হোম গদ্য দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু : আত্মবিধ্বংসী কবি ইন্তেকাল সেলিব্রেশন চাওয়ার কারণ কী?

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু : আত্মবিধ্বংসী কবি ইন্তেকাল সেলিব্রেশন চাওয়ার কারণ কী?

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু : আত্মবিধ্বংসী কবি ইন্তেকাল সেলিব্রেশন চাওয়ার কারণ কী?
673
0

কেউ কেউ কবিতার জন্যেই—শিল্পের জন্যেই—জীবনের দাস না হওয়ার জন্যেই পৃথিবীতে আসেন-যে তা দেখা যায় না? ১৭ নভেম্বর ২০১৮ কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু ইন্তেকাল করেন আটচল্লিশ বছর বয়সে। তিনি আসলে কে ছিলেন? তার নিজের উত্তর—’স্বর্গ হতে আসিয়াছি এক অলৌকিক উন্মাদ’।

জীবন সম্পর্কে তার উপলব্ধি কী ছিল? চিন্তার কোন লেবেল থেকে সমাজ-সংসার দেখছিলেন? তার কবিতায় নতুন মেটাফর, নতুন কাব্যভাষার দীপ্তি ছিল? তার জানা-শোনার পরিধি? অন্তর্দৃষ্টি? কিঞ্চিৎ খুঁজে দেখা যাক।


তৃতীয় বন্ধনীর ভিতর একটু স্মৃতি


[পঁচিশ/ছাব্বিশ বছর আগের কথা। ১৯৯২/৯৩/৯৪ সালের দিকে, আমি তখন সিলেটের সাপ্তাহিক অনুপমের নির্বাহী সম্পাদক। পত্রিকাটির মালিক-সম্পাদক ছিলেন মনিরউদ্দিন চৌধুরী। অনুপম তখন সিলেটের প্রমিজিং তরুণ লেখকদের প্রতিদিন সকাল বিকাল আড্ডার জায়গা।

সেখানে আসতেন কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার (প্রয়াত), বদরুল আলম খান (প্রয়াত), মোস্তাক আহমাদ দীন, (এখন লিডিং ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক) জফির সেতু (এখন শাবিপ্রবি-র শিক্ষক), শামসুল আলম সেলিম (গীতিকার, সিলেটে),  টি এম আহমেদ কায়সার (বৃটেনে, সোসাইটি অব পয়েট্রি অ্যান্ড ইন্ডিয়ান মিউজিক—সৌধ এর পরিচালক), মাহবুব লীলেন (আমেরিকায়), আহমদ মিনহাজ (সিলেটে বসেই বাঘা-বাঘা ইংরেজি গদ্য লেখেন ছদ্মনামে অনলাইনে, মিনিং অব লাইফ খুঁজতে), ফজলুর রহমান বাবুল (সিলেটেই), নাসিমুল হক (কোথায় জানি না), শাহ শামীম আহমেদ (বৃটেনে), শামীম শাহান (বৃটেনে), শাহ তোফায়েল (অস্ট্রেলিয়াতে), জগলু চৌধুরী (জেলা আওয়ামীলীগের একজন নেতা) হেলাল আহমদ চৌধুরী (অধ্যাপক, সিলেটেই), আরো অনেকেই আসতেন। মৌলভিবাজার থেকে সৌমিত্র দেব টিটোও আসতেন। তিনি এখন রেডটাইমসডটকমবিডি-এর সম্পাদক।’


দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, মানুষ মৃত্যুর পর কবিতা লেখে।


১৯৯৩ হয়তো তখন, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু (প্রয়াত) রাশিয়া থেকে দেশে ফিরে কয়েকবার এসেছিলেন অনুপমে। কবিতা গল্প দিতেন সাহিত্যপাতার জন্যে। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। তার ইন্তেকালের পর কবি শামীম শাহানের সাথে কথা বলার পর নিশ্চিত হলাম। (শাহান তখন ‘গ্রন্থি’ লিটলম্যাগ সম্পাদনা করতেন।) মনে পড়ল তখনের লাজুক স্বভাবের দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুকে। পাঞ্জাবি পরে আসতেন। মুচকি হাসি মুখে বসে চুপচাপ শুনতেন কে কী বলে। আলাপে অংশ নিতেন না। ফকির ইলিয়াস আমেরিকা থেকে দেশে ছুটিতে এসে দুয়েক চক্কর এসেছেন আমাদের আড্ডায়। আমরা সমৃদ্ধ পাঠের লিটলম্যাগ বার করতাম। ঢাকা বগুড়া, রাজশাহী থেকে কি কি প্রকাশ পাচ্ছে খোঁজ নিতাম, সংগ্রহ করতাম। দৈনিকের সাহিত্যম্যাগে কে কী লিখলেন তা নিয়ে আলাপ করতাম। তখন, মানে, ১৯৯২-৯৭, কোনোদিন ‘একবিংশ’-তে প্রকাশিত কারো লেখা নিয়ে, বা ‘গাণ্ডিব’-এ প্রকাশিত কারো লেখা নিয়ে আমরা আলাপ করতাম। কিংবা কোনো সাহিত্যের পাতায় প্রকাশিত ফরহাদ মজহার, মাসুদ খান, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, মুজিব মেহদী, মজনু শাহ কিংবা শিহাব সরকারের কোনো লেখা নিয়ে আমরা বিতর্ক করতাম। ওই সময়খণ্ডেই সম্ভবত, ইউকে থেকে প্রকাশিত আহমদ ময়েজ সম্পাদিত ‘ভূমিজ’-এর একটি সংখ্যায় মুজিব ইরমের কবিতা পড়ি আর তার কথা রচনার ম্যাগনেটিজম আমার মনোযোগ কাড়ে। পরে আমরা পাই কবিতাসাধক, আরো সমৃদ্ধ, আরো ম্যাগনেটিক—ইনফেকশাস কবিতার মুজিব ইরমকে।]


কেন সুন্দর—কেন কবিতা?


