হোম গদ্য ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি ও ধর্মের প্রয়োগ

ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি ও ধর্মের প্রয়োগ

ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি ও ধর্মের প্রয়োগ
771
0

এমন একটা গ্রামে আমার শৈশব কেটেছিল, সেটিই আমার জন্মস্থান, যেখানে একটি মাত্র পরিবার ছিল হিন্দু; যারা পুরো গ্রামের বয়স্ক ও শিশুদের চুলকেটে জীবিকা নির্বাহ করতেন। অবশ্য জীবিকা শব্দটি তাদের জন্য মানানসই ছিল না, তারাই আসলে ছিলেন এই গ্রামের মানুষের মাথা ও চুলের শৈলী-নির্মাতা। স্বভাবত তারা আমাদের শিশুদের মাথাটা তাদের দুই হাঁটুর মাঝখানে চিমটার মতো শক্ত করে ধরে রেখে চুল কাটার কাজটি সেরে নিতেন; যদিও পদ্ধতিটি কষ্টকর তবু এর উপকারী দিক ছিল—মাথাটা হাঁটুর মধ্যে শক্ত করে ধরে থাকায়, ধারাল কাঁচি বা ক্ষুরের আঘাত থেকে রক্ষা পায়। একটি বৃহত্তর গ্রামের প্রায় কয়েক হাজার লোকের চুল-দাড়ি তারা দক্ষতার সঙ্গে বংশপরম্পরায় কেটে আসছিলেন; এই সুবাদে তাদের যাতায়াত ছিল আমাদের পরিবারগুলোর উঠোন থেকে পাকঘর পর্যন্ত। যেহেতু শিশুদের চুলও তারাই কাটতেন, এমনকি মেয়ে-শিশুদের চুলও আট-দশ বছর পর্যন্ত তাদের সাইজ করে রাখতে হতো; আর এই সুবাদে বাড়ির মহিলাদের কাছেও তারা ছিলেন সমান প্রিয়; মাঝে-মাঝে তারাও তাদের চুলের আগা কেটে নিতেন, আড়ালে-আবডালে। দুই ঈদ বা শবে-বরাতে তাদের ব্যস্ততা যেমন বেড়ে যেত, তেমনি বিয়ে বা খাতনার অনুষ্ঠানগুলোতে তাদের কাঁচির ঝনঝনানির সঙ্গে আনন্দ ঝরে পড়ত। সবচেয়ে মজা হতো, যখন তারা বিয়ের বর কিংবা খাতনার পাত্রের গোঁফে কিংবা মাথার চুলে একটি পোচ দিয়ে হাতগুটিয়ে বসে থাকতেন; অর্থাৎ এবার ছেলের মা-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে থেকে আনা-আধুলি-কড়ি না-পড়া পর্যন্ত তার চুলকাটা শেষ হতো না। দুই ঈদ বা কোনো অনুষ্ঠানাদি ছাড়া তাদের চুল কামানোর সঙ্গে নগদার্থের কোনো সম্পর্ক ছিল না; বর্ষার শুরুতে আউশ কাটার মৌসুমে, আর শীতের শেষে রবিশস্য মাড়াইয়ের সময়ে তারা বস্তা নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরে প্রতিটি বাড়ি থেকে তাদের মজুরি আদায় করে নিতেন। অবশ্য এটি হতো একটি পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে; কাউকে কখনো বলে দিতে হতো না, তাদের কী পরিমাণ শস্য দিতে হবে, কিংবা তারা নিজেরাও কখনো অতিরিক্ত দাবি করেছেন বলে শোনা যায় নি।

এই ব্যবস্থা কেবল তাদের জন্যই চালু ছিল না, যারা নদী পারাপার করতেন, লাঙল বাঁধতেন, কামার বা কুমোরের কাজ করতেন, চিকিৎসা দিতেন—সবার জন্যই ছিল একই ব্যবস্থা। তবে আমাদের গ্রামে চুল-মেরামত ছাড়া আর সকল কাজের সঙ্গে মুসলমানরাই জড়িত ছিলেন। পেশার ধরনের কারণে কাউকে গ্রামের মধ্যে বড় বা ছোট শ্রেণিভুক্তির বিষয়টি তখনো আমাদের গোচরে আসে নি। যদিও এই সত্য অস্বীকার করা যাবে না যে, পেশাগত শ্রেণি আদিকাল থেকে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে দিয়েছে। অবশ্য আমাদের গ্রাম থেকে একক্রোশ উত্তরে গেলে, সেখানে হিন্দু বসতির ঘনত্ব ছিল কিছুটা বেশি; যেখানে শিক্ষকতা ও উচ্চতর পেশাবৃত্তির সঙ্গে তারা জড়িত ছিলেন। অনেককেই আমি দেখেছি, শাদা পাঞ্জাবি ও শাদা ধুতি পরিহিত পরিপাটি মানুষ, গ্রামের লোক যাদের বাবু বলে ডাকতেন, এবং বেশ সমীহ করে কথা বলতেন। এই ঘটনাগুলো দেশ-স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পর পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল। আশির দশকের শুরুতে এটি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়। তার অর্থ কি এমন, পাকিস্তান শাসনের সময় পর্যন্ত এ দেশে হিন্দু সম্প্রদায় তাদের পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে বসবাস করেছিলেন! দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান কি তাদের সামাজিক কাঠামো ক্ষুণ্ন করতে পারে নি, কিংবা করতে চায় নি! ধর্মে বিভক্ত পাকিস্তানের এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলিম সামাজিক কাঠামোর কিরূপ পরিবর্তন হয়েছিল, তার কোনো গবেষণা আমার কাছে নেই। তবে ভারত বিভাগের ফলে দুটি সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পূর্বের সামাজিক কাঠামোর মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়েছিল বলে বিশ্বাসযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই। তার হয়তো একটি কারণ হতে পারে, কেন্দ্রীয়ভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও বাঙালির দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও সমাজকাঠামো তাকে পরিবর্তন করতে বাধা দিয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তান রাষ্ট্রের পর থেকে বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিজেদের আলাদা জাতি বলে প্রবলভাবে সংঘটিত করার চেষ্টা করেছে; তার প্রধান উপাদান ছিল ভাষা; এবং বাংলা ভাষার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উপাদান হিন্দু উপাদান থেকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো উপায় ছিল না; তারচেয়ে বড়, দীর্ঘদিনের একত্রে বসবাসের অভিজ্ঞতা তাদের অপর বলে চিনতে সহায়তা করে নি। দুটি ধর্মের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের ছিন্ন রক্তের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কোনো সুযোগ খোলা না থাকলেও প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকে একটি ভাষিক সম্পর্ক দ্বারা যুক্ত ছিল; কাকা, জ্যাঠা, ফুপু, মা, মাসি খালা—এ ধরনের সম্পর্কগুলো রক্তের সম্পর্কের বাইরেও তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল; এবং পাশাপাশি বসবাসের ফলে এই সম্পর্কগুলো এতই সুদৃঢ়ভাবে হাজির থাকত যে, আখেরে তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না; এবং তাদের ছেলে-মেয়েরা বংশ পরম্পরায় একই সম্পর্কের ঐতিহ্য নিয়ে বেড়ে উঠত। আর এই সম্পর্কের উপযোগিতার স্থায়িত্বের অন্তরালে ছিল পেশাভিত্তিক শ্রম-বিভাজন। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক দ্বারা যুক্ত ছিল। যতদিন না পেশার বন্ধনগুলো শিথিল এবং পরিবর্তিত হয়েছে কিংবা অন্যকোনো কৌশলের কাছে পরাভূত হয়েছে—ততদিন পর্যন্ত ধর্ম ও বর্ণভিত্তিক সমস্যাগুলো রক্তপাত কিংবা ঘৃণার বস্তু হিসাবে বিবেচিত হয় নি। যদিও সামজিক এই বন্ধনগুলোর মধ্যেই ছিল একটি হীন ও বশ্যতা আদায়ের প্রক্রিয়া, তবু সম্প্রতি-উদ্ভূত নবীন সমস্যাসমূহের অনেকখানি ততকালে মোকাবেলা করতে হয় নি।


মুসলমান নেতাদের পক্ষে দেশ বিভাজন যে একটি জাতীয় আত্মহত্যার শামিল, তা কেবল অর্বাচীনদের পক্ষেই ভাবা সম্ভব ছিল।


