিকানবাসী পণ্ডিত প্যাগেট হেনরীর মতে, সংস্কৃতি নির্মাণের এই প্রক্রিয়া আফ্রিকার রাজনৈতিক দর্শন নির্মাণ করছে।

ফ্রানৎস ফানোঁ কিভাবে ও কেন জনগণের নীতি-নৈতিকতার কাণ্ডারি ও জ্বালাময়ী ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন, তা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আমরা তাঁর চিন্তার উৎকর্ষতা বুঝতে পারি। এই মহৎ ব্যক্তির চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উৎসাহী ব্যক্তিত্বগণ গ্রামীণ ও মজলুম জনগোষ্ঠীর ইনসাফ লাভে কাজ করে গেছেন। তাঁর লিখিতকালো চামড়া, ধলো ঢাকনা [Black Skin, White Mask, 1952] গবেষণাটি বর্ণবাদবিরোধী মানবদরদি চিন্তার আমূল পরিবর্তনকামী প্রথম গ্রন্থ। বইটি শ্বেতাঙ্গ কিংবা কৃষ্ণাঙ্গ বর্ণ, কোনোটাকেই প্রাধান্য দিয়ে লেখা হয় নি। বন্দিত্বের কবলে আটকে পড়া মজলুম মানুষের বয়ান হিসেবে এটি তিনি লিখেছেন, যা তাঁর পরবর্তী গবেষণাগুলোতে প্রভাব ফেলেছে। ফানোঁর গায়ের বর্ণ ছিল কৃষ্ণ; তবে তাঁর সামাজিক অবস্থান উন্নত হওয়ায় একটু বেশি সুযোগ-সুবিধা লাভ করতেন। এই অবস্থানের প্রেক্ষিতে বইটিতে তিনি বিস্তর পরিসরে নিজের বয়ান তুলে ধরেন। তাঁর লিখিত পরবর্তী বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ হলো আলজেরীয় বিপ্লবের পঞ্চম বছর  [L’An V de la Révolution Algérienne, 1959] অধিকতর সুপরিচিত গ্রন্থটি হলো দুনিয়ার দণ্ডপ্রাপ্ত [The Wretched of the Earth, 1961]। বইটি লেখার উদ্দেশ্য ছিল বন্দি দশায় আটকে পড়া মজলুম “দেশবাসী”র মধ্যে নিজেদের জমি ও মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগ্রামী মানসিকতা ও সচেতনতা তৈরি করা। তাছাড়া এটি সংস্কৃতি ও সভ্যতার সার্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে ইউরোপের পূর্বপরিকল্পিত ভেজাল প্রকল্পকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছিল। মানবতা সম্পর্কে বইটি ফানোঁর অকপট বক্তব্য এবং বলিষ্ঠ নৈতিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত পরাধীনতা থেকে মুক্তিকামী তত্ত্বের অসাধারণ ভাষ্য। এই বয়ান স্বভাবত “খেতমজুর” হিসেবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর যেকোনো সদস্যের মানবিক মর্যাদার প্রতি অভিনব ওয়াদা, যা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে শক্তিশালী সিলসিলা তৈরি করে গেছে।


জীবনী

ফ্রানৎস ফানোঁ ১৯২৫ সালের ২০ জুলাই ফ্রান্স অধ্যুষিত মার্টিনিক উপনিবেশে জন্মগ্রহণ করেন। মার্টিনিক সমাজে তাঁর পরিবার সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে কৃষ্ণাঙ্গ মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফানোঁর পিতা ক্যাসিমির ফানোঁ পেশায় আমদানি-রপ্তানি বিভাগে পর্যবেক্ষণের কাজ করতেন। মার্টিনিকের রাজধানী পোর্ট-দ্য-ফ্রান্সের শহরতলিতে মা এলেয়ানোর মেডেলিচের যন্ত্রপাতির একটি দোকান ছিল। সাধারণত এ ধরনের পরিবারের লোকজন ফ্রান্সের শ্বেতাঙ্গ সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে নিজেদের পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করে থাকেন। ফানোঁ এই পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন আইমা চেসেয়ারের বিবৃত “কৃষ্ণাঙ্গদের গৌরবদীপ্ত সাংস্কৃতিক আত্মোপলব্ধি বা নেগ্রিটিউড”-এর প্রাথমিক পাঠ তাঁর জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এই পাঠের পর বিশেষত ফ্রান্সের ইতিহাসচর্চাকালে তিনি নড়েচড়ে বসেন। এইবার স্বদেশের ইতিহাস নিজের মতো করে শিখতে থাকেন। য়ুরোপীয় মাতব্বরি মানসিকতার যারা সমালোচনা করেন, তাদের মধ্যে মার্টিনিক অধিবাসী আইমা চেসেয়ার একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। রাজনীতির শিকার হয়ে ফানোঁ নিজেকে মার্টিনিক সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করবেন এবং পূর্বপরিকল্পিত বর্ণবাদী পরিচয় নির্মাণকে সমর্থন করবেন কিনা—এই দুই সমস্যা নিয়ে তিনি দ্বিধান্বিত হন। অবশেষে ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে ফ্রান্স থেকে মুক্তিকামী মজলুমদের সঙ্গে জালিমদের দখলকৃত নিজ দেশ ছেড়ে চলে যান। এসময় তাঁর বয়স মাত্র ১৮।

যুদ্ধের পর তিনি মনস্তত্ত্বজ্ঞান ও ওষুধবিদ্যা পড়ার উদ্দেশ্যে ফ্রান্সে অবস্থান করেন। সেখানে স্বভাবত কৃষ্ণাঙ্গবিরোধী নিষ্ঠুর আচরণের শিকার হন। উল্লেখ্য, ক্যারিবিয়ান শ্রেণিগোষ্ঠীর মধ্যে অত্যন্ত প্রকট বৈষম্য রয়েছে, যার আদল সাদা বা কালো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈষম্যের এই আদল নিরূপণ করা প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার। এই পাশবিক আচরণ তাঁকে এমনভাবে ক্রোধান্বিত করে তুলল, যার প্ররোচনায় লিখলেন “কৃষ্ণাঙ্গ মনুষ্যজাতির বৈষম্যের খতিয়ান” [An Eassy for the Diseleanation of Blacks] প্রবন্ধ। পরবর্তীতে লেখাটি কালো চামড়া, ধলো ঢাকনা [Black Skin, White Mask, 1952] নামে গ্রন্থিবদ্ধ হয়। এতে তিনি মার্ক্সবাদী ও অস্তিত্ববাদী চিন্তা দিয়ে ব্যাখ্যা শুরু করেন। এছাড়া বইটি কেবল অন্যান্যদের সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গদেরও অন্তর্ভুক্তিকরণের মতো সাধারণ ভাবনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; যা চিন্তা হিসেবে আমূল পরিবর্তনকামী জোরাল বক্তব্য তুলে ধরে। এই ভাষ্য বর্ণবাদবিরোধী মানবদরদি চিন্তার সূচনা ঘটিয়েছে।

