হোম গদ্য পথিকপরান

পথিকপরান

পথিকপরান
112
0

একটি রচনায় বঙ্কিমচন্দ্র লিখলেন : ‘এস, অন্ধকারে ভয় কি? এই যে নক্ষত্র মধ্যে মধ্যে উঠিতেছে নিবিতেছে, উহারা পথ দেখাইবে। চল! চল!’ বাক্যটির মধ্যে সুপ্ত হয়ে আছে যেন পথিকমনের তাড়না ও আহ্বান, এবং অবিরাম গতির এক অসম্ভব প্রণোদনা। অজানার আহ্বানে পথিক এভাবেই চলতে চায়, নাক্ষত্রিক আলোআঁধারির মধ্যেও খুঁজে নেয় তার পথনির্দেশ। পথিক পথভোলা, অনির্দেশ্যভাবেই নিজ চেতনাকে যুক্ত করেন অনিশ্চয় এবং বিস্তৃত জগতের অপরিমেয় ধাঁধা এবং অপ্রত্যাশিত সুন্দরের সাথে, কিন্তু তার মধ্যে থাকে এক অসম্ভাব্য প্ররোচনা যা তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

পথ মানুষই সৃষ্টি করে কিন্তু সব পথমাত্রই মানুষের নয়। পথ হয় কিছু ব্যতিক্রমী মানুষের কারণে, কেননা তারাই পথকে পাথেয় করেন। মানুষ প্রয়োজনে পথ সৃষ্টি করে, তার ব্যবহার না হলে সেই পথরেখা অপসৃতও হয়। কিন্তু কিছু মানুষ নিজের প্রয়োজনে সৃষ্টি করে নেন নিজের পথ, হয়তো সেই পথে কেউ আর যায়ও না। সেই পথটি যে ছিল ওই বিশেষ মানুষটির পাথেয়! কার্থেজের বীর হানিবল রোম আক্রমণ করতে গিয়ে আল্পস পর্বতের কাছে বাধাগ্রস্ত হলে, তার সেনাবাহিনী তাকে জানায় যে রোমের পথের কোনো দিশা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তিনি বলেছিলেন, পথ না থাকলে আমরাই নতুন পথ বানাব। সে ছিল জয় করার এক অদম্য নেশা।

২.
সংস্কৃতে ‘মার্গঃ’ শব্দটি বোঝায় পথ বা অন্বেষণ। পথ তো আসলে অন্বেষণই, নতুন স্থানে যাওয়া বা পুরোনো স্থানে নতুনভাবে, বা পুনঃপুন যাওয়া। কিন্তু পথ শুধু স্থানে নয় কালেও যাওয়া, আধ্যাত্মিকতাও তা-ই বলে। এই পথ পৃথিবী নামক স্থান থেকে অপার্থিব নামক কালে গমন। গীতায় জ্ঞানমার্গ অধ্যায় রয়েছে যাকে বলা হয়েছে অব্যয় যোগ। ঈশ্বরপ্রাপ্তি বিষয়ে সেখানে বলা হয়েছে : যেভাবে মানুষ ঈশ্বরের কাছে আসে, সেভাবেই ঈশ্বর তাকে গ্রহণ করেন; অর্থাৎ নানা পথে মানুষ ঈশ্বরকে অনুসরণ বা পেতে চায়, আর সব পথই সত্যি। এর মানে, সব পথই আসলে এক পথ হয়ে যায় একসময়। এই অধ্যায়ে ‘মদ্ভাবম্‌’ নামক একটি শব্দবন্ধ রয়েছে যার অর্থ ‘আমার অতিপ্রাকৃতিক অস্তিত্ব’। কিছু মানুষ, কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ, এই অতিপ্রাকৃতিক অস্তিত্বকে নিজের মধ্যে আবিষ্কার করতে চান নিজেকে দিয়ে। তারা এরজন্য পথে নামেন, নতুন পথ অন্বেষণ করে, এগিয়ে যান নিজের অন্তরের সত্যকে আবিষ্কারের জন্য। তারা পথকেই করেন জীবন। তারা আসলে পথিক, অনন্ত পথের, অনন্ত পাথেয়র—অনন্ততাকে পাওয়ার জন্য। তারা পথিকাত্মা, পথেই তাদের অতিপ্রাকৃত সত্তার বিকাশ ঘটে। তারা পথে-পাওয়া মানুষ। বিভূতিভূষণ ছিলেন এমনই এক পথিক মহাজন। প্রকৃতির বাস্তব অস্তিত্বেরও বাইরে তার আধিভৌতিক অস্তিত্বে তিনি ছিলেন প্রগাঢ়ভাবে বিশ্বাসী এবং এর অন্বেষণে সারাজীবন ছিলেন বুভুক্ষিত। এই বিষয়টা তার জীবনাচরণ এবং লেখায় প্রকাশিত।