একটা সময়ে ভারতবর্ষে ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-ধারণার যুগ। গ্রামীণ সমাজের বাইরে মানুষকে জীবিকার জন্য তেমন কোথাও যেতে হতো না। জীবন ধারণের প্রায় সকলবস্তু সেখানেই উৎপাদিত হতো। যে বস্তুসমূহ তারা উৎপাদন করতে পারত না, তার অধিকাংশ আশেপাশের গ্রামের সমবায়ী হাটের মাধ্যমে অনেকটা বিনিময় প্রথার মাধ্যমে সম্পন্ন করতেন। রাজা বা জমিদারের খাজনা মিটিয়ে দিলে তাদের আর কোনো ঝামেলা থাকত না। সমস্ত গ্রামও প্রায় একটি পারিবারিক ব্যবস্থার মতো ছিল। সেই সঙ্গে ছিল তাদের সামাজিক শ্রমের অভিজ্ঞতা; এবং ছিল একটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ; যারা বিবাদ মীমাংসায় মধ্যস্থতা করতে পারতেন। আসলে এই গ্রাম-ব্যবস্থাই ছিল একটি ক্ষুদ্র প্রজাতন্ত্র। এমনকি এসব গ্রামগুলোতে ছিল একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রত্যেকে পারিবারিকভাবে ছিল আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। মেয়েরাও এ ব্যাপারে পিছিয়ে থাকতেন না; বাইরে থেকে আসা ছোটখাটো আক্রমণ তারা ঠেকিয়ে দিতে পারতেন। এ ধরনের রাষ্ট্রের একটা সুবিধা থাকে, নিচ থেকেই তা টেকসই রূপ নিয়ে বেড়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা থেকে তাকে খুব বেশি সহায়তা দিতে হয় না। এর পরবর্তী পদক্ষেপগুলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে, যা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকে। কিন্তু এই পদ্ধতির সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা ও রাজনীতি জড়িত থাকার ফলে স্থানীয় লোকজন সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন না; যারা এই সব কাজে দক্ষ ছিলেন তারা কেন্দ্রীয় ইচ্ছার কাছে পরাস্ত হয়ে পড়েন। সম্পূর্ণ গ্রামধারণার যুগে ধর্ম ও বর্ণের নামে সংঘাত হওয়ার সুযোগ কম ছিল, কারণ প্রত্যেকেই পেশা দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল; রাত পোহালেই মাছের জন্য জেলের কাছে, তৈজসপত্রের জন্য কুমারের কাছে, অস্ত্রের জন্য কামারের কাছে ছুটতে হতো; তবে এর দ্বারা এই সব পেশার প্রান্তিক অবস্থার পরিবর্তনের কোনো সুযোগ ছিল না।

সে যাই হোক, আমি যে নাপিত পরিবারের কথা বলতে ছিলাম, তারা আশির দশকের শুরুর দিকে তাদের বংশপরম্পরায় বাস্তুভিটা ত্যাগ করে গোপালগঞ্জ জেলার কোনো একটা উপজেলা সদরে নতুন করে আবাস গড়ে তোলেন। বর্তমান সময়ে এসে এই প্রশ্নটি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে, কেন তারা তাদের পূর্বপুরুষের আবাস ছেড়ে একটি অচেনা আজানা পরিবেশে নিজেদের নিয়ে গেলেন। অভিবাসন মানুষের একটি সাধারণ প্রক্রিয়া, মানুষ আদিকাল থেকে অভিবাসনের মাধ্যমে নিজের জীবনযাপনকে অধিকতর নিরাপদ ও সহজ করতে চেয়েছে। তবু মানুষ পরিণামে একটি শিকড়বিহীন বৃক্ষ—যেখানেই সে যাক না কেন, ঘুরে ঘুরে সে তার জন্মস্থানের কাছে, তার ডাইলেক্টেসের কাছে, তার শৈশবে বেড়ে ওঠা মানুষজনের কাছে ফিরে আসতে চেয়েছে। আমি এই লেখাটা শুরু করেছিলাম এই জন্য যে, সেই অভিবাসী হিন্দু পরিবারটির বর্তমানের প্রবীণ সদস্য, যার বয়স এখন আশি বছর অতিক্রম করছে, সেই গিরেন্দ্রনাথ, তিরিশ বছরের ব্যবধানে জীবনের শেষপর্বে এসে প্রায়ই তার ফেলে যাওয়া গ্রামে বেড়াতে আসেন; এবং তার পরিত্যক্ত ভিটের কাছে বসে থাকেন; এবং পরিচিতদের সঙ্গে বসে দুটি কথা বলতে খুবই আকুলতা পোষণ করেন। এ ধরনের মনস্তত্ত্ব কোনো নতুন নয়; এটা রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’র উপেন হোক, আর ইহুদিদের প্রতিশ্রুত ভূমি হোক—সকল কিছুর জন্য প্রায় একই ধরনের চেতনা কাজ করে থাকে। কিন্তু গিরেন কী জন্য তার ভিটে ছেড়ে গিয়েছিলেন, তার উত্তরে যা জানা যায়, তা হলো নিরাপত্তহীনতা, অপরিচয়ের ভয় এবং পেশা হারানো—একই সঙ্গে তার জন্য ঘটে গিয়েছিল।

সাতচল্লিশের বিভাজনের পরে পাকিস্তান হয়েছিল বা হয় নি তারা বুঝতে পারেন নি। যদিও অনেকেই তখন এলাকা ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু যারা ছিলেন তারা প্রতিবেশীদের সঙ্গে আত্মীয়তা ও কর্মের বন্ধনে থেকে গিয়েছিলেন; এবং নিজের আঙিনাতে একটি শালগ্রাম প্রতিষ্ঠা করে পূজামণ্ডপেরও ব্যবস্থা করেছিলেন। ঘরের বউ-ঝিরা পূজামণ্ডপ ও তুলসি তলায় জল ছিটিয়ে নিজেদের প্রেতলোকের কাজটি সমাধা করতে পারতেন। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই একটি বড় পরিবর্তন তারা লক্ষ করলেন। প্রথমত যে পাকিস্তান হিন্দু-সম্পত্তিকে শত্রুতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, তারা যাওয়ার পরে যেন এই চেতনা স্বাধীন দেশের মানুষের মধ্যে নতুন করে দেখা দিল; তারা যে হিন্দু, তারা যে আলাদা তা গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন। আর এটি প্রবল হয়ে উঠল তখন, যখন ওই গ্রামের হাটের ওপর একটি আধুনিক মানের সেলুন ঘর গড়ে উঠল। তখন অনেকেই বলতে শুরু করল হিন্দুর কাছে চুল-দাড়ি কাটলে নাপাকি যায় না, অনেকেই এককাঠি এগিয়ে গিয়ে বলল, পবিত্র দাড়ি-মোবারকে হিন্দুর ছোঁয়া লাগলে নামাজ হবে না। আর এই সব প্রচারণার সঙ্গে নব-প্রতিষ্ঠিত সেলুনের খরিদ্দারের সংখ্যা বাড়তে শুরু করল। এমনকি এতদিন যারা এবং যাদের বাপদাদারা গিরেনের বাপ তুষ্ট নাপিতের কাছে বংশ পরম্পরায় চুলদাড়ি কেটে আসছিলেন তারাও প্রকাশ্যে আসতে সাহস হারিয়ে ফেললেন। অজানা কারণেই দেখা গেল গ্রামের বয়স্কদের সঙ্গে যে সম্পর্কে তারা আবদ্ধ ছিলেন নতুন প্রজন্ম কেন যেন তাদের কাছে এবং তাদের সন্তানদের কাছে অপরিচয়ের হয়ে উঠলেন। যদিও এ গ্রামে আগে থেকে মুসলমানদের মধ্যেও, বিশেষ করে নানা মাজহাব এবং আমিন জোরে বলা, কিংবা দোয়াললিন অথবা জোয়াললিন বলাকে কেন্দ্র করে দু’একবার খুনাখুনি পর্যন্ত গড়িয়েছে; কিন্তু হিন্দু ও মুসলমান—এ ধরনের ধর্মীয় বিভাজনে তাদের মধ্যে কোনো কোন্দল কখনো হয় নি।