পড়াশোনা সম্পন্ন করার পর অল্প সময়ের জন্য তিনি ক্যারিবিয়ায় ফিরে আসেন। এসময় বেশিদিন বাড়িতে থাকলেন না। ফ্রান্সে খুব সীমিত অর্থে জীবনযাপন করতে থাকেন। অবশেষে ১৯৫৩ সালে আলজেরীয় ব্লিডা-জয়েনবিলই হাসপাতালের মনস্তত্ত্ব ওয়ার্ডের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফ্রান্সের হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকালে তিনি জালিমদের সৈনিক ও কর্মকর্তা এবং যুদ্ধে নির্যাতনের শিকার আহত আলজেরীয়বাসী উভয় গোষ্ঠীর মানসিক দুর্দশার চিকিৎসা করতেন। ১৯৫৪ সালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আলজেরীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। ফ্রন্ট ডে লিভারেশন ন্যাশনাল [এফএলএন]-এর নেতৃত্বে আন্দোলন সংঘটিত হলে ফ্রান্সের স্বশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক নির্মমভাবে নির্যাতনের শিকার হন। শাসকদের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে ১৯৫৬ সালের আগে ফানোঁর বোঝাপড়া আরো পোক্ত হয়। পরাধীনতা থেকে মুক্তি সংগ্রামের পাশাপাশি ফ্রান্স দখলদারদের দাপ্তরিকভাবে চিকিৎসা ক্ষেত্রে সহায়তা করা তাঁর রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই ভেবে তিনি হাসপাতালের দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেন।

এরপর আলজেরিয়ায় ফ্রান্স দখলদার সরকারের দাপ্তরিক কোনো কাজে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন না। আলজেরীয়বাসীদের স্বাধীনতার জন্য নিজেকে পুরোপুরিভাবে নিবেদিত করলেন। তিনি এফএলএন-এর পক্ষে প্রাথমিকভাবে তিউনিসিয়ায় নার্সদের প্রশিক্ষণ প্রদান করতে থাকেন। কাজের পাশাপাশি এল মুজাহিদ নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন এবং আন্দোলনের উপর দরদি সাময়িকীগুলোতে প্রবন্ধ লিখতেন। এ ধরনের সাময়িকীর মধ্যে রয়েছে প্রেজেন্স আফ্রিকেইন ও জ্যাঁ পল সাত্রের ল্যাস টেম্পস মডারেটস। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে লিখিত ফানোঁর কয়েকটি লেখা তাঁর মৃত্যুর পর আফ্রিকার বিপ্লব [Toward the African Revolution, 1964] গ্রন্থে প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৫৯ সালে কয়েক কিস্তিতে তাঁর বেশ ক’টি প্রবন্ধ প্রকাশ পায়। তার মধ্যে আলজেরীয় বিপ্লবের পঞ্চম বছর  [L’An Cinq, de la Révolution Algérienne] শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধে মজলুম আলজেরীয়বাসী কিভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে বিপ্লবী সংগ্রামী যুদ্ধে নিজেদের সংঘবদ্ধ করেছে তাঁর বয়ান তুলে ধরেন। একই বছর তিনি সাময়িক আলজেরীয় সরকারের কূটনৈতিক পদে ঘানার কূটনীতিজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা তিনি আলজেরীয় মুক্তিকামী যোদ্ধা সরবরাহের ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছিলেন। ঘানায় অবস্থানকালে তাঁর লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন। ক্রমশ দৈহিকভাবে অবনতি হওয়া সত্ত্বেও ফানোঁ লিখতে থাকেন। জীবনের শেষ দশ মাস রোগের সাথে যুদ্ধ করে যে বইটি লিখে গেছেন তার জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। দুনিয়ার দণ্ডপ্রাপ্ত [The Wretched of the Earth, 1961]। বইটি দখলদার জালিম শাসকগোষ্ঠীর বর্বরতা ও সহিংসতার খতিয়ান, যেখানে তিনি খুব আন্তরিক বয়ানে পরাধীনতা থেকে মুক্তিকামী তৃতীয় বিশ্বের জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে মানবতার নতুন ইতিহাস নিয়ে হাজির হয়েছেন।

১৯৬১ সালের অক্টোবর মাসে সিআইএ-এর একজন প্রতিনিধি [এজেন্ট] ফানোঁকে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। উল্লেখ্য, তৎকালে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অবস্থিত বেথেসডার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ হাসপাতালেই একমাত্র লিউকেমিয়ার চিকিৎসা ছিল। এর দুই মাস পর ১৯৬১ সালের ৬ ডিসেম্বর এই মনীষী মারা যান। মৃত্যুকালেও তিনি তৃতীয় বিশ্বের জনসাধারণের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার লাভের জন্য মানসিকভাবে মনস্থির ছিলেন বলে মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এফএলএন-এর অনুরোধে তাঁর মৃতদেহ তিউনিসিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে তা আলজেরিয়াবাসীদের মাটিতে এনে দাফন করা হয়। এই মজলুম জনগোষ্ঠীর জন্য জীবনের শেষ পাঁচ বছর একাই যুদ্ধ করে গেছেন, যার জন্য তিনি স্বাধীনতাকামী যেকোনো জনগোষ্ঠীর কাণ্ডারি হয়ে আছেন।


ঘটনার প্রেক্ষাপটে আফ্রিকার জ্ঞানকাণ্ডের চিন্তাপদ্ধতির ব্যাকরণ বা আফ্রিকান ফেনোমেনোলজি

