হোম গদ্য চিঠি ও স্মৃতিচারণায় বোর্হেস-অনুবাদক নরম্যান টমাস ডি জিওভান্নি

চিঠি ও স্মৃতিচারণায় বোর্হেস-অনুবাদক নরম্যান টমাস ডি জিওভান্নি

চিঠি ও স্মৃতিচারণায় বোর্হেস-অনুবাদক নরম্যান টমাস ডি জিওভান্নি
610
0

খবরটা পেয়েছিলাম তার মৃত্যুর দু’দিন পর (জন্ম ১৯৩৩—মৃত্যু ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। বেশ কয়েক মাস ধরেই তার সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না। ই-মেইল পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না তার। পরে কায়সার ভাই, মানে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কায়সার হক জানালেন যে মৃত্যুর মাসখানেক আগে তার সাথে কথা হয়েছিল। কণ্ঠ শুনেই নাকি তখন বুঝতে পেরেছিলেন নরম্যান বেশ নিস্তেজ হয়ে পড়েছেন। তার সঙ্গে শেষ আলাপের অল্প কিছুদিন আগেই নাকি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাসায় ছিলেন তিনি। এখন বুঝতে পারছি কেন ফোন করেও তার কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না। ২০০৯ সালে যখন তিনি বাংলাদেশে এলেন তখনই তার বয়স ৭৬, কিন্তু শারীরিক সামর্থ্যে ও মানসিক স্ফূর্তিতে তিনি রীতিমতো ঝলমলে এক প্রাণবন্ত মানুষ। হাসি আর ঠাট্টায় সময়গুলো মৌসুমি সমুদ্রের পেটের মতো ফুলে উঠেছিল আর আমরা ছিলাম সেখানে পালতোলা মাতাল তরণি। ভুবনমোহন লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসের সাথে তার দিনাতিপাতের সময়গুলোর অভিজ্ঞতা বলছিলেন গল্পচ্ছলে, কিন্তু দারুণ রসের মিশেলে। বলছিলেন আর্হেন্তিনার অন্য সব লেখকদের সাথে তার পরিচয়ের অভিজ্ঞতার কথাও। এসবই বলছিলেন আমাদের প্রশ্ন ও কৌতূহলের জবাবে। আর্হেন্তিনো লেখকদের কথাই যেহেতু এল, তাই ভুলে যাওয়ার আগেই বলে রাখি বোর্হেসের সহ-লেখক ও ঘনিষ্ট বন্ধু আদোল্ফো বিয়ই কাসারেসের কথা প্রসঙ্গক্রমে উত্থাপিত হওয়ায় জানা গেল তিনি ছিলেন নিপাট রমণীলিপ্সু [Mujeriego]। আর কথাটা যখন বললেন, তখন নরম্যানের চেহারার অভিব্যক্তি থেকেই বুঝতে পারছিলাম যে আদোল্ফো ছিলেন অবিশ্বাস্য মাত্রায় রমণীলিপ্সু। সেসব কথাবার্তায় পরে আসছি। কিভাবে তার সাথে সাক্ষাৎ সম্ভব হলো, সেখান থেকেই বরং শুরু করা যাক।

স্বীকার করা উচিত যে সে-বার আমি অফিস থেকে প্রায় জোর জবরদস্তি করেই ছুটি নিয়ে দেশে এসেছিলাম শুধুই তাকে দেখার জন্য। জোর জবরদস্তি এই জন্য যে আমি যেখানে চাকরি করতাম সেখানে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় প্রধান উৎসবগুলো ছাড়া ছুটি পাওয়া ছিল খুবই অসম্ভব। তারপরেও সেই অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল বন্ধু অনুবাদক আনিসুজ্জামানের আনুকূল্যে, আর সে ছিল এই যাত্রায় আমার সঙ্গী। সেও খুব আগ্রহী ছিল নরম্যানের সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য। আর এর সবটাই সম্ভব হয়েছিল মূলত অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক রফিক-উম-মুনীর চৌধুরীর উদ্যোগে। রফিক আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে যাচ্ছে এমন একজনের সাথে যাকে সে চিনেছে আমার মাধ্যমে—এই কথাটা এভাবে বলার মধ্যে একটা কৃতিত্বের ভাব হয়তো ফুটে ওঠে, কিন্তু আমি আসলে ঘটনার কৌতুককর আনন্দটা তুলে ধরার জন্য ওভাবে বললাম। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য, কিন্তু এক বৈপরীত্যে মোড়ানো ইতিহাস রয়েছে এর পেছনে। ইতিহাসটা এই যে, ১৯৯৭ সালে আমার সম্পাদনায় যখন মেহিকান মনীষা নামে মেহিকানো (প্রচলিত উচ্চারণ মেক্সিকান) লেখকদের একটি প্রবন্ধের সংকলন বের হয় তখন সেটি উৎসর্গ করেছিলাম নরম্যানকে। সেই বইয়ের একটি কপি রফিকের মারফত তাকে পাঠিয়েছিলাম। রফিক তখন লন্ডনে পড়াশুনা করছে। বোর্হেসের সাহিত্যের সাথে রফিকের পরিচয়ও ঘটে আসলে আমারই মাধ্যমে; সেই অর্থে নরম্যানের সাথেও রফিকের পরিচয় আমার মাধ্যমেই। কিন্তু এই রফিকই আবার—কী মজার ব্যাপার—নরম্যানের সাথে আমাকে সশরীরে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। এখানেই হচ্ছে সেই কৌতুককর পরিহাস।


ভাবা যায়, বোর্হেসের বন্ধু, বোর্হেসের অনুবাদক ঢাকায় আসছেন!


