হোম গদ্য নজরুলের গানে চিন্তা ও চেতনা

নজরুলের গানে চিন্তা ও চেতনা

নজরুলের গানে চিন্তা ও চেতনা
536
0

খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে।। বিরাট শিশু আনমনে।। প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা।। নিরজনে প্রভু নিরজনে।।

এই গান মা গুনগুন করে গাইতেন। আর আনমনে কাজ করতেন। বাড়িতে বিদ্যুৎ চলে গেলে মা-চাচিরা গানের আসর বসাতেন। আর আমি হারিকেন সামনে স্কুলের পড়া ফাঁকি দিয়ে জানালা গলে মুখ বের করে ওই গান শুনতাম। তার মধ্যে অনেক গান আজও আমার হৃদয়ে সুরের কান তৈরি করে দিয়েছিল। ‘আমি চির তরে দূরে চলে যাব, তবুও আমারে দেবো না ভুলিতে’ এই গান গাইতে গাইতে মায়ের চোখ দিয়ে প্রায়ই পানি পড়ত। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম মা কেন গান গাইতে গিয়ে কাঁদে। ‘লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনু গো আঁখি খোলো, প্রিয়তম! এতদিনে বিরহের নিশি বুঝি ভোর হলো।’ এই গান মা চোখ বুজে মুগ্ধ হয়ে গাইতেন। আর  আপু নাচত এইসব গানে ‘দূর দ্বীপবাসিনী, চিনি তোমারে চিনি’ ‘মোমের পুতুল মমীর দেশের মেয়ে নেচে যায়।’ বিহ্বল চঞ্চল পায়।। খর্জুর-বীথির ধারে। সাহারা মরুর পারে। বাজায় ঘুমুর ঝুমুর ঝুমুর মধুর ঝঙ্কারে।’ আমিও দুলে দুলে সেসব মুদ্রা শিখতাম। গানগুলো যেন ছেলেবেলায় সুরের মোহনায় ভাসিয়ে নিত। তখনও বুঝি না কোনটা নজরুল সংগীত আর কোনটা রবীন্দ্র সংগীত। অনেক বড় হয়ে জানতে পেরেছি প্রথম গানটি নজরুলের। আর বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি, নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য। আমি ভেবেছিলাম এটা বুঝি রবীন্দ্র সংগীত। এভাবে রবীন্দ্র-নজরুলের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা হলেও নজরুল যেন ক্রমশ দূরে সরে যেতে লাগলেন, নানা কর্মব্যস্ততায় মা যেভাবে ধীরে ধীরে চোখের আড়াল হতে লাগলেন। তাই বলে কি মা সরে গেছে? আসলেই কি নজরুল সরে গেছেন আমার চিন্তার খোরাক থেকে, মনের খোরাক থেকে? আমার চেতনা তৈরিতে নজরুল কি কম ভূমিকা রেখেছিলেন? আজ বড় সাহস করে নজরুল নিয়ে লিখতে বসেছি, সাহস নয় দুঃসাহস। কারণ আমি কতটুকু জানি তাকে!


নজরুল ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতানুরাগী এবং আধুনিক মনস্ক একজন মানুষ।


