হোম গদ্য পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় : মুক্তিযুদ্ধের দ্বৈত মানস

পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় : মুক্তিযুদ্ধের দ্বৈত মানস

পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় : মুক্তিযুদ্ধের দ্বৈত মানস
2
0

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাহিত্য-শিল্পের প্রতিটি শাখাকেই করেছে দীর্ঘ প্রেষিত। নাট্য রচনায় মুক্তিযুদ্ধকে প্রেক্ষিত করে যে কজন নাটক রচনা করেছেন তার মধ্যে সৈয়দ শামসুল হক [১৯৩৫-২০১৬] অন্যতম। সৈয়দ শামসুল হক বাংলা ভাষা-সাহিত্যের অপ্রতিরোধ্য কবি। সব্যসাচী লেখক হিসেবেও সমধিক পরিচিত। কাব্য-উপন্যাস-নাটকসহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখাতেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাসে কাব্যনাট্য ধারায় তিনি অনন্য আসনে সমাসীন। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ তার প্রথম নাটক। তার অন্যান্য নাটকগুলো : ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘গণনাটক’, ‘ঈর্ষা’, ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’, ‘নারীগণ’ প্রভৃতি বাংলা নাট্য সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তার নাটকগুলোতে রয়েছে নাট্য ও কাব্যময়তার যৌথ অনন্য উচ্চতা। ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ যেমন কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে তেমনি ‘নারীগণ’ও বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার নারীগণের ইতিহাস আশ্রিত। ‘ঈর্ষা’ নাটকে মানুষের মানবিক জটিলতা রূপায়িত হয়েছে। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকটি ইতিহাস, বাস্তবতা, নাট্য ও কাব্যগুণে ঐকতানিক। ভাষায় অনন্য বৈচিত্র্যমণ্ডিত।

‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকের কাহিনিতে দেখা যায়—মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতায় গ্রামবাসী মানুষদের মধ্যে ভয়-উদ্বেগ-উৎকণ্ঠ-উত্তেজনা। চারপাশের প্রায় সব গ্রামের নারী পুরুষ এসেছে মাতবরের কাছে। মাতবর তাদের আশ্বাস দিচ্ছেন। গতরাতেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে; কথা হয়েছে বলে জানাচ্ছেন। কিন্তু গ্রামবাসী যেন ভরসা রাখতে পারছেন না। এ সময় ঘটে আরেক ঘটনা। মাতবরের মেয়ে ঘরের ভেতর থেকে বাইরে চলে আসে। সবাইকে জানাতে চায় তার বাবা পাকিস্তানিদের দোসর। তার বাবা মাতবর গতরাতে জোর করে নিজের মেয়েকে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের হাতে তুলে দিয়েছিল। অপমানিত আত্মগ্লানিতে মাতবরের মেয়ে আত্মহত্যা করে। কিন্তু মাতবর যে যুক্তিতে দাঁড়াতে চায় তা হলো—একরাতের জন্য হলেও সে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের কাছে বিয়ে দিয়েছিল। এভাবেই কাহিনি এগিয়ে চলে।


সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম কাব্য নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। প্রকৃত অর্থে এ নাটকটি মুক্তিযুদ্ধের নায়ক/নায়িকা-নির্ভর বর্ণনা বা ঘটনা সমৃদ্ধ কোনো নাটক নয়।


মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল-রোটি-আওরাত’, শওকত ওসমানের ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’, হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’, শাহরিয়ার কবিরের ‘একাত্তরের যীশু’, সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ প্রভৃতি গল্প-উপন্যাস অর্থাৎ নানা সাহিত্যকর্মের মধ্যে কাহিনিবিন্যাসে ব্যতিক্রম ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। মুক্তিযুদ্ধের মঞ্চনাটকগুলোর মধ্যেও এ নাটক ভিন্ন মাত্রায় সমাসীন। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে মানবীয় রক্তক্ষরণ এ নাটকের প্রতিপাদ্য। নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক বলেন—এই নাটকের বীজ আমি পেয়েছিলাম একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাস্তব একটি ঘটনা থেকে কিন্তু সেই ঘটনা ঠিক কোথায় ঘটেছিল তা আজ শনাক্ত করতে পারব না। এমন ঘটনা বাংলাদেশে সেদিন প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই ঘটেছিল বলে আমরা দেখতে পাব; আমরা দেখতে পাব যে, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যারা সহায়তা করেছিল তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত ঐ হানাদার বাহিনীরই শিকারে পরিণত হয়েছিল। [সৈয়দ শামসুল হক, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাট্যগ্রন্থ, চারুলিপি প্রকাশন, ঢাকা, পৃষ্ঠা-৫৭]

সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম কাব্য নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। প্রকৃত অর্থে এ নাটকটি মুক্তিযুদ্ধের নায়ক/নায়িকা-নির্ভর বর্ণনা বা ঘটনা সমৃদ্ধ কোনো নাটক নয়। মুক্তিযুদ্ধকে আশ্রয় করে একটি ক্ষুদ্রাকার মহাকাব্য। যার মূল সুর ট্র্যাজেডি। কিন্তু ট্র্যাজেডির শর্ত মানেন নি নাট্যকার। নাট্যকার পঞ্চ অঙ্কের বিপরীতে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিকে আশ্রয় করেছেন। মৈমনসিংহ গীতিকায় যেমন দৃশ্য বা অঙ্কবিভাজনের বাইরে আছে শুধুমাত্র ঘটনার শিরোনাম। ঠিক তেমনি ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকেও দৃশ্য কিংবা অঙ্ক বিভাজন নেই। আর বাঙালির ঐতিহ্যের ধারার শিরোনামও নেই। গ্রিক নাট্য কৌশলের ঐক্যগত মিল আছে। নাটকটি সফোক্লিসের ‘ইডিপাস’ নাটকের অনুসৃত। সময়ের ঐক্য-স্থানের ঐক্য ও ঘটনার ঐক্য মিশে একাকার। নাটকের শুরুতে গ্রামবাসী আসে মাতবরের কাছে। যেমনটা ইডিপাসে দেশবাসী আসে ইডিপাসের কাছে সমূহ বিপদ থেকে মুক্তির জন্য। ইডিপাসে যেমন ঘটনার পর ঘটনা উন্মোচিত থাকে এবং শেষে ইডিপাসই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হোন। ইডিপাসের জীবনে নেমে আসে ট্র্যাজেডি। ঠিক তেমনি এ নাটকে গ্রামবাসী বিপদের মুখে মাতবরের কাছে আসে। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের বীভৎসতা। শেষে নাটকের মাতবর নিজের ভুল উপলব্ধি করেন। নিজের মেয়ে আত্মহত্যা করে। নেমে আসে মাতবরের জীবনে ট্র্যাজেডি। গ্রিক নাটকের অবশ্য বিষয় ছিল কোরাস। এ নাটকেও কোরাস ব্যবহার করেছেন নাট্যকার।

নাটকের শুরুতেই দেখা যায় বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন একে একে আসছে মাতবরের কাছে। এ সমূহ বিপদে যেন মাতবরই তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। নাটকে তার বর্ণনাই ফুটে ওঠে এভাবে—

মানুষ আসতে আছে কালীপুর হাজীগঞ্জ থিকা
মানুষ আসতে আছে ফুলবাড়ি নাগেশ্বরী থিকা
মানুষ আসতে আছে যমুনার বানের লাহান
মানুষ আসতে আছে মহরামের ধূলার সমান

অত্যন্ত চমৎকার ভাষার অলংকরণে অনবদ্য হয়ে ওঠে সংলাপ। উপমায় যেন ফুটে ওঠে গ্রামের মানুষের ব্যাকুলতা। গ্রামবাসী সংলাপে বিধ্বস্ত এ জনপদের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেন গ্রামবাসীর অসহায়ত্ব পাঠক হৃদয়ের মর্মমূলে আঘাত হানে—

আম গাছে আম নাই শিলে পড়েছে সব
ফুল গাছে ফুল নাই গোটা ঝরছে সব
সেই ফুল সেই ফল মানুষের মেলা
সন্ধ্যার আগেই য্যান ভরা সন্ধ্যাবেলা।

পীরের কাছে মাতবর যেন গ্রামের জিম্মাদার। মানুষের ভালো-মন্দ সমস্ত কিছুই যেন মাতবরের হাতে। মাতবরই যেন এ হেন কঠিন বিপদে তাকে রক্ষা করে। পীরকে অনুরোধ করে গ্রামবাসী। অপূর্ব ছান্দসিক সংলাপে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাতবরও যেন জন হিতৈষী। পীর বলেন—