তাছাড়া এই পরিবারটির পাশের বাড়ি, যারা ছিল সুখ-দুঃখের সাথি, তাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কেমন যেন একটি অসহিষ্ণুভাব এবং যখন-তখন বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে মেয়ে-বউদের অপ্রস্তুত করে তোলার প্রবণতাও বেড়ে গেল। তখন আর এ গ্রামে থাকা তারা নিরাপদ মনে করেন নি। আসলে প্রতিবেশীর ছেলেদের জন্য যখন নতুন করে ঘর ও বাড়ি তৈরির প্রশ্ন দেখা দিল, তখনই এই হিন্দু পরিবারের জমিটি তাদের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ল। এ ক্ষেত্রে ধর্ম তাদের কিছুটা সহায়তা করল বই কি! কিন্তু এই পরিবারটির এমন কোনো অবস্থা ছিল না, চাইলেই পাশ্ববর্তী হিন্দু রাষ্ট্রে গমন করে ধর্মের দ্বারা আত্তীকৃত হতে পারেন। যাদের এ ধরনের সুবিধা ছিল না আশির দশকের শেষাবধি তারা শহরে, কিংবা যে সব এলাকায় হিন্দু-বসতি অপেক্ষাকৃত ঘনবদ্ধ সেইসব স্থানে অভিবাসন করেছেন। তবে সাতচল্লিশের পর থেকে যে একটি বড় অংশ ভারত গমন করেছেন তাতে সন্দেহ নাই; আর এটি এই জন্যই সম্ভব হয়েছে যে, তিন দিক বেষ্টনকারী ভারত একটি বৃহত্তর দেশ, যেখানে ধর্মের বাহ্যিক সহানুভূতির সঙ্গে স্থানের সুপ্রতুলতাও রয়েছে। শতকোটি নাগরিকের দেশে এক বা দুকোটি লোককে আত্মীকরণ করা খুব একটা শক্ত কিছু নয় বলেই আপাতভাবে মনে করা যায়, যদিও বাস্তবতা হয়তো তা নয়। সম্প্রতি মদিজি এইসব হিন্দু জনগোষ্ঠীকে নিজেদের মূলধারায় মিশে যেতে অনুমতি দিয়েছেন। বাঙালি মুসলমান সেই সুবিধা পাবে না; যদিও তাদের পিতা না হলেও পিতামহদের একই দেশ ছিল ইংরেজ বাহাদুরের অধীনে, কিংবা পরাক্রান্ত মোগলের সাম্রাজ্যে। এই যে বিভাজনটা যে হয়ে গেল গত শতকের সাতচল্লিশে তার দায়-দায়িত্ব এখন কাদের ওপর বর্তাবে? দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে যদিও দেশ বিভাজন হয়েছিল, তবু এই বিভাজন তো কেবল বাড়ির পুবদুয়ার বরাবর বেড়া তুলে দিলেই সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল না। এর জন্য এমন কি তাড়া ছিল যে, যেদিকে শতকরা একান্ন জন মুসলমান সেদিকে মুসলমান রাষ্ট্র আর যেদিকে একান্নজন হিন্দু সেদিকে হিন্দু রাষ্ট্র; তাহলে উনপঞ্চাশ জন মুসলামনকে কি বলির উপযুক্ত হয়ে তৈরি হতে হয়েছে? এই ধর্মীয় গণতন্ত্রায়নের নির্মম উদাহরণ আর ইতিহাসে হতে পারে না। মুসলমান নেতাদের পক্ষে দেশবিভাজন যে একটি জাতীয় আত্মহত্যার শামিল, তা কেবল অর্বাচীনদের পক্ষেই ভাবা সম্ভব ছিল। এক ভারতের পক্ষেই মুসলমানদের আর্গুমেন্ট যথাযথ ন্যায়সম্মত ও আদর্শিক হতে পারত। কিছু বিবেচনা কিছু উপবিবেচনা সামনে রাখলেই তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার হওয়ার কথা ছিল। যে মুসলমানরা একটানা প্রায় আটশ বছর ভারত উপমহাদেশ শাসন করলেন; এবং তাদের হাত থেকেই ইংরেজ ক্ষমতা নিলেন; অথচ ইংরেজ চলে যাওয়ার প্রাক্কালে কিভাবে তারা একটি খণ্ডিত ভারতের ক্ষুদ্রাংশ নিয়ে তার জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হলেন, তারা যা পেয়েছে তা যথেষ্ট এবং এতটুকু না পেলে পুরোটাই হাতছাড়া হয়ে যেত। মুসলমানরা তো সবকালেই এ দেশে সংখ্যালঘুই ছিল, তাই বলে শাসনতন্ত্রের ক্ষেত্রে তো তাদের ধারাবাহিকতার ইতর-বিশেষ হয় নি; এবং ইতিহাস তো এটিই বলে সংখ্যালঘুরাই মূলত দুনিয়াটাকে শাসন করে থাকেন। সুতরাং সংখ্যার ওপরে শাসনতন্ত্র নির্ভর করে না।


এই অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ও গোত্রের সঙ্গে একত্রে বসবাসের এক গভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন; তার জন্য আলাদাভাবে তাদের ধর্মনিরপেক্ষ বা সেকুলার হওয়ার দরকার হয় নি।


তাছাড়া যে বিপুল সংখ্যক মুসলিম জনগণ, তাদের দৃষ্টিতে যারা ছিল শত্রু সেই হিন্দুদের জিম্মাদারিতে রেখে গেলেন, তারা কিভাবে মুসলিম-হিতৈষী হতে পারেন? কিন্তু দেখা যাচ্ছে এসবের কিছুই হয় নি। হিন্দু রাষ্ট্র বলে যেটি হিন্দুস্থান হলো আর মুসলিম রাষ্ট্র বলে যেটি পাকিস্তান হলো, তাদের উপরিতলের প্রচারণা ভিন্ন রাষ্ট্রীয় চরিত্রের কোনো পার্থক্য থাকল না; হিন্দু বা মুসলিম হওয়ার জন্য তাদের পূর্বের চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হলো না। দুটি রাষ্ট্রই মূলত তাদের ধর্ম-নিরপেক্ষ চরিত্র বজায় বা সমুন্নত রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করল, সেটি নেহেরু কিংবা জিন্নাহ দুজনের কর্ম এবং বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে যথাযথভাবে ধরা পড়বে। সুতরাং এই যে বিভাজন তা মূলত একটি জনহিতকর চেতনা থেকে সাধিত না হয়ে, নেতৃত্বের খায়েস থেকে সংঘটিত হয়েছিল বলে মনে করা যায়। কিন্তু ক্ষতি যা হলো তা হলো এই হিন্দু এবং মুসলমানদের জন্য অন্তত নৈতিকভাবে দুটি দেশ আলাদা হয়ে গেল; এবং সর্বদাই তাদের জনগণের কাছে একটি নতুন প্রকল্প তুলে ধরতে হলো, রাষ্ট্রীয়ভাবে সেটি কসরত করতে হলো, আর তার নাম দেয়া হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। এই ধর্মনিরপেক্ষতা একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে যথেষ্ট মূল্যবান এবং ধারাল অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হলো। অথচ এই পরিভাষার বাইরেই এই অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ও গোত্রের সঙ্গে একত্রে বসবাসের এক গভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন; তার জন্য আলাদাভাবে তাদের ধর্মনিরপেক্ষ বা সেকুলার হওয়ার দরকার হয় নি। তারা তাদের নিজেদের মানুষের সঙ্গে বসবাসের দ্বারা এই অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন, যেভাবে মানুষ বিভিন্ন পরিবারে বিভক্ত হয়ে, একই সমাজে বসবাস করে, অথচ তাদের মধ্যে কতই না পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এই প্রশ্নটি আমাকে গভীরভাবে ভাবিত করে, সত্যিই কি বিভাজন-প্রকল্প মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য চালিত ছিল; নাকি নেতৃত্বের বলি-খেলার অংশ হিসাবে, আর ইংরেজ প্রভুদের দূরদৃষ্টিতায় সম্পন্ন হয়েছিল? ধরে নেয়া গেল, সাতচল্লিশে অবিভক্ত ভারত স্বাধীন হয়েছে আওরঙ্গজেবের বিজিত সাম্রাজ্যসহ; তাহলে ভারত রাজ্য হিসাবে আর মুসলমানরা জাতি হিসাবে কোথায় দাঁড়াত? পৃথিবীর প্রায় অর্থেক মুসলমান তখন এই একটি মাত্র দেশে বাস করতেন; এবং শক্তিশালী ভারতের অবস্থানের কারণে আজ সারাবিশ্বের মুসলমান যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের শিকার হচ্ছে, তা নাও হতে পারত; কিংবা সর্বদা একটি দরকষাকষির অবস্থানে থাকতেন।