ভাবছিলাম কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর সাহিত্যে শিল্পে মগ্ন জীবন যাপন নিয়ে। কবিতার জন্যেই, শিল্পের জন্যেই এ মানুষটি এই পৃথিবীর জীবনে এসেছিলেন। তার কবিতারাই বলে দিচ্ছে তিনি কবিতায় মগ্ন বা শিল্পে মগ্ন জীবন যাপন করেছেন। শিল্পের মায়া, শিল্পীর জন্যে মায়া এক অনির্বচনীয় বিস্ময় নয় কি? সেখানে যেটুকু বিশুদ্ধতম ভালোবাসার মগ্নতা থাকে, সেখানে কোনো প্রকার ডিজায়ার ছাড়াই কি মায়া জ্বলজ্বলে থাকে না? মানুষ কি শিল্প না? অপার—অপরিমেয় রহস্যের আধার না?

এই রহস্যের আধার মানুষ কবিতা রচনা করে কেন? কেন শিল্পের ডাকে দিশাহারা অবস্থা হয়? কবিতায় নিবেদিত থাকে কেন ডন টু ডাস্ক? কেন ধর্মগ্রন্থগুলোর ভাষা কাব্যিক? কেন ইমরুল কায়েস, আল মোতানাব্বি কবিতা লিখতেন? কেন রসুলের সাহাবিদের মধ্যেও কবি ছিলেন? কেন ইবনে সিনা, আল গাজ্জালি, সাদী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, ইকবাল অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের পাশাপাশি কবিতা লিখতেন? কেন কনভেনশনাল ওয়াজ-নসিহত ছেড়ে কবিতার আলো দিচ্ছিলেন মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি?

তাইলে কি বিশুদ্ধ কবিতা অপ্রতিম কিছু একটা না? রহস্যের আধার কি নয়? কবিতা চরের পাখির মতো হয় বলে জানিয়েছিলেন আল মাহমুদ। (“কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী কুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ার দহন… (কবিতা এমন, আল মাহমুদ)। কবিতা আরো অনেক কিছু।

সোজা হিসাব করে সোজা রায় দেয়া গেলে রায়টি ষোলআনা সোজা না হতে পারে—যথাযথ প্রপরশনাল না হতে পারে। সোজা হিসাবে ১ ২ ৩ ৪ ৫ গোনে গোনে ইটারনিটি-তে পৌঁছা যায়। কিন্তু অনুক্রম শুধু এটিই না। আরেকটা অদ্ভুত সুন্দর ক্রম হলো ১ ১ ২ ৩ ৫ ৮ ১৩ ২১—এইভাবে গোনেও ইটারনিটি-তে যাওয়া যায়। এই হিসাবের ভিতর ১.৬১৮ ম্যাজিক কেন থাকে? এই ম্যাজিক, এই ‘গোল্ডেন রেশিও’ দৃশ্যত অসমতার মাঝে বিস্ময়কর সুসমতা দেখায় কেন? কার সাধ্য বলতে পারে—কেন সুন্দর বিশুদ্ধভাবে ফোটাতে গেলে ফিবোনাচ্চি নাম্বার হাজির হয়? সালভাদর ডালি তার শিল্পে ‘গোল্ডেন রেশিও’ ব্যবহার করেছেন। ব্রিটিশ পদার্থবিদ পল ডিরাক তার বিখ্যাত ইকুয়েশনটিতে, যে-ইকুয়েশনের মাধ্যমে কোয়ান্টাম মিকানিক্স রিশেইপ করেছিলেন, সেই ইকুয়েশনেও ‘গোল্ডেন রেশিও’ বা ‘ডিভাইন রেশিও’ ব্যবহার করেছেন। অথচ ‘গোল্ডেন রেশিও’ নাম্বারটি ইররেশনাল নাম্বার। ইররেশনাল নাম্বারের মাধ্যমে যথাযথ প্রপরশনাল রেজাল্ট। অদ্ভুত না?

আমরা দেখি, বিশুদ্ধ কবিতা আর বিশুদ্ধ কবি রহস্যের ও সুন্দরের আধার। কেউ কেউ কবিতা অন্তঃপ্রাণ থাকেন। নাইজেরীয় লেখক বলেছিলেন, তিনি স্বপ্নেও কবিতা লেখেন। দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, মানুষ মৃত্যুর পর কবিতা লেখে।

কবিতা আমরা কেন লেখি ও পড়ি এর একটা জবাব দিয়েছিলেন ওয়াল্ট হুইটম্যান —

We read and write poetry because we are members of the human race. And the human race is filled with passion. So medicine, law, business, engineering… these are noble pursuits and necessary to sustain life. But poetry, beauty, romance, love… these are what we stay alive for. 