অভিযাত্রার দর্শন তাকে আজীবন তাড়িয়ে ফিরেছে, এবং এর প্রতিভাস নির্মিত হয়েছে তার বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর চরিত্রগুলোতে।


সারাটি জীবন ধরে তিনি ছিলেন এক অক্লান্ত পথিক, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যাকে বলাই যায় ‘পথিকপরান’। পৃথিবীর পথে পথে শুধু জীবনপথিকই তিনি ছিলেন না, অতিপ্রাকৃতিক পথেও তিনি হেঁটেছেন শেষদিন পর্যন্ত যার প্রমাণ মিলবে তার দেবযান বইটিতেও। মৃত প্রিয়জনদের পাওয়ার জন্য প্ল্যানচেটের মাধ্যমে মৃত আত্মাদের আহ্বান জানাতেন তিনি। ডায়েরিতে লিখেছিলেন তিনি : ‘একটা কথা আজকাল নির্জনে বসে ভাবলেই বড় মনে পড়ে। এই পৃথিবীর একটা স্পিরিচুয়াল নেচার আছে…।’ জন্মের পর থেকেই শুরু হয় তার পথজীবন যা তিনি চালিয়ে গেছেন জীবনের শেষাবধি। এই জীবনকে অন্বেষণ ও লালনের জন্য স্বাভাবিক জীবন থেকে বেরিয়ে গেছেন, দীর্ঘকাল পালন করেন নি সবার মতো গার্হস্থ্যজীবনও, থাকতে চেয়েছেন এবং বলা যায় থেকেছেন একা। পালিয়ে গেছেন নগর ও সর্পিল জীবনের ঘূর্ণাবর্ত থেকে, কখনও ঘাটশিলা, কখনও শিলং, কখনও সিংহভূম, কখনও বহরাগড়া, কখনও পূর্ববঙ্গ, আরাকান, আরও কত কত জায়গায়! আবার বারে বারে ফিরে গেছেন তার প্রিয় জন্মস্থানে, ঘেঁটুফুল আর ইছামতী নদীকে দেখার জন্য। বয়ে চলেছেন নদীর মতোই—স্থান পেরিয়ে, কাল পেরিয়ে: অন্যত্র, অন্যসময়ে। চলমানতার অমৃতকেই তিনি শিরোধার্য করেছেন জীবনভর। এমনকি সশরীরে না-গেলেও মানসিকভাবে ভ্রমণ করেছেন আফ্রিকার ভয়ংকর জঙ্গল, আর এর ওপরই লেখেন তার বিখ্যাত কিশোর উপন্যাস চাঁদের পাহাড়। চিন্তা করেছেন কত কত স্থানের! তার সৃষ্ট মানসচরিত্র অপু কত-যে স্থানের কথা—তাহিতি, দক্ষিণ কালিফোর্নিয়া, ওয়ালোয়া, হাওয়াই প্রভৃতি—চিন্তা করে, আর মনে মনে পাল তুলে দেয় মনপবনের নাওয়ের, সেখানে যাওয়ার জন্য। অপু হচ্ছে বাংলা সাহিত্যে সৃষ্ট প্রথম নিসর্গজ-রোম্যান্টিক বহির্স্থিত চরিত্র যে সমাজসংসারচ্যুত হতে চায় স্বইচ্ছায়, বাঁধাবন্ধনহীন জীবনের অন্বেষণে তার মন আঁকুপাঁকু করে সর্বদা: ‘কিন্তু এক-একসময় তাহারও সন্দেহ আসে। জীবন যে এই রকম হইবে, সূর্যোদয় হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রতি দণ্ড পল যে তুচ্ছ অকিঞ্চিৎকর বৈচিত্র্যহীন ঘটনায় ভরিয়া উঠিবে, তাহার কল্পনা তো তাহাকে এ আভাস দেয় নাই।’ সে ভাবে, জীবন তাকে প্রতারণাই করেছে এতদিন, এর জন্য সে মুক্ত হতে চায়, সারা দিতে চায় পথ, অরণ্য, অজানার নিরন্তর ডাকে। আর এ কারণেই মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর সে যেন মনে এক ধরনের আনন্দ, এক মুক্তির নিশ্বাস উদ্‌যাপন করতে থাকে। এ বোধ বহির্স্থিতের। এ জাতীয় চরিত্ররা জীবনবিমুখী বা মানববিমুখী নয়, শুধু জীবনের দায় থেকে মুক্ত হতে চায়। এবং তা-ও চিরস্থায়ী আকুতি নয় তাদের, তারা একসময় জীবনের দায় বা ভারকেও গ্রহণ করে নেয় সানন্দচিত্তে। অপুও তাই নেয় কাজলের ভার। তবে এ জাতীয় মানুষ পথের চিরঅন্বেষণ চালিয়ে যায়, তারা নিজেদের মহাবিশ্বের পথিকই ভাবে। অপু যেমন ইছামতীর তীরে বনে অনন্ত বিশ্বের কথা ভাবে, ভাবে, ‘যে বিশ্বের সে একজন নাগরিক, তা ক্ষুদ্র, দীন বিশ্ব নয়।’