আর যে কল্পিত হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কথা বলা হয়, তা ঐতিহাসিকভাবে ধোপে টেকে না। কারণ হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা বলা হয়, তা কেবল বিভাগোত্তর বিভাজনের দাবির কারণে সংঘটিত হয়েছে। এই সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির মাধ্যমেই জিন্নাহ ও গান্ধী দু’টি রাষ্ট্রের বৈধতা প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। অথচ এই বিভাজনের ফলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে প্রায় গোটা তিনেক বড় ধরনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, অসংখ্য লোকক্ষয় হয়েছে, সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে; প্রচুর সেনা মোতায়েন রাখা হচ্ছে; প্রতি বছর দেশগুলোর বাজাটে বিশাল অঙ্কের সামরিক ব্যয় রাখা হচ্ছে; এবং সাধারণ মানুষের নিরুদ্বিগ্ন উন্নয়নের পরিবর্তনে অনিশ্চিত শঙ্কায় জীবনপাত হচ্ছে। ফলাফল দাঁড়াচ্ছে, সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সংঘাত এড়ানোর জন্য এই বিভাজনের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল বলে মনে করা হয়, তার লাভের আশায় গুড়েবালি। তবে এটি ভাবার কারণ নাই যে, ঔপনিবেশিক আমলে দুটি জাতি বিভাজিত হওয়ার যুক্তিসংগত কোনো কারণ ছিল না; এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য, মুসলিম ও ইংরেজ শাসনামলে হিন্দু মুৎসুদ্দি শ্রেণিকে ঠিক একই কাজ করতে হয়েছিল, যার একটি হলো শাসন সহযোগী করণিকতা; যার জন্য অফিস আদালতে কাজ করার উপযোগী একাডেমিক শিক্ষায় তারা এগিয়ে ছিলেন, সে ফারসি হোক বা ইংরেজি হোক তাদের জন্য কোনো ইতর-বিশেষ হয় নি। ইংরেজের শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে মুসলমানদেরও ঠিক একই প্রতিযোগিতায় নেমে আসতে হলো। কিন্তু শিক্ষা ও দক্ষতার অভাবে প্রতিযোগিতায় এঁটে ওঠা সহজ ছিল না। আর এরই ফলাফল বাংলাভাগে কার্জনের যৌক্তিক অবস্থান; বঞ্চিত মুসলমানদের এই সাময়িক প্রাপ্তিকে ছোট করে দেখার সঙ্গেও ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করা হয়। কিন্তু একটি দেশের অধীনে প্রশাসনিক বিভাজন আর চূড়ান্ত পর্বে দেশ হিসাবে আলাদা অস্তিত্বে আসা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। আমরা কি এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, ইংরেজের বিভাজনের শাসননীতি কেবল তাৎক্ষণিক উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্যই প্রবর্তিত ছিল না; আখেরে তাদের গতায়নের পরেও যাতে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রসত্তার জন্ম দ্বারা বৃহত্তর জাতীয়তাবাদের শক্তি খর্ব হয়, এ পরিকল্পনাও অমূলক নয়। বাংলা বিভাজনের সেই শুরুতেই, প্রায় একশ বছর আগে এর পক্ষচ্ছেদনের কর্মটি সম্পন্ন হয়েছিল। যে সুবে বাংলা মুসলমানরা শাসন করত, সেই মুসলমানরাই কিছু অংশের সংখ্যাধিক্যের দাবিতে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দাবি ছেড়ে দিয়ে কেবল কর্তিত বাংলার অধিকার নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন। পরিণামে বাংলা মায়ের যে পক্ষচ্ছেদন হয়, তাতে চিরদিনের জন্য দুপায়ে হাঁটার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে; এবং মূলবাংলা থেকে উপবাংলার উড়িষ্যা, বিহার, আসাম, ছত্রিশগড়, চণ্ডিগড়, ছোটনাগপুর ও ত্রিপুরা চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বাংলার এই সবগুলো অঞ্চল একত্রে থাকলে চিনের মান্দারিন ছাড়া আর কোনো বৃহত্তর জাতি বাঙালিদের সমান হতো না; সুতরাং শুরু থেকেই বাঙালিদের যৌক্তিকতা এটিই হতে পারত যে, দেশ যদি স্বাধীন হতেই হয়, তাহলে এই বিশাল বাংলা নিয়েই তার আয়োজন হতে হবে। হয়তো বিভাজনের এই সময়কালে বাঙালিরা এই জাতের কোনো নেতা পয়দা করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যিনি তাদের জন্য দীর্ঘকালের ফলদবৃক্ষ রোপণ করতে পারবেন। সেটি হিন্দু ও মুলমান উভয় বাঙালির জন্যই সত্য; যদিও কার্জনের বাংলাভাগকে উচ্চমধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালিরা যেভাবে রুখে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন, অথচ যখন চূড়ান্তভাবে দেশবিভাগ হলো তখন সেই শ্রেণির হিন্দুরাই বাংলা মায়ের পক্ষচ্ছেদনের পক্ষে দাঁড়ালেন; এর মধ্যে যে তাৎক্ষণিক একটি শ্রেণিস্বার্থই প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছিল। অথচ ইতিহাসে এই বাংলা একটি স্বাধীন ও বিদ্রোহী সত্তা নিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে টিকে ছিল; শশাঙ্ক, সেন ও পাল আমলে তার যেমন গুরুত্ব ছিল, তেমনি স্বাধীন সুলতানি আমল ও বার ভূঁইয়াদের আমলেও বাংলার নিজস্বতা খর্ব হয় নি। বাংলা একই সঙ্গে স্বর্গ ও নরক বলে বিবেচিত হয়েছে। যেসব বিদেশি পর্যটক এদেশে বেড়াতে এসেছেন তারা দেখেছেন, একটি দেশ অফুরন্ত খাদ্যের ভাণ্ডার, মাছ-মাংস ফল মূল সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে, এসব সংগ্রহের জন্য অর্থের দরকার হয় না। আবার দিল্লি থেকে যারা শাসন করতে এসেছেন, গরম ও আর্দ্রভাবাপন্ন একটি দেশ, যাতায়াত ব্যবস্থা সর্বত্র নদীনালা দ্বারা বিভক্ত, ঘোড়া ছুটিয়ে খুব একটা যাওয়ার সুবিধা পাওয়া যায় না। তবু যারা একবার এসে পড়েছেন, তারা এই দেশটিকে ভালোবেসে ফেলেছেন, এই কুহুকিনীকে ছেড়ে তারা আর কোথাও যেতে চান নি। সুলতানি আমলের তুঘরিল-বোগরা খা, মোগল আমলের শাহ সুজা থেকে অনেকেই এই তালিকায় রয়েছেন। এর ফলে বাংলা একটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতির জনগোষ্ঠী উপহার দিতে পেরেছিল, যা অন্য কোনো অঞ্চলের মুসলমান কিংবা হিন্দু কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় জাতপাত সম্প্রদায়ের বাইরে একটা নতুন ধরনের দর্শন ও ধর্ম চেতনার অংশ হিসাবেই তার বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু ইংরেজ শাসনের অভিঘাতে বাঙালির হয়ে ওঠার চেতনপ্রক্রিয়ায় প্রথম বাধাগ্রস্ততা তৈরি হয়; প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের চিন্তার বিনিময় তাকে ধর্মীয় আত্তীকরণের জায়গা থেকে সরিয়ে আনতে শুরু করল; ব্যক্তিগত ধর্মবোধের চেতনার বাইরে রাজনৈতিক ধর্মচেতনার উদ্ভব হলো; রাজার মানুষদের মধ্যেও এর একটি সযত্ন প্রয়োগ দেখা যেতে শুরু করল।


পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক চেতনার সীমাবদ্ধতাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে একটি উদারনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। 