নজরুল থেকে নজরুল সংগীত। নজরুল শব্দটি বা নামটি যখন মনে পড়ে তখন চোখের কোণে ভেসে ওঠে নানান কিছু নজরুল ঘিরে। প্রথমে মায়ের কাছ থেকে জানা, তারপর বই পড়ে জানা। গ্রাম কুঁড়ে ঘর মেঠো পথ ক্ষেত ফসলাদি ধুলোমাখা জামা-কাপড়, যুদ্ধ-স্বাধীনতার কখনও ঝাঁকড়া-বাবরি চুল শান্ত-অশান্ত পরিক্রমণ-বীণা-বাঁশি আয়তমিশ্র ড্যাব ড্যাবে চোখ শানিত শব্দের তুবড়ি ঝোড়ো বৈশাখী দখিন হাওয়ায় বাসন্তীর মিশ্র প্রকাশ। নজরুল সংগীতে যেন আলো হাওয়া সব মিলে মিশে এক হয়ে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে সংগীতের নানান সুর-বাণী ।পল্লীগীতি থেকে শুরু করে লোকগীতি, ভাটিয়ালী, বাউল, ভাওয়াইয়া, ঝুমুর, সাঁওতালি, কাজরি কি নেই তার গানে। হাসির গান, কমিক, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, গজল। স্কুলে প্রথম প্রতিযোগিতায় নজরুলের গজল গেয়েছিলাম হাঁটু কাঁপিয়ে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত, প্রকৃতির সাথে হিন্দিগান, ঠুমরি, কাওয়ালি, খেয়াল/ উচ্চাঙ্গ, রাগ-প্রধান, দাদরা, টপপা, ধ্রুপদ, হত্যা সংগীত। আরও  দেশাত্মবোধক, জাতীয় সংগীত, মার্চ বা রণসংগীত, স্বদেশি, নানা সংগীত, জাগরণী, উদ্দীপনা, আগমনী। পাই শিশু ছড়া আশীর্বাদ। ইসলামী কাওয়ালি, জাগরণী, উদ্দীপনা, না’ত মুর্শিদী-ভাটিয়ালী, হাম্‌দ, ঈদ-উল-ফিতর, ঈদ-উল-আযহা, শব-ই-কদর, মোহররম মর্সিয়া, শব-ই-বরাত, রামাদান, মুর্শি, হাম্‌দ-নাত, শ্যামা সংগীত, দুর্গা-পূজা, হোরি/ হোলি, ভজন/ রাজভজন, ভক্তিগীতি, কীর্তন হরি-কীর্তন, রাধা-কৃষ্ণ, শিব/ মহাদেব/ নটরাজ, সাধন সংগীত, সরস্বতী, ঝুলন, লক্ষ্মী, সম্বর্ধনা, কাব্যগীতি, পালাগান [লেটো] প্রায় ৮০ ধরনের গানের সমাহার। সুরের নতুন মোড়কে মোড়কে গানের নতুন প্লাবন-মহাপ্লাবন ধারা। অর্থাৎ এটি একটি ইন্ডাস্ট্রি বা সংগীত কারখানা। কারখানায় সাধারণত মেইন প্রোডাক্ট হবার পর ওয়েস্টেজ দিয়েও হয় কিছু উৎপাদন সামগ্রী। নজরুল সংগীত ইন্ডাস্ট্রি থেকেও মেইন সংগীত সুর থেকে ভেঙে নানান সুর ধারার মিশ্রণ সংগীত। তাতে আশিটি প্রধান বিষয় থেকে ভেঙে নানান ধারার সুর মিশ্রকার গান। নজরুল সংগীত ইন্ডাস্ট্রিজের ভিতও পাকা-পোক্ত, কারণ তৈরি হয় রাগ-রাগিণীর মিশ্রণে। আবার বাণীতে রয়েছে বৈচিত্রেয় শব্দ সংযোজন—যেমন চাঁদের পিয়ালাতে আজি জোছনা শিরাজী ঝরে/ ঝিমায় নেশায় নিশীথিনী যে শারক পান করে। কিম্বা কাল-বোশেখী মিছেই কাঁদে ফাগুন রাতের আফসোসে’ কিম্বা আলগা করগো খোঁপার বাঁধন দিল ওহি মেরা ফসগ্যায়ি কিম্বা ‘বৈকালী সুরে গাও বৈতালী গান, বসন্ত হয় অবসান। নহবতে বাদে নজরুল মুলতান কিম্বা কাজরি গাহিয়া এসো গো লনা কিম্বা ‘হায় সাকি এ আঙুরি খুন নয় ও হিয়ার খুন খারাব কিম্বা হেরা হতে হেলে দুলে নূরানি তনু ওকে আসে হায়/ সারা দুনিয়া হেরেমের পর্দা খুলে খুলে যায় কিম্বা সৃজন ছন্দে আনন্দে নাকো নটরাজ/ হে মহাকাশ প্রলয় তলে ভোলো ভোলো কিম্বা আমি কালি যদি পেতাম কালী রইত না  এই নজরুল সংগীত কারখানা বা শিল্প মেনিকোস্টোও নড় নতনু ঢং এ মোড়া যেমন সংগীতে গায়কি, শিল্পী স্বাধীনতা এবং বৈঠকি’র মিশ্রণ। এর ব্যবহারও নজরুল করে গেছেন বিশ্লেষণে। আধুনিক বাংলা গানের পঞ্চ প্রধান ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ [১৮৬১-১৯৪১], দ্বিজেন্দ্রলাল [১৮৬৩-১৯১৩], রজনীকান্ত [১৮৬৫-১৯১০], অতুলপ্রসাদ [১৮৭১-১৯৩৪] এবং কাজী নজরুল ইসলাম [১৮৯৯-১৯৭৬]। বিশ শতকের প্রথম চার দশকের মধ্যে এ পঞ্চরত্ন আধুনিক বাংলা গানকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অবদান গুরুত্বপূর্ণ; তারা ছিলেন একাধারে কবি ও সংগীতজ্ঞ।