সেই ছোটোবেলা থেকেই হাতে কঞ্চি নিয়ে বাড়ির চারপাশে ঘুরে বেড়াতেন তিনি, আর আবিষ্কার করতেন নিজ জগৎকে, আর এই কঞ্চি যেন আমাদের শৈশব-কৈশোরকেই মনে করিয়ে দেয়, মনে করিয়ে দেয় তার প্রিয় চরিত্র অপুর শৈশবকে। ইছামতীর পারে, নীলকুঠির মাঠেঘাটে, বা চটকাতলার বাঁওরে, যেখানেই হোক, কী এক ভূতগ্রস্ততায় তিনি ঘুরতেন আর ঘুরতেন। প্রকৃতির যে অদৃশ্য বিকাশ, যে উপলব্ধিময় আত্মপ্রকাশ, যে মায়া বিস্তার, তার অস্ফুট ভাষাকে যেন তিনি বুঝতে চাইতেন, চাইতেন এই মহাপ্রকৃতির সাথে একাত্ম হতে; হয়তো নিজেকে ভাবতেন এরই অংশ। পথ তাকে হাতছানি দিত সেই ছোট্টবেলা থেকেই। স্কুলের ছুটির ঘণ্টা বাজলে তিনি খুশিতে লাফিয়ে উঠতেন, কারণ এখন নিশ্চিন্তে হেঁটে হেঁটে তার একান্ত নিজস্ব জগতে বিচরণ করতে পারবেন। কিশলয় ঠাকুর তার পথের কবিতে বিভূতিভূষণের এই অন্বেষণের বিষয়ে লিখেছেন : ‘রাজপুর, নিশ্চিন্দিপুর, সোনারপুর, বারুইপুর, বোড়াল, মালঞ্চের জল-জঙ্গল, পথ-প্রান্তর হাতছানি দিয়ে ডাকে বারাকপুরের কঞ্চি-হাতে ঘুরে বেড়ানো চিরসবুজ সত্তাটিকে। কখনও অনমনা হেঁটে চলেন বর্ষাজলের চিহ্ন আঁকা ইতিহাসের আদিগঙ্গার তীর ধরে, নিশ্চিন্দিপুরের বেণুছায়ায় হারিয়ে, বারুইপুরের পেয়ারাবনের পাশ দিয়ে, লিচুবাগানের নিচে দিয়ে।’ এই যে পথপরিক্রমণ, এর কারণ হলো, তিনি বিশ্বাস করতেন, ওখানে রয়েছে উন্মুক্ত আনন্দভাণ্ডার, জীবনের প্রকৃতিলুপ্ততা। ‘যাত্রাপথের অদৃশ্য তিলক’ কপালে পরেই তিনি তিনি হয়েছেন ‘ঘরছাড়া’। এই অভিযাত্রার দর্শন তাকে আজীবন তাড়িয়ে ফিরেছে, এবং এর প্রতিভাস নির্মিত হয়েছে তার বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর চরিত্রগুলোতে। বিখ্যাত পথের পাঁচালীতে তিনি যা বলেন, তাই যেন হয়ে পড়ল তার জীবনভাষ্য, তার প্রতিস্বের স্থায়ী উচ্চারণ : ‘সোনাডাঙার মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়া পাড়ি দিয়ে পথ আমার চলে গেল, সামনে, সামনে শুধুই সামনে।’ আবার অপরাজিতয় দেখি নিজেকে তথা বিশ্বমানবকে জীবন-মৃত্যুর পরিভ্রমণে এক পথিক আত্মা রূপে তিনি কল্পনা করেছেন, যে শুধু বিচরণ করে নতুন পথসন্ধানের মাধ্যমে : ‘সে জন্ম-জন্মান্তরের পথিক আত্মা—দূর হইতে সুদূরের নিত্য নূতন পথহীন পথে তার গতি—এই বিপুল নীলাকাশ, অগণ্য জ্যোতির্লোক, সপ্তর্ষিমণ্ডল, ছায়াপথ, বিশাল অ্যাানড্রোমিডা নীহারিকার জগৎ, বহির্ষদ পিতৃলোক—এই শত সহস্র শতাব্দী তার পায়ে চলার পথ।’ তার সৃষ্ট চরিত্র হরিহর বা অপু, দুজনেই জীবনপথের পথিক। পথিকমনের এই চিন্তা বা দর্শন তার সমস্ত লেখায় এবং জীবনে রূপান্তরিত, নানা ভাবে ও বিভাবে। দৃষ্টিপ্রদীপ উপন্যাসে তিনি বলেন নিজের বিশাল চেতনের কথা যার রথচক্র শতাব্দীপথে ভ্রমণ করে যায়।

