হোম গদ্য পালকি : যেখানে হৃদয় দোলে গানের সুরে

পালকি : যেখানে হৃদয় দোলে গানের সুরে

পালকি : যেখানে হৃদয় দোলে গানের সুরে
195
0

গানের সুরে সুরে সমস্ত ক্লান্তি ভুলে গ্রামের মেঠো পথ ধরে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে হেঁটে নতুন বউকে শ্বশুরালয়ে নিয়ে যেতেন যারা, তারা বেহারা। আর যেখানে বসিয়ে দুলিয়ে দুলিয়ে, বাবা-মাকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট ভুলিয়ে ভুলিয়ে স্বামীর সংসারে পৌঁছে দিতেন, তার নাম পালকি। এটিকে প্রথমত মনে করা হতো দেবতার বাহন, পরবর্তীকালে ইউরোপের সম্ভ্রান্ত নারীদের বাহন হিসেবে পরিচিতি পায়। কালের পরিক্রমায় উপমহাদেশেও সম্ভ্রান্ত মহলে এটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও তা ক্রমেই আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। যার ফলে আমাদের শিল্প, সাহিত্যে পালকির একটি বিশেষ অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ‍


পালকি আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে যখন এর ব্যবহার সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে বেরিয়ে এসে বর-কনের নান্দনিক বাহনে পরিণত হয়। 


পালকি কেন এবং কোন কারণে বাঙালি সংস্কৃতি এবং সাহিত্যে বিশেষ অবস্থান করে নিয়েছে সেই উত্তর একটু খোঁজা যাক। প্রথমত, এই পালকির গঠন এবং পালকি তৈরির উপকরণ বিশ্লেষণ করতে চাই। পালকি এমন একটি বাহন, যেটি তৈরি করা খুব সহজ। অত্যন্ত আরাম আয়েশে বসা যায় বা আধা শোয়া অবস্থায় থাকা যায়, এমন উচ্চতা রেখে দৈর্ঘ্য আর প্রস্থে পর্যাপ্ত জায়গা রেখে চৌকোনা আকৃতির এই বাহনটি তৈরির মূল উপকরণ কাঠ যা আমাদের দেশে খুবই সহজলভ্য। চৌকানা আকৃতির এই বাহনের দুই পাশে দুটি শক্ত ও মোটা খুঁটি সামনে আর পিছনের দিকে প্রলম্বিত করে স্থাপনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়; যা দুই, চার, কিংবা ছয়জন বেহারা কাঁধে নিয়ে খুব সহজেই চলতে পারে। নির্মাণ কৌশল খুব সহজ ও নির্মাণ উপকরণ সহজলভ্য হওয়ায় আমাদের দেশে এটি ক্রমেই সহজলভ্য ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু পালকি আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে যখন এর ব্যবহার সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে বেরিয়ে এসে বর-কনের নান্দনিক বাহনে পরিণত হয়। একই সাথে এই বাহনের বোহারাদের ক্লান্তি দূর করার জন্য তাদের মুখে মুখে যখন বিশেষ ধরনের সংগীতের সৃষ্টি হয়, তখন তা সাধারণ জনমানুষের মনের আরও গভীরে স্থান পেতে শুরু করে। সঙ্গতকারণেই, পালকি নিয়ে যখনই বোহারারা গ্রামের রাস্তায় হেঁটে যেতেন, রাস্তার দুপাশে অত্যন্ত আগ্রহ আর উচ্ছ্বাস নিয়ে নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে, শিশু-কিশোরের ভিড় জমে যেত আর কান পেতে শুনতে থাকত বোহারাদের হৃদয় দোলানো গানের ব্যঞ্জনা। বেহারাদের এই গান ক্রমেই এমন একটি স্থানে উপনীত হয়, যা আমাদের আবহমানকালের বিভিন্ন শ্রেণির গান যেমন : জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ‍মুর্শিদি, ভাওয়াইয়া ইত্যাদি গানের সাথে তার জায়গা করে নেয়।

