হোম গদ্য জীবনানন্দের হাঁটা

জীবনানন্দের হাঁটা

জীবনানন্দের হাঁটা
728
0

১.
আমি যদি কোনোদিন চলে যাই এই আলো অন্ধকার ছেড়ে,
চলে যাই যদি আমি অন্য এক অন্ধকার—আলোর আকাশে,
পায়ের অক্ষর যদি মুছে যায় যদি এই ধুলোমাটিঘাসে,
ওগো পথ,—একজন চলে যাবে তবে শুধু;—কখন যে ক্লান্তি এসে ঘেরে
আমাদের,—কখন জড়ায়ে পড়ি অবসাদে—সময়ের ফাঁসে!—
কখন পাতার মতো খসে যাই ক্ষয়ে যাই উত্তর বাতাসে!
কখন মাছির মতো আমাদের মৃত্যু এসে নিয়ে যায় কেড়ে

……..

আমরা জানি না কিছু;—একদিন ওগো পথ,—যাই যদি চলে,—
শীতরাতে স্থির নক্ষত্রের তলে আসে যদি ঘুমের সময়,
মনে হয় যদি ঐ আকাশের নক্ষত্রের সাথে শেষ হলে
মানুষের হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষার তৃপ্তি হয়—শান্তি তবে হয়,—
সেই কথা কে শুনিবে সেইদিন!—তখন যে ঘুমায়ে সকলে;
আমার পায়ের পথ পৃথিবীর সে কি তবু কান পেতে রয়!

বুদ্ধ যেভাবে রাতের অন্ধকারে নিকটজনদের নিদ্রাকালে চলে গিয়েছিলেন ঘর ছেড়ে অজানা ও অনিশ্চিত পথের সন্ধানে, তেমনই এক চলে যাওয়ার আকুতি, আর তার পরাসংবেদ কবিতাটির আত্মায় ধ্বনিত। চলে যাওয়ার জন্য দরকার পথ যা পথিককে পৌঁছানোয় সাহায্য করে। অনেকে যায় আবার ফিরে আসে পথ ধরে, অনেকে আবার ফেরে না, পথই তাকে অদৃশ্য করে দেয়। সেই অর্থে চলে যাওয়া মৃত্যুর দ্যোতকও। মানুষ যখন মরে যায় তখনও তাকে অনুসরণ করতে হয় এক লীনরেখা। এই রেখা ধরেই মৃত্যুযাত্রী পৌঁছে যায় অন্যলোকে। মৃত্যু হচ্ছে প্রাণ-কুলপ্রথা, তাকে সবার গ্রহণ করতে হয়। যেভাবে তীর্থযাত্রীরা পথ ধরে যাত্রা করে তীর্থের উদ্দেশে, যেভাবে পথিক যায় অজানার দিকে, ঠিক সেভাবেই মানুষকে, কোনো এক অদৃশ্যটানে, চলে যেতে হয় জীবনের বাইরে। এই যাওয়ারও শারীরিক-মানসিক-আধ্যাত্মিক লীনরেখা আছে যাকে আমরা বলতে পারি চিরন্তন প্রস্থানপথ। কবিতাটিতে এই অন্তর্ধানের আক্ষেপ কবিতায়িত।

পথ ছিল তার জীবনচিন্তার মতোই দূরগামী, হাতছানিময়, তবে কাঙ্ক্ষিত। পথ ছিল তার পরাভ্রমণ আর ইতিহাস বোধের প্রতীকতাৎপর্য। আর হাঁটা ছিল জন্ম ও জন্মপূর্ব অস্তিত্ববিষয়ক উৎকণ্ঠা। পথ নিষ্ক্রমণের কথা বলে। এক আঁকাবাঁকা অপস্রিয়মাণতার প্রতীক যেন পথ। আর এই পথকে পাড়ি দিতে হয় শারীরযোগে। দৌড়ে পথ পাড়ি দেওয়া যায় না, দূরত্ব অতিক্রম করা যায় মাত্র। অথবা বলা যায়, দৌড় সে-ও এক হাঁটার দ্রুততা।


কবি এক পরিব্রাজক যিনি নশ্বর জীবন থেকে মৃত্যুর অনশ্বর অবস্থানে প্রবেশ করেন।


হাঁটা আসলে পথের হাতছানির ফল, যা হয়তো হয়ে ওঠে জীবনের অনুস্মরণ। হাঁটা তাই পথের অন্তরঙ্গতা, আশ্লিষ্টতা এবং অনিঃশেষ চেতনা। হাঁটা মানে নতুন পথের আবিষ্কার বা পুরোনো পথের নতুন আবর্তন। তার বনলতা সেন কাব্যের শেষ কবিতাটির নাম ‘পথ হাঁটা’, যা এই বিষয়ের এক ইঙ্গিতবাহিতাকে প্রতিপন্ন করে :

কি এক ইশারা যেন মনে রেখে একা একা শহরের পথ থেকে পথে
অনেক হেঁটেছি আমি; অনেক দেখেছি আমি ট্রাম-বাস সব ঠিক চলে;
তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হয়ে চলে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে:

