হোম গদ্য নজরুলের একটি গান এবং ভারতীয় পুরাণের ‘একেশ্বরবাদ’ তত্ত্বের অভূতপূর্ব বিনির্মাণ

নজরুলের একটি গান এবং ভারতীয় পুরাণের ‘একেশ্বরবাদ’ তত্ত্বের অভূতপূর্ব বিনির্মাণ

নজরুলের একটি গান এবং ভারতীয় পুরাণের ‘একেশ্বরবাদ’ তত্ত্বের অভূতপূর্ব বিনির্মাণ
723
0

সময়টা ব্রিটিশ ভারতবর্ষ তথা পরাধীন ভারত। ভারতের স্বাধীনতার ক্ষীণ স্বপ্ন তখন একটু-একটু করে দানা বেঁধে উঠেছে মানুষের মনে। ঠিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম [১৮৯৯-১৯৭৬]। ভারতের স্বাধীনতা এবং অভিন্ন জাতিগঠন নজরুলের সমগ্র সাহিত্যকর্মের একটি মূল প্রবণতা। তাঁর এই চেতনাকেই আমরা ‘বিদ্রোহী’ বিশেষণে বিশেষায়িত করেছি।

এই অভিন্ন জাতিগঠনের চেতনায়-ই সাম্যের পথ ধরে হেঁটেছিলেন নজরুল। সকল মানুষ এবং সকল মত-পথকে এক পথে ধাবিত করবার চেষ্টা তিনি বরাবর করেছেন। এই গানটির মূল চেতনার শিকড়ও সেখানে। বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম’ ততদিনে সাম্প্রদায়িক চেতনার ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে সমকালের মনে। কেবলমাত্র ‘বন্দে মাতরম’ বলে ভারত স্বাধীন প্রায় অসম্ভব। কেননা ‘বন্দে মাতরম’ বললে ‘শাক্ত’ সম্প্রদায় যত বেশি উদ্বুদ্ধ হচ্ছে, ‘বৈষ্ণব’ সম্প্রদায় তত বেশি নিরুৎসাহিত হচ্ছে। বাকি অন্য ধর্মসম্প্রদায়ের এই ‘বন্দে মাতরম’ ডাকে উদ্বুদ্ধ হবার প্রশ্নই আসে না। এই বিভেদ দূর করতেই তিনি সাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। এই সাম্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়েই তিনি এই গানে শিব এবং কৃষ্ণকে এক করে দেখাতে চেয়েছেন। অর্থাৎ শাক্ত ও বৈষ্ণবের মিলনের চেষ্টা করেছেন।

ভারতীর পুরাণের অন্যতম একটি মূল তত্ত্ব ‘একেশ্বরবাদ’। ‘ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর, তিনে মিলে একেশ্বর’। এই তিনের অভেদ কল্পনায় দাঁড়িয়ে আছে সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি। নজরুলের এই গানে আমরা এদের মধ্যে বিষ্ণু ও মহেশ্বর এই দু’জনকে এক সঙ্গে পেয়েছি, তাই আমরা এটাকে পৌরাণিক মূল তত্ত্বের বিনির্মাণ বলছি। প্রাচীন একটি তত্ত্বকে সময়ের প্রয়োজনে সামান্য রদবদল করে তিনি বিনির্মাণ করেছেন নতুন তত্ত্ব। যেহেতু তাঁর মূল ইচ্ছে ছিল ‘শাক্ত’ ও ‘বৈষ্ণব’দের একত্র করা, তাই তিনি ব্রাহ্ম প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেছেন। কিংবা সমকালীনতায় তার প্রয়োজনও বোধ করেন নি। পৌরাণিক সব তত্ত্বগুলো দাঁড়িয়ে আছে কাব্যাকারে লেখা ছোট-ছোট কিছু গল্পের উপর নির্ভর করে। নজরুল কোনো পৌরাণিক গল্পের উপর দাঁড়ান নি, নজরুল নিজের গল্পের উপর দাঁড়িয়েছেন। এই কারণেও আমরা নজরুলের এই মৌলিক সৃষ্টিকে পুরাণের মূল তত্ত্বের বিনির্মাণ বলছি।