আফ্রিকার ফেনোমেনোলজি বা “ঘটনার প্রেক্ষাপটে আফ্রিকার জ্ঞানকাণ্ডে” ফানোঁর অবদান হলো এই জনগোষ্ঠীকে সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে একটি জ্ঞানকাণ্ড [পূর্ব-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তীব্র উপলব্ধি থেকে ‘আত্মসত্তা’ বা ‘সেলফ’ বিষয়ের বিশ্লেষণকরণ; যার বয়ান একটি বিশেষ গোষ্ঠী হিসেবে ওই ‘আত্মসত্তা’র আলাদা অবস্থান তুলে ধরে] বিশেষ আকারে গুরুত্ববহ করে তুলে ধরা। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে গিয়ে চারপাশে বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার শিকার হন, যা শ্বেতাঙ্গদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব অবস্থার সবচেয়ে কার্যকর বয়ান উন্মোচন হয়েছে কালো চামড়া, ধলো ঢাকনা [Black Skin, White Mask, 1952] গ্রন্থে। বইটির মূলকথা হলো শ্বেতাঙ্গ সমাজে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি অবশ্যই “সাদা মুখোশ” তথা শ্বেতাঙ্গদের মতো আচরণ করার চেষ্টা করবে। এই বক্তব্য ডব্লিউ. ই. বি. ডো বইস-এর যুক্তি স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁর মতে, শ্বেতাঙ্গক্ষমতা-কাঠামোর মধ্যে বাস করতে গিয়ে আফ্রিকা-আমেরিকাবাসীকে দুই ধরনের চিন্তা নিজের মধ্যে লালন করতে হয়। এক. ওই ক্ষমতা কাঠামোর [কোনো না কোনো কাঠামো] তোষামোদী হওয়া। দুই. আফ্রিকা-আমেরিকাবাসীদের সঙ্গে বসবাসের সময় অদ্ভুত আচরণের মুখোমুখি হওয়ার সচেতনতা। ডো বইসের মতে, ফানোঁর বক্তব্যের ধরন হলো কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি একটি সামাজিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে আচরণ করতে বাধ্য থাকেন, যা স্বভাবতই তাকে বর্ণবাদী আচরণের মুখে ঠেলে দেয়। এর কারণ হলো বিদ্যমান মানবতার ধারণাটি উঁচু-নিচুর ভিত্তিতে বৈষম্যভিত্তিক চিন্তাকাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত। ফানোঁ পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ফ্রান্সের ক্যারিবিয়ান ও আফ্রিকার দখলদারী মনোভাব ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে কিভাবে বর্ণবাদ নারী-পুরুষ উভয়ের জীবনকে বিকৃত করে তুলেছে। আফ্রিকার সমাজবিজ্ঞানী প্যাগেট হেনরী ঘটনার প্রেক্ষিতে জ্ঞানকাণ্ড মাথায় রেখে ডো বইস-এর সঙ্গে ফানোঁর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। হেনরীর বক্তব্য খুব স্পষ্ট। এতে হেনরী আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে, কারো দ্বারা আরোপিত বর্ণবাদী পরিচয়ের মাধ্যমে কাউকে অধস্তন হিসেবে চিহ্নিত করার কারণে ‘আত্মসত্তা’ বা ‘সেলফ’ কিভাবে মানসিক দুর্দশার মুখোমুখি হয়। তাছাড়া ‘আত্মসত্তা’ পরিচয় নির্মাণে আত্মসচেতনতা ও সাংস্কৃতিক পর্যায়ে সমঅধিকার চর্চার মধ্য দিয়ে কিভাবে সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্বপরায়ণ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে স্বাধীন ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে তা উঠে এসেছে।

ফানোঁ তাঁর প্রথমসারির সকল রচনায় শ্বেতাঙ্গ য়ুরোপীয় সংস্কৃতির বর্ণবাদী ও দাসত্ব তৈরির প্রকল্পগুলো ব্যবচ্ছেদ করেন। এইসব প্রকল্পের সর্বক্ষেত্রে উঁচু-নিচুর ভিত্তিতে কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থান নির্ণয় করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো কৃষ্ণাঙ্গদের “নিগ্রো” ও “অন্যরা” বলে চিহ্নিত করে, ফানোঁ যার বিপরীতে বয়ান হাজির করেন। কালো চামড়া, ধলো ঢাকনা [Black Skin, White Mask, 1952] গ্রন্থে মানুষকে “নিগ্রো বলে” চিহ্নিত করার ফলে সৃষ্ট বিচিত্র মানসিক দিক ও এর বিভিন্ন সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পরিপক্ব আলোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, আলজেরীয় বিপ্লবের পঞ্চম বছর [L’An V de la Révolution Algérienne, 1959] দুনিয়ার দণ্ডপ্রাপ্ত [The Wretched of the Earth, 1961] গ্রন্থদ্বয়ে বহুমুখী রাজনৈতিক দিক তুলে ধরা হয়েছে। “নেগ্রিফিকেশন” বা “নিগ্রো বলে কৃষ্ণাঙ্গদের আলাদা বলে চিহ্নিত করার” ফলে সামাজিক জীবনে তাদের উপর সহিংস আচরণের মানসিক বিচিত্র দিক ও তার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফানোঁ এসব গ্রন্থে চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, “নিগ্রো বলে কৃষ্ণাঙ্গদের আলাদা বলে চিহ্নিত করার” এই ধারণা অন্যান্য কৃষ্ণাঙ্গ ও আফ্রিকাবাসীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো প্রকট করে তুলে। দ্বিতীয়ত, এই ধারণা য়ুরোপের প্রতি ইতিবাচক আগ্রহ ও তাদের প্রতি আড় চোখে তাকানোকে স্বাভাবিক করে তোলে। সর্বশেষ, “নিগ্রো বলে কৃষ্ণাঙ্গদের আলাদা বলে চিহ্নিত করার” ধারণাটি বিশ্বের সর্বক্ষেত্রে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এর বিকল্প কোনো পথ নেই। এই ধারণা কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে অপরিহার্যভাবে বিচ্ছিন্নতার মানসিক অবস্থা তৈরি করেছে, যা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। এই পরিস্থিতির জন্য কেবল দায়ী কর্তৃত্বপরায়ণ শ্বেতাঙ্গ সংস্কৃতি, যা কেউ উপলব্ধি করতে পারে না। কেননা, একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি আলাদা পরিবেশের মুখোমুখি হয়। মূলত উভয় বর্ণের লোকদের মধ্যে এমন একটি প্রেক্ষাপট সুগঠিতভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা বর্ণবাদ বা বর্ণবাদী থেকে আলাদা। তাছাড়া এই পরিস্থিতিতে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ নারী বা পুরুষের জাতিগত পরিচয় মূল্যায়ন শ্বেতাঙ্গদের নিয়ম ও মূল্যবোধের মানদণ্ডে পরীক্ষা করতে হয় না। ফানোঁর মতে, উভয় বর্ণের লোকদের মধ্যে উল্লিখিত সাজানো পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কৃষ্ণাঙ্গ নারী-পুরুষকে মুখোমুখি হতে হয়। এ সময় তাদের “বিচ্ছিন্নকরণের মানসিকতা মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে” সামাজিকভাবে বৈষম্যের শিকার হতে হয়। মূলত “বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গমুখ্য জ্ঞানকাণ্ড” [বর্ণবাদী ফেনোমেনোলজি] এই পরিস্থিতির গোড়াপত্তন করেছে।