এ পৃথিবীতে কে না হাঁটে? জীবন তো হাঁটা আর হাঁটা, থেমে থেমে হাঁটা বা হেঁটে হেঁটে থেমে যাওয়া। খোঁড়াও হাঁটে, মনে মনে, বা ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে; অন্য প্রাণীরাও হাঁটে। প্রাচীন গ্রিক এরেবুসে মৃতরাও হাঁটে। জেগে ওঠার আগ পর্যন্ত আর জেগে ওঠার পর, হাঁটা চলে বিরাম নিয়ে নিয়ে অবিরাম, পথে-বিপথে, অনন্তের পিছু পিছু, একা বা যৌথভাবে। অনেকে নিদ্রার ভেতরও হাঁটেন, তারা তো স্বপ্নচারী: স্লিপ ওয়াকার। সেই কবির কবিতার মতো যেখানে কবি বলেন, উই আর দ্য স্লিপ ওয়াকার, উই আর দ্য ড্রিমার অফ ড্রিমস। কিন্তু বলতে চাইছি সত্যিকারের সেই হাঁটার কথা, যার পরতে পরতে, যার মুহূর্তপ্রতিমে কেলাসিত হতে থাকে ভাবনা, শেষে যা পরিণতি পায় সৃষ্টিতে। এ পৃথিবীতে হাঁটার সময়টিই মনে হয়, সবচেয়ে সৃষ্টিশীল। দৌড়াতে দৌড়াতে কেউ ভাবতে পারে না। বসে বসে যে ভাবনা, তা মূলত সংযোগরহিত। হাঁটা সৃষ্টিশীল দেহ-অভিভাব, তা মানুষকে করে তোলে ব্যতিক্রমী চিন্তাশীল। কিন্তু তা কখনও কিছু মানুষকে এমন এক আচ্ছন্নতা দেয় যা জীবনকে বিপন্ন করে তোলে চিন্তাকে উসকে দিয়ে। তাকেও তা-ই করেছিল। সেই হাঁটা যা জন্ম দিয়েছিল মৃত্যুপরিণতির, তাকে করেছিল পুরোপুরি আচ্ছন্ন, এমনকি মানসিক সামীপ্যে জগদ্বিচ্ছিন্ন। জেগে জেগে তিনি যেন এ পৃথিবী থেকে বিমুক্ত হয়ে পড়েছিলেন, তা না হলে কেন এই শ্লথগতিযানের নিচে চাপা পড়বেন, কেন আনমনে দাঁড়িয়ে থাকবেন তার বহু কবিতার স্মৃতিধর ট্রাম লাইনের ওপর! হ্যাঁ, জীবনানন্দ দাশ। তার হাঁটার অভ্যাস ছিল বরাবরই। এই হাঁটা ছিল না অবকাশ বা বিনোদনজনিত, বরং তা ছিল চিন্তা ও অনুভূতির সমিধ সংগ্রহের এক সংরাগ; ঠিক নিট্‌শের মতো, বা বিভূতিভূষণের মতো। হাঁটার সময় চারপাশ অন্তর্বীক্ষণে হয়ে উঠতেন ঋদ্ধ, অনুপ্রাণিত, তার ভাষায় : ‘একা একা হেঁটে হেঁটে এদের গভীর শান্তি হৃদয়ে করেছি অনুভব।’ সেই বরিশালের জীবনেও হেঁটেছেন, জানা যায় তিনি হেঁটে হেঁটেই ব্রজমোহন কলেজে যেতেন। ছোটবেলায় বাবার সাথে বাড়ির সামনের খালি পড়ে থাকা জমিতে সকালে বা সন্ধ্যায়, সুযোগ মতো, পায়চারি করে বেড়ানো ছিল তার অভ্যাস। কলকাতায়ও নানাকিছু দেখার টানে, প্রকৃতিকে উপভোগের জন্য, প্রায় দিনেই দীর্ঘ পথ, প্রায় পাঁচ-সাত মাইল, হাঁটতেন তিনি, কখনও সঙ্গীসহ, কখনও-বা একা। সঙ্গী হিসেবে পেতেন প্রতিবেশী বন্ধু সুবোধ রায় বা তরুণ সহকর্মী অজিতকুমার ঘোষকে। কলকাতায় যে-পথরেখা ধরে তিনি ভ্রমণ করতেন তা ছিল—ল্যান্সডাউন ধরে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ দিয়ে কিছুটা পশ্চিম দিকে, এরপর রসা রোড ধরে সাদার্ন অ্যাভিনিউ ধরে গড়িয়াহাটা গোলপার্ক পর্যন্ত; কখনও-বা ঢাকুরিয়া লেক থেকে ছোট লেক হয়ে টালিগঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে হাঁটতেন। বস্তুত হাঁটা ছিল জীবনানন্দের নৈঃসঙ্গচেতনা এবং জীবনাচ্ছন্নতার বাহ্যিক দিক। তার দেহমানসের বাহ্যিকতা হাঁটায় পেত মাত্রা। ভাই অশোকানন্দ দাশ বলছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমাদের রক্তে—বিশেষ করে দাদার—হাঁটার নেশা ছিল। স্মরণপ্রান্তের প্রায় শেষ সীমানায় গিয়ে মনে হচ্ছে, পঞ্চাশ বছর পূর্বে খুব ছোটবেলায় নেপালে নয়,—নেপালের কাছে সুপোলে গিয়েছিলাম। রোজই সকালে ও সন্ধ্যার প্রাক্কালে সেখানকার জনবিরল উদার প্রান্তরে আমরা হেঁটেছি। মাঠে হাঁটতে-হাঁটতে, আকাশের বুকে মেঘ পাল তুলে সাঁতার কেটে যাচ্ছে দেখে, দাদা বলতেন, ‘‘জানিস, বড় হ’য়ে আমি এমন নৌকা তৈরি করব, যাতে করে তুই ওই মেঘের মতন আকাশে বেড়াতে পারবি।’’ মনপবনের নৌকার যারা মাঝি, তারা বলতে পারবেন সে-রকম নৌকা তৈরি হয়েছে কি-না। প্রায় ছোটবেলা থেকেই বরিশালের উপকণ্ঠে শ্মশানভূমির পাশ দিয়ে আমরা দু-জনে হেঁটেছি, অবাক হয়ে কখনো-বা লাশকাটা ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখেছি। কখনও আরও দূরের পাল্লা, শহর ছাড়িয়ে গ্রামের পথে। বর্ষাকালে নদীর তীরে কত সন্ধ্যায় হেঁটেছি,… গিরিডিতে উশ্রী নদী পার হয়ে বালুর তট, আমলকী বনে বহুদিন হেঁটেছি। কখনও হেঁটেছি এপারে ক্রিশ্চান হিলের দিকে।… পুনা শহরে হেঁটে গেছি পার্বতী মন্দিরের চ’ড়ায়, যারবেদায় পর্ণকুটিরের পাশ দিয়ে মূলা-মূথা নদীর সঙ্গমে, মালাবার হিলে, ওয়ার্লির সমুদ্র পাশে, ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস থেকে বান্দায়, বান্দা থেকে সান্টাক্রুজে, সান্টাক্রুজ থেকে জুহুর সমুদ্রতীরে হেঁটেছি। দিল্লির সড়কে… জীবনানন্দ শেষ ঘুমের আগ পর্যন্ত রোজই হেঁটেছেন এক নেশায় আক্রান্ত হয়ে, কোনও সাথির সঙ্গে অথবা সঙ্গীহীন হয়েও।’ অশোকানন্দ হাঁটার যে-সব স্থানের বর্ণনা দিয়েছেন তার সবকিছুই আমরা দেখি জীবনানন্দর কবিতায়, বিশেষ করে আমলকী বন, মালাবার হিল, সান্টা ক্রুজ, জুহু ইত্যাদি। সেই ‘জুহু’ নামের একটি কবিতার শুরুই করেন এই বলে যে, ‘সান্টা ক্রুজ থেকে নেমে অপরাহ্ণে জুহুর সমুদ্রপারে গিয়ে/ কিছুটা স্তব্ধতা ভিক্ষা করেছিল সূর্যের নিকটে থেমে সোমেন পালিত।’ অশোকানন্দ আরও বলেছেন, জীবনানন্দ ‘এক নেশায় আক্রান্ত হয়ে’ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হেঁটেছেন, তার এ কথা যে-এক অমোঘ সত্য তা তো দেখতে পাই জীবনানন্দের কবিতায়ই যেখানে তিনি বলছেন, এক অন্ধ ইশারাকে মনে রেখে একা শহরের পথে পথে হাঁটার কথা। জীবনের শেষ ক্ষণেও ছিলেন সেই ইশারার অমূলপ্রত্যক্ষণে আবিষ্ট হয়ে পদভ্রমণরত, সংবেদনাত্মক আবেশে মুহ্যমানও হয়তো। কিন্তু এটাই হলো তার মৃত্যুরতির শেষ অস্তিত্বগামিতা। সেদিন বরাবরের মতো ল্যান্সডাউনের বাসার দক্ষিণে পার্কে হাঁটাহাঁটি করে যখন ঘরে ফিরছিলেন, ঘরে পৌঁছানোর একশ গজ আগে রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে, ‘জলখাবার’ এবং ‘জুয়েল হাউস’-এর সামনের রাস্তাটি পার হতে গিয়ে, পথের মাঝখান দিয়ে, তার ভাষায়, ‘সর্পিণী সহোদরার মতো’ চলে যাওয়া ট্রাম লাইনের ওপর আনমনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ট্রাম আঘাত করল তাকে। যে-হাঁটা ছিল তার চিন্তা উন্মোচনের এক সংরাগ, তা-ই হলো তার মৃত্যুর কারণ। অনেক দিন আগে লেখা একটি কবিতায় তিনি বলেছিলেন, ‘পায়ের তলে লিকলিকে ট্রামের লাইন’ শাসন করছে তাকে, তা-ই যেন সত্য হলো তার মৃত্যুর পরিধিতে। মহাপথিক জীবনানন্দ হাসপাতালে মৃত্যুদীর্ণ অবস্থায়ও আকাশের দিকে তাকিয়ে পড়তে চাইলেন কবিতা! যে আকাশ তার প্রিয় ছিল, যে-আকাশে তিনি একা একা হাঁটতেন মনে মনে, সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে কবিতা তো তিনিই পড়তে চাইবেন!