আমার উৎসর্গ করা বইটি পেয়ে তিনি যে খুব খুশি হয়েছিলেন—সে কথা রফিকই আমাকে জানিয়েছিল তখন। অনেক বছর পর আমি তখন মেহিকো-প্রবাসী, রফিক ততদিনে লন্ডনে পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরেছে। দুর্দান্ত সব কাজ করছে দেশে ফিরে। সেগুলোর বেশির ভাগই স্প্যানিশ সাহিত্যের অনুবাদ। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তার সাথে ফোনে ও মেইলে কথা হয়। তার বড় বড় পরিকল্পনার কথা জানাচ্ছে আর আমি তা শুনে শিহরিত হচ্ছি। ইতিমধ্যেই লাতিন আমেরিকার আধুনিক গল্পের একটা সংকলন প্রায় গুছিয়ে এনেছে বলে জানালো। গল্প আমি খুব একটা অনুবাদ করি নি কখনো, কিন্তু রফিকের আবদারে সেটা করতে হয়েছে সাহিত্যের প্রতি তার গভীর অনুরাগকে সম্মানিত করার জন্যই। এর আগে ২০০১ বা ২০০২ সালের দিকে বোধহয় রফিক আমাকে বলেছিল নরম্যান একটা বই লিখছেন বোর্হেস সম্পর্কে, সেখানে নাকি আমার উল্লেখ আছে। বলে কি! আমার উল্লেখ! আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কিভাবে কোন সূত্রে আমি উল্লেখিত হতে পারি তার মতো এক বিখ্যাত লেখকের বইয়ে। হ্যাঁ, মনে পড়ছে, তাকে উৎসর্গ করা বইটি পাঠানোর সময় বোর্হেস নিয়ে আমার তখন রঙিন আবেগ আর টগবগে উত্তেজনা—তাঁর অনুবাদে বোর্হেস পাঠের ফলাফল হিসেবেই—জানিয়ে একটা দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলাম এবং বলেছিলাম যে এই উৎসর্গ আসলে আপনার অনুবাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার একটি প্রকাশ মাত্র। ভাবতে আশ্চর্য লাগে বোর্হেস ততদিনে মৃত আর আমি কোন এক অচেনা অজানা ভাষার এক বোর্হেস-পাঠক, যার আবেগ, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতাকে মূল্য দিচ্ছেন এক ভুবনমোহন অনুবাদক, যিনি কিনা বোর্হেসের সাহচর্য ও বন্ধুত্বে এক বিশেষ ব্যক্তি, যাকে ‘নিউ ইয়র্কার’-র মতো পত্রিকা চুক্তিবদ্ধ করেছিল নিয়মিত লেখার জন্য, মার্কিন বাঘা বাঘা প্রকাশনীর সাথে যিনি চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন বোর্হেসের অনুবাদ প্রকাশের জন্য। এসব তথ্য আমার ততদিনে জানা হয়ে গেছে। ফলে, আমি উত্তেজনায় অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম রফিকের কাছ থেকে সে কথা শুনে। সম্ভবত সে বছরের কোনো এক সময় রফিকের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে নরম্যান আমাকে সৌজন্যপূর্ণ এক চিঠি লিখেছিলেন। আমি যথারীতি তার উত্তরও দিয়েছিলাম। কিন্তু কথাবার্তা আর খুব বেশি এগোয় নি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দিক থেকে দেখলে মেহিকো-প্রবাস ছিলো আমার জন্য এক বন্ধ্যা ও বিমুখ সময়। সাংস্কৃতিক (স্বদেশের) বিচ্ছিন্নতা আমাকে অনেকটাই নিষ্প্রাণ করে রেখেছিল। লেখালেখিও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেকের সাথেই যোগাযোগ ছিল নিরুৎসাহের নিরালোকে স্থবির। নরম্যানের সাথেও সেই হঠাৎ আলোর ঝিলিকের মতো সূচনাকে ধারাবাহিকতায় নিতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। কিংবা বলা যায়, আমি এতই নির্বোধ ছিলাম যে ধারাবাহিকতা রক্ষার গুরুত্বটা তখন বুঝতে পারি নি। অবশেষে আবার তার সাথে যোগাযোগ হলো। এবারও রফিকই ঘটক। ওই চিঠি লেখার ছয় বছর পর রফিক বলল নরম্যানকে ঢাকায় সাহিত্যের এক সেমিনারে দাওয়াত করা হয়েছে এবং তিনি আসতে সম্মত হয়েছেন। নরম্যান ঢাকায়? রফিক তো রীতিমতো অসাধ্য সাধন করে ফেলেছে! আমি বললামও তাকে সে কথা। ভাবা যায়, বোর্হেসের বন্ধু, বোর্হেসের অনুবাদক ঢাকায় আসছেন! ঢাকার লেখক-পাঠকরা কি সত্যি বুঝতে পারছে নরম্যানের আসার গুরুত্ব? কিন্তু এই সংবাদটা যতই উত্তেজনাময় মনে হচ্ছিল আমার কাছে, আমি ততই বিষণ্ন বোধ করছিলাম এই ভেবে যে আমি তাকে আমার দেশে দেখার সুযোগটি পাব না বলে। কিন্তু রফিক বলল, রাজু ভাই, নরম্যান আসবে আর আপনি থাকবেন না—এটা কী করে হয়? আমি তখন জাপানি যে-কোম্পানিতে চাকরি করি সেখানে ছয়টা-পাঁচটা নিয়মিত উপস্থিতির বিধান। বছরের মাঝামাঝি আমাকে কোনোভাবেই এক সপ্তাহের ছুটি তো দূরের কথা, দুদিনের জন্যও ছুটি দেবে কিনা সন্দেহ, যদি না অসুস্থতার অজুহাত দেখাই। রফিক, প্রায় মিনতির স্বরেই বলল, আপনি এক সপ্তাহের জন্য হলেও আসুন। দরকার হলে আপনার জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করব। আহা রফিক! আমি বুঝতে পারছিলাম না, কী করব। রফিক আমার দ্বিধা আঁচ করে বলল, আপনিও এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হবেন, আপনার আসা যাওয়ার খরচের ব্যবস্থাও করব, আপনি চলে আসুন, প্লিজ। এমন নয় যে আমি যেতে চাচ্ছিলাম না, যাওয়ার জন্য আমি খুবই ব্যাকুল ছিলাম, কিন্তু আমার অন্য এক বাঙালি বন্ধু, ঘটনাক্রমে যে আমার বস, তাকে কোনোভাবেই তা বুঝাতে পারছিলাম না, কারণ সাহিত্য-ব্যাপারে সে পুরোপুরি আবেগরহিত এক মানুষ। কিন্তু সেখানেই আমার আরেক বন্ধু আনিস, যে কিনা সাহিত্য বিষয়ে রীতিমতো আবেগে প্রজ্বলিত, সে-ই আমার যাওয়াকে নিশ্চিত করে তুলল। এদিকে আমি যখন যাওয়ার ব্যাপারে অনিশ্চয়তায় ভুগছি তখন নরম্যান কয়েকটি মেইল করে আমাকে তার দেখার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। যাওয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগার আগেই তাকে একটি চিঠি লিখেছিলাম বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য অগ্রিম স্বাগত জানিয়ে। আমার চিঠিটি ছিল দুর্বল ইংরেজিতে লেখা, কিন্তু তিনি আমার দুর্বল ইংরেজির উল্টো প্রশংসা করে আমার হীনম্মন্যতাবোধকে ধূলিসাৎ করে দিলেন তার স্বভাবসুলভ উদারতা দিয়ে। আর সে চিঠিতেই তিনি জানালেন আমাকে দেখতে চাওয়ার কথা :

N T di Giovanni <norman@digiovanni.co.uk>
4/10/09
to razualauddin
[razualauddin_hotmail.com]
Razu,

What a beautiful letter! Thank you very much. Your English, my dear friend, is better than mine.

Are you in Mexico? Or will I be lucky enough to meet you in Dhaka next month? It seems that Rafique has pulled a rabbit out of the hat and got us invitations. Since meeting him and knowing you through your letters I have had a great desire to visit Bangladesh.

I am reading about yr country now but I feel it shall remain incomprehensible until I can take it in with my own eyes.

This is just a quick note of thanks. Do let me know if you are still in Mexico. I also want to point out my website, which perhaps you will enjoy.

www.digiovanni.co.uk

Un abrazo fuerte,

Norman

এই চিঠি যখন তিনি লিখছেন, তখন তিনি লন্ডনে আর আমি মেক্সিকো। রফিক তার আগেই আমাকে ঢাকা যাওয়ার জন্য বললেও আমি যেতে পারব না বলে জানিয়ে দিয়েছিলাম। এরই কয়েকদিন পর নরম্যানের প্রথম চিঠিটা এল। আমার ধারণা, সম্ভবত রফিকের প্ররোচনায়ই তিনি চিঠিটা লিখেছিলেন। রফিক হয়তো ভেবেছিল নরম্যান বললে আমি আর ‘না’ করতে পারব না। রফিকের কাছ থেকে আমার অপারগতা শুনে তিনি দুদিন পর আমাকে আরেকটি চিঠি লিখলেন :

N T di Giovanni <norman@digiovanni.co.uk>
4/10/09

to razualauddin

Razu,

Rafique phoned me last night and I learned that you will not be in Dhaka. What a pity. I count you as a benefactor.

Thanks for your visit to my website. I shall continue to be posting Borges material there, and I shall inform you when new items appear.

Now the the trip to Bangladesh is a reality, I am working on the arrangements. I find tedious all the bureaucracy of visas and vaccinations against ever known and several unknown diseases. I am reading about your country and everything seems to be a warning about how awful
it all is. I refuse to believe it. Or, at least, I want to see for myself.

You could give me some advice about what you think I should try to see of the country apart from Dhaka. I am sure Rafique will be more than helpful, but I would value your views as well.

I am a most informal person and can’t abide stuffiness. Am I going to be all right? All the young Bangladeshi I met in London were wonderful, so why am I worried? I am not an academic. I dislike institutions. I was once invited to the University of Maryland as a guest lecturer for a year and a half and every minute of it was torture. My translations have been subjected to such stupid criticism by American academics. I distrust the whole lot of them. I write and translate for readers, not for a narrow academic community.

Anyway, enough ranting. Tell me, give me some sound advice. I look forward to your views.

Un abrazo,

Norman

তার চিঠিগুলো পড়তে গিয়ে লক্ষ করছি আমার যাওয়া না যাওয়ার এই নিঃশব্দ ও অদৃশ্য নাটকীয়তার সূত্রে বাংলাদেশ সম্পর্কে তার আগ্রহ, অন্যদিকে, ভিসা বিষয়ক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও একাডেমিসিয়ানদের বদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়াগুলো। আর এই চিঠিরই সবশেষে প্রায় সব বড় নিমগ্ন লেখকের মতোই জানালেন যে তিনি লেখেন এবং অনুবাদ করেন পাঠকদের জন্য, সংকীর্ণমনা বিদ্যায়তনিক গোষ্ঠীর জন্য নয়। আমার চিঠির জবাবে তিনি তিন দিন পর আবার আরেকটি চিঠি লিখলেন। তার অনুবাদ এবং বোর্হেস সম্পর্কিত আমার কিছু জিজ্ঞাসা ছিল সেই চিঠিতে। জিজ্ঞাসার একটা হলো, কেন তিনি তার অনুবাদগুলো পুনঃপ্রকাশ করছেন না। আমার একদমই জানা ছিল না তার অনুবাদগুলো প্রকাশ না করার পেছনের আইনি জটিলতার বিষয়টি। তিনি সে বিষয়টি সংক্ষেপে কিন্তু স্বচ্ছতার সঙ্গে জানালেন আমাকে লেখা তার তৃতীয় চিঠিতে। বোর্হেস সম্পর্কে কৌতূহলী পাঠকরা এই চিঠিতে পাবেন অন্তরালের সেই জটিলতার কারণগুলো।

N T di Giovanni <norman@digiovanni.co.uk>
4/10/09

to razualauddin

Razu,

The Universal History you bought is the first edition. The introduction I am writing is an entirely different matter. Perhaps I’d best explain to
you what I am up to.