আধুনিক’ গানেরও প্রবর্তক ছিলেন নজরুল। নজরুলই প্রথম আধুনিক বা মডার্ন শব্দ দুটির প্রচলন, ব্যবহার তার সংগীত হেডিং-এ যুক্ত করেন। ইনিয়ে-বিনিয়ে সবার গানেই ‘আধুনিক’ সুর প্রবর্তনের সাথে সুরের অবাধ বিচরণ আছে অথচ নজরুলের সুরে আধুনিকতার প্রাণবন্ততা, যা অন্যতে পাওয়া একদমই দুষ্কর।

নজরুল-পূর্বে সকল গানই ছিল নায়কি প্রধান। নজরুল প্রথম যুক্ত করলেন সংগীতে গায়কি বিষয়টি। নজরুল-পূর্বে যারা সংগীতে ছিলেন; রজনীকান্ত সেন, অতুল প্রসাদ সেন, দিজেন্দ্র লাল রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সকলেই নায়কিতে গান বাঁধতেন। অর্থাৎ ওরা যেমন সুর করেছেন শিল্পীকে হুবহু তেমনি গাইতে হবে, সুরের বা পর্দার কোনো হেরফের করা যাবে না। নজরুল এর থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এলেন। তিনি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির পার্থক্যর স্থান রাখলেন। যেমন একইরকম ব্যথার প্রকাশ ব্যক্তি বিশেষে একইরকম হবে এটা না করে ব্যক্তি বিশেষে ব্যথা-বেদনের প্রকাশ আলাদা হবে এভাবে। এরকম হওয়াই তো স্বাভাবিক। গায়কির যুক্ততায় শিল্পীরাও হাফ ছেড়ে বাঁচল যেন। তারা তাদের কণ্ঠকে কিছুটা নিজ গুণে ব্যবহার করতে শুরু করল। সংগীতে প্রাণের সৃষ্টি হলো। এখানে সামান্য বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোতে যারা উপস্থাপনা করেন তারা যে ধরনের ব্যাখ্যা এই ‘গায়কি’ নিয়ে বলে থাকেন তা ঠিক নয়। তারা ব্যক্তি-পার্থক্যকে গায়কি ভেবেছেন। কিন্তু ব্যাপারটি তা নয় ব্যাপারটি হবে সুরকার ও সুরটি করেছেন শিল্পী ঠিক সে রকমটি না করে কণ্ঠ ব্যবধানে সুর প্রকাশে তার পার্থক্য হয় না, শিল্পী পার্থক্যে সুরপার্থক্য শ্রুতিতে মোটেও আঘাত করে না। আরো কারণ নজরুলের গান রাগাশ্রয়ী তাই সেখানে গায়কি’র ব্যবহার ব্যবধান শ্রুতিতে আঘাত করে—সুর বৈচিত্র্য’র বৈচিত্রেয় প্রকাশ সহজেই শ্রোতাদের আকর্ষণ করে। যেমন নজরুলের ‘নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখি জল’ গানটি সকলেই শুনে থাকলে এবং সেই প্রথম থেকে আজ অবধি অসংখ্য শিল্পী গানটি কণ্ঠে ধারণ করেছে এবং প্রতি শিল্পীই তার কণ্ঠ গায়কির ব্যবহার করেছেন। তৃপ্ত হয়েছেন। নজরুল কর্তৃক এই গায়কির প্রবর্তনে শিল্পী স্বাধীনতাও ছুটে এসে যুক্ত হয়েছে। নায়কি প্রথার গায়কি আর গায়কি প্রথার গায়কি এই দুই ‘গায়কি’কে এক কাতারে শামিল করে দেখাটাই যত দুর্ভোগের কারণ যাতে অশিক্ষিত সংগীত-আচরণ বলাটাই যুক্তিযুক্ত।