হাঁটার কথা—যা ছিল তার শবলিত চারণা, তার যাপনোদ্ভাস—অনেক কবিতায় বলেছেন তিনি। সেই কবে প্রকাশিত তার বিখ্যাত ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতাটি তিনি শুরুই করেছেন এই বলে যে, ‘আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়,/ দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল/ কুয়াশার;’। বুঝতে পারি, এই হাঁটা চিরন্তন-দ্যোতক মহিমা নিয়ে হাজির হয়েছে কবিতাটিতে। এই অভিযাত্রিক আরম্ভ আসলে এক মহাদর্শনের নামান্তর, যা চোখের সামলে খুলে দেয় অন্য এক জগৎ, অন্য এক ভ্রমণের বারতা, যা বস্তুত জীবনমন্থক। এজন্যই তিনি বলতে পারেন :

আমরা মৃত্যুর আগে কী বুঝিতে চাই আর? জানি না কি, আহা,
সব রাঙা কামনার শিয়রে-যে দেয়ালের মতো এসে জাগে
ধূসর মৃত্যুর মুখ;—

তিনি এখানে জীবন থেকে মৃত্যুতে পরিণত করছেন অভিদর্শনকে। এবং এই দর্শন তার কবিতায় ফিরে ফিরে এসেছে, কখনও জীবনবেদের ইন্দ্রিয়গম্যতায়, কখনও-বা মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী রূপকের অন্যত্বে। কবিতাটিতে জীবনানন্দ হেঁটেছেন জীবনের মাঠ থেকে মৃত্যুর বহ্নিহীন প্রান্তরে। জীবনের এক শান্ততা থেকে কবিতাটি উপনীত হয় মৃত্যুর অসহনীয় নির্জনতায়, মনে হয় সব আয়োজন এক চিরবিলীনতায় নিয়তিপ্রাপ্ত। কবিতাটিতে রয়েছে আটটি স্তবক, প্রত্যেক স্তবকে ছয়টি করে পঙ্‌ক্তি। প্রথমেই শুরু হয় কবির পরাভ্রমণের অভিজ্ঞতা দিয়ে : আমরা হেঁটেছি যারা…, তারপর হেঁটে হেঁটে দেখার কথা : দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল…, তারপর ভালোবাসবার কথা : অন্ধকারে দীর্ঘ শীত-রাত্রিটিরে…, তারপর আবারও দেখার কথা যা পরিণত হয় অভিদর্শনে : বুনোহাঁস শিকারির গুলির আঘাত…, তারপরের স্তবকে অনুধ্যানের কথা; আমরা বুঝেছি যারা বহু দিন মাস ঋতু শেষ হলে…, আর অবশেষে সবকিছুকে বাতিল করে এক অপসৃতির অভিজ্ঞানের কথা : আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝিতে চাই আর?… ধূসর মৃত্যুর মুখ… ইত্যাদি। জীবন এক চলমানতা যা নানা মায়াপ্রপঞ্চকে আত্মসাৎ করে মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়।


অস্তিত্বের পরিক্রমণে সত্তা ছাড়া কোনো যান নেই, নিজের ভরকে নিজেই বহন করে পাড়ি দিতে হয় পথনির্জনতা।


কবি এক পরিব্রাজক যিনি নশ্বর জীবন থেকে মৃত্যুর অনশ্বর অবস্থানে প্রবেশ করেন, আর এই অভিযাত্রা দ্রুত তালে হয় না, হয় মন্থর অভিগমনে। তিনি, বিলম্বিত বা সাবলীল মধ্যলয় বা দ্রুতলয়ে চালান তার যাত্রাপথের খেয়াল। এজন্যই কবি বেছে নেন এক আচ্ছন্ন চলন। সেই আচ্ছন্ন চলন যা হাতছানি দেয় এক মহান বিলুপ্ততার—যা তাকে বিপ্রলব্ধ করে জীবন নামক বিশাল প্রপঞ্চের সত্যগুলোকে নিজের মতন করে উপস্থাপন করতে। কী সেই সত্য যার সন্ধান চালান কবি তার জীবনের মিথ্যাগুলোর ভেতর দিয়ে? শব্দসত্য হলো বলার মহিমা যা কবিতাকে প্রথমে ভিন্ন করে অন্য সাহিত্যমাধ্যম থেকে। কিন্তু শুধু শব্দসত্য দিয়ে কবিতার শেষরক্ষা হয় না। কবিতা উদ্ধার করতে চায় জীবনের সেই অবস্থানগুলো, যা হৃত, যা হতে পারত কিন্তু হয় না। কবিতা এর-জন্য পেরিয়ে যায় শব্দসত্যের মতো প্রাথমিক সত্যতাকে, পৌঁছতে চায় সেই প্রতিভাস-এলাকায় যেখানে আপাত সত্যগুলো মিথ্যা হয়ে যায় আর মিথ্যাগুলো কেন জানি সত্য হয়ে ওঠে। এর জন্যই কবিরা ভাষার পেছনের নীরবতায় পৌঁছতে তৎপর হয়ে ওঠেন। ভাষার নেপথ্যনীরবতার প্রকাশই কবিতা। আর মাত্র চিত্রকরদের জন্যই এ কথা খাটে। জীবনানন্দ হলেন এমন একজন কবি যার কবিতা পাঠককে একচ্ছত্রভাবে সেই নীরবতার স্থানাঙ্কে, সেই নৈঃশব্দ্যস্থানে পোঁছে দেয়। পৃথিবীর কবিদের মধ্যে এতটা আচ্ছন্ন চলন, এতটা দ্বিধাগামিতা আর হয়তো চোখে সহজে পড়বে না, যা জন্ম দিয়েছিল সেই মন্থর দর্শনের, আর তা আমাদের দিয়েছে সেই উপলব্ধি যা জীবন নামক অধরা সত্তার তীব্র শৈত্যকে উপলব্ধি করায় নিদারুণ ইন্দ্রিয়বিপর্যয়ে।

