হোম গদ্য ছায়াভূত

ছায়াভূত

ছায়াভূত
941
0

মাত্র সাড়ে সাত মাস বয়সী বুধোকে কোলে নিয়ে তার ঠাকুরদা যে বিকেলে মথুরাগঞ্জের বিলের ধারে ঘুরতে গিয়ে বেবাক উধাও হয়ে যায় সেই বিকেলে একঝাঁক সাদা বক আলাদিনের পিদিম আকৃতির এক মেঘকে স্পর্শ করে আকাশের পশ্চিম থেকে পূর্বের দিকে উড়ে গিয়েছিল বলে মথুরাগঞ্জের লোকেরা বলে থাকে। বকগুলো কোথায় যাচ্ছিল তা তারা কোনোদিনই বলতে পারে না, তবু বিষয়টিকে বুধোর ঠাকুরদার উধাও হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলেই তারা মনে করে, কারণ নিজেদের অনুমানক্ষমতাকে যথাসাধ্য প্রসারিত করে তারা বলে, বকগুলো সেই দেশ থেকেই এসেছিল যে দেশে একসময় বুধোরা থাকত, এবং তারা পুনরায় বুধোর ঠাকুরদাকে সেই দেশেই উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে। মথুরাগঞ্জের প্রাক্তন প্রধান পরাণকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সে বলে, ‘তা ছাড়া আর কুথাক যাবে?’ এবং বলে, ‘বকগুলার আসাটা আমি দেখি লাই গো, কেউই দ্যাখে লাই। শুধু প্রস্থানটা দেখ্যেছে সকলে।’ দেখেছে? নিজের চোখে? পরাণ কেশে কেশে একদলা কালো কফ মাটিতে ফেলে দিয়ে বলে, ‘ও একরকম দ্যাখ্যাই বটে। বুধোটাকে সঙ্গে লিয়ে বুড়াটা গিইছিল উ বিলের ধারে, বেড়াইনতে। আমরা কেউ সিখানে ছিলাম না তখন। কিন্তু আকাশে বকের ঝাঁকটা সকলে দেখ্যেছিল বটে। পরে সন্ধ্যা নামল। বুড়া তখনও আসে না। শেষে বুধোর বাপ গ্রামের আরও পাঁচজনকে লিয়ে গেল খোঁজ কইরতে। গিয়ে দ্যাখে, ব্যাটাটা কেবল মাটিতে হামা টাইনছে। কিন্তু বুড়া লাই গো।’ বুড়ো তাহলে কোথায় গেল, এই প্রশ্নের উত্তরে পরাণ প্রবল বেগে শুধু কাশতে থাকে এবং কিছু বলে না, এবং আঙুল তুলে পূর্বদিকে প্রসারিত করে। কিন্তু এটুকু বললে সবটা বলা হয় না, কেননা প্রকৃত সত্যসন্ধানী যেহেতু এ কথা ভালোভাবেই বোঝে যে, একঝাঁক বকের পক্ষে একটা ফিনফিনে বুড়োকে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া মোটেই অসম্ভব নয়, সেহেতু সে পরাণের কথাকে উড়িয়ে দিতে পারে না, তবু তার মন থেকে খটকাও দূর হয় না, কারণ মথুরাগঞ্জের কেউ কেউ এমনটাও বলে থাকে যে, বুধোর ঠাকুরদাকে পাখির দল উড়িয়ে নিয়ে যায় নি, বরং সে হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল। ফলত সত্যসন্ধানী অন্য কোনও কথা শোনার প্রত্যাশায় যখন বুধোর জ্যাঠা নিবারণ, অর্থাৎ লোকমুখে লেবোর দ্বারস্থ হয়, তখন লেবো বলে, ‘বাবারে স্বয়ং নারায়ণ আইস্যাও যদি ওই দ্যাশে ফিরাইয়া লইবার চাইতেন, বাবা যাইত না।’ অতঃপর লেবো জানায়, তাদের এক কাকা সেকালে সপরিবার ও-দেশে থেকে গিয়েছিলেন, এবং তিনি যখন বুধোর ঠাকুরদাকে এক পোস্টকার্ডে লেখেন, ‘আমরা প্রাণভয়ে কলমা পড়িয়া মুসলমান হইয়াছি’, কিন্তু অভ্যাসবশে পত্রের শুরুতে ‘শ্রী শ্রী হরি সহায়’ লিখে সেই পোস্টকার্ড ডাকবাক্সে ফেলে দেন, তখন ও-দেশে সেই চিঠি বাজেয়াপ্ত হয়। পরবর্তীকালে কিভাবে চিঠি বাজেয়াপ্ত হওয়ার ব্যাপারটি তারা জানতে পেরেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরে লেবো কিছুই বলে না, শুধু বলে যে, ‘বাবা ও দ্যাশে যায় নাই, বাবা হাওয়ায় মিলাইয়া গ্যাছে।’ কিভাবে হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া সম্পর্কে লেবো এত নিশ্চিত হয় তা-ও সত্যসন্ধানীর কাছে খুব স্পষ্ট হয় না, কেননা লেবো বারবার শুধু এটাই বলে যে, বুধোর ঠাকুরদাকে বহু খুঁজেও যখন কোথাও পাওয়া যায় নি, এবং বুধো যেহেতু সেই কালসন্ধ্যায় বিলের ধারে একাই পড়ে ছিল, তখন হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া ছাড়া বুধোর ঠাকুরদার আর কোনো গতি হতে পারে না। সত্যসন্ধানী এই বিষয়টির বাস্তবতা সম্পর্কেও সম্যক অবহিত হওয়ার কারণে এ কথাও সে উড়িয়ে দিতে পারে না, বরং তার মনের সন্দেহ দৃঢ়তর হয়। আরও অনুসন্ধানে সে জানতে পারে, গ্রামের লোকেরা যখন বুধোর বাপের সঙ্গে সেই সন্ধ্যায় বুধো ও তার ঠাকুরদার খোঁজে বিলের ধারে এসে পৌঁছয় তখন বুধো ঠিক কী করছিল, সেই নিয়েও মতভেদ রয়েছে। পরাণ প্রমুখ বলে থাকে, ‘ব্যাটাটা তখন হামা টাইনছিল গো।’ অন্যদিকে লেবো বলে, ‘হামা দিবে ক্যান! ছেলে তখন হাঁটবার পারে না?’ তাহলে কি বুধো তখন হাঁটছিল? না, লেবো বলে, ‘গিয়া দেখি ছেলে ঘাসের উপর শুয়্যা ঘুম দিছে। ওদিকে ঠাকুরদা হাওয়ায় মিলাইয়া গ্যাছে, আর ছেলে ঘুম দিছে!’ শুধু বুধোর ঠাকুমা বলে, গ্রামের লোকেরা যখন বিলের ধারে পৌঁছায় ছেলে তখন কদম গাছের ডালে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিল। এই ব্যাপারটি প্রকৃত সত্যসন্ধানীর কাছেও অবিশ্বাস্য ঠেকে, তাই সে গভীরতর অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হয়।


সেই সমস্ত মানুষ অনমনীয় বজ্রকণ্ঠে বলেছিল, কলকাতার বদলা তারা নেবে।


বস্তুত মথুরাগঞ্জের অধিকাংশ লোক এ কথা কিছুতেই বিশ্বাস করে না যে, বুধোর ঠাকুরদা তার দেশে কখনো ফিরতে চাইত না। তারা বলতে চায়, এবং বলে, সেনাবাহিনীর হানাদারির সেই রাত্রে ঢাকার জগন্নাথ হলের সার্ভেন্টস কোয়ার্টারের পার্শ্ববর্তী একটি ম্যানহোলে বুধোর ঠাকুরদা যখন ঢুকে পড়ে এবং প্রায় উনত্রিশ ঘণ্টা বহমান গু-মুতের মধ্যে ভূত সেজে বসে থাকে তখন সে একা ছিল না। বুধোর ঠাকুরদা সেই রাতের কথা মথুরাগঞ্জের লোকেদের প্রায়শই বলত, এবং বলত, ‘জাকের ছিল আমার সঙ্গে, এক মোসলমানের ব্যাটা, তারে আগে চিনতাম না, তার কাঁধে গুলি লাগছিল’, এবং বলতে বলতে আতঙ্কে কিংবা ক্ষোভে তার চোখ ঔজ্জ্বল্যের সহোদর যে ম্লানিমা তার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে আসত। প্রায় দেড় দিন পরে ম্যানহোল থেকে উঠে আসার সময়ে জাকির যে তার