When Borges died in 1986, his estate fell into the hands of one Maria Kodama, who cut me entirely out of the picture. Eventually she got new translations made of all of Borges’s work, thereby scuppering all I had done and also throwing away Borges’s own contribution to our project. I believe she broke my contracts illegally. The new translations have turned out a disaster and have been universally pilloried.

I am trying to get my old work reinstated. I have a publisher here who has free access to high-powered copyright lawyers whom I cannot afford. They are now looking over my contracts to determine the legality or illegality of what has taken place.

Meanwhile I have been secretly working on an entirely new edition of Borges fiction. It is to be in 13 volumes. It begins with the brief autobiography that he and I wrote directly in English. For this edition, I am extensively revising the old translations, principally to cast them into British English  and out of the American English in which they were originally written. I call this new edition The Millennium Borges.

For each of these volumes I am writing a three- or four-page introduction for the common reader. I have completed vols. 1, 3, and 8 and am currently putting finishing touches on vol. 2, a Universal History.

I will tell you more about this later. None of it may ever come to fruition commercially, but I am determined to finish it anyway and possibly bring out a privately printed edition of 35 copies. I believe I owe this to Borges and to his readers.

Anyway, I have had no reply from Sabbir to my letter and valuable time is slipping away. What should I do?

Best wishes,

Norman

এই চিঠিতে বোর্হেসের রচনার অনুবাদ বিষয়ক প্রকাশের জটিলতা ও নরম্যানের নতুন পদক্ষেপ নিয়ে আলাদা করে অন্যত্র বলার লক্ষে আপাতত এ বিষয়ে চুপ থাকছি। কিভাবে তার সাথে সাক্ষাৎ সম্ভব হয়েছিল সেই দিকটাতেই মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখতে চাই।

ইতিমধ্যে রফিকের সঙ্গে আমার যাওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত করে ফেলেছি। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিঠি লিখে জানালাম যে আমি যাচ্ছি। এর পরদিনই নরম্যান আমাকে ছোট্ট এক চিঠিতে তার শিশুতোষ পবিত্র সারল্যের বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইলেন আমার আসাটা সত্যি কিনা:

N T di Giovanni <norman@digiovanni.co.uk>
4/10/09

to razualauddin

Razu,

Please confirm: did I or did I not receive an email from you just now in which you say you are coming to meet Susan and me In Bangla?

Or was it a dream?

Please, please, please come. I am dying to meet you.

A warm embrace,

Norman

PS. Your copy of Universal History is the paperback, the hardcover was issued in 1972.

এই চিঠিটা পড়ে আমার তখন মনে হয়েছিল বড় মানুষের একটি বড় গুণ এই যে, তারা ছোট ছোট জিনিসকেও গুরুত্বের সাথে দেখতে পারেন। তা না হলে আমার মতো অজ্ঞাতকুলশীল রাজু আলাউদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে এমন মমতা নিয়ে লিখবেন কেন? জীবনে আমি যার কোনো প্রয়োজনে আসার সৌভাগ্য ও সক্ষমতা অর্জন করি নি তাকে গুরুত্ব দেয়ার এমন কী আছে। কিন্তু, তবুও এমনই ছিলেন তিনি জীবদ্দশায় যোগাযোগের শেষ দিনটি পর্যন্ত।

২০০৯ সালের মে মাসে আমাদের এক সাথে হওয়ার কথা ঢাকায়। কিন্তু এপ্রিল থেকেই তখন বিশ্বব্যাপী আলোচনা ও আতঙ্কের বস্তু হয়ে ওঠে মেহিকোতে জন্ম নেয়া Swine Flu, কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন যাকে—পরবর্তী এক আড্ডায়—বাংলা তর্জমা করে বলেছিলেন ‘বরাহ-ব্যাধি’, আর কথ্য ভাষায়ও এর আরেক নাম তিনি দিয়েছিলেন : ‘শুওইরা জ্বর’। আশরাফ ভাইয়ের সেই তর্জমা ছিল বেশ উপভোগ্য। কিন্তু বিশ্বব্যাপী এই রোগ তখন দুর্ভোগের কারণ হিসেবে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। অতএব, আমি মেহিকোতে আছি জেনে আমার ব্যাপারে তার উদ্বেগ জানাতে ভুললেন না :

Date: Saturday, May 9, 2009, 9:31 AM
Razu
With all this publicity about swine flu in Mexico I have been 
anxious about you. I hope you are well and will arrive in 
Bangladesh well. I am counting on you.
I have a couple of presents for you, one of which is long
overdue.
Susie and I hope you will be able to act as our guide in
your country, with Rafique if he is available, without him
if not. We are determined to give our hosts more than what
they have asked us for. In return, we want to come back to
England with a huge piece of Bangladesh for ever in our
hearts and for ever in our lives. We are counting on you
to make this come true.
Un abrazo muy fuerte,
N.

অবশেষে আমাদের প্রতীক্ষিত সাক্ষাতের জন্য রওয়ানা হলাম মেহিকো থেকে আমি এবং বন্ধু আনিস। ঢাকা বিমানবন্দরে এসে যখন পৌঁছুলাম, দেখি রফিক আমাদেরকে রিসিভ করার জন্য হাজির। বিমানবন্দর থেকে বেরোনো মাত্রই রফিক কাকে যেন ফোন করে আমাকে তার ফোনটা ধরিয়ে দিল কথা বলার জন্য। ওপার থেকে ভেসে এল নরম্যানের কণ্ঠ : Razu, Bienvenido a Dhaka, estamos esperando a verte [রাজু, ঢাকায় স্বাগতম। আমরা তোমাকে দেখার অপেক্ষায় আছি]। কী রসিকতারে বাবা! যেখানে কিনা আমার দেশে তাকে স্বাগত জানাবার কথা, উল্টো অতিথিই আমাকে আমার দেশে স্বাগত জানাচ্ছে! বোর্হেসীয় ধরনে তিনি যে বিপ্রতীপ রসের স্রষ্টা এই স্বাগতবচন যেন তারই এক নমুনা হয়ে উঠল। টুকটাক আরও সৌজন্য বিনিময়ের পর আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। রফিককে বললাম, আমার দেশে এক বিদেশি আমাকে স্বাগতম জানাচ্ছে। এবার বুঝুন রসিকতাটা। ঢাকার ট্র্যাফিক জ্যামের মধ্যে আমরা হাসতে হাসতে হৃদয়ে পাল তুলে এগিয়ে যাচ্ছি নরম্যানের দিকে। পরে মেলামেশা করে দেখেছি রসিকতা আর সিরিয়াসনেস—বোর্হেসের অালংকারিক শৈলীর মতোই-তার ব্যক্তিত্বে পরস্পর আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে আছে মৈথুনরত যুগলের মতো।