২.
আরেকটি বিখ্যাত কবিতার শুরুই হয়েছে এভাবে যে, ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে।’ জীবনানন্দ জীবনের অস্তিত্বের গতায়াতকে হাঁটার রূপকের মাধ্যমে উপলব্ধি করেন এখানে। বরিশালের জীবনে হাঁটা ছিল প্রকৃতি পাঠের এক উপায়। তার নিজের স্বভাবমতে সাবলীল মধ্যলয়ে হাঁটতেন তিনি, দেখে নিতেন গতিশীল মহাজগতের স্ফুলিঙ্গ ও অন্তর্বস্তুগুলোকে। হেঁটেই যেতেন বিএম কলেজে, ফিরেও আসতেন একইভাবে। হয়তো বিকেলে বা সন্ধ্যায় বা রাতে আবার বের হতেন। এক-পা দিয়ে ভর নিয়ে অন্য পা বাড়িয়ে দিতেন অগ্রভাগে, যেন মহাপৃথিবীর দিকে এক পায়ে ভর দিয়ে এক কদম এগিয়ে যাওয়া। হয়তো যেতেন স্টিমার ঘাটে বা কোনো আপাত মন্থর নদীর ধারে, বা কোনো মৌনগ্রস্ত গাছপালাময় প্রতিবেশে থিতু হয়ে থাকতেন কিছুটা সময়, ভুলে যেতেন আপন অস্তিত্ব; মাঝে মাঝে তাকাতেন ওপরে, আকাশের পানে, ভর করত ব্রহ্মাণ্ডের ভার ও বিস্ময়। পরখ করে নিতেন তার প্রিয় নক্ষত্রগুলোকে: স্বাতী, অনুরাধা আরও কত কী! মহাপৃথিবীর প্রথম কবিতার প্রথম পঙ্‌ক্তিটি কি এভাবেই হানা দিয়েছে তার মধ্যে: একবার নক্ষত্রের দিকে চাই—একবার প্রান্তরের দিকে/ অনিমিখে। আামরা জানি অনিমিখ মানে অপলক, আর অপলকভাবেই তিনি দেখতেন এইসব নক্ষত্র বা আকাশ বা জড়ীভূত স্থাবরজঙ্গমাদি। একই কাব্যের অন্য-এক কবিতায় একইভাবে বলা শুরু করে তিনি বলেন ভিন্ন কথা যা তারই হৃদয়ের সংরাগে হয়ে ওঠে অসাধারণ: ‘একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে—একবার বেদনার পারে/ অনেক কবিতা লিখে চ’লে গেল যুবকের দল।’ তো হেঁটে হেঁটে বসে, বা হেঁটে হেঁটে হেঁটে তিনি শোনেন অশ্বত্থের কথাও: ‘বলিল অশ্বত্থ ধীরে: কোন দিকে যাব বলো—তোমরা কোথায় যেতে চাও?’ প্রকৃতির যে প্রকাশ্য ও গুপ্ত জাদুঘর, যা আশ্চর্যজনকই শুধু নয়, অনবরত জন্ম দেয় অনেক আশ্চর্যেরও, তার ভেতরে হেঁটেছেন জীবনানন্দ, তারই স্বভাবভারে, নানা বিভঙ্গে। এভাবেই তাকে গ্রাস করেছে অদ্ভুত মন্থরতার দর্শন, যার ভিত্তি অবাক-করা নিষ্পৃহতা। এ পৃথিবীতে কবি বা শিল্পী, প্রাথমিকভাবে অন্যদের মতোই, যা দেখেন তা আসলে মুগ্ধকর আলো, কিন্তু এর পেছনে থাকে গ্রাসিত অন্ধকার, বা সেই অন্ধকার যা অস্তিত্বের অব্যর্থ রূপকে মসৃণতা দিয়ে যায়, আর কবিরা এই অন্ধকারকে তুলে আনেন নিজ বোধে। তা না হলে মুকুরের উল্টোপিঠে কেন কবি মৃত্যুকে দেখবেন?

