হোম গদ্য পোস্টমডার্ন বর্ষাবন্দনা

পোস্টমডার্ন বর্ষাবন্দনা

পোস্টমডার্ন বর্ষাবন্দনা
0

বর্ষা নিশ্চয়ই উপাদেয়! বিশেষত আপনি যখন আকাশে কালিদাসের লগে বৈসা বৈসা সঞ্চরণশীল মেঘমালা দেখেন। নিচে অতি অবশ্যই একখানা ট্যাগোর ভিলেজ। সেখানে কাটিতে কাটিতে ধান বর্ষা আসে। এই বর্ষা সর্বপ্লাবী নয়, ফসলবিনাশীও নয়, একটু তাড়া দেয় মাত্র। তাতেই ধান কাটা সারা। নৌকাভরা ধান। শতবর্ষ পরের একটি অবাস্তব রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের চলচ্ছবি। ম্যাজিক রিয়ালিজম।

সেই বর্ষা, মন্দ্রিত অন্ধকার, বনপথ থেকে হেঁটে আসা অনামা সুন্দরী—সবই আমাদের কালেকটিভ নস্টালজিয়ার অংশ। এই প্রত্নতাত্ত্বিক মেটাফরগুলো যাতে আজকের নাছোড়বান্দা শ্রাবণের সামান্য ইশারায় ভিজে ম্যাড়ম্যাড়ে না হয়ে যায়—সে কারণে সন্তর্পণে আমরা হাঁটি, মালিবাগ চৌরাস্তায়, কোমরপানি ঠেলে ঠেলে। দেখি, শুশুকের মতো ডুব দিয়ে দিয়ে রিকশা টেনে মৌচাক রেলগেইট বরাবর চলে যাচ্ছে পূর্বজন্মের মাঝি। একটি বাসের হঠাৎ সঞ্চরণে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে নাগরিক ঊর্মিমালা, নির্মীয়মাণ মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে বিস্তীর্ণ কালাপানি জুড়ে। স্কুলগামী শিশু আর তার মাকে তাড়া দেয় সেই ঢেউ। হাঁটুপানি ঠেলে হাঁপাতে হাঁপাতে তারা এগোয় ওভারব্রিজের দিকে। কিন্তু ঢেউ আর কালাপানি মাঝপথেই হারিয়ে দেয় তাদের। মৌসুমের প্রথম স্নাতক হয় তারা। যুগ্মভাবে।

হঠাৎ কোত্থেকে একটি নৌকাও ঢুকে পড়ে এই অভিষেক অনুষ্ঠানে। অদ্ভুত! মধ্যযুগের কোন বর্ষামঙ্গল কাব্যের হলুদ পৃষ্ঠা ছিঁড়ে পালিয়ে এসেছে সে?

এহেন নাগরিক জলাবদ্ধতায় চিরায়ত বর্ষাবিধৌত বাংলা সাহিত্য কিরূপে ধাতস্থ হইবেক? নয়ানজুলিগুলোকে গিলে ফেলেছে রিয়াল এস্টেট নামের ডাইনোসর, পরিবেশ আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় খামাখাই একে অপরকে দোষারোপ করছে। এক ট্যাগোরের বদলে আমরা পেলাম দুই-দুইখান মেয়র। তাদের কল্পনাপ্রতিভা আর নিরবচ্ছিন্ন আশাবাদ থেকে লাখে লাখে জন্ম নিচ্ছে এডিস মশা। ফলে, আশঙ্কা করা যায়, এই বর্ষাতেই, মাথার ওপর ঘূর্ণায়মান মশার দঙ্গল তাড়াতে তাড়াতে ডুবন্ত বধ্যভূমি পার হয়ে গ্রামের দিকে ছুটবে বাংলা সাহিত্য। পেছনে সে রেখে যাবে অবিনশ্বর জলজট, ডেঙ্গুসন্ত্রাস, অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ফ্ল্যাটবাড়ি আর অসময়ে ছুটি হয়ে যাওয়া স্কুলগুলোকে।


দাঁতকপাটি খুলছে ফারাক্কা, ধেয়ে আসছে মমতা ব্যানার্জি!


