হোম গদ্য জাক লাকাঁ, সলিমুল্লাহ খান ও সিকদার আমিনুল হকের ঈষৎ ‘অজ্ঞান’

জাক লাকাঁ, সলিমুল্লাহ খান ও সিকদার আমিনুল হকের ঈষৎ ‘অজ্ঞান’

জাক লাকাঁ, সলিমুল্লাহ খান ও সিকদার আমিনুল হকের ঈষৎ ‘অজ্ঞান’
643
0

বিশ্বখ্যাত ফরাসি মনঃসমীক্ষক ও দার্শনিক জাক লাকাঁর সাইকো-এনালাইসিস তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্ট ‘দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য আনকনশাস’ বা ‘অজ্ঞানের ভাষা’ খোঁজার নামে অধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবী সলিমুল্লাহ খান বাংলাদেশে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, চলচ্চিত্র, ইতিহাস রচনাপাঠে নতুন একটি দরজা উন্মোচন করেছেন। আমার জানা মতে এরকম আলোচনা বাংলাদেশে এই প্রথম। সম্প্রতি কবি আবুল হাসানের আত্ম-আবিষ্কারমূলক কবিতা ‘আবুল হাসান’-এর ওপর তার লেখা ‘আবুল হাসানের অজ্ঞান’ অনলাইন সাহিত্য ম্যাগাজিন পরস্পর-এ পড়ার সুযোগ হয়েছে। সলিমুল্লাহ খান অধ্যাপক, লেখক ও বুদ্ধিজীবী। অগাধ তার পাণ্ডিত্য। তার পাণ্ডিত্যের একটি অন্যতম দিক এই যে—তিনি শুধু টেক্সটের ওপর আলোকপাত করেন না। তিনি প্রশ্ন করেন, তুলনামূলক বিচার করেন—হোক না তা কবিতা, উপন্যাস, নাটক বা সমাজ, রাজনীতি বা ইতিহাস। তার সাথে সাথে যেন বাঙালির এক অংশ পুনঃপাঠ করে চলেছে চাপিয়ে দেয়া—ন্যারেটিভের চাদরে ঢাকা—নিজেদের অজানা নিজেকে, দেখতে সক্ষম হচ্ছে কেটে ফেলা নিজেদের আর এক রক্তাক্ত অংশকে। তাই স্বভাবতই আবুল হাসানের ওপর তার লেখাটি আবুল হাসানের কবিতার ফর্ম, স্টাইল বা টেকনিক নিয়ে আলোচনা নয়। এই লেখাতে সলিমুল্লাহ খান কবি আবুল হাসান নয়, বরং কর্তামানুষ, সামাজিক ও রাজনৈতিক মানুষ, নিজের এক অংশ হারানো, দ্বিখণ্ডিত মানুষ—হাসান যে [অ]ভাব বোধ করছেন, সেই ফাঁক পূরণের জন্য ক্রমাগত অস্ফুট গোঙানি করছেন—সেই আবুল হাসানকে পাঠকের সামনে তিনি নতুন করে তুলে ধরেছেন। তার গদ্য টান টান, নৈয়ায়িক, কখনো তা পাটিগণিতের মতো স্বতঃসিদ্ধ। তার ভাষা ও পরিভাষা, স্টাইল একান্তই তার নিজস্ব। তিনি অনায়াসে ইতিহাসকে বর্তমানের চোখ দিয়ে বিচার, বিশ্লেষণ ও পুনর্মূল্যায়ন করতে পারেন। তার গদ্য একাডেমিক হলেও সাধারণ পাঠক এর মাধ্যমে একটি থেরাপির মধ্য দিয়ে যেতে পারেন, নিজেকে প্রশ্ন ও নতুনভাবে জানতে পারেন। জাক লাকাঁর সূত্র ধরে তিনি মনে করেন মানুষ ভাষার অধীন—‘স্পিকিং এনিমল’। ভাষা তার কাছে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ম্যাকানিজম, কারণ মানুষের ইতিহাস ভাষারই ইতিহাস। তিনি লিখেন সাধু ভাষায়। এটির কয়েকটি কারণ থাকতে পারে—সাধু ভাষার স্থিতিস্থাপকতা বেশি, এর বাক্যরূপ প্রায় সুনির্ধারিত, এর ভাব-গম্ভীর আভিজাত ও ঋজু। কিন্ত তার গদ্য প্রায়শ বিদ্যাসাগরী, বঙ্কিমীয় গদ্য বলে এবং তার করা বিশেষ ডিকশন, ভোকাবলারিতে হয় বলে—নতুন পাঠক যদি তার বিষয়বস্তুর সাথে তাল মিলিয়ে তার লেখাগুলো ইস্তেমাল না করতে পারেন, তাহলে মাঝে মাঝে পথ হারানোর সম্ভাবনা আছে।


আবুল হাসানের ‘অজ্ঞানের ভাষা’ আবিষ্কারে সেই পথেই পা বাড়ান—‘মিলিত অক্ষর শুদ্ধ বহন মাত্র করে না, অর্থ সৃষ্টিও করে।