ঝড়ের খবার আগে পায় বড় গাছের ডাল
বানের খবর আগে পায় যমুনার বোয়াল
খরার খবর পয়লা জানে আজদাহা সাপ।
সে না আইসা কি পারে

তারপরও গ্রামবাসীর অধীর অপেক্ষা। মাতবর আসবে তখন। বলতে থাকে—

মাতবর সাব, বাড়িত আছেন?
দরজা খোলেন, জলদি আসেন
রদ্দুরে গাও পুইড়া যায়
তিয়াসে বুক শুকায়া যায়
সময় বুঝি ফুরায়া যায়
মাতবর সাব, বাইরে আসেন।

অবশেষে নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাতবর সাহেব জনসম্মুখে হাজির হন। মানুষ যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। কারণ এ হেন যুদ্ধের সময় মাতবর ছাড়া আর কে আছে তাদের বাঁচানোর। কোরাস গ্রামবাসী যেন তাদের আর্জি তুলে ধরে মাতবরের সামনে। পাকিস্তানিদের অত্যাচারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে। মাতবর যে নিজেই পাকিস্তানি হানাদারদের পক্ষে তা জনগণ জানে না। গ্রামবাসী শুধুই জানে মাতবরের ক্ষমতাই পারে তাদের রক্ষা করতে।

মাতবর—নিজ চক্ষে দ্যাখো নাই সেটা বোঝা যায়
চক্ষুর চেয়েও দূরে দুই কান যায়
শোনো নাই মানুষের মরণ চিৎকার?
আওয়াজ কি পাও নাই আগুন লাগার
দ্যাখো নাই সেই তাপে লাল আসমান
ভোরের আগেই এক ভয়ানক ভোরের লাগান?

ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিবেশ। মাতবর গ্রামবাসীকে আশ্বস্ত করে এই বলে যে, গতরাতেও পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের সাথে তার কথা হয়েছে। জনগণকে নিরাপদ রাখতে সে যথেষ্ট প্রচেষ্টা রাখছে। গ্রামবাসী যেন আশ্বস্ত হয়েও হতে পারে না। এমন সময় ঘটে আরেক ভয়াবহ সত্যের উন্মোচন। মাতবরের একমাত্র মেয়ে বাড়ির অন্দর থেকে বাহির বাড়িতে চলে এসে মুখ খোলে। মাতবর তার বাবা হয়েও নিজের কন্যাকে তুলে দিয়েছে মিলিটারি ক্যাপ্টেনের হাতে। গ্রামবাসী বিস্মিত হয়ে পড়ে।

মাতবর মূলত পাকিস্তানি মিলিটারিদের সহায়তা করেছে। পাকিস্তানি মিলিটারিদের সঙ্গে তার গোপন শলা-পরামর্শও ছিল। যে ক্যাপ্টেন মিলিটারিকে এতদিন মাতবর নানাভাবে সহায়তা করেছে। গ্রামের নারীদের তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। সে ক্যাপ্টেন যখন অনুমান করে এ দেশে আর টিকে থাকা সম্ভব নয় তখন সে মাতবরের মেয়েকেই চেয়ে বসে। মাতবর প্রথমে বজ্রাহত হলেও তার করণীয় কিছু থাকে না।

মেয়ে : উপস্থিত সক্কলেরে কই, বিশ্বাস করেন
আমার বা’জান তিনি সত্যই বলেন
মেলেটারি এ বাড়িতে আইসাছিলেন।

আত্মগ্লানিতে মাতবরের কন্যা যেন মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর যন্ত্রণায় ভুগছে। মেয়ে তার বাবা সম্পর্কে আরো বলতে থাকে—

তর মা-য়ে কই? বইলা ঘরের ভিতর
গিয়া কইলেন, পাকঘর থিকা শোনা যায়,
‘মেয়েটারে মেলেটারি চায়।’
কইলেন, ‘এতে কোনো দোষ নাই,
রাজী করছি সে হইবো আমার জামাই’
কইলেন, ‘কলমা পড়ায়া দিমু রীতিমতো বিয়া
না হয় দেশের ছেলে না-ই হইল, দেশ ধুইয়া
পানি খামু? দেইখা নিও এই যুদ্ধ শেষ হইলে পর
সোনায় মুড়ায়া দিবে তোমার এ ঘর।’