বিশুদ্ধ কবিতা বলতে আমরা বুঝি, যে কবিতায় দ্রোহ থাকে প্রেম থাকে এমনভাবে যে, চট করে মনে ধরে, মনকে মোচড় দেয়, অবাক করে, স্পিচলেস করে। আর সেটা বোধগম্য হওয়ার আগেই আক্রান্ত করে। (টি এস এলিয়ট)। কেবল আক্রান্ত করে না, সমাজ সভ্যতার ময়লা সাফ করতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। আবার অন্য অন্য রকম ত হয়ই। বিরাম মুখোপাধ্যায়ের বাছাই করা ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বইয়ের ভূমিকার শুরুতেই  জীবনানন্দ দাশ ২০ এপ্রিল ১৯৫৪ সালে লিখেছিলেন “কবিতা কি এ-জিজ্ঞাসার কোনো আবছা উত্তর দেওয়ার আগে এটুকু অন্তত স্পষ্টভাবে বলতে পারা যায় যে কবিতা অনেক রকম। হোমারও কবিতা লিখেছিলেন, মালার্মে, রাঁবো ও রিল্কেও। শেক্সপিয়র, বোদলেয়র, রবীন্দ্রনাথ ও এলিয়টও কবিতা রচনা করে গেছেন। কেউ কেউ কবিকে সবের উপরে সংস্কারকের ভূমিকায় দ্যাখেন; কারো কারো ঝোঁক একান্তই রসের দিকে। কবিতা রসেরই ব্যাপার, কিন্তু এক ধরনের উৎকৃষ্ট চিত্তের বিশেষ সব অভিজ্ঞতা ও চেতনার জিনিস—শুদ্ধ কল্পনা বা একান্ত বুদ্ধির রস নয়।”

আমরা দেখি, ‘শুদ্ধ কল্পনা’র পক্ষে না থেকে জীবনানন্দ হয়ে উঠেছিলেন শুদ্ধতম কবি।


বিশুদ্ধ কবি ‘আত্মবিধ্বংসী’ কেন?


বিশুদ্ধ কবিতালেখক, প্রকৃত কবি, মোমবাতির মতো কি জ্বলে না? জ্বলে জ্বলে নিঃশেষ হয় না? প্রেমের আগুনে জ্বলবে, দ্রোহের আগুনে জ্বলবে, সে কি পুড়বে না? ছাই হবে না? এই ছাই মানে কি শেষ হওয়া? নাহ্। এই ছাই হওয়া থেকে ফোটে আসল মানুষটি। ওই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গাইলেন—”আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে/ এ জীবন পুণ্য কর দহন— দানে”। দহনে দহনে কবি জীবনের উৎকর্ষতা, দহনে দহনে শ্রেয়তর করা। কবিকে ওই অনিন্দ্য বিস্ময়কর আগুনের পরশ পেতে হয়।

তাছাড়া ফালতু ইল্যুসিভ ইগোকে নাশ করা মানে কি আত্মধ্বংস করা না? giacomo casanova বলেছিলেন, ‘be the flame not the moth.’ কবি ধীরে ধীরে ফ্লেইম হয়ে ওঠেন কি? তিনি ত অজ্ঞতার অন্ধকারকে ডিফাই করেন, ডিফাইনও করেন।

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু বলতেন, প্রকৃত কবি আত্মবিধ্বংসী। তিনি নিজেকেও তা মনে করতেন। তার বিবেচনায় জীবনানন্দ দাশ, আবুল হাসান, শোয়েব শাদাব, কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, নাসিমা সুলতানা, শামীম কবির, কেদার ভাদুড়ী, শমসের আনোয়ার, আরো আছেন, এদেরকে আত্মবিধ্বংসী কবি মনে করতেন।

এই কবিরা স্বেচ্ছায় নিজেদের ধ্বংস চান বলে কি আত্মবিধ্বংসী? নাহ্। এত সোজা আক্ষরিক অর্থ সেখানে নাই। সেখানে আছে গভীর ধ্যাননিষ্ঠতা ও তেজদীপ্ত ভাষার বয়ানের কনটেক্সট। তারা আত্মবিধ্বংসী এই অর্থে যে প্রথাসিদ্ধ জীবন যাপনের ছল-চাতুরী আর রাজনৈতিক প্রতারণার যে-সমাজ, ওই সমাজচিন্তার ভিতরে তারা থাকতে পারেন না। দল গোষ্ঠীর ভিতরে ঢুকে ফায়দা লুটবার তালে তারা থাকতে পারেন না। তারা তাদের জীবনের ধ্বংস চান না। তারা চান তুলনামূলক উৎকৃষ্ট চিন্তার পথে চলতে পারা। অভ্যস্ত রীতি অস্বীকার করে ভেঙে-চুরে চলতে চলতে নিজেদের পছন্দের জীবন যাপন করা। মঞ্জু বললেন, “…কবিতা লেখাটাও আমার কাছে একটা কৌশল বা বেঁচে থাকার সর্বশেষ অবলম্বন…।” (সূত্র : ‘কথাবলি’-তে প্রকাশিত নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের সঙ্গে আলাপচারিতা।) তাহলে দেখা যাচ্ছে, এই ধারার কবিরা কোনো অবলম্বন ধরে বাঁচতে চান, শাব্দিক অর্থের আত্মধ্বংস চান না। আবার এ-ও উল্লেখ্য, মঞ্জুর ইন্তেকালের পর নির্ঝর নৈঃশব্দ্য ফেসবুক নোটে জানালেন, আত্মবিধ্বংসী কবিদের কবিতার সংকলন করা নিয়ে যখন আলাপ করছিলেন ফোনে মঞ্জু, তখন এক পর্যায়ে মঞ্জু জানতে চান নির্ঝরের কাছে ‘আত্মবিধ্বংসী’ টার্ম ঠিক আছে কিনা (আমি ও গেওর্গে আব্বাস ৫—নির্ঝর নৈঃশব্দ্য)। মানে, আত্মবিধ্বংসী শব্দটি ব্যবহার নিয়ে মঞ্জু দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলেন।