নজরুলের লিখনশৈলীর প্রধানতম হাতিয়ার পুরাণ-ইতিহাস-ঐতিহ্যের অসহ্য সুন্দর ব্যবহার।


পৌরাণিক শব্দ-চরিত্রের ব্যবহার করে নবজাগরণ কিংবা শক্তির পূর্ণগঠনের প্রবণতা নজরুলের সাহিত্যে অনেকবার অনেকভাবে দেখা গেছে। ধরতে গেলে নজরুলের লিখনশৈলীর প্রধানতম হাতিয়ার পুরাণ-ইতিহাস-ঐতিহ্যের অসহ্য সুন্দর ব্যবহার। নজরুল যখন লিখেন, ‘আমি ভীম ভাসমান মাইন’—এই সামান্য চারটি শব্দের রস আস্বাদন করতে গেলে প্রায় চার’শ বাক্য লিখতে হবে। কিংবা যখন লিখেন ‘আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী’—তিনটি শব্দের গতি মুহূর্তে আমাদের চেতনায় অদ্ভুত এক অনুভূতির সৃষ্টি করে। অথবা যখন দু’টি শব্দে একটি কবিতার নামকরণ করেন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’, তখন মুহূর্তে আমাদের অনেক কিছু জানার-বোঝার আগ্রহ তৈরি হয়ে যায়। এদিক থেকে নজরুলের মুনশিয়ানার সুনাম ঘোর নজরুল-বিরোধীরাও করে থাকেন হয়তো।

নজরুলের যে গানটি নিয়ে আমাদের আলোচনা, সেটা খুব-ই পরিচিত একটা গান। অনেকবার শোনা এই গানটি হয়তো আমরা ভালো করে কখনও লক্ষ করে দেখি নি। আসুন মূল গানটির ব্যবচ্ছেদ করে এর রসসুধা আস্বাদনের চেষ্টা করি।

অরুণ কান্তি কে গো যোগী ভিখারী।
নীরবে হেসে দাঁড়াইলে এসে…
প্রখর তেজ তব নেহারিতে নারি॥
রাস-বিলাসিনী আমি আহিরিণী…
শ্যামল কিশোর রূপ শুধু চিনি…
অম্বরে হেরি আজ এ কি জ্যোতি-পুঞ্জ?
হে গিরিজাপতি! কোথা গিরিধারী॥

রাধার পাশে আমরা বরাবর কৃষ্ণকেই দেখেছি। কিন্তু সেই রাধার পাশে আজ কৃষ্ণ নন, শিব এসে দাঁড়িয়েছেন। দেহে তার সূর্যের জ্যোতি, স্বভাবে সে মহাযোগী। এই জ্যোতি রাধা সহ্য করতে না পেরে তাকে বলছেন, হে গিরিজাপতি—অর্থাৎ হে গিরিকন্যার পতি, মানে হিমালয়কন্যা দুর্গা/পার্বতী—সেই দুর্গার স্বামী। আমি সামান্য এক গোয়ালিনী—আমি তোমার অপরূপ ভৈরব রূপ সহ্য করতে অপারগ। আমি তোমার রাসলীলার সঙ্গী, আমি কেবল তোমার সেই কৃষ্ণবর্ণ কিশোর কোমল রূপকেই চিনি। তোমার রূপের ছটায় আজ আকাশজুড়ে এ কী অপূর্ব জ্যোতি! সামান্য গোয়ালিনী আমি, কী করে সইতে পারি তোমার এমন জ্যোতির্ময় রূপ! হে শিব শূলপাণি, একবার তুমি বলো আমার সেই গিরিধারী কোথায়? ‘গিরিধারী’ কৃষ্ণের একশত আটটি নামের মধ্যে একটি। প্রতিটি নামের আছে আলাদা মহিমা, আছে আলাদা-আলাদা গল্প। এই নাম বিষয়ে বিশদ আলোচনায় যাব না আজ, কারণ আমরা আজ অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে বসেছি। এককথায় শুধু এতটুকু জেনে রাখি, কৃষ্ণ ও ইন্দ্রের মধ্যে আগাগোড়াই বিরোধ ছিল। সেই বিরোধ থেকে মনস্তাত্ত্বিক এবং সম্মুখ উভয় প্রকার যুদ্ধের দৃষ্টান্ত-ই পৌরাণিক গ্রন্থগুলোতে খুঁজে পাই। তো এমন এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের একটি মুহূর্তে আমরা দেখতে পাই, ইন্দ্র সমগ্র গোকুল-বৃন্দাবনকে জলে প্লাবিত করে দেয়ার ইচ্ছা নিয়ে তুমুল বৃষ্টি বর্ষণ করে যাচ্ছেন, আর কৃষ্ণ সেই অনবরত বৃষ্টির হাত থেকে প্লাবন রোধে ‘গোবর্ধন’ নামের এক বিশাল পর্বতকে ছাতার মতো উঁচু করে ধরে আছেন। বিশাল এই গিরিকে এভাবে হাতে ধরে রেখেছিলেন বলে তার নাম হয় গিরিধারী।