অবশ্য ভারতীয় রাষ্ট্রচেতনার মধ্যেও ধর্ম অনুপস্থিত ছিল না। অশোক থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত সকলেই তা ব্যবহার করেছেন। আকবর ধর্মের একটা সেকুলার রূপ দিতে চেষ্টা করেছিলেন; যদিও তার প্রয়োগের মধ্যে নতুন একটি ধর্মীয় আবহ তৈরি করা হয়েছিল, বলা হয়েছিল রাজার ধর্ম দীন-ইলাহি, যেসব বিষয় মুসলমান বা হিন্দুর কাছে পরস্পরবিরোধী তিনি তার একটা সমন্বয় দ্বারা হিন্দু প্রজাগণকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন, ধর্মের কারণে অন্তত কেউ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হবে না। হিন্দু বেগমদের জন্য ঠিকঠাক মতো পূজাগৃহগুলো সংরক্ষিত হয়েছিল; এমনকি তাদের গর্ভে ভবিষ্যতের মোগল রাজাদের জন্মও হয়েছিল। যদিও আকবরের ভারত-শাসননীতিতে ধর্মের ব্যবহার ঘটেছিল; তবু বলা চলে এটিই হয়তো ইউরোপীয় চেতনার আগের সেকুলার রাষ্ট্রভাবনার প্রকাশ। কিন্তু এই চেতনা স্থায়ী না হওয়ার কারণ, জনগণের সঙ্গে এই চিন্তার কোনো বোঝাপড়া সম্পন্ন হয় নি; যেটি ইউরোপের আলোকায়ন কিংবা ফরাসি বিপ্লবের ফলে জনসম্পৃক্তির মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল। ইউরোপে ব্লাসফেমির মতো আইন অব্যাহত থাকার পরেও তারা রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে পেরেছিল। ধর্ম প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত বিষয় হিসাবে পরিগণিত হয়েছিল; রাষ্ট্র নাগরিকদের ভালোমন্দের ক্ষেত্রে ধর্মীয় কোনো ব্যবস্থাপত্র সামনে আনবে না। অবশ্য এর আগে এমন সব বিষয়ের তারা ফয়সালা করতে পেরেছিল, তা হলো এমন—বাইবেলের বাইরেও অভ্যন্তরীণ এবং দেশের বাইরে রফতানিযোগ্য বুদ্ধি ও যুক্তিভিত্তিক চিন্তাশীল উপাদান; যেমন পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে, কিংবা মানুষ বিবর্তনের ফল;—সাধারণ মানুষের কাছে যদিও এই সত্য প্রায় ধর্মের মেটাফরের মতো, কারণ কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি ছাড়াই সেগুলো তাদের মেনে নিতে হয়; এবং এমন সব বিষয় যা এখনো মীমাংসিত হয় নি, সত্যিই মানুষ বানর জাতীয় প্রাণী থেকে উদ্ভূত নাকি স্বর্গ থেকে নেমে আসা এক পুরুষ ও নারীর গর্ভ থেকে তারা ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীময়। এর সঙ্গে যদিও দুনিয়ায় বেঁচে থাকা জীবনের কিছু এসে যায় না, তবু যখন পৃথিবীর জীবনের কর্মের ওপর মৃত্যু-উত্তর অনন্ত জীবনের ভালো থাকা নির্ভর করে, তখন তো আর অনেকেই অল্প-দামে মরজীবনকে বিক্রি করতে চাইবে না; যেহেতু ধর্মে নির্দেশ আছে, কী ধরনের কর্ম-সম্পাদন করলে তারা কী ধরনের একটি অনন্ত আনন্দময় জীবন যাপন করতে পারবেন। যদিও ধর্মের অনেকগুলো অনুশীলন ব্যক্তিগতভাবে সম্পাদন করা যায়, আবার অনেকগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে; বিশেষ করে বর্তমান সময়ে এসে কেবল মুসলিম দুনিয়ায় নয়, খ্রিস্টান দুনিয়াতেও গর্ভপাত, সমলিঙ্গের বিয়েসহ নানা ব্যক্তিগত অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে; এর বাইরে মুসলিম দুনিয়ায় আছে ব্যাংকিং ও সুদব্যবস্থা, মেয়েদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও মেয়েদের ড্রেসকোড নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক—এসবও রাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে হয়। সুতরাং ধর্ম নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্র একটি জটিল সম্পর্কের দ্বারা আবদ্ধ।

ভারত উপমহাদেশ যদিও ধর্মের দ্বারা বিভাজিত হয়েছিল; কিন্তু অচিরেই ধর্মনিরপেক্ষ একটি চরিত্র ধারণের চেষ্টা করে আসছিল। ভারতের ক্ষেত্রে তো ছিলই, নেহেরুর অব্যাহত প্রচেষ্টার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সারবস্তু অন্তত চিন্তা ও প্রচারে ছিল। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে না হলেও পাকিস্তানের প্রথম আইন বিষয়ক মন্ত্রী যোগেন মণ্ডলসহ দলিত নেতাদের পাকিস্তান সমর্থনের মধ্যে এই সত্য প্রমাণ করে, বাইরে ধর্ম-নিরপেক্ষ মোড়ক না থাকলেও রাষ্ট্রের মূলচরিত্র ধর্ম-নিরপেক্ষ। কিন্তু পরিণামে এই যুক্তি দেয়া খুব কঠিন যে, পাকিস্তান ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ছিল; আর এ প্রমাণ করতে চাওয়া উদ্ভটও বটে। কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষতার বাইরে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এই দাবি জোরেসোরে ছিল যে, এতে নিম্নশ্রেণির হিন্দুরাও সুবিধা পাবে। কিন্তু পরিণামে কেবল হিন্দু নয়, বাঙালি মুসলমানরাও বঞ্চনার শিকার হন। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক চেতনার সীমাবদ্ধতাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে একটি উদারনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। নবগঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান যে চারটি মূলনীতির ওপর নির্মিত হয়েছিল তার অন্যতম ছিল ধর্ম-নিরপেক্ষতা। রাষ্ট্রীয় ধর্ম-নিরপেক্ষ নীতি আর প্রকৃতপক্ষে ধর্ম-নিরপেক্ষতার চর্চা এক নয়, কিংবা সম্ভব নয়, তা কিছুদিনের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রথমত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মমতের প্রতি প্রশ্রয় প্রদর্শন ছাড়া ভোট কেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; ফলে অপর একটি আদর্শ দ্বারা নিগৃহীত না হওয়া পর্যন্ত চলমান মূল্যবোধের সবটার সঙ্গেই কৌশলগত সম্পর্ক শাসককুলকে রেখে চলতে হয়। সুতরাং সংবিধান ধর্ম নিরপেক্ষ হওয়া সত্ত্বেও, এই মতের দাবিদার দলটিকেও এই ভেবে জনগণের সমীহ আদায় করতে হয় যে, তারা ইসলামের জন্য কতখানি করেছেন, কিংবা ইসলামি দেশগুলোর সঙ্গে কতখানি সম্পর্ক রক্ষা করে চলছেন। এসবই জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি অকুণ্ঠ সম্মানবোধ, যদিও এসবই বহিঃসম্পর্কের ব্যাপার। রোমান কনসটান্টিপোল ধর্ম না মেনেও রাষ্ট্রীয়ভাবে খ্রিস্টান ধর্মের স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে মূলত জনগণের ইচ্ছের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দ্বারা জনগণের ইচ্ছের দ্বারা রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার সম্মতি আদায় করে থাকেন।