নাটকের সংলাপগুলোর ছন্দবদ্ধতা মুগ্ধ করার মতো। ঠিক পয়ার ছন্দ ব্যবহার না করলেও প্রতিটি বাক্য কিংবা শব্দের শেষ অন্ত্যমিল রয়েছে।


মাতবরের এতদিনের চরিত্রের প্রকৃত রূপ প্রকাশ পেতে থাকে। গ্রামবাসী, মেয়ে, মাতবরের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে মুক্তির সামগ্রিক বিষয়গুলো উপস্থাপিত হতে থাকে। মেয়েকে ধমকে মাতবর বলে ওঠেন—

আমি। আমি তা হাতে নিজেই আল্লার নামে দিয়াছি
মেয়েরে।
আমি জানি আল্লাতালা হাশরে আখেরে
এ বিয়া কবুলভাবে অবশ্য নিবেন। আমি জানি
সাফ দেলে ডোবার পানি হয় জমজমের পানি
আমি জানি আল্লার কালাম হইল নিজের বুলন্দে
পাপী তাপী পীর পাগলা কানা খোড়া আতুর বা অন্ধ
যেই তা জিহ্বার ’পরে উচ্চারণ করে একবার
হুজুরে কবুল হয়, কোনো শক্তি নাই দুনিয়ার
করে তা নাচার।

গ্রামবাসীর মনে প্রশ্ন দানা বেঁধে ওঠে। ক্ষমতা যেন আরেক ভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়। নিজের আত্মপরিচয়ে মাতবরের জবানিতেই ফুটে উঠে—

এতকাল যে লোক নিজের লোক তুইলা দিতে পারে
কও, বিশ্বাস কি তারে?

মুক্তিযোদ্ধারা মাতবরকে এবার আরো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। মেয়ের মুখে করুণ আর্তি ছাড়া কিছুই নেই।

যখন আমার দেহে কালসাপ জড়ায়া ধরছিল
যখন আমার বুকে কালসাপ দংশাইয়াছিল
বলেন, জবাব দেন, কোথায় কোথায়?
বেহেস্তের কোন বাগিচায়
বলেন থাকলে পর বান্দার কান্দন তার কানে না পশায়?

মেয়েটি বিষপানে আত্মহত্যা করে। মাতবরের যেন হুঁশ হয় না। গ্রামবাসী মুক্তিযোদ্ধা মাতবরের মৃত্যু চায়। মাতবর নিজেই বলেন—

আমার মরণ চাও? মারতে চাও? প্রাণ নিতে চাও?
আমারেই খুন করতে চাও?

অপর দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনের শব্দ শোনা যায়। নিজের পাইকই বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ হিসেবে মাতবরকে হত্যা করে। মৃত পড়ে থাকে মাতবরের দেহ।