মঞ্জু আমৃত্যু নিজের সাথেও দ্বন্দ্বে ছিলেন। নিজের সংসার বউ বাচ্চাদের ভালোবাসার দিকেও মনোযোগী ছিলেন, কবিতার প্রতিও মনোযোগী ছিলেন। ফলে দ্বন্দ্ব চলতে থাকত। ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ অবস্থাতে তড়পাতে তড়পাতে কেটে গেছে জীবনের সময়। তার জীবনে ‘সংসার জীবনের সফলতা’ অন্য অনেকের মতো না আসতেই পারে। কিন্তু কবি ও চিন্তক মঞ্জু অনেক দূর গিয়েছেন, যত দূর যেতে সাহস করেন খুব কম সংখ্যক মানুষ।

আমি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ারকে প্রায় পাঁচ বছর কাছে থেকে দেখেছি। প্রায়ই গপ-আড্ডা হতো। ‘অনুপম’-এ, ‘দৈনিক জালালাবাদ’-এ আসতেন। কখনো রাস্তায় রিকশা থেকে হাঁক দিয়ে আমাকে থামাতেন। মাস্তানি জোশের একটা বডি ল্যাঙ্গুয়েজে ‘সারওয়ার ভাই’ চিল্লানি মেরে রিকশা থেকে নেমে কাছে চলে আসতেন। কিশওয়ার নিজের মতো জীবন যাপন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই চাওয়া প্রথাসিদ্ধ সমাজের নিয়ম-কানুনের ভিতর মিলত না বলে তিনি বঞ্চিত থেকেছেন, খাপ খাওয়াতে পারতেন না। তাই বেদনা বহন করেছেন আমৃত্যু। মনে পড়ে যেন কখনো বলেছিলেন—”আমি এমনই, এভাবেই কেটে যাবে জীবন”।


জগতের জীবন দুঃখের সারাৎসার হয়েও মায়ার ম্যাগনেটিজমেরও এসেন্স—মায়াই ভব—মায়াই আরক।


শামীম কবির মাত্র ২৪ বছর বয়সে স্বেচ্ছাপ্রস্থান করেছিলেন। কবি মজনু শাহ লিখেছেন—

“সে অনুভব করেছিল তার চারদিকে এক অদ্ভুত রকমের আকাশময়তা। নিজের ভূমি কাঁধে নিয়ে, মেঘেদের রঙবদল আর ছুটন্ত ধূলিকণার  জ্বলন্ত পুচ্ছের লীলা দেখতে থাকা, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার দৃষ্টি শূন্য হয়ে আসে।

Horus has been bitten. O re! A scion of yours has been bitten! Horus has been bitten!… The atmosphere changes at once. The sickness of horus is a cosmic event. এই অনুভব দ্বারা তাড়িত হয়ে, সবকিছু ভুলে এমন একটা অসুখ সে চেয়েছিল, কেননা সে হোরাসের ভূমিকায় ভাবতে পেরেছিল নিজেকে, The sickness of mine is a cosmic event.  Oh I have been bitten!

এরপর, ক্রাটনের এনগ্রেভিং, যেখানে আমরা জানতে পারব, সমস্ত পরীক্ষানিরীক্ষা শেষ হয়েছে, অক্ষরের পৃথিবী থেকে চলে যাবার সময় হয়েছে তার। My aim is to go aimless, এমনই কবিত্বপূর্ণ তার সেই প্রস্থান।”

কসমিক ইভেন্ট বেশ তাৎপর্যবহ। কসমসের ভিতরেই ত আমাদের গ্রহ—ইউনিভার্সের ভিতরেই পৃথিবী আর এর সমুদয় বিষয়-আশয়। এমন ত ভাবা যায় যে, কসমসের সামগ্রিক সিস্টেমে গ্রন্থিত ঘটনাপুঞ্জের সিকোয়েন্স এই ঘটনা সেই ঘটনা বিশেষ ঘটনা। সুনিশ্চিত কিছু বলা দুষ্কর।


প্রকৃত কবি অসাধারণ মানুষ?


দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুকে বার্মিংহামে সমাহিত করার পর, বন্ধুরা বললেন, দেখলাম ইউটিউবে, তিনি অসাধারণ মানুষ ছিলেন, শক্তিশালী কবি ছিলেন। বিলেতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জানাযায় গিয়েছিলেন স্বজন বন্ধুরা।

আমরা দেখি, প্রকৃত কবি—বিশুদ্ধ কবি—শক্তিশালী কবি অসাধারণ মানুষ হয়ে থাকেন। তাদের দিল থাকে দরদভরা। তারা ভণ্ডামি ষণ্ডামি করেন না। কোনো দল মত পথে বন্দি থাকেন না (ননলিনিয়ার)। আনপ্রিডিক্টেবল থাকেন। আনপ্রিডিক্টিবিলিটি কি রিয়েল হিউম্যান নেচার না? তারা উল্লম্ফক হন না। স্ট্যান্টবাজ হন না। তাদের ভিতর বাহির স্বচ্ছ। কে কি বলে তার পরোয়া করেন না। যা ঠিক মনে করেন তা যেকোনোভাবে বলেন, করেন। তারা মৃত্যুকে ভয় করেন না। মনে হয় তারা অন্তরের চোখে দেখে ফেলেন—মৃত্যু মানেই শেষ হয়ে যাওয়া না। এখানে বিনাশের মধ্য দিয়ে রূপের বদল হয়। মনে হয় তারা দেখে ফেলেন মহাবিশ্বমণ্ডলের ইনারমোস্ট কিংবা অন্য ডাইমেনশনের অবারিত সৌন্দর্য। তারা নিজেরাই দেখেন নিজেদের ভুলগুলো। “কিছু কথা ক্ষয় হলো প্রেমে আর ‎কামে..” (‘আমি’—’ইস্পাতের গোলাপ’— দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু)। মানব মন বাউটামি করে, তা-ও দেখেন। বাউটামি ছাড়বার কথাও বলেন। মঞ্জু লিখেছেন—