আধুনিক কালে শিল্প, সাহিত্য পাঠে এবং সিনেমা নাটকের বিশেষ চরিত্রের মনের অলি-গলিতে আলোকপাত করার জন্য যে কতগুলো শিল্প-সাহিত্যিক তত্ত্ব—যেমন সংগঠনবাদ, উত্তর সংগঠনবাদ, আধুনিকতাবাদ, উত্তর-আধুনিকতাবাদ, নিউ ক্রিটিসিজম, উপনিবেশবাদ ইত্যাদি সাহিত্য সমালোচনা—সমালোচকেরা ব্যবহার করে থাকেন তার মধ্যে সাইকো-এনালাইসিস একটি অপেক্ষাকৃত গূঢ় ও ক্যাথারসিস—আত্ম বিশোধনমূলক তত্ত্ব। এই বিশেষ তত্ত্বটি বলে—যে টেক্সট লেখকের গোপন, আশা আকাঙ্ক্ষা তার উদ্বিগ্নতা, যা তার অজ্ঞান স্তরে জমা থাকে তা প্রকাশ করে দেয়। এটি আরো বলে যে একটি টেক্সট আর কিছু নয় লেখকের মনোজগতের ভাষা-বিবরণ ছাড়া। এর মাধ্যমে আমরা লেখকের বাল্যজীবনের ট্রমা, সেক্সচুয়াল কনফ্লিক্ট, অবসেশন ইত্যাদি জানতে পারি। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে এই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো আসে সরাসরিভাবে নয়, পরোক্ষভাবে। দাবিয়ে রাখা আবেগগুলো ছদ্মনামে, লিটেরেরি টেকনিক যেমন প্রতীক, মেটাফর [রূপক] ও মেটোনিমিতে [শব্দের স্থানান্তর] প্রকাশিত হয়। কখনো তা প্রকাশ পেতে পারে কনডেন্সেড [ঘনীভূত] অবস্থায়, একটিমাত্র ছবিতে অথবা মিলেমিশে থাকায় বিশেষ অন্য একটি শব্দে বা ছবিতে।  সাইকো-এনালাইসিস তত্ত্ব দিয়ে একটি টেক্সট পাঠ করলে পাঠকের কাছে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সেটি হলো লেখক/চরিত্রের ডিজায়ার [বাসনা] বা অভাব।

জাক লাকাঁ সিগমুন্ড ফ্রয়েডের শ্রেষ্ঠ ছাত্র ও পাঠক। তার এই তত্ত্ব পরাবাস্তববাদ, প্রাচ্য দর্শন, সংগঠনবাদী ভাষা তত্ত্বে প্রবল প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। জাক লাকাঁর গুরু সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানুষের মনের উপরিতলার অংশটুকুকে কনশাস [চেতন, জ্ঞান] আর সর্ব নিচের অবস্থাটিকে আনকনশাস [অবচেতন ‘অজ্ঞান’] বলে জাহির করেছেন। এই অজ্ঞান আবিষ্কার ভাষার একটি বিশাল আবিষ্কার যা চিরদিনের জন্য আধুনিক শিল্প সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা শিল্প, ভাস্কর্য ইত্যাদির বিষয়, উপস্থাপন ও ভাষা চিরদিনের জন্য পাল্টে দিয়েছে৷ কেননা এর আগে মানুষ তার মনের এই বিশেষ স্তরের কথা সবিশেষ জানত না। ফ্রয়েডের আনকনশাসের ভাষা গ্রামারলেস। সেটি স্বপ্ন, স্লিপ অব দা টাং, স্মৃতি  ইত্যাদির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এগুলোর শুরু আমাদের সমস্ত ডিজায়ার [বাসনা] থেকে। আমাদের বাসনা অনুযায়ী যদি আমরা কাঙ্ক্ষিত বস্তুকে না পাই তখনি সেগুলো অজ্ঞান স্তরে আশ্র‍য় নেয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে ‘অজ্ঞান’ জ্ঞানের চেয়ে শক্তিশালী প্রভাবক। কেননা আমরা যা নই—তা পাওয়ার জন্য যে বাসনা, মানে চাওয়া ও না পাওয়ার মধ্যে যে ব্যবধান, যার ফলে যে আকুতি, যে অস্ফুট গোঙানি হয়, সেটি হলো ‘অজ্ঞান’।

জাক লাকাঁ বলেন কর্তামানুষ সব সময়ই দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটি তার কনশাস সাইড [চেতন, “জ্ঞান”] যা গমনযোগ্য মন আর একটি হলো আনকনশাস সাইড [অবচেতন ‘অজ্ঞান’] যা অগম্য মন। আনকনশাস মনে, দাবানো অনেক ইচ্ছা, আশা আকাঙ্ক্ষা, উদ্বিগ্নতা লুকিয়ে থাকে। তিনি বলেন আমরা হলাম সেই যা আমরা মনে করি আমাদের কাছে মিসিং। সেই ভাগ করা আমাদের আর এক পক্ষ আমাদের ‘আদার’ আমাদের নিজস্ব ‘অপর’। সেই অপর বা আমাদের ভাগ করা আমাদের ‘অপর’ অবশেষে ‘অজ্ঞান’ হিসাবে জেগে ওঠে। যেহেতু আমরা টের পাই যে আমাদের কিছু মিসিং হচ্ছে, আমার আর একটি অংশকে খুঁজে বেড়াই। তাই এটি একটি অভাব। আমরা সব সময় এই ‘অভাব’ বন্ধ করতে চাই, কখনো বা অন্য কিছু দিয়ে পূর্ণ করতে বা রিপ্লেস করতে চাই। লাকাঁ এই অভাবকে বলছেন—ডিজায়ার বা বাসনা। কিন্তু ডিজায়ার কখনো পূর্ণ হবার নয়, এমনকি তা পূর্ণ হয়ে গেলেও। তিনি আরো বলেন আমাদের সমস্ত প্রয়োজন সাথে সাথে আমাদের অভাব বা বাসনায় পরিবর্তিত হয়ে যায়।

