হোম গদ্য জাতির আত্মপরিচয়ের পথ দেখায় সেলিম আল দীন

জাতির আত্মপরিচয়ের পথ দেখায় সেলিম আল দীন

জাতির আত্মপরিচয়ের পথ দেখায় সেলিম আল দীন
243
0

স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের আত্মপরিচয় থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আজ বাংলাদেশ স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছর অতিক্রম করল অথচ হাজার বছরের নিজস্ব ইতিহাস ঐতিহ্য কিংবা মূল্যবোধে জাতিগত জাগরণ ঘটল না। উপরন্তু ব্রিটিশদের সৃষ্ট ইতিহাস-কর্মবলয়েই আমরা ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছি। ইউরোপীয়দের সৃষ্ট অনুকৃতির বলয়েই ঘুরছি। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে সেলিম আল দীনই [জ. ১৮ আগস্ট, ১৯৪৯- মৃ. ১৪ জানুয়ারি, ২০০৮] প্রধান; যিনি দেখালেন সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিতে বাংলাদেশ কিভাবে নিজস্বতার বিকাশ ঘটাতে পারে; কিভাবে আত্মপরিচয়ের দৃপ্তিতে বিশ্বমাঝে ভাস্কর হয়ে উঠতে সক্ষম। তিনি গবেষণা, শিক্ষকতা/ বক্তৃতা, নাট্যরচনা, সম্পাদনাসহ নানা মাধ্যমেই হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোয় সমকালীন বিশ্বনন্দনে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় সৃষ্টিতে ব্যাপ্ত ছিলেন। বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপরিচয় সৃষ্টিতে সেলিম আল দীনের দেখানো পথটি কী এ প্রসঙ্গের সংক্ষিপ্ত কলেবরের অনুসন্ধানে ব্যাপ্ত থাকব আমরা এ আলোচনায়।


ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতিকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন সেলিম আল দীন। 


বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়—ফ্রান্স ফ্যানন তার ব্যাখ্যানে কিভাবে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর উপর উপনিবেশ দৈহিক মানসিক নির্যাতন চালায়, স্থানীয়ের জীবন-সংস্কৃতিতে নষ্ট করে দেয় এবং মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি বিকৃত তৈরি করে তা পর্যবেক্ষণ করে উপনিবেশিত সংস্কৃতি থেকে মুক্তির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে জাতীয় সংস্কৃতির পুনর্জাগরণকেই বেশি গুরুত্ব প্রদান করেছেন। সেলিম আল দীনও ইতিহাস-নাট্য-সংস্কৃতির ধারায় বাংলাদেশে বিদ্যমান উপনিবেশের প্রলেপগুলো চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টাতেই ব্যাপ্ত ছিলেন সমগ্র চিন্তা-মানস-কর্ম নিয়ে। তত্ত্বভিত্তিক তর্ক-বিতর্কমূলক গ্রন্থ রচনায় প্রবৃত্ত না হয়ে প্রতিটি গবেষণা, নাট্যরচনা, সংস্কৃতির নানা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে তার প্রচেষ্টা ছিল উপনিবেশের জ্ঞানতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারায় নিজস্বতার বিকাশ ঘটানো। ফ্যাননের আন্দোলন অনেকাংশেই রাজনীতি-নির্ভর হবার কারণে জাতীয়তাবাদী চেতনা, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে এক করে জাতীয়মুক্তির পথে এগিয়েছেন। ফ্যাননের আন্দোলন প্রথম পর্বে উপনিবেশিত জাতির রাজনৈতিক চেতনা লাভ করাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত জাতির আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা; তৃতীয় পর্যায়টি সম্পূর্ণ আন্দোলন কেন্দ্রিক পরিবর্তন। ফ্রান্স ফ্যানন আলজেরিয়ার প্রেক্ষিতে দেখান যে, ঔপনিবেশিক শক্তি শুধুমাত্র বস্তুগত আধিপত্যই বিরাজমান রেখে ক্ষান্ত হয় না; মন-মানসিকতার উপরও দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্যবাদী গভীর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। তা জাতিকে হীনম্মন্য ও জাতীয় জাগরণের বিপরীত অবস্থা সৃষ্টিতে তৎপর থাকে। সেলিম আল দীন সরাসরি উপনিবেশ বিরোধী রাজনৈতিক কোনো আন্দোলনে জড়িত ছিলেন না। গবেষণায় ইতিহাসের পুনরুদ্ধার, তত্ত্বায়ন ও নাট্যরচনায় উপনিবেশের জ্ঞানতত্ত্বকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে এগিয়েছেন। বক্তৃতা ও শিক্ষকতায় হাজার হাজার অনুসারী তৈরিতে সচেষ্ট ছিলেন। ‘হাতের মুঠোয় হাজার বছর, আমরা চলেছি সামনে’ শ্লোগান দিয়ে জাতীয় সংস্কৃতির জাগরণকেই আত্মপরিচয়ের সূত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন। আফ্রিকার নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গার মতো মানসিক উপনিবেশের প্রত্যাখ্যানও অত্যন্ত জোরদারভাবে সেলিম আল দীনের গবেষণা ও অন্যান্য নানা আলোচনায় প্রতীয়মান হয়। এডওয়ার্ড সাঈদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিপরীতে সেলিম আল দীন উপনিবেশের দুশো বছরের মধ্যখণ্ডন উপেক্ষায় সংস্কৃতির বিকাশে এগিয়েছেন। কিংবা হোমি কে ভাবার হাইব্রিডিটি, মিমিক্রির বিপরীতে ঐতিহ্যের ধারার নতুন নতুন নানা তত্ত্বের উদ্‌ঘাটন করেছেন। বাংলার শিল্পকৌশলকে দ্বৈতাদ্বৈতাবাদী শিল্প নামে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশে শহীদ আল বোখারী ধ্যান শিখনের মধ্যে দিয়ে বাঙালি জাতির গৌরবান্বিত বিস্মৃতির আত্মজাগরণমূলক কর্মধারায় ব্যাপ্ত থাকলেও সেলিম আল দীন সংস্কৃতির তত্ত্বকরণ ও নাট্যরচনার পথে এগিয়েছেন। গায়ত্রী স্পিভাকের সাবঅল্টার্নের মতো তাত্ত্বিক ব্যাখ্যানে না গিয়ে বিকাশ ঘটিয়েছে ব্রাত্য অস্পৃশ্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনসংস্কৃতির। সেলিম আল দীন বলেন ‘জাতির আত্মবিশ্বাসের দালান ধার-করা ইটে তৈরি করার প্রয়াস বন্ধ হোক। আজ জাতিকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করতে হবে। শিকড়হীন রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিকরা কি করছেন আমরা তার থোড়াই তোয়াক্কা করি। আমরা চাই বাংলাদেশের মঞ্চ ও বাংলাদেশের রাস্তাগুলো নিজস্ব ভঙ্গিতে নেচে উঠুক। নেচে উঠুক নিজস্ব সম্পদের গৌরবে। সবগুলো দল এই সত্য অনুধাবন করুক যে—নিজের হাতে বাঁধা রাস্তাতেই একটা জাতিকে চলতে হয়—অন্য কারো রচিত পথে নয়—উপলব্ধি করুক—নাটক তার আনন্দ নাটক তার জীবনের নবনির্মাণ। [সেলিম আল দীন রচনা সমগ্র, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৭২]