রবীন্দ্র সংগীতের আগে তান পিছে তান মাঝে গান করে রবীন্দ্র সংগীতকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রবীন্দ্র সংগীত তান সহ্য করার মতো হজম করার মতো গান নয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই তার সংগীতে অলঙ্করণ পছন্দ করতেন না। তার ‘সংগীত-চিন্তা’ গ্রন্থটি পড়লে তো তাই জানা যায়। নজরুলের যে গানে তান-আলাপ নেই সে গানেও তান আলাপ যুক্ত করা যায়—কারণ ওতে সহ্য করার শক্তি আছে। রবীন্দ্র সংগীত বর্তমানে যেমন-তেমন পরিবেশিত হচ্ছে তা কি রবীন্দ্র সংগীত হচ্ছে? বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী পঙ্কজ কুমার মল্লিক আকাশ বাণী থেকে সংগীত শিক্ষার আসরে বাধ্য হয়ে যখন ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি’ গানটি শেখাতে শুরু করলেন তখন বলেছিলেন এ গান তার পক্ষে সঠিকভাবে শেখানো মুশকিল। কারণ এ গান রেওয়াজি কণ্ঠের দরকার। এর থেকেই রবীন্দ্র সংগীতের কণ্ঠ আর নজরুল সংগীতের কণ্ঠের আকাশ-পাতাল তারতম্য বোঝা যায়। রবীন্দ্র সংগীত প্রধানত খোল নির্ভর গান আর নজরুল সংগীত তবলা নির্ভর। রবীন্দ্র সংগীত নাসিকা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় একাধিক পরিবেশনে একঘেয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। কিম্বা অতুল প্রসাদ কিম্বা রজনী দিজেন। সুরে উদাত্ত-উদার পরিসর কেবল নজরুলেই আছে। নজরুলের গানে সকল ধরনের সংগীতের লীলাক্ষেত্রে আছে। নজরুলের গান আর রবীন্দ্রনাথের গান বিচারের কর্ম আমার নয়। তবুও তৈরি হওয়া কান যতটুকু ধর্তব্য ততটুকু বলার চেষ্টা।

নজরুল ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতানুরাগী এবং আধুনিক মনস্ক একজন মানুষ। সে প্রেরণাতেই উচ্চাঙ্গ সংগীতের সঙ্গে আধুনিকতার রস সংমিশ্রণ করে সৃষ্টি করেন নতুন এক ধারার। গান ও সুরকে নতুনত্ব এবং বৈচিত্র্যময় করে তোলাই ছিল নজরুলের উদ্দেশ্য। বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর সংমিশ্রণ করে নতুন নতুন সুর সৃষ্টিই ছিল তার গানের বৈশিষ্ট্য। যেমন রাগ জয়ন্তী ও খাম্বাজ সুর এক করে নজরুল গেয়েছেন—

‘ছাড়িয়া পরাণ নাহি চায়
তবু যেতে হবে হায়…’

আবার নটমল্লার এবং ছায়ানট রাগ মিলিয়ে লিখেছেন…

‘হাজার তারার হার হয়ে গো
দলি আকাশ বীণার পলে।’

এ তো গেল রাগের সংমিশ্রণ। তিনি বিভিন্ন রাগের চলনের ওপর তার লেখা অঙ্কিত করেছেন। অর্থাৎ সেই রাগের সুর ও লয় ঠিক রেখে তিনি গানের কথা সাজিয়েছেন। যেমন…

‘সাজিয়াছো যোগী বল
কার লাগি তরুণ বিবাগী।’