বিমানবন্দর থেকে আমরা সরাসরি পৌঁছে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব এক্সিলেন্স-এ, নরম্যান আর তার স্ত্রী সুসি উঠেছেন সেখানে। নরম্যানকে আগে ছবিতে দেখেছিলাম। তাকে প্রথম সরাসরি দেখার আবেগ ও উত্তেজনা পুঞ্জীভূত করে ধীরে ধীরে তার রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। বোর্হেসের অনুবাদক, বোর্হেসের কয়েক বছরের সঙ্গী এবং বন্ধু; তিনি যে দুর্ভেদ্য দুর্গম হবেন না তার আঁচ তো চিঠিপত্র থেকে অনেকটাই করা গেছে। বাস্তবেও দেখা গেল তাই। রফিক পরিচয় করিয়ে দেয়া মাত্রই স্প্যানিশেই তাকে সম্ভাষণ জানালাম। তিনি সম্ভাষণের জবাবে কেবল করমর্দন করেই ক্ষান্ত হলেন না, বললেন, Dejame abrazarte (তোমাকে আলিঙ্গন করতে দাও)। তার আন্তরিকতা ও উষ্ণতায় শরীর ও হৃদয় কল্লোলিত হয়ে উঠল। গড়পড়তা ইউরোপীয়দের তুলনায় একটু বেটে, কিন্তু গাট্টাগোট্টা ধরনের। পোশাকে কোনো সাহেবিয়ানা নেই। একেবারেই সাধারণ, প্রায় আটপৌরে পোশাক। কথা বলেন, ধীর লয়ে, প্রতিটিবাক্য কেবল সুগঠিতই নয়, তা একই সাথে অর্থের যথাযথতায় সুবিন্যস্ত, যেমনটা তার লিখিত গদ্যের মধ্যে লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ বাক্যালাপে আমরা অনেক সময় এলোমেলো ভঙ্গিতে কথা বলি, তেমন নয় তার কথা বলার ধরন। কিন্তু তাই বলে ভঙ্গি তাকে রসিকতা থেকে বিরত রাখে না। তার এই ধরনকে ঠিক আনুষ্ঠানিক বলা যায় না, কারণ কথা বলছেন হালকা চালেই, কিন্তু যা বলছেন তা স্বচ্ছতা ও পূর্ণতায় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। পরিচয় করিয়ে দিলাম আমার বন্ধু অনুবাদক আনিসুজ্জামানের সাথে। আনিস ভীষণ সাহিত্যানুরাগী, বোর্হেসের সাথে নরম্যান একসাথে বেশ কয়েক বছর কাটিয়েছেন শুনে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ছুটে এসেছে দেখার জন্য।


কাজলবাবু, আমি যদ্দুর জানি, বামপন্থি ঘরানার মানুষ। অথচ তারা যখন এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সামাজিক সমস্যাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন তখন তা দেখে দুঃখ হয়।


তার সাথে আলাপ ও আড্ডার বেশির ভাগটাই ছিল বোর্হেস, আর্জেন্টিনা এবং তার দেখা আর্জেন্টাইন ও অন্যান্য স্প্যানিশভাষী লেখকদের সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ও সম্পর্কের বয়ানে ঋদ্ধ। তার নিজের অনুবাদ সম্পর্কে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। রফিক তাদেরকে নিখুঁত আতিথেয়তা দিয়ে যতটা স্বাচ্ছন্দ্য ও আরামদায়ক করে রাখা যায় তার সর্বোত্তম চেষ্টা করেছিল। পরিচিত লেখক-বন্ধুদের অনেকেই এসেছিলেন নরম্যানের সাথে দেখা করার জন্য। অনুবাদক ও অধ্যাপক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, কবি কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, আরও কেউ কেউ। কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে নরম্যান আলাপ করার সময় আমি হঠাৎ করেই উপস্থিত হওয়া মাত্র লক্ষ করলাম তিনি নরম্যানকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন এদেশে হিন্দুরা কতটা এবং কিভাবে নির্যাতিত ও বঞ্চিত হচ্ছে। আমি তাকে তখন জিজ্ঞেস করলাম, আপনি হিন্দুদের নির্যাতিত ও বঞ্চিত হওয়ার কথা বলছেন, সেটা ঠিকই আছে। কিন্তু এদেশে কি মুসলমানরাও নির্যাতিত ও বঞ্চিত হয় না? আপনি আলাদা করে শুধু হিন্দুদের কথা বললে সেটা সাম্প্রদায়িক শোনায়। এদেশে ক্ষমতাবান ও বিত্তবান হিন্দু কি নির্যাতিত ও বঞ্চিত হচ্ছেন? ক্ষমতাহীন ও বিত্তহীন—তা সে হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক তারা নির্যাতিত হন। সমস্যাটা ধর্মীয় পরিচয়ের নয়, সমস্যাটা আমরা কোন রাজনীতির মধ্যে আছি, সেটা। গণতন্ত্র ও স্বাধীন বিচার বিভাগ যদি প্রতিষ্ঠা করা যেত তাহলে এই প্রশ্নগুলো দেখা দিত না। কাজলবাবু, আমি যদ্দুর জানি, বামপন্থি ঘরানার মানুষ। অথচ তারা যখন এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সামাজিক সমস্যাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন তখন তা দেখে দুঃখ হয়।

কিন্তু একটা বিষয়ে আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল এটা দেখে যে বাংলাদেশে তখন এতগুলো পত্রিকা এবং চ্যানেল তারা কেউ-ই নরম্যানকে নিয়ে লেখার বা কোনো অনুষ্ঠান করার প্রয়োজন বোধ করে নি। এত বড় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক অনুবাদক, তার ব্যাপারে আমাদের গণমাধ্যমগুলোর অনীহা অবহেলা বা অজ্ঞতা যাই বলি না কেন, আমার নিজের কাছে খুবই অসম্মানজনক মনে হয়েছিল। আমি প্রায় ১০ বছর যাবৎ দেশের বাইরে থাকায় পত্রিকাগুলোর সাহিত্য বিভাগের দায়িত্বে থাকা কাউকেই চিনি না। তারাও নিশ্চয়ই আমাকে চেনেন না। ফলে তাদের কাছে বলার মতো সম্পর্ক আমার ছিল না। আর চ্যানেলের কাউকে তো আমি এমনিতেও চিনি না, কারণ এগুলোর উত্থান ঘটেছে আমি যখন প্রবাসে। শেষ পর্যন্ত লজ্জা কিছুটা লাঘব করার জন্য তাকে নিয়ে রফিকের সম্পাদনায় প্রকাশিত ব্রোশিয়রের লেখাটিই প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলাম ‘প্রথম আলো’র সাহিত্য সাময়িকীতে। যদিও নিশ্চিতভাবেই জানি, আমি যা নিয়ে এত চিন্তিত তা নিয়ে নরম্যানের কোনো ভাবনাই নেই। আমাদের সঙ্গে আড্ডায়, এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে তিনি বেশ খোশ মেজাজেই আছেন। রফিক তাকে এরই মধ্যে ঢাকার বহু দর্শনীয় স্থান দেখিয়েছে। পুরোনো ঢাকার অলিগলিও ঘুরিয়ে এনেছে। পুরোনো ঢাকা নাকি তার বেশ ভালো লেগেছে। বাংলাদেশের বহু কিছু তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিয়েছিলেন আমাদের কাছ থেকে। ভাষা-আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের সমস্যা। বাংলা সাহিত্যের প্রধান প্রধান ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানার জন্য ইংরেজিতে অনূদিত বাংলা কবিতা ও গল্পের যে কটি সংকলন তখন পাওয়া গিয়েছিল সেগুলো তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশ আমাদের প্রধান আবেগ হয়ে ওঠার কারণে তারও কিছু অনুবাদগ্রন্থ জোগাড় করেছিলাম। তবে বাংলাদেশি অনুবাদকদের অনুবাদ পড়ে তিনি ভাষার অসমসাময়িকতা নিয়ে বেশ হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। কারো কারোর অনুবাদের ভাষা নিয়ে বেশ ঠাট্টা-তামাশাও করেছেন খুব। তবে কায়সার হক-এর ইংরেজি ভাষার খুব প্রশংসা করেছিলেন তিনি।

34103743_1871621496216296_1069920290949038080_n
নরম্যানের সঙ্গে উপরে বাম দিকের ছবিতে: রাজু আলাউদ্দিন ও রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী; উপরে ডান দিকের ছবিতে: রবিউল হুসাইন ও বেলাল চৌধুরী; নিচে বাম দিকের ছবিতে: রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী ও রাজু আলাউদ্দিন; নিচে ডান দিকের ছবিতে: রাজু আলাউদ্দিন ও কায়সার হক

কায়সার ভাইয়েরই উদ্যোগে কিনা জানি না, কবি রবিউল হুসাইনের বাসায় নৈশভোজের একটা আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে, কবি বেলাল চৌধুরী, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, খাদেমুল ইসলাম, কায়সার হক রফিক-উম-মুনীর চৌধুরীসহ আরও কে কে যেন ছিলেন। নরম্যান সেই আড্ডাটা বেশ উপভোগ করেছিলেন। ঐ ভিড়ের মধ্যে আমি প্রায় শ্রোতার ভূমিকায় ছিলাম। কেবল মাঝে মধ্যে নানানজনকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে তাদের সম্পর্কে যে সব বিশেষণ ও পরিচিতি দেয়া দরকার, তা দিয়েছিলাম।