সম্বর সম্বর মহিমা তব…
হে ব্রজেশ ভৈরব! আমি ব্রজবালা,
হে শিব সুন্দর! বাঘছাল পরিহর—
ধর নটবর বেশ, পর নীপমালা।

হে ভৈরব, হে শিব, হে সুন্দর, বাঘের ছাল পরিহিত ফুলের মালা গলায় জড়িয়ে ভৈরব রূপ ছেড়ে তুমি নটরাজরূপে দেখা দাও, আমি সামান্য এক ব্রজনারী—তোমার এমন সূর্যপ্রভাময় রূপ আমার অভিজ্ঞতার বাইরে।

নব-মেঘ-চন্দনে ঢাকি’ অঙ্গজ্যোতি…
প্রিয় হ’য়ে দেখা দাও ত্রিভুবনপতি,
পার্ব্বতী নহি আমি, আমি শ্রীমতী,
বিষাণ ফেলিয়া হও বাঁশরী-ধারী…

ওহে শিব আমি পার্বতী/ দুর্গা না, দুর্গার মতো দুর্গতিনাশিনী সেই মহা শক্তিশালী মহামায়া আমি না, আমি কোমল প্রাণের কিশোরী—আমি শ্যামপ্রিয়া শ্রীমতী রাধা। তোমার এই রুদ্ররূপ আমি সহ্য করতে পারছি না। দয়া করে নতুন মেঘকে চন্দন ক’রে তোমার এই জ্যোতির্ময়তা ঢেকে সেই শ্যামল বর্ণখানি ধারণ করো—যে শ্যামল-কিশোর রূপ আমার প্রিয়ের, সেই রূপে তুমি আমাকে দর্শন দাও। ফেলে দাও তোমার ভয়ংকর শিঙ্গা, যে শিঙ্গার ধ্বনিতে ধরণী কম্পিত করে তা আমি চাই না—আমি আমার সেই মোহন বংশীধারী প্রিয়তমকে চাই। যার বাঁশি আমাকে ভীত করে না, করে পুলকিত।


ব্রিটিশ বিরোধী নজরুল, সাম্যবাদী নজরুল সর্বভারতীয় মুক্তির প্রশ্নে সকলকে এক সঙ্গে করে দেয়ার চেষ্টা করছেন। 


রাধার শেষ উক্তি থেকে ‘বিষাণ ফেলিয়া হও বাঁশরী-ধারী’—স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে, যিনি বিষাণধারী শিব , সেই তিনি-ই বিষাণ ছেড়ে বাঁশরী ধারণ করে কৃষ্ণের রূপে পরিবর্তিত হতে পারেন। অর্থাৎ যিনি শিব তিনি-ই কৃষ্ণ। কৃষ্ণ কে? কী তার আসল পরিচয়, তা বিশদ আলোচনা করা সম্ভব না হলেও এতটুকু জেনে রাখি—কৃষ্ণ বিষ্ণুর-ই অবতার রূপ। অর্থাৎ কৃষ্ণ-ই বিষ্ণু। সেক্ষেত্রে এই কথাও প্রমাণিত হয়ে যায় যে, ব্রহ্মা এখানে অনুপস্থিত থাকলেও বিষ্ণু ও মহেশ্বরের ভেদ এখানে একদম ঘুচে গেছে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, নজরুল কেন এদের একত্র রূপকে দেখতে বা আমাদের দেখাতে চাইছেন? তাঁর মূল লক্ষ্য কি একেশ্বরবাদ প্রকাশ বা প্রচার? না, একদম না। ব্রিটিশবিরোধী নজরুল, সাম্যবাদী নজরুল সর্বভারতীয় মুক্তির প্রশ্নে সকলকে এক সঙ্গে করে দেয়ার চেষ্টা করছেন। আলাদা-আলাদা থেকে স্বাধীনতা আনা অসম্ভব, তাই তিনি চাইছেন শ্রেণিবৈষম্য দূর করতে। এমন চেষ্টা নজরুল অনেকবার করেছেন। মনে করার চেষ্টা করুন, নজরুল গাইছেন : ‘শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে—জপি আমি শ্যামের নাম।’ অদ্ভুত তাঁর একাত্মকরণের প্রয়াস। একদিকে শাক্ত সম্প্রদায়ের মা কালী/শ্যামা, অন্যদিকে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কৃষ্ণ/শ্যাম। এই শাক্ত আর বৈষ্ণব দু’টি সম্প্রদায়ের সাপে-নেউলে সম্পর্ক সেকালে মাত্র নয়, আজকের দিনেও বর্তমান। তাই নজরুল চেয়েছিলেন প্রভেদ ভেঙে সবাইকে এক কাতারে এনে দাঁড় করাতে। এখানেও ওই একই বিষয়, স্বাধীনতাকামী নজরুলের সমন্বয়-প্রয়াস কেবল শক্তিকে একত্রিত করা। কোনো ধর্মীয় বাসনা থেকে নজরুল তা কখনও করেন নি। প্রয়োজনটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক।