ফলে বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি জোর দেয়া হলেও পাকিস্তান আমলের অ-ধর্মনিরপেক্ষতার চেয়ে আলাদাভাবে ক্রিয়া করে নি। বরং ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাছে প্রতিপক্ষ হিসাবে হাজির হয়েছে, কেবল আলাদাভাবে স্বীকৃতি থাকার কারণে। এতদিন হিন্দু-মুসলমান দুটি আলাদা জাতি হিসাবে স্বীকৃত থাকলেও ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মীয় পক্ষ বলে আলাদা কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল না। অথচ সেই অস্তিত্বই বড় হয়ে বিশাল ধর্মীয় পক্ষ হিসাবে রূপ লাভ করে; এবং স্বাধীনতার স্থপতি সপরিবারে নিহত হওয়ার পরে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে অকার্যকর তবু শোভন ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটিরও অবসান ঘটানো হয়; এবং এটি করে জাতীয় সিম্বলের মতো ইসলামকে জাতীয় ধর্মের স্বীকৃত দেয়া হয়। এটি যদিও এমন কিছু নয়, একটি দোয়েল পাখিকে জাতীয় পাখি করার অর্থ এই নয় যে আর কোনো পাখির অস্তিত্ব দেশে নাই, কিংবা তাদের গুরুত্ব কম রয়েছে। তারপর শুক্রবারে সাপ্তাহিক ছুটি, যা ইসলামি পাকিস্তানে দরকার হয় নি; ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর অবাধ রাজনীতি করবার সুযোগ, এসবই সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন তলিয়ে দেখা হয়নি যে, আধুনিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থার সঙ্গে ধর্মীয় রাজনীতির কোনো সুযোগ আছে কিনা? এ দেশে সেকুলার হওয়ার পেছনে প্রধানত হিন্দু ও মুসলিম দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি অবৈরিতাপূর্ণ বসবাসের রাষ্ট্রীয় মনোবৃত্তি বোঝানো হলেও সংবিধানের আওতায় কোনো হিন্দু ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায় না, যেমনটি জামায়াতে ইসলামি কিংবা অপরাপর মুসলিম দলের অস্তিত্ব রয়েছে। তাহলে এই প্রণোদনার পেছনে যে একটি ভোটের রাজনীতি রয়েছে এ কথা অস্বীকার করা যায় না। কারণ, এদেশে হিন্দুধর্মের কোনো রাজনৈতিক দল রাস্তায় নামলে যে ভোটের রাজনীতিতে অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবে, সেই বুদ্ধিটুকু তাদের ঘটে আছে। কিন্তু মুসলিম নামে দল গঠন করলে প্রাথমিকভাবে যেমন সকল মুসলমানকে দলভুক্ত ভেবে আনন্দ পাওয়া যায়, তেমনি আখেরে সম্ভবনাকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। অথচ ভারতে ঠিকই হিন্দু মৌলবাদী দলগুলো ক্ষমতার স্বাদ নিতে শুরু করেছে। এমনকি ভারতে কোনো হিন্দুধর্মীয় গোষ্ঠী ক্ষমতায় থাকলে এ দেশের ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো সন্তোষ প্রকাশ করে থাকেন; এবং ইদানীং প্রায়ই লক্ষ করা যায়, দুটি ধর্মের বিশ্বাসগত চরম বৈরিতা সত্ত্বেও তারা ধর্মনিরপেক্ষ কিংবা ধর্মহীন রাজনীতির চেয়ে শ্রেয় মনে করেন। এমনকি কেউ কারো অখণ্ডতাকে আঘাত করতে চায় না। অথচ নিয়ম অনুসারে ইসলামি দলগুলোর প্রধানত কাজ করার কথা ছিল অমুসলিমদের মাঝে, তাদের হেদায়েত করার মাধ্যমে খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের পথ প্রশস্ত হওয়ার কথা। কিন্তু মুসলিম দলগুলো কেবল মুসলমানদের মধ্যে কিংবা দলগুলোর মধ্যে নিজেদের সঙ্গে ফারাক তৈরির মাধ্যমে একটি আদর্শগত বৈরিতা তৈরি করছে। তাহলে দুটি দেশেই ধর্মীয় রাজনীতির সমান্তরালে যে বস্তুটি আসছে তা হলো, গণতন্ত্র ও সংখ্যাগুরুর সমর্থন লাভ। ধর্মীয় দল কিংবা ধর্ম আখেরে কোনো কাজে আসছে না, হয়তো তা বাইরে বা চেতনায় থেকে যাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে ভারত একটি ভিন্ন ধর্মসহিষ্ণু রাষ্ট্র হলেও আধুনিক সেকুলার রাষ্ট্র ধারণার আমলে তা রীতিমতো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; এমনকি ধর্মীয় উগ্রপন্থার জন্ম হচ্ছে, এটি যে ভালো তার পক্ষে মতামত গঠন হচ্ছে, এবং জনগণের সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হচ্ছে। অথচ এই ভারতের রয়েছে হিন্দু ও মুসলিম দুটি বিপরীত মেরুর বাসিন্দাদের অন্তত এক হাজার বছরের বসবাসের অভিজ্ঞতা। দুটি ধর্মের মৌলিক শিক্ষার মধ্যে তীব্র বিরোধ থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তারা এতদিন ভালোভাবে বসবাস করে এলেও, সাম্প্রতিক ধর্মনিরপেক্ষতার যুগে এমন সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে যা আগে কখনো হতে হয় নি। যদিও তাদের জানা থাকা উচিত—এই দুটি সম্প্রদায় চূড়ান্তভাবে কেউ কাউকে ধ্বংস করতে পারবে না; এমনকি তাদের বৈশিষ্ট্যেরও মৌলিক কোনো পরিবর্তন হবে না। বরং তারা এই সত্যটি উপলব্ধির মাধ্যমে ভারতীয় সমাজকে আরো এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।


সকল নবীন ধর্ম হয়তো তার অস্তিত্বের সংকটে কিংবা অস্তিত্বশীল ধর্মগুলোর গোঁড়ামির বিরুদ্ধে একটি উদার চেতনা থেকে কাজ করেছিল।


মুসলিম ও হিন্দু ধর্মের ঘাত-প্রতিঘাতের ফলে একদা ভারতীয় সমাজ লাভবান হয়েছে, তার চিন্তা, জ্ঞান ও সভ্যতা বিকাশের ক্ষেত্রে; এবং দুটি ধর্মই তার কৌলীন্য হারিয়ে একটি নতুন ধরনের চিন্তামতের জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় বহু-ঈশ্বরবাদ মোকাবেলায় মুসলমানরা যেমন তাদের নির্ভেজাল একেশ্বরবাদ ছেড়ে পীর-সুফি-সাধু-সন্তুসহ নানা মধ্যস্বত্বভোগীর প্রতি নির্ভরশীল হয়েছে, তেমনি হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানদের বিশ্বাসের অনুরূপ শিখ বৈষ্ণব ব্রাহ্ম ধর্মের প্রবর্তন হয়েছে। সুফি-বাউল চিন্তার পাশাপাশি কবীর, নানক, দাদু, রামানন্দ বহুসমন্বয়বাদী সাধকের জন্ম হয়েছে; যাদের চিন্তা মূলত মধ্যযুগে ভারতীয় সমাজের সেকুলার ধর্মমত হিসাবে কাজ করেছিল। শুরুতে শিখ ধর্মের গুরুগৃহ সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, এখনো আছে, কিন্তু শিখ আলাদা একটি পরিশুদ্ধ ধর্মে পরিণত হয়েছে। ঈশ্বরসেবক হওয়ার জন্য কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের দরকার হয় না। অবশ্য সকল ধর্মের শুরুতে একটি উদার সর্বধর্মীয় বিষয় কাজ করে। ইসলামের আদিযুগে তা লক্ষ করা যায়, ইসলাম শুরুতে তার পূর্ববর্তী সকল ধর্মের স্বীকৃতি যেমন রয়েছে, তেমন মসজিদেও খ্রিস্টান পাদ্রিদের উপাসনায় আপত্তি ছিল না। সকল নবীন ধর্ম হয়তো তার অস্তিত্বের সংকটে কিংবা অস্তিত্বশীল ধর্মগুলোর গোঁড়ামির বিরুদ্ধে একটি উদার চেতনা থেকে কাজ করেছিল। কিন্তু কালক্রমে সেইসব ধর্মের অনুসারীরা সেই চেতনা থেকে নিজেদের সরিয়ে এনে ধর্মীয় পরিশুদ্ধতা রক্ষার চেষ্টা করেন। যদিও নিত্য-নতুন চিন্তা ও গোষ্ঠী তাদের নিজেদের ধর্মমতের মধ্যেই ঘটতে থাকে; এবং তারা তাদের নিজেদের উপদলের সঙ্গে একটি আপসরফা করলেও অন্য ধর্মের মানুষদের সঙ্গে সেটা করতে আগ্রহী থাকে না। যদিও মুসলমানরা আজ অনেক দেশে আন্তঃধর্মীয় সংঘাতেও লিপ্ত রয়েছে। মুসলমানদের এই সংঘাতের পেছনে যদিও পশ্চিমা সেকুলার কান্ট্রিগুলোর অনেককে দায়ী করা হয়; তবু এটি তো সত্য, মুসলমানদের দ্বারাই তাদের দুষ্কর্ম সাধিত হচ্ছে। কিছু পরিবার বা সামরিকপক্ষ নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য অন্যদের ক্রীড়নক হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর অনেকটাই সাধিত হচ্ছে ধর্মীয় মোড়কে।