“ও মন
কতো আর খাবে চৈপিঠা, কোমরের মিঠা
ও মন, বাউটামী ছাড়ো।” (বাউটা-দিন, ‘নীল কাব্যের বয়াত’)

বাউটামি মানে বাছ-বিচার না করে যেমন খুশি তেমন চলা। মঞ্জু বাউটামি ছাড়বার কথা বলেন। কারণ ইল্যুসিভ দুনিয়ার তুচ্ছতার মাঝে বাউটামির কোনো মানে নাই। সুন্দর মনের মানুষ হতে হলে বাউটামি ছাড়তে হয়।

প্রকৃত কবি কেবল শক্তিশালী কবি হন না, অসাধারণ সুন্দর মনের মানুষ হন, মঞ্জুও সেরকম একজন মানুষ ছিলেন।

সাপ্তাহিক সুরমা সম্পাদক ও কবি ফরীদ আহমেদ রেজা লন্ডন থেকে নগর বার্মিংহামে গিয়েছিলেন মঞ্জুর জানাজায়। তিনি সেখানে ইউকে টিভিকে বললেন, “মঞ্জু অত্যন্ত শক্তিশালী কবি ছিলেন। তার ইন্তেকালে আমরা আহত হয়েছি”।

নগর বার্মিংহামে হাসপাতালে দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু ভর্তি হওয়ার পর, মঞ্জু কোনো আত্মীয় স্বজন তাকে দেখতে আসতে এলাও করেন নি। শুধু তার প্রিয়জন কবি মুজিব ইরমকে অনুমতি দিতেন। তারা একে অন্যে গুরু সম্বোধন করতেন। মুজিব ইরমের সাথে শেষ কথা হয়েছিল এরকম—

“ইরম : গুরু, কবিতা লিখছেন? মাথায় কবিতা আসছে?
মঞ্জু : না গুরু, আমি অন্তিম পর্যায়ে।

তারপর কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু হসপিটালের ছয় তলা থেকে বাইরে রোদহীন কুয়াশাভেজা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন—

“রাশিয়ার মতো লাগছে গুরু।”

আমার চোখ জলে ভরে গেল। আমি অশ্রু লুকাতে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম।

আমেরিকা থেকে ফকির ইলিয়াস বলেছেন, “মঞ্জুর কবিতায় সাম্যবাদ, মানবতা এসেছে আলোর ফোয়ারা হয়ে।”

কবি মাজুল হাসান জানালেন, “দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু বহুমুখী কর্মশক্তিসম্পন্ন ননলিনিয়ার কবি। ভার্সেটিলিটি তার লেখায় মিলে। কবিতার বাইরে তার মুক্তগদ্য বা তুলসিপত্রের গল্প বা প্যারাবল অনবদ্য। মঞ্জু সেই কবি যিনি অনাবিষ্কৃত, উপেক্ষিত।”

আমার এক সময়ের সহকর্মী (দৈনিক জালালাবাদ-এ) বন্ধু শফিকুর রহমান শাহজাহান বার্মিংহাম থেকে জানালেন :

“দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু ম্যাগনেটিক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন। তার কথা শুনলে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নাই। তার জ্ঞানের পরিধি অনেক বিস্তৃত।”

কবি নাঈম ফিরোজ ২০১৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নগর বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত কবিতা ও সংগীত সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর কথা বললেন :

“তিনি বিস্ময়কর প্রতিভাধর কবি ছিলেন। প্রকৃত কবিদের প্রসঙ্গে তিনি একটা অভিধা ব্যবহার করতেন ‘আত্মবিধ্বংসী কবি’। তিনি নিজেই ছিলেন তা মূলত। তার বিশ্বইতিহাস জ্ঞান ও রাজনীতি সচেতনতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি ছিলেন প্রতুল মানবিকবোধসম্পন্ন এক প্রকৃত কবি। বাংলা সাহিত্যের, বিশেষত কবিতার ক্ষেত্রে লিটারারি গ্লোবালাইজেশনের জন্যে তার ও মুনিরা আপুর অবিস্মরণীয় অবদান হচ্ছে POETICS OF GREEN DELTA ANTHOLOGY OF POETRY OF BANGLADESH ERA(1971 ONWARD) এর প্রকাশন। তিনি ও মুনিরা আপু অসামান্য অবদান রেখে আমাদেরকে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করে গেছেন। এই ঐতিহাসিক প্রকাশনার সম্পাদনা পর্ষদ তার বিদেহী আত্মার প্রতি আজীবন আনত।”

(উল্লেখ্য, ১৭ নভেম্বর বার্মিংহামে দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু ইন্তেকালের কয়েক ঘণ্টা পর বাংলা একাডেমি ইউকে-র পরিচালক কবি ও কথাশিল্পী মুনিরা চৌধুরী কার্ডিফে ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর কারণ দুর্ঘটনা, জানিয়েছেন স্বজনেরা।)

অস্ট্রেলিয়া থেকে শাহ তোফায়েল জানালেন, “তার সাথে প্রথম দেখা সারদা হলে একটি অনুষ্ঠানে ৮৯/৯০ এর দিকে হবে। প্রথম দিনেই সে মুগ্ধ করেছিল তার কথা ও ভাবনা দিয়ে। মঞ্জু আমাদের সময়ের বাংলা কবিতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবি বলে আমি মনে করি। নিশ্চিতভাবেই জানি মঞ্জু আরও পঠিত হবে, হওয়া উচিত। কারণ মঞ্জুর কবিতা স্মার্ট, প্রভাবক এবং ভিন্নতর।”

কবি সাংবাদিক শামীম শাহান লন্ডন থেকে বার্মিংহামে গিয়েছিলেন দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে। শাহান জানালেন, “জানাজায় গিয়ে মুখে মুখে শুনলাম একটি কথা, মঞ্জু আগে থেকেই বলছিলেন, তার মৃত্যুর পর শোক না করে সেলিব্রেট করতে। এটা অনেকেরই বুঝে আসছে না, কেন এমন বললেন?”