পায়ে হেঁটেই ভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন তিনি। বাল্যকালে হেঁটে হেঁটেই লিরিক কবিতার মতো ঘেঁটুফুলের সৌন্দর্য দেখতেন আর বড়ো হয়ে অরণ্যের মধ্যে খুঁজে পেতেন মহাকাব্যের সৌন্দর্য। যে-যুগের মানুষ, তখন অরণ্যের ভেতর পায়ে হেঁটে প্রবেশ ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। কিন্তু তিনি স্বইচ্ছায় হেঁটে ভ্রমণ করতেন প্রিয় আরণ্য। হরিনাভিতে স্কুলের চাকরি নিয়ে যাওয়ার পথে প্রস্তুত ঘোড়ার গাড়িকে ব্যবহার না-করে রাজপুরের মাঝ দিয়ে তিন মাইল পথ হেঁটে তিনি হরিনাভিতে পৌঁছন। উদ্দেশ্য একটাই ছিল, নতুন পথ ও স্থানকে চিনে নেওয়া নিজের মতো করে, আর আত্মভাবনাকে চাঙা করে তোলা। আরেকবার অকিয়াব যাওয়ার পথে মংডুতে দূর-দূরান্তের পাহাড়ের সম্মোহনে পায়ে হেঁটে পাহাড়ের ওপাশে কী আছে তা দেখার বাসনা মনে জাগে তার। এভাবেই অসংখ্যবার অন্য যানকে বাতিল করে পদযানকেই পাথেয় করেন তিনি। একবার ঘাটশিলা থেকে খ্রিস্টীয় নববর্ষের উৎসবে যাওয়ার জন্য গাড়ির প্রস্তাব বাতিল করে হেঁটেই রওনা করেন তিনি; সাঁওতাল এলাকা জগন্নাথপুরের ভেতর দিয়ে যাওয়ার পথে শুনতে পান সেই গানটি যা তার বাবা গাইতে ভালোবাসতেন : ‘হরি দুঃখ দাও যে-জনারে’। এই জন্মগত দুঃখবোধের কথা, দুস্থ আত্মার ভঙ্গুরতার কথা তিনি বলেছেন সারাজীবন এবং পথকে পাথেয় করে তা দূর করার চেষ্টাও করেছেন। পথই ছিল তার দুঃখমুক্তির সারথি, জীবনচলার মোক্ষ। অপরাজিততে দেখি, অপু ড্রিলিং তাঁবুর তত্ত্বাবধানের কাজ নিয়ে যখন উমেরিয়ার প্রত্যন্ত বন্য এলাকায় যায়, সেখানে একদিন ঝুঁকি নিয়ে পায়ে হেঁটেই অমরকণ্টক দেখে ফেলে যা ছিল আশি মাইল দূরত্বে। দৃষ্টিপ্রদীপ-এ দেখা যায়, অধ্যাত্মজীবনের এক অমোঘ টানে ঘরছাড়া হয় নায়ক, তারপর অন্তহীন অজানা পথ পাড়ি দিয়ে তার অনুভব হয়, তার দেবতার পথ, নায়ক যে-পথ দিয়ে চলছে সেই চিরজানা পথও। দেবযান উপন্যাসে দেখা যায় মৃত্যুপরবর্তী লোকে আত্মাদের ভ্রমণ, যা দেহহীন, কালহীন এবং স্থানহীন।