পরিমিত পান ও প্রিয় বিষয়ে কথা বলার অনুকূল পরিবেশ তাকে যে খোলতাই ও দিলখুশ অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল তা ওনার অগোচরে লক্ষ্য করে আমার বেশ মজাই লাগছিল। কত বড় বড় মানুষের সঙ্গে তিনি আড্ডা দিয়েছেন। বোর্হেসের মতো লেখককে তিনি কত সব পরামর্শ দিয়েছেন এবং তার Gogres & Else বইয়ের মাধ্যমে জানতে পারছি বজ্জাত স্ত্রী এলসার কাছ থেকে বোর্হেসকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রেও এই মানুষটিই ছিলেন নাটের গুরু। সেই মানুষটিই এখন আমাদের মাঝে, আছেন এমনভাবে যেন আমাদের মতোই গৌণ কেউ, আচরণে ও আলাপে নেই অহংকারের সামান্যতম ইশারা।

রফিক ও আমি পরিকল্পনা করলাম নরম্যানের একটা দীর্ঘ সাক্ষাৎকার আমরা ফাঁকে ফাঁকে নিতে থাকব। আমি যে ক্যামেরাটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম, সেটা ছিল ডিজিটাল ক্যাসেটের। সেটি কিনেছিলাম ২০০৪ সালের দিকে। তবে কাজ চালানোর মতো। ছবি বা ভিডিওর গুণগত মান তেমন আহামরি কিছু না, কিন্তুু কাজ চালানো যায়। আর দেখলাম, ঢাকায় এসব ক্যাসেট পাওয়াও যায়।

Norman, Susan, Razu-1
নরম্যান ও তার স্ত্রী সুজানের সঙ্গে লেখক

আমাদের প্রস্তাবটি নরম্যানকে জানাবার আগে একটু দ্বিধায় ছিলাম তিনি রাজি হবেন কিনা। আর এই সাক্ষাৎকারে বিরাট অংশই যেহেতু হবে বোর্হেসকে কেন্দ্র করে, সুতরাং তিনি বোর্হেস সম্পর্কে এখন মুখ খুলতে রাজি হবেন কিনা কে জানে। কারণ ইতিমধ্যেই বোর্হেস-বিশ্বে দুটা পন্থি তৈরি হয়ে গেছে: একটি কোদামাপন্থি, অন্যটি অ-কোদামাপন্থি। নরম্যান কোদামাপন্থিদের বিপরীতে অবস্থান করেন। নরম্যানের অনুবাদ পুনঃপ্রকাশের অনুমতি দিতে না-রাজ কোদামা। এ নিয়ে মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত চলছে। কোদামা তাকে বোর্হেস-বিশ্ব থেকে পারলে চিরকালের জন্য মুছে ফেলতে চায়। এসব কারণেই আমাদের একটু সংশয় ছিল তিনি আদৌ রাজি হবেন কিনা। কিন্তু প্রস্তাব করতেই ফল ঘটল উল্টো। তিনি সাক্ষাৎকার দেবেন তো বটেই, আমাদেরকে বিস্মিত করে দিয়ে বললেন, তোমরা ইচ্ছে করলে বোর্হেস সম্পর্কিত যে কোনো বাজে প্রশ্নও করতে পারো। আমরা দুজনই আনন্দে আপ্লুত। কিন্তু আমি একটা বিষয়ে ভেবে পাচ্ছিলাম না, কেন তিনি বললেন বাজে প্রশ্নও করা যাবে। বোর্হেস নিয়ে কী এমন বাজে প্রশ্ন করা সম্ভব? এ নিয়ে ভেবে আমি বাজে কোনো প্রশ্নই খুঁজে বের করতে পারছিলাম না। যাই হোক, সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য আমার দীনহীন ভিডিও ক্যামেরাটা দিয়ে সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেছিলাম। সেই সাক্ষাৎকার মোট কত ঘন্টার ছিল এখন আর মনে নেই, তবে চার/পাঁচ ঘণ্টা তো হবেই, আরও বেশিও হতে পারে।

[ছবি: Kabir Chow with Norman-1]

Kabir Chow with Norman-1
কবীর চৌধুরী ও নরম্যান ডি জিওভান্নি

দিনটি এ মুহূর্তে মনে নেই, যেদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নরম্যান এবং আমি একই মঞ্চে আসীন। কবীর চৌধুরী ছিলেন সে অনুষ্ঠানের সভাপতি। সেদিনের বিষয় ছিল বোর্হেসের জীবন ও সাহিত্যকর্ম। আমি যথারীতি বোর্হেস সম্পর্কে দীর্ঘ যে লেখাটি সদ্য শেষ করে এনেছি, সেটিই পাঠ করতে শুরু করলাম, যা ছিল প্রায় ২০/২২ পৃষ্ঠার এক দীর্ঘ লেখা। কিন্তু মাত্রই দুই তিন পৃষ্ঠা এগুতে না এগুতেই সভাপতি অধৈর্য হয়ে আমাকে সংক্ষিপ্ত করতে বললেন। আমি খুবই লজ্জা এবং অপমানিত বোধ করেছিলাম সভাপতির ওই আচরণে। সভাপতি যেহেতু চাইছেন না তারপরে তো আর পাঠ করার কোনো মানে হয় না। অথচ মেহিকো থেকে আমাকে আনাই হয়েছে বোর্হেস সম্পর্কে বলতে। আমি হতাশ হয়ে আমার আসনে ফিরে এলাম। এরপরই বক্তৃতা দেয়ার পালা নরম্যানের। আমি হতাশা ও অপমান নমিত করে উৎকর্ণ হয়ে উঠলাম তার বক্তৃতা শোনার জন্য। তার হাতে কিছু কাগজপত্র আর তার The lesson of a master বইটি, যেটি ছিল বোর্হেসকে নিয়ে তার লেখা সর্বশেষ বই। বইটির কথা শুনলেও আমি এখনও পর্যন্ত দেখি নি। তিনি বই থেকেই তার বক্তৃতা পাঠ করতে শুরু করলেন। কিন্তু বিস্মিত হয়ে লক্ষ করলাম তিনি বক্তৃতার এক জায়গায় আমার উল্লেখ করে বললেন :

The reverberation of the clerk’s words seem never to have ended. Thirty years later, I was to receive from Bangladesh two copies of a small books. The volume, mexican thoughts, an anthology of prose pieces in translations, edited by one Razu Alauddin, is dedicated to me, both in Bengali and English. In an accompanying letter, my generous benefactor informed me that the book was a thank you for my work with Borges. That any of this could have happened is a tribute to Borges and his international appeal.

তার মুখে এই কথাগুলো শুনবার পর একটু আগে সভাপতির হাতে যে অপমান ও লজ্জা আমাকে বিমর্ষ করে রেখেছিল তা নিমিষেই উধাও তো হলোই, কৃতজ্ঞতাবোধের এক বিহ্বল অনুভূতি নিয়ে আমি তার দিকে তাকালাম। না, তার দৃষ্টি আমার প্রতি নয়, তিনি বই থেকে তার বক্তৃতা পাঠে অব্যাহত। আগেই বলেছি বইটি আমি তখনও দেখি নি। দেখি নি বলাও ঠিক হবে না, রফিকের হাতে দেখেছি, কিন্তু সে দেখা এক পলকের মাত্র। কিংবা বলা যায়, শুধু নেড়েচেড়ে দেখা মাত্র। কারণ বইটি পড়তে চাইলেও রফিক আমাকে তখন দেয় নি। পরে শুনেছি—রফিকই বলেছে—নরম্যান চেয়েছেন যে, বইটি তিনি আমাকে নিজ হাতে স্বাক্ষর করে দেয়ার আগে যেন কোনোভাবেই রফিক আমাকে পড়তে না দেয়। এখন বুঝতে পারলাম কেন রফিক আমাকে পড়তে দেয় নি। নরম্যান এই দিনের এই মুহূর্তের আগে আমাকে বইটি সম্পর্কে জানতে দিতে চান নি এই নাটকীয় মঞ্চায়নের জন্য? নাটকীয়তা তিনি চেয়েছিলেন সেটা ঠিক, কিন্তু এই নাটকীয়তা যে কাকতালীয়ভাবে লজ্জা ও অপমানকে উৎখাত করার দায়িত্ব একই সাথে পালন করবে তা বোধহয় নরম্যানও ভাবেন নি। অনুষ্ঠান শেষে নরম্যানকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে তাকে এই উজ্জল উদ্ধারের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম। তিনি তৃপ্তির এক মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন, শোনো, এধরনের অনুষ্ঠানে বড় কিছু পাঠ না করাই ভালো, শ্রোতাদের আগে সভাপতিরাই অধৈর্য হয়ে পড়েন, দীর্ঘ বক্তৃতায় বলবে কম, কিন্তু যা বলবে তা যেন স্ট্রাইকিং হয়।