ইন্তেকাল সেলিব্রেশন, উচ্চতর উপলব্ধি


ফুসফুসের ব্যাধিতে আক্রান্ত মঞ্জু ইন্তেকালের আগে, সম্ভবত মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটালে ভর্তি হওয়ার আগে, তার মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ না করে, উদ্‌যাপন করবার কথা বলেছিলেন। এবং মিডিয়ায়, ফেসবুকে জানাজানি হওয়ার ব্যাপারেও অনাগ্রহ ছিল তার। শেষের ক’দিন স্বজনেরা এসে দেখতে পারেন নি। কাউকে এলাও করতেন না। যেন-বা টের পেয়েছিলেন এই মিছা দুনিয়াতে—এই ইল্যুসিভ দুনিয়াতে দেখবার আর দেখাবার কিছু নাই।

এই পৃথিবীর জীবন ত তিনি তার তকদির অনুযায়ীই কাটিয়ে গেছেন—এরকম একটা ভাবনা ত আছে। মঞ্জু নিজেও বলেছেন—‎‘ইতা আমার কপালের লেখা’ (আমি, ইস্পাতের গোলাপ)। অন্য সবার মতো এ জীবনের আলো অন্ধকার তাকেও ছুঁয়েছে। (এই জীবনে ভালো-মন্দ দুইই প্রাসঙ্গিক। মন্দের দ্বারাও উপকার হয়।) কিন্তু আমরা মায়ার কারণেই পস্তাই, বুঝি, বড় জলদি চলে গেলেন! এ চলে যাওয়াও তকদির নির্ধারিত দেখি আমরা। মাটির পিঞ্জরে রুহের আসা যাওয়া তার নিয়ন্ত্রণে নয় কি?

জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে এই যে ইন্তেকালকে সেলিব্রেট করবার কথা বলেছেন মঞ্জু, এটি বেশ উঁচু পর্যায়ের উপলব্ধি মনে হয় না? মৃত্যুর মধ্য দিয়ে খোদার কাছেই ফিরে যাওয়া। মৃত্যু সংবাদ শুনলে আমরা বলি—ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, মানে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর, তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন। অতএব, দয়াল মাওলার কাছে প্রত্যাবর্তন সেলিব্রেট করবার বিষয় নয় কি? আরবি শব্দ ইন্তেকাল মানে স্থানান্তর। ইহকালের জীবন থেকে পরকালের জীবনে স্থানান্তর।

জালালউদ্দিন রুমি লিখেছিলেন—

“Our death is our wedding with eternity.”
জন মিল্টন দেখেছিলেন—মৃত্যু গোল্ডেন গেইট।

কবি ও ‘শব্দপাঠ’ সম্পাদক আবু মকসুদ জানালেন, “মঞ্জু ভাই, কারো মৃত্যুতে তেমনভাবে শোক প্রকাশ করতে দেখি নি। মৃত্যু তার কাছে জীবনের মতোই ছিল, স্বাভাবিক।”

কিন্তু এ জগতের জীবন দুঃখের সারাৎসার হয়েও মায়ার ম্যাগনেটিজমেরও এসেন্স—মায়াই ভব—মায়াই আরক। ‘মায়া ছাড়া দুনিয়াতে বড় মাপের কাজ হয় না ‘(হেগেল)। মায়ার কারণেই স্বজনেরা বিষাদাক্রান্ত হয়।

অথচ বিষাদ বিচ্ছেদও ধীরে ধীরে প্রকৃতি এক্সপাঞ্জ করে। বিস্মৃতির ম্যাগনিটিউড কত বড় কে জানে! রূপ বিনাশের ধারা চলমান। মঞ্জুও বুঝেছিলেন শক্তির নিত্যতা বুঝিয়ে দিচ্ছে, এ পৃথিবীও এক সময় থাকবে না। সব ফানা ফানা হবে—(কুল্লু মান আলাইহা ফান, আল কোরআন)। কোথায় গেল গন্দওয়ানা আর লওরাসিয়া মহাদেশ? কোথায় গেল তেদিস মহাসাগর? ২২৫ মিলিয়ন বছর আগে এ পৃথিবীতে হিমালয় পাহাড় ছিল না। কোথায় গেল মেসোজয়িক যুগ? কোথায় থাকবে মনুমেন্ট – সাধের কীর্তিস্তম্ভ? পৃথিবীপৃষ্ঠে ত এই যুগের মহাদেশ মহাসাগরও থাকবে না এক সময়। পৃথিবীটাই থাকবে না এই বিশাল ছায়াপথের সংসারে।


মঞ্জুর জানাশোনা ও বোধের উচ্চতা


অনেক জানাশোনা ছিল তার। পড়তেন প্রচুর। অন্তর্দৃষ্টিও প্রখর ছিল। Leeds থেকে টি এম আহমেদ কায়সার জানালেন, গভীর রাতে মঞ্জুই ফোন করতেন কায়সারকে। তারা আন্তরিক আলাপ করতেন প্রায়ই, বিতর্ক করতেন। কায়সার লিখেছেন—”রাত্রি গভীর হলে জীবন, প্রেম, প্রণয়, নারী, যৌনতা আর কবিতা নিয়ে এত গভীর তত্ত্বালাপ আর কার সঙ্গেই-বা করা যায়! দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু নেই অথচ অমাবস্যা পূর্ণিমার গভীর গভীর রাত্রিগুলি ঠিকই দুয়ারে হানা দিয়ে যাচ্ছে!”