৩.
খাপ-না-খাওয়া শব্দবন্ধটি কবিদের জন্য বড়োবেশি ক্লিশে হয়ে গেছে যেন। অব্যবস্থিত শব্দটিও আর টানে না। তবু বলতে হয়, এই পৃথিবীতে জীবনানন্দ অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনকভাবে যেন রয়ে গিয়েছিলেন এক আগন্তুক। মনে পড়ে প্লাতোনের সেই নীতিগল্পের কথা : মানুষটি এক অন্ধকার গুহার দিকে মুখ করে বসে আছে সূর্যের আলোর দিকে পিঠ দিয়ে, আর দেখছে আলো থেকে সৃষ্ট ছায়ার খেলা; আলো আসে বাস্তব জগৎ থেকে আর ছায়া হলো জগৎ। প্লাতোনের ব্যক্তি আসলে দেখছে পেছনে থাকা বাস্তবের অবভাস। জীবনানন্দের মতো কবিরা যেন এই ছায়াবাজির ঘোরে আগন্তুক জীবন কাটিয়ে দেন আর মাঝে মাঝে একান্ত স্বরে বলে ওঠেন: ‘এই কি জীবন? এই-ই কি সব? ও তাহলে এ-ই সব!’ শোপেনহাওয়ার এই জীবনকে বলছেন মিসলিশে সাশে : বেয়াড়া বিষয়; বলেছেন, এর চিন্তনেই জীবন কাটাতে হয় কিছু মানুষকে। জীবন এক অপ্রীতিকর অবস্থা, একে নিয়ে ভেবে ভেবে চালাতে হয় জীবন। তলস্তয়ের যুদ্ধ ও শান্তির পেতার বেজুকভ ভাবে : ‘কাকে বলে মন্দ? ভালোই-বা কী?… কিসের জন্য বেঁচে থাকে একজন? আমি কেন বেঁচে আছি? জীবন ও মৃত্যুই-বা কী?’ এই যে প্রশ্ন, তা নয় অতিপ্রশ্ন, স্বাভাবিক মনের প্রশ্ন; তা শুধু আধুনিকের নয়, চিরন্তন প্রশ্ন, তা তাড়িয়ে বেড়ায় আজীবন কিছু মানুষকে। জীবনানন্দ এই প্রশ্নের মীমাংসায় যান নি, তিনি জানতেন এর মীমাংসা হয় না, বরং এর ভাবনার ভেতরেই জীবন কাটাতে হয়, অভিযাত্রা করতে হয় বলে মনে করতেন। তা না হলে কেন তিনি বলবেন : ‘কত যে কত যে গভীর রাতে/ হেঁটেছি হেঁটেছি শুধু স্তব্ধ গ্যাসপোস্টদের সাথে—।’ নিজেকে তিনি যাত্রী মনে করতেন পৃথিবীর, ‘ব্রহ্মাণ্ডের মতো গোল প্রপঞ্চ’, তার যাত্রী বা সহযাত্রী। আর যাত্রী হতে হলে মাড়িয়ে যেতে হয় পৃথিবীর পথ ও পান্থশালা, অতিক্রম করতে হয় পথের বাঁক ও রহস্য, হেঁটে হেঁটে। কেননা অস্তিত্বের পরিক্রমণে সত্তা ছাড়া কোনো যান নেই, নিজের ভরকে নিজেই বহন করে পাড়ি দিতে হয় পথনির্জনতা।

আধুুনিক ছিলেন জীবনানন্দ, কিন্তু অনুকারক-আধুনিক ছিলেন না। তা হলে লিখতে পারতেন না রূপসী বাংলা বা মহাপৃথিবীর মতো কাব্য। তিনি ছিলেন একঅর্থে আধুনিকতার বিনির্মাণকারী। আধুনিকতাকে তার মনে হতো আপতিক বিষয়। কেননা আধুনিকতার সম্প্রত্যয়গুলো যে অচিরেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে, তা হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। যে-আধুনিক চেতনার মানে পৃথিবীচ্যুতি বা মানববিবিক্তি, যে-আধুনিকতা চেতনার খণ্ডিত উপস্থাপনে আগ্রহী, সেই আধুনিকতাকে মনে মনে মেনে নিলে তিনি বলতে পারতেন না: ‘অনেক রাত্রির শেষে তারপর এই পৃথিবীকে/ ভালো ব’লে মনে হয়।’ দ্বন্দ্ব ছিল তার, সত্যকে আচ্ছন্ন বলে মনেও করেছেন। হয়তো ঈশ্বরে বিশ্বাস ছিল বা ছিল না, হয়তো-বা ছিলেন সন্দেহ বা অজ্ঞেয়বাদী। স্টোয়িকদের মতো নির্বিকারত্বও তার মধ্যে ছিল বলে মনে হয়, আবার বিচলনবোধে, সিদ্ধান্তহীনতায়ও, আক্রান্ত হতেন প্রায়শই। ধর্ম সম্পর্কে তেমন-কিছু বলেনও নি—বলার ক্ষমতা নেই, এই ছুতো তুলে এড়াতে চেয়েছেন ব্যাপারটা। তবে দু-একটি প্রবন্ধে তাকে বলতে দেখি কিছু কথা। ‘যুক্তি জিজ্ঞাসা ও বাঙালি’ প্রবন্ধে তিনি বলেন : ‘বিশ্বাসী ধর্মাশ্রয়ীরা কেবলমাত্র নীতি ও যুক্তিকে ধর্ম ব’লে মনে করে না, এগুলো বাদ দিয়েও ধর্ম চলে, তাদের মতে ধর্মসাধনায় এমন কোনো চৈতন্যের দরকার নেই যার ফলে বিশ্বাস জন্মাবার আগে যুক্তি ও জিজ্ঞাসার জন্ম হয়। কথাটা ভেবে দেখার মতো; হয়তো অসত্য নয়; কিন্তু প্রায় লোকের হাতেই এর অপব্যবহারের সম্ভাবনা, যারা অশিক্ষিত আধা-শিক্ষিত তারাই শুধু নয়, অনেক সুশিক্ষিত বুদ্ধিমান লোকও ভক্তিকেই ধর্ম মনে করেন—অন্ধভক্তিকেও। ঈশ্বর আছেন কি-না স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু খুব সম্ভব কারো নেহাতই ভাবাবেগের ফলের ভিতর তিনি বা তার অন্ধ স্বরূপের কিছু আছে ব’লে মনে হয় না।’ আরও বলেছেন, ধর্মের সত্যগুলো বিজ্ঞানের হাতে চলে গেছে। এখানে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, তথাকথিত পুণ্যের পাপ নিয়ে জীবনানন্দ মৃদুভাবে প্রশ্ন তুলেছেন যা আধুনিকবাদীর আংশিক লক্ষণ। কিন্তু মঙ্গলবোধ ও মানবভাবনা তাকে তাড়িয়ে ফেরেছে, নীতিকে ধর্ম মনে করতে পারলে সুখবোধ করার কথা তিনি বলেছেন। একবার অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত যখন তাকে জিজ্ঞেস করেন ‘কী মানো’, তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘মানুষের নীতিবোধ মানি’। তার তরুণ সহকর্মী অজিতকুমার ঘোষকে কখনও জিজ্ঞেস করে বসেন মৃত্যুর পর ‘কী’ আছে বলে, আবার কখনও তাকে শুনিয়ে দেন মৃত্যুর আগে জন স্টুয়ার্ট মিলের বিখ্যাত উক্তিটি :