এমন কী থাকত বেহারাদের এই গানে? এই বিষয়টি একটু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বোহারাগণ যে ভাষায় গান গাইত, তার ভাষাশৈলী অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল। শব্দের উৎস ছিল প্রতিদিনের জীবনযাপন থেকে নেয়া। কথামালা ছিল আপনার আমার মুখের কথার মতো, কিন্তু তা ছিল অত্যন্ত সুনিপুণ ছন্দোবদ্ধ এবং মাত্রাবিন্যাসে ছিল অত্যন্ত যত্নশীল যা তাদের অবচেতন মনে হয়ে যেত। অনেকটা চারণ কবির মুখের চরণের মতো খই ফুটত যখন তারা নতুন বউ কিংবা বরকে নিয়ে এই গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতেন। গানে গানে উঠে আসত কনের রূপের বর্ণনা, সাজ পোশাকের বিবরণ অথবা বরের বীরত্ব কিংবা নানান যোগ্যতা।

কর্তাবাবুর রংটি কালো, গিন্নি মায়ের মনটি ভালো, সামলে চলো হেঁইও
হেঁইও জোয়ান সরু আল চলো ধীরে, কর্তাবাবুর দরাজ দিল দেবে চিঁড়ে

বাঙালির বিয়ের আয়োজনের অন্যতম একটি পর্ব মেহেদি তোলা। এই মেহেদি তোলার প্রতিটি দৃশ্যের বর্ণনা উঠে আসত বোহারাদের সুরে…

ছিল মেন্দি হিন্দুস্তানে, আইলো মেন্দি পাকিস্তানে
এই মেন্দি তুলিবে কে? দুলাইনের বড় ভাবি রে….

সামান্য বখশিশের আশায় নতুন বউ নিয়ে তারা বরের বাড়ির প্রত্যেকটি ঘরের দরজায় গিয়ে গিয়ে সুরে সুরে গান গাইত সেই ঘরের গৃহকর্তা কিংবা গৃহিণীর মনোরঞ্জনের জন্য।

ভাবির কানের পাশা গো, রোইদে ঝিলমিল করে গো
লা ইলাহা কলমা পড়ো ভাইগো….

এই ঘরের বড় ভাবি কোথায় জানি গেল রে…
মান দেওয়ার ভয়ে ভাবি কোথায় জানি পালাইলো…
লা ইলাহা কলমা পড়ো ভাইগো….

পশ্চিম ঘরের বুয়া গো, মানের টাকা লাইয়া আসেন গো…
লা ইলাহা কলমা পড়ো ভাইগো….

উত্তর ঘরের বুয়া গো, মানের টাকা লাইয়া আসেন গো…
লা ইলাহা কলমা পড়ো ভাইগো….

ছেলের মা’কে খুশি করার জন্য বরের বাড়ির নিকটবর্তী হলে বেয়ারারা ধরত নতুন গান—

আল্লা বোল, ওরো বোল, মাইয়ার মারে দিসি গোল…
পোলার মা’রে স্বর্গে তোল

যেই কোদালে ছাঁচে হিসে দুলার বাপের বাড়ি রে,
সেই কোদালে ছাঁচে দুলহানের  বাপের দাড়ি রে,


ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত আন্দোলিত হয়ে পালকি নিয়ে জাদুকরি শব্দ চয়নে রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত জনপ্রিয় কবিতা ‘পালকির গান’।


আবার বেহারারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে একদল গান ধরত কনের পক্ষে আবার অন্য পক্ষ গান ধরত বরের পক্ষে। বাড়ির আঙিনায় ভিড় করে গ্রামের সকল মানুষ প্রাণ ভরে শুনত বেহারাদের গান। শুধু যে তাদের গানে বর-কনের বিষয়াদি ছিল, তা নয়। গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরুর গৃহস্থের দিনযাপনের চিত্র চিত্রিত হতো বোহারাদের গানে গানে…

বাইশ ভরি রাখছি ধান চিড়া খাইবার আশে
সেই ধান কাটিয়া নিলো রাজবাড়ির ইঁদুরে রে..
হরি হরি রে, বাইচ্চা ইঁদুরে ঘিরিল আমার বাড়ি রে…