গুরু সিগমুন্ড ফ্রয়েড-এর সাথে লাকাঁর পার্থক্য এখানে যে লাকাঁ সুইস ভাষাবিদ ফার্দিনান্দ দ্য স্যোসুরের ভাষার সংগঠনবাদী তত্ত্ব থেকে ধার নিয়ে বলেছেন আমাদের ‘অজ্ঞান’ ভাষার আকারে থাকে। স্যোসুর দেখিয়েছেন এটি বললে ভুল হবে যে—চিহ্ন শুধুমাত্র কোনো শব্দ বা নামকে কোনো বস্তুর সাথে যোগ করে। আসলে চিহ্ন একটি সাউন্ড-ইমেজকে একটি কনসেপ্ট-ধারণার সাথে যোগ করে। সাউন্ড অথবা ইমেজকে বলে সিগ্নিফাইয়ার, কনসেপ্টকে বলে সিগ্নিফাইড। অর্থ শুধু সিগ্নিফাইয়ার ও সিগ্নিফাইডের মধ্যে সম্পর্কের জন্য সৃষ্টি হয় না। বরং সিগ্নিফাইয়ারের সাথে অন্য সব সিগ্নিফাইয়ারের অবস্থান জনিত কারণেই অর্থ তৈরি হয়। লাকাঁর মতে অর্থ থাকে সিগ্নিফাইয়িং চেইনের মধ্যে। সুতরাং অর্থ শব্দের অর্থ থেকে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় সিগ্নিফাইয়িং চেইনে শব্দটি কিভাবে অবস্থান করে—সেখান থেকে।

লাকাঁ বলেছেন, সিগ্নিফাইয়ার [শব্দ] আর সিগ্নিফাইডের [কনসেপ্ট]-এর নিচে থাকে ‘অজ্ঞান’। ‘অজ্ঞান’ প্রকাশিত হয় মেটাফর [রূপক] আর মেটোনিমি [‘নামান্তর’ স্থানান্তর] মাধ্যমে। আমরা রূপকের মাধ্যমে একটি শব্দের পরিবর্তে আর একটি শব্দ ব্যবহার করি। আর মেটোনিমিতে ঘটে শব্দের জায়গা বদল। ভাষার এই দুটি চক্র—শব্দ বদল আর শব্দের জায়গা বদলের মাধ্যমে আনকনশাস [‘অজ্ঞান’] কাজ করে।

সলিমুল্লাহ খান জাক লাকাঁর ডিসকোর্স প্রেমিক, বিশেষত তার কথিত ‘অজ্ঞানের ভাষা’ প্রেমিক। বলা যায় যে ভাষা সিগ্নিফাইং চেইনের মধ্যে থেকে অর্থ দেয়, যে ভাষার অতীত ইতিহাস আছে, শক্ত ভিত আছে, সেই ভাষার প্রেমিক তিনি। মানে তিনি স্ট্রাকচারালিস্ট, তার ভাষা বিচার লগোসেন্ট্রিক, শব্দে শব্দে মিলে একটি অর্থময় পরিবেশ তার পছন্দ। তিনি তার রচনায় আবুল হাসানের ‘অজ্ঞানের ভাষা’ আবিষ্কারে সেই পথেই পা বাড়ান—‘মিলিত অক্ষর শুদ্ধ বহন মাত্র করে না, অর্থ সৃষ্টিও করে। অতএব দাঁড়াল কী? দাঁড়াল এই। পদ থেকে পদান্তরে অভিসার ছাড়া বান্দার ত্রাণ নাই। এই সত্যে সন্দিহান যারা তারাই সিদ্ধার্থ গৌতমের নামে প্রচার করেছেন, বাসনার নাম নির্বাণ। আমরা এর অর্থ করি অন্য। পরমের বাসনা অনির্বাণ। বাসনা অমর, অ-এর মরা, অজ্ঞানের শহিদ। শুদ্ধ নামেই তার মুক্তি। একমাত্র নামের, পদের বা ভাষার দোহাইতেই জীব পরমের অংশ। আবুল হাসানের শেষ প্রশ্নের উত্তর এখানেই মেলে : মানুষের সঙ্গে সে নিশ্চয়ই সম্পর্কিত ছিল একদিন। ইহুদি পুরাণে আছে : আল্লাহ হযরত আদমকে প্রথমে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিলেন। এই শিক্ষা তিনি ফেরেশতাদের দেন নাই। সলিমুল্লাহ খান আবুল হাসানের এই বিশেষ কবিতাটি বেছে নিয়েছেন কারণ এখানে লাকাঁর অজ্ঞানের ভাষা প্রবলভাবে হাজির। তিনি এই কবিতাটির গুণ বিচার না করে, এর রচনাকারীর অভাবের—মানে অজ্ঞানের ভাষা তথা আবুল হাসানের মনের গহিনে যে বিরাট একটা গর্ত আছে, একটা ফাঁক আছে—তাকে পূরণ করতে আবুল হাসানের যে আকুতি, যে গোঙানি তা জানতে চেয়েছেন। তাই যৌক্তিক, কেননা কোনো লেখকের সাইকিটা জানা থাকলে তার কবিতা পাঠ তথা তার ভাষার শিরধারা জানা হয়ে পড়ে। ‘আবুল হাসান’ নাম কবিতায় আবুল হাসান—কর্তামানুষ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। আবুল হাসান তাই সেই মিসিং ‘অপর’ এক আবুল হাসানকে খুঁজে বেড়ান, তৈরি ফাঁক পূরণ করতে সচেষ্ট হোন বিভিন্ন রূপকে, শব্দের স্থানান্তরে। [আবুল হাসান দীর্ঘদিন অসুস্হ ছিলেন, তার সাইকি স্বভাবতই উদ্বিগ্ন, শঙ্কিত, পীড়িত সাইকি। জাক লাকাঁর অপূর্ব ছাত্র হতে পারতেন তিনি।]