রাগ যোগী আবার রাগ দরবারি কানাড়াতে…

‘আজ ঘুম নাহি নিশি জাগরণ।’

রাগ মালকোষের উপর সাজিয়েছেন…

‘গরজে গম্ভীর গগনে কম্ভু
কাটিতে সুন্দর নাচে সয়ম্ভু।’

এছাড়া নজরুলের নিজস্ব সৃষ্টি রাগ খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। যেমন তার সৃষ্ট পিলু রাগের—

‘যাক না নিশি গানে গানে
জাগরণে জাগরণে
আজকে খুশির বান ডেকেছে
আমার মনে আমার মনে।’

কাজী নজরুল ইসলাম দুটি রাগ রাগিণী একদম নিজস্ব বলে অভিমত পোষণ করেছেন। রাগ দুটি হলো বেণুকা ও দোলন চাঁপা। এছাড়া বিদেশি সুর অবলম্বন বিভিন্ন রাগাশ্রিত গান তো রয়েছেই। গায়কি এবং শিল্পী স্বাধীনতা যখন নজরুল গানে প্রবর্তিত হলো তার সাথে ‘বৈঠকি’ প্রভাব অবলীলায় যুক্ত হয়ে গেল।

গজল সংগীতের পরিবেশনে যে ধরনের পরিবেশ তৈরি দরকার সে ধরনটি হবে একটি ঘরোয়া মজলিশ, তাকিয়া, শতরঞ্জি, দরবারি হুকো, গোলাপ আতর দান তার থেকে হালকা ধুয়া ঘরময় সুগন্ধি সৃষ্টি করছে শিল্পী গাইছে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে গানের ছন্দে-তালে একাকার হয়ে কখনো অ্যাঙ্কোর, কখনো ফিনজুরো বলে শিল্পীকে উৎসাহ যোগাচ্ছে বাহবা, বাহ বা বলছে শিল্পী ও মাথা নেড়ে হাত তুলে কণ্ঠ শৈলী প্রকাশে মাতোয়ারা হয়ে সংগীত পরিবেশনে একাকার তবলার চাটি, র‌্যালা, তুব তেহাইতে আসর জমাট। সংগীতের এমন বিশাল পথ সৃষ্টি নজরুল আগমনের পূর্বে কোথায় ছিল? জমিদাররা তো ছিল কিন্তু সংগীত ছিল নায়কি নির্ভর। নজরুল গজল গানের সুরেই প্রথম রাগের ব্যবহার করেন, যা ক্রমশ বিচিত্র ও ব্যাপক হয়। তার কয়েকটি বিখ্যাত গজল হলো : ‘আসে বসন্ত ফুলবনে’ [ভীমপলশ্রী], ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’ [ভৈরবী], ‘দুরন্ত বায়ু পুরবইয়া’ [কাফি-সিন্ধু], ‘এত জল ও কাজল চোখে’ [মান্দ], ‘ভুলি কেমনে আজো যে মনে’ [পিলু], ‘কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে’ [গারা-ভৈরবী], ‘কেন কাঁদে এ পরাণ’ [মিশ্র বেহাগ-খাম্বাজ], ‘চেয়ো না সুনয়না’ [বাগেশ্রী পিলু], ‘বসিয়া নদীকূলে’ [কালাংড়া] ইত্যাদি। নজরুলের প্রথম দিকের গজলগুলির অধিকাংশই কৃষ্ণনগরে রচিত। সে সময় নজরুল দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন। নজরুলের গজলগুলি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে দিলীপকুমারের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। দিলীপকুমার ছিলেন রাগসংগীতে পারদর্শী, তাই তার কণ্ঠে রাগাশ্রিত সুরে নজরুলের গজলগুলি রচয়িতার কাঙ্ক্ষিত রূপ লাভ করে।