ধর্মনিরপেক্ষতার চ্যালেঞ্জগুলো আজ প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ দেশগুলোকেও মোকাবেলা করতে হচ্ছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবারের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আমেরিকায় কোনো মুসলমান প্রেসিডেন্ট-প্রার্থী হতে পারবে না। এটি তাদের সংবিধানের জন্যও সাংঘর্ষিক। তাদের আক্রমণের তির ওবামার দিকে; যদিও ওবামা মুসলমান নন; তবে তার বাবা অফ্রিকান-মুসলমান ছিলেন, ওবামা তার মায়ের ধর্ম ক্রিশ্চানিটিকেই গ্রহণ করেছেন। অদূর ভবিষ্যতেও আমেরিকায় কোনো মুসলমানের প্রেসিডেন্ট-প্রার্থী হওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না; তবু কেন রিপাবলিকানরা এই স্লোগান নিয়ে আসছেন? হয়তো আমেরিকান জনগণের মধ্যে একটি সাম্প্রদায়িক মানসিকতা রয়ে গেছে, বিশেষ করে মুসলিমবিদ্বেষী মানসিকতা; আর এটিই হয়তো রিপাবলিকানরা ক্যাশ করতে চাচ্ছেন, সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটের চেয়ে সংখ্যাগুরু খ্রিস্টান ভোট তাদের জন্য বেশি জরুরি। এখন আর রাজনৈতিক উপাদান হিসাবে ধর্মনিরপেক্ষতা কাজে আসছে না। ইউরোপের দেশগুলোও এটি কমবেশি মোকাবেলা করছে। যদিও আমরা অনেকদিন ধরে ইউরোপীয় বস্তুচিন্তা ব্যবহার করে আসছি; তবু সঠিকভাবে তা ব্যবহার করার সুযোগ ঘটে নি। স্বাধীনতা-উত্তর একবারই সেই সুযোগ এসেছিল, কিন্তু এর বাস্তবতা রাজনৈতিক ক্ষমতার অনুকূলে নয় বলে প্রবর্তকগণই এর একটি জগাখিচুড়ি ব্যবহার করেছেন। একুশ শতকের সূচনাপর্বে বিশ্বব্যাপী তথাকথিত মুসলিম জঙ্গিবাদের প্রচার সর্বস্বতায় আরেকটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু ক্ষমতা হারানোর ভয় থেকে তা গ্রহণ করা হয় নি। সংবিধান-সংশোধন হয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে আসছে, সঙ্গে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসাবেও থাকছে; উলামাদের নিয়ে অঙ্গসংগঠনও করা হচ্ছে; ব্লগারদের উৎসাহ দেয়া হচ্ছে, আবার হত্যাকারীদের যুক্তি আছে বলেও মনে করা হচ্ছে। আজ পক্ষ-বিপক্ষ নির্ণয় করা বড্ড কঠিন হয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মের সম্পৃক্ততার এমন একটা গ্যাঁড়াকল রচিত হয়েছে, যা থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার জন্য রাষ্ট্রের যে সংস্কারগুলোর প্রয়োজন ছিল, তার একটি হতে পারত মুসলিম পারিবারিক আইন। মেয়েদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও কার্যত কিছু করার ঝুঁকি সরকার নিতে রাজি নয়। অথচ আইয়ুবের ইসলামি পাকিস্তানি রাষ্ট্রেও এ আইনের যুগান্তকারী সংশোধন হয়েছিল, যা এখনো এ দেশের আইনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে; তার একটি মেয়েদের বিয়ের বয়স নির্ধারণ ও দাদার আগে পিতার মৃত্যু হলে নাতিদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার হওয়া। ইসলামের আইনের যদিও সারবস্তু ছিল, পিতার সম্পত্তিরই কেবল উত্তরাধিকার হওয়া যাবে, দাদার সম্পত্তির নয়। কিন্তু কোরানের উত্তরাধিকার আইন মোটেও কট্টর ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, মানবিক চেতনাই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে; এবং এই আইনের মধ্যে এর সংস্কারের সূত্র নিহিত আছে। মেয়েদের সম্পত্তির ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা কোরআনে রয়ে গেছে। কিন্তু ইসলামি আইন যে ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত সেটি সঠিকভাবে দেখার জন্য কোনো যুগোপযোগী ব্যাখ্যাকারী উলামা বা নেতা ঝুঁকি নিচ্ছে না। অথচ দেড়হাজার বছর আগে যে আইনটি হয়েছিল মেয়েদের সম্পত্তি পাইয়ে দেয়ার জন্য, সেই ধর্ম আজ মেয়েদের বঞ্চিত করার দোষারোপ নিয়েও কানে পানি দিচ্ছে না। এতে রাষ্ট্রেরও কিছু এসে যায় না, যেমন আছ তেমন নাচ নীতিতে সবাই বিশ্বাসী। তবু সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ বস্তু এখনো দামি হিসাবে প্রতিপন্ন; বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোট টানার জন্য এর রয়েছে ধন্বন্তরিগুণ; যেমন বড় দুটি দলের নেতাকর্মীরা সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে একই রকম আচরণ ও মনোভাব পোষণ করেন, অন্তত সম্পত্তি বা স্বার্থের ব্যাপারে। তবু বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ হিন্দুভোট আকর্ষণে এগিয়ে থাকে, কারণ অন্তত আইন ও চেতনাগতভাবে সংখ্যালঘুরা নিজেদের হীন ভাবেন না। অপরদিকে বিএনপি এটি বোঝাতে সক্ষম হয় নি যে নাগরিক হিসাবে এদেশে তাদের গুরুত্ব কম নয়। আপাতভাবে জামায়াতে ইসলামি দুর্নামের ভয়ে সংখ্যালঘু নিপীড়ন না করলেও তাদের অনেককেই বলতে শুনছি, তারা চলে গেলেই ভালো, কারণ তারা তো তাদের ভোটার হবে না। আবার তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়া যায়, কোনো ইসলামি দল ক্ষতায় এল, তাহলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিক মর্যাদা কী হবে? সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাটি এখানে কেবল সংখ্যালঘু ভোটের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে; সংখ্যাগুরুদের নিয়ে যেন কিছুই ভাবার নেই।


গণতান্ত্রিক চর্চা, এবং ভালোত্বের সংস্কৃতি যখন একটি দেশে বিনিময়ের পথ রুদ্ধ করে ফেলে তখন বক্রপথই পথ ওয়ে ওঠে। 