আজকের মনোবিজ্ঞান বলছে যে আমাদের মন কতগুলো মডিউল দ্বারা গঠিত যা কালক্রমে বিবর্তিত হয়েছে।


আর একটি কথা না বললেই হয়। জাক লাকাঁর সাইকো এনালাইসিসের আর একটি গুরত্বপূর্ণ এলিমেন্ট হলো—মিরর স্টেজ বা আয়না পর্ব। যাকে সমালোচকেরা মনে করে উত্তর-সংগঠনবাদী মন্ত্র। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শিশু ভাবে যে এপাশের ‘আমি’ আর এক পাশের ‘আমি’ অপর আমি দুই ভাগে বিভক্ত। আমি ও সে, সে মানে তার আপন ‘পর’। এর আগে শিশু ছিল একটি রিয়েল স্টেজে—যেখানে সে তার প্রয়োজন দ্বারা তাড়িত, মায়ের সাথে একাত্মভূত। কিন্তু আয়না পর্বে শিশু প্রথম তার শারীরিক স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে অবহিত হয়। শুরু হয় ‘অপর’কে মানে পুরুষ/মহিলা, পূর্ব/পশ্চিম ইত্যাদি বোঝার তাগিদে নিজেকে জানা। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের মাঝে—সে দেখে তার ‘আদর্শ আমি’কে যা প্রকৃতিস্থ, স্বাধীন এবং শিশু এটিকে পেতে চায় যা—আবার তার আপন ‘পর’। সেই মোতাবেক মানব আইডেন্টিটি ডিসেন্টারড—কেন্দ্রচ্যুত। মনে করুন জাক দারিদার ডিকনস্ট্রাকশন তত্ত্বের কথা—যেখানে তিনি বলছেন টেক্সটের কোনো কেন্দ্র নাই। কেন্দ্র থাকে আসলে বাইরে। দারিদা এই কনসেপ্ট লাকাঁর কাছে পেয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো দারিদা এই ঋণ কোথাও স্বীকার করেন নাই। যা হোক। সেই মোতাবেক সলিমুল্লাহ খান মানবের এই কেন্দ্রহীন, দ্বিধা বিভক্ত সত্তা, যার মাধ্যমে মানু্ষের মনে জমা হয় আশান্তি, বিস্ময়, নিয়ন্ত্রিত পাগলামি, এবং পাগলামির ভাষা—মানে কেন্দ্রহীন, আপাত অর্থহীন আইডিয়া এবং এর থেকে তৈরি উত্তরাধুনিক কবিতার উত্তম সমঝদার হতে পারতেন। বাংলা কবিতার হাল আমলের আর একটি উর্বর অঞ্চল বিবেচনায় আনতে পারতেন। যেমনটি ঘটেছে উত্তর সংগঠনবাদী লেখক, আলোচক ও দার্শনিকদের মাঝে। ফুকো ও দারিদা এর মধ্যে অন্যতম।

সাইকো-এনালাইসিসের সমালোচনা ফ্রয়েড যেখানে অজ্ঞানকে একটি একক সত্তা হিসাবে দেখেছেন, সেখানে আজকের মনোবিজ্ঞান বলছে যে আমাদের মন কতগুলো মডিউল দ্বারা গঠিত যা কালক্রমে বিবর্তিত হয়েছে। যার ফলে মন এখন আমাদের কনশাসনেসের বাইরে কাজ করে। বিশ্ব বিখ্যাত আমেরিকান ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কির মতে—আমাদের একটি সার্বজনীন আনকনশাস ল্যাংগুয়েজ প্রসেসর আছে—যা আমদেরকে বলে দেয় আমাদের ব্যবহার করা বাক্যটি সঠিকভাবে গঠিত হয়েছে কিনা। ফ্রয়েড যেখানে বিশ্বাস করতেন যে আমাদের আদি কামনা আমদেরকে সমূহ উদ্বেগ থেকে রক্ষা করার জন্য আনকনশাসে ডুব দেয়, সেখানে এখন আধুনিক অভিযোজিত আনকনশাস বলে দক্ষতার কারণে আমাদের বেশির ভাগ তথ্যাদি কনশাসনেসের বাইরে থাকে, মনের ভেতরে নয়।


সিকদার আমিনুল হকের ঈষৎ ‘অজ্ঞান’