যদি তুমি থাকো, তাহলে হে ঈশ্বর, আমার আত্মার মঙ্গল কোরো, যদি আত্মা বলে কিছু থেকে থাকে।

আরেকবার ‘ব্রহ্মে বিশ্বাস করেন কি না’, এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হয়ে তিনি ‘না’ বলে জানান যে, তিনি মানবে বিশ্বাস করেন। তবে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের অন্তিম আলোড়ন যে বিশৃঙ্খলতা আনে, সে-বিষয়ে উদ্বেগের কথাও তিনি বলেছেন। আর একটি বিষয়, রোম্যান্টিকরা যেমন মহাপৃথিবীকে অবলোকনের জন্য কল্পনাপ্রতিভা, জগৎকে বোঝার জন্য প্রকৃতিকে গুরুত্ব দেন, জীবনানন্দর মধ্যেও এর ছায়াসম্পাত কিছুটা হলেও ছিল বলে মনে করা যায়। আমরা জানি ওয়ার্ডসওয়ার্থের ভ্রমণপিপাসার কথা, জানি আরও অনেকে রোম্যান্টিকদের হাঁটার নেশার কথা, কেননা তারা প্রকৃতিকে নিজের মতো পরিগ্রহণের জন্য হাঁটতে ভালোবাসতেন; হাঁটাই বস্তুত বাহ্যপ্রকৃতির সাথে ব্যক্তির প্রত্যক্ষসংযোগ ঘটিয়ে থাকে। এর বিপরীতে আধুনিকরা ঘরকুনো, প্রকৃতিবিমুখ এবং আত্মক্লিষ্ট। এ বিবেচনায় জীবনানন্দকে পাড় আধুনিকের তকমা দেওয়াটা কষ্টকর হয়ে যায়।


মনোশারীরিক জীবনানন্দ শারীরিকভাবে শুধু নয়, মানসিকভাবেও হেঁটেছেন অনেক।


৪.
এই যে অব্যবস্থিত জীবন, এই যে তমসজীবন, এই যে নিরোধজীবন, এই যে আবদ্ধজীবন,—এই ভাবপ্রপঞ্চের আতুরঘর রয়েছে কিছু মানুষের চিন্তায়। তাদের চিন্তাই প্রথম তাদের বুঝতে শেখায় যে, এ পৃথিবীতে সত্তার অবলীলা এমন অবস্থায় আসতে পারে যখন ব্যক্তি তার বিচ্ছিন্নতার বিন্দুটিকে চিহ্নিত করতে পারেন শুধু তার চিন্তার সামর্থ্যে। সাহিত্যের জোরাল দিক হলো, সাহিত্য তার কথা দিয়ে সমগ্রের না-হোক, কিছু মানুষের জীবনকে পরিচালিত করতে পারে। আর এই চিন্তনের সূত্রপাত হতে পারে মন্থর দেহপরিক্রমায়। মানসভ্রমণ কবির স্বাভাবিক অভিমুখ, কিন্তু শারীরিক ভ্রমণ তাকে জোগায় উদ্‌যোগ। আর এ মতে যে চিন্তার উদ্‌গম হয় তারা সূত্রবদ্ধ নয়, তারা খণ্ডিত, এবং তির্যক। জীবনানন্দের কবিতা, এমনকি গদ্যও, কখনও কখনও মনে হয় সামগ্রিক চিন্তার বর্জাইস যা মোটেই অবিচ্ছিন্ন নয়। মনে হয়, কবিতায় অনুচিন্তারা স্থান করে নিয়েছে তার জীবনবীক্ষার কোনো অস্থির মুহূর্তে ভর-করা ভাবনার হঠাৎ-প্রাপ্তিতে, খণ্ডিত উপায়ে। আর মনে করাই যায়, এসব চিন্তা বা তার প্রতীকতার জন্ম হয়েছে কোনো সৃষ্টিশীন হাঁটার সময়ে। হাঁটার সময়, বিশেষত একা হাঁটার সময়, প্রতিটি মানুষই অতিমাত্রায় চিন্তাশীল হয়ে ওঠে। এককভাবে সে বুঝতে শেখে পৃথিবীর বহির্বস্তু ও অন্তর্বস্তুকে, দুইয়ের সম্পর্ককে, তাদের রূপপ্রকৃতি ও অসহায়তাকে। সে সংযোগ স্থাপন করতে পারে মহাপৃথিবীর অদৃশ্য উপস্থিতির সাথে। এটা সম্ভব হয় বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণে। একা হাঁটার সময়টিতে ব্যক্তি চারপাশের জগৎ থেকে মুক্ত করতে পারেন নিজেকে, পরাদৃষ্টির উন্মোচনের মাধ্যমে। এই আপাত বিযুক্তি তাকে আবার যুক্ত করে অন্য কিছুর সাথে। কিন্তু হাঁটার সময় যে-চিন্তারা হানা দেয়, লেখার সময় তার সামগ্রিকতা ভেঙে যায়। ভেঙে যে যায়, তা-ই হয়ে ওঠে কবিতার উপযোগী চিন্তা। তা না-হলে এই চিন্তা কবিতাতে সফলভাবে তার স্থান করে নিতে পারত না। সুতরাং চিন্তা ভেঙে যে অণুচিন্তারা সংবেদিত হয়, কবিতার জন্য তা হয়ে ওঠে মহার্ঘ। জীবনানন্দের কবিতায় এই অণুচিন্তন পুনর্জন্ম নেয়। সুতরাং যে-উপাদান বা গতিভঙ্গি তিনি হাঁটার সময় পেয়েছেন, মনে করা সংগত যে, তারই আভিপ্রায়িক সম্পর্কগুলো কবিতায় প্রতিস্থাপন করেছেন তিনি। রূপসী বাংলার শেষ কবিতাটিতে তিনি বলছেন: ‘মনে হবে, পৃথিবীর পথে যদি থাকিতাম বেঁচে’, অর্থাৎ তিনি চিরপথিক হওয়ার আকুতি প্রকাশ করছেন। আসলে কবি ছাড়া কে আর তাকাতে পারে বস্তুসৌন্দর্যের দিকে আশ্চর্য বিস্ময়ে!

