হোম গদ্য তিমিরবিনাশী এক আলোর সন্ধান

তিমিরবিনাশী এক আলোর সন্ধান

তিমিরবিনাশী এক আলোর সন্ধান
430
0

বার বার ডাক আসে রাজপথে নেমে শবের বাহক হতে/ কত শব দগ্ধ করা গেল

সে মারা গেল তারপর। তাকে শ্মশানে নিয়ে যাবার জন্য কেউ সেই মেসে ছিল না। সে ভাবতে লাগল এই দেহ নিয়ে সে কী করবে। ভাবতে ভাবতে কিছু উপায় খুঁজে না পেয়ে নিজেই নিজেকে নিয়ে গেল শ্মশানে।

অথচ ফিরে যাবার কথা ছিল সেই কাশবন হোগলার দেশে। যেখানে ধানের ছায়া মেখে হলুদ হয় নদী। যেখানে রাত্রির কিনার দিয়ে সাদা জ্যোৎস্নায় উড়ে যায় বুনো হাঁস। যে-পথে শেষবার তার দিকে চেয়ে, ঘোমটা টেনে বাঁশের জঙ্গলের ছায়ার ভেতরে চলে গেছে সেই বনলতা। যেখানে চিরকাল সে ঘাসের ভেতরে শুয়ে থেকে লাল লাল বটফলের ঝরে যাওয়া দেখবে ভেবেছিল। ভেবেছিল নীল তারার কাছে জেনে নেবে অচেনা মৃত্যুর ঘ্রাণ।

বাবার চিতাটি হয়তো এখন আর চেনা যাবে না। সেই দুটো ইট চাপা পড়ে গেছে এক শতাব্দীর নিচে। অনেক ভাঁটের জঙ্গল, শিয়ালমুতরির ঝোপ, রাবণলতার বেষ্টনীর গভীর কুয়াশায় ডুবে গেছে সমস্ত ইতিহাস। হয়তো সেই মাঠ আর শ্মশান আজ নেই। সেখানে উঠেছে কংক্রিট, কিম্বা ছুটেছে পিচওড়া অজগর পথ। মুছে গেছে ধানসিঁড়ি, বেদনাবাহিত চিলের আকাশ।

তার যাওয়া হলো না। সে পড়ে রইল এই মাকড়জালের মতো কালো রাজপথের শহরে। সরীসৃপ ট্রামলাইনের সম্মোহনের আলো-আঁধারিতে।

 

‘এরপর কারো আর তিলে তিলে মৃত্যু হবে না ক’/ মৃত্যু বিজ্ঞাপিত হবে—সব মৃত্যু/ সকল শবের চুল পরিপাটি করে আঁচড়ায়ে দেওয়া হবে

নিজেকে পুড়িয়ে সে ফিরে এল। তারপর গভীর রাত্রে দেখল হাজার বছরের পুরাতন চাঁদ নিয়নকুয়াশা খুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে মেসের জানালার কাছে। এখানে আকাশের বিস্তার নেই। জিরাফের মতো আপাতনিরীহ মাথা তুলে আছে অজস্র হিংস্র ইমারত। আলোর দাঁতালো চোখ অস্থির করে রেখেছে বণিকের নগরীর নিত্যকার রাত। সে ধীরে ধীরে বের করে আনল সেইসব তোরঙ্গ। যেখানে তার কবিতারা ঘুমিয়ে আছে কোনোদিন জাগবে না বলে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, মন্বন্তর, তেভাগা, দাঙ্গা, দেশভাগ পেরিয়ে, খাদ্য চেয়ে দু’দুটো রক্তাক্ত বিক্ষোভ আর সত্তরের অগ্নিতারুণ্যের রক্তিম বহ্নুৎসব অতিক্রম করে এসেছে তার গুপ্ত কবিতারা। তার ফেরার পথের উপর উঠে গেছে কাঁটাতার। ভারত ভেঙে পাকিস্তান, পাকিস্তান ভেঙে আরো এক নতুন দেশে গিয়ে পড়েছে তার দেশান্তরিত স্মৃতি।

অত্যন্ত গোপনে সে মেলে ধরল তার কবিতার খাতা।

 

লোহার ফলার পরে কতদিন শিল্পী তার রেখা টেনে যাবে/ তরবার সৃষ্ট হবে—দাঁতের লাগাম ছিঁড়ে যাবে/ হৈমন্তিক ঘোড়াগুলি মুখোমুখি?