এভাবেই এক শাশ্বত পথিকের মতো হেঁটে বেড়িয়েছেন তিনি। পথিক শাশ্বত হয় তখনই যখন কেউ পথকেই করে নেয় সকল সম্বন্ধের উপায় ও গন্তব্য হিশেবে। ঘুরে ঘুরে পৃথিবীর যাবতীয় উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির সাথে একাত্ম বোধ করে সেই পথিকমন। বিভূতিভূষণ সর্বতো অর্থেই এক শাশ্বত পথিকসত্তা। সত্তা হচ্ছে অস্তিত্বের স্পন্দন, অস্তিত্বকে উপলব্ধি করাতে যে ভূমিকা রাখে, সত্তা হচ্ছে অবিচ্ছিন্নতা, বা জাগরিত প্রপঞ্চ। এই অনিদ্র প্রপঞ্চের জোরেই প্রাকৃতিক-অতিপ্রাকৃতিক-আধ্যাত্মিক পথে পা বাড়িয়েছেন তিনি শক্তভাবে, যেন পিছলে না পড়েন। পিতৃযান, দেবযান—সবখানেই যেতে চেয়েছেন তিনি। হেঁটে হেঁটে দেখে দেখে অনুভব করতেন ‘চারিধারের নির্জনতা’, প্রকৃতির অপার পূর্ণতার ঐশ্বর্য, ‘প্রকৃতির পরিস্ফুট বন্যসৌন্দর্য’, আর তার রহস্য ও অন্যোন্যতা। ‘দিবাবসান’ গল্পে তিনি যা লেখেন তা-ই যেন হয়ে ওঠে এসবের নির্যাস : ‘এই পাখি, এই প্রজাপতিটা, এই ফুল, এই তুচ্ছ কি গাছটা, এই লতা, এই আকাশ, বাতাস, জল, মাটি, ওই যে উজ্জ্বল হয়ে আসছে ওই চাঁদটা, এই চারিধার, এই প্রাণী-জগৎ, ওই লক্ষ মাইল দূরের সূর্য, ওই অনন্ত মহাব্যোম, এই বিপুল অচিন্ত্যনীয় অসীমতা—সবগুলোর মধ্যে পরস্পর কী আশ্চর্য নাড়ি যোগ! কী বিপুল হেস্যে ভরা তাদের এই পরস্পরনির্ভরতা! ’ আমরা বুঝি, অণুবিশ্ব থেকে আবিশ্ব, সবকিছুর এক অন্বয়, অবাধসংযোগ ও মিলনসূত্রকে প্রতিপন্ন করতে চাইছেন তিনি তার কাব্যিক উচ্চারণে।