থিয়েটারই প্রথম প্রযোজনা করেছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকটি। বাংলাদেশের নেতৃত্বস্থানীয় নাট্যদল থিয়েটার। নাট্য উপস্থাপনে তারা নানাবিধ পরিবর্তন এনেছেন। নির্দেশনা দিয়েছেন আবদুল্লাহ আল মামুন। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ নভেম্বর ঢাকার মহিলা সমিতি মঞ্চে এ নাটকের প্রথম অভিনয় হয়। এ যাবৎ নাটকটির দুশোর বেশি প্রদর্শনী হয়েছে। এখন যারা এ নাটকে অভিনয় করেন—ফেরদৌসী মজুমদার, কেরামত মওলা, শফিউর রহমান মানু, নুরুল ইসলাম সানি, খুরশীদ আলম, রাশেদুল আওয়াল শাওন, জোয়ারদার সাইফ, তামান্না ইসলাম, সামিয়া মহসীন, শেকানুল ইসলাম শাহী, মারুফ কবির, তানভীর হোসেন সামদানী, কল্যাণ চৌধুরী, তানজুম আরা পল্লী, কাওসার রাজীব, আতিকুর রহমান, এরশাদ হাসান, তোফা হোসেন, ত্রপা মজুমদার প্রমুখ। এক সময় এতে অভিনয় করতেন প্রথিতযশা অভিনয়শিল্পী—আবদুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, মোহাম্মদ জাকারিয়া, আবদুল কাদের, তারিক আনাম খান, মিতা চৌধুরী, তারানা হালিম, খায়রুল আল সবুজ, আরিফুল হক প্রমুখ। নাটকটি নির্মাণে মূল নাট্যগ্রন্থ থেকে সম্পাদনা করে মঞ্চবিন্যাস করা হয়েছে। থিয়েটার প্রযোজিত এ নাটকটির বর্তমানে নবরূপায়ন করা হয়েছে। নবরূপায়নে নির্দেশনা দিয়েছেন সুদীপ চক্রবর্তী। নাটকটির সুভ্যিনিয়রে উল্লেখ—‘…আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তবর্ণ আলেখ্য পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। বাংলাদেশের নিরীহ, সরল ও সবল মানুষগুলো স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে আর এই সংগ্রামী মানুষকে ঔপনিবেশিক শক্তির অনুচররা প্রতিহত করার জন্য গোপন যড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এ যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক শুধু তার স্বজনকে হারায় নি, হারিয়েছে মানুষের বিশ্বাস এবং নিজের জীবন। হাজার হাজার মুক্তিসেনার রণজয়ী পায়ের আওয়াজ বয়ে নিয়ে এল আমাদের স্বাধীনতার সংবাদ। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হলো আমাদের লাল সবুজ পতাকা। এ নাটকে কেবল রাজনৈতিক মুক্তি নয়, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতা থেকে মুক্তির মতো বৃহত্তর মুক্তি বলা হয়েছে।’ [থিয়েটার নাট্য দলের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এর সুভিন্যুর।]

নাটকের মূল চরিত্র মাতবর। তারপর আছে পীর সাহেব, মাতবরের মেয়ে, পাইক, গ্রামবাসীগণ, তরুণদল ও মুক্তিযোদ্ধাগণ। মাতবর চরিত্র মূলত একজন পাকিস্তানি সহযোগী। তার চরিত্রের মধ্য দিয়েই নাট্যকার মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতার স্বরূপ তুলে ধরেছেন। নাটকে বিয়োগান্তক পরিণতি মাতবরের। মাতবর নিজেও তা জানেন। তাই তো মাতবর আত্মগ্লানিতে বলে ওঠে—

না হয় জালেম আমি, কও দেখি, একবার
বুকে হাত দিয়া কও, জালেম কি জন্মাবে না আর?
কোনো দেশে? কোনো বংশে? আবার? আবার?

নাট্যকার গ্রামবাসীর সংখ্যা কুড়ি কিংবা তারও বেশি দাবি করেছেন। তা আবার তারা বিভিন্ন বয়সী হতে হবে। এর মধ্যে একশ বছরের কাছাকাছি বৃদ্ধার কামনাও করেছেন। যখন অধীর অপেক্ষা করছে গ্রামবাসী। তখন গ্রামবাসী বলে ওঠে—

চাই মাতবর সাবেরে
চাই মাতবর সাবেরে
চাই মাতবর সাবেরে
চাই মাতবর সাবেরে
তিনি কই
তিনি কই
তিনি কই
তিনি কই
তার তো জানা আছে আসছি আমরা
তার তো শোনা আছে আসছি আমরা
তার তো দেখা আছে আসছি আমরা
তার তো হুঁশ আছে আসছি আমরা।

নাট্যকার নাটকের দৃশ্যপট সম্পর্কে শুরুতেই একটি রূপরেখা ব্যক্ত করেছেন। নাটকের মঞ্চ তিনদিকই কালো পর্দায় সজ্জিত থাকবে। মঞ্চের মাঝখানে একটি চেয়ার; কাঁঠাল গাছের তৈরি বহু ব্যবহারে তৈলাক্ত এবং মসৃণ। আবার নাটকের শেষ দৃশ্য কল্পনা করেছেন এভাবে—নাটকের শেষভাবে যে পতাকার কথা বলা হয়েছে তার আয়তন গোটা মঞ্চ ক্ষেত্রের এক চতুর্থাংশ হতে হবে। দশক সমাগম শুরু থেকে থেকেই মঞ্চ অনাবৃত থাকবে। স্তিমিত একটা সাধারণ আলোর ভেতরে অপেক্ষাকৃত জোরাল আলোয় চেয়ারটি উদ্ভাসিত থাকবে। নেপথ্য থেকে বাঁশি ও ঢাকের মিলিত একটা সংগীত শোনা যাবে; সে-সংগীত হৃদ্‌স্পন্দন অথবা তালে তালে বহু পদশব্দ এগিয়ে আসবার অভিব্যক্তি। [সৈয়দ শামসুল হক, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাট্যগ্রন্থ, চারুলিপি প্রকাশন, ঢাকা, সবিনয় নিবেদন অংশ]