নজরুল যখন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ লিখেন, তখনও তিনি হিন্দুদেবী কালীকে তুষ্ট করতে এই আহ্বান লিখেন না। তিনি রুদ্ররূপিণী সেই শক্তিকে আহ্বান করেছিলেন এবং তা ভারতের স্বাধীনতা-প্রশ্নেই করেছিলেন। এখন প্রশ্ন হতে পারে, অন্য পুরাণগুলোতেও তো এমন শক্তির উৎস আছে, তবে কালী-ই কেন? কালী শুধু এজন্য যে, হিন্দু-অধ্যুষিত ভারতভূমিতে কালী একটি সুপরিচিত বিশ্বাসের নাম। নজরুল নিজে তাকে বিশ্বাস করতেন, এমন ভাবনার তেমন কোনো সুযোগ নেই। কারণ নজরুলকে আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনার একজন প্রগতিশীল যুবক হিসেবেই চিনি। যিনি নিজে মুসলিম, ঘরে যার হিন্দু স্ত্রী। যার সন্তানেরা সবাই অদ্ভুত নামের অধিকারী—কৃষ্ণ মোহাম্মদ, কাজী অনিরুদ্ধ—অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিমকে এক সুতায় গেঁথে নেয়ার এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ এসব। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও তাঁর সাহিত্যে এই সমন্বয়-প্রয়াস নজরুলের মধ্যে আজীবন-ই ছিল। একদিকে ইসলামি হামদ-নাত, অন্যদিকে বৈষ্ণবের বৈষ্ণবীয় কীর্তনগাথা, আরেকদিকে শাক্ত সম্প্রদায়ের জন্য শ্যামাসংগীত—সব-ই সমান দক্ষতায় রচনা করছেন তিনি। এই বিষয়েও বিশদ আলোচনার তেমন সুযোগ নেই আমাদের এই লেখায়।

আসুন আমরা আমাদের মূল আলোচনায় ফিরে যাই। কৃষ্ণের এমন রূপ পরিবর্তনের ঘটনা এই প্রথম নয়। আগেও বিভিন্ন সময়ে কৃষ্ণের এই রূপ পরিবর্তনের মায়া আমরা দেখেছি। শিশুবয়সে সে তাঁর মা নন্দরানি যশোদাকে একবার বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন নিজের মুখের মধ্যে। সমুদ্রমন্থনে উত্থিত সুধা বণ্টন নিয়ে দেব-দানবের ঝগড়া যখন তুমুলে পৌঁছে গেল তখন শিব গিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন এবং পরিবেশ কিছুটা শান্ত হলো। ঠিক সেই সময় কৃষ্ণ তাঁর আপন মহিমা প্রতিষ্ঠার জন্য মোহিনীরূপ ধরে সেখানে গিয়ে উপস্থিত। এই মোহিনীরূপের ধারণা হয়তো পাঠকের আছে, তবু আমি একবার স্মরণ করিয়ে দিতে ইচ্ছা করি। মোহিনী রূপ এমন এক রূপ যা ঠিক কল্পনা করে ওঠা সম্ভব নয় আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে। কারণ যে রূপের ছটায় শিবসহ সকল দেব-দানব মূর্ছিত হয়ে পড়েছিলেন, সেই অপরূপ রূপ আমরা কী করে কল্পনায় আনতে পারি? এখানেই উল্লেখ পাই হিন্দু পুরাণের আরও এক বিশেষ তত্ত্ব, ‘অর্ধনারীশ্বর’ তত্ত্ব। যে তত্ত্ব প্রচলিত নারীবাদ-পুরুষবাদের ধারণাকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দেয়।