এই হেঁটে হেঁটেই একদিন নিজ-মৃত্যুর এক অসম্ভব পূর্বাভাসকে পেয়ে যান তিনি।


তিনি আমাদের প্রকৃতিবোধনের ও আরাধনার আতশি কাচ, বা সাহিত্যিক প্রকৃতিবীক্ষক। প্রকৃতিকে দেখতে চাইলে, বুঝতে চাইলে, অন্তরঙ্গ করতে চাইলে, তাতে আক্রান্ত হতে চাইলে, তাকে ছাড়া গতি নাই। এবং এটা বলাও অতি হবে না যে, এখন পর্যন্ত এই ধারার তিনিই একক প্রতিনিধি। এই হারিয়ে যেতে থাকা প্রকৃতি হয়তো একসময় নিশ্চিহ্ন হয়েই যাবে, কোনো চিহ্নও আর থাকবে না, তখন বিভূতিভূষণই হবে সেই লুপ্ত প্রকৃতির শেষ পরাপাঠ, অভ্রান্ত বাক্‌পতি। একটি ভাটফুলকে ভালোবেসে কী করে উদ্বেল হওয়া যায়, একটি ইছামতীর কাছে কিভাবে জীবনকে সমর্পণ করা যায়, তার উদাহরণ তো তিনিই। আমাদের মনোযোগের বাইরে চলে যাওয়া অরণ্য, ধ্বংসের কবলে পড়ে যাওয়া প্রকৃতি, আমাদের যাপনের থেকে বাতিল হয়ে যাওয়া গ্রামকে যেন তিনি ফিরিয়ে দিচ্ছেন আমাদেরই কাছে, কোমল এবং স্মৃতিভাসিত করে। আর বাতলে দিচ্ছেন এদের ভালোবাসার গুপ্তবিদ্যা। তাকেই বলা যায় সেই নিসর্গবিদ যিনি শুধু পর্যবেক্ষণই করেন না, অপর প্রাণ দান করেন প্রকৃতিকে, নিজস্ব ভাবজ ক্রিয়ায়। হেঁটে হেঁটে, দেখে দেখে যে একটি জীবনকে অন্য জীবনে রূপান্তর করা যায়, তার একমাত্র উদাহরণ তো তিনি।

এই হেঁটে হেঁটেই একদিন নিজ-মৃত্যুর এক অসম্ভব পূর্বাভাসকে পেয়ে যান তিনি। মৃত্যুর এই প্রতীক তার কাছে কেন ধরা দিয়েছিল তা অবোধ্য, কিন্তু মনে করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, যে প্রকৃতিকে তিনি নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন, সেই মহাপ্রকৃতিই বন্ধুর বেশে তাকে আগাম সংকেত দিল কি! প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে যে ভয়ও রয়েছে, এই সৌন্দর্যদর্শন যে ভয়জাগানিয়া, তা তো বলেছেন অনেক আগেই তার অসাধারণ ও অতুলনীয় উপন্যাস আরণ্যক-এ: কিন্তু যে-কথাটা বার বার নানাভাবে বলিবার চেষ্টা করিতেছি, কিন্তু কোনো বারই ঠিকমতো বুঝাইতে পারিতেছি না, সেটা হইতেছে এই প্রকৃতির একটা রহস্যময় অসীমতার, দুরধিগম্যতার, বিরাটত্বের ও ভয়াল গা-ছম-ছম-করানো সৌন্দর্যের দিকটা। না দেখিলে কী করিয়া বুঝাইব সে কী জিনিস!’ এই যে রক্ত শীতল করা অনভূতি, এর কথা তিনি নানাভাবে বলেছেন—কখনও উড়ুক্কু প্রাণীদের হেঁটে বেড়ানোর কথা বলে, কখনও পরিদের ডানা বিস্তারের কথা বলে।