Norman in Savar-1
জাতীয় স্মৃতিসৌধে নরম্যান ও অন্যান্য লেখক

অনুষ্ঠান শেষে আমরা নরম্যানকে নিয়ে গিয়েছিলাম সাভারে আমাদের স্মৃতিসৌধ দেখাতে। চারিদিকে চোখ জুড়ানো উম্মুক্ত খোলা জায়গা আর স্মৃতিসৌধ্যের স্থাপত্য শিল্প তার খুব ভালো লেগেছিল। কিন্তু গরমটা তিনি মোটেই বরদাস্ত করতে পারছিলেন না। ফলে বাইরে আর ছোটাছুটি না করে আমরা ফিরে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউজে।

রফিক এবং আমি একটু বেশি মাত্রাই সতর্ক থাকতাম যাতে গরমের অত্যাচারে তিনি অসুস্থ না হয়ে পরেন। আমি তাকে এই গরম প্রসঙ্গে একবার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম বুয়েনোস আইরেসে গরম কী রকম। তিনি প্রায় ভূত-দেখার মতো চমকে উঠে বললেন, ও মাই গড। বুয়েনোস আইরেসের গরম তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। রীতিমতো দুঃসহ। সেই তুলনায় তোমাদের এই গরম কিছুই না। ২০১৪ সালে Friday Project প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত Georgie & Elsa গ্রন্থে চমৎকার রসবোধের সাথে বুয়েনোস আইরেসের গরমের এক দৃশ্য তিনি হাজির করেছিলেন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে :

সেই সময় শহরে সবাই স্যুট টাই পড়তেন। না পড়াটা হতো সামাজিক আত্মহত্যার শামিল। কিন্তু সেগুলো পড়াটাও হতো আরেক ধরনের আত্মহত্যা। রাস্তা ঘাটে বা বাসের মধ্যে যে-কেউ গরমে গলতে থাকতো আর গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছাতো ঘামে জবজবে অবস্থায়। [পৃ:৮৬]

বুয়েনোস আইরেসের সেই গরম তিনি সহ্য করেছিলেন ছয় বছর। তখন তিনি যুবক, কিন্তু এই বৃদ্ধ বয়সে এখন বাংলাদেশের এই গরমও তার শরীরের পক্ষে অসহনীয়। গেস্ট হাউজের শীতল কক্ষে তিনি থিতু হয়ে বসলেন। সবার জন্য কফির অর্ডার দেয়া হলো। কফি খেতে খেতে বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে তার আগ্রহের কথা জানালেন। রফিক এই সুযোগে বাংলাদেশের গল্পের একটা সংকলন করা যায় কিনা এরকম একটা প্রস্তাব করায় নরম্যান তাতে বেশ আনন্দের সাথেই সায় দিলেন। কিন্তু কিভাবে সেটা প্রস্তুত হবে এ নিয়ে রফিকের সাথে বেশ কয়েক দফা আলোচনা হয়েছিল। সেদিন এই আলোচনার ফাকে এক সময় তার ব্যাগ থেকে দুটো বই বের করলেন।

একটি সেই বই The lesson of the master যেটা থেকে তিনি অংশবিশেষ পাঠ করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগররের অনুষ্ঠানে। আরেকটা বই, যেটি আমি আগে কখনো দেখি নি। প্রথম বইটিতে তিনি নিজ হাতে তার ফাউন্টেন পেন দিয়ে কিছু একটা লিখলেন। লেখা শেষে বইটি আমার হাতে দিয়ে জাবাবদিহির ভঙ্গিতে বললেন, ‘রাজু, তুমি কিছু মনে করো না বইটি দিতে দেরি করেছি বলে। এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ কেন দেরি করলাম।’

তার কৌতুকভরা মিষ্টি হাসিতে উদ্ভাসিত মুখের দিকে সলজ্জ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বইটি গ্রহণ করে মুখ ফুটে শুধু বলতে পেরেছিলাম: মুচাচ্ গ্রাসিয়াস্ (অনেক ধন্যবাদ)। তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এস্পেরাতে, আই মাস (আরও আছে)। পাশে রাখা তার ব্যাগ হাতড়ে আরও একটি বই বের করলেন তিনি। এটি বোর্হেসের ‘El Congreso’ নামক দীর্ঘ গল্পটির একটি সীমিত সংস্করণের বিশেষ কপি। এই সংস্করণটির বিশেষত্ব হচ্ছে ১৯৭১ সালের ১৭ মার্চে এর তিন হাজার কপি প্রকাশিত হয়েছিল। সঙ্গে আরও তিনশ কপি মুদ্রিত হয়েছিল একেবারেই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের বাইরে, যার প্রত্যেকটি ছিল ‘Borges 71’ লেখা একটি লাল রংয়ের ফিতার মতো কাগজে মোড়ানো। সেই একাত্তর সালের পর এটির কোনো দ্বিতীয় মুদ্রণ হয় নি এবং হবেও না।

34382029_1872651842779928_4819461117275275264_n
লেখককে দেয়া নরম্যানের উপহার

বিশেষ ও বিরল এই সংস্কারণটির সম্পাদক ছিলেন হুয়ান আন্দ্রালিস ও নরম্যান টমাস ডি জিওভান্নি। সাধারণ বইয়ের তুলনায় দ্বিগুণ আয়তনের এই বইটির একটি কপি তিনি আগেরটির মতোই লিখে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘তুমি, নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে এটি বোর্হেসের একটি বিরল বই, আর এজন্যই এটি তোমার প্রাপ্য।’

বইটি হাতে নিয়ে আমি আবেগে ও উত্তেজনায় বিমূঢ় হয়ে আছি। দুষ্প্রাপ্য কিছু পাওয়ার জন্য মানুষ কত কী করে। আমি তার কিছুই না করে এমন অমূল্য জিনিস পেয়ে গেলাম—রীতিমতো অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। নরম্যান এক জাদুকরের মতো তার ঝোলা থেকে রহস্যময় বস্তুগুলো বের করে যেন আমার সামনে ভোজবাজি দেখাচ্ছেন। পুরো সময়কে মনে হয়েছিলো রূপকথার বিস্ময়ে মোড়ানো। যেন চিরকালের সময় এখানে এসে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। আমার মতো এক শিশুকে জাদু দেখিয়ে তিনি অনাবিল কী আনন্দই না উপভোগ করছেন। যেন আমাকে মুগ্ধ করতে পারাতেই তার যত আনন্দ।

আমি আর রফিক ভাবছিলাম ঘিঞ্জি ও ঘিনঘিনে, গরম ও জ্যামের এই শহরের বাইরে কোথায়ও যদি একদিনের জন্য তাদেরকে নিয়ে যাওয়া যেত তাহলে বাংলাদেশ সম্পর্কে তার ধারণাটা শুধুই ঢাকা-নির্ভর থাকবে না। তাছাড়া বাংলাদেশের আসল সৌন্দর্যই তো ঢাকার বাইরে। সেটা যদি তাদেরকে না দেখাতে পারলাম তাহলে এতদূর থেকে এত কষ্ট করে আসার মানেটা কী। আমাদের গ্রন্থকুবের আশরাফুল আলম বাবুল ভাইও এই সময়টায় প্রায় নিত্যসঙ্গী বলা যায়। অফিসের কাজ শেষে তিনি এসে আমাদের সাথে যোগ দিচ্ছেন প্রায় নিয়মিতই। বাবুল ভাই আমাদের এই শলাপরামর্শ শুনে নিজেই প্রস্তাব দিয়ে বসলেন তাদেরকে একদিনের জন্য সিলেটে নিয়ে গেলে কেমন হয়। তাই তো, বাবুল ভাই থাকতে আমরা কেন সিলেটের কথা ভাবছি না? আমাদের দুজনের কাছেই বাবুল ভাইয়ের প্রস্তাবটাকে সর্বোত্তম মনে হলো। বাবুল ভাইয়ের ইমামতিতেই আমরা সেইভাবে আয়োজন করে ফেললাম। নরম্যান এবং সুসি আমাদের প্রস্তাবে বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। পরের দিনই আমরা সকাল সকাল একটা মাইক্রোবাসে রওয়ানা হলাম সিলেটের উদ্দেশে।