সেলিম আল দীন নাট্যসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করলেও বাংলাদেশের অন্যান্য জ্ঞানকাণ্ডের নানা দিকেই গতি নির্দেশ করেছেন। তিনি মনে করতেন, আমাদের মধ্যে উপনিবেশের সৃষ্ট হীনম্মন্যতা এখনও ক্রিয়াশীল। ঔপনিবেশিকরা আমাদেরকে স্বাভাবিক পথে যেমন বিকশিত হতে দেয় নি তেমনি তাদের রক্তচক্ষুর শাসনে আমরা আমাদের শিল্পভূমি থেকে বিচ্যুত হয়েছি। [থিয়েটার স্টাডিজ, সংখ্যা-০৯, পৃষ্ঠা-১১] পরম্পরায় তা বিদ্যমান রেখে চলেছি। সেলিম আল দীন প্রচলিত বিভ্রান্তিমূলক নাটকের ইতিহাসের বিপরীতে বাঙলা নাটকের হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তার গবেষণাগ্রন্থ মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, এতে ইতিহাসের বিভ্রান্তি এবং বাঙলার হাজার বছরের নাট্যসংস্কৃতিগুলো তুলে ধরেন। ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্রে উল্লিখিত ‘ওড্রমাধগী রীতি’ বাঙলা অঞ্চলেরই প্রাচীন নাট্যরীতি। বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধন সংগীত ‘চর্যাপদ’-পূর্ব কাল থেকেই বাঙালি জীবনে নাট্যসংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল। আজকের প্রসেনিয়াম নাট্যচর্চা পাশ্চাত্যের আরোপণ বা প্রভাব। হাজার বছরের বাঙলার নাট্যচর্চা ইউরোপীয় তত্ত্বাদর্শ থেকে ভিন্ন রূপ ও রীতির। সেলিম আল দীন বিশ্বাস করতেন বাঙলায় নাটকের উদ্ভব ও বিস্তার ইংরেজ শাসনামলে নয়। নানা রূপ ও রীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বাঙলার জনপদে বাঙলা নাট্য বিদ্যমান ছিল। [মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র, খণ্ড-০৪, পৃষ্ঠা-৩২১] সেলিম আল দীন বাঙলার নাট্যবৈশিষ্ট্যে তুলে ধরেন বর্ণনাত্মক বাঙলা নাট্যরীতি, বর্ণনাত্মক নাট্য-অভিনয়রীতি, কথানাট্য, পাঁচালিরীতি—যা বাঙালি নাট্য-ঐতিহ্যের দীর্ঘদিনের সম্পদ। তিনি আরো দেখান যে, পাশ্চাত্যের মতো সুনির্দিষ্ট চরিত্রাভিনয় রীতিতে আবহমান বাঙলার নাট্য নয়। বাঙলা নাট্য আসরকেন্দ্রিক নৃত্য-গীত-অভিনয় ও কাহিনির অদ্বৈত সমন্বয়ে গঠিত ও উপস্থাপিত। [প্রাগুক্ত, পৃষ্টা-৩৫৫] বাঙালি জাতির মহাজাগরণকারী শ্রীচৈতন্যদেবের ‘অচিন্ত্যদ্বৈতবাদ’ ধর্মচেতনার আলেখ্যে সেলিম আল দীন ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ নামক ধারণায় পৌঁছান। বাংলা পরিবেশনা শিল্পরীতির বৈশিষ্ট্য হলো—দ্বৈতাদ্বৈতবাদ অর্থাৎ একের মধ্যে বহুত্বের অবস্থান। একই আঙ্গিকের শিল্পের মধ্যে বহুবিধ আঙ্গিকের শিল্পের সমন্বয় ঘটে। পাশ্চাত্যের রীতি সুনির্দিষ্ট চরিত্রাভিনয় রীতি। বাংলার পরিবেশনা শিল্পে একজনই ঘটনা বর্ণনা করেন, গান করেন, বিভিন্ন চরিত্রে একজনই অভিনয় করেন। অর্থাৎ এ একের মধ্যে বহুত্বের বৈশিষ্ট্যই আমাদের শিল্পবৈশিষ্ট্য।

ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতিকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন সেলিম আল দীন। শুরুর দিকে নিরীক্ষাধর্মী নাটক রচনা করলেও পূর্ণাঙ্গ পর্যায়ের রচনাগুলোর মধ্য দিয়ে উপনিবেশের অবলেশ পুরোপুরি পরিত্যাগ করেছেন। তার নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম—‘মুনতাসির’, ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘শকুন্তলা’, ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘হাতহদাই’, ‘চাকা’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘প্রাচ্য’, ‘বনপাংশুল’, ‘হরগজ’, ‘নিমজ্জন’, ‘ধাবমান’, ‘স্বর্ণবোয়াল’, ‘ঊষা উৎসব’, ‘পুত্র’ প্রভৃতি।