এই তত্ত্ব নিয়েও আজ আর আলোচনা করা সম্ভব না। আমরা প্রসঙ্গে ফিরে যাই, কৃষ্ণের রাসলীলার গল্প কমবেশি আমরা সবাই শুনেছি। সেখানে একটা খণ্ড আছে ‘সূর্যপূজা’। তো সেই সূর্যপূজার গল্পটা এমন, রাধা কৃষ্ণ গহিন বনে মিলিত হয়েছেন। এমন সময় সেই বনপথে রাধার শাশুড়ি ও ননদিনী জটিলা-কুটিলাকে আসতে দেখে রাধা ভয় পেয়ে যান। কৃষ্ণ তখন বলেন, ভয় করো না শ্রীমতী। এই আমি সূর্যরূপ ধারণ করছি, তুমি পূজারিণী বেশে আমার পূজায় রত হও। তাই হলো, জটিলা-কুটিলা এসে দেখলেন, তাদের গৃহবধূ সূর্যপূজায় রত। সে যাত্রায় বিপদ থেকে রক্ষা পেল শ্রীমতী রাধিকা। ‘মহাভারতে’ কুরুক্ষেত্রের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের খবর হয়তো আপনাদের সবার-ই কমবেশি কিছু জানা। সেই যুদ্ধের শুরুতে আমরা দেখি, যোদ্ধা-বেশে অর্জুন রথে চেপেছেন আর সেই রথের সারথি হিসেবে আছেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে প্রতিপক্ষ হিশেবে স্বজনদের দেখে অর্জুন যুদ্ধ শুরু করতে অসম্মতি জানান। কারণ তিনি পারবেন না তার স্বজনদের হত্যা করতে। তখন কৃষ্ণ অর্জুনকে দিব্যশক্তি দান করেন, সেই শক্তি পেয়ে অর্জুন দেখলেন কৃষ্ণের অন্য এক মহিমাময় রূপ—যা তিনি আগে কখনও দেখেন নি। যে কৃষ্ণকে এতকাল নিছক ভাই-বন্ধু হিশেবেই জানতেন, তাকেই আজ দেখলেন বিশ্বত্রাতা হিসেবে। কৃষ্ণের যুক্তিতে পরাস্ত হয়ে শেষে অর্জুন যুদ্ধ শুরু করতে বাধ্য হন। এমন আরও কিছু গল্প পৌরাণিক কাব্যগুলিতে খুঁজে পাওয়া যায়।


সমকালীন পরাধীন ভারতভূমি স্বাধীন করবার তুমুল বাসনা নিয়ে নজরুল তার জীবনের একটা বড় সময় অতিবাহিত করেছেন।


কিন্তু এই গানটির মধ্যে নজরুল গল্পের মাধ্যমে যে তত্ত্ব প্রকাশ করছেন, তা পৌরাণিক কোনো গ্রন্থে কোথাও নেই। রাধা-শিবের দেখা পুরাণের কোথাও নেই। এই অভূতপূর্ব দৃশ্য—এই নাটকীয় মুহূর্ত সম্পূর্ণ নজরুলের কল্পনাজাত অপূর্ব কবিত্ব শক্তির প্রকাশ। না তিনি কোনও মিথ্যে বানোয়াট তত্ত্ব তৈরি করেছেন, না তিনি কোনো মনগড়া ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন। পুরাণের ঘটনা ও তত্ত্বকে আশ্রয় করে তিনি জন্ম দিয়েছেন নতুন এক পুরাণের। ফলে আমরা নজরুলের এই মুনশিয়ানাকে পুরাণের বিনির্মাণ বলতে চাইছি। সময়ের প্রয়োজনে পুরনো তত্ত্ব ভেঙে নতুন তত্ত্ব জন্ম নিবে, সেটাই স্বাভাবিক। আর তা না ঘটলে জ্ঞানচর্চার পথ উন্মোচিত হবে কী করে?

শিল্প-সাহিত্যের পথে মৌলিক সৃষ্টি বা কোনো আলোচনাই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। আমাদের এই আলোচনারও সমালোচনা হতে পারে। তাই যে কেউ চাইলে এই লেখার একটা গঠনমূলক আলোচনা করতে পারেন। আমরা আবার বলে রাখতে চাই, নজরুলের এই বিনির্মাণ প্রয়াসে কোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্য নেই, আছে কেবল রাজনৈতিক কারণ বিশেষ। সমকালীন পরাধীন ভারতভূমি স্বাধীন করবার তুমুল বাসনা নিয়ে নজরুল তার জীবনের একটা বড় সময় অতিবাহিত করেছেন। চেষ্টা করেছেন হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, শাক্ত-বৈষ্ণব, উঁচু-নিচুর প্রভেদ ভেঙে সমগ্র মানুষের শক্তিকে এক করে তিনি ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন।

(723)