দুপুরের দিকে আমরা কমলগঞ্জের সুরমা চা বাগানে বেশ কিছুক্ষণ থেকেছিলাম। দুপুরের খাওয়া-দাওয়াও সেরেছিলাম ওখানেই। চা বাগানটা খুব ভালো লেগেছিল তাদের। ওনারা সম্ভবত আগে কখনো চা বাগান দেখেন নি। পরে ওখান থেকে আমরা চলে গেলাম মৌলভীবাজারের কাছে দুসাই রিসোর্টে, ওখানে বিকেলের দিকে নাস্তাটাস্তা সেরে রাতের বেলা পৌঁছলাম মৌলভীবাজারের বাহারমর্দান গ্রামে, সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের বাড়িতে। সাইফুর রহমারের বাড়িতে উঠবার কারণ মূলত বাবুল ভাই, যিনি এই সাবেক অর্থন্ত্রীর ভাগ্নে।

বাড়িটা বেশ বড়সর। ভেতরে কোনো কোনো কক্ষে এসিও রয়েছে। ঢাকা থেকে এই দূরবর্তী এলাকায় এমন রাজকীয় আয়োজন নরম্যান কেন, আমরাও কল্পনা করি নি। রাতটা বেশ চমৎকার কেটেছিল আতিথেয়তা ও আলাপচারিতায়। পরের দিন আমরা নিকটবর্তী হাইল হাওড়ও দেখতে পেরেছিলাম বাবুল ভাইয়ের সৌজন্যে। সবুজ আর গ্রাম্য পরিবেশ তারা দুজনই খুব উপভোগ করেছিলেন। ঢাকার বাইরে সবুজের এই স্বর্গ তাদেরকে যেন দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল।

ওই হাওড় থেকে আমরা সেদিন বা পরের দিন গিয়েছিলাম ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা করিমগঞ্জের গঙ্গানগর এলাকায়। এত সবুজ আর বৃক্ষরাজির দুর্ভেদ্যতা আমি আগে কখনো দেখি নি। দৃষ্টিসীমার আশেপাশে জনপদহীনতা যেন প্রাগৈতিহাসিক পরিমণ্ডল রচনা করে রেখেছে। ওখানে আমরা রাত কাটিয়েছিলাম কিনা মনে নেই। বোধহয় আমরা রাত কাটাই নি। নরম্যানের একটা দৃশ্য খুব মনে পড়ে। নরম্যান যে সঙ্গে করে বাংলাদেশের একটা মানচিত্র এনেছিলেন সেটা আমি কখনো লক্ষ করি নি। নরম্যান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হঠাৎ তার ব্যাগ থেকে একটা মানচিত্র বের করলেন। তাকিয়ে দেখি ওটা বাংলাদেশের। উনি মানচিত্রের দিকে ঝুঁকে বুঝবার চেষ্টা করছেন আমরা কত দূর এসেছি এবং ভারতের সীমান্তটা আমাদের এই অবস্থান থেকে কত দূরে।

সম্ভবত সেদিনই দুপুরে আনিসের সাথে তারা দুজন ঢাকা ফিরে গিয়েছিলেন। আমি, রফিক আর বাবুল ভাই ফিরেছিলাম পরের দিন।

ঢাকায় ফিরে নরম্যানের সাথে আবার মোলাকাত হলে আনিস আমাদের সবাইকে র‌্যাডিসন হোটেলে এক নৈশভোজে আপ্যায়িত করে। সম্ভবত আনিস তাকে ওর নদ্দার বাসায়ও নিয়ে গিয়েছিল। ওর বাসায় যাওয়ার পথে নরম্যান এক লোককে কাঁধে করে সিলিং ফ্যান নিয়ে যেতে দেখে আমাদেরকে বললেন, Look, he is carrying his own helicopter. নরম্যানের রসিকতায় আমরা সবাই হেসে উঠলাম।

নরম্যানের ফেরার দিন ক্রমশই ঘনিয়ে আসছে দেখে রফিক তাকে নিয়ে ঢাকার বেশ কিছু ঐতিহাসিক জায়গা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল, যেমন লালবাগের কেল্লা, হোসেনি দালান এবং আরও কোথাও কোথাও। রফিক তাঁকে খুব সময় দিয়েছিল।

একদিন, যাওয়ার মাত্র এক দুদিন আগে বোধহয়, আর্জেন্টিনার অপেক্ষাকৃত অল্প পরিচিত এক ঔপন্যাসিকের একটি বই উপহার দিলেন আমাকে। লেখকের নাম দানিয়েল মোইয়ানো। আর বইটির নাম The Flight of the Tiger নরম্যানের অনুবাদে এটি বেরিয়েছিল ১৯৯৫ সালে। সত্যি বলতে কি, এই লেখকের নাম আমি আগে শুনি নি। এই লেখক সম্পর্কে আমি তাকে আমার অজ্ঞতার কথা জানাতেই তিনি বললেন, ‘দানিয়েল খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখক। তুমি পড়ে দেখো।’ ‘অবশ্যই পড়ব। আপনার পছন্দের ব্যাপারে আমার কোনো সংশয় নেই প্রিয় নরম্যান।’

উপহার হিসেবে দেয়া সর্বশেষ বইটিতে দেখতে পাচ্ছি তারিখ দেয়া আছে ৩ জুন। সম্ভবত পরের দিন ৪ বা ৫ জুন তিনি ঢাকা ছেড়ে চলে যান। বলেছিলেন লন্ডন ফিরে গিয়ে তিনি এই সফর নিয়ে লিখবেন কোনো এক পত্রিকায়। পরে তিনি লিখেছিলেন কি না তা আর জানার সুযোগ পাই নি। তবে আমার ধারণা তার নোট বই বা ডায়েরিতে তিনি ঢাকা সফরের কথা নিশ্চিতভাবেই টুকে রেখেছেন। লন্ডনে ফিরে গিয়ে ৬ জুন তিনি চিঠি লিখে জানালেন যে সহিসালামতে বাসায় ফিরেছেন :

>Date: Sat, 06 Jun 2009 10:02:46 +0100
>To: Alauddin Razu 2
>From: N T di Giovanni 
>Subject: Home
In case you have not received this message, I am sending it to
yr other address.
Un abrazo,
N.

Querido amigo Razu,

We had the longest day in the world yesterday but got home okay.
Today I am dragging my ass in exhaustion, but what happened to us
in Bangladesh is indelible and I am riding on the excitement of it all.
I must confess that the last two days really wore us out - between the
heat and the traffic.
Did not see enough of you after we returned from Sylhet but I know
what you were trying to achieve.

I will write again when I have recovered my strength. I want to say
something important now. Before you go to California next time, let me
know exactly when you will be there. I can phone you at Anis's for no cost.
I am going to phone Anis later today.
Un gran, gran abrazo para ti y besos para tu hijo y tu mujer,
N.

N T di Giovanni <norman@digiovanni.co.uk> 6/9/09

to razualauddin

Razu, querido amigo y socio,

You don’t have to say anything about those last two days. You had much to do, and Susie and I were running out of steam. The heat was debilitating. The long journey back was a killer too.
But we are slowly recovering and getting back to work.

The good news is that Khademul Islam. of the Star, is going to publish Susie’s Panda story in a slightly shortened version. He has also asked me to write something for him.

I have had warm exchanges of letters from several people. not least Kaiser Haq, who had marvellous things to say about The Lesson of the aster.

I have written to Rafique about our anthology of Bangla stories. I will forward you a copy. I know how busy you are, so am I, but I do not want to let time slip by before we begin. I need this as a way of staying close to my beloved Bangladesh.

Un abrazo y carinos a tu familia,

N.

দেখতে পাচ্ছি ৬ জুন তিনি আমাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। আরেকটি পাঠিয়েছিলেন ৯ জুন, প্রথমটায় রয়েছে ফেরার বার্তা আর দ্বিতীয়টায় শেষের দুদিন তাকে সময় দিতে পারি নি বলে মার্জনা চেয়ে যে-চিঠি লিখেছিলাম তারই জবাবে আরেকটি চিঠি। আবার এই ৯ জুনেই তিনি আরেকটি চিঠি আমাকে ফরোয়ার্ড করলেন যেটি আসলে রফিককে সম্বোধন করে লেখা। ফরোয়ার্ড করার কারণ বাংলাদেশের গল্প নিয়ে আমাদের সম্ভাব্য সংকলনটি সম্পর্কে তার পরামর্শ।

N T di Giovanni <norman@digiovanni.co.uk> 6/9/09

to razualauddin

Date: Mon, 08 Jun 2009 19:51:19 +0100
To: Chowdhury Rafique
From: N T di Giovanni
Subject: Next move

Amigo Rafique,

Please thank my friend Nazmun for her words. Now, as for you, I want to get started on our story anthology as soon as possible. How do we propose to begin? I think you and Sr Razu should begin to draw up a list of authors and send it to me even if it tells me very little.