আসলে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি গোলমেলে বস্তু হিসাবে রয়ে গেছে; আদতে যাকে ধর্মনিরপেক্ষ বলা হয়েছে, তার আসলে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র কখনো ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতার উপাদান মূলত নিজেই একটি ধর্মবস্তুতে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে মধ্যযুগে হিন্দু-মুসলমানের মিলনের যুগে কবীর, লালন, অশোক, আকবর, দারাশিকো, গান্ধী—তাদের জীবন-দর্শনের মূল্যবোধ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ থেকে গ্রহণ করা হয় নি; বরং ধর্ম তাদের জীবনের অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। নিজের ধর্মীয় লেবাসকে তারা সমালোচনা না করলেও অন্যের ধর্মাচরণে তারা উপহাস করেছেন। বর্তমানেও ধর্মনিরপেক্ষতা সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত না হয়ে ভোটের রাজনীতির ক্ষেত্রে পরিচালিত হচ্ছে। সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয়-সম্প্রীতি রক্ষা করে কিনা, তা নিয়েও আজ প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে; সবাই প্রত্যক্ষ করেছে যে, অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে রামমন্দির প্রতিষ্ঠার যে উন্মাদনা তার জন্ম সর্বোচ্চ ধর্মনিরপেক্ষ দেশের সংবিধানের আওতায় হয়েছে; সাম্প্রদায়িক গুজরাট হত্যা আর তারই ওপরে ভর করে ক্ষমতায় আসীন—সংবিধান সে সব রক্ষা করতে পারে নি। কারণ একটি মাত্র দল যখন এই ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিদার ও সুবিধাভোগী হয়ে পড়ে, তখন ক্ষমতার অন্যান্য অংশীদাররা অন্য পথে ক্ষমতায় আসতে চেষ্টা করে। সুতরাং একটি মুক্ত গণতান্ত্রিক চর্চা, এবং ভালোত্বের সংস্কৃতি যখন একটি দেশে বিনিময়ের পথ রুদ্ধ করে ফেলে তখন বক্রপথই পথ ওয়ে ওঠে। ফলে চরিত্রের দিক দিয়ে ভারতের কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে বস্তুত কোনো তফাত নাই। বলা হয়ে থাকে বিজেপির প্রতিষ্ঠাদের কেউ বিশ্বাসী হিন্দু নন, এবং তাদের দলেও মুসলমান নেতার সংখ্যা কম নন। পাশাপাশি নেপাল সংবিধানে এতকাল হিন্দুরাষ্ট্র বলে স্বীকৃত হলেও ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দুরাষ্ট্রের মতো সেখানে ধর্মীয় সংঘাত বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হতে দেখা যায় নি। বরং তাদের জনগণের মধ্যে ভারতীয়দের প্রতি এক ধরনের ক্ষোভ লক্ষ করা গেছে, কারণ সে দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের শীর্ষভাগ তাদের দখলে। আবার অতিসম্প্রতি তাদের হিন্দুরাষ্ট্রের পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা যে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের জন্ম দেবে না তা বলা মুশকিল। ইতোমধ্যেই তাদের তরাই এলাকার জনগণের মধ্যে একটা উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যদিও আপাতভাবে ধর্মীয় উগ্রপন্থা মানুষের জন্য ক্ষতিকর মনে হয়েছে, তবু ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিকর্মকাণ্ড দ্বারা গত শতকে যত লোক নিহত হয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ও রাষ্ট্রের দ্বারা সেই হত্যাকাণ্ড কয়েকগুণ বেশি হয়েছে। সুতরাং, রাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিচয় বা ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক সংযোজনের আসলেই কোনো প্রয়োজন আছে কিনা সেটি ভেবে দেখার দরকার হয়ে পড়েছে। কারণ বর্তমান রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় এগুলো রাজনৈতিক জিকির ব্যতীত আর কোনো কাজে আসছে বলে মনে হয় না। আসলে এই মীমাংসাটাই জরুরি, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের ধরন কেমন হবে। সংবিধানে এমন-সব প্রতীকী মেটাফর যার বহুবিধ ব্যাখ্যা হতে পারে, তা আসলে নাগরিকের প্রয়োজনে আসে না। নাগরিকের মৌলিক অধিকারসহ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, ব্যবসায়-বাণিজ্যের নিরাপত্তা, গমনাগমের স্বাধীনতা, গোপনীয়তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সরকার নির্বাচনের স্বাধীনতা এবং ফৌজদারি ও দেওয়ানি অপরাধসমূহের নিষ্পত্তির সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকাই যথেষ্ট; আর সব অবশিষ্ট হতে পারে রাষ্ট্রের এখতিয়ার মুক্ত। যদিও আমার এই মত রাষ্ট্রের কাঠামোর সুচিন্তিত প্রকাশ নয়, তবু বলা যায়, এমন কিছু পরিবর্তন কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নেয়া কোনো ন্যায়সংগত নয়, তার অন্যতম হলো, যা দেশের একজন ব্যক্তিরও চিন্তা বা বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে। রাষ্ট্রের এমন-সব বিষয়ে হাত দেয়ার প্রয়োজন হয় না, যেখানে রাষ্ট্র বা ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তবে আমাদের এখানে সরকার ও রাষ্ট্রকে অধিকাংশ সময়ে সমান্তরাল হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

আমাদের গ্রামের উন্মূল নাপিত পরিবারকে দিয়ে এ আলোচনা শুরু করেছিলাম। কারণ আমার কাছে এ আলোচনা সম্পাদনের জন্য কোনো গবেষণা-প্রণালি ছিল না। অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে এগুতে চেয়েছি। যেমন নাপিত পরিবারটির আজ যে উন্মূলিত হওয়ার ঘটনা, তা কেবল একটি গ্রাম-সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ইউরোপের শরণার্থী ব্যবস্থার সঙ্গেও তার যোগ রয়েছে। কারণ বিশ্বায়নের ধাক্কায় আমাদের পরিচিত সকল কিছু আজ অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে, আর যা অপরিচিত তা-ই আমাদের অচেনা ও অপর মনে হচ্ছে। যেমন মধ্যযুগে ধর্মের বিভেদ থাকলেও তার রূপ ছিল দেশজ, যেমন শত শত বছর মুসলমানরা ভারতীয় সমাজে বাস করলেও ধর্মের প্যাটেন্ট পরিশুদ্ধতার দরকার হয় নি; বা কেউ তার প্যাটেন্ট দাবি করে নি; যেমন এই শতাব্দীতে এসে আমাদের বলতে হচ্ছে, এই নিমগাছ, এই পাটগাছ আমাদের। আমরা যদি সময় মতো বাণিজ্যের খাতায় তালিকাভুক্ত না করতে পারি তাহলে অন্যরা এটি নিয়ে নেবে, এবং এর ব্যবহারের জন্য আমাদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে। তেমনি আজ নানা রকম যোগাযোগ, তথ্য-প্রযুক্তি, অনুবাদ ও বর্ণশিক্ষার ফলে ধর্মের মূল গ্রন্থের বাণী ও উপগ্রন্থের সঙ্গে যেমন যে কারো সহজে পরিচয় ঘটছে, সেহেতু তার ব্যাখ্যাও নানা রকম হয়ে যাচ্ছে; এবং এতকাল যা দেশজ ও প্রায়োগিক ছিল তা-ই আজ হয়ে যাচ্ছে কেতাবি ও বাণিজ্যিক। হিন্দু ধর্মের জন্যও এটা সত্য। কারণ হিন্দুরা প্রকৃতিগতভাবে ধর্মের কোনো পরিশুদ্ধতা ছাড়াই পুরোপুরি স্থানিক নিয়মে ধর্মপালন করে এসেছেন এতকাল। কে রাম আর কে লক্ষ্মণ তার বাস্তব রূপ নিয়ে তার মাথাব্যথা ছিল না। অথচ আজ দশমুণ্ডের রাবণ আর দশভুজা দুর্গা হিন্দুর মানসলোকে ক্ষমতালক্ষ্মী হিসাবে দেখা দিয়েছে। ফলে এই নাপিত পরিবারকে পুরনো মালের নতুন মোড়কের যুগে টিকতে হলে বেশি মূল্য গুনতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা হুদাই একটি বোল।


ঈদসংখ্যা ২০১৯
মজিদ মাহমুদ

মজিদ মাহমুদ

জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি গ্রামে। এম.এ (বাংলা), ১৯৮৯, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। লেখালেখি ঠিক রেখে কখনো সাংবাদিকতা, কখনো শিক্ষকতা; আর পাশাপাশি সমাজসেবা।

প্রকাশিত বই:
কবিতা—
মাহফুজামঙ্গল (১৯৮৯), গোষ্ঠের দিকে (১৯৯৬), বল উপখ্যান (২০০০), আপেল কাহিনী (২০০১), ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম (২০০৫), নির্বাচিত কবিতা (২০০৭), কাঁটাচামচ নির্বাচিত কবিতা (২০০৯), সিংহ ও গর্দভের কবিতা (২০১০), শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১১), দেওয়ান-ই-মজিদ (২০১১), গ্রামকুট (২০১৫), কবিতামালা (২০১৫)।

প্রবন্ধ ও গবেষণা—
নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র (১৯৯৭), কেন কবি কেন কবি নয় (২০০১), ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ (২০০৫), নজরুলের মানুষধর্ম (২০০৫), উত্তর-উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য (২০০৯), রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ-সাহিত্য (২০১১), সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা (২০১১), রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ (২০১৩), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৪), সন্তকবীর শতদোঁহা ও রবীন্দ্রনাথ (২০১৫), ক্ষণচিন্তা (২০১৬)।

গল্প-উপন্যাস—
মাকড়সা ও রজনীগন্ধা (১৯৮৬), মেমোরিয়াল ক্লাব।

শিশু সাহিত্য—
বৌটুবানী ফুলের দেশে (১৯৮৫), বাংলাদেশের মুখ (২০০৭)

সম্পাদনা—
বৃক্ষ ভালোবাসার কবিতা (২০০০), জামরুল হাসান বেগ স্মারকগ্রন্থ (২০০৩); পর্ব (সাহিত্য-চিন্তার কাগজ)

অনুবাদ—
অজিত কৌড়ের গল্প (২০১৬), মরক্কোর ঔপন্যাসিক ইউসুফ আমিনি এলালামির নোমাড লাভ এর বাংলা অনুবাদ ‘যাযাবর প্রেম’

ই-মেইল : mozidmahmud@yahoo.com
মজিদ মাহমুদ