সিকদার আমিনুল হক আবুল হাসানের সময়ের কবি। আবুল হাসানকে নিয়ে তিনিও ‘কবি’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। সেই কবিতার আবহ অনুযায়ী আবুল হাসানের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য, তার উন্মূল জীবনের প্রতি সিকদারের এক রকমের সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু সিকদার আবুল হাসান নয়। তার জীবনকে আবুল হাসানের মতো এমন করুণ, অনিকেত, নিরবলম্ব অবস্থায় দেখা যায় নি। তিনি হাসানের মতো আত্মপরিচয় সঙ্কট সমাধানে হাহাকার করার মতো কবি নন, তার প্রয়োজনও নাই। আবুল হাসান যেখানে ‘যে তুমি হরণ করো’ তে বলেন ‘দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদী রাখবো না আর আমার ভেতর’  সেখানে সিকদার তার আয়েশি বারান্দা থেকে অবকাশ যাপনকারী মানুষের মতো উপভোগ করেন—‘কালো অন্তর্বাস, বগলের ক্ষার আর বেদিনির মত এক সারি ঝিলিক দেয়া দাঁত’। সুতরাং বলা যায় দ্বিধাগ্রস্ত আবুল হাসানের মতো নিজেকে আবিষ্কার এবং নিজের দ্বিখণ্ডিত সত্তাকে মেটাফর ও মেটিনোমিতে দেখার তার প্রয়োজন হয় নি। তিনি ম্যাটেরিয়াল বাসনা অর্থাৎ অভাবের [গরিবি হাল] কবি নন মোটেই, তাই আবুল হাসানের অনিকেত জীবনের জন্মভার তার সইতে হয় নি। কিন্তু খুব কাছ থেকে পাঠের মাধ্যমে সিকদার আমিনুল হকের ভেতর একজন দেহবাদী, নারী-মিলনপিয়াসি, বাসনাকাতর কবির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। তার বাসনা রিপুর বাসনা, প্রবল মিলনের আকাঙ্ক্ষা, যা কখনো পূরণ হবার নয়। সেই তার অভাব—সেই তার অজ্ঞান। সিকদার আমিনুল হককে অনেকেই ‘নিভৃতচারী’, ‘সতত কবি’ ‘প্রতীকী কবিতার একমাত্র প্রতিনিধি’, ‘পরাবাস্তববাদী কবি’ এবং ‘তিরিশ-পরবর্তী বাংলা কবিতার বিশুদ্ধতম রোমান্টিক কবি’ প্রভৃতি নামে ডেকেছেন। কিন্তু যে দিকটি প্রায় অলক্ষ্যে ঘটে গেছে সেটি হল তিনি- অবদমিত যৌন বাসনার কবি। তার অনেক কবিতায় দেখা যায় তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে নারীদের  অন্তর্বাস, জঘন, স্তন, ব্রা, পেটিকোট, বোগলের ক্ষার- ইত্যাদি উপভোগের অতি যৌন আবেদনময় ইচ্ছা দিয়ে কবিতার আবহ তুলে ধরেছেন। সিকদার যেসব বিষয় উপকরণের সহযোগে  তার-কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন তা বাংলাদেশের কবিতায় এর আগে খুব একটা দেখা যায় নি। এটি সত্য যে- তিনি পশ্চিমা বিশ্ব থেকে শুরু করে প্রাচ্যকেও তার কবিতায় অকাতরে ঠাঁই দিয়েছেন। তাকে একজন ব্যস্ত, বিশ্ব পর্যযটক বললেও ভুল হবে না। বিশ্ব পরিভ্রমণের পথে যা কিছু তার ভালো লেগেছে, ছায়া ফেলেছে হৃদয়ের গভীরে—সবই তিনি নিখুঁতভাবে তুলে এনেছেন তার কবিতায়। সেখানে বিশ্বখ্যাত নগর-বন্দর-বাজার যেমন আছেন তেমনি আছে দীর্ঘাঙ্গী সুঠাম দেহের রূপসীরা। নারীকে দেখা বাসনামুক্ত নয় মোটেই, এখানে দমিত কামনা বসানার ছাপ জ্বলজ্যান্ত। নারীপ্রিয় কবি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ও আল মাহমুদ। কিন্তু সিকদারের পোয়েটিক ডিকশন, ভোকাবুলারি কামের উদ্রেক করে, কেননা এগুলো কবির ডিজায়ার। লাকাঁর মতে সকল ডিজায়ার অপূর্ণ থেকে যায়, তাই অভাবের সৃষ্টি হয়, সেই থেকে অজ্ঞান। কবি যা কামনা করছেন তা সে কখনো পাওয়া হবে না, সমাজ-পিতা তার কাশট্রেশন [খতনা] করে ফেলেছে অনেক আগেই। তার বাসনা প্রকৃতিস্থ হয় ভাষায়, তার আশ্রয় ভাষায়—তিনি ভাষায় মানে কবিতায় মেটাফর আর মেটিমনিতে অশেষ যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। সিকদার আমিনুল হকের ডিজায়ার, তার অজ্ঞান- সুঠাম দেহের নারীকে পাওয়ার অভাব, তার তীব্র বাসনার ভাষা বোঝার জন্য আমাদেরকে আগে জাক লাকাঁর যৌনতা বিষয়ে ভাবনা, তথা কাস্ট্রেশন [খতনা] সম্পর্কিত ধারণা জানা আবশ্যক।