সেলিম আল দীন নাট্যচর্চায় বিষয়বস্তু, ভাষা, চরিত্র, রচনারীতি, দর্শন প্রভৃতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় তাত্ত্বিক ভিত্তিকে পরিত্যাগ করেছেন। তিনি ‘শকুন্তলা’ ও ‘কিত্তনখোলা’ নাটকে হাজার বছরের বাঙলা সংস্কৃতিকে মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় উন্মোচন করেন। পাশ্চাত্যের মতো দ্বন্দ্ব-নির্ভরতা পুরোপুরি পরিত্যাগ করেছেন। কিত্তনখোলা নাটকটি সর্গ বিভাজনে রচিত। শিরোনামভিত্তিক একটি মেলাকে উপজীব্য করেছেন এ নাটকে। এতে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার, বাঙালি সংস্কৃতির আচার-উপকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাঙলা মঙ্গলকাব্যের সমকালীন এক ধরনের নিরীক্ষাও হতে পারে এ নাটক।

‘চাকা’ নাটকে পাশ্চাত্য নাট্যরীতিকে তিনি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন। আবহমান বাঙলার কথকতার ধারায় রচনা করেছেন এ নাটক। উপনিবেশের দুশো বছরের মধ্যখণ্ডন না থাকলে কথকতা হয়তো আজকের দিনে কথানাট্যে বিবর্তিত হতে পারত। সংস্কৃতের ‘কথা সরিৎসাগর’-এর রচনারীতিকে অবলম্বন করে লম্বক ও তরঙ্গ বিভাজন করেছেন। ইউরোপীয় বিরাম-চিহ্ন পরিত্যাগ করে আবহমান বাঙলার পালা রচনারীতির মতো বিরাম-চিহ্ন ব্যবহার করেছেন। বাঙালি সংস্কৃতিতে বেনামি একটি মৃতদেহকে তার পরিজনের কাছে পৌঁছানোর মানবিকযাত্রার কাহিনি বাঙালি সমাজ, জীবন, বোধ, রুচি-আচার ও নান্দনিকতায় তুলে ধরেছেন। এ নাটকের মাধ্যমে সেলিম আল দীন মূলত স্পষ্ট করে তুলতে চেয়েছেন ইউরোপীয় রীতির বিপরীতে হাজার বছরের বাঙলার নাট্যরীতিকে।

উপনিবেশের সাহিত্যের প্রকরণ বিভাজন এতে উপেক্ষিত। হাজার বছরের বাঙলার কাব্যবৈশিষ্ট্য যেমন এতে বিদ্যমান, তেমনি উপনিবেশ জ্ঞানতত্ত্বের গল্প ও উপন্যাসের সমস্ত উপাদানগুলোও এতে লভ্য। তার ‘হাত হদাই’ নাটকে অঞ্চলিক মানুষের জীবনযাত্রা যে মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় বিধৃত হতে পারে সে চিত্রই তিনি তুলে ধরেছেন। তার কথানাট্যরীতির আরেকটি নিরীক্ষামূলক রচনা ‘যৈবতী কন্যার মন’। এ নাটকে উপনিবেশ সাহিত্যধারাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যধারার সঙ্গে সমসাময়িক ধারাকে বিকশিত করার প্রয়াসে ব্যক্ত নাট্যকার। বাংলা নন্দনতাত্ত্বিক শিল্পরীতিও এ নাট্যে প্রায়োগিক আখ্যানে একীভূত। এ নাট্যে কোনো ধরনের পাশ্চাত্যরীতির দৃশ্যবিভাজন, সংলাপ নেই। বর্ণনা, কথোপকথনের মধ্যদিয়ে বাঙালি সমাজ-সভ্যতার চিত্র বিনির্মিত হয়েছে। সেলিম আল দীন বাঙলা পাঁচালি রীতির আদলে কথা, পদ, নাচাড়ি, বোলাম প্রভৃতি এবং সংগীতরীতির রাগ-আশ্রয়ে রচনা করেছেন ‘বনপাংশুল’ নাটক। এ নাটকের মধ্যদিয়ে বাঙলার নৃগোষ্ঠীর কৃষ্টি, সভ্যতা, জীবনপ্রবাহ তুলে ধরেছেন।