৫.
মনোশারীরিক জীবনানন্দ শারীরিকভাবে শুধু নয়, মানসিকভাবেও হেঁটেছেন অনেক। আমরা যাকে বলি দেহ, আত্মা, প্রাণ—তা আসলে একই জিনিসের তিনটি অবস্থান: দেহ হলো অস্তিত্বের বস্তুপ্রপঞ্চ, আত্মা হচ্ছে দেহের অশারীরিক প্রপঞ্চ আর দেহ ও আত্মার স্পন্দনই হলো প্রাণ। সুতরাং সৃষ্টিশীলদের হাঁটা বস্তুত এই তিনটিরই হাঁটা, কেননা এ তিনটির গতি ও সংগতিতেই বেজে ওঠে তাদের ভাবনার কনচের্টো। হাঁটা ছিল তার স্নায়ুর সংরাগ, সতেজ হতো তার স্নায়ুধারা, দিনে যা হয়ে যেত ম্রিয়মাণ রাতে হাঁটার সময় তা-ই হয়তো হয়ে উঠত চাঙা, সতেজ। জীবন-বাস্তবতা তাকে কি আর সুখে রেখেছিল! সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা বা রাত, যখনই হেঁটেছেন তিনি, দেহের সাথে সাথে আসলে হেঁটেছে তার চিন্তা, হেঁটেছে তার স্পর্শকাতর মন। জানা যায়, সন্ধ্যা বা রাতেই হাঁটতেন তিনি। ভোর হলো আলোর অভিযাত্রা, আলো কিভাবে অন্ধকারকে ভেঙে রূপায়িত করে বস্তু-অবয়ব, তা ধরা পড়ে সকালে হাঁটার সময়, আর সন্ধ্যা হলো আলোর অপস্রিয়মাণতা, অন্ধকারের মূর্ততা—বস্তুরাশি যেন অন্যরূপে প্রকাশিত হতে থাকে তখন; আর রাত হলো প্রগাঢ় নিবিড়তা যখন অন্ধকারের স্থিরতায় ভাবনারা রহস্যগ্রস্ত হয়। এটা স্বাভাবিক ঠেকে যে সন্ধ্যা আর রাতই জীবনানন্দের হাঁটার ঠিক সময়, কেননা তিনি তো অন্ধকারেরই প্রতিভাসনির্মাতা। সে যা-ই হোক, কিন্তু মানসিক জীবনানন্দ হেঁটেছেন আরও বেশি। তার মানসিক পয়দল ছিল সার্বক্ষণিক। কিন্তু কোথায় ছিল এই ভ্রমণ? এ জগৎ এক রহস্যময় জাদুঘর, এখানে জীবন্ত সত্তারা ঘুরে বেড়ায় আপন খেয়ালে, কেউ কেউ ঘুরে বেড়ায় জীবন্মুক্ত হয়ে; অপ্রাণ বস্তুরাও এখানে ঘোরার জন্য হয়ে পড়ে উদ্যত, কোনো অজানার তরে যেন তারা গমনোন্মুখ, সমগ্র মাধ্যাকর্ষণকে পেরিয়ে যাবার জন্য যেন তারা এক মুক্তবেগ পেতে আকাঙ্ক্ষী জীবনানন্দ হেঁটেছেন এই আশ্চর্যলোকে, হেঁটে হেঁটে আত্মসংবেশে মায়াবলোকন করেছেন এই অন্তর্বাহী জাদুঘর, তাতে আত্মভূত হয়েছেন, যেন তিনিও তা-ই। আমরাও হাঁটি এখন তার শব্দ-নিঃশব্দময় ভুবনে। কিন্তু যে-শারীরিক হাঁটাকে অন্তরঙ্গ করেছিলেন তিনি, সেই হাঁটাই হয়ে দাঁড়াল তার অস্তিত্বলোপী করালবিনাশক। ১৪ অক্টোবর, একা একা সেই সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার পথে…

হেঁটেই যেন তিনি প্রবেশ করলেন মহাকালের অতলত্বে!

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা: লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব ( ২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২), তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪);

প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬), অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯),মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫);

অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪)।

ই-মেইল : kumar.4585@yahoo.com
কুমার চক্রবর্তী