শুধু গজল নয়, নজরুলের সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী স্বদেশি গান ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ বা ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ দিলীপ রায় তার সহশিল্পীদের নিয়ে প্রথম পরিবেশন করেন ১৯২২ সালের ২২ মে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনের উদ্বোধনী সংগীতরূপে। ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম নজরুলের গান রেকর্ড হলেও [শিল্পী : হরেন্দ্রনাথ দত্ত, গীত : ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব’] এবং ১৯২৬ সাল থেকে নজরুল গজল রচনা করলেও ১৯২৮ সালের মার্চ মাসের আগে তিনি প্রত্যক্ষ বা নিয়মিতভাবে কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। নজরুল ওস্তাদদের সংস্পর্শে এসেছিলেন গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ এবং কলকাতা বেতারে সংশ্লিষ্ট হওয়ার পরে, কিন্তু তার আগেই যে তিনি রাগসংগীতে ব্যুৎপন্ন ছিলেন, সে পরিচয় পাওয়া যায় ১৯২৬-২৮ সালের মধ্যে রচিত তার গজল ও গান থেকে। তার বুলবুল [১৯২৮], চোখের চাতক [১৯২৯] এবং চন্দ্রবিন্দু [১৯৩০] গীতি-সংকলনের অধিকাংশ গানের সুরই রাগনির্ভর। বুলবুল-এর গানগুলি গজল আঙ্গিকে হলেও চোখের চাতক এবং চন্দ্রবিন্দু-র গানগুলি গজল ছাড়াও অন্যান্য আঙ্গিকের। বোঝা যায় যে ১৯৩০ সালের মধ্যেই নজরুল তার বিভিন্ন আঙ্গিকের গানের সুরে রাগ-রাগিণী ও তালের ব্যবহারে পারদর্শী হয়ে ওঠেন।নজরুলের ১৯২৬-২৭ সালে রচিত গজলগুলি পরবর্তীকালে, আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, হরিমতি, রাধারানি প্রমুখ শিল্পীর কণ্ঠে রেকর্ড হয়। তার গানে কেবল প্রেম নয় দর্শন আর সমসাময়িক সময়ের উৎপ্রেক্ষণও ক্রিয়াশীল ছিল।


‘একদিকে রবীন্দ্রনাথ, একদিকে নজরুল।’ সাহিত্যে, সংগীতে বাঙালির চেতনায় এই দুই মহীরুহ আমাদের কেবল প্রেরণা নয়, মূল শেকড়।