এই শহরের বামপন্থি কবিরা তাকে তেমন পছন্দ করে নি। অথচ সে তো তেমন কবিতাও লিখেছে। এক বিখ্যাত বামপন্থি কবি যিনি তাকে ‘পলায়নবাদী’ কবি মনে করতেন, তিনিই এক তরুণ কবিকে একবার একটি চিঠিতে লিখেছিলেন—

‘এখন কবিদের, আমাদের দেশে, টাকার দরকার’—তোমার এই মোক্ষম কথাটা স্বীকার করতে আমার অনেক দিন লেগেছে। এমন কী, নাজিম হিকমত আর পাবলো নেরুদা জোর দিয়ে বলার পরেও। আমার বলার কথা, শুধু ‘টাকার দরকার নয়’, ভালো টাকার দরকার। যাতে বই কেনা যায়, বেড়ানো যায় এবং দরকার মতো না লেখার স্বাধীনতা মেলে।

মর্মে মর্মে সে এই কথাগুলো বোঝে। সে বাবার কাছে গল্পের ছলে একবার বলেছিল, মস্ত একটা মাঠের মধ্যে কুঁড়ে ঘর বানিয়ে থাকার খুব ইচ্ছা তার। সেই মাঠের পাশ দিয়ে বয়ে যাবে কর্ণফুলী, মেঘনা, অথবা ইছামতি। খিদের চিন্তা থাকবে না। দিগন্তবিস্তৃত সোনালি খড়ের মাঠে ঘুরে বেড়াবে সে আর দেখবে লাল আকাশ ভেঙে সন্ধ্যার দাঁড়কাকেরা কেমন ফিরে যাচ্ছে ঘরে। সেখানে সে পড়বে, লিখবে, শুয়ে থাকবে ঘাসের উপর, ইচ্ছেমতো।

তার একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল। আগুনরঙা ফুল ফুটত যার মাথায়। তার নিচে বসে কতবার সে মিল্টন, এলিয়ট পড়েছে। পড়েছে বায়রন কিম্বা মাইকেল। যদি এমন হতো যে তাকে প্রচুর অবসর দেওয়া হলো। সে শুধু লিখবে পড়বে ঘুরে বেড়াবে। সত্যিই কি তাহলে সে আরো ভালো লিখতে পারত? যদি সে স্ত্রী সন্তান এবং বেঁচে থাকার লড়াইকে উপেক্ষা করে ফিরে যেত কার্তিকের নবান্নের দেশে ভোরের ধূসর কুয়াশার সান্নিধ্যে , তবে কি সে আরো বড় কবি হতে পারত?

কিন্তু সে তো যেতেই পারল না। একটা টিউশানির জন্য আটকে গেল। একটা চাকরির জন্য ভীষণ হন্যে হয়ে উঠল। সন্তানের জন্য দুধ-লজেঞ্চুস-খেলনা, মা আর স্ত্রীর জন্য একটি ভালো শাড়ি কিনতে না পারার অক্ষমতা তাকে কিছুতেই শান্তি দিল না। যার জন্য এত সাধনা তার সেই কবিতাও তো তাকে কোথাও, কোনো আলোকিত সত্যে পৌঁছে দিতে পারে নি। সম্পাদকদের তাচ্ছিল্য, সতীর্থদের উপেক্ষা, অবহেলার অন্ধকারে সে তো কবেই ডুবে গিয়েছে।

একজন সৎ কবি কেন জীবদ্দশায় মূল্য পায় না, কেন তাকে রাষ্ট্রের আনুগত্য খুঁজতে হয়, বিক্রি করতে হয় কাকচক্ষু আত্মা? একসময় এই প্রশ্নগুলো যন্ত্রণার মতো তার কবিতার নবপরিভাষা হয়ে উঠল অজান্তেই। তারপরও কি সে ‘পলায়নবাদী’ রয়ে গেল পদাতিক কবিদের আঙিনায়?

 

চারিদিকে উঁচু উঁচু গম্বুজের দ্রাঘিমায় দু’একটা নক্ষত্রের আলো/ খোঁড়া ঠ্যাঙে তৈমুরের মতো এসে ত্রিভঙ্গে দাঁড়াল/ চেয়ে দেখে দেশ তার ভরে গেছে ছিন্নভিন্ন মগজের স্তূপে

মেসের জানালা দিয়ে সে আবার বাইরে তাকাল। এখন অনেক রাত, তবু কলকাতা জেগে আছে। এই কল্লোলিনী তিলোত্তমায় কবিতার স্থান কি সীমিত হয়ে গেছে আজ, জীবন এখন কি খুব দ্রুতছন্দে আঁকা, কোথাও কি তবে আর কোনো অবসরের গান নেই? গাঙচিল শালিক মৃণালিনী সুরঞ্জনা গাঙুড়ের জল, তবে এরা সবাই কি মৃত আজ এই ছিন্নভিন্ন বিবর্ণ স্বদেশে? জেলখানা প্রাচীর ডিঙিয়ে গান ভেসে আসে। কারা যেন গান গায় অন্ধকূপে বসে—ভারতবর্ষ কবে তুমি মানুষের হবে!