সেলিম আল দীন মূলত তার নাট্যরচনায় স্পষ্ট করে তুলতে চেয়েছেন বাঙলার হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।


বাঙলার আখ্যানরীতির বৈশিষ্ট্যে নাটগীত ও অন্তিম ভাটিমার সংযুক্তি ঘটিয়েছেন নাট্যকার। বাঙালি জীবনদর্শনের নব দার্শনিক ব্যাখ্যা সেলিম আল দীনের ‘প্রাচ্য’ নাটক। পাশ্চাত্য জীবনবোধের বিপরীতে প্রাচ্য জীবনবোধের রূপই এখানে ফুটে ওঠে। দরিদ্র সয়ফর নোলককে বিয়ে করে আনলেও বাসর রাতে সর্পদংশনে স্ত্রী মারা যায়। বিয়োগান্তক আখ্যান এ ‘প্রাচ্য’ নাটক। ক্ষমা করে দেয়ার মতো প্রাচ্যের দর্শন এখানে দলিল হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এতে বাঙলার প্রকৃতি, সমাজ, সংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন, শোষণ, নিপীড়ন, আচার, অনুষ্ঠান, কৃত্য, বিশ্বাস বিবৃত। পাশ্চাত্যের নাট্যরীতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বাঙলা পাঁচালি রীতির কথা, পদ, শিকলি, নাচাড়ি, বোলাম বিভাজনে সমন্বিত। সেলিম আল দীন রচিত আরেক মানবিক আখ্যান ‘হরগজ’ নাটক। এটিও মহাকাব্যিক বিস্তারে রচিত। এ নাটকে বাঙলা নাট্য অভিনয়রীতির নিরীক্ষা করেছেন সেলিম আল দীন। পাশ্চাত্যের চরিত্রাভিনয় অভিনয়রীতির বিপরীতে বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতি তুলে ধরেছেন। বিশ্বের তাবৎ গণহত্যা-গুপ্তহত্যার প্রেক্ষিতে এক আগন্তুকের মহাজাগতিকে পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতা ‘নিমজ্জন ’নাটকের বিষয়বস্তু। হাজার বছরের বাঙলার রচনারীতির আদলে ঘটনা প্রবাহের শিরোনাম দিয়েছেন। বলা যায়, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা এ নাট্যকে নিয়ে গেছে মহাকাব্যিক আখ্যানে। ‘ধাবমান’ ‘পুত্র’ ‘স্বর্ণবোয়াল’ ইত্যাদি নাটকে ইউরোপীয় আদর্শকে পরিত্যাগ করে বাঙলার জীবনবোধ ও সাহিত্য রচনারীতি গ্রহণ করেছেন।