কবি ও সাহিত্যিক, গীতিকার ও সুরকার, সমাজ সংস্কারক, রাজনৈতিক কর্মী কিম্বা ব্যক্তি হিসাবে নজরুল বিচার ও মূল্যায়ন হয়েছে, অনেকে করেছেন। সেইসব লেখালিখির মধ্যে তাকে নিয়ে সমাজের নানান শ্রেণির, নানান সম্প্রদায়ের ও নানান অংশের চিন্তা ও উৎকণ্ঠা ধরা পড়ে। সেই দিক থেকে নজরুল তার সময়কালে এক ভাবে আলোচিত হয়েছেন। সেই আলোচনার মধ্যে সেই সময়কালের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন, সমাজের নতুন পরিগঠন, রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা ইত্যাদির লক্ষণ বা উৎক্ষেপ রয়েছে। তাকে নিয়ে আলোচনার সময় সেই লক্ষণ বা উৎক্ষেপগুলোই সামনে আসে সেটাই স্বাভাবিক। ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে এখনকার সময় অবধি বাংলাদেশের জনগণের, আবেগ, কল্পনা, আত্মচিন্তা ও আত্মপরিচয়ের টানাপড়েন ও বিবর্তন বোঝার জন্য নজরুল অসামান্য সামাজিক উপাদান। সেইদিকে বাংলাদেশে তার সর্ম্পকে আগ্রহ আছে ঠিকই কিন্তু খুব একটা কাজ হয়েছে বলে মনে হয় না। তার গান ও সাহিত্যকর্ম নিয়েই আগ্রহ আমাদের বেশি। তার জীবনকে গান ও সাহিত্যকর্মের আলো ফেলে আমরা বোঝার চেষ্টা করি। এতেও অবাক হবার কিছু নাই, এটাই প্রাথমিকভাবে হবার কথা। কিন্তু উলটো দিক থেকে তাকে বোঝার চেষ্টা করি না। একটি জনগোষ্ঠীর বেড়ে উঠার ইতিহাসের সঙ্গে তার লেখালিখি ও সংগীতচর্চা কিভাবে জড়িত সেই দিকটা এখনও অনালোচিতই থেকে গেছে। নজরুল নিয়ে আমাদের বিপুল আগ্রহ থাকলেও তার তাৎপর্য নিয়ে বাংলাদেশে আমরা যথেষ্ট ভেবেছি বলে মনে হয় না। আরও একটি কারণে তাকে একপেশে রেখে চলার প্রবণতা আমাদের প্রকট। তা হলো হিন্দু না তিনি মুসলিম। কিন্তু যে নজরুল ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যে-জনগোষ্ঠীকে কল্পনা করতে চেয়েছিলেন সেখানে হিন্দু-মুসলমান ভেদ ছিল না। অথচ বাস্তবে সেই ভেদ তৈরি হয়ে গিয়েছিল, তার লেখালিখির মধ্যে দুই সম্প্রদায়ের প্রতি অতএব আলাদা আবেদন প্রস্তাব করবার তাগিদ ছিল। কখনও তিনি ‘হিন্দু’ হয়ে লিখেছেন, কখনও ‘মুসলমান’ হয়ে। দুই সম্প্রদায়ের আশা আকাঙ্ক্ষা ও অভিপ্রায় তখন এক বিন্দুতে বা এক কাতারে ছিল, ইতিহাস তা বলে না। আমরা বাংলাভাষা, সংস্কৃতি ও বাঙালি পরিচয়কে হিন্দু মুসলমান ভেদাভেদ থেকে আড়াল করে রাখতে চাই। যা আসলে অবাস্তব ও অনৈতিহাসিক। তার শ্যামা সংগীত বা কীর্তন রচনাকে নিছকই সাহিত্যিক চর্চা হিসাবে গণ্য করবার সুযোগ নাই কারণ তা ওই ভেদহীন সমাজ করার লক্ষ্যেই। তর্ক করব না, তুলনাও করছি না, রবীন্দ্রনাথ তো বাঙালি হয়েও ‘ইসলামি সংগীত’ রচনা করেন নি। তাই বলে তিনি সাম্প্রদায়িক ছিলেন তাও না। এটা কূটতর্ক বলে আমরা পরিহার করতে পারি, কিন্তু এটাই ইতিহাস। হিন্দু মুসলমান ভেদকে বাস্তব ও ঐতিহাসিক বলার অর্থ এই নয় যে, এই ভেদ প্রাকৃতিক অতএব চিরায়ত। অর্থাৎ হিন্দু কিম্বা মুসলমানকে এই ভেদবুদ্ধির জন্য দোষারোপ না করে এই ভেদ তৈরি হবার ঐতিহাসিক কারণগুলোকে বোঝা এবং অতীতের ভুলের পূর্বানুবৃত্তি বন্ধ করা।। ‘এখন আমাদের বাঙলা সাহিত্যে স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করিতে হইলে সর্বপ্রথম আমাদের লেখার জড়তা দূর করিয়া তাহাতে ঝর্নার মতো ঢেউ ভরা চপলতা ও সহজ মুক্তি আনিতে হইবে। যে সাহিত্য জড়, যাহার প্রাণ নাই, সে নির্জীব সাহিত্য দিয়া আমাদের কোন উপকার হইবে না, আর তাহা স্থায়ী সাহিত্যও হইতে পারে না। বাঙলা সাহিত্য রবীন্দ্রনাথ ছাড়া খুব কম লেখকেরই লেখায় মুক্তির জন্য উদ্দাম আকাঙ্ক্ষা ফুটিতে দেখা যায়।’–বাঙলা সাহিত্যে মুসলমান [নজরুল ইসলাম, ১৯৬৬, পৃষ্ঠা-৮২০] যেখানে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই ছিলেন নজরুলের প্রেরণা সেখানে আজ আমাদের কেন গান রচনায়—‘একদিকে রবীন্দ্রনাথ, একদিকে নজরুল’। সাহিত্যে, সংগীতে বাঙালির চেতনায় এই দুই মহীরুহ আমাদের কেবল প্রেরণা নয়, মূল শেকড়। হিন্দু-মুসলমানে মিলনে বিশ্বাসী নজরুল নিজেই  বলেছেন, ‘বাংলা সাহিত্য হিন্দু-মুসলমান উভযেরই সাহিত্য, এতে হিন্দু দেব-দেবীর নাম দেখলে মুসলমানদের রাগ করা যেমন অন্যায়, হিন্দুদেরও তেমনি মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যে নিত্য-প্রচলিত মুসলমানী শব্দ তাদের লিখিত সাহিত্য দেখে ভ্রু কুঁচকানো অন্যায়।’ তিনি অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁকে লিখিত এক পত্রে উল্লেখ করেন, ‘আমি হিন্দু-মুসলমানদের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী…। তাই তাদের এ সংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি বা হিন্দু দেব-দেবীর নাম নেই।’ তাই আমাদের মনে রাখতে হবে বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুধু পরাধীনতার বন্ধন মুক্তির, পুরানো সমাজ ভেঙে নতুন ও উন্নত সমাজ গঠনের স্বপ্নই দেখেন নি, তিনি বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিভেদের এবং সঙ্কীর্ণতার আগল ভেঙে নতুন ঐতিহ্য গড়ার ধারা সৃষ্টি করে গেছেন, রেখে গেছেন অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত।