We must impose parameters for the book: number of stories, themes, age of the writers, etc. See how I dealt with this in the introductions to Celeste and Hand in Hand. You must also be all-embracing in your choice. Find one or two good Hindu writers. Find a good number of women writers. The book must reveal in the immortal words of Jibanananda ‘the face of Bangla’.

I am just about to sign contracts for three books of my own with my new publisher Scott Pack. In time, I want to present our anthology to him. Remember, this will be a book for English-speaking people outside Bangladesh. If we can also get the book published in Dhaka, all to the good.

I had a wonderful letter from Kaiser today about The Lesson of the Master. I am over the moon.

I’ll write again soon to badger you more. I shall be relentless and without pity. Prepare yourself.

Un abrazo fuerte,

N.


কোদামার এই পদক্ষেপের ফলে বোর্হেস-ভূমণ্ডল থেকে নরম্যান একেবারে ছিটকে পড়েন এক নির্জন দ্বীপে।


এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না কেন তার সাথে শেষের দু’তিনদিন দেখা হয় নি। খুব সম্ভবত আমি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারি। তিনি ঢাকা ছাড়বার আরও কয়েকদিন পরে আমি ঢাকা থেকে মেহিকোতে ফিরে যাই। সেখান থেকে ফোনে তার সাথে বেশ কয়েকবার আলাপও হলো। আমি আবার দেশে ফিরে এলাম ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে। দেশে ফিরে মাঝেমধ্যে সংক্ষিপ্ত পত্রযোগাযোগ হয়েছিল বটে কিন্তু তা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছিল। তবে ক্ষীণ হওয়ার আগে তিনি রফিকের মাধ্যমে আমাকে তার সর্বশেষ অনূদিত বইটির একটি কপি পাঠিয়েছিলেন।

বহুদিন পার হয়ে গেলেও আমার পক্ষ থেকে বইটির কোনো প্রাপ্তি সংবাদ না পেয়ে তিনি আমাকে আরেকটি চিঠি লিখে জানতে চাইলেন বইটি আমি পেয়েছি কিনা। বই? আমি তো জানিই না কোনো বইয়ের কথা। তিনি পরের চিঠিতে কিছুটা বিস্ময় আর উষ্মা প্রকাশ করলেন। আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম, পাঠিয়েছেন যখন, তখন নিশ্চয়ই পেয়ে যাব।

সেই বই অবশ্য পেয়েছিলাম, তবে কয়েক মাস পরে। শেষের দিকে, যেমনটা আগেই বলেছি, যোগাযোগ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে গিয়েছিল। এবং ব্যাপারটা এমনই হয়ে গিয়েছিল যে তার মৃত্যু সংবাদটাও জানতে পারলাম বেশ কিছু দিন পর।

নরম্যানের শেষ দিনগুলির জন্য সত্যি খুব বেদনা হয়। শেষ দিন বলতে তার আয়ুর শেষ দিন নয়, তার অনুবাদক জীবনের শেষ দিনগুলির কথা। বোর্হেসের দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়া কোদামা বোর্হেসের সমগ্র বিষয় সম্পত্তির মালিক হওয়ার পর নরম্যানের করা বোর্হেস অনুবাদগুলো পুনঃপ্রকাশের অনুমতি না দিয়ে তাকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়। বোর্হেসের রচনাবলি অন্য অনুবাদকদের মাধ্যমে অনুবাদ করানো হয়। কোদামার এই পদক্ষেপের ফলে বোর্হেস-ভূমণ্ডল থেকে নরম্যান একেবারে ছিটকে পড়েন এক নির্জন দ্বীপে। বোর্হেসের ডাকসাইটে অনুবাদককে প্রায় নিশ্চিহ্ন করা হয়। অথচ নরম্যান কেবল বোর্হেসের রচনার অনুবাদের সাথেই নয়, এমনকি বোর্হেসের জীবনের ঘটনাবহুল এক সময়কালের সাথেও জড়িয়ে ছিলেন। সেই সময়কালের এক নাটকীয় বিবরণ আমরা দেখতে পাব তার সর্বশেষ Gorges and Elsa গ্রন্থে। এই গ্রন্থেই আমরা দেখতে পাই প্রথম স্ত্রী এলসাকে তিনি বিয়ে করলেও তার সাথে সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত তিক্ততায় গিয়ে পৌঁছেছিল। বোর্হেস চাইছিলেন এলসা থেকে মুক্তি। নরম্যান তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। বোর্হেসকে উদ্ধারের কারণে এলসার কাছে নরম্যান চিহ্নিত হন শত্রু হিসেবে। বোর্হেসের দ্বিতীয় স্ত্রী কোদামার কাছেও তিনি শত্রু বলে চিহ্নিত না হলেও চিহ্নিত হন ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ (Persona nongrata—ঠিক এই শব্দটাই তিনি ব্যবহার করেছিলেন আমাকে লেখা অন্য এক চিঠিতে) হিসেবে।

তবে সুখের কথা এই যে যে-দুজনের কাছে এই প্রণম্য অনুবাদক ও লেখক শত্রু ও অনাকাঙ্ক্ষিত বলে চিহ্নিত হয়েছেন তাদের দুজনের কেউই সাহিত্যের নন; যদিও তারা ছিলেন মহান এক সাহিত্যিকেরই স্ত্রী। আর ঐ চিহ্নায়ন কোনো সাহিত্যিক কারণ থেকে নয়, বরং ঈর্ষা ও বিষয়বাসনা থেকে জন্ম নেয়া। সাহিত্যের গুণবিচারী পাঠকদের কাছে তিনি চিরকাঙ্ক্ষিত ও পরম বন্ধু। আমার সৌভাগ্য, এই মানুষটির সাথে অল্প কিছু দিনের জন্য হলেও সাক্ষাৎ ও মেলামেশার সুযোগ পেয়েছিলাম। তার স্নেহ ও ভালোবাসার উদার ডানার নিচে থাকার উষ্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম।


ঈদসংখ্যা ২০১৮
রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন

জন্ম ১৯৬৫, শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত। ভিন্ন পেশার সূত্রে মাঝখানে বছর দশেক কাটিয়েছেন প্রবাসে। এখন আবার ঢাকায়। ইংরেজি এবং স্পানঞল ভাষা থেকে অনুবাদের পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বিশ।

প্রকাশিত বই :
অনূদিত কাব্যগ্রন্থ—
গেয়র্গ ট্রাকলের কবিতা (মঙ্গলসন্ধ্যা প্রকাশনী, ১৯৯২)
সি পি কাভাফির কবিতা (শিল্পতরু প্রকাশনী, ১৯৯৪)
টেড হিউজের নির্বাচিত কবিতা (বাংলা একাডেমী, ১৯৯৪)
আকাশের ওপারে আকাশ (দেশ প্রকাশন, ১৯৯৯)

অনূদিত সাক্ষাৎকার গ্রন্থ—
সাক্ষাৎকার (দিব্যপ্রকাশ, ১৯৯৭)
কথোপকথন (বাংলা একাডেমী, ১৯৯৭)
অনূদিত কথাসমগ্র ( কথাপ্রকাশ)

সংকলন, সম্পাদনা ও অনুবাদ—
মেহিকান মনীষা: মেহিকানো লেখকদের প্রবন্ধের সংকলন (সাক্ষাৎ প্রকাশনী, ১৯৯৭)
খ্যাতিমানদের মজার কাণ্ড (মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৭)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত গল্প ও প্যারাবল (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত কবিতা (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত সাক্ষাতকার (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত প্রবন্ধ ও অভিভাষন (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
প্রসঙ্গ বোর্হেস: বিদেশি লেখকদের নির্বাচিত প্রবন্ধ (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
রবীন্দ্রনাথ: অন্য ভাষায় অন্য আলোয় (সংহতি প্রকাশনী, ২০১৪)
মারিও বার্গাস যোসার জীবন ও মিথ্যার সত্য (সাক্ষাৎ প্রকাশনী, ২০১৫)

গৃহীত সাক্ষাৎকার—
আলাপচারিতা ( পাঠক সমাবেশ, ২০১২)

কবিতা—
আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি (শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০১৪)

জীবনী—
হোর্হে লুইস বোর্হেসের আত্মজীবনী (সহ-অনুবাদক, সংহতি প্রকাশনী, ২০১১)

প্রবন্ধ—
দক্ষিণে সূর্যোদয়: ইস্পানো-আমেরিকায় রবীন্দ্র-চর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস( অবসর প্রকাশনী, ২০১৫)

ই-মেইল : razualauddin@gmail.com
রাজু আলাউদ্দিন