নাটকের সংলাপগুলোর ছন্দবদ্ধতা মুগ্ধ করার মতো। ঠিক পয়ার ছন্দ ব্যবহার না করলেও প্রতিটি বাক্য কিংবা শব্দের শেষ অন্ত্যমিল রয়েছে। এর মধ্যে কাব্যময়তা রয়েছে। ধূর্ত মাতবর সংলাপে যেমন ছন্দ আছে তেমনি গ্রামবাসী কিংবা পীরের সংলাপেও অন্ত্যমিল আছে। পীর সাহেব বলেন—

যদিও সকল চক্ষু আমার উপর
না, আমি না
এ বিয়ার কিছুই জানি না


নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক রাজাকার চরিত্রকে নায়ক বানিয়ে মূলত কালোর মধ্য দিয়ে সাদার অনুপস্থিতি বুঝানোর চেষ্টা করেছেন।


নাটকের ভাষা আঞ্চলিক হলেও তার মধ্যে তা যেন সার্বজনীন ভাষায় রূপলাভ করেছে। ভাষায় একধরনের শিল্পসৌকর্য প্রাণ পেয়েছে। সংলাপে অত্যন্ত চমৎকার পরিমিতিবোধও আছে। নাটকে উপমার অসাধারণ প্রয়োগ ঘটেছে সংলাপে সংলাপে। রূপকল্প, দৃশ্যকল্প ভাষায় অসাধারণ অলংকারের প্রয়োগ ঘটেছে।

যেমন মানুষ গেলে পথে চিহ্ন থাকে
আছে চিহ্ন আছে
যেমন বানের শেষে পাড়ে চিহ্ন থাকে
আছে চিহ্ন আছে
যেমন মারীর শেষে গায়ে চিহ্ন থাকে
আছে চিহ্ন আছে
যেমন হিমের শেষে ডালে চিহ্ন থাকে
আছে চিহ্ন আছে

নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক রাজাকার চরিত্রকে নায়ক বানিয়ে মূলত কালোর মধ্য দিয়ে সাদার অনুপস্থিতি বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। নাট্যকার বলেন—‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ মুক্তিযুদ্ধের নাটক হিসেবে পাঠক ও দর্শকের কাছে চিহ্নিত হলেও, সবশেষে কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে বলা দরকার যে—এ নাটক আমি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নাটক হিসেবে রচনা করি নি; একাত্তর এ নাটকে একটি পরিচিত ও আমাদের প্রত্যেকের জীবন স্পর্শকারী পটভূমি মাত্র। আমি চেয়েছি এই মুক্তিযুদ্ধকে পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করে আরো বড় একটি মুক্তির জন্যে দর্শককে প্রাণিত করতে—সে-মুক্তিযুদ্ধ ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, ধর্মের নৌকোয় নৈতিক অন্যায়কে পার করিয়ে দেবার যুগ-যুগান্তরের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে। [সৈয়দ শামসুল হক, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাট্যগ্রন্থ, চারুলিপি প্রকাশন, ঢাকা, পৃষ্ঠা-৬৩]

বাংলার গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থায় ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ একটি রূপক শব্দ। এক ধরনের ভাবব্যঞ্জক শাব্দিক অনুসরণে অনুকৃত নামকরণ। মূলত ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধের পটভূমিকায় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা, ধর্ষণ, হত্যা, গ্রামীণ মোড়লের ভূমিকা, রাজাকারদের কর্ম, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ চেতনায়প্রেক্ষিতে মানবীয় আখ্যান। মূল চরিত্র রাজাকার মোড়ল দ্বৈত মানসিকতার পরিচয় বহন করে। কাব্যিক ব্যঞ্জনায় অনবদ্য নাটকটি বাঙালির জীবনসত্তার রূপকেই উদ্ভাসিত করে। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত হোক সাহিত্য-শিল্পের প্রতিটি ধারা।

(2)