 

আমাদের সাহস হারায়ে গেছে বহুদিন পুলিশের ব্যাটনের/ তলে নুয়ে থেকে/ ফুটবল-গ্রাউন্ডের কাছে ব’সে শকুন/ চরানো নীল এশিয়ার দুপুরবেলায়

চারদিকে এত রক্তপাত, এত মৃতপ্রাণের কোলাহল তবু আজ এমন অশ্লীল আড়ম্বর কবিতায় কোথা থেকে আসে? এত মানবতার অপমানেও কবি কি তবে ন্যুব্জ নয় আর? সে তাকিয়ে থাকে তার অক্ষরের দিকে। ভাবে কী হলে ভালো হতো। কেমন লিখলে উপভোগ্য হতো জীবন। সে কি মূর্খ ছিল? কিম্বা পাগল। কিসের বেদনা তাকে টেনে নিয়ে যেতে চায় চিরকাল মন্থরতম ট্রামের আলিঙ্গনে। কেন সে বিচ্ছিন্ন এত? কেন সে দলীয় বিপ্লবে সায় দিতে পারে নি অথচ স্বৈরাচারের কাছে নতজানু নয়।

বণিকের অজগর হাত পৃথিবীতে নির্জন মুছে দিয়েছে আজ। তার কবিতাগুলো যেন পৃথিবীর শেষ চিঠির মতো পড়ে আছে গহিন আঁধারে। শস্ত্রময় শমীবৃক্ষ হয়ে আছে যেন, অজ্ঞাতবাস মুক্তির অপেক্ষায়। সে একটু ভাবে। ভাবতে ভাবতে দেখে অক্ষরগুলোকে চাপা দিচ্ছে তারই দেহপোড়া ছাই। সে তোরঙ্গ বন্ধ করে। মেসে সবাই ঘুমে অচেতন। বাইরে আলোর তারস্বর ছিঁড়ে দু একটা নাগরিক ফিঙে রাত জাগে নির্ঘুম যন্ত্রণায়। ঘোলাটে আকাশ দেখে পৌষ কী মাঘ মাস বোঝা যায় না। সে বাঁধাছাঁদা শুরু করে। ফিরতে হবে তাকে!

 

অনেক জীবন লোক চ’রে যায় চারি-দিকে/ আজ
একটি মৃতকে আজ মনে পড়ে হেমন্তের/ খেতে

ট্রেন চলতে শুরু করে। সামনে অথবা পিছনে ইতিহাস। সে জানালায় মুখ রেখে দেখে কুয়াশায় ঢেকে গেছে মহাপৃথিবী। তার তোরঙ্গগুলো কথা বলে চুপিচুপি। সে শুনতে পায়। তার কানে ভেসে আসে ভৃগু-অনুসূয়া সংলাপ। ভৃগু বলে, ‘কেন মনে করো না, এই কলকাতাই তোমার তপোবন, ওই মিছিল চলছে, ওই তোমার নবমালিকা বনজ্যোৎস্না, ওই একটি ভিখারি মেয়ে তোমার কাছে পয়সা চাইল, সে-ই মাতৃহীন হরিণশিশুটি। ভেবে দেখো, যদি তোমাকে এই বাংলাদেশ ছেড়ে, কলকাতা ছেড়ে, চিরকালের জন্য চলে যেতে হয়—এই সবই তোমার পায়ে পায়ে আঁকড়ে আঁকড়ে ধরবে।’

ট্রেনের গতি বেড়ে ওঠে। প্রবলভাবে দুলতে থাকে ট্রেন। চাকাগুলো যেন আতঙ্কে প্রাণপণে বলতে থাকে, ‘দোহাই আলি, দোহাই আলি’। একটা সংঘর্ষের শব্দ শোনা যায়, সে বাইরে তাকায়। বাজ পড়ছে কাছাকাছি কোথাও। সে চমকে ওঠা বিদ্যুতের আলোয় দেখতে পায় ট্রেন বাফার উড়িয়ে দিয়ে কাঁটাতার ছিন্নভিন্ন করে ছুটে যাচ্ছে। অন্ধকার ছিঁড়ে ডানা ঝাপটায় কিছু পাখি। সে ঝরতে শুরু করে। তার দেহছাই ছড়িয়ে পড়তে থাকে বঙ্গপ্রান্তরজুড়ে। শুধু গুপ্তকবিতাময় তোরঙ্গগুলো থেকে যায় ট্রেনের অনন্ত যাত্রীর মতো। তারা দুলতে দুলতে পেরিয়ে যেতে থাকে পথ, যে পথ তিমিরাধিক আলোর।


ঋণ :

* জীবনানন্দ উপন্যাস সমগ্র
* জীবনানন্দের অপ্রকাশিত কবিতা
* প্রামাণ্য সামসুল হক
* সিনেমা-কোমল গান্ধার

মৃন্ময় চক্রবর্তী

জন্ম ১৯৭৬। কবি, গদ্যকার, অনুবাদক এবং চিত্রশিল্পী।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলি [২০০৪]
এই মৃগয়া এই মানচিত্র [ ২০০৮]
পাঁচালি কাব্য : ভুখা মানুষের পাঁচালি [২০০৯]

সম্পাদিত গ্রন্থপুস্তিকা :

রাত্রির কঠোর বৃন্ত থেকে, মানিক শতবর্ষপূর্তি (শমীবৃক্ষ)
নির্মোহ রবীন্দ্রনাথ (শমীবৃক্ষ)

সম্পাদিত পত্রিকা : মাটির প্রদীপ

ই-মেইল : mrinmoyc201@gmail.com