সঙ্গে ছিল না সে কথা বলার পাশাপাশি বুধোর ঠাকুরদা এমনও বলত বলে জানা যায় যে, আরও আগে বুধোর ঠাকুরদার জ্যেঠা নোয়াখালির রামগঞ্জ গ্রামে এক বিকেলে রেশন নিয়ে ফেরবার পথে একদল মানুষের সম্মুখীন হয়েছিল, যাদের মুখের অগ্নিবর্ণিলতা তাকে বিহ্বল করে দিয়েছিল। সেই সমস্ত মানুষ অনমনীয় বজ্রকণ্ঠে বলেছিল, কলকাতার বদলা তারা নেবে। বস্তুত এর পরের দিনই রামগঞ্জের কালীমন্দিরের ধ্বজাকে কেউ বা কারা ভূলুণ্ঠিত করে তার ওপর হেগে রেখে যায়, এবং গ্রামের হিন্দুরা ছিন্নভিন্ন হয়ে পালাতে শুরু করে। বুধোর পূর্বপুরুষরা ঢাকায় এসে আশ্রয় নিলেও তাদের গ্রামস্থ প্রতিবেশী ফণীভূষণ রুইদাস কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজের আশ্রয়শিবিরে সপরিবার চলে আসে, এবং তারপর তারা কোথায় যায় কেউ জানতে পারে না। বুধোর ঠাকুরদা বলত, ‘এই বাংলায় আইস্যাও ফণী হারায় গিয়াছিল।’ এবং বলত, ‘আমরা তখনও দ্যাশ ছাড়ি নাই, ঢাকায় আসছিলাম। আইস্যা দ্যাখলাম, সে-ও কম বিদ্যাশ নয়।’ এ কথা কেন বলত বুধোর ঠাকুরদা তা মথুরাগঞ্জের লোকেরা ঠিক বুঝতে পারে না, কিন্তু এটুকু তারা বোঝে যে, যেখান থেকে সে এসেছিল সেই জায়গার প্রতি মাথুরকৃষ্ণীয় একটা বিরহ তার থেকেই গিয়েছিল। ফলত প্রকৃত সত্যন্ধানী সন্তুষ্ট হতে পারে না, এবং সে তার অনুসন্ধান জারি রাখে।

বস্তুত এ কথা মথুরাগঞ্জের হাওয়ায় কান পাতলেই শোন যায় যে, মথুরাগঞ্জে আসার পূর্বেই বুধোর বাপের পুংধ্বজা চূর্ণ হয়েছিল কেননা বুধোর ঠাকুরদা যখন ম্যানহোলের ভেতরে লোহুলালায় আপ্লুত জাকিরের সঙ্গে লুকিয়ে ছিল তখনই নারায়ণগঞ্জে একটি সেনাদল পৌঁছে মৃত্যুমর্মরে চতুর্দিক প্রকম্পিত করে তোলে, এবং বহু বহু বলাৎকারে যখন সেনাকর্মীদের পৌরুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন স্বাদবদলের জন্য একটি আঞ্চলিক গাভীর পশ্চাদবিহারে তারা প্রবৃত্ত হয়, এবং নারায়ণগঞ্জে নিজেদের বসতবাটীর ছাদে লুক্কায়িত অবস্থায় তৎকালীন যুবক বুধোর-বাপ দুই হাতে নিজের স্ত্রী এবং মায়ের মাথা ছাদের পাচিলের নিচে চেপে ধরে রেখে নিজের বিস্ফারিত চোখ দু’টিকে পাচিলের ওপরে ভাসিয়ে সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে এবং প্রবল আতঙ্কের মধ্যে সমধিক আতঙ্কে লক্ষ করে যে, তার পৌরুষ ক্রমশ উল্লম্ব অবস্থা প্রাপ্ত হচ্ছে। কেন এমনটা ঘটেছিল তা বুধোর বাপ কোনোদিন বলতে পারে না, ফলত মথুরাগঞ্জের লোকেরাও এ বিষয়ে কিছু বলে না, কিন্তু তারা এটুকু নিশ্চয়ই বলে যে, সে-ই ছিল বুধোর বাপের অন্তিম উত্থান। এ বিষয়ে মথুরাগঞ্জের অন্তরঙ্গ অবন্ধুদের কাছে সে প্রায়শই আক্ষেপ করত বলে জানা যায়, এবং এ-ও গ্রামের লোকেদের মুখে জানা যায় যে, এই ঘটনার পূর্বেই নিজের বিগত পৌরুষের চিহ্ন বুধোর বাপ রেখে দিয়েছিল স্ত্রীয়ের গর্ভে নিজের বীজ বপন করে এবং