কায়সারের সাথে ফোনালাপে মঞ্জু এ-ও বলতেন, অনেকের সাথে কথার লড়াই করেছেন। এই লড়াই করায় তিনি দুঃখ বোধ করছেন। উল্লেখ্য, মঞ্জু মিস্ত্রাল, গেওর্গে আব্বাস, অভিজিৎ কুণ্ডু ইত্যাদি ছদ্মনামে ব্লগ বা অনলাইন অন্য কোনো সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজের দর্শনের পক্ষে মঞ্জু তুমুল বিতর্ক করতেন। মঞ্জু দেশ জাতি বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সাম্যের কথা বলতেন। ২০০২ সালে প্রকাশিত তার কবিতার বই ইস্পাতের গোলাপ-্এর রিভিয়্যু-তে কবি ফরীদ আহমেদ রেজা লিখেছেন, “মানব সমাজে বিরাজমান বিবাদ ও বিভেদ দেলোয়ার হোসেন ‎মঞ্জুকে ব্যথিত করে এবং তিনি ‎এমন এক সমাজের কল্পনা করেন ‎যেখানে দেশে দেশে কোনো সীমানা থাকবে না। ‎


মঞ্জুর মতে, জীবনানন্দের কবিতায় ডিভাইন ট্রাংকুইলিটি আছে।


‎‘সোনালী নুড়ির দেশে পাখিদের ঘর। পাখিদের বুকে/ কেন যে ‎বসাও বারবার সীমান্ত পিলার!/ ‎অনন্ত নক্ষত্র ছুঁয়ে যায় মানুষের ‎কবর/ তুমি আজন্ম কেন কবরের মতো উদার নও!/ পাখিদের ‎‎‎ঠোঁটের উপরে উড়ে চলে মেঘ; একপ্রস্থ মেঘ/ আমাদের বাড়ির ‎উপর দিয়ে চলে গেল/ তুমি অত ‎‎কেন বাড়ির সীমানা নিয়ে ‎ভাবো!’ (পাখিরা বৈকুণ্ঠে যায় : ইস্পাতের গোলাপ)‎”

মঞ্জু জ্যাক দেরিদাকে পছন্দ করতেন। মিশেল ফুকোর ব্যাপারে ততটা আগ্রহী ছিলেন না। দেরিদা পড়ার ঘোরে থাকা অবস্থায়, তার মতে, একটা ভ্রম বিভ্রমে থাকতে থাকতে মৌলিক ময়ূর বইয়ের কবিতাগুলো লিখা হয়। (নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের সাথে আলাপচারিতা, প্রাগুক্ত) এই আলাপে মঞ্জু জানিয়েছেন, তিনি চেয়েছিলেন ফ্রান্সে গিয়ে জ্যাক দেরিদার সাথে কথা বলতে। কিন্তু দেরিদার ইন্তেকাল হয়ে যাওয়ায় যান নি।

দেরিদা হলেন সেই জ্ঞানী এক মানুষ যিনি আস্তিক নাস্তিক তর্কের শূন্যগর্ভতা মানবজাতির কাছে তুলে ধরেছিলেন। দ্রষ্টব্য—(‘জ্যাক দেরিদার নজরে আস্তিক নাস্তিক পজিশন এবং সর্বশক্তিমানের নিরস্তিত্ব’— সারওয়ার চৌধুরী, পরস্পর ডট কমে প্রকাশিত)।


নতুন নতুন মেটাফর, নতুন ডিনোটেশন


সিরিয়ার মানুষ যখন তাদের দেশাত্মবোধক গানটি গায় সমস্বরে, তারা প্রশান্তি পায়। গানে তারা বলে—
“জান্না জান্না ইয়া ওয়াতান্না… হাত্তা নারাক জান্না।”

অর্থাৎ, “হে স্বদেশ তুই আমাদের জান্নাত… এমনকি তোর আগুনও জান্নাত।”

তার মানে, আরবি শব্দ জান্নাত (الجنة) মানেই  ইসলামি পরিভাষার অর্থ মোতাবেক মরার পরে, বিচারের পরে ‘স্থায়ী সুখের ঠিকানা’ নয়। স্বদেশ স্বভাষার মাঝে, নিজের সংস্কৃতির মাঝে জীবন যাপন করার মানেও জান্নাতে থাকা। তারা খুব মজার ঘ্রাণ নাকে লাগলেও বলে জান্না জান্না।

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু তার কবিতায় জান্নাত শব্দের নতুন ডিনোটেশন করেছেন।

“এইসব হইরো ক্ষেত, লাইবিছরাসহ হাড়িকোণার বেহেশতে দীর্ঘ দিবস বেঁচে রই আমি;”
এখানে ফারসি বেহেশত শব্দের আরবি হলো জান্নাত। এখানে প্রশান্তি দেওয়ার জায়গাগুলো জান্নাত হয়ে এসেছে। বলেছে—

“চাঁদের জান্নাতে তাই খুঁজি পাখিভরা রোদের দুপুর।”

চাঁদ, সে ত কেবল ওই আকাশের চাঁদ না, সে মানবীও হতে পারে। এসব এসেছে ‘নীলকাব্যের বয়াত’ কবিতাটিতে। এসেছে ‘অঙ্গভরা উরিক্ষেত অনঙ্গে সজিদা করে।’ এসেছে বাতাসের সাথে বিবাহের কথা। উল্লেখ্য, জীবনানন্দ দাশের কবিতা পাঠককে স্পর্শ করবার কারণ, মঞ্জুর মতে, জীবনানন্দের কবিতায় ডিভাইন ট্রাংকুইলিটি আছে।