“ঘটনার প্রেক্ষাপটে জ্ঞানকাণ্ড” [বা ফেনোমেনোলজি] তৈরি করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো ভাষা। কালো চামড়া, ধলো ঢাকনা [Black Skin, White Mask, 1952] গ্রন্থে ফানোঁ এই বিষয়ে বলেছেন যে, সংস্কৃতিতে ভাষা বর্ণবাদের জন্ম দিতে পারে। এক্ষেত্রে তিনি উদাহরণস্বরূপ ফরাসি ভাষায় সাদা ও কালোর প্রতীকগুলো তুলে ধরেন, যা ইংরেজি ভাষায়ও একই মেজাজ দিয়ে অনূদিত হয়েছে। ফানোঁ জোর দিয়ে বলেন যে, প্রত্যেককে সাদার বিশুদ্ধতা ও কালোর কালিমা মেনে নিয়েই ফরাসি ভাষা শিখতে হয়। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অবচেতন মনে বিষয়টি কারো পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মতে, শ্বেতাঙ্গ হওয়া মানে কপাল খোলা; অন্যদিকে কৃষ্ণাঙ্গ হওয়া মানে মুখে চুনকালি লাগা। কালো চামড়া, ধলো ঢাকনা গ্রন্থে ফরাসি ভাষায় দখলদারী মানসিকতার বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আলজেরীয় বিপ্লবের পঞ্চম বছর [L’An V de la Révolution Algérienne, 1959] গ্রন্থে ভাষা কিভাবে পরাধীনতা থেকে মুক্তিলাভের প্রক্রিয়াকে সফল করে তুলবে, তার চমৎকার বক্তব্য তুলে ধরেছেন। ফানোঁ উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৫৬ সালে আলজেরীয় বিপ্লবী শক্তিগুলোর ফরাসি ভাষাকে পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত বাতিল করে বরং ফরাসি ভাষাকে আমজনতার ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল অনারবিভাষাীসহ বহুমুখী মনোভাবসম্পন্ন প্রতিরোধশক্তিগুলোকে একতাবদ্ধ করা। ফরাসি ভাষা গ্রহণের ফলে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা আমজনতার ভাষার চেয়ে অনেক বেশি। তাছাড়া দখলদাররা সংঘবদ্ধ হচ্ছে এবং আলজেরীয় সকল ফরাসিভাষী দখলদার সরকারের প্রতি অনুগত হচ্ছে—আমজনতার মধ্যে বিরাজমান এই সাধারণ সন্দেহ ফরাসি ভাষা দূর করে। কৌশলগত দিক থেকে দখলদারদের ভাষা অবলম্বনের পর যে কেউ কোনো দোকান, সরকারি দপ্তরে সহজে প্রবেশ করতে পারে। এতে ভাষাগত জটিলতার মুখোমুখি হতে হয় না।

ঘটনার প্রেক্ষাপটে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ সম্পর্কে ফানোঁর বিশ্লেষণ বিভিন্ন সমালোচনার মুখে পড়ে। যেমনকালো চামড়া, ধলো ঢাকনা [Black Skin, White Mask, 1952] গ্রন্থের আদ্যোপান্ত যারা পড়েছেন সেখানে দেখবেন যে, কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা শ্বেতাঙ্গ পুরুষকে আর কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষরা শ্বেতাঙ্গ নারীদের প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে পেতে চায়, যা খুবই নারীবিদ্বেষমূলক বক্তব্য বলে মনে হয়। এই সমালোচনা সাধারণত নারীবাদীদের পক্ষ থেকে আসে। বিশেষত মার্টিনিকানবাসী মেয়ট্টে কেপাসিয়ার আত্মজীবনীর আলোকে এই সমালোচনা করা হয়; যিনি যেকোনো ধরনের একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষকে ভালোবাসতে চেয়েছিলেন। ফানোঁ যাকে “নিচু” ও “হাস্যকর” বলে উল্লেখ করেছেন। এই ভাষ্য ফানোঁ তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন। উপরোক্ত বক্তব্য তিনি রেনে মারানের উপন্যাসের চেয়ে কম গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন বলে সমালোচনা রয়েছে। মারানের উপন্যাসে জ্যাঁ ভেনিয়্যুস নামের একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি একজন শ্বেতাঙ্গ ফরাসি নারীর প্রেমে পড়েছিলেন যাকে তিনি ওই নারীর ভাইয়ের বিশেষ অনুরোধ ছাড়াই বিয়ে করতে দ্বিধা করছিলেন। শ্বেতাঙ্গ নারীবাদীরা অভিযোগ এনেছেন যে, ফানোঁ কেপাসিয়ার প্রতি অপেক্ষাকৃত কম সহানুভূতি দেখিয়েছেন এবং তার কালো বর্ণকে অবমাননা করেছেন। যদিও ফানোঁ দ্ব্যর্থকণ্ঠে ঘোষণা দেন যে, এই দুই ধরনের বক্তব্যই “জাতি হিসেবে বঞ্চিত” জনগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন মানসিকতাকেই তুলে ধরে। কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী লেখিকাদের প্রায় সব লেখায় এই অভিযোগ পাওয়া যায়। উক্ত অভিযোগের মধ্যে সারবস্তু কম এবং তা ঘটনার প্রেক্ষাপটে বিভিন্নভাবে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। ফানোঁ যেভাবে বর্ণবাদকে ‘ঘটনার প্রেক্ষাপটে’র ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন, তেমনি একজন নারীবাদী ‘ঘটনার প্রেক্ষাপট’কে নারী-পুরুষকেন্দ্রিক নির্ভরশীল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে, বহুমুখী চিন্তার কাঠামোর দিক থেকে তর্কের খাতিরে ফানোঁর নারী-পুরুষ বিষয়ক বর্ণবাদের বয়ান নারীদের প্রতি গভীরে প্রোথিত অবজ্ঞা থেকে অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত।


পরাধীনতা থেকে মুক্তির খতিয়ান

আলজেরীয় বিপ্লবের পঞ্চম বছর [L’An V de la Révolution Algérienne, 1959] দুনিয়ার দণ্ডপ্রাপ্ত [The Wretched of the Earth, 1961] গ্রন্থ দুটিতে পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য কৃষ্ণাঙ্গ বলে বিচ্ছিন্ন রাখার রাজনৈতিক দিকগুলো নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করা হয়েছে। ফানোঁ এখানে বিশ্বব্যাপী কৃষ্ণাঙ্গ নারী-পুরুষদের কেবল হীন করার রাজনৈতিক লক্ষণগুলো তুলে ধরেন নি। তাছাড়া তিনি নিজের পর্যবেক্ষণকে বলিষ্ঠ নৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে বয়ান তুলে ধরেন। প্রত্যেক নারী-পুরুষের সমান অধিকারের ভিত্তিতে তাদের মানবিক মর্যাদার কথা তিনি উল্লেখ করেন। আমাদের প্রত্যেকেই এই নৈতিক অবস্থানের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত এবং কেউই তার বাইরে নয়। এটাই তাঁর পরাধীনতা থেকে মুক্তির মূলনীতি। ফানোঁর এই বয়ান মানবাধিকার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত পণ্ডিত ও কর্মীদেরকে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে।