ভাবলাম, এই পলায়ন নিশ্চয়ই নৈসর্গিক এবং শাস্ত্রসম্মত। চালাঘর ঘিরে ঘোরবর্ষার গীতবাদ্য না হলে সাহিত্যের ঝিমুনি আসবে কী করে? এমন বাদল-দিনে আমাদের নিশ্চয়ই আরো আরো কালিদাস চাই, যেহেতু মেঘদূত ছাড়া আমাদের টিনের কৌটায় আর কোনো শুকনো খাবার অবশিষ্ট নাই। কালিদাসের বর্ষা বিরহের, আর ঠাকুরের বর্ষা বেদনার। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য নগরায়নের ল্যাবে বানানো দানবীয় এই বর্ষা বিরহেরও নয়, বেদনারও নয়। ফলে, কালিদাস কিংবা ঠাকুরের থিয়েটারে তার মঞ্চায়ন আর হচ্ছে না।

সঙ্গত কারণেই শহীদ কাদরীর অভিজ্ঞতায় “অদ্ভুত উড়োনচণ্ডী এক বর্ষা”র সন্ত্রাসে ছত্রখান হয়ে গেল সন্ধ্যার তন্দ্রালস জনারণ্য। কিন্তু তখনো সুযোগ ছিল ঢলের, সে সিগারেট-টিন, ভাঙা কাচ, সন্ধ্যার পত্রিকা, লন্ড্রির হলুদ বিল, শৌখিন শার্টের ছিন্ন বোতাম আর রঙিন বেলুনসমেত নেমে যেতে পারত “নর্দমার ফোয়ারার দিকে”। হায়, ফোয়ারা তখনো ছিল! নর্দমাও ছিল! ছিল বলেই আবিদ আজাদের টাইপ রাইটারের টাপুর টুপুর শব্দে বৃষ্টি নামতে পারত মতিঝিলে! নাগরিক জলজটের প্রাগাধুনিক যুগের কথা সেসব।

পোস্টমডার্ন জমানায় একটি গ্রামীণ বর্ষাবন্দনা লিখতে গিয়ে নিশ্চয়ই আমাদের মনে পড়বে ট্যাগোর-বর্ণিত সেই কৃষ্ণ বালিকার কথা—যাকে “কালো” বলতো গাঁয়ের লোক। কিন্তু আমরা কখনোই জানব না, লাগাতার বজ্রপাতের ভেতর সে ঠিকঠাক বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল কি না? নাকি তাকে পেড়ে ফেলেছিল কয়েকজন যুবক, বর্ষামন্দ্রিত বনপথে? নাকি ঢলের ধাক্কায় সে, তার শ্যামলা গাই আর পায়ের নিচে ব্রিজ—সবই উধাও হয়ে গিয়েছিল বেনোজলে, কোনো বর্ষানিশীথের ক্রুদ্ধ যমুনায়? নাকি তাকে আজো পাওয়া যাবে দিনাজপুরের সেই জলমগ্ন গহিন গ্রামে, যেখানে ভারতমাতার নদীশাসনের উদাত্ত আশীর্বাদ অঙ্গে মেখে নৌকা বানাচ্ছে নুহনবী!

আজিকে যে বর্ষাঋতু, তা কেবলি নৈসর্গিক নয়। বরফ গলছে, সি-লেভেল বাড়ছে, অসমান রাষ্ট্রসম্পর্কের ঔরস থেকে জন্মাচ্ছে অন্য এক বর্ষা। বাঁধ ভাঙছে, ফসল তলাচ্ছে, বানভাসি মানুষ ঠাঁই নিচ্ছে ইউটিউবে, ফেসবুকে থৈ থৈ করছে পানি। ইমোটিকন ছাড়া আপাতত আর কোনো ত্রাণসামগ্রী নাই। কৃষ্ণকলি তুমি এখন কারে বলবে, হে প্রাগাধুনিক সুবোধ? কোন্ বাগানবাড়িতে বসে মেঘমঞ্জরি লিখবে তুমি? দাঁতকপাটি খুলছে ফারাক্কা, ধেয়ে আসছে মমতা ব্যানার্জি! এই সিজনেই তুমি, আমি, বাংলা সাহিত্য, নৌকাভরা ধান আর ডুবন্ত কবরস্থানসহ একটা নিটোল আষাঢ়ে গল্প হয়ে যাব!