তাছাড়া, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর কাব্যভুবন মানে বিদ্যুতের বাগান। তার কাব্য সংগ্রহের নাম বিদ্যুতের বাগান সমগ্র। মানে, সেখানে তার কবিতার শক্তির, মানে, তার কাব্যভাষার, তার মেটাফরের, উপমার, ছন্দের সৌন্দর্যের, চিত্রকল্পের শক্তি বিস্ময়কর বিদ্যুতের শক্তির সাথে এনালগাস। তার কবিতারা বিদ্যুতের বাগান হওয়াই তার কবিতার নিজস্বতা। তাতে কোথাও কোথাও দুর্বলতা থাকতেই পারে। শক্তিতে সুন্দরে জ্বলজ্বল বেশি। কিছু পঙ্‌ক্তি পড়া যাক—

ট্রাকে করে নিয়ে যায় ‘জলজ্যান্ত ডাহুকের ডাক দরবেশের কবর’
কিংবা
‘দুই চোখে উঠে আসে আগুনের কষ’
অথবা
‘পাললিক পেশীর ভেতরে কেঁপে উঠছে গথিক গির্জার চূড়া’
এবং
“চারটি চাকায় করে নিয়ে যাচ্ছি কুমড়োর বাগান
অস্তিত্বের লাশ ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছি দূরে
ঠেলাগাড়িতে করে বাংলাদেশ নিয়ে যাচ্ছি”
আর
“দূর বিদ্যুতের চূড়া হতে
শঙ্খের আওয়াজ ফেটে পড়ে গমক্ষেতে, নাভির উর্বরে…”
কিংবা
“এইসব রক্তের বেড়ি, কুয়াশাবিচ্ছেদ, এতসব প্রভায় দু-চোখ শক্ত হয়ে এলে আমাদের ট্রেন চলে যায় দূরে ঘোড়ায় চড়ে…”
এবং
“বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকার হয় দেলোয়ার ট্রেডার্স। অন্ধ রাজকন্যার ঘরে তুমি কি কয়েকটি কৃষ্ণবাতি জ্বালিয়ে এসেছ? দেলোয়ার তুমি কেমন আছ”
অথবা
“দেখলাম—গাছের পাতায় পাতায় সবুজ উচ্চাঙ্গ সংগীত বাজছে”


ননলিনিয়ার চিন্তক


বিদ্যুতের বাগান সমগ্র নির্মাণের কবি রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতার সংসারে এপোলিটিক্যাল ছিলেন না, কিন্তু ননলিনিয়ার চিন্তক ছিলেন। অন্যায্য সুবিধা নেয়ার জন্যে, জনপ্রিয় হওয়ার জন্যে, পুরস্কার পাওয়ার জন্যে ঝুঁকে পড়েন নি কোনো দিকে। বলেছেন কবিতাতেই—’পুরস্কারের মুখে প্রস্রাব সর্বদাই স্বতঃস্ফূর্ত’ তার। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে থেকেও দলদাস হয়ে যান নি। স্পষ্ট বলেছেন ফেসবুক স্টাটাসে—

“আমার কোনো দেশ নেই
এই ক্রসফায়ারের দেশ কখনোই আমার হতে পারে না”
বলেছেন—
“একবাক্যে ‘মাদক বিরোধী অভিযান’ শুরু  করা এবং সামাজিক প্রকৌশলের বিষয়টি উপেক্ষা করে মাদকাসক্তদের হত্যা করা রাষ্ট্রীয় বর্বরতা ব্যতিত আর কিছুই নয়।”
বলেছেন—
“দক্ষিণের লম্বা ঘাড়ে তথা প্রতিটি মানব-শরীরে অনেক অনেক মাদক রয়েছে…
এই মাদক
কোন শ্রেণির মাদক, তা নির্ণয়ে বঙ্গকন্যা ব্যর্থ…
আর
স্বপ্নহীন সমাজ হচ্ছে মাদক-উৎপাদনের প্রকৃত মাঠ, তা কি কেউ ভাবে!”
বলেছেন—
“জীবনের কাছে দাস হয়ে গেলে
সুন্দরের ক্রীতদাস হওয়া বড়ই যে কঠিন”

কবি ও চিন্তক দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু জীবনের দাস না হওয়ার চেতনা আমাদেরকে ভাবায়, আমরা ভাবতে থাকি….।

#

সারওয়ার চৌধুরী

কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও অনুবাদক। প্রাক্তন সিলেট প্রেসক্লাব সদস্য। প্রাক্তন সহকারী সম্পাদক দৈনিক জালালাবাদ। একুশ বছর ধরে ইউএই প্রবাসী।

প্রকাশিত বই—

একমুঠো ল্যাবিরিন্থমাখা মায়াবী জীবন তৃষ্ণা [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৬]
অচিন মানুষটির নানা রঙের গল্প [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৭]
বচনে বন্ধনে ঘ্রাণে প্রশ্নোত্তর ফোটে [প্রবন্ধ; আদর্শ, ২০১২]
শিশির ও ধূলিকণা মায়া [গল্প; শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
হারুকি মুরাকামির গল্প ও বচনামৃত [অনুবাদ গল্প; চৈতন্য, ২০১৫]
ভালবাসার চল্লিশ নিয়ম [অনুবাদ উপন্যাস; মূল : এলিফ সাফাক, চৈতন্য, ২০১৬]
সাক্ষাৎকার [অনুবাদ, পাওলো কোয়েলো, হারুকি মুরাকামি, থিক নাট হান]
সংগীতশিল্পী [অনুবাদ, মূল : কাজুও ইশিগুরো, চৈতন্য, ২০১৭]

ই-মেইল : sarwarch@gmail.com