আলজেরীয় বিপ্লবের পঞ্চম বছর [L’An V de la Révolution Algérienne, 1959] গ্রন্থটিতে ফানোঁ প্রথম উল্লেখ করেছেন কিভাবে আলজেরীয়বাসী বিপ্লবী যুদ্ধে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে ফরাসি দখলদার শাসককে উৎখাত করেছিল। এই গ্রন্থে উৎসাহী বিপ্লবী শক্তিগুলোর জন্য আন্দোলনের কলাকৌশলের মালমশলা রয়েছে। ফানোঁর উত্থাপিত এফএলএন-এর কলাকৌশল এক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। এসব কৌশল বিশেষত আলজেরিয়ার প্রেক্ষাপটে গৃহীত হলেও যাচাই-বাছাই করে তা নিজেদের মতো করে সাজিয়ে-গুছিয়ে প্রয়োগ করা সম্ভব। একই মতাবলম্বী নাগরিক সমাজের যোগাযোগের ভাষা এবং আদর্শগত ও প্রায়োগিক দিক থেকে এফএলএন-এর কৌশল হিসেবে ফরাসি ভাষার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বহুক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখবে, যা ফানোঁ চিহ্নিত করেছেন।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে শাসকদল পত্রিকাগুলোর উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। দখলদারদের প্রযুক্তি বলে এফএলএন বেতারযন্ত্র বয়কট করে। কিন্তু পরবর্তীতে বেতারযন্ত্র ব্যবহারের মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল পেয়েছিল। এরই মধ্য দিয়ে ভয়েস অব ফাইটিং আলজেরীয় নামে একটি জাতীয় বেতারযন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। এই যন্ত্রের মাধ্যমে দখলদারদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাকে মুক্তিকামী জনগোষ্ঠী প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছিল। ফানোঁ এই পদক্ষেপের ব্যাপকতার দিক থেকে “জাতির প্রথম প্রতিবাদ” বলে উল্লেখ করেন। তারা দখলদারী বিশ্বের বিভক্তিকরণ নীতি ও উঁচু-নিচুভিত্তিক প্রশাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। এই বিপ্লবী বয়ানের ফলে সাময়িক বা প্রভিশনাল সরকার আলজেরীয়বাসী সকল জনসাধারণকে নাগরিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, যা ছিল অভূতপূর্ব। এই উদ্যোগ ছিল হাইতির প্রথম গঠনতন্ত্রের [১৮০৫] আদলে য়ুরোপীয় দখলদারীদের বিরুদ্ধে মহাবিদ্রোহ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হাইতির সকল নাগরিক কৃষ্ণাঙ্গ বলে বিবেচিত হবে। এই ঘোষণা প্রদানের মাধ্যমে গায়ের রংয়ের উপর ভিত্তি করে সামাজিকভাবে প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধার উঁচু-নিচুর বৈষম্যভিত্তিক ব্যবস্থা তীব্রভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিল। আলজেরীয় ও হাইতির এই উভয় ঘোষণা ফানোঁর উল্লিখিত দখলদারীদের ভিত্তিদানকারী কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দুর্বল করে দেয়।

আলজেরীয় বিপ্লবের পঞ্চম বছর [L’An V de la Révolution Algérienne, 1959] গ্রন্থে ফানোঁর বয়ানে ঐতিহাসিক প্রামাণ্যসহ গভীর অন্তর্দৃষ্টি খুঁজে পাওয়া যায়। দুনিয়ার দণ্ডপ্রাপ্ত [The Wretched of the Earth, 1961] বইটিতে দখলদারিত্ব ও বিপ্লব নিয়ে আরো দার্শনিক ধারণার বর্ণনা রয়েছে। এটি কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে মনে করা হয়। বইটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফানোঁর মতে, পরাধীনতা থেকে মুক্তির সংগ্রামে সহিংসতা অবশ্যই সুফল নিয়ে আসবে। স্বাধীনতার লক্ষ্যে জনসাধারণকে আন্দোলন-সংগ্রামে উজ্জীবিত না করে বরং জাতীয় অভিজাত শ্রেণি ও সাবেক দখলদারীদের সঙ্গে মীমাংসায় বসলে পরাধীনতা থেকে মুক্তি পাওয়া কখনো সম্ভব নয়। মুক্তিলাভের এই ভ্রান্ত পথ বেছে নেওয়ার কারণে স্বাধীনতা লাভ অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকারীদের প্রয়োজন হলো বিপ্লবী শিল্পকলা ও সাহিত্য আন্দোলনের চর্চা করা। আর দখলদারীদের নির্যাতনের শিকল থেকে নিজেদের মুক্ত করতে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণ করা। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বয়ানের খানিক দুর্বল অংশ নিয়ে জ্যাঁ পল সার্ত্রে সংক্ষেপে বইটির মুখবন্ধে আলোচনা করেছেন। সার্ত্রের মতে, বইটি দর্শনের ভাষায় লিখিত এবং মার্ক্স ও হেগেলের যুক্তি এখানে মুখ্য বিষয়। যে কেউ তা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির হাতিয়ার মনে করতে পারেন। তবে এই দর্শন পাশ্চাত্য দর্শনের কথা বলে না। এখানে তৃতীয় বিশ্বের মুক্তিকামী জনগোষ্ঠীর জন্য শলাপরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।