সেলিম আল দীন মূলত তার নাট্যরচনায় স্পষ্ট করে তুলতে চেয়েছেন বাঙলার হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। উপনিবেশকে প্রত্যাখ্যান করে জাতির নিজস্ব আত্মপরিচয়কে সুদৃঢ় করা। এ ছাড়াও বাঙলার হাজার বছরের নাট্য সংস্কৃতির নানা বিষয়ের তত্ত্বায়ন করেছেন। বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের নানা বিষয় নিয়ে সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন ‘বাঙলা নাট্যকোষ’। তিনি এ গ্রন্থের মাধ্যমে বাংলার অতীত সংস্কৃতি যে কত সমৃদ্ধ ছিল তা তুলে ধরতেই প্রয়াসী ছিলেন। অবশ্য সত্যি যে, প্রায় ছ’শয়ের অধিক অন্তর্ভুক্তিতে অতীতের গৌরবান্বিত সাংস্কৃতিক জীবনের অস্তিত্বকেই প্রকাশ করে। বাঙালির জাতিগত আত্মপরিচয় সৃষ্টিকে তিনি সর্বাত্মক গুরুত্ব দিতেন। বাঙালির রুচি ইউরোপীয় রুচিবোধ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি এদেশের প্রতিটি মাধ্যম থেকেই ইউরোপীয় অপকৃষ্টগুলোকে পরিত্যাজ্য মনে করতেন। তিনি আনন্দের স্বাদ পেতেন স্বভূমিজ চিন্তার বিকাশে—নিজ জাতির বহমান শিল্পসাহিত্যের বিকাশে। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে আত্মপরিচয়ে দাঁড়ানোর গৌরবে। সেলিম আল দীন কামনা করতেন বিদ্বেষহীন নতুন এক সভ্যতার। স্বাধীন আত্মপরিচয়ে উজ্জ্বল নতুন এক জীবনের।

সেলিম আল দীন ঐতিহ্যের ধারায় আদর্শ প্রতিস্থাপনে তার নাটকগুলো দেশীয় আবহমানকালের রচনারীতিতে অনবদ্য শিল্পভাষে তুলে ধরেছেন। পাশ্চাত্যের শিল্পরীতির গদ্য-পদ্য-অঙ্ক বিভাজনকে উপেক্ষা করেছেন। পাশ্চাত্যের দৃশ্যবিভাজনের বিপরীতে গ্রহণ করেছেন বাঙলার হাজার বছরের বহমান পাঁচালি, কথকতা ধারায় এবং বর্ণনাত্মক বৈশিষ্ট্যের আধুনিক বাংলা নাট্য। আবহমান বাঙলায় আসর ও পালা কেন্দ্রিক সমন্বিত দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব। প্রতিটি নাটকের বিষয়বিন্যাসে স্থান দিয়েছেন হাজার বছরের বহমান বাঙালি জীবন, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, বোধ-বিশ্বাস ও সমাজ-সভ্যতার। ঐতিহ্যের ব্যবহারমূলক বিভ্রান্তিতে তিনি না পড়ে ঐতিহ্য-বিকাশী চিন্তাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ আলোচনাটি আমরা শেষ করতে পারি সেলিম আল দীনের নিজের সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন [সাক্ষাৎকার, থিয়েটারওয়ালা) দিয়েই—‘আমি শুরু করেছি, আমার লেখা পাঠে অভ্যস্ত হতে সবারই সময় লাগবে। তবে এক সময়ে আমার লেখার ভেতরে যখন সে প্রবেশ করতে পারবে, আজ না হোক, কয়েক বছর পরেও, তখন বুঝতে পারবে, আমি কেমন করে ঔপনিবেশিক জাল ছিন্ন করে মানুষকে হাজার বছরের ঐতিহ্যের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছি।’

আবু সাঈদ তুলু

জন্ম ১ মার্চ, ১৯৭৯; জামালপুর । তিনি শৈশব থেকেই সাহিত্য-শিল্পের প্রতি অনুরাগী। দীর্ঘদিন ধরে নাটক, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখে আসছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।

প্রকাশিত বই :

লিপির উদ্ভব, ক্রমবিবর্তন ও বাংলা লিপির পরিণত পর্যায় [প্রবন্ধ; অন্তরীপ পাবলিকেশন, ২০০৭]
বিপ্রলব্ধ [উপন্যাস; শিখা প্রকাশনী, ২০০৮]
রূপান্তরবাদ [শিখা প্রকাশনী, ২০০৯]
অনন্তপথের যাত্রী [ভাষাচিত্র, ২০১৪]
জলের আয়না [ভাষাচিত্র, ২০১৫]
পাতার বাঁশি [লিটলবিট, ২০১৭]
সেলিম আল দীনের সাহিত্য ভাবনা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮]

ই-মেইল : tuluart@yahoo.com