যার পরিণামে সীমান্ত পেরনোর সময়েই বুধোর মায়ের প্রসববেদনা ওঠে এবং পেট্রাপোল ও বেনাপোলের মধ্যবর্তী নো ম্যানস ল্যান্ডে রাতের অন্ধকারে খোলা আকাশকে সাক্ষী রেখে বুধো জন্ম নেয়। তবে মথুরাগঞ্জে বুধোর বাপের বিশেষ সুহৃদ মোহন এই অন্তিম উত্থানের বিষয়টিকে অংশত সত্য বলে মনে করে কেননা সে বলে, তার পরেও বুধোর বাপের পৌরুষ অন্তত একবার জেগেছিল। বস্তুত ঢাকা থেকে সপরিবার কলকাতার গাঙ্গুলিবাগানের বিদ্যাসাগর কলোনিতে এসে প্রাথমিক বসবাস শুরু করলেও কলোনির ক্লেদ বুধোর বাপদাদাদের শরীরকে অতিক্রম করে ক্রমশ অন্তর্লোককে স্পর্শ করে এবং তারা বিরক্ত হয় এবং পুনরায় তাদের স্মরণে আসে প্রায় পঁচিশ বছর পূর্বে রামগঞ্জের এক বিকেলে কয়েকজন অগ্নিবর্ণিল যুবকের দ্বারা উচ্চারিত ‘কলকাতার বদলা লইব’ বাক্যটি, এবং তাদেরও চোখ ঔজ্জ্বল্যের সোদররূপিনীর ম্লানিমায় আচ্ছন্ন হয়ে এলে তারা স্থির করে, এর চেয়ে গ্রামে যাওয়া ভালো। বস্তুত তখনই বুধোর বাপের পূর্বপরিচিত মোহনের সঙ্গে তাদের আকস্মিক পত্রমারফত যোগাযোগ হয় যে-মোহন তখন পূর্বদেশ থেকে এসে অজয় নদী পার করে লতায়পাতায় সম্পর্কিত এক মামার আশ্রয়ে মথুরাগঞ্জে রয়েছে। বস্তুত মোহনের আহ্বানরূপী প্ররোচনায় বুধোরাও তল্পিতল্পা নিয়ে মথুরাগঞ্জে চলে আসে, এবং বসতি স্থাপন করে। মোহনের মুখে জানা যায়, বেশ কয়েক বছর সেখানে নতমুখে বুধোর বাপ অপৌরুষেয় জীবনযাপন করার পর একদিন যখন মথুরাগঞ্জে খবর আসে যে, অদূরবর্তী হাইরোডের একটি পাঞ্জাবী ধাবায় এক অনত-বর্বর যুবকদল প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর নামে জয়ধ্বনি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, এবং মথুরাগঞ্জের লোকেরা তা দেখতে ছুটে যায়, এবং তাদের সঙ্গে গিয়ে বুধোর বাপও কালান্তক অন্ধকারের প্রেক্ষাপটে অগ্নিঅর্ণবে তরঙ্গায়িত ধাবাটিকে প্রত্যক্ষ করে, তখন থেকেই পুনরায় উত্তেজিত অভিব্যক্তি চলে আসতে থাকে বুধোর বাপের শরীরে। সেদিন রাত্রে গ্রামে আয়োজিত রামলীলার ময়দানে মোহনের পাশে বসে অভিনয় দেখতে দেখতে রাবণের প্রতি জটায়ুর সংলাপ, ‘রে পামর, নারীরে তুই স্বধর্মচ্যুত করিস কোন সাহসে!’ শুনে বুধোর বাপ সহসা কেঁপে ওঠে এবং মোহনকে বলে, ‘ওরা দোকানটায় আগুন ধরাইল ক্যান?’ মোহন বলে, ‘প্রধানমন্ত্রী খুন হইছে, তাই’, তখন বুধোর বাপ বলে, ‘কোথাকার প্রধানমন্ত্রী?’ এবং মোহন বলে, ‘আমাদের দ্যাশের।’ বুধোর বাপ এরপর কিছুক্ষণ অবোধ দৃষ্টিতে মোহনকে দ্যাখে, এবং বলে, ‘তারে কে করল প্রধানমন্ত্রী? আমি তো ভোট দিই নাই!’ মোহন এতে বিরক্ত হয় এবং বলে, ‘দাও নাই ক্যান? তোমারে তো কইছিলাম, লিস্টে নাম তোলাইতে। তোলাও নাই ক্যান।’ এ কথা শুনে বুধোর বাপ আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে বলে মোহনের মনে হয়, কেননা খানিক পরে সে যখন পুনরায় বুধোর বাপের দিকে আড়চোখে দৃষ্টিক্ষেপ করে তখন আধো অন্ধকারেও অনুমানে সে বোঝে, জঙ্ঘার কাছে বুধোর বাপের লুঙ্গিটা উঁচু হয়ে রয়েছে। বুধোর বাপ এরপর ‘আমি একটু আসতাছি’ বলে অভিনয় ছেড়ে উঠে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে মোহন জানতে চায় সে কোথায় যাচ্ছে, এবং বুধোর বাপ বলে, ‘মাগের কাছে’ এবং চলে যায়। সেই ঘটনার পর বহু বছর অতিবাহিত হলেও মোহন এখনও এ কথা খুব দায়িত্বের সঙ্গেই বলে যে, সেদিন বুধোর বাপের লুঙ্গিকে জঙ্ঘাস্থলে সে নিশ্চিতভাবেই উত্থিত অবস্থায় দেখেছিল। বস্তুত মোহনের এই কথায় প্রকৃত সত্যসন্ধানীর কোনো সন্দেহ জাগেও না, কেননা মথুরাগঞ্জের মানুষেরা বলে থাকে যে, সেদিন রামলীলা ময়দান থেকে উঠে ঘরে স্ত্রীয়ের কাছেই ফিরেছিল বুধোর বাপ। সেই রাত্রে তারুণ্যোত্তীর্ণা বুধোর মা-কে ঘুম থেকে তুলে বুধোর বাপ যখন কামবাঞ্ছা করে তখন বিস্মিত হওয়ার তুলনায় সম্ভবত বুধোর মা বিরক্তই হয়েছিল বেশি, কেননা সে বলেছিল, ‘মাইঝ রাতে অ্যাদ্দিন পরে এ আবার কী পাইগলামি!’ স্ত্রীয়ের এই কথায় বুধোর বাপের উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার পরিবর্তে আরও বেড়ে গিয়েছিল বলে মনে হয়, কেননা এরপর সে পাশবিক আক্রোশে ‘তোরে আজ ফাটাইয়া দিমু রে, মা’ বলে চিৎকার করে স্ত্রীয়ের কাপড় তুলে প্রমত্ত পশ্চাদবিহার শুরু করে। মথুরাগঞ্জের অনেকেই অবশ্য বলে থাকে, সেদিন নিজের স্ত্রীকে ‘মা’ নয়, বরং ‘মাগি’ বলে সম্বোধন করেছিল বুধোর বাপ, কিন্তু যে নারীরা তার পরের দিন পুকুরঘাটে ক্রন্দনরতা বুধোর মাকে কৌতূহলী প্রশ্ন করে গত রাতের ঘটনা প্রথম জানতে পেরেছিল তারা বলে যে, স্ত্রীকে সে রাতে ‘মা’ বলেই ডেকেছিল বুধোর বাপ। ‘আমাদেরও পোত্থমে সন্দেহ লাইগছিল গো’ বলে তারা, এবং বলে, ‘পরে বুধোর মা বইলল যে, না, বুধোর বাপটো গত রাইতে বারবার তাকে মা বলেই ডেকেছে’। বস্তুত একটু চাপ দিলে তারা এ কথাও বলে যে, সেই রাতে ‘তোরে কখনো দিই নাই, মা’ এবং ‘তোরে আরও দিমু, মা’ এমন বাক্যও বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করেছিল পশ্চাদবিহাররত বুধোর বাপ, যা শুনতে তার স্ত্রীর ভুল হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বুধোর বাপের এহেন আচরণের যেহেতু কোনো স্পষ্ট কারণ বোঝা যায় না, সেহেতু প্রকৃত সত্যসন্ধানী বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিতে রাজি হয় না, বরং তার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয় এই বিষয়টি যে, এই সমস্ত ঘটনা ঘটানোর পরের দিনই বুধোর বাপও বুধোর ঠাকুরদার মতোই উধাও হয়ে যায়। বস্তুত বিধ্বস্ত বুধোর মা সেই রাত্রে ঘুমিয়ে পড়ার পর পরবর্তী সকালে ঘুম থেকে যখন ওঠে তখন বিছানায় তার পাশে নিজের স্বামীকে দেখতে না পেয়ে তার ধারণা হয়, মানুষটা হয়তো