আলজিরীয় বিপ্লবের পঞ্চম বছর [L’An V de la Révolution Algérienne, 1959] গ্রন্থটিকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক ছড়িয়ে আছে তা কালো চামড়া, ধলো ঢাকনা [Black Skin, White Mask, 1952] গ্রন্থের চেয়েও আলাদা। কালো চামড়া, ধলো ঢাকনা গ্রন্থের নারীবাদী সমালোচকদের দাবি হলো এই গ্রন্থ গভীর পাঠের প্রয়োজন রয়েছে এবং যেসব প্রশ্ন ফানোঁ উত্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন তা বিশ্লেষণ করা জরুরি। সার্ত্রের মতে, ফানোঁ পাঠে আলজেরীয় বিপ্লবের পঞ্চম বছর গ্রন্থে উল্লিখিত সক্রিয় সহিংসতাকে অত্যন্ত সরলভাবে ব্যাখ্যা করার কারণে পাঠকরা উক্ত বয়ানকে ভুল বুঝেন। ফানোঁ কেবল পরাধীনতা থেকে মুক্তিকামী দেশবাসী নিজেদের লক্ষ্য চরিতার্থ করতে সহিংসতার পথ বেছে নেওয়ার উপর জোর দিয়েছেন। গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত “সহিংসতা সম্পর্কে উদ্বিগ্নতা” প্রসঙ্গটি তুলে ধরেছেন। এর মূল অর্থ হলো দখলদারিত্বের অপরিহার্য পরিণতি হলো দখলদারী কর্তৃক সহিংসতার সূত্রপাত করা এবং মুক্তিকামী জনগোষ্ঠীকে সহিংসতায় সম্পৃক্ত করা। ফানোঁর মতে, এই সহিংসতা সম্পর্কে উদ্বিগ্নতার অর্থ হলো মুক্তিকামী দেশবাসী অবশ্যই সহিংসতার মোকাবেলা করতে গিয়ে মজলুম সম্প্রদায়ের লোকদের এ বিষয়ে সচেতন করে আন্দোলনে তাদের সম্পৃক্ত করবে অথবা এই সহিংসতার গোড়াপত্তনকারী ভিনদেশিদের বিরুদ্ধে পাল্টা লড়াই চালিয়ে যাবে। দখলকারীদের কর্মকাণ্ডের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আহবান জানিয়ে ফানোঁ বিরামহীনভাবে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে বলেছেন। তিনি মূলত পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য দেশীয়দের মধ্যে নারী-পুরুষ প্রত্যেকের দায়িত্বশীল আত্মমর্যাদাবান হওয়ার ডাক দিয়ে সহিংসতাকালে সক্রিয় হয়ে ওঠার আহবান জানান।


ফানোঁর চিন্তাপদ্ধতির পটভূমি

ফানোঁর চিন্তাগঠনে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো “কৃষ্ণাঙ্গদের গৌরবদীপ্ত সাংস্কৃতিক আত্মোপলব্ধি বা নেগ্রিটিউডের দর্শন”, যা তিনি আইমে চেসায়ারের কাছ থেকে পেয়েছেন। মনের মধ্যে লুপ্ত তাঁর এই আত্মোপলব্ধি জারি থাকা সমাজকাঠামোর বিপক্ষশক্তি হিসেবে ক্রিয়াশীল ছিল। সর্বসাকুল্যে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দখলদারী সংস্কৃতির প্রতি পাল্টা জবাব হিসেবে পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া এই প্রতিক্রিয়া গোলকায়ন বিশ্বের স্বভাবসিদ্ধ সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রকাশ করে। এই আত্মোপলব্ধির চেয়ে তাঁর চিন্তায় অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছিলে ফ্রান্সে থাকাবস্থায় হেগেল, মার্ক্স ও হোসেরল পাঠ। জ্ঞানের এসব উৎস থেকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটে। জবাবের পাল্টা জবাব হিসেবে ছিটকে পড়া ব্যক্তিসত্তা বর্ণবাদী নিষ্ঠুর আচরণের প্রতি যথাযথভাবে পাল্টা আচরণ করতে শেখে। এই প্রতিক্রিয়া সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি এমন এক ধরনের তীব্র আত্মোপলব্ধি, যা মানবসত্তাকে গড়ে তোলে এবং কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপটকে বোঝার মতো আত্মসচেতন ভাবজগৎ তৈরি করে। তাছাড়া তিনি সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী ধারণা দিয়ে ব্যক্তিসত্তা তুলে ধরার পদ্ধতি গ্রহণ করেন। অস্তিত্ববাদী এই বয়ানের প্রেক্ষিতে আমাদের প্রত্যেকের অবস্থান নির্ধারিত হয়। ফানোঁ ও সার্ত্রে দুজনে চিন্তায় পরস্পরকে প্রভাবিত করেছেন। সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী ধারণা কালো চামড়া, ধলো ঢাকনা গ্রন্থকে আরো পরিচিত করে তুলেছে। পরাধীনতা থেকে মুক্তি সংগ্রামে সার্ত্রের আন্তরিক ও আমূল পরিবর্তনকামী ওয়াদাপূর্ণ বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, তাঁর উপর ফানোঁর নিশ্চিতভাবেই প্রভাব ছিল।


ফানোঁর চিন্তায় প্রভাবিত আন্দোলন ও ব্যক্তিবর্গ

সমগ্র আফ্রিকাবাসীরা ভাই ভাই, এই আত্মোপলব্ধি ফানোঁর মগজ ও মননে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। তৃতীয় বিশ্বের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক আন্দোলনে যা কখনো প্রয়োগ করা হয় নি। এটি মনে রাখা জরুরি যে, ফানোঁর সমসাময়িককালে “তৃতীয় বিশ্ব” যে অর্থে ব্যবহৃত হতো তা আজকাল একই অর্থ বহন করে না। বর্তমানে তৃতীয় বিশ্বের ধারণা হলো খুবই দুর্দশাগ্রস্ত দরিদ্র দেশগুলোর সমষ্টি, যেগুলো উন্নত দেশসমূহের দাতব্য প্রকল্পের টার্গেট হয়ে আছে। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে তৃতীয় বিশ্ব বলতে প্রথম বিশ্ব [যুক্তরাষ্ট্র ও য়ুরোপ] অথবা দ্বিতীয় বিশ্ব [রাশিয়া ও সমভাবধারার রাষ্ট্রসমূহ]-এর রাজনৈতিক দিক থেকে একই মতাবলম্বী হিসেবে উঠতি রাষ্ট্রগুলোকে বোঝাত। আফ্রিকার নবীন স্বাধীন জাতিগুলো কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি ও সামষ্টিক সংহতি তৈরির উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে এসব জনগোষ্ঠী আগের মতো বন্দি দশা হওয়ার মতোই ভোগবাদী-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বেড়াজালে আটকে আছে। ইতোমধ্যে ফানোঁ এ বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। বর্তমান স্বাধীনতা ব্যবসার [নিউলিবারালিজম] যুগে ফানোঁর আলোচনা উল্লিখিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর সমভাবধারার চিন্তাভাবনা কেবল বামপন্থি পণ্ডিতদের বিশ্লেষণে রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে টিকে আছে, যা নোয়াম চমস্কি ও নাওমি ক্ল্যাইনের মতো কর্মীরা প্রচার করে যাচ্ছেন।