গৃহস্থলির দিনযাপনের পাশাপাশি পালকির গান ছিল রোমান্টিসিজমে ভরপুর। হৃদয় নিংড়ানো সুরে, মন দোলানো কথামালায় বেহারারা মাতিয়ে তুলত প্রেমিক-প্রেমিকার মন…

হাতে যদি তুলি ফুল, হাতের ময়লা লাগে রে,
কোলে যদি তুলি ফুল, ফুলের রেণু ঝরে রে
মাথায় যদি তুলি ফুল, চিলে ছোঁপ্পা দেয়ো রে…
ও ফুল ভ্রমরা রে….
কারে দি পাঠাইবো ফুল, সুন্দরীর মান্দিরে,
ও ফুল ভ্রমরা রে….

ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালি সংস্কৃতিতে কনেকে বিয়ে দেয়ার পর বরের বাড়িতে চলে যায়। নিজের মেয়েকে জন্মদানের পর থেকে অতি আদরে লালন-পালনের পর যখন পরের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়, তখন মেয়ের বাবা মায়ের হৃদয়ের ভেতরে শুরু হয় বিচ্ছেদের রক্তক্ষরণ। আর সেই বিষয়টিও পালকির গানে বাদ ছিল না।

আগে যদি জাইনতাম বালি (মেয়ে), পরে নিবো তোরে রে..
হাতের কাম ফালাই রাখি, কোলে নিতাম তোরে রে…

আগে যদি জাইনতাম বালি (মেয়ে), পরে নিবো তোরে রে..
চুলার আগুন নিভাই রাখি, কোলে নিতাম তোরে রে…

মেয়েটির হৃদয়ও যে তার পিতা-মাতার জন্য সবসময় হাহাকার করে বেড়াত, সারা দিনমান দূরের আকাশে প্রতীক্ষার নজরে খুঁজে বেড়াত বাবার বাড়ি থেকে তাকে দেখার জন্য, নাইওর নেয়ার জন্য কেউ আসছে কি না? এমনও দৃশ্যকল্প ফুটে উঠত পালকির গানে…

ওই দেখা যায় ঘরের পিছ দি, রেল গাড়ি আইতাছে,
রেলের কপাট খুইলা দেখো, বাজান বাইয়া রইছে
ও বাজান বাজান গো, মায়ে কিতা করে…
আমার মায়ের কঁন্দনে বৃক্ষের পাতা ঝরে…

এক কথায় বলা চলে, চলমান জীবনের গতিধারা ক্লান্তিময় দীর্ঘ হেঁটে চলার শব্দের সাথে সাথে যখন সুরের মূর্ছনায় উচ্চারিত হয়, তখন তা খুব সহজেই মানুষের মনে নিজের জন্য এমন একটি জায়গা করে নেয় যেখান থেকে প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে যেতে থাকে নববধূর ভেজা চুলের মাতাল করা ঘ্রাণ।

পালকির গানের কথা এবং সুর সাধারণ জনমানুষের মনে গেঁথে যাওয়ার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম তার উপকরণ, সহজবোধ্যতা, সাবলীল উচ্চারণ, হৃদয় দোলানো সুর, বোহারাদের প্রেজেন্টেশন এবং চমৎকার চিত্রকল্প। গ্রামীণ সমাজের প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত নান্দনিক উপস্থাপনায়, নেচে নেচে গেয়ে গেয়ে চিত্রকল্পগুলো চোখের সামনে ভাসিয়ে তোলার অসম্ভব ক্ষমতার কারণে লোকসাহিত্যে তার একটি শক্ত অবস্থানের সৃষ্টি হয়। আর সেজন্যেই ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত আন্দোলিত হয়ে পালকি নিয়ে জাদুকরি শব্দ চয়নে রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত জনপ্রিয় কবিতা ‘পালকির গান’—

‘পালকি চলে/পালকি চলে/গগন তলে/আগুন জ্বলে/স্তব্ধ গাঁয়ে/আদুল গায়ে/যাচ্ছে কারা/রৌদ্রে সারা’

পালকির প্রভাব আমাদের লোকসাহিত্যে এতটাই প্রকট যে ‘পালকির গান’ কবিতাটা একসময় সুর সম্রাট সলীল চৌধুরীর সুরে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গাইতে শোনা যায় যা এখনও বাংলা ভাষার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে একটি।

এ ছাড়াও বিশ্বকবি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীর পুরুষ’ কবিতায়ও উঠে এসছে পালকির কথা…

‘তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে/ দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে।’


প্রতিটি বাঙালির অনুসন্ধিৎসু মন এখনও তার অজান্তে খুঁজে বেড়ায় হৃদয়ের মণিকোঠায় যত্ন করে তুলে রাখা পালকিটিকে।


পালকি ধীরে ধীরে বাঙালির মনে এমন একটি আবেদন সৃষ্টি করেছে যার প্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালে দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর পরিচালনায় নির্মিত হয় জনপ্রিয় ছবি ‘পালকি’। তা ছাড়াও বাংলা নাটক, উপন্যাস, গল্প এবং কবিতায় বিভন্নভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে পালকি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

তা ছাড়াও কাঠের তৈরি এই পালকির বাহিরের দেয়ালে খোদাই করে আঁকা হতো আবহমান বাঙলার লোকগাঁথা। নকিশকাঁথায় যেমন গ্রামবাঙলার প্রকৃতি, গ্রামীণ দৃশ্যপট, গ্রামীণ জীবন যাপনের চিত্রকল্প সুঁইয়ের আলপনায় আঁকা হতো, পালকির গায়েও ঠিক তেমনি আমাদের লোকজ জীবন যাপনের বিভিন্ন দৃশ্যপট, প্রকৃতির সাবলীল উপস্থিতি পাওয়া যেত। আর তার ফলেই পালকি দিনে দিনে আমাদের লোক সংস্কৃতির অন্যতম একটি উপাদান হয়ে ওঠে এবং কালের পরিক্রমায় লোক সাহিত্যে তার একটি স্থায়ী অবস্থান সৃষ্টি করে নেয়।

যদিও বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতায় পালকি প্রায় বিলুপ্তির পথে, কিন্তু গ্রাম বাঙলার প্রতিটি বাঙালির অনুসন্ধিৎসু মন এখনও তার অজান্তে খুঁজে বেড়ায় হৃদয়ের মণিকোঠায় যত্ন করে তুলে রাখা পালকিটিকে। রক অ্যান্ড রোল, কান্ট্রি, জাজ, র‌্যাপ ইত্যাদি সংগীতে মজে থাকা ছেলেটি কিংবা মেয়েটি এখনও মাঝে মাঝে ইউটিউব কিংবা গুগুলে খুঁজে দেখে পালকির গান পাওয়া যায় কি-না। কেননা, দিন শেষে প্রতিটি পাখিই ঘরে ফেরে, আর প্রতিটি বাঙালিই ফিরে যায় তার শেকড়ের কাছে, আপন নীড়ে। তেমনই একটি ছোট্ট নীড়ের নাম পালকি, তেমনই একটি শেকড়ের সুর ‘পালকির গান’। তাই তো পালকি এবং পালকির গান এখনও আমাদের হৃদয় মন্দিরে বেঁচে আছে বাঙালির লোক সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হিসেবে।

কৃতজ্ঞতা : মনোয়ারা বেগম

মোক্তার হোসেন

জন্ম ৬ এপ্রিল ১৯৮২, লক্ষ্মীপুর। স্নাতকোত্তর, মৎস্যবিদ্যা, ঢাকা কলেজ। পেশা : চাকুরি।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
একটি লাল ঘুড়ি এবং আমি [জেব্রাক্রসিং, ২০১৭]
মহুয়া মাতাল হলে [বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

ছড়া—
মগজবিহীন গাধার দল [তিউড়ি প্রকাশন, ২০১৭]
ধুর শালা কস কী [অগ্রদূত অ্যান্ড কোং, ২০১৯]

গল্প—
আইসিইউ বেড নম্বর নাইন [বেহুলা বাংলা, ২০১৮]

শিশুসাহিত্য—
রোদবৃষ্টির মিষ্টি ছড়া (ছড়া) [টাপুর টুপুর, ২০১৮]

ই-মেইল : hossain.mokthar@gmail.com