বিশ শতক পেরিয়ে আমরা একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে প্রবেশ করেছি। এরই মধ্যে সাম্রাজ্যবাদের বদলে এসেছে বিশ্বায়ন, ঔপনিবেশিক শোষণের স্থান নিয়েছে মুক্তবাজার অর্থনীতি, জাতীয় সংস্কৃতিকে গ্রাস করে ফেলেছে আকাশসংস্কৃতির বিকিরণে অপসংস্কৃতির বাতাবরণ। আজ তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে জটিল সমস্যা ওই প্রভুত্ব থেকে স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রাখা আর সে জন্য প্রয়োজন একই সঙ্গে স্বদেশি ও আন্তর্জাতিক হওয়া। নিজের জাতিসত্তার ও সংস্কৃতির প্রতি অবিচল থেকে আন্তর্জাতিক হওয়া। আজকের পৃথিবীতে কোনো দেশ-জাতি নির্জন দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। আজ তাকে নিজের মাটিতে আপন ঐতিহ্যের শেকড় গভীর থেকে গভীরে প্রোথিত করে দাঁড়াতে হবে। নজরুলের মতো বলতে হবে, ‘বল বীর/ বল উন্নত মম শির/ শির নেহারি আমারি নতশির ওই শির হিমাদ্রির।’ আমাদের বেলা-অবেলা আর চেতনাবোধে নজরুল হয়ে উঠুক আরও ব্যাপক চর্চাকেন্দ্র।


দোহাই :

আব্দুল কাদির [১৯৬৬] নজরুল রচনাবলী, ঢাকা : বাংলা একাডেমি।

ইসলাম, কাজী নজরুল [১৯৮৪] নজরুল রচনাবলী, চতুর্থ খণ্ড, ঢাকা : বাংলা একাডেমি।

চক্রবর্তী, জ. [২০০৩] বাঙলা ভাগ হোল : হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাও দেশবিভাগ ১৯৩২ -১৯৪৭, ঢাকা : ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড।

নজরুল ইসলাম [১৯৬৬] নজরুল রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, ঢাকা : বাংলা একাডেমি।

নজরুল প্রসঙ্গ : বাংলা একাডেমি।

আঁখি সিদ্দিকা

আঁখি সিদ্দিকা

জন্ম ১৭ অক্টোবর, মানিকগঞ্জ। বাংলায় স্নাতকোত্তর।
পেশা : চাকরি; কর্মকর্তা, আইসিবি।

প্রকাশিত বই—

ছায়াচর
বালক
নক্ষত্রের জলে কয়েকটি তারা
বিষণ্ন সরাইখানা
বই-চড়ুইয়ের সাদা ডিম ভাঙ্গা দুপুরে (২০১৬)

ই-মেইল : ankheesiddika@Gmail.com
আঁখি সিদ্দিকা