সমভাবধারা ও রাজনৈতিক ভাষ্য পুনর্নির্মাণের এই জ্ঞানকাণ্ড গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুনভাবে চর্চা করা হচ্ছে, যা “বন্দি দশা থেকে মুক্তিলাভের তত্ত্ব বা পোস্ট-কলোনিয়ালিজম” নামে আলোচিত হয়েছে। দখলদারবিরোধী তত্ত্বকে বিশ্লেষণ করেছেন এমন তাত্ত্বিক হলেন এডওয়ার্ড সাঈদ ও গায়ত্রী স্পিভাক। এরা দুজনেই দুনিয়ার দণ্ডপ্রাপ্ত [The Wretched of the Earth, 1961] গ্রন্থে ফানোঁর ব্যক্ত “বিভক্তিকরণ ও উঁচু-নিচুকেন্দ্রিক প্রশাসন কাঠামো”র [ম্যানিসিয়ান] উপর ভিত্তি করে পরাধীন ব্যক্তিসত্তা ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে অন্ততপক্ষে বিশ্লেষণধর্মী কাঠামো দিয়ে উপস্থাপন করেছেন।

কৃষ্ণাঙ্গ-বিদ্বেষী বর্ণবাদী ধারণা ও পরাধীনতা থেকে মুক্তিলাভের বিদ্যায়তনিক আলোচনায় গোলকায়ন বিশ্বের পণ্ডিতগণ ফানোঁর গবেষণা দ্বারা বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। বিশ্লেষণাত্মক শিক্ষাতত্ত্ব [ক্রিটিক্যাল পিডাগগি]-এর ব্রাজিলবাসী তাত্ত্বিক পাওলো ফ্রেইরে পিডাগগি অব দ্য অপপ্রেসড [The Pedagogy of the Oppressed, 1968] গ্রন্থের আলোচনায় ফানোঁর চিন্তাপদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। ফ্রেইরের বক্তব্যের একাংশ ফানোঁর চিন্তাপদ্ধতি থেকে বিপথে গিয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। ফ্রেইরের ওই বক্তব্য হলো, মজলুম জনগোষ্ঠী তাদের স্বাধীনতার পথ তৈরি করতে পারে। ফ্রেইরি কেবল গোলটেবিলের তর্কাতর্কির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং জালিমদের সামাজিক অবস্থান ও সুযোগ-সুবিধা হস্তগত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন। ফ্রেইরির এই প্রসঙ্গটি নিয়ে ফানোঁ তাঁর দুনিয়ার দণ্ডপ্রাপ্ত এবং “বর্ণবাদ ও সংস্কৃতি” শীর্ষক প্রবন্ধে পুনর্ব্যক্ত করে নিজের উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছেন। ফ্রেইরের আলোচনায় রাষ্ট্রের গভীরে প্রোথিত দেশীয়-ক্ষমতাহস্তগতকারীদের শাসনকাঠামো স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। আর তাঁর এই আহবান পরাধীনতা থেকে মুক্তিলাভের ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালিত হবে। ভ্রান্তিপূর্ণ এই পন্থায় শোষিত জনসাধারণের জায়গায় দেশের উঁচুতলার শ্রেণি কেবল ক্ষমতাহস্তগতকারীদের অবস্থানে নিপীড়নকারী হিসেবে পুনর্বাসিত হয়। সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয় শর্ত হিসেবে জনপ্রিয় রাজনীতির অন্তর্ভুক্তিকরণ  এবং প্রেক্ষাপটগত পরিবর্তন সাধনের উপর ফ্রেইরের গুরুত্ব প্রদানকে ফানোঁর ব্যক্ত উদ্বিগ্নতা আরো বেশি বেগবান করবে।

কেনিয়াবাসী লেখক ও পরাধীনতা থেকে মুক্তিকামী কর্মী নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গো [জন্ম ১৯৩৮] ফানোঁর দুনিয়ার দণ্ডপ্রাপ্ত গ্রন্থের বিষয়বস্তুর উপর জোর দিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। দেশীয়দের পরাধীন চিন্তাভাবনা থেকে মুুক্তিলাভের জন্য ফানোঁর প্রদত্ত বয়ানের মাধ্যমে থিয়াঙ্গো বেশ প্রভাবিত হন। থিয়াঙ্গো “মনের পরাধীনতা” থেকে মুক্তিলাভের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, মনের এই দাসত্ব ক্ষমতাচর্চাকারীদের আরোপিত ভাষা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ঘটে থাকে। ফানোঁর মতো তিনিও ভাষার দুই ধরনের চরিত্র আছে বলে মনে করেন। ভাষাও এই অর্থে পরাধীনতা তৈরি করে। যেমন শাসকগোষ্ঠী ভাষা ব্যবহারের [নিজেদের সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে] মধ্য দিয়ে কিভাবে ইতিহাসে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে পরাধীন রাখার কৌশলী কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু আমাদের স্বতন্ত্র আত্মসচেতন “মন ও মগজ” তৈরি করার উদ্দেশ্যে বাস্তব জীবন ও যোগাযোগের প্রয়োজনে শাসককুলের ভাষা রপ্ত করা যেতে পারে। এভাবে ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের সম্ভাবনাগুলোর চর্চা করে নিজেদের স্বাধীন করে গড়ে তোলা যায়। থিয়াঙ্গোর সর্বশেষ বই মনের পরাধীনতা থেকে মুক্তির ইশতেহার [Decolonizing the Mind, 1986] ছিল ইংরেজি ভাষায় লিখিত। এটি ছিল জাতীয় ভাষা গিকুয়োর উপর গুরুত্ব দিয়ে লেখা এবং শাসকদের ভাষাকে দাপ্তরিকভাবে পরিত্যাগ করার ঘোষণা। তাছাড়া বইটিতে আফ্রিকার সাহিত্যে ভাষার রাজনীতি নিয়ে চমৎকার বিশ্লেষণ রয়েছে। এই বই ফানোঁর দুনিয়ার দণ্ডপ্রাপ্ত [The Wretched of the Earth, 1961] আফ্রিকার বিপ্লব [Toward the African Revolution, 1964] গ্রন্থে শিল্পকলা ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে দার্শনিক বক্তব্যের বিস্তৃত পরিসর হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে।

মাউরি পণ্ডিত লিন্ডা তুহিওয়াই স্মিথ তাঁর লেখায় স্বাধীন জাতিগুলোর জন্য নতুন সাহিত্য ও সংস্কৃতি নির্মাণ করতে মুক্তিকামী জনগোষ্ঠীর শিল্পসাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতি ফানোঁর বক্তব্যকে গ্রহণ করেছেন। তুহিওয়াই স্মিথ নিজের প্রেক্ষাপটে ফানোঁর বক্তব্যকে প্রয়োগ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, নিউজিল্যান্ডে মাউরি লেখকগণ বিপ্লবী আদিবাসীদের আন্দোলনকে সমর্থন করে সাহিত্য সৃষ্টি করছেন, যা তদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরে। তিনি এও উল্লেখ করেছেন যে, সামাজিক বিজ্ঞানের বিদ্যায়তন মহলেও একইভাবে চিন্তার স্বাধীনতা অর্জনের স্বল্প প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। ফানোঁর আহবানে সাড়া দিয়ে তিনি পরাধীনতা থেকে মুক্তি লাভের চিন্তাপদ্ধতি [Decolonizing Methodologies, 2012] শিরোনামে একটি বই লিখে ফেলেন, যা “গবেষণা” ক্ষেত্রে য়ুরোপীয় দখলদার শক্তিগুলোর আদিবাসীদেরকে অধস্তন রাখার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং দখলদারীদের উৎপাদিত জ্ঞানপদ্ধতির বিপরীতে গবেষণা পদ্ধতি তুলে ধরেন।

যুক্তরাষ্ট্রে ফানোঁর প্রভাব ক্রমশ বেড়েই চলছে। নারীবাদী তাত্ত্বিক বেল হকস ফানোঁর গবেষণায় নারী-পুরুষ ভেদাভেদের অনুপস্থিতির উপর জোর দিয়েছেন। পরাধীনতা থেমে মুক্তিকামী ব্যক্তিসত্তার মধ্যে লড়াইয়ের তীব্র বাসনা এবং তার অপরিমেয় ভালোবাসার সম্ভাব্যতা নিয়ে ফানোঁর বক্তব্যকে কেউ অস্বীকার করে না। অস্তিত্ববাদী ফেনোমেনোলজিবিদ বা ঘটনার প্রেক্ষাপটবিশারদ লুইস আর. গর্ডন ফানোঁ উপস্থাপিত পরাধীনতা থেকে মুক্তিলাভের জন্য বর্ণবাদবিরোধী দর্শনকে নতুন মানবদরদি চিন্তা হিসেবে তুলে ধরতে গবেষণা করেছেন। আফ্রিকা-ক্যারিবিয়ানদের কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যায়াতনে গর্ডন একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। বর্তমানে আফ্রিকা-ক্যারিবিয়ানবাসীদের মধ্যে গবেষণা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় তিনি নিবেদিতচিত্তে কাজ করছেন। তাদের প্রতিষ্ঠিত ক্যারিবিয়ান ফিলোসফিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন থেকে প্রতি বছর ফানোঁর নামে পুরস্কার প্রদান করা হয়। পাণ্ডিত্যে স্বীকৃতিস্বরূপ ক্যারিবিয়ার দর্শন ও আফ্রিকার মানবতাবাদীদের এগিয়ে নিতে ফানোঁর চিন্তার উত্তরাধিকারী হিসেবে এই মহৎ ব্যক্তির নামানুসারে গবেষণা ক্ষেত্রে পুরস্কারটি প্রদান করা হয়।

ফানোঁ তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনে ফ্রান্সের পূর্বতন দখলদারিত্বের কেন্দ্র প্যারিসে যে তুমুল আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলেন সেখানেই তাঁরই কন্যা মিরেইল ফানোঁ পিতার মানবতাবাদী পরাধীনতা থেকে মুক্তিকামী দর্শন নিয়ে কাজ করছেন। সর্বব্যাপী মিরেইল সকল জনসাধারণের জন্য নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত পিতার প্রতিশ্রুতিশীল বয়ান দিয়ে তাদেরকে সোচ্চার করে তুলছেন। এছাড়া তিনি ফাউন্ডেশন ফ্রানৎস ফানোঁ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে উদ্বাস্তুদের অধিকার ও সব ধরনের শক্তি ও বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।


গ্রন্থপঞ্জী ও অন্যান্য পাঠ্য তালিকা—


প্রাথমিক উৎস :

  • Fanon, Frantz.  L’An Cinq, de la Révolution Algérienne.  Paris: François Maspero, 1959.  [Published in English as A Dying Colonialism, trans. Haakon Chevalier (New York: Grove Press, 1965).]
  • Fanon, Frantz.  Les Damnés de la Terre.  Paris: François Maspero, 1961.  [Published in English as The Wretched of the Earth, trans. Constance Farrington (New York: Grove Press, 1965).]
  • Fanon, Frantz.  Peau Noire, Masques Blancs.  Paris: Editions du Seuil, 1952.  [Published in English as Black Skin, White Masks, trans. Charles Lam Markmann (New York: Grove Press, 1967).]
  • Fanon, Frantz.  Pour la Révolution Africaine.  Paris: François Maspero, 1964.  [Published in English as Toward the African Revolution, trans. Haakon Chevalier (New York: Grove Press, 1967).]

অন্যান্য উৎস :

  • Cherki, Alice.  Frantz Fanon: A Portrait.  Trans. Nadia Benabid.  Ithaca, NY: Cornell University Press, 2006.
    • A biography of Fanon by one of his co-workers at the Blida-Joinville hospital in Algeria and fellow activists for Algerian liberation.
  • Gibson, Nigel C.  Fanon: The Postcolonial Imagination.  Cambridge, UK: Polity Press, 2003.
    • An introduction to Fanon’s ideas with emphasis on the role that dialectic played in his development of a philosophy of liberation.
  • Gibson, Nigel C. (ed.).  Rethinking Fanon: The Continuing Dialogue.  Amherst, NY: Humanity Books, 1999.
    • A collection of some of the enduring essays on Fanon, with attention to his continuing relevance.
  • Gordon, Lewis R.  Fanon and the Crisis of European Man: An Essay on Philosophy and the Human Sciences.  New York: Routledge, 1995.
    • An argument in the Fanonian vein that bad faith in European practice of the human sciences has impeded the inclusive humanism Fanon called for.
  • Gordon, Lewis R., T. Denean Sharpley-Whiting, and Renée T. White (eds.).  Fanon: A Critical Reader.  Malden, MA: Blackwell, 1996.
    • Essays on Africana philosophy, neocolonial and postcolonial studies, human sciences, and other academic discourses that place Fanon’s work in its appropriate and illuminating contexts.
  • Hoppe, Elizabeth A. and Tracey Nicholls (eds.).  Fanon and the Decolonization of Philosophy.  Lanham, MD: Lexington Books, 2010.
    • Essays by contemporary Fanon scholars exploring the enduring relevance to philosophy of Fanon’s thought.
  • Sekyi-Out, Ato.  Fanon’s Dialectic of Experience.  Cambridge, MA: Harvard University Press, 1996.
    • A hermeneutic reading of all of Fanon’s texts as a single dialectical narrative.
  • Zahar, Renate.  Frantz Fanon: Colonialism and Alienation.  New York: Monthly Review Press, 1974.
    • An analysis of Fanon’s writings through the concept of alienation.