লাকাঁর কাস্ট্রেশন কোনো ফিজিক্যাল নপুংসকরণ নয়। লাকাঁর কাস্ট্রেশন হলো অভাব, কাল্পনিক বস্তু না পাওয়ার প্রতীকী অভাব। এই অভাব প্রতীকী চেইন এর সাথে জড়িত। ক্লিনিকে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে যখন কেউ তার কাল্পনিক ভালোবাসার মানুষটিকে হারায় তখনি কাস্ট্রেশনের ঘটনা ঘটে। লাকাঁ বলেন : আমাদের কামনা অপরের কামনা। এর ভিত্তিতে লাকাঁ ফ্রয়েডের ইডিপাস প্রেষণা অন্যভাবে সমাধা করেছেন। লাকাঁ নিজেকে ফ্রয়েডের কনসেপ্ট—বায়োলজিকাল অর্গান—‘পেনিস’ ধারণা থেকে সরে এসেছেন। তার পরিবর্তে লাকাঁ ফাল্যাস—[ভালোবাসার বস্তু]-এর কথা উল্লেখ করেছেন। এখানে লাকাঁ বলেছেন : শিশু শুধুমাত্র মায়ের কামনাকে উপলক্ষ্য করে ফাল্যাস সাজে। মায়ের কামনাকে বিজয় করার মাধ্যমে ঘটে ইডিপাস প্রেষণার সমাধান। মায়ের কামনাকে খুশি করার জন্য শিশু মায়ের ফাল্যাস [লাভ  অবজেক্ট] হয়ে পড়ে। কিন্তু এক সময় যখন সে বাবাকে দেখে মায়ের বিছানা দখল করতে—তখন শিশুর ইডিপাস প্রেষণা আঘাত প্রাপ্ত হয়। মায়ের কাছে প্রিয় বস্তু হওয়ার ক্রমাগত চেষ্টা যখন এক সময় ব্যর্থ হয় তখন ঘটে কাস্ট্রেশনের। শিশুর এই কাস্ট্রেশন মেনে নেয়ার মাধ্যমে সাময়িকভাবে তার ইডিপাস প্রেষণার সমাধা হয়। লাকাঁর মতে যখন শিশু কাস্ট্রেশন মেনে নেয় তখন সে তার সামাজিক সংঘে ভাষা ব্যবহারে উপযুক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু যে মানুষ কোনো রকমের সাইকোসিস [মনোব্যাধি] এ ভুগছেন তিনি কার্যকর ভাষা প্রয়োগে অপারগ। লাকাঁ আরো জোর দেন এই বলে যে—মানুষ স্পিকিং এনিমল, যখন কর্তামানুষ তার মায়ের ভাষা শেখে তখন সে এই ভাষার শৃঙ্খলার ভেতরে প্রবেশ করে। আসলে তার সাথে দুনিয়ার সাথে কী সম্পর্ক হওয়া উচিত এবং তার বায়োলজিক্যাল বডিকে কীভাবে সে অনুভব করবে তা সে বোঝে ফেলে। এই ক্ষেত্রে তিনি ফেনোমলজির তত্ত্বের কাছে অনেকাংশে ঋণী। বিশেষ করে হাইডেগারের কাছে তিনি এই ধারণা পান যে—কর্তামানুষ হতে গেলে আমাদেরকে এই দুনিয়াকে একটি ‘মিনিংফুল টোটালিটি’ হিসাবে অনুভব করতে হবে। ফ্রয়েড তার ‘ইন্ট্রোডাকটরি লেকচার টু সাইকোএনালিসিস’-এ মন্তব্য করেন যে অজ্ঞানকে গ্রামারহীন ভাষার সাথে তুলনা করা যায়। কিন্তু লাকাঁ যুক্তি দেন যে অজ্ঞান ভাষার মতো সংঘটিত। কারণ অজ্ঞান কথা বলে—‘কা-পারলে’ [ফ্রেঞ্চ]। রোগের আলামতকে শারীরিক মেটাফর হিসাবে পড়া দরকার। কামনা যদি কোনো সন্তোষজনক ফলাফল পেতে চায় তাহলে তাকে পরোক্ষভাবে জানাতে হবে। যেমন কোনো কর্তামানুষের যদি মাস্টারবেট করার কামনা জাগে তাহলে সে পরোক্ষভাবে আনন্দ পাবে এমন একটি উত্তেজনাকর ক্রিয়া কর্মে অংশ গ্রহণ করে—যেখানে কর্তামানুষ কোনোকিছু বার বার করতে সক্ষম হবে।


নারীকে সরাসরি কামনার ফিগারে দাঁড় করানো লজ্জাকর। তাই ভাষার আশ্রয়, রূপক আর শব্দের নামান্তরে ভ্রমণ, কবিতাযাপন।


যখন কেউ তার ভালোবাসাকে গোলাপের সাথে তুলনা করে, লাকাঁর মতে, আসলে সে তার দাবানো বাসনাকে আপাত প্রতিরূপ কোনো শারীরিক বস্তুর মাঝেই প্রকাশিত করে। লাকাঁ তার গুরু ফ্রয়েডের ‘ভালোবাসার মনঃসমীক্ষণ’ লেখার বরাতে বলেছেন—মানুষের কামনা মেটোনিমিতে [শব্দের স্থানান্তরে] সংঘটিত হয়। মেটোনিমিতে, উদাহরণস্বরূপ মানুষ পুরা জিনিসের নাম তোলে—বস্তুটির মাত্র একটি অংশের কথা উল্লেখ করে। যেমন কেউ একটি বাড়ির কথা বলতে চাইলে হয়তো বলবে বাড়িটির দরজার কথা। লাকাঁর যুক্তি হলো কাশট্রেশন যেহেতু কর্তামানুষকে তার প্রথম ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করে তাই সে সমরূপ, বহু বস্তুর প্রতি তার ভালোবাসা, কামনা বহাল রাখে। সিকদার আমিনুল হকের অধিকাংশ কবিতায় নারীর দেহ, নারীর আবেদনময়ী শরীরের কথা ঘুরে ফিরে এসেছে। বাংলাদেশের ষাট দশকের কবিদের কবিতায় এরকম নারীর দেহকেন্দ্রিক, ইন্দ্রিয়ঘন, কামনাকাতর কবিতা সচারচর দেখা যায় না। তার সমকালীন কবি প্রায় সবাই পশ্চিম পাকিস্তানের আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক অন্যায় অবিচারের জাঁতাকল পড়ে, উন্মাতাল স্বাধীনতা আন্দোলনের রক্তলাল সময় এবং পূর্ব বাংলার অবহেলিত, অত্যাচারিত মানুষের কথা বলেছেন। সিকদার সেখানে যেন বারান্দায় বসা এক স্বপ্নকাতর পর্যটক, যার কাম স্পৃহা জাগিয়ে তোলে সুঠাম দেহের নারীর নীল অন্তর্বাসের চিত্রকল্প। যিনি তার বাসনা তথা অভাব [নারীর শরীর] পূরণের প্রচেষ্টায়, অজ্ঞানের ভাষা—কবিতায় বিভিন্ন রূপক, প্রতীক আর মেটোনিমিতে প্রকাশ করেছেন।  আমরা আলোচনার জন্য তার নিচের কবিতাটি নিতে পারি এবং এই কবিতায় লাকাঁর অজ্ঞানের ভাষা খোঁজার চেষ্টা করব।


অতিপ্রগলভ শতাব্দী কবিতা

কবিতাকে থাকতে দাও একা, অস্পষ্ট আর পরস্ত্রীর মতো পবিত্র। মানুষের হাত, সে স্বচ্ছন্দ নামুক পাতালের নিচে, অন্ধকারে। পাল তোলার জন্যে কব্জির জোর এবং পাহাড়ে ওঠার জন্যে শক্ত গোড়ালি এখনও দরকার। কবিতা সে থাকুক কামনাদাত্রীর ওষ্ঠে, বগলের নিচের ছোট অন্ধকারে, এবং যার প্রণয়িনী নেই, পানশালায় তার শেষ পাত্রে। 

কবিতা তুমি উজ্জ্বল হও। তুমি বাঁচো। এবং সুবিশাল নারীর প্রশস্ত নিতম্বের মতো দায়িত্ববোধে আবৃত হও! … মানুষকে তর্ক করতে দাও। জুয়াখেলার ত্রুটি নিয়ে সে চালাক ছুরি। তার পথ ছেড়ে দাও। সমুদ্র আর বালির দ্বীপ তাকে ডাকে। আসবাবের বার্নিশ তাকে দিক আত্মবিশ্বাস! গণিকার প্রণয়সঙ্গীতে সে টুকরো টুকরো করুক তার শৈশব স্মৃতি… 

কিন্তু কবিতা, তুমি তো সম্রাট! তোমাকে নিয়ে গল্প করবে ক্ষত-বিক্ষত সৈনিক, যারা তোমাকে দ্যাখে না। তুমি সেই কিশোরীর অন্তর্বাস, বৃদ্ধেরা যার রঙ পর্যন্ত আঁচ করতে পারে না। বেতের চেয়ারে বসে যারা কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কবিতা তুমি ওঠো! অগ্নিশিখা আর ক্রোধের মতো। পশুর মতো তোমার গর্জন। গুম্ফার সন্ধ্যার মতো তুমি সমগ্র হও। এবং বিষণ্ণ, কবরের গোলাপের মতো। এবং যে-নারী প্রায়শ প্রতারণা করে, তার মতো তুমি সমস্ত রাত্রির জন্যে কামার্ত হও… !

কবিতাকে নারী হিসাবে চিন্তা করা, রমণীয় প্লেজার টয় হিসাবে দেখা কবিতার ইতিহাসে বিরল নয়। দেশে বিদেশে রোমান্টিক, আধুনিক কবিরা বহু আগে থেকেই কবিতাকে নারীর সাথে তুলনা করেছেন—প্রেম, বিরহ, রিরংসা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, আবুল হাসান-সহ হাল আমলের অনেক কবি কবিতাকে নারীরূপে কামনা করেছেন। এদের কবিতায় [আল মাহমুদ ছাড়া], সবারই নারীর প্রতি টান দেখা যায়, কাছে পাওয়ার কাতরতা দেখা যায়। এদের এটি উন্মাতাল রোমান্টিকতা, অজ্ঞান নয়।  কিন্তু সিকদারের ‘অতিপ্রগলভ শতাব্দীর কবিতা’ নামক কবিতায় আমরা কবির বাসনার নারীকে পেলাম কবিতা-নারীর রূপকে। অর্থাৎ ক-বি-তা সিগ্নিফায়ার ইশারা দিয়ে ‘কবিতা-নারী’ সিগ্নিফাইডে দৃষ্টিগোচর হয় এবং শেষে সিম্বোলিক চেইনের ভেতর থেকে রক্ত মাংসের সুঠাম দেহের কামার্ত নারী হয়ে বাসনার বিধি জারি রাখে। জাক লাকাঁর ফাল্যাস তিনি হতে পারেন নি, তার কাশট্রেশন সমাজ-পিতার মাধ্যমে হয়ে গেছে। কারণ সমাজ-পিতা আইন করে দেন—কাম প্রকাশের সঠিক পাত্র কোনটি।  কিন্তু তার বাসনা অসফল, সেই অভাব তাকে ছাড়ে নি। কামনার আগুন ভেতরে জ্বলে, অজ্ঞানে জায়গা নেয়। বাইরে বাস্তব নারী দেখলে উত্থিত বাসনা-দণ্ডের সমাজ-পিতার আইনে কাশট্রেশন ঘটে। তাই কবিতা-নারীকে অন্তরঙ্গভাবে পাওয়ার বাসনা, তার অভাব ভাষার সংগঠনে নিহিত হয়, প্রতীক আর শব্দের স্থানান্তরের মাধ্যমে অভাব জানান দেয়া হয়। তাকে প্রকৃতিস্থ করার জন্য সিকদার রূপক আর মিটোনিমিতে আশ্রয় নেন। কামের বাসনা আর বাসনার বস্তুকে না পাওয়ার যে গ্যাপ, তা পূরণ না হলে অসুখে পরিণত হয়। তাই সিগ্নিফাইয়ার- কবিতাকে পেলাম সিগ্নিফাইড কাম জগানিয়া রমণীয় নারী হিসাবে। না পাওয়ার ভাষা একটা প্রতীকী চেইনে ধরা পড়ে যেন। এই কবিতার প্রধান প্রসঙ্গ কাম। সিকদার আমিনুল হকের অধিকাংশ কবিতাই কাম তাড়িত। এটি এমন না যে তিনি ইচ্ছা করে এই বিষয়টিকে হাজির করছেন। ঘটছে খুব স্বাভাবিকভাবে। কেননা এটি তার বিশেষ ‘অজ্ঞান’—মানে মিলন না পাওয়ার জ্ঞান। জাক লাকাঁ বলছেন, দমিত বাসনা সন্তোষজনক ফলাফল না পেলে সে সমরূপ কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কবিতাকে নারীর গুণ দিলে কবিতা-বাসনার রূপে পাওয়া হয়ে যায়। ‘অস্পষ্ট আর পরস্ত্রীর মতো পবিত্র’ বা ‘কবিতা সে থাকুক কামনাদাত্রীর ওষ্ঠে, বগলের নিচের ছোট অন্ধকারে’, সামাজিকতায় এই কাম-ভাব প্রকাশযোগ্য নয়, কিন্তু ভাষায় এসব গোপন চাওয়া রূপক আর শব্দের জায়গা বদলের মাধ্যমে ঘটতে থাকে। ‘সুবিশাল নারীর প্রশস্ত নিতম্বের মতো দায়িত্ববোধে আবৃত হও’ অথবা ‘তুমি সেই কিশোরীর অন্তর্বাস’, সবই আসলে কামের মেটাফর/নামান্তর, তার বাসনা বাস্তবে পূরণ হবার নয়, সমাজ পিতার কারণে কাশট্রেশন হয়, নারীকে সরাসরি কামনার ফিগারে দাঁড় করানো লজ্জাকর। তাই ভাষার আশ্রয়, রূপক আর শব্দের নামান্তরে ভ্রমণ, কবিতাযাপন। আমি নিচের আরো দুটি কবিতা দিয়ে আমার আলোচনা শেষ করব। বাকিটা প্রিয় পাঠক বুঝে নিবেন আমি কী বলতে চাই।

সুপ্রভাত, হে বারান্দা!… দেখলে তো কবি বেঁচে আছে।
…এক হ্রদে, আমার নৌকায়
আমি চার-জোড়া রূপসীকে পেয়েছি একাই!
গায়িকা মেয়েটি ছোটো, দেহ-মিলনের মতো নয়;
তবে পৃথুলার গন্ধ বেশ সুস্থ!… স্তন ভালো যার


সুপ্রভাত হে বারান্দা

তোমার কাছেই চিঠি লিখছি এখন।

…চিঠি লিখছি আলোয় অথচ অন্ধকারের গন্ধ পাচ্ছি!

মেদ কি অন্ধকার? মাংস কি অন্ধকার? সব গহ্বর কি,
অন্ধকার?—নাকি বসন্ত বলেই আমি আজ এত কামার্ত!
চিঠি তো লিখছি না, যেন বাতাসে উড়তে উড়তে সংগম করছ।

[মধ্যবয়স্কা কাউকে যখন চিঠি লিখি]

______________________________________________________________

সহায়ক গ্রন্থ/রেফারেন্স :

১. সলিমুল্লাহ খান, ‘আবুল হাসানের অজ্ঞান’ পরস্পর, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৭
২. Terry Eagleton, Literary Theory, An Introduction, Second Edition, Blackwell Publishers Ltd, USA 1996
৩. Jacques Lacan, The Four Fundamental Concepts of Psychoanalysis: Translated by Alan Sheridan, W.W Norton & Company, New York, London 1981
৪. Sigmund Freud, Introductory Lectures on Pscychoanalysis, Digireads.com, 2013
৫. সিকদার আমিনুল হক ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ আগামী প্রকাশনী ২০০০
৬. সলিমুল্লাহ খান, স্বাধীনতা ব্যবসায়, আগামী প্রকাশনী ২০১১

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫; কিশোরগঞ্জ। পৈতৃক নিবাস রায়পুরা, নরসিংদী। ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স), এমএ।

পেশা : ইংরেজির শিক্ষক, নাভিটাস ইংলিশ ফেয়ারফিল্ড কলেজ, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
সিজদা ও অন্যান্য ইসরা [চৈতন্য, ২০১৬]
ক্রমশ আপেলপাতা বেয়ে [চৈতন্য, ২০১৫]
নো ম্যানস জোন পেরিয়ে [শুদ্ধস্বর, ২০১২]
জল্লাদ ও মুখোশ বিষয়ক প্ররোচনাগুলি [নিসর্গ, ২০১২]
শাদা সন্ত মেঘদল [নিসর্গ, ২০১১]
গানের বাহিরে কবিতাগুচ্ছ [নিসর্গ, ২০১০]
পলাশী ও পানিপথ [নিসর্গ, ২০০৯]
বাল্মীকির মৌনকথন [জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৯৬]
শীতমৃত্যু ও জলতরঙ্গ [জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৯৫]

গদ্য—
কবিতার ভাষা [চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : abusayeedobaidullah@gamail.com