মাঠে গিয়েছে। কিন্তু বেলা বাড়ার পরও যখন সে ফেরে না, তখন বুধোর মা বিষয়টি পরিবারের অন্যদের জানায়। বুধোর জ্যেঠা এবং জ্যেঠতুতো দাদারা বুধোর বাপের খোঁজে চতুর্দিক তোলপাড় করে ফেলে, কিন্তু তার খোঁজ মেলে না, এবং সেদিনই বেলার দিকে পুকুরপাড়ে বাসন মাজতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বুধোর মা এবং স্বামীর ওই অব্যাখ্যেয় আচরণের কথা সবাইকে বলে। বুধোর বাপ এরপর আর কোনোদিনই ফিরে আসে না, কিন্তু তার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নিয়ে গ্রামের লোকেরা তেমন কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারে না যেমনটা তারা দিয়েছিল বুধোর ঠাকুরদার ক্ষেত্রে। বস্তুত তাদের যখন জিজ্ঞেস করা হয় যে, বুধোর বাপ কোথায় গেল, তখন তারা পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়, এবং যখন জানতে চাওয়া হয় যে, সেদিনও সকালে তারা কোনো আকাশচারী বকের ঝাঁক দেখেছিল কি না, তখন হাত নেড়ে জানায় যে, না, দ্যাখে নি। বুধোর জ্যেঠাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সে অবশ্য পুনরায় বলে যে, বুধোর বাপও হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। সে বলে, ‘বংশটাই অভিশপ্ত, বুইঝলেন কি না? আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদা চৌষট্টি যোগিনীকে সাধনবলে জাগায় তুইল্যা তাদের সঙ্গে অবাধ সঙ্গম করছিল, দিনের পর দিন। তারই শাপ লাগছে। অ্যাকে অ্যাকে সকলেই হাওয়ায় মিলাইয়া যাইব।’ সত্যসন্ধানী বিষয়টির সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না, কিন্তু তার কাজই যেহেতু সত্যের শেষ দেখে ছাড়া, এবং সত্যের শেষ যেহেতু কখনও দ্যাখা যায় না, সেহেতু নিজের অনুসন্ধান সে অব্যাহত রাখে।


একদিন পরাণের কুষ্ঠশীর্ণ পায়ে তার বউকে তেল মালিশ করতে দেখে বুধো বিচলিত হয়ে পড়ে, এবং দৌড়ে গিয়ে সন্তাকে বলে, ‘আমি মুসলমানের মেয়ে বিয়ে করব। তোরা মেয়ে দ্যাখ।’ 


জানা যায়, বাপ নিখোঁজ হওয়ার পর বুধো দিন কয়েক অবশ্যম্ভাবী নীরবতা পালন করার পর ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, ও যৌবনের প্রারম্ভে সে তৎকালীন শাসক দলের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। বুধো বলত, ‘মানুষ রাজনীতি রক্তে নিয়ে জন্মায় না, রাজনীতির ট্যাবলেট তাকে আলাদা করে খেতে হয়। তো সেটা সে খাবে কেন? কিছু পাবে বলেই না? আর যারা শাসক, মজুতঘরের চাবি তাদের কাছেই থাকে, তারা ছাড়া আর কেউ কিছু দেবে না।’ মথুরাগঞ্জের কেউ কেউ এতে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী দেবে?’, অর্থাৎ ঠিক কী পেতে চায় বুধো। বুধো এই প্রশ্নের সম্মুখে বিহ্বল হয়ে পড়ত বলে জানা যায়, এবং বলত, ‘সে পাবার পরে বোঝা যাবে।’ সেইমতো বুধো শাসক দলের মিটিং-মিছিলে যোগ দেওয়া শুরু করে, কিন্তু তার কিছু প্রাপ্তিযোগ ঘটে বলে মথুরাগঞ্জের লোকেরা জানতে পারে না। এইভাবে কিছুকাল চলার পর একদিন গ্রামের এক বিয়েবাড়িতে পোস্তর তরকারি মেখে ভাত খেতে গিয়ে আচমকা বুধোর মনে পড়ে যায় যে, তার ঠাকুরদা রামগঞ্জে থাকাকালীন কোনোদিন ইলিশ মাছ ছাড়া ভাতের গ্রাস মুখে তুলত না; এবং এরপর খাওয়া থামিয়ে বুধো কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে, এবং তারপর পাতের ভাত পাতেই ফেলে রেখে সে উঠে চলে যায়। পরের দিন তাসের আড্ডায় গ্রামস্থ সন্তা যখন বুধোকে জিজ্ঞেস করে যে, আগের দিন কেন সে খাওয়া ফেলে উঠে গিয়েছিল তখন বুধো ওই ইলিশ মাছের গল্পটি বলে। অতঃপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে ঘোষণা করে, ‘আমি অযোধ্যা যাব।’ প্রথমটা কেউ তার কথার অর্থ বুঝতে পারে না, কিন্তু পরে বোঝে যে, দেশজুড়ে যে রথের চাকার ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে, তারই প্রত্যুত্তরে করসেবক হয়ে বুধো অযোধ্যা যাবে বলে স্থির করেছে, কেননা তার মনে হয়েছে, মুসলমানদের এমন জবাব দেওয়ার সুযোগ আর সে পাবে না। আড্ডার লোকেরা এই কথার উত্তরে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারে না, কারণ অযোধ্যা কোনদিকে তা তাদের জানা ছিল না, তাদের শুধু এইটুকু ধারণা ছিল যে, অযোধ্যা বহু দূরের ব্যাপার, যেমনটা খোদ অযোধ্যার লোকেরাও মনে করে থাকত। কিন্তু বুধো যে অযোধ্যা যাবে সে কথা ক্রমশ চাউর হতে থাকে, এবং গ্রামের লোকেরা বিভিন্ন সময়ে বুধোকে যখন জিজ্ঞাসা করে যে, সে অযোধ্যা কবে যাবে, কিংবা আদৌ যাবে কি না, তখন বুধো প্রত্যেকবার শিশুবৎ প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে, ‘যাব তো, অবশ্যই যাব। একটা ভালো দিন দেখে বেরিয়ে পড়ব।’ কিন্তু ভালো দিন যেহেতু সদাই অধরা থাকে সেহেতু আদপে বুধো কোথাওই যায় না, গ্রামেই পড়ে থাকে, এবং একদিন পরাণের কুষ্ঠশীর্ণ পায়ে তার বউকে তেল মালিশ করতে দেখে বুধো বিচলিত হয়ে পড়ে, এবং দৌড়ে গিয়ে সন্তাকে বলে, ‘আমি মুসলমানের মেয়ে বিয়ে করব। তোরা মেয়ে দ্যাখ।’ হতবাক সন্তা যখন জানতে চায়, সে হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছে, তখন বুধো বলে যে, সে বুঝেছে, একজন মুসলমানকে এক হিন্দুর চাকর করে রাখার এর চেয়ে ভালো রাস্তা আর নেই। কথাটা পুনরায় গ্রামে চাউর হয় এবং তার প্রতিক্রিয়ায় বুধোর অযোধ্যা যাওয়ার ব্যাপারটা চাপা পড়ে যায়। তখনও বুধোর মা যেহেতু সম্পূর্ণ উন্মাদ হয় নি, সেহেতু একদিন সে আবারও গ্রামের পুকুরপাড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে যেমনটা সে আট বছর আগেও একদিন ভেঙে পড়েছিল, এবং গ্রামের মেয়েরা যখন জানতে চায় যে, কেন সে কাঁদছে, তখন সে বলে, ‘জানো না? তুমরা জানো না? যে জাতি গাভীমাতার সঙ্গে অশৈলতা করে, তাদের মেয়েকে বুধো বিয়া করবে বলে বায়না ধরছে।’ গ্রামের মেয়েরা তখন বাক্যহীন সান্ত্বনা দিয়ে বুধোর মা-কে বোঝাতে চায় যে, এ বুধোর খেয়ালমাত্র, যেমনটা তার অযোধ্যা যাওয়ার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে হয়েছিল তেমনই এবারও আদপে বুধো কিছুই করবে না। সবকিছু ঠিক থাকলে বুধো শেষ পর্যন্ত কী করত তা অবশ্য জানা যায় না কারণ ইতিমধ্যে মসজিদ ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়, এবং দেশ জুড়ে কর্কশ মৃত্যুকলরোলের মধ্যে বুধোর মা সম্পূর্ণ উন্মাদিনী অবস্থায় রাস্তায় রাস্তায় দৌড়ে বেড়াতে শুরু করে। গ্রামের মানুষেরা মনে করতে থাকে, এবার বুধোর মায়েরও উধাও হয়ে যাওয়ার সময় আসন্ন, কিন্তু উধাও আদপে সে হয় না, বরং ধারাবাহিক বিস্ফোরণের মৃত্যুশলাকা যেদিন দেশের হৃদয় স্ফারিত করে দেয় সেদিন শাখা ও সিঁদুর পরিহিত বিধবা বুধোর-মা সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় লোকসমক্ষে এসে দাঁড়ায় এবং বলে, ‘এই হইল’ বলে মাটিতে পড়ে মরে যায়। কেউ কেউ যদিও বলে থাকে যে, ওই কথা বলার পরেই বুধোর মা মরে নি, বরং আরও দিন কয়েক বা মতান্তরে ঘণ্টা কয়েক বেঁচে ছিল, কিন্তু প্রকৃত সত্যসন্ধান যেহেতু সংখ্যালঘুর মতকে ধর্তব্যের মধ্যে ধরে না, সেহেতু ব্যাপারটা মথুরাগঞ্জের হাওয়ায় বুধোর ঠাকুরদার মতোই ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকে।

কার্যত বুধোর মা দেহত্যাগ করলেও দেহ যেহেতু বুধোর মা-কে ত্যাগ করে না, সেহেতু তাকে দাহ করার জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে চিতাগ্নির সামনে দাঁড়িয়ে চিত্রবৎ স্থির বুধো কিছুই করে না, যদিও বহু কিছুই তার করার ছিল। পরে নদীতে স্নান সেরে লৌহ স্পর্শ করে বাড়িতে প্রবেশ করার খানিক পর শুক্লা একাদশীর কুমারী চন্দ্রালোকের ভেতরে বুধোর জ্যেঠা সামনের উঠোনে দৃষ্টিক্ষেপ করে অকস্মাৎ নিজের বিগত বাবাকে দেখতে পায় এবং প্রারম্ভিক ভীতি কাটিয়ে ভাবতে শুরু করে, এই মৃত্যুমরীচিকা তাকে গ্রাস করার জন্যই এসেছে, এবং সমাগত প্রেতটিকে প্রণাম করে মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে। সেই সময় ঘর থেকে উঠোনে বহির্গত হয়ে বুধো ভাসমান মূর্তিটিকে দেখতে পায়, আহৃদয় প্রকম্পিত হয়, এবং ভীতিজাত সাহসের জোরে প্রবলস্বরে ‘রাম রাম’ জপ করতে শুরু করে। বুধোর জ্যেঠা তখন ‘ওরে উনি যে তোর ঠাকুরদা’ বলে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেও প্রকৃত সত্য এটাই যে, সেই একাদশীর উদ্ভিন্ন চন্দ্রালোকে এক নাতিবৃদ্ধের চোখের সম্মুখে এক বিগতযৌবন যুবকের রাম-নামের প্রতিক্রিয়ায় সেই ছায়াভূত রক্তমেদমাংসাস্থিময় বুধোকে আদ্যন্ত সঙ্গে নিয়ে মথুরাগঞ্জের হাওয়ায় চিরতরে মিলিয়ে যায়।

(941)