৩.
এই যে হাঁটা, হাঁটার ইতিহাসে তা ছিল না কোনো নতুন ঘটনা, কিন্তু তা ছিল তার জগৎ ও জীবন-অধ্যয়ন, আত্মপর্যবেক্ষণ ও ধ্যান, যা পরিণত হয়েছিল এক অসাধারণ সাহিত্যে যার তুলনা বিশ্বসাহিত্যে ভার। এই পথের অন্বেষণ, এই প্রকৃতিপাঠ, তা যেন ছিল এক নিসর্গবিদের অভিযান যেখানে মন মোচড় দিয়ে ওঠে, যেখানে মানুষের সাম্রাজ্যবাদিতার আরেক নগ্ন রূপকে নিমিষেই চেনা হয়ে যায়। কিন্তু এই হাঁটার হাত ধরেই একদিন তিনি দেখা পেলেন তার আসন্ন মৃত্যুর এক অধিবিদ্যক রূপকের। সেটা ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ, তার মৃত্যুবছর। পঁচিশে অক্টোবর তার সংবর্ধনার আয়োজন হলো ঘাটশিলার স্থানীয় শুভানুধ্যায়ীদের উদ্যোগে। তার দু-দিন পর, বিকালে, দু-একজন সঙ্গীসমেত, তিনি বেড়াতে গেলেন ধারাগিরি পাহাড়ে। সঙ্গীদের সাথে কথা বলতে বলতে সন্ধ্যার দিকে পাহাড়ে উঠছেন বিভূতিভূষণ, চারপাশে দ্বিতীয়ার হালকা জোছনার আরক। কিছুদূর উঠে বসলেন পাথরের ওপর। রাত হয়ে যাচ্ছে, সঙ্গীরা নামতে চাইলেন কিন্তু তিনি উঠতেই থাকলেন। হঠাৎ চিৎকার দিলেন, সঙ্গীরা এসে দেখলেন বিভূতিভূষণ মুখ ঢেকে বসে আছেন—সামনেই একটি মরার খাটিয়া যাতে শুয়ে আছে একজন, সাদা কাপড়ে ঢাকা তার দেহ, পাশের সরায় সিঁদুর-কলা সাজানো। সঙ্গীরা আশ্চর্য হয়ে গেল এই দৃশ্য দেখে—কিভাবে তা সম্ভব! যা-ই হোক, পাহাড়িদের মড়া বলে সবাই তাকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে লাগলেন। কিন্তু তিনি বলে বসলেন যে, ওই মড়ার মুখটা তারই মুখ, তারই মৃতদেহ; খাটিয়ায় শোয়া মানুষটার মুখের কাপড়টা সরাতেই তিনি দেখলেন, তারই মৃতদেহ শুয়ে আছে! আরও বললেন, সত্বরই তাকে চলে যেতে হবে পৃথিবী থেকে। এর তিন দিন পর, পহেলা নভেম্বর তিনি, বিভূতিভূষণ, মারা যান। এটা ছিল হেঁটে হেঁটে তার প্রিয় দেবযান-এ গমন যার রূপক উদ্ভাসিত হয়েছিল তিন দিন আগে, সেই ধারাগিরি পাহাড়ের চড়াইয়ে, খাটিয়ায় মৃতরূপ নিজমুখ দর্শনে! এটাই ছিল এই পথিকপরানের মৃত্যুর অধিবাস!


গ্রন্থঋণ :

১. পথের কবি : কিশলয় ঠাকুর, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা: প্রথম সংস্করণ ১৯৭৮
২. দেবযান: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি.: কলকাতা: প্রথম প্রকাশ: ১৩৫১
৩. বাংলা সাহিত্যে পরিবেশচেতনা : কবিতা নন্দী চক্রবর্তী, আশাদীপ, কলকাতা, ২০১৭
৪. অরণ্যসমগ্র : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্পাদনা: চণ্ডিকাপ্রসাদ ঘোষাল, গাঙচিল: কলকাতা: ২০১৩

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা: লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব ( ২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২), তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪);

প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬), অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯),মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫);

অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪)।

ই-মেইল : kumar.4585@yahoo.com
কুমার চক্রবর্তী

Latest posts by